#Tell_me_who_I_am
#বোনাস_পর্ব_১
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(সকল নতুন ও অভিজ্ঞ লেখকদের জানানো যাচ্ছে যে, আমার গল্পের সংলাপ, প্রেক্ষাপট বা বৈশিষ্ট্য কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কপি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।)
__________________________________________☞
[বি.দ্র. আগেই বলেছিলাম, বোনাস পর্বগুলো মূল গল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়।]
সকালবেলার স্নিগ্ধ আলো জানালার কাচ ছুঁয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। কক্ষে ছড়িয়ে আছে এক প্রাতঃস্মরণীয় প্রশান্তি। কারান অফিসের জন্য প্রস্তুত হলো। তার দেহে গাঢ় নেভি ব্লু স্যুটপ্যান্ট, ভেতরে নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট, গলায় সিল্কের কালো টাই। কব্জিতে হ্যাবলট বিগ ব্যাং-এর ঝলমলে ঘড়ি দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। বুকপকেটে গোঁজা তুষারশুভ্র পকেট স্কয়ার পুরো সাজসজ্জায় রাজসিক ঔজ্জ্বল্য যোগ করেছিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে অনায়াস ভঙ্গিতে চুলগুলো সযত্নে গুছাচ্ছিল। হঠাৎই তার চোখে-মুখে দুষ্টু ভাব প্রকাশ পেল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে, উচ্চকণ্ঠে ডাকল, "সুইটহার্ট।"
মিরা পাশের কক্ষে জানালার ধারে একটি পুরোনো কাঠের আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসেছিল। সকালবেলার আলো জানালা পেরিয়ে এসে তার গায়ের উপর এক নিস্তরঙ্গ আভা ফেলছিল। বহুদিন পর বই হাতে ডুবে গিয়েছিল এক বিদেশি উপন্যাসে। কারানের ডাক শুনে সে বিরক্তি চেপে বই বন্ধ করে গলা উঁচিয়ে বলল, "বলো..."
"অফিসে যাচ্ছি।"
"আচ্ছা।" বলে আবার সে বইয়ের পাতায় মন ডুবিয়ে দিল। কপালের উপর নেমে আসা আলগা চুলটা আঙুল দিয়ে সরিয়ে নিয়ে মনোযোগী হয়ে পড়তে লাগল।
কিন্তু মিরার এমন নির্লিপ্ত জবাবে কারানের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। বুকের কাছে হাত বাড়িয়ে সে নিপুণ ভঙ্গিতে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে ফেলল। তারপর ড্রয়ার থেকে তুলে নিল তার প্রিয় ‘রোজা ওট লাক্স’ এর পারফিউমের বোতল। বুকের কাছ থেকে শুরু করে কাঁধ পর্যন্ত এক ঝলকে ছড়িয়ে দিল মাদকতাময় গন্ধ। গোলাপের গভীর সুবাসের সাথে চন্দন ও ভ্যানিলার ঘন মিশ্রণ কক্ষে রাজকীয় আবেশ তৈরি করল।
কারান গলা উঁচিয়ে আবার ডাক দিল, "মিরা, একবার এদিকে এসো।"
মিরা বইটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেল। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বইটা শেলফে তুলে রেখে ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করল। চোখেমুখে কোনো বাড়তি আবেগ না এনে নিরুত্তাপ গলায় বলল, "বলো।"
কারান বোতামটা হাতে তুলে ধরে মিরার দিকে বাড়িয়ে দেখাল, "এটা খুলে গেছে, লাগিয়ে দাও।"
মিরা ভ্রূ কুঁচকে হাত বাড়াল, "অন্য একটা পরে নিলেই তো হয়।"
"না, সময় নেই। এখন এটাই পরে যেতে হবে।"
মিরা চোখ সরু করে তার শার্টের দিকে তাকাল। ঠান্ডা স্বরে বলল, "তা আমি লাগিয়ে দিতে গেলে বুঝি সময় থেমে থাকবে? তোমার কালো শার্ট অন্তত চার হাজার পাঁচশোটা তো হবেই, আর সাদা শার্টও পাঁচ হাজারের কম নয়। বাকিগুলোর কথা না বলাই ভালো। এত পোশাক দিয়ে কী করো?"
কারান ঠোঁট বাঁকিয়ে একপ্রকার অহংকারী ভঙ্গিতে জবাব দিল, "আমি কোনো পোশাক রিপিট করি না।"
মিরা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "হয়েছে। মোট কথা, আমাকে দিয়ে এখন খাটানো লাগবে।"
কারান ঠোঁটের কোণে প্রগলভ হাসি ফুটিয়ে তুলল। মিরাও মৃদু হাসল, তারপর পাশের কক্ষ থেকে সূক্ষ্ম সুতোর রিল ও সুঁই হাতে নিয়ে ফিরে এলো। কাছে এসে সে সযত্নে কারানের শার্টের বুকে বোতাম লাগানোর প্রস্তুতি নিল।
ঠিক তখনই কারানের গায়ে ছড়িয়ে থাকা রোজা ওট লাক্স পারফিউমের ঘন আবেশে মিরা মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। চেতনার অতল থেকে যেন এক অকারণ মোহ তাকে আচ্ছন্ন করল। কারান তীক্ষ্ণ চাহনিতে অনুধাবন করল স্ত্রীর এই আকস্মিক বিভোরতা। এ জন্যই সে দেহে সুগন্ধি ছড়িয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মিরা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে পুনরায় সূক্ষ্ম সেলাইয়ের কাজে মনোযোগ দিল।
কারান অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিরার মুখাবয়বে। মিরা বোতাম লাগানো শেষ করে সামান্য ঝুঁকল সুতা কাটতে। সেই মুহূর্তে কারান চোখ বন্ধ করে অনুভব করল মিরার চুলের সুগন্ধি। নিশ্বাসের সাথে তার বুক ভরে উঠল সেই অদৃশ্য মাদকতায়। মূলত এই গোপন কারণেই কারান ইচ্ছে করে বোতামটা খুলেছিল।
সেলাই শেষ হলে মিরা গলা উঁচু করে বলল, "হয়ে গেছে।"
কিন্তু তার চোখে পড়ল ভিন্ন দৃশ্য। কারান চোখ বন্ধ করে হাতে মুঠো করে রেখেছে মিরার কয়েকগুচ্ছ চুল, সেই সুবাসে নিমগ্ন সে। মিরার ঠোঁটে খেলল সংযত হাসি। আস্তে করে তার হাত থেকে চুলগুলো ছাড়াতে চাইতেই কারান হঠাৎ শাড়ির আবরণ ভেদ করে কোমর শক্ত করে টেনে নিল কাছে। তার দৃষ্টি তখন গভীর, স্থির; সেই শিকারি চোখে একান্ত অধিকার জেগে উঠেছে।
মিরা মৃদু হাসিতে দু’হাত দিয়ে কারানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "কি ব্যাপার, মিস্টার একে চৌধুরি? একটু আগেই না খুব তাড়া দেখাচ্ছিলেন।"
কারানের চোখে তখন নেশালো দীপ্তি খেলল। কোমরে দৃঢ় বাঁধন চাপিয়ে টেনে নিল আরো কাছে। দু’জনের উদর মিলিয়ে গেল। তার গলা থেকে বেরোল কোমল স্বর, "মুড চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে যে, স্টারলিং।"
মিরা মৃদু হাসি ছড়িয়ে তার বুকে হালকা ধাক্কা দিল। "অফিসে যান।"
কারান হাসতে হাসতে সরে গিয়ে বলল, "ওকে, সুইটহার্ট। সাবধানে থেকো।"
কারান দরজার দিকে এগোতে যাবে, তখনই পেছন থেকে মিরার কণ্ঠ শোনা গেল, "কারান..."
কারান বিস্মিত চোখে থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরল। মিরা ধীরপায়ে এগিয়ে এলো, তারপর হঠাৎ নীচু হয়ে বসে পড়ল তার সামনে। কারান কপালে ভাঁজ ফেলে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। মিরা নিখুঁত যত্নে কারানের জুতোর ফিতে বাঁধতে শুরু করল।
কারান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই যত্ন তার কাছে অমূল্য, অপ্রত্যাশিতও বটে। ফিতে বাঁধা শেষ হলে মিরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দু’হাত বাড়িয়ে তার গলা ধরে সামান্য নিচে নামালো, তারপর গালে রাখল এক গভীর চুম্বন। মুহূর্তেই কারানের বুক ভরে উঠল প্রশান্তির অপরূপ স্রোতে। মুখে কোনো হাসি ফুটল না, কারণ সেই নিঃশব্দ যত্নে সে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল।
মিরা আলতো হাসল, শান্ত কণ্ঠে বলল, "এবার যাও।"
কারান মিরার দিকে অপলক দৃষ্টি রাখল। এতটা নিখুঁত যত্নশীল কেন তার স্ত্রী? সে নিজেও বিস্মিত, সাথে হৃদয়ে গর্বের এক মৃদু তপ্ততা অনুভব করল। সংযত কণ্ঠে বলল, "লাভ ইউ।"
মিরা হালকা হেসে উত্তর দিল, "হয়েছে, বাবা। এখন যাও, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।"
কারান আলতো করে মিরার কপালে চুম্বন করল। মিরা বন্ধ চোখে গভীর নিশ্বাস নিল।
তারপর কারান হালকা হাসি টেনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াল। গাড়ির সিটে বসার পর পুরো রাস্তাটাই মিরার সৌম্য উপস্থিতি আর গৃহপরিচর্যার মায়াজালেই বন্দী হয়ে গেল সে। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজের অজান্তে ফিসফিস করল, "আমি জানি না তোমাকে কতটা অনুভব করাতে পারি, বা কতটা যত্নে আবৃত করতে পারি। তবে তুমি যে প্রতিদিন নিজের ভালোবাসা দিয়ে আমাকে ঋণী করে দিচ্ছ, সুইটহার্ট।"
______
ঘরে কয়েক ঘণ্টা কাটল অচেতন পরিশ্রমে। কারান না থাকার কারণে মিরা নিজেকে অতিরিক্ত ব্যস্ত রাখছে। বসার ঘরের বুকশেলফ অনেকটাই পরিষ্কার, তবুও সে গাঢ় কাঠের তাকগুলো একে একে মুছে নিল। জানালার পর্দা ইতোমধ্যেই গুছানো, তবু আবার ভাঁজ মেলল, নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখল। ছোট ছোট জিনিসগুলো হাতেনাতে সাজালো, মেঝেতে হাত বুলিয়ে পরিষ্কার করল। আসলে কাজ নয়, একাকিত্বের ভার কমানোই ছিল তার উদ্দেশ্য।
তবু মন বসছিল না। বিছানায় এসে ধপাস করে বসে মনখারাপের স্বরে বিড়বিড় করল, "ইশশ, কখন যে আসবে তুমি! একটুও ভালো লাগছে না।"
কিছুক্ষণ পরে অস্থির হয়ে পা নাড়াতে শুরু করল। একবার শুয়ে পড়ল, আবার উঠে দাঁড়াল।
"না, শুতেও ভালো লাগছে না। সব কাজই তো শেষ হয়ে গেছে। এবার কি করি?"
হঠাৎ মনে এলো, ইলিজাকে কল করা যায়। মুখে হঠাৎ প্রশস্ত হাসি ফুটল। তৎক্ষণাৎ ফোন হাতে নিল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ল—আজ তো ইলিজার স্কুল আছে। আবার মন খারাপ হয়ে গেল।
"তাহলে কাকে কল করি? আচ্ছা, তারান্নুমকে করি। ওর ভাইয়ের নামে একটু বদনাম করার জন্য এখনই মোক্ষম সময়।"
অন্যদিকে, প্রাচীন চৌধুরি পরিবারের আঙিনায় দুপুরের রোদে তারান্নুম পাটি বিছিয়ে বসেছে। পাশে তার ছোট বোন তুব্বা। দু’জনের সামনে ছড়ানো ছিল রঙিন লুডুর গুটি। এই খেলায় তারান্নুম প্রায়ই হেরে যায় তুব্বার কাছে। আজও সেই পরিণতির মুখোমুখি। তবে তার বুকের ভেতর গোপন প্রতিজ্ঞা হলো, একদিন না একদিন খেলায় তুব্বাকে গো হারানো হারাতেই হবে।
আপাতত খেলা শেষের দিকে। পাশা হাতে নিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে মনে মনে বলল, "এইবারও হারলে তুব্বার বাচ্চায় আমারে নিয়া যে মজাটা করব রে। আয়হায়!"
ওদিকে তুব্বা চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক নিয়ে হেসে বলল, "এইবার হারলে সোজা ফারহান ভাইয়ারে বইলা দিব যে, তোমার মতোন হেরো ভূতরে যেন বিয়া না করে।"
কথাটা বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে।
তারান্নুমের চোখ-মুখ কুঁচকে গেল, ঠোঁটে রাগ জমলো। সে জোরে বলে উঠল, "আমি জানতাম, মা তোরে ব্রিজের নিচের পচা ডোবাটা থেইকাই কুঁড়াইয়া আনছিল। তুই আমার বইন হইলে তো ওই আঁটকুড়া ব্যাটার পক্ষ নিতি না।"
আপনমনে হেসে বলল, "যদিও সে দামড়া, খাটাশ, কিন্তু আঁটকুড়া নামটাই ভালো মানায়!"
তারান্নুমের ক্ষোভ আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাগের দর্শন দেখে তুব্বা হাসি আটকাতে পারল না। হেসে হেসে সে লুটোপুটি খেল। বলল, "ফারহান ভাইয়ের ছবি দেইখাই আমার মেলা পছন্দ হইছে। না জানি সামনে থেইকা কত সুন্দর! তুমি যে আমারে পিটাও, আর আগে কারান ভাইয়ার জন্য দেওয়ানা ছিলা—সব আমি বইলা দিব।"
তারান্নুম ঠোঁট কামড়ে বলল, "খাড়া তুই।"
এই বলে সে মারধরের জন্য হাতের কাছে কিছু খুঁজতে ঝুঁকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনের বেজে উঠা রিং টোনে তার ক্ষুদ্র হিংসা উবে গেল। কে কল করেছে তা দেখার আগেই তুব্বা হেসে বলল, "হইবো না! আগে দান দাও, তোমারে হারাইতে সেই মজা!"
তারান্নুমও অবচেতন বুদ্ধি প্রয়োগ করল। কারণ সে জানে, এ খেলায় তার পরাজয় অবধারিত। পরাজয়ের লজ্জা মেনে নেওয়ার চেয়ে, খেলা ভেঙে ফেলা তার কাছে অতি বুদ্ধিমানের কাজ মনে হলো। ইচ্ছাকৃত ভঙ্গিতে পাশে রাখা ফোনটার দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্ক্রিনে মিরার নাম দেখে তার ঠোঁটের কোণে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল। তৎক্ষণাৎ ফোনটা কাড়ল আর সগৌরবে বলল, "এমনিতেও আমার লগে পারতি না তুই। মিরা ভাবি কল দিছে—গেলাম কথা কইতে।"
এই বলে সে সামনের গুটি সব এলোমেলো করে দিয়ে দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে গেল। তুব্বার চোখের সামনে মুহূর্তেই ভেঙে গেল তার এতক্ষণ ধরে গড়া খেলার সব পরিশ্রম। দম আটকে আসা রাগ ও অভিমানের স্রোত থামাতে না পেরে তুব্বা হাত-পা ছড়িয়ে, গলা ফাটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আর যদি তোমার লগে খেলি আমি... না পারলেই এমন করো। এ্যাআআআ!"
কিন্তু তারান্নুমের ঠোঁটে তখন মুচকি হাসির লাবণ্য ফুটল। ফোন রিসিভ করতেই উৎফুল্ল কণ্ঠে ডাক দিল, "ভাবিইইই, কেমন আছো?"
অপাশে মিরা ঘরের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল। জানালা দিয়ে ঝরে পড়া আলো তার চুলে খেলা করছিল। চোখেমুখে দীপ্তিময় প্রশান্তি নিয়ে সে হেসে উঠল, "এই তো তরু, অনেক বেশি ভালো আছি। তোমাদের খুব মনে পড়ছে।"
"তা তো আমগোও মনে পড়ে। কবে আইবা তুমি? ভাল্লাগে না আর।"
মিরা হালকা হাসি দিয়ে বলল, "আসব আসব। কিন্তু তোমার যে একটা একরোখা ভাই আছে, সে যে আমাকে যেতে দেয় না।"
তারান্নুম ঠোঁট কামড়ে ঠাট্টার সুরে ঝাঁঝ মেশাল, "দিব না তো। আসলে সব ব্যাটারাই হারে বজ্জাত।"
"তাই তো। শোনো, ভালো বুদ্ধি দিচ্ছি—বিয়ে নামক অশান্তিতে জড়িও না। এ এক অন্তহীন গহ্বর, যেখানে সুখ কেবল ছলনার মায়াজাল।"
তারান্নুম এক গভীর হতাশ নিশ্বাস ফেলে বলল, "ওইসব আকাইম্মা জিনিসে জড়াইন্নার ইচ্ছা আমারো নাই। খালি একটু টেস্ট করতে মন চায় যে, ব্যাটা মানুষরে চুমু দিলে কেমন ফিল হয়। নইলে ওসব পাপের থেকে আমি শতহাত দূরেই থাকতাম।"
মিরা জোর করে ঠোঁট চেপে রাখল। অথচ তার বুকের ভেতর খিলখিল হাসির বন্যা হয়ে যাচ্ছিল। সে গলা খাকারি দিয়ে বলল, "কে বলল তোমাকে বিয়ে করা পাপ কাজ?"
তারান্নুম তখন সামনের দিকে হাঁটছিল। গ্রামীণ বাতাসে তার গোল জামার ঘের বারবার উড়ছিল। তার কিশোরী মুখে সেই বাতাসের ছোঁয়া স্নিগ্ধ আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। চোখ পাকিয়ে সে বলল, "বিয়ে করা তো পাপ না, বিয়ের পর যেগুলা করে ওইগুলা পাপ। আমি অনেক সুশীল মাইয়া, ওইসব অশ্লীলতার ধারেকাছেও নাই। শুধু একবারের জন্য হইলেও চুমু খাওয়ার কৌতূহলটা মিটাইতে বিয়া করবার মন চায়।”
তারান্নুমের বেপরোয়া সরলতায় মিরার বুক ভরে উঠল নিঃশব্দ হাসিতে। কিন্তু সে কৃত্রিম গাম্ভীর্যের আবরণে মুখ লুকিয়ে তার সাথে সায় দিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ননদ-ভাবির আলাপে বোনা হলো অগোছালো কথার জাল—যার অধিকাংশই ছিল কারান ও ফারহানের নিন্দা-পরিহাস। সময় গড়িয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর অবশেষে ফোনের সংযোগ ছিন্ন হলো।
তারান্নুম কল কেটে চঞ্চল ভঙ্গিতে নাচতে নাচতে ঘরে ঢুকল। এবার তার উদ্দেশ্য রান্নাঘরে গিয়ে ফাতিমাকে উত্ত্যক্ত করা।
অন্যদিকে ফোন কেটে যেতেই মিরার মুখমণ্ডল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে এলো। তার হাসি মিলিয়ে গিয়ে স্থির হলো বিষণ্নতার মুখোশে। কিছুক্ষণ চেয়ার ধরে বসে রইল, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় গেল। ওপাশে টেক্সাস শহরের বিশাল স্কাইলাইন চোখে পড়ল। সামনে শুধুই বিস্তৃত প্রকৃতির শ্যামল প্রান্তর, অথচ কোনো জনবসতি নেই।
মিরা সেই দৃশ্যের দিকে চেয়ে থেকে গভীর নিশ্বাস ফেলল। ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিল। ডায়াল প্যাড থেকে নাম্বার বের করল। স্ক্রিনে কারানের নাম উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিল, অথচ আঙুল স্থির হলো না। নিজের সাথে বিড়বিড় করে বলল, "কারানকে কল করা কি সত্যিই ঠিক হবে? অফিসে আছে, নিশ্চয়ই ব্যস্ত... হয়ত এখন বিরক্ত করা উচিত নয়। কিন্তু এই অবাধ্য মন যে কোনো যুক্তির কাছে মাথা নত করছে না।"
এই আত্মসংঘাত তাকে অস্থির করে তুলল। একবার ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। আবার কিছুক্ষণ পর তুলে নিল। হৃদয়ের টান প্রতিবারই বুদ্ধির দেয়াল ভেঙে ফেলছে। অবশেষে চোখ বন্ধ করে দৃঢ় আঙুলে চাপ দিল কল বাটনে।
অন্যদিকে কারান ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ আটকে কাজ করে যাচ্ছিল। ফাইলের একের পর এক অনুচ্ছেদ পড়তে পড়তে যখনই সে গভীর মনোযোগে তলিয়ে গেল, ঠিক তখনই অফিসঘরের নীরবতা ভেঙে ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। কারানের ভ্রূ কুঁচকে গেল। মুখের প্রতিটি রেখায় অপ্রকাশিত বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে তো প্রতিদিন অফিসে ঢোকার আগেই ফোন সাইলেন্ট করে রাখে। আজ তাহলে করল না কেন? এমনটা তো তার স্বভাববিরুদ্ধ! ভ্রূ নাচিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই বিরক্তি মিলিয়ে মুখটা উজ্জ্বল হাসিতে বদলে গেল। ডিসপ্লেতে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে —My Queen Victoria.
ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি খেলিয়ে কারান ইচ্ছে করেই ফোন ধরে না চিনার ভান করল। গম্ভীর স্বরে বলল, "হ্যালো, কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে সামান্য নিশ্বাস ফেলার শব্দ পেল সে। তারপরই মিরার হাসির আলতো শব্দও শুনলো। মিরাও গম্ভীরমুখে বলল, "আপনার বউ বলছি।"
কারান ঠোঁট টিপে হাসল, মিরার এই অভিনয় বরাবরই তার পছন্দ। তবে আমোদটা ধরে রাখতে গম্ভীর গলায়ই বলল, "জি, বলুন?"
এবার মিরার কণ্ঠ বদলে গেল। কঠোরতার চাদর খুলে বেরিয়ে এলো নিবিড় কোমলতা। দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে এক নিমেষের জন্য চোখ বন্ধ করল সে। তারপর গভীর মায়ায় ভেজা স্বরে বলল, "মিস ইউ, হানি।"
কারান নিঃশব্দে হাসল। ওপারে থাকা মানুষটিকে অনুভব করতে তার বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না। চোখে স্বচ্ছ উষ্ণতা নিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল, "মিস ইউ টু, সুইটহার্ট।"
মিরার ঠোঁট থেকে হালকা হাসি ঝরে পড়ল, কিন্তু বাক্য আর গড়াল না। তবে তার নিস্তব্ধতার ভেতর কোনো অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা দোদুল্যমান। কারান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর মিরার নিরবতা দেখে নিজেই মুখ খুলল, "আর কিছু বলবে?"
মিরা ঠোঁট কামড়ে দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল, "কখন আসবে?"
কারান হালকা হেসে বলল, "যখন সময় হবে।"
"আচ্ছা।"
"আর?"
"আসার সময় একটা কোক নিয়ে এসো।"
"ওকে। আর?"
অল্পক্ষণ নীরব থেকে মিরা আবার বলল, "আর..."
কারান চুপচাপ কানে ফোন লাগিয়ে পিছনের চেয়ারে মাথা হেলিয়ে বসে থাকল। মিরা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। তারপর হালকা একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অশান্ত কণ্ঠে বলল, "তুমি কিছু বলবে না?"
কারান হাসল, জানে মিরার ফোন করার মূল উদ্দেশ্য কি! তাই শান্ত, গভীর স্বরে বলল, "লাভ ইউ, মহারানি ভিক্টোরিয়া। উম্মাহ..."
মিরার মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল। সেই মুহূর্তে তার মনের গভীরে নিগূঢ় প্রশান্তির শিহরন ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবারই কারানের গম্ভীর কণ্ঠের প্রতিটি শব্দই তার মনপ্রাণকে আলোকিত করে দেয়, সমস্ত তৃষ্ণা ম্লান হয়ে যায়। আজও এই অনুভূতির ব্যতিক্রম হলো না। মিরা হেডবোর্ডে মাথা হেলিয়ে বলল, "ডিনারে কি খাবে, কারান?"
কারান নেশালো গলায় উত্তরে বলল, "তোমাকে।"
🍁চলবে?🍁
#Tell_me_who_I_am
#বোনাস_পর্ব_২
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(সকল নতুন ও অভিজ্ঞ লেখকদের জানানো যাচ্ছে যে, আমার গল্পের সংলাপ, প্রেক্ষাপট বা বৈশিষ্ট্য কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কপি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।)
__________________________________________☞
[বি.দ্র. আগেই বলেছিলাম, বোনাস পর্বগুলো মূল গল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়।]
কথাগুলো শুনে মিরার গাল যেন পরিপক্ব ডালিমের মতো লালচে আভা পেল। লজ্জা তার চোখের ভাষায়ও খেলা করল; ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না। কারণ সে জানে, কারানের সামনে কোনো প্রত্যুত্তর উচ্চারণ মানে নিজের লজ্জাকে আরো প্রগাঢ় করা।
কারান কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দ্রুত বলল, "সুইটহার্ট..."
"হ্যাঁ, বলো," মিরা মৃদু স্বরে জবাব দিল।
"কাল রাতে তোমাকে বলেছিলাম না, আজ আমার একটা স্পেশাল মিটিং আছে? একটু পরই শুরু হবে। ফোনটা সাইলেন্ট করে দিচ্ছি, সোনা। তুমি কিন্তু ঘর থেকে একদম বের হবে না। খুব দ্রুত ফিরে আসব। বাই, বেইবি।"
কারান এক নিশ্বাসে কথাগুলো শেষ করল। অন্য প্রান্তে মিরা তার স্বর শুনে কিছুটা থমকে গেল।
"আচ্ছা," শুধু এই শব্দটুকুই বেরোল মিরার ঠোঁট থেকে, তাও নিস্তেজ সুরে। কারণটা এই যে, এখন তাকে আবার একা থাকতে হবে।
কারান ক্ষীণ এক হাসি হেসে কল কেটে দিল। ফোনের স্ক্রিন নিভে যেতেই মিরার মনটা শূন্যতায় ডুবে গেল। মিরা অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল; তার দৃষ্টি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে এলো, মুখের প্রশান্তি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল মৃদু বিষণ্নতা।
সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর কিছু ছড়ানো কাগজ। কারানের আজকের স্পেশাল মিটিং-এর ফাইলটাও ওখানেই পড়ে আছে। মিরা কপালে হাত রেখে অসহায় স্বরে উচ্চারণ করল, "হে আল্লাহ!"
সে এগিয়ে গিয়ে ফাইলটা হাতে নিল। মোটা কভারটির ওপর কারানের হাতের লেখা দেখে স্বচ্ছ হাসল। সেটার উপর আলতোভাবে হাত বুলিয়ে নিয়ে ফাইলটা খুলল। তাকিয়ে দেখল, তাতে জরুরি নোট, পাতাগুলোর কোণে অফিসের সিল, বিদেশি নাম, ক্লায়েন্টের স্বাক্ষর, আর কিছু গোপন তথ্যের কপি রয়েছে। মিরার মনে উদ্বেগ দানা বাঁধল। বলল, "এবার আমি কী করব? বাংলাদেশে থাকলে ফরিদ কাকাকে দিয়েই পাঠানো যেত। এখন তো সে উপায়ও নেই।"
ফোনটা হাতে নিয়ে কারানকে কল দিতে গেল মিরা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, কারান তো নিজেই বলেছিল, ফোনটা সাইলেন্টে রাখবে। হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ফোনটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখল।
নিজেকেই প্রশ্ন করল, "এবার কী করব?"
একটু থেমে ভাবল, "আচ্ছা, আমি কি যাব?"
যুক্তি খুঁজে বেড়াতে লাগল নিজের ভেতরে, "উপায়ও তো দেখি নেই, কিন্তু যাওয়াটা কি ঠিক হবে?"
কিছুক্ষণ কপাল ডলে ভাবনার গভীরে ডুবে রইল। তারপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল, "আমিই যাই। নাহলে আজকের এত গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটা নষ্ট হয়ে যাবে।"
এই সিদ্ধান্তেই মন স্থির হলো তার। প্রস্তুতি নিতে ধীরে ধীরে ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে গিয়ে যত্ন করে হ্যাংগার থেকে পোশাকগুলো নামাল। আজই প্রথম কারানের অফিসে যাবে, তাই পোশাকের প্রতিটি বাছাইয়ে সে নিখুঁত হতে চাইল।
পোশাকগুলো বিছানায় ছড়িয়ে রেখে গোসলের প্রস্তুতি নিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে পুনর্জীবিত করতে লাগল। ঠান্ডা জলের স্রোত গায়ে লেগে যেন ক্লান্তি ধুয়ে নিচ্ছিল। স্বচ্ছ ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছিল তার কাঁধ বেয়ে। ফরসা ত্বকের উপর সেই ফোঁটাগুলোর দীপ্তি তাকে করে তুলছিল আরও স্নিগ্ধ, আরও কোমল।
গোসল শেষে বাথরোব পরিধান করে বেরিয়ে এলো মিরা। চুলের ভেজা গোছা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হালকা হাসল। নিজের এত সৌন্দর্য দেখে পুলকিত হয়ে চেহারায় হাত রেখে বলল, "এ মুহূর্তে কারান যদি আমাকে দেখত, নিশ্চিত আরেক দফা দুর্বল হয়ে পড়ত।"
চিন্তাটা মনে হতেই গাল দুটো লালচে আভায় রাঙা হয়ে উঠল। মিরা হেসে কানের পাশে ভেজা চুলগুলো গুঁজে নিল সযত্নে। এরপর একে একে পরিধান করতে লাগল পোশাকগুলো— প্রথমে ঢিলেঢালা সাদা ওয়াইড-লেগ ট্রাউজার, তারপর অফ-হোয়াইট ঢিলেঢালা টপ, তার উপর পড়ল হালকা বেজ রঙের লং ব্লেজার। এই পোশাকের পরিপূর্ণতায় দেহের কোনো রেখা বোঝা গেল না। এরপর মাথায় পরল অফ-হোয়াইট রঙের হিজাব, নিপুণভাবে সেটাকে প্যাঁচিয়ে গলাটা সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলল। উপরে আরেকটি স্কার্ফ ঘুরিয়ে মুখও ঢেকে ফেলল, এখন কেবল চোখ দুটি দৃশ্যমান।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, "সব ঠিক আছে তো? উমম... আর কীভাবে ঢাকা যায় নিজেকে?"
অবশেষে বুঝল, চোখই এখনো অনাবৃত। তাই একটা গাঢ় বাদামি সানগ্লাস পরে নিল। ড্রেসারের পাশে রাখা বাদামি চামড়ার হ্যান্ডব্যাগটা হাতে নিল, এরপর সাদা স্নিকার্স পায়ে গলিয়ে নিল। অতঃপর, টেবিল থেকে ফাইলটা তুলে নিল সযত্নে।
গাড়িতে উঠে ফাইলটা পাশে রেখে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিরা। শহরের সকাল তখন ব্যস্ততার গুঞ্জনে মুখর; গাড়ির জানালা দিয়ে ধূসর সূর্যালোক তার মুখে পড়ছিল। আধঘণ্টার মধ্যে গাড়ি এসে থামল ‘কে.ছি কর্পোরেট হেডকোয়ার্টার্স’-এর সামনে।
গাড়ি থেকে নামতেই সামনে ভেসে উঠল এক বিরাট ভবন। ভবনটির কাচ-ঢাকা দেয়ালটি সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। বিশাল উঁচু গ্লাস টাওয়ার, চারপাশে সোনালি আভাযুক্ত স্টিলের ফ্রেম, আর প্রবেশপথের সামনে সাজানো রয়েছে বিদেশি পামগাছ আর নিখুঁতভাবে ছাঁটা সবুজ লন।
প্রবেশদ্বারের সামনে রয়েছে ঝকঝকে মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। কাচের স্বয়ংক্রিয় দরজার ওপারে দেখা যাচ্ছে ভিতরের ঝলমলে লবি। বিল্ডিংয়ের চারপাশে রয়েছে সুশৃঙ্খল পার্কিং লট, যেখানে সারি সারি লাক্সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ‘কে ছি টেক্সটাইল’ কোম্পানির নামটা বিশাল ধাতব অক্ষরে ভবনের গায়ে খোদাই করা।
দৃশ্যটা এমনই মনোমুগ্ধকর যে মিরার চোখ অজান্তেই ওপরে উঠল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সে মৃদু স্বরে বলল, "এটা দেখার ইচ্ছেও আমার উইশলিস্টে রাখা উচিত ছিল, যেটা না চাইতেই আজ পূরণ হয়ে গেল।"
এরপর মিরা পা বাড়াল প্রধান প্রবেশপথের দিকে। দরজা পেরোতেই ঠান্ডা এয়ার কন্ডিশনের হালকা শীতল বাতাস তার মুখ ছুঁয়ে গেল। ভিতরের ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ারের আলো লবির মেঝেতে প্রতিফলিত হচ্ছে, দেয়ালে ঝুলছে বিমূর্ত চিত্রকর্ম।
রিসেপশন ডেস্কের পেছনে বসে থাকা তরুণী কর্মচারী মিরাকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়াল, মুখে অভ্যর্থনাসূচক হাসি নিয়ে বলল, "Good morning, ma’am. How can I help you?"
মিরা কিছু না বলে কেবল এক ক্ষীণ হাসি দিল। তারপর ব্যাগ থেকে তার নতুন পরিচয় Melek Yılmaz নামের একটি নিখুঁতভাবে তৈরি ফেইক আইডি বের করল। যা কারান আগেই নিখুঁতভাবে যাচাই-যোগ্য সব তথ্যসহ তৈরি করে দিয়েছিল। মেয়েটি আইডিটা হাতে নিয়ে চোখ বড়ো করে তাকাল, মুখের ভাব পালটে গেল মুহূর্তেই।
"এক্সকিউজ মি, ম্যাম... আপনি-আপনি কি...?"
সে বাক্য শেষ করার আগেই চেয়ারে থেকে উঠে দাঁড়াল, প্রায় কুর্নিশের মতো ভঙ্গিতে বলল, "হ্যালো, মিসেস কারান চৌধুরি। আ'ম এক্সট্রিমলি সরি। আমরা জানতামই না আপনি আসছেন। যদি জানতাম, আপনার আগমন উপলক্ষ্যে পুরো ফ্লোর প্রস্তুত রাখতাম। আপনি একটু বসুন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করছি।"
সে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই মিরা হালকা হাসল।
"আরে না, এত আনুষ্ঠানিক হওয়ার কিছু নেই। আপনি দয়া করে আপনার কাজে মনোযোগ দিন। আমি কেবল একটা ফাইল দিতে এসেছি, ব্যাস।"
রমণীটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ফিসফিস করে বলল, "যাক, তিনি রাগ করেননি। নাহলে কে.ছি স্যার জানলে বিপদই হতো।"
তারপর একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "ম্যাম, আপনি দয়া করে বসুন। কিছু ড্রিংকস অর্ডার করব? কফি? গ্রিন টি?"
মিরা মাথা নেড়ে বলল, "ধন্যবাদ, কিছু লাগবে না। আপনি শুধু বলুন—কারানকে কোথায় পাবো?"
সে মাথা নেড়ে টেলিফোন তুলে দ্রুত এক্সটেনশনে কল লাগাল। কণ্ঠে সামান্য নার্ভাসনেস নিয়ে বলল, "মিসেস কারান চৌধুরি এসেছেন।"
মিরা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে দরজার দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল একজন তরুণী এগিয়ে আসছে। এ মেয়েটিকেই মূলত রিসেপশনিস্ট কল করেছিল। তার নাম রিলে উইলসন। সে সাদা শার্টের সঙ্গে কালো শর্ট টপ পরিহিত, গলায় ঝুলছে অফিসের আইডি কার্ড। দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এসে কুর্নিশ করল, ভয় মিশ্রিত স্বরে বলল, "ম্যাম, প্লিজ আসুন।"
মিরা হেসে তার পিছু নিল, অথচ মেয়েটা কিছুই বলার সাহস পাচ্ছিল না। তার এই ভীতসঙ্কুল মুখ দেখে মিরার মনে সামান্য অস্বস্তি হলো। হালকা হাসিতে সে বলল, "আপনি... বাংলা জানেন?"
রিলে এবার সামান্য হেসে বলল, "জি, ম্যাম। আমি স্যারের ট্রান্সলেটর হিসেবে কাজ করি।"
"ওহ, আচ্ছা। গ্ল্যাড টু মিট ইউ," মিরা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল। তবে মনে ছোটোখাটো দ্বিধা কাজ করছিল। মেয়েটির ভয়ের প্রকৃত কারণ সে জানে না; পরিচিত নয়, তাই কেমন ভঙ্গিতে কথা বলবে, তাও বুঝতে পারছিল না।
রিলের চোখে হঠাৎ স্বস্তি দেখা গেল। সে হেসে পিছনে ফিরে বলল, "মিট ইউ টু, ম্যাম। আমি... মানে, বস এত রাগী মানুষ, ভাবিনি আপনি এত স্বচ্ছন্দে কথা বলবেন। তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, যদি কোনো ভুল হয়ে যায়..."
মিরা চওড়া হাসি দিয়ে বলল, "তাহলে ধরতে পারেন আমি আপনার বসের পূর্ণ বিপরীত। একদম ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আমি শুধু ওর এই ফাইলটা দেওয়ার জন্য এসেছি।"
রিলের বুক থেকে যেন পাথর নামল। সে হেসে বলল, "আচ্ছা আচ্ছা। আসুন, ম্যাম।"
পদক্ষেপ নিয়েই সে বলল, "ফাইলটা আমি একজনকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আসলে বস মিটিং চলাকালীন একেবারেই ডিস্টার্ব পছন্দ করেন না। তাই–আপনি নিশ্চয়ই বুঝবেন, ম্যাম..."
মিরা হেসে বলল, "ইট’স ওকে। আপনি আমাকে ব্রেক রুমে নিয়ে যান।"
"জি, ম্যাম।"
এরপর দুজনেই লিফটে উঠল। তবে রিলে একবারও মিরার দিকে তাকায়নি; হয়ত আড় চোখে তাকানোও তার কাছে অসম্মানস্বরূপ মনে হচ্ছিল। লিফটের স্বাভাবিক গুঞ্জনের মধ্যে তারা নীরবভাবে উপরে পৌঁছাল; মিরাকে ব্রেক রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। রিলে ফাইলটি হাতে নিয়ে বলল, "ম্যাম, আপনি এখানে বসুন। আমি এটি দিয়ে আসছি। বসের মিটিং শেষ হলেই আমি আপনার কথা জানিয়ে দিব।"
"ঠিক আছে," মিরা হেসে উত্তর দিল এবং ব্রেক রুমের নরম সোফায় বসে পড়ল। রিলে হেসে চেহারায় সংযম রেখেই প্রস্থান করল। মিরা সামনের টেবিলে রাখা একটি ম্যাগাজিন হাতে তুলে পড়তে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর চারজন মহিলা স্টাফ ব্রেক রুমে প্রবেশ করল। মিরা তাদের দিকে চোখ তুলে না তাকিয়ে কেবল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠায় মনোনিবেশ করল। তবে তার পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ যাচ্ছিল না, জুলির চোখে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝলকাচ্ছে। জুলি অবশ্যই অতি সুন্দরী, নিখুঁত রূপের অধিকারী; কিন্তু তার চোখে রক্তিম বেগুনি রঙের মতো ক্রোধ ও হিংসার অশনি সংকেত বিদ্যমান। পাশের এরিনা হালকা কণ্ঠে বলল, "I’ve heard that K.C. Sir’s wife come to the office."
জুলি কিছু না বলে শুধু দাঁতে দাঁত পিষতে থাকল।
এদিকে এই বাক্য মিরার কানে পৌঁছাতেই তার মস্তিষ্কে সজাগ হলো, যদিও বাইরে সে প্রকাশ্যে চুপচাপ বই পড়ার ভান করছিল।
আরেকটি মেয়ে লিউ বলে উঠল, "আবার বলো না, নইলে রাগে শরীরই পুড়ে যাবে। আমি তো জানতামই না যে কারান চৌধুরি ম্যারিড।"
জুলি তীব্র কণ্ঠে হেসে বলল, "Married, so what! Don’t you know that I dangerously love him? I just want to see that girl once, to understand how she managed to entangle the boss in marriage."
এদিকে এঞ্জেলিনা আয়নার সামনে গিয়ে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক ছড়িয়ে বলল, "বসের ওয়াইফ অবশ্যই অনেক বেশিই হট হবে। বাট আজকে আমি তাকে সিডিউস করে দেখাব—আমার সে'ক্সি-নৈসর্গিক মোহ তার বউকেও ছাড়িয়ে যাবে।"
মিরা সোফায় বসে থেকে শুধু ফুসফুস ভরে নিশ্বাস ছাড়ছিল। হাতে ধরা মার্কারটা এত শক্তভাবে ধরেছিল যে মনে হচ্ছিল, সেটি যে কোনও মুহূর্তে তাদের গলার দিকে ধেয়ে যাবে। তার চোখ ইতোমধ্যেই রক্তাভ হয়ে উঠেছে; কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। নিজের সঙ্গে নিজের মনেই বারবার বলল, "আল্লাহ, এই রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো। মনে হচ্ছে আজ চারটা লাশ পড়বে। হে আল্লাহ! সামলাও নিজেকে, মিরা..."
একটু পর মিরা দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, "আমার স্বামীর দিকে চোখ দেওয়ার সাহস করলে? একবার যদি আমি আমার আসল রূপে সামনে দাঁড়াই, তোমাদের র'ক্তে পুরো অফিস ভিজে যাবে।"
ওদিকে জুলি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, "সি'ডিউস করবে মানে? ওহ হ্যাঁ, এই অফিসের মেয়েদের তো কাজ ছাড়া আর একমাত্র কাজ—কে.ছি কে সিডি'উস করা। লাভ নেই, সে আমার দিকে ছাড়া আর কারো দিকে তাকাবে না।"
এ কথা কর্ণগোচর করে তিনজনেই খিলখিল করে হেসে উঠল। এরিনা মুখ উঁচিয়ে বলে, "ওহ, রিয়েলি? বস কবে কারো দিকে তাকিয়েছে?"
লিউ হেসে ব্যঙ্গভরে বলল, "তুমি তার সামনে নে'ই'কিড হয়ে দাঁড়াও, দেখি সে তাকায় কিনা!"
জুলি এবার ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল, "যদি এতটাই বোঝো, তাহলে এত আয়োজনই কেন করা হচ্ছে তার জন্য?"
অন্যদিকে মিরা রাগের আগুনে ভস্মীভূত হয়ে আর সহ্য করতে না পেরে হুট করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। স্কার্ফের নীচে তার ঠান্ডা মুখমণ্ডল দেখলে চারজন মেয়েই হয়ত ভয়েই কাবু হয়ে যেত। তার রাগ এতটাই প্রবল হয়েছে যে, থরথর করে কাঁপছিল সে। মিরা শীতল স্বরে হুংকার দিয়ে বলল, "হ্যালো, আ'ম মিসেস কারান চৌধুরি।"
এই শব্দগুলো চারজনের কানে যেন বজ্রপাত হয়ে ধরা দিল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চারজনই প্রায় পড়ে যেত, কিন্তু নিজেদের অহংবোধ তাদের সামলে রাখল।
মিরা চোখের সানগ্লাস খুলে ফেলল। এবার তার রক্তিম চোখ সবাইকে স্তম্ভিত করে দিল। লিউ বিড়বিড় করে বলল, "তার মানে এতক্ষণ ম্যামের সামনেই বসের নামে... ওহ, ফা'কিং শি*ট!"
জুলি ছাড়া বাকিরা একযোগে কুর্নিশ করে বলল, "হাই, ম্যাম। সরি, ম্যাম। উই আর এক্সট্রিমলি সরি। স-সরি এগেইন, ম্যাম।"
মাথা উঁচু করে হাত জোড় করে আকুতি করল, "প্লিজ, ম্যাম, আমাদের জব থেকে ফায়ার করবেন না।"
মিরা তাদের ভয়ে কাবু হওয়া মুখের দিকে তাকাল না। বরং জুলির দিকে সরু চোখে তাকিয়ে দুই হাত বুকে বেঁধে কঠিন কণ্ঠে বলল, "Excuse me, do you want me to show you my power?"
জুলি ঠোঁট বেঁকিয়ে আড় হেসে বলল, "Expensive clothes can’t buy the aura of Mrs. KC. The real wife of the boss doesn’t need to prove who she is."
মিরা ব্যঙ্গাত্মক হেসে কিছুক্ষণ জুলির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। রাগে ভিতরে ভিতরে মনে হচ্ছে সে তাদেরকে কয়েকবার মে'রেও ফেলেছে। তারপর হাত পিছনে নিয়ে মুখের স্কার্ফ খুলে ফেলল। মিরার সৌন্দর্য এত গভীর ছিল যে, চারজন মেয়ের চোখ মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল। যেন স্বর্গ থেকে কোনো পরি নেমেছে। এরিনা এক ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, "ও এম জিইই!"
আর কোনো শব্দ বের হওয়া সম্ভব হল না। এক মুহূর্তে এরিনা হেলে পড়ে গেল নিচে। বাকিরাও স্তব্ধ থেকে হঠাৎ হুঁশে ফিরে এসে মেঝেতে ঢলে পড়ল। মিরা একেবারে স্থবির হয়ে রইল। চোখ বড়ো করে বলল, "আরে, হলো কি সবার? এই, হ্যালো?"
অকস্মাৎ মিরা সামনের আয়নায় নিজের প্রতিফলন লক্ষ্য করল। যা দেখে তার ঠোঁটের কোনে অল্পতম হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে রইল, চোখের অন্তরালে নিজের সৌন্দর্যকে মাপকাঠিতে তুলল। আর এই মেয়েদের অচেতন হওয়া আরও স্পষ্ট করে দেখিয়েছে সে কতটা চিত্তাকর্ষক! কারান চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে তার সৌন্দর্য সত্যিই অপ্রতিরোধ্য।
একটু সময় পর মাথার স্কার্ফটা পুনরায় বাঁধল, চোখে সানগ্লাস পরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ল। কয়েক মিনিট ধরে ঘুরে, অবশেষে এক কক্ষের বাইরে থেমে দাঁড়াল। ভিতরে কারান গম্ভীর কণ্ঠে প্রোজেক্টরে ডিজাইন ব্যাখ্যা করছে। মিরা হালকা মুচকি হাসি দিয়ে দরজাটা আস্তে খুলল।
দেখল কারান গম্ভীর মুখে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে। হঠাৎই কারানের নজর দরজার দিকে পড়ল। মিরার সমস্ত চেহারা ঢেকে থাকলেও চোখ দেখেই তার পরিচয় চিনতে তার কোনো অসুবিধা হল না। ভ্রূ কুঁচকে সে বলল, "কুইন ভিক্টোরিয়া!"
মিটিংরুমের সকলের মুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট হলো। কেউ কেউ একে অপরের দিকে তাকাল। কারানের ম্যানেজার প্রশ্ন করল, "স্যার, রানি ভিক্টোরিয়া কোথায়? আর এখানে তিনি কীভাবে আসবে?"
এদিকে মিরা মুচকি হেসে দরজা বন্ধ করে সেখান থেকে সরে গেল। কারান অবাক চোখে বলল, "কুইন ভিক্টোরিয়া আমার বউ।"
সবার চিত্তে ধাক্কা খেল। একসাথে বলল, "এ্যা!"
ম্যানেজার স্টিফেন বিস্মিত হয়ে বলল, "কিন্তু সে তো বহুদিন আগেই মারা গেছেন!"
কারান আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না; দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে মিরাকে খুঁজতে শুরু করল। রিলে তাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, "স্যার, মিসেস চৌধুরি—মানে মেলেক ইলমাজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন।"
কারান ঠোঁটের কোনে হালকা হাসল। রিলে অবাক হয়ে তাকাল, কারণ কারানের মুখে হাসি দেখা খুবই বিরল।
"সে কোথায় এখন?" কারান জিজ্ঞেস করল।
রিলে চোখ নামিয়ে বলল, "ব্রেক রুমে অথবা আপনার কেবিনে।"
কারান ধীরে ধীরে স্যুট সমন্বয় করে সেই দিকে অগ্রসর হলো। ব্রেক রুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে অনুপ্রবেশের পর মুহূর্তেই সেখান থেকে বেরিয়ে নিজ কেবিনে প্রত্যাবর্তন করল।
কেবিনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কারানের কপালে আবারও ভাঁজ পড়ল, কারণ তার চেয়ারে বসে আছে মিসেস মিরা চৌধুরি। পেছনের দিকে মাথা হেলিয়ে সে এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে রেখেছে। মনে হচ্ছে, পুরো কক্ষ তার রাজ্য, আর সে তার অনন্ত সাম্রাজ্যের অমর রানি। মিরার এই অহংকারী, রাজসিংহাসনসমান ভাব দেখে কারান সামান্য বিস্ময়াভিভূত হয়ে ভ্রূ উঁচু করল। কারান পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে গম্ভীর, গভীর স্বরে উচ্চারণ করল, "হ্যালো।"
মিরা চেয়ার ঘুরিয়ে অভিব্যক্তি অপরিবর্তিত রেখেই বলল, "ইয়েস, কাম ইন।"
কারান হালকা বাঁকাহাসি দিয়ে বলল, "বেচারি মেয়েগুলোকে সেন্সলেস না করলে চলত না, সুইটহার্ট?"
মিরা কারানের মতো করেই ঠোঁটের কোন চুলকাতে চুলকাতে বাঁকা হেসে বলল, "দ্যাথস নট মাই ফল্ট, হানি। কারান চৌধুরীর বউয়ের এলইডি লাইট একটু বেশিই চকমকে কিনা!"
"চলো, এবার তোমাকে কারানের এলইডি আলো দেখাই!"
মিরা কপাল কুঁচকে বলল, "কোন এলইডি?"
এক ভ্রূ উঁচু করে কারান বলল, "যার আলোতে একমাত্র মিসেস মিরাই আলোকিত হয়েছে। নো প্রবলেম, স্টারলিং—পাঁচ বছরের আগে ওই আলো দিয়ে গর্ভ আলোকিত করব না।"
মিরা হঠাৎ বুঝল কারান আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে। তার চোখ বড়ো হয়ে গেল। দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে কারানের মুখ হাত দিয়ে চেপে রেখে কটমট কণ্ঠে বলল, "আমরা কোথায় আছি, মনে নেই নাকি?"
কারান কিছুক্ষণ স্থির, নেশালাগা চোখে তাকিয়ে রইল মিরার দিকে। মিরা তার সেই দৃষ্টি বুঝে সেও তাকিয়ে রইল একইভাবে। হঠাৎই কারানের মুখের ভাব পালটে গেল। মৃদু কোমলতা ছিঁড়ে গিয়ে জায়গা নিল কঠিন গাম্ভীর্য। মিরার হাত ওষ্ঠাধর থেকে সরিয়ে নিল। তার চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, কঠিন গলায় বলল, "এভাবে কেন বেরিয়েছ?"
মিরা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর হালকা কাশি দিয়ে ভরকে যাওয়া গলায় বলল, "কেন? আমার কি শরীর বোঝা যায়?"
"না, কিন্তু আজ তোমাকে অস্বাভাবিকভাবে সুন্দর লাগছে। চেহারা না দেখেও কেউ এভাবেও তোমার প্রেমে পড়তেই পারে।"
মিরা ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি এনে বলল, "সে তো বোরকা পড়লেও হতে পারে।"
"হ্যাঁ, হতেই পারে, তাই তুমি বেরোবে না। কেন বেরিয়েছ?"
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা গেল। মিরা কাঁপা গলায় বলল, "তো-তোমার ফাইলটা রেখে এসেছিলে, ওটাই দিতে এসেছিলাম।"
"থাপ্পড় চেনো?"
মিরার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না। পরক্ষণেই কারান তার বাহু ধরে টেনে নিল নিজের কাছে।
"কে বলেছিল এতটা বেয়াদবি করতে?"
মিরার চোখে আগুন জ্বলতে শুরু করল। এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে কটমট করে বলল, "কেন? আমি আসাতে কি তোমার খুব ক্ষতি হয়েছে?"
কারান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মিরার হঠাৎ কঠিন হওয়ার কারণ অনুধাবন করতে পারল না। কিন্তু মিরারও রাগ থামল না। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল, শ্বাস দ্রুত হয়ে এল।
দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "অফিসের মেয়েগুলো যেভাবে তোমার দিকে তাকায়... ওদের গলা কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার!"
কারান ঠোঁটে বক্র হাসি টেনে দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আর ইউ জেলাস, মিসেস চৌধুরি?"
মিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আবার জিগায়!"
কারান মাথা সামান্য কাত করে হাসল।
"আচ্ছা, ওদের ফায়ার করে দিব।"
মিরা এবার ঘুরে কঠিন চোখে তাকাল। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, "শুধু ফায়ার?"
কারান হালকা নিশ্বাস ফেলে চুলে ব্যাকব্রাশ চালাতে লাগল। তারপর শান্ত কণ্ঠে হঠাৎ বলল, "ঠিকাছে, তোমার স্যাটিসফিকশনের জন্য ওদেরকে মে'রে ফেলব।"
মিরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
"কি? কী বললে?"
কারান আগের মতোই অদ্ভুতভাবে শান্ত স্বরে প্রতিক্রিয়া জানাল, "যা শুনলে।"
"তুমি কি মজা করছ?"
"না।"
মিরা রাগে তার গায়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল, "সরো তো।"
কারান মৃদু হাসি নিয়ে মিরার কোমর ধরে টান দিল। মিরার শরীর স্বাভাবিকভাবে তার সাথে মিলিত হয়ে গেল। নেশায় ভরা কণ্ঠে কারান ফিসফিস করল, "উঁহুঁ, আমি অন্য মুডে চলে এসেছি, বেইবি।"
মিরা কথার প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই কারান তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করল, "আমি টায়ার্ড হতে চাই, মিরা।"
মিরার চোখ মুহূর্তেই বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল কারানের সম্মোহনী এবং অনিবার্য চেহারার দিকে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারানের ম্যানেজার স্টিফেনের কণ্ঠ ভেসে এলো, "স্যার, আসবো?"
কারান দরজার দিকে না তাকিয়ে বলল, "নো। আগামী দেড় ঘণ্টায় এই রুমের আশেপাশেও যেন কেউ না আসে।"
"কিন্তু স্যার, মিটিং?"
"ক্যানসেল।"
তারপর ধীরে ধীরে কারান দরজায় হাত রেখে তা আস্তে করে বন্ধ করল। ধীরগতিতে মিরার দিকে এগোতে থাকল। মিরার একদম কাছে এসে সে হালকা ঝুঁকে বলল, "রিল্যাক্স, মাই লাভ... দ্য রুম ইজ কমপ্লিটলি সাউন্ডপ্রুফ।"
কারানের মনোভাব বুঝতে পেরে মিরা হঠাৎ হুঁশে ফিরল। তার রোমান্টিক চাহনি যেন হিমায়িত করে দিয়েছে। ভয়ে সে আস্তে আস্তে পেছনে সরে যেতে লাগল। কেঁপে কেঁপে বলল, "কারান, অফিসে আমরা..."
কারানও একইভাবে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে বলল, "ম্যাটার করে না।"
মিরার শ্বাসপ্রশ্বাস আগের চেয়ে দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠল।
"রাগ হচ্ছে কিন্তু আমার।"
"হোক রাগ!"
"আমি কিন্তু তোমার নামে অফিসে কমপ্লেইন করব।"
কারান ভ্রূ উঁচিয়ে বাঁকা হেসে বলল, "কার কাছে?"
"অফিসের সিইও—"
কারান চুপচাপ ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। মিরা চোখ বন্ধ করে নিজেকে কল্পনায় অসংখ্য গালি দিতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতা পর চোখ খুলে বলল, "ধুর, কাছে এলে আজ খু'ন করে ফেলব।"
কারান নেশালো চোখে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, "কাম অন বেইব, খুন করে ফেলো।"
"তুমি কি কখনো ভালো হবে না?"
"অফিস থেকে বের হলেই ভালো হয়ে যাবো।"
মিরা হালকা করে কারানের কাঁধ ছুঁয়ে বলল, "কিন্তু তোমার হাতে তো ব্যথা, কারান।"
"সেটারই তো মেডিসিন নেব এখন।"
আর এক পা মিরা পিছনে সরতেই হুট করেই ডেক্সের পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। কারান ঝুঁকে চেয়ারটি নিজের দিকে টেনে আনল। এরপর চুপচাপ মিরার মুখের স্কার্ফটি খুলে ফেলল, চোখের চশমা ডেক্সের ওপর রাখল। তারপর আরও কাছাকাছি ঝুঁকে এলো। দুজনেরই নিশ্বাস একে অপরের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মিরা শুধু স্তব্ধ চোখে কারানের দিকে তাকিয়ে রইল।
কারান হালকা স্পর্শে মিরার পায়ের মাঝখানটা হাত দিয়ে সরিয়ে জায়গা করে নিয়ে, সেখানে দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, "চেয়ার অর কাউচ? কোনটা প্রেফার করবে?"
মিরা লজ্জায় লাল হয়ে নীচে চোখ নামিয়ে ভারী নিশ্বাস ফেলতে থাকল। তার উত্তর না পেয়ে, কারান হঠাৎ তার কোমর ধরে কোলে তুলে নিল। মিরা মুখ লুকিয়ে কারানের বুকের কাছে নিজেকে সঁপে দিল।
কারান নেশালো গলায় মৃদু সুরে গাইতে লাগল,
"আ তুজহে ইন বাহোঁ মে ভার কে,
অর ভি কার লু মে কারীব...
তু জুদা হো, তো লাগে হে...
আতা যাতা হার পাল আজীব।
ইস জাহা মে হে অর না হোগা,
মুজসা কোই ভি খুশ নাসিব...
তুনে মুজকো দিল দিয়া হে,
মে হু তেরে সাবছে কারীব।"
🍁চলবে?🍁
বি.দ্র. শেষের রোমান্টিক অংশটুকু আমি আগামীকাল প্রাইভেট গ্রুপে পোস্ট করব; অবশ্য পেইজে লিংক পোস্ট করে দিব।
আজকের পর্বের ঘটনাবলি আমেরিকা ভিত্তিক, তাই উচিত ছিল প্রায় সবগুলো সংলাপ ইংরেজিতে দেওয়া। কিন্তু এতে অনেকেই বুঝতে পারবেন না, তাই বাধ্য হয়ে বাংলায় দিতে হলো।