ফন্ট সাইজ:
থিম:
Tell me who i am(২য় খণ্ড)

২২তম পর্ব

লেখক: আয়সা ইসলাম মনি

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_১৭_প্রথমাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

_________________________________________☞

"এসবই আমাদের প্ল্যান ‘এ’," আগের রাতে কথাটা শেষ করেই কারান টেবিলের ওপর থেকে একটা গ্রাফাইট পেনসিল তুলে নিল। তর্জনী আর মধ্যমার সংযোগস্থলে সেটা রেখে ঘোরাতে শুরু করল। পেনসিলটা তার আঙুলের খাঁজে ক্ষণিক বিরতি নিচ্ছে, পরক্ষণেই বুড়ো আঙুলের ওপর দিয়ে এক পাক্ষিক আবর্তন সম্পন্ন করে আবার আদি অবস্থানে ফিরে আসছে।

আয়লা মন্ত্রমুগ্ধের মতো কারানের দীর্ঘ আঙুলের সেই ছন্দ লক্ষ্য করতে করতে প্রশ্ন করল, "আর প্ল্যান ‘বি’?"

"তোমার বাম চোখে একটা হাই-রেজ্যুলেশন মাইক্রো-ক্যামেরা লেন্স প্রতিস্থাপন করা থাকবে। পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে তুমি ধরা পড়ে যাচ্ছ, তখন সেটার লাইভ ফিড ব্যবহার করে আমরা ওদের লোকেশন ডিটেক্ট করব।"

আয়লা ভ্রূ কুঁচকে সোফাতে সোজা হয়ে বসল। বেশ তাচ্ছিল্য করেই আওড়ালো, "ওয়েট, ওয়েট, ওয়েট! তুমি বলছো আয়লা দেমির ধরা খাবে? হাহ্? সিরিয়াসলি, কারান?"

ফারহান কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে আড়চোখে দুজনের দিকে তাকালো। সে জানে কারানের পরিকল্পনাগুলো কোনো সাধারণ ছকে বাধা থাকে না, তাই সে নীরব থেকে তথ্যগুলো মস্তিষ্কে ধারণ করতে থাকল।

"হ্যাঁ, তুমিই ধরা খাবে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তো ভালো, কিন্তু যদি কোনোভাবে ওরা তোমাকে সন্দেহ করে, তবে পালানোর বৃথা চেষ্টা করে শক্তিক্ষয় করো না। বরং সারেন্ডার করো। কারণ তোমার এই বন্দিদশা আদতে আমাদের জন্য বড়োসড়ো অ্যাডভান্টেজই হবে। ওরা তোমাকে সরাসরি ওদের সেই গোপন ট্রানজিট পয়েন্টে নিয়ে যাবে, যেখানে ভিকটিমদের পা'চার করার আগে রাখা হয়। অর্থাৎ তুমি মুক্ত থাকলেও লাভ, বন্দি থাকলেও লাভ।"

ফারহান মৃদু হেসে কিবোর্ডে একটা টোকা দিয়ে বলল, "তার মানে আয়লা হচ্ছে আমাদের ট্রোজান হর্স!"

ফারহানের উপমায় কারান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে দিল, "এক্সাক্টলি!"

কারানের এই প্রখর বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা আয়লাকে সবসময়ই বিস্মিত করে। "গ্রেট! তার মানে আমি নিজের ইচ্ছায় ওদের খাঁচায় ঢুকবো। আচ্ছা... আর যদি তোমরা ধরা খাও? মানে অপারেশন যদি মাঝপথেই লিক হয়ে যায়?"

আয়লার সংশয় কারানের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোতে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করল। সে কপালে তর্জনী ঠেকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "ভেরি ভ্যালিড পয়েন্ট। এবার তো আমি নিজেই ইব্রাহিমের কাছে এই ইনফরমেশন লিক করব। আমাদের আল্টিমেট টার্গেট ওদের পুরো সিন্ডিকেট ধ্বংস করা। তাই আমাদের ধরা পড়াটাও হবে একটা সুপরিকল্পিত টোপ। ওদের সাঙ্গপাঙ্গসহ একেবারে শেষ করার জন্য মূল নেটওয়ার্কের ভেতরে ঢোকার এটাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।"

ফারহান তার নীল চোখের ওপর মোটা ফ্রেমের চশমাটা উপরে ঠেলে দিল। তাকে এই মুহূর্তে একজন প্রখর মেধার সফ্‌টওয়্যার আর্কিটেক্টের মতো দেখাচ্ছে। নিজের এক হাতের আঙুলের খাঁজে অন্য হাতের আঙুলগুলো আবদ্ধ করে সে বলল, "আয়লা, কারান আসলে একটা ডাবল ব্ল্যাফ খেলছে। ইব্রাহিম মনে করবে ও আমাদের ট্র্যাপ করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো ও নিজেই আমাদের ওর সবচেয়ে সুরক্ষিত গোপনীয়তার কাছে টেনে নিয়ে যাবে, যেটা আমাদের মূল উদ্দেশ্য। রিস্ক ফ্যাক্টর এখানে ১০০%, কিন্তু সাকসেস রেটও জিওমেট্রিক প্রগ্রেশনে বাড়বে।"

আয়লা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে কারানের সংকল্পিত চোখের গভীরে তাকালো। তারপর ম্লান হাসি দিয়ে নিচু স্বরে বলল, "তোমার এই মাস্টারমাইন্ড প্ল্যানে আমি যদি মা'রাও যাই, তুমি নিশ্চয়ই তার পরের চালটাও ভেবে রেখেছ, তাই তো কারান?"

কথাটা শুনে কারান টেবিলের ওপর সজোরে একটা চাপড় দিয়ে আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়িয়ে আয়লার দিকে ঝুঁকল। কারানের এই আচমকা সান্নিধ্য আয়লার হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিল। সে মনে মনে আওড়ালো, ​"এতটা সন্নিকটে এসো না, কারান। কারান চৌধুরি নামক এই সত্তাটি শুধুই আইদাহ আহসান মিরার, এই সত্যটুকু থেকে আমাকে বিচ্যুত করে আমার নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করো না। কেন তুমি এতটা... এতটা অসহ্য রকমের সুদর্শন? এই মুহূর্তে তো মনে হচ্ছে, তোমার নিখুঁত পরিকল্পনার স্বার্থে যদি আমার প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তবে সেই মৃ'ত্যুতেও আমি পরম প্রশান্তি খুঁজে পাব। তবে... সেই অন্তিম বিদায়টা যদি তোমার বলিষ্ঠ বাহুডোরে হয়, সেটাই হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।"

কারান আয়লার আরও সন্নিকটে এলো। তার উত্তপ্ত নিশ্বাসের স্পর্শ আয়লার ললাট ছুঁয়ে যাচ্ছে। কারান গম্ভীর ও কঠোর স্বরে ঘোষণা করল, "কারান চৌধুরি জীবিত থাকতে ইব্রাহিম বা জেহেরের মতো কোনো স্কাউনড্রেল তোমার লোমও স্পর্শ করতে পারবে না, আয়লা দেমির। দ্যাট’স মাই প্রমিজ।"

কারানের এই দৃঢ় আশ্বাসে আয়লা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বক্র হাসি ফুটে উঠল।

________

জুটমিলে প্রবেশের ঠিক পনেরো মিনিট পূর্বে ফারহানের সাথে কারানের কানেকশন বিচ্ছিন্ন হলো। পরক্ষণেই কারানের ব্লুটুথ ইন্টারকমে উচ্চকিত স্বরে বেজে উঠল এমেকার কল। কারান তার ডুকাটি মোটরবাইকের থ্রোটল মোচড় দিয়ে গতিবেগ ১৮০ কিলোমিটারের কোঠায় নিয়ে গেল। সে হেলমেটের অভ্যন্তরে থাকা সুইচটি চেপে সংযোগটি গ্রহণ করল। তৎক্ষণাৎ ওপার থেকে মরুভূমির তপ্ত বাতাসের ঝাপটা শোনা গেল। এমেকা তার ইয়ামাহা আর-ওয়ান স্পোর্টস বাইকে চড়ে দিগন্তবিস্তৃত হাইওয়ে দিয়ে কৌণিক গতিতে ধাবমান; তার রিয়ার-ভিউ মিররে পিছনের কালো এসইউভিগুলোর হেডলাইটের আলোকচ্ছটা বারবার প্রতিফলিত হয়ে তার দৃষ্টিবিভ্রম ঘটাচ্ছে।

এমেকা তার মাতৃভাষা নাইজেরিয়ান পিজিন ইংলিশে বলল, "কারান, ব্যাড বয়েজ দেই মাই টেইল! আই ফিট সি ডেম ফর মাই মিরর। ওয়েটিন আই গো ডু নাউ? মেক আই গো ল্যাব অর মেক আই জাস্ট কিল ডেম অল?" (কারান, কিছু লোক আমার পিছু নিয়েছে! আমি ওদের আয়নায় দেখতে পাচ্ছি। এখন কী করব? আমি কি ল্যাবে যাব নাকি ওদের সবকটাকে এখনই খ'তম করে দেব?)

কারানের ওষ্ঠাধারে ধূর্ত হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো। ইব্রাহিমের এক ছদ্মবেশী অংশীদারের মাধ্যমে সে যে তথ্যটি কৌশলে লিক করেছিল, তা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করেছে। কারান গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল, "নো এমেকা। ও মা লো সি ল্যাব। (ল্যাবে যেও না।) আর এখনই ওদের শেষ করার প্রয়োজন নেই।"

"হোয়াট? বাট হোয়াই?"

"মো ফে কি ওন মু ও, সুগবন জা দিয়ে কি ও মা বা ফুরা।" (আমি চাই ওরা তোমাকে বন্দি করুক, কিন্তু কিছুটা প্রতিরোধ করো যাতে ওরা বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে।)

কারান কৌশলগতভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে শুরু করল, "ওরা যেন না বুঝে আমরা স্বেচ্ছায় এই ম'রণফাঁদে পা দিচ্ছি। ওরা তোমাকে সরাসরি আজমান বর্ডারের পরিত্যক্ত জুট মিলে নিয়ে যাবে, যা আদতে এই অন্ধকার সিন্ডিকেটের অঙ্গ পা'চারের প্রধান ইনভেন্টরি এবং কালো টাকার মূল ভল্ট।"

"ওকে, আই হিয়ার ইউ। বাট ওয়েটিন ইফ জেহের লাই টু আয়লা? ইফ দ্যাট প্লেস নো বি দ্য রিয়েল হাইড-আউট?" (ঠিক আছে, বুঝতে পেরেছি। কিন্তু জেহের যদি আয়লার কাছে মিথ্যা বলে থাকে? যদি ওটা আসল আস্তানা না হয়?)

কারান তার হেলমেটের স্বচ্ছ ভাইজারটি সশব্দে নামিয়ে নিল। "কো লে শেলে।" (এটা অসম্ভব।)

সে পুনরায় যোগ করল, "জেহেরের মতো কা'মাতুর জা'নো'য়ার আয়লার সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশনের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য। তাছাড়া আমি যে ১০টি ব্রিফকেস ইব্রাহিমের প্রাসাদে রেখে এসেছি, সেগুলোর অভ্যন্তরে ফারহানের সেট করা ন্যানো-ট্র্যাকারগুলো অলরেডি আজমান বর্ডারের ওই নির্দিষ্ট জিও-কোঅর্ডিনেটসেই ব্লিংক করছে। জেহেরের স্বীকারোক্তি আর আমার মানি-ট্র্যাকারের রিয়েল-টাইম ডেটা এখন সমান্তরাল। সুতরাং লোকেশন নিয়ে কোনো ডাউট নেই।" সামান্য বিরতি নিয়ে কারান সতর্কবার্তার সুরে বলল, "তবে আন্তর্জাতিক নারী পা'চারের ওই রুট ম্যাপটা এখনও একটা রহস্য। ওই এয়ার-গ্যাপড হার্ড ড্রাইভটা উদ্ধার না করা পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না যে মেয়েগুলোকে ওরা পরবর্তী কোন গন্তব্যে শিফট করার পরিকল্পনা করছে। এমেকা, বি কেয়ারফুল।"

এমেকা নিমিষেই বাইকের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে হাইওয়ে ছেড়ে ধূলিধূসরিত এক দুর্গম মেঠো পথে প্রবেশ করল। পেছনের সেই ঘাতক এসইউভিগুলো ধুলার আস্তরণ উড়িয়ে তার অনুসরণ অব্যাহত রাখল। এমেকা অকুতোভয় কণ্ঠে জানাল, "আই রেডি ফর ডেম। আই গো বি ইয়োর আইজ ইনসাইড দ্যাট হেল। মো শেতান!" (আমি প্রস্তুত। ওই নরকের অভ্যন্তরে আমিই হবো তোমার চক্ষু। আমি তৈরি!)

°

°

ঘন অন্ধকারের চাদরে আবৃত পরিত্যক্ত জুট মিলের সীমানা থেকে, ঠিক পঞ্চাশ গজ দূরে কারান তার বাইকটির ইঞ্জিন বন্ধ করল। ফারহান তার ল্যাপটপে থার্মাল ইমেজিং এবং লিডার স্ক্যানার সক্রিয় করতেই পুরো চত্বরজুড়ে মাকড়সার জালের মতো লাল বর্ণের লেজার রশ্মিগুলো ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে উঠল। ​"কারান, সাবধান! এগুলো অত্যন্ত সেনসিটিভ ইনভিজিবল ট্রিপ-ওয়্যার লেজার। বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটলেই সাইলেন্ট অ্যালার্ম বেজে উঠবে, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তোকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হবে।"

​কারান ব্যাকপ্যাক থেকে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির সিলিন্ডার বের করল। ওষ্ঠাধারে বক্র হাসি ফুটিয়ে সে আওড়ালো, "কারান চৌধুরি জানে কোন লুফহোল দিয়ে কীভাবে ঢুকতে হয়। চিল ব্রো, জাস্ট ওয়াচ মি।"

​সে সিলিন্ডার থেকে বিশেষ ধরনের রিফ্র্যাক্টিভ এরোসল স্প্রে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দিল। সূক্ষ্ম কণাগুলো বাতাসে স্থিতিশীল হতেই অদৃশ্য র'ক্তিম রশ্মিগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠল। কারান তার সুগঠিত শরীরকে বাঁকিয়ে, কখনও কশেরুকাকে ধনুকের ন্যায় নুইয়ে, কখনও হামাগুড়ি দিয়ে, আবার কখনও বা ভূ-পৃষ্ঠ ঘেঁষে বিদ্যুদ্বেগে স্লাইড করে লেজারগুলো অতিক্রম করল। ফারহানও তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ বলয়ে প্রবেশ করল।

​প্রাচীর টপকে জুট মিলের ভেতরে ঢুকতেই দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র প্রহরী তাদের দিকে এগিয়ে এলো। কারান কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করল না, কারণ বুলেটের শব্দ পুরো বাহিনীকে সজাগ করে দিতে পারে। প্রথম প্রহরীটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কারান তার কবজি আঁকড়ে ধরে এক ঝটকায় তাকে শুইয়ে দিল, এবং তার গ্রীবাদেশের ভ্যাগাস নার্ভ পয়েন্টে এক তীক্ষ্ণ আঘাতে তাকে অজ্ঞান করে দিল।

দ্বিতীয় প্রহরীটি বিপদবার্তা প্রেরণের উপক্রম করতেই, কারান লাফ দিয়ে তার শক্তিশালী পায়ের প্যাঁচে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে নিস্তেজ করে ফেলল।

"আজ কুঠারটা থাকলে এদের মতো কুমরোপোকাদের মা'রতে দু-সেকেন্ড লাগত না, আর এত এনার্জিও নষ্ট হত না। ব্যাপার না, মাঝে মাঝে বডির জয়েন্টগুলো সচল করা দরকার।" এই বলে কারান গ্রীবাদেশ একবার বামে ও একবার ডানে হেলিয়ে হাড়ের মটকা ভেঙে নিল।

​ইতোমধ্যে অন্ধকারের অন্তরাল থেকে আরও তিনজন প্রহরী তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ফারহান এবার তার হাতে থাকা কাস্টমাইজড ইলেক্ট্রোকিউটর গ্লাভ্‌স ব্যবহার করল। এক প্রহরী তার ওপর চড়াও হতেই ফারহান তার কবজি চেপে ধরে কয়েক হাজার ভোল্টের উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তাকে তাৎক্ষণিক পঙ্গু করে দিল। বাকি দুজন কারানের দিকে তেড়ে এলে সে ‘ক্র্যাভ মাগা’ পদ্ধতিতে একজনের চিবুকে প্রচণ্ড ঊর্ধ্বমুখী আঘাত করল, এবং অপরজনের হাঁটুর সন্ধিস্থলে পদাঘাত করে তার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দিল।

​কারান মৃদু স্বরে বলল, "পেরিমিটার ক্লিয়ার। ফারহান, এবার মেইন গেটের ইলেকট্রনিক লকিং সিস্টেমটা বাইপাস কর।"

​ফারহান তার পোর্টেবল হ্যাকিং ডেক থেকে কিবোর্ড দ্রুতলয়ে পিটিয়ে উত্তর দিল, "ডান!"

কারান তার মুষ্টিবদ্ধ হাত ফারহানের হাতের তালুতে আঘাত করল। এরপর অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে তারা দুজনে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গুদামের গোলকধাঁধায় প্রবেশ করল।

________

বর্তমানে জেহেরের পিস্তলের নলের সামনে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে কারান বলল, "দাবার বোর্ডে যখন কোনো গুটি খুব সহজে হস্তগত করা যায়, তখন বুঝতে হয় প্রতিপক্ষ অত্যন্ত সচেতনভাবে টোপটি তোমার সামনে ছুঁড়েছে। কারণ তার প্রকৃত লক্ষ্য তোমার মন্ত্রীকে চেকমেট করা।"

কারানের কণ্ঠস্বরের এই অতিপ্রাকৃত নির্লিপ্ততা দেখে জেহেরের স্নায়বিক চাপ বৃদ্ধি পেল। তার পেশিবহুল অবয়বে অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রেখে ব্যারেলটি কারানের কপালে সজোরে চেপে ধরল, এবং কর্কশ স্বরে শাঁসিয়ে উঠল, "গেম খেলতে চাচ্ছ, কারান চৌধুরি? তাও ইলিয়াস জেহেরের সাথে? আই উইল মেক শিওর ইউ ডাই আ স্লো ডে'থ!"

কারান হঠাৎই উচ্চৈঃস্বরে ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে ফেটে পড়ল। তা অবলোকন করে জেহেরের আত্মবিশ্বাসে প্রথমবার ফাটল ধরল। সে কয়েকবার শুষ্ক ঢোক গিলল। ওদিকে ফারহানও গালের ভেতরে জিহ্বা ঠেলে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে স্মিত হাসল, যেন সে কোনো নিম্নমানের সার্কাস দেখছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর কারান নিজ অধরের ওপর বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে হাস্যরস সিক্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, "তোর কি সত্যিই মনে হচ্ছে তুই আমাদের বলপূর্বক এখানে নিয়ে এসেছিস? কাম অন, ব্রো! কারান চৌধুরি কোন পর্যায়ের ট্যাকটিশিয়ান, সেটা আমেরিকান মাফিয়া থেকে শুরু করে মেক্সিকান কার্টেলগুলোও জানে। তোর এই চাইল্ডিশ প্ল্যানে কারান পা দেবে, এটা ভাবলি কীভাবে? হাহ্?"

জেহেরের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ল, ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। কারান এবার হাতের আঙুলের গাঁটগুলো এক এক করে ফুটিয়ে শরীরের জড়তা কাটিয়ে নিল। সে ঘাড়টি সামান্য কাত করে বিদ্রুপের স্বরে বলল, "আর আয়লা? তুই কি ভেবেছিস ও সাধারণ কোনো ড্রাগের প্রভাবে অচেতন? নোপ! শি ইজ ইন আ লুসিড ড্রিম স্টেট। ওর সেন্স ফিরলেই ওর কন্ট্যাক্ট লেন্স থেকে নির্গত ইনফ্রারেড স্ক্যানার তোর ইনভেন্টরির প্রতিটি অবৈধ বারকোড স্ক্যান করে, এনক্রিপ্টেড চ্যানেলে তা সরাসরি ইন্টারপোলের মেনফ্রেম সার্ভারে লাইভ ট্রান্সমিট করবে।"

জেহের সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে উঠল, "শাট আপ! তুই এখন আমার কাস্টডিতে। তোর মস্তিষ্ক বিগড়ে গেছে, তাই আজেবাজে প্রলাপ বকছিস। আমিরা নূর নিজের হাতে আয়লাকে টর্চার করে শেষ করেছে। আর এমেকা তো অলরেডি ডেড! এবার তোর পালা, ফা*কিং পি*স অফ শি*ট!"

কারান এক পা সামনে বাড়াল। এবার জেহেরের রিভলভারটি কারানের কপালে গর্ত তৈরি করার উপক্রম করল। তবুও কারানের প্রখর আত্মবিশ্বাস ও স্থির দৃষ্টি দেখে আশেপাশে অবস্থানরত সশস্ত্র গার্ডদের হাত কাঁপতে শুরু করল। আগুনের ন্যায় চোখে তাকিয়ে কারান শীতল কণ্ঠে বলে উঠলো, "এমেকা শেষ? গ্রো আপ, ম্যান! নাইজেরিয়ান স্পেশাল ফোর্সের একজন টপ-টিয়ার কমান্ডোকে তোর এই সস্তা গুন্ডারা এত সহজে ধূলিসাৎ করে দেবে মনে হয়?"

ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এমেকা—যাকে এতক্ষণ নিথর ও মৃ'ত বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সে ক্ষিপ্রতায় নিকটবর্তী গার্ডের পা সজোরে টেনে ধরল। গার্ডটি ভারসাম্য হারিয়ে কংক্রিটের মেঝেতে আছড়ে পড়তেই এমেকা তার বেল্টের হোলস্টার থেকে নাইন-এমএম পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে অগ্নিবর্ষণ শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে সেই গার্ডের দেহ বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে নিথর হয়ে গেল। এমেকা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। তার হাতের শক্ত বাঁধন সে আগেই তার আংটিতে লুকানো ঘন অ্যাসিডের প্রলেপ দিয়ে গলিয়ে ফেলেছিল। চোখের পলকে সে পার্শ্ববর্তী দুই গার্ডের গ্রীবাদেশ মোচড় দিয়ে তাদের অস্ত্রগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল।

_______

আয়লার মস্তিষ্কের পশ্চাদ্ভাগে তীব্র যন্ত্রণার তরঙ্গ আছড়ে পড়ছে। নূরের প্রবল আঘাতের ফলে তার দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা লাগছে। অবিন্যস্ত কেশরাশির অন্তরালে সে অনুভব করল তার মাথা পটিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রকোষ্ঠটিতে যান্ত্রিক কম্পন অনুভূত হচ্ছে, যা কোনো বিশাল জাহাজের লোয়ার ডেকের ইঞ্জিনের ভাইব্রেশন। আয়লা কায়িক শক্তি সঞ্চয় করে উঠে বসার উপক্রম করতেই মাধ্যাকর্ষণের টানে পুনরায় ধাতব মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ব্যথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করল সে।

"আহ! উফ... মা!" তার শুষ্ক কণ্ঠনালি থেকে অস্ফুট শব্দ বের হলো।

এরমধ্যেই আয়লা চরম অস্বস্তির সাথে উপলব্ধি করল, তার পরিধানে কোনো কাপড় নেই। সে তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল, আন্তর্জাতিক পা'চার চক্রের জাহাজের গোপন কার্গো হোল্ডে তাকে আনা হয়েছে। পাষণ্ড জেহেরের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করে সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, "মাদা*রফা*কা*র জেহের! তোকে যদি একবার নাগালে পাই, তবে তোর ওই বি*চি দুটো কে*টে দুবাইয়ের রাজপথে ফেলে রাখব।" মাথায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, "উফফ, মনে হচ্ছে মাথার ভেতরটায় কেউ হাজার হাজার হাতুড়ি দিয়ে অনবরত পেটাচ্ছে।"

হঠাৎ কক্ষের ভারী ইস্পাত নির্মিত দরজাটি সশব্দে খুলে গেল। আয়লা নিমিষেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে সম্পূর্ণ নিস্পন্দ করে রাখল, যেন সে অজ্ঞান হয়ে আছে। কক্ষের কৃত্রিম নিওন আলোয় আবির্ভূত হলো এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের অন্যতম রূপকার আমিরা নূর। তার খয়েরি লিপস্টিক মাখা ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠলো। জেহেরের সাথে তার সম্পর্কও কোনো ভাইবোনের বন্ধন নয়, বরং তা বিকৃত লালসায় সিক্ত। মূলত জেহের ছিল ইব্রাহিমের প্রথমা স্ত্রীর ভাই, যে দুর্ভাগিনী তার স্বামী ও ভাইয়ের এই অর্গান ট্র্যা'ফি'কিং ও নৃ*শংস কুকীর্তি সহ্য করতে না পেরে আ*ত্মহ*ত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

নূরের অনুগামী হয়ে দুজন সশস্ত্র প্রহরী এবং একজন প্রৌঢ় চিকিৎসক কক্ষে প্রবেশ করলেন। চিকিৎসকের অবয়বে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের ছাপ স্পষ্ট। আয়লার ন'গ্ন দেহ দেখে তার দৃষ্টিতে যে সূক্ষ্ম সংকোচ ও অপরাধবোধ খেলে গেল, তা তার অন্তরের সুপ্ত মনুষ্যত্বেরই পরিচয় দেয়। নূর তর্জনীর ইশারায় এক প্রহরীকে নির্দেশ দিল আয়লার দেহ পরীক্ষা করতে। প্রহরীটি হাঁটু পেতে বসে আয়লার দুই গালে সজোরে কয়েকটি চপেটাঘাত করল। কিন্তু আয়লা নিজেকে আগের মতোই স্থির রাখল।

নূর হঠাৎ করেই তার কোমরের বেরেটা ৯২-এফএস পিস্তলটি বের করে সেই প্রহরীর মাথায় গুলি বর্ষণ করল। তপ্ত ও ঘন র*ক্তধারা নূরের দামি লাল বডিকন ড্রেসে ছিটকে পড়ল। আয়লার অনাবৃত ত্বকেও র*ক্তের উষ্ণ ছিটা বিঁধল; কিন্তু সে এই বীভৎস নৃ*শংসতা উপলব্ধি করেও নিশ্চল হয়ে রইল।

নূর বন্দুকের তপ্ত নলটি নিজের কপালে ঘষতে ঘষতে তাচ্ছিল্য ভরে আওড়ালো, "গর্দভ সব! সামান্য একটা মেয়েকে কনশাসনেসে ফিরিয়ে আনতে পারছে না।"

নূরের এই ম'রণঘাতী উন্মাদনা দেখে বাকি প্রহরী ও চিকিৎসক কম্পিত হলেন। নূর ডাক্তারের দিকে র*ক্তপিপাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ স্বরে বলল, "দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আপনাকে রেমুনারেশন দেওয়া হয় না, ডক্টর। কাজ শুরু করুন, নাহলে আপনার কপালেও এই একই লিথাল ডোজ জুটবে।"

একটি বক্র হাসি ছড়িয়ে আমিরা নূর তার লাস্যময়ী দেহভঙ্গি নিয়ে হেলতেদুলতে কক্ষ ত্যাগ করল। কক্ষের ভারি ইস্পাত দরজাটি পুনরায় বন্ধ হতেই ডাক্তার রবার্ট একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি নিজের দামি পশমি কোটটি খুলে পরম মমতায় আয়লার ন'গ্ন দেহে জড়িয়ে দিলেন। তারপর তিনি যখনই তার মেডিক্যাল কিট থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বের করার জন্য পাশের মেটাল বক্সের দিকে মনোনিবেশ করলেন, ঠিক তখনই আয়লা অতর্কিত ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের কণ্ঠনালি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

"বো...কা মেয়ে, কর...ছোটা কি? ছা...ছাড়ো!" ডাক্তার রবার্ট ফুসফুসে অক্সিজেনের অভাবে অস্ফুট স্বরে গোঙাতে লাগলেন।

আয়লা তার হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় করে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "শাট আপ! একদম চিৎকার করবেন না। আমি যা বলছি তা যদি হুবহু পালন না করেন, তবে আপনার জীবনের অন্তিম যাত্রা এখানেই সমাপ্ত হবে।"

কিন্তু আয়লার দুর্বল শরীরে এই শক্তির স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণস্থায়ী। ডাক্তার রবার্ট তার সর্বশক্তি দিয়ে এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিতেই আয়লা পুনরায় ভারসাম্য হারিয়ে ধাতব মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ডাক্তার হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘাড় ডলতে থাকলেন, এবং প্রচণ্ড কাশিতে তার মুখমণ্ডল আরক্ত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি মৃদু স্বরে বললেন, "আই অ্যাম নট ইয়োর এনিমি। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি।"

আয়লা তার ললাট থেকে র*ক্তরঞ্জিত ও অবিন্যস্ত কেশরাশি সরিয়ে ক্রূর হাসিতে শুধালো, "আয়লা দেমিরকে এই সব সস্তা ইমোশনাল ট্র্যাপে ফেলার চেষ্টা করবেন না, ডক্টর। আমি জানি আপনি ইব্রাহিমের বেতনভুক্ত গোলাম। আপনি এখানে আমাকে হাই-ডোজ সেডেটিভ দিয়ে অসার করতে এসেছেন, যাতে ওরা আমাকে কোনো বাধা ছাড়াই পা'চার করতে পারে।"

আয়লার এই প্রখর সচেতনতা ও ফার্মাকোলজিক্যাল জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা পেয়ে ডাক্তার রবার্ট বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। তিনি হালকা ভ্রূ উঁচিয়ে বললেন, "অস্বীকার করব না। তবে তোমার মস্তিষ্কের ল্যাসারেশন চিকিৎসা আগে করে তারপর ড্রাগ দেওয়ার আদেশ রয়েছে। তুমি এখন শান্ত হয়ে আগে কোটটা গায়ে জড়িয়ে নাও, আমার কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।"

"হোয়্যার আর মাই ক্লোদস?"

"আই হ্যাভ নো আইডিয়া। সম্ভবত ওগুলো ডিসপোজ করা হয়েছে।"

"লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি। আপনাকে আমার একটা বিগ ফেভার করতে হবে।" আয়লা ডাক্তারের চোখের মণি বরাবর স্থির দৃষ্টি রাখল।

"হোয়াটস ইন ইট ফর মি?" ডাক্তার রবার্ট কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গাত্মক স্বরে প্রশ্ন করলেন।

"আপনি আমাকে সাহায্য করবেন কি না, সেটা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। বড়ো কথা হলো, আপনি নিজের প্রাণ ভিক্ষা চান কি না। আমার ইনস্ট্রাকশন ফলো না করলে আমি আপনাকে এখানেই খ'তম করে দেব। তাছাড়া আমার হারানোর কিছুই নেই, কিন্তু আপনার আছে।"

ডাক্তার রবার্ট তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, "ইউ ক্যান হার্ডলি স্ট্যান্ড, লেট অ্যালোন কি'ল মি।"

"আই অ্যাম নট জোকিং, ডক্টর।"

"বুঝলাম। তুমি এখান থেকে পালাতে চাও, দ্যাট’স ইয়োর গোল?"

"একদমই না। আমি এসেছি এখানে বন্দি মেয়েগুলোকে রেসকিউ করতে।"

আয়লার এই অবিশ্বাস্য ও দুঃসাহসিক সংকল্প শুনে ডাক্তার রবার্ট মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে গেলেন। তিনি অত্যন্ত নিচু স্বরে বললেন, "নোবেল কজ! কিন্তু সেই দুর্ভাগা মেয়েদের ঠিক কোথায় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তা আমার জ্ঞানের বাইরে। আমি কেবল ল্যাবে কাজ করি।"

"আমি জানি ঠিক কোথায় ওরা আছে। আপনি শুধু আমার মাথার ড্রেসিং আর ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট নিখুঁতভাবে করুন। তার বিনিময়ে আমি আপনাকে এই ভাসমান নরক থেকে সেফলি বের করে নিয়ে যাব। আর এই পা'চার চক্রে আপনার অনিচ্ছাকৃত সংশ্লিষ্টতার কোনো লিগ্যাল এভিডেন্স অবশিষ্ট থাকবে না। ইউ উইল বি এ ফ্রি ম্যান।"

ডাক্তার রবার্ট এক মুহূর্ত দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে চিন্তা করলেন, তারপর আয়লার সেই তেজস্বী ও প্রখর চাহনিতে নির্ভরযোগ্যতা খুঁজে পেলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, "তোমাকে কে বলল আমি এখান থেকে মুক্তি চাই?"

"আপনার চোখের এই ক্লান্তি আর অবদমিত মনুষ্যত্ব। এনিওয়ে, উই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম।"

ডাক্তার ম্লান হেসে আয়লার মাথার ক্ষত পরিষ্কার করতে শুরু করলেন। কক্ষের বাইরে তখন বিশাল জলযানটি উত্তাল আরব সাগরের নোনা ঢেউ চিরে অজানা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

_______

জেহেরের চক্ষুদ্বয়ে তখন আসন্ন মৃ*ত্যুর হিমশীতল আতঙ্ক পরিব্যাপ্ত। সে কাঁপাকাঁপা হাতে পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দেওয়ার উপক্রম করতেই, কারান বিদ্যুৎগতিতে অস্ত্রটি ছিনিয়ে নিল। কারানের কবজিতে থাকা বিশেষ ঘড়িটি থেকে সেই ফোল্ডিং নাইফ নির্গত হয়ে জেহেরের হাতের কবজি বিদীর্ণ করল। ধমনি ছিন্ন হয়ে গাঢ় র*ক্তধারা ফিনকি দিয়ে নির্গত হতেই জেহের আর্তনাদ করে উঠল। সে তার ক্ষতস্থান চেপে ধরে উন্মত্তের ন্যায় চিৎকার করল, "গাধার দল, ফিনিশ দেম অল! কি'ল দিস মা*দারফা*কা*র্স!"

"ওই কাইল্লা, মুভ!" ফারহান উচ্চস্বরে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেই নিকটস্থ একটি ভারি কার্গো কনটেইনারের আড়ালে সটান আশ্রয় নিল। পরক্ষণেই সে তার পোর্টেবল হ্যাকিং ডিভাইস থেকে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক পালস ট্রিগার করে ওই কক্ষের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিল। চতুর্দিক নিমিষেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।

ফারহান অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিদ্রুপের স্বরে আওড়ালো, "যাহ শালা! এখন ওই কাইল্লাকে ওরা খুঁজে পাওয়া তো দূরের কথা, ওদের বাপ ফারহানও ডিটেক্ট করতে পারবে না।"

ফারহানের সংকেত শ্রবণমাত্র কারান আর এমেকাও নিজ নিজ অবস্থানে আত্মগোপন করল।

ফারহান কিঞ্চিৎ পরিহাসের সুরে কানে থাকা মাইক্রোফোনে ফিসফিস করল, "ওই এমেকা, তোর দাঁতটা একটু দেখা তো, বাপ! তোকে তো এই অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। ইউ আর লিটারালি ইনভিজিবল, ম্যান!"

তার এই রেসিস্ট জোক শুনেও এমেকা ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের পেশাদারিত্ব অটুট রাখল। জেহেরের সশস্ত্র অনুচররা লক্ষ্যহীনভাবে অন্ধকারে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল।

এদিকে কারান তার কোমরের হোলস্টার থেকে এক জোড়া স্টিল-কোরড নানচাকু বের করে নিল। অন্ধকারে বাতাসে শো শো শব্দ তুলে সে শত্রুদের ওপর চড়াও হলো। প্রথম গার্ডটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কারানের নানচাকুর এক প্রচণ্ড আঘাতে তার চোয়াল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। দ্বিতীয়জন তলোয়ার নিয়ে তেড়ে আসতেই কারান শরীরটাকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে তার হাঁটুর সন্ধিস্থলে আঘাত করল; হাড়ের মটকা ভাঙার তীব্র শব্দ হলো।

এরপর লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তেই কারান বিদ্যুৎবেগে নানচাকুর চেইনটি তার গ্রীবাদেশে প্যাঁচিয়ে ধরল। পরক্ষণেই তাকে সজোরে মেঝেতে আছড়ে ফেলে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তার মেরুদণ্ডের ওপর হাঁটু চেপে ধরল; চেইনের তীব্র টানে আর হাঁটুর পিষ্টকারী চাপে নিমিষেই লোকটির ফুসফুস অক্সিজেনশূন্য হয়ে নিথর হয়ে গেল।

অন্যদিকে, এমেকা কৃষ্ণবর্ণ ত্বকের সুবিধা নিয়ে অন্ধকারের সাথে একীভূত হয়ে গেল। সে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াই একজনের কণ্ঠনালি বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরে উপরের লোহার বিমের সাথে ঝুলিয়ে দিল। প্রহরীরা পা'গলের মতো টর্চ জ্বেলে তাকে খোঁজার চেষ্টা করতেই এমেকা কারও ওপর বিশাল পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করল, আবার কাউকে সুইস-নাইফ দিয়ে নিস্তেজ করে দিল।

ফারহান সরাসরি কায়িক সংঘাতে না জড়ালেও সে ছিল এই ম'রণপণ যুদ্ধের অদৃশ্য পরিচালক। সে তার ল্যাপটপের থার্মাল ইমেজিং স্ক্রিনে শত্রুদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে কারান আর এমেকাকে ক্রমাগত কমান্ড দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে একজন প্রহরী ফারহানের অবস্থান লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়তে উদ্যত হলে, ফারহান দ্রুত তার পকেট থেকে একটি হাই-ডেসিবেল সনিক ফ্ল্যাশ ব্যাং তার পায়ে ছুঁড়ে মারল। উচ্চমাত্রার শব্দ আর তীব্র আলোকচ্ছটায় ওই প্রহরীর স্নায়ুতন্ত্র মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়ল।

জেহের তখন অন্ধকারের মধ্যে দিগভ্রান্তের মতো হাতড়াচ্ছিল আর গালি দিচ্ছিল, "ইউ বা*স্টার্ডস! একবার শুধু তোরা সামনে আয়! আই উইল মেক শিওর ইউ ডাই লাইক ডগস! কাওয়ার্ডের মতো কোথায় লুকিয়েছিস, জা*নোয়ারগুলো?"

তখনই কারান অন্ধকারের মধ্যেই জেহেরের পশ্চাদ্ভাগে আবির্ভূত হলো। জেহেরের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে হিমশীতল কণ্ঠে ফিসফিস করল, "গেম ওভার, জেহের। ইউ আর ট্র্যাপড ইন ইয়োর ওন হেল।"

​জেহের আর্তচিৎকার করে কিছু করার আগেই ফারহান কক্ষের মেইন পাওয়ার গ্রিড সক্রিয় করে হ্যালাইড আলোগুলো জ্বালিয়ে দিল। আকস্মিক আলোকচ্ছটায় জেহেরের চোখের পিউপিল সংকুচিত হয়ে এলো। সে বি'স্ফোরিত নেত্রে লক্ষ্য করল, কারান নানচাকুর লৌহশৃঙ্খল দিয়ে তার কণ্ঠনালি আষ্টেপৃষ্ঠে প্যাঁচিয়ে ধরেছে। সম্মুখে ফারহান ঘাড় সামান্য হেলিয়ে তাচ্ছিল্যভরা হাসিতে দাঁড়িয়ে আছে, আর জেহেরের বাম ললাটে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে এমেকা। জেহের কয়েকবার শুষ্ক ঢোক গিলে চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার হৃৎপিণ্ড যেন স্পন্দন থামিয়ে দিল; তার পুরো সশস্ত্র বাহিনী এখন মেঝের ওপর নিথর, নিস্পন্দ এবং র*ক্তাত্ব অবস্থায় পড়ে আছে।

​এমেকা এক পা সামনে এগিয়ে এলো। তার বিশালবপু ও কৃষ্ণবর্ণের পেশিবহুল অবয়ব দেখে জেহেরের শিরা-উপশিরায় ভীতি ঠিকরে পড়ছে। এমেকা জেহেরের কপালে প্রতিটি শব্দের শেষে তর্জনী দিয়ে টোকা দিতে দিতে বলল, "কাওয়ার্ড! তোর নিজের সেফ হাউসে এসেই তোর সব ইঁদুরগুলোকে মে*রে আজ তোকে এই ব্যারেলের সামনে দাঁড় করিয়েছি। নাউ টেল মি, কাওয়ার্ডটা আসলে কে?"

​এমেকার কণ্ঠস্বর সচরাচর শোনা যায় না, কিন্তু যখন সে মুখ খোলে, প্রতিপক্ষের মস্তিষ্কে তখন অ্যাড্রেনালিন রাশ শুরু হয়ে যায়। কারান আড়চোখে এমেকার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে নীরব সাধুবাদ জানালো। জেহের তবুও নিজের সহজাত দম্ভ বজায় রাখতে ফারহানের দিকে বিষাক্ত ও ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। রাগে তার নাসারন্ধ্র বারবার স্ফীত হচ্ছে।

​জেহেরের এমন শোচনীয় ও করুণ দশা দেখে ফারহান ভ্রূ নাচিয়ে বিদ্রুপের স্বরে প্রশ্ন করল, "কী অবস্থা, মদনা?"

​ফারহান ধীরপদে এগিয়ে এসে জেহেরের কপালে জমে থাকা ঘাম নিজের আঙুলের ডগায় নিয়ে তা অবজ্ঞার সাথে ঝেড়ে ফেলে দিল। জেহের ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করে উঠল, "ফা'ক ইউ!"

​ফারহান বাঁকা হাসি হেসে তাৎক্ষণিক উত্তর দিল, "ফা'ক ইউ টু, ব্রো।" ​পরক্ষণেই ফারহানের মনে হলো সে এক জঘন্য রুচিহীন প্রতি-উত্তর দিয়েছে। সে মুখ বিকৃত করে বলল, "হা'রামজাদা! তোর মেয়ে দিয়ে হয় না? আবার আমার মতো অবলাকে... আজ তুই শেষ!"

​ক্রোধোন্মত্ত ফারহান ওষ্ঠাধর কামড়ে পিছনের পকেট থেকে একটি রিভলভার বের করল। ট্রিগারে আঙুল রেখে সে যখনই জেহেরকে মা*রার জন্য লক্ষ্যভেদী অবস্থানে এলো, ঠিক তখনই কারানের তীক্ষ্ণ নেত্রপল্লবের এক সংকেত তার মস্তিষ্কের উত্তাপকে প্রশমিত করল।

​কারান নানচাকুর লৌহশৃঙ্খল জেহেরের কণ্ঠনালিতে আরও সজোরে চেপে ধরে গর্জে উঠল, "আয়লা কোথায়? যদি ওর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে, তবে এই দুবাইয়ের উত্তপ্ত মরুভূমিতেই তোর নামহীন সমাধি রচিত হবে। স্পিট ইট আউট, ও কোথায়?"

​জেহের শ্বাসরোধকারী যন্ত্রণায় আষ্টেপৃষ্ঠে কুঁকড়ে গেলেও তীর্যক শয়তানি হাসিতে আওড়ালো, "দেরি হয়ে গেছে, কারান! ইব্রাহিম ওকে অলরেডি সেই আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলে পাঠিয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের সিক্রেট ডকে গিয়ে মিশেছে। আজ রাতেই ওরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করবে। তুই কোনোদিন ওদের খুঁজে পাবি না!"

কিন্তু জেহেরের ন্যায় একজন ধূর্ত মিথ্যুকের এই আকস্মিক স্বীকারোক্তি কারানের সংশয়বাদী মনকে তৃপ্ত করতে পারল না। সে জেহেরের কণ্ঠনালির ওপর চাপের মাত্রা দ্বিগুণ বর্ধিত করল। জেহেরের শ্বাসক্রিয়া তখন প্রায় অবরুদ্ধ; অক্সিজেনের অভাবে তার মুখমণ্ডল ক্রমশ নীলবর্ণ ধারণ করছে। সে যন্ত্রণায় বারবার কেশে উঠল, সেই সাথে র*ক্তের ছিটে তার চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। তার দুই হাত দিয়ে নানচাকুর লৌহশৃঙ্খল থেকে মুক্তির নিষ্ফল প্রচেষ্টায় সে রত রইলো।

ঠিক সেই মুহূর্তে ফারহান তার ট্যাবে ভেসে ওঠা ডেটা দেখে চিৎকার করে উঠল, "কারান! আয়লার লেন্স থেকে এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল রিসিভ করছি। ওরা মেয়েদের একটি গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে উপকূলের ডকিং স্টেশনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তুই জলদি ওই লিফট শ্যাফ্ট দিয়ে নিচে নাম!"

জেহের অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, "ফা'ক, ফা'ক, ফা'ক!"

কারান ঘৃণাভরে অধর কামড়ে জেহেরের হাঁটুর মালাইচাকিতে সজোরে এক পদাঘাত করল। হাড় ভাঙার মটমট শব্দে জেহের আর্তনাদ করে হাঁটু পেতে বসে পড়তেই, কারান তার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে ক্রূর ও শীতল হাসি দিয়ে বলল, "ইব্রাহিমকে বাঁচানোর জন্য তুই আজমান বর্ডারে নিজের জান বাজি রেখেছিস, অথচ ইব্রাহিম তোকে এখানে বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজে সমুদ্রের মাঝপথে। ইউ আর জাস্ট আ ডিসপোজেবল পন, বোকার হদ্দ!"

জেহেরের অন্তরাত্মা এবার আতঙ্কে প্রকম্পিত হলো। স্বার্থপরতার এই নোংরা খেলায় সে বুঝতে পারল যে, ইব্রাহিম এবং আমিরা নূর তাকে ধোঁকা দিয়েছে।

"এবার বল, হার্ড ড্রাইভটা কোথায়?" কারানের কণ্ঠস্বর এখন ইস্পাতের ন্যায় কঠিন হলো।

জেহেরের মনোবল তখন তলানিতে ঠেকলেও সে তার অপরাধী দম্ভ বিসর্জন দিল না। কারান অনুধাবন করল যে এই পাষণ্ড সহজে মুখ খুলবে না। সে অকস্মাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এমেকার হাত হতে পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে জেহেরের উরু লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করল। উষ্ণ র*ক্ত ছিটকে এসে তার ট্রাউজার সহ মেঝে ভিজিয়ে দিল। সে গগনবিদারী আর্তনাদ করে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। কারান এবার একটা নাইলন রশি হাতের কবজিতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে যমদূতের মতো এগিয়ে এলো।

জেহের যখন র*ক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল, ফারহানের মনে হয়েছিল ওর খেলাটা বুঝি এখানেই ‘দ্য এন্ড’। কিন্তু জেহেরের মতো ধুরন্ধর ও প্রফেশনাল অপরাধীরা সবসময় একটি আত্মরক্ষার বিকল্প পথ হাতে রাখে। কারান এমেকার দিকে ঘুরে পরবর্তী ট্যাকটিক্যাল নির্দেশ দিতে যাবে, সেই ক্ষণিক অসতর্কতার সুযোগ নিল জেহের। সে নিজের পকেট থেকে একটি ক্ষুদ্র ফ্রিকোয়েন্সি-বেসড রিমোট কন্ট্রোল বের করে সজোরে বোতাম টিপে দিল। কারান কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেহেরের ঠিক পেছনে থাকা দেয়ালের একটি অংশ হাইড্রোলিক প্রেসারের হিসহিস শব্দে সরে গেল। সেই গুপ্ত কক্ষের ভেতর আগে থেকেই চালু দিয়ে রাখা ছিল একটি কালো রঙের মার্সিডিজ-বেঞ্জ জি-ওয়াগন। জেহের দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে গাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ল।

"হোলি শি*ট! দ্যাট স্লা*ট-বোর্ন মাদা*রফা*কা*র!" কারান গর্জে উঠে তার পিস্তল তাক করল, কিন্তু ততক্ষণে স্বয়ংক্রিয় ইস্পাতের দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে।

জুট মিলের বাইরে তখন একটি গোপন ভূগর্ভস্থ ঢালু পথ দিয়ে জেহেরের গাড়িটি উল্কার বেগে বেরিয়ে গেল। জেহের তার র*ক্তাক্ত পায়েই থ্রোটল সজোরে চেপে ধরেছে; তার চোখে তখন প্রতিহিংসার লেলিহান শিখা। গাড়িটি ধূলিঝড় উড়িয়ে মরুভূমির মূল হাইওয়ের দিকে ধাবিত হলো, যার গন্তব্য পারস্য উপসাগরের সেই উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে ইব্রাহিমের জাহাজ নোঙর করা আছে।

কারান দাঁতে দাঁত চেপে ফারহানের দিকে তাকালো। ফারহান ততক্ষণে তার ট্যাবলেট পিসিতে জেহেরের গাড়ির জিপিএস সিগন্যাল ট্র্যাক করতে শুরু করেছে। "কারান, ও মেইন রোডে উঠে গেছে! আমাদের এখনই বেরোতে হবে, নতুবা ওকে ধরা ইম্পসিবল!"

কারানের কপালে চিন্তার ভাঁজ থাকলেও তার তীক্ষ্ণ নেত্রে পরাজয়ের গ্লানি নেই। সে দ্রুত র*ক্তাক্ত মেঝের দিকে দৃষ্টিপাত করল। যেখানে জেহের শুয়ে ছিল, সেখানে একটি ছোট প্রিমিয়াম লেদার কেস পড়ে আছে, যা জেহের তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। কারান ক্ষিপ্রতায় সেটি তুলে নিল। ভেতরে কোনো ড্রাইভ না থাকলেও, আছে একটি কিউআর-কোড যুক্ত এনক্রিপ্টেড স্মার্ট কি-কার্ড। কারান মুহূর্তেই তার প্রখর মস্তিষ্কে সমীকরণ মিলিয়ে নিল।

"জেহের ড্রাইভটা সাথে নেয়নি। ওটা নিতে গেলে ও ধরা পড়ে যেত। এই কি-কার্ডটা লো-ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল ট্রান্সমিট করছে। এমেকা, লিসেন টু মি কেয়ারফুলি, এই কার্ডের ফ্রিকোয়েন্সি ট্র্যাক করো। এই স্ট্রাকচারের ঠিক নিচেই কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড সার্ভার রুম আছে। জেহের যে সিক্রেট ডোর দিয়ে পালাল, তার ঠিক অপোজিট ওয়ালে একটি ভল্ট থাকার প্রোবাবিলিটি নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট। ওই ভল্টটা এই কার্ড ছাড়া অ্যাক্সেস করা ইম্পসিবল। আই'ম ড্যাম শিওর, ড্রাইভটা ওখানেই সিকিউর করা আছে।" কারান এবার এমেকার দিকে ফিরে তার চূড়ান্ত নির্দেশ দিল, "এখানে হিউম্যান অর্গান ট্র্যা'ফিকিং-এর যত ডকুমেন্টস আছে, আর ক্রায়োজেনিক কন্টেইনারে রাখা অর্গানগুলো সব সিজ করে নাও। ড্রাইভটা উদ্ধার করে দ্রুত আমাকে ডিজিটাল কপি পাঠিয়ে দাও। আমি আর ফারহান জেহেরের পিছু নিচ্ছি। জাস্ট রিমেম্বার, ওই হার্ড ড্রাইভে আন্তর্জাতিক নারী পা'চারের রুট ম্যাপ আর ভিআইপি ক্লায়েন্টদের লিস্ট আছে। ওটা হারানো মানে আমাদের পুরো অপারেশন ডেডলক। আর এখানের কাজ শেষ করে তুমি সেইফ হাউসে গিয়ে হাই-পোটেন্সি অ্যান্টিডোট আর নিউরো-বুস্টার ড্রিপ নিয়ে এসো।"

এমেকা কি-কার্ডটা নিয়ে মাথা নাড়িয়ে গম্ভীর স্বরে সম্মতি জানাল, "ওকে, বস।'

ফারহান কার্বন-ফাইবার কম্পোজিট হেলমেটটি কারানের অভিমুখে নিক্ষেপ করলে, কারান সেটি এক হাতে লুফে নিল। মাথায় পরিধান করে ভাইজারটি সশব্দে নামিয়ে নিল সে।

°

°

কারান ও ফারহান তাদের স্পোর্টস বাইকের থ্রোটল পূর্ণ শক্তিতে মোচড় দিয়ে জেহেরের পিছু নেওয়া শুরু করেছে।

সম্মুখস্থ জি-ওয়াগন থেকে জেহের তার রিয়ার-ভিউ মিররে দুই আরোহীকে ধেয়ে আসতে দেখে দন্ত কিড়মিড় করে উঠল। জুট মিলের ভেতরে তার প্রধান স্কোয়াডটি কারানদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও, জেহের তার চূড়ান্ত ট্রাম্প কার্ডটি এখনো খেলেনি। সে বুঝে গিয়েছিল, চিতাবাঘ কারান চৌধুরিকে আটকানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, তাই সে আগে থেকেই দুবাইয়ের হাইওয়েগুলোতে তার এক্সটার্নাল স্ট্রাইক টিম মোতায়েন করে রেখেছিল।

​সে দ্রুত এয়ারপড প্রো কানে সংলগ্ন করে তার সেই অবশিষ্ট ঘাতক বাহিনীকে নির্দেশ দিল, "ইন্টারসেপ্ট দেম নাউ! আই ওয়ান্ট দোজ বাইকারস ডেড অন দ্য হাইওয়ে!"

মুহূর্তের মধ্যে দুবাইয়ের সেই প্রশস্ত ফ্লাইওভারে আরও কিছু কৃষ্ণবর্ণের ক্যাডিল্যাক এসইউভি এবং একঝাঁক সুপারবাইক বাহিনী কারানদের ঘিরে ফেলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হলো।

ফ্লাইওভারের রেলিঙের প্রান্ত ঘেঁষে ফারহান তার বাইকটিকে কৌণিক অবস্থানে ঝুঁকিয়ে দিল। পেছনের দুটি ক্যাডিল্যাক এসকেলাড (গাড়ি) যখন ফারহানকে পিষ্ট করার অভিপ্রায়ে গতি বাড়িয়ে তার দুপাশ দিয়ে চেপে ধরল, ফারহান বাইকের রিয়ার ব্রেক সজোরে চেপে ধরে পাওয়ার স্লাইড করল। বাইকটি লাটিমের ন্যায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। ফারহান ঠিক ওই মুহূর্তেই থ্রোটল মোচড় দিল; বাইকটি এক চাকার ওপর ভর দিয়ে ঘাতক গাড়ি দুটির মাঝখানের মাত্র কয়েক ইঞ্চির পথ দিয়ে পেছনের দিকে বেরিয়ে গেল।

​গতি জড়তা আর সেকেন্ডের ভগ্নাংশের এই হিসেবে চালক দুজন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এসইউভি দুটি একে অপরের ওপর সজোরে আছড়ে পড়ল। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতায় একটি গাড়ির এক্সেল ভেঙে ছিটকে গেল, আর অন্যটি রেলিং ভেঙে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে কয়েকশ ফুট নিচে আছড়ে পড়ল।

কারান ঝড়ের বেগে সম্মুখপানে ধাবিত হলো। ঘূর্ণায়মান চাকার ঘর্ষণে সড়ক থেকে যেন স্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। রিয়র-ভিউ মিররে ফারহানের চোখের সাথে তার দৃষ্টি বিনিময় হতেই পরিকল্পনা বুঝে নিল। ফারহান বাম ভ্রূ আর ঠোঁটের কোণ উঁচিয়ে বিদ্রুপাত্মক হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল।

ফারহান তার বাইকটিকে একপাশে কাত করে সিলেটি ভাষায় চিৎকার করে উঠল, "কারান, তুই জলদি যা! গিয়া দেখ আয়লা ঠিক আছেনি। ওগুনতরে আজকু এই ব্ল্যাক প্যান্থারে দেখব। ইতা কু'ত্তার বাইচ্চাইনরে আজকু হিদল হুটকির লাখান চ্যাপটা করিয়া ছাড়মু!"

(এই কু'ত্তার বাচ্চাদের আজ সিদল শুটকির মতো চ্যাপটা করে ফেলব!)

কারানের সমস্ত মনোযোগ তখন স্পিডোমিটার আর জেহেরের ধাবমান জি-ওয়াগনের ওপর। বাইকের গতিবেগ এখন ২০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। জেহের আয়নায় কারানদের ধেয়ে আসতে দেখে ক্রোধে ও হতাশায় পাশের সিটে সজোরে কয়েকটি মুষ্ট্যাঘাত করল। এরপর সে ড্যাশবোর্ড থেকে একটি হাইড্রোলিক সুইচ টিপতেই গাড়ির পেছনের অংশ থেকে ছোট ছোট লোহার কাঁটা সড়কে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

"কারান, ওয়াচ আউট! স্পাইকস!" ফারহান দ্রুত বাইকটি একপাশে কাত করে ম'রণফাঁদটি এড়িয়ে গেল। কারান মাত্র এক ইঞ্চি ব্যবধানে কাঁটাগুলো পাশ কাটিয়ে বাইকের গতি আরও বাড়িয়ে দিল।

জেহের এবার বাম হাতে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে, ডান হাত জানালার বাইরে বের করে তার সাব-মেশিন গান দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে শুরু করল।

কারান ইচ্ছে করেই গাড়ির টায়ার লক্ষ্য করে গুলি চালাল না, কারণ জেহেরকে অনুসরণ করে সেই গোপন ডকিং স্টেশনে পৌঁছানোই তাদের মূল লক্ষ্য। কারান চোখের ইশারায় ফারহানকে ফ্ল্যাঙ্কিং করার নির্দেশ দিল। কারান ডান দিকে আর ফারহান বাম দিকে বাইক চরম মাত্রায় কাত করে, এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে অপর হাতে তাদের গ্লক পিস্তল বের করল।

কারান ইন্টারকমে ধারালো স্বরে বলল, "ফারহান, টার্গেট দ্য বাইকারস ফাস্ট। জেহেরকে জ্যান্ত চাই, সো ডোন্ট শ্যুট হিজ কার টায়ার্স। জাস্ট ক্লিন দ্য ট্র্যাশ অ্যারাউন্ড হিম।"

"বুঝছি রে ভাই, তুই টেনশন করিস না। ইতা কাইল্লা চু*দির ভাইনরে আমি একলাই সামলাইমু। ইউ জাস্ট গো ফর ইট, ব্রো!"

ফারহানের পৈতৃক নিবাস সিলেটে। সে শৈশবে প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশে ফেরার পর দ্রুত আঞ্চলিক বুলিগুলো আয়ত্ত করে নিয়েছে। এই মুহূর্তে নিজের শেকড়ের ভাষায় গালি দেওয়ারও যে পরম প্রশান্তি, তা অন্য কোনো ভাষায় লভ্য নয়।

জেহেরের এক বাইকার অনুচর তার সমান্তরালে আসতেই, কারান তার বাইকের গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এক হাত ছেড়ে তার কাঁধে গুলি করল। আরোহীটি ছিটকে পড়ল সড়কের ওপর। ওদিকে ফারহান তার বাইকটিকে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চালিয়ে জেহেরের গাড়ির দিক থেকে আসা বুলেটগুলো এড়িয়ে চলল, এবং অপর পাশের বাইক আরোহীকে পদাঘাত করে চলন্ত ট্রাকের নিচে পাঠিয়ে দিল।

______

আয়লার মাথার ক্ষ'তস্থানটি চিনচিন করে উঠল। ড্রেসিং শেষ হয়েছে। ডাক্তার রবার্ট নিজের পকেট থেকে একটি ক্ষুদ্র শিশি বের করলেন, যার ভেতরে স্বচ্ছ নীলচে তরল চিকচিক করছে।

"এটা একটা নিউরো-এক্টিভেটর। সাময়িকভাবে তোমার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে অ্যাড্রেনালিন প্রবাহ বৃদ্ধি করবে। শারীরিক সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেলেও এর আফটার-ইফেক্ট হিসেবে কিছুটা অবসাদ আসতে পারে," রবার্ট সতর্কবার্তার সুরে বললেন।

আয়লা শিশিটা নিয়ে নিজের দেহের ওপর ডাক্তারের পশমি কোটটি জড়িয়ে নিল। তারপর ডাক্তারের সার্জিক্যাল কিট থেকে একটি স্কালপেল এবং এক জোড়া হেমোস্ট্যাট চিমটা নিয়ে নিল। এই মুহূর্তে এগুলোই তার জীবনরক্ষাকারী অস্ত্র। তার সন্ধানী দৃষ্টি তখন প্রকোষ্ঠের কোণে পড়ে থাকা একটি মরচেধরা ভাঙা সার্জিক্যাল ট্রের ওপর নিবদ্ধ হলো।

সে ট্রের একটি সরু ইস্পাত খণ্ড মোচড় দিয়ে ভেঙে নিল। মেঝের কংক্রিটে ঘর্ষণ করে টুকরোটির অগ্রভাগ সুচালো এবং চ্যাপটা করে নিল। আয়লা এবার দরজার সমান্তরালে ওত পেতে দাঁড়াল। ওপাশ থেকে ভারী কমব্যাট বুটের আসছে; সে জানে, কিছুক্ষণ পরপরই গার্ড চেক করতে আসে।

ডাক্তার রবার্ট রুদ্ধশ্বাসে বিড়বিড় করলেন, "এই মেয়ে, তুমি কি পাগ'ল? ওরা হেভিলি আর্মড!"

আয়লা তর্জনী অধরে স্থাপন করে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দিল। একজন প্রহরী ভেতরে প্রবেশ করতেই আয়লা ডাক্তারের কোট দিয়ে তার মুখমণ্ডল জাপটে ধরল এবং তার গ্রীবাদেশের ক্যারোটিড সাইনাস পয়েন্টে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করল। প্রহরীটি কোনো প্রকার বিপদ সংকেত দেওয়ার পূর্বেই নিস্তেজ হয়ে পড়ল।

°

°

জাহাজের করিডোরটি সংকীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে এবং লুব্রিকেন্ট অয়েলের গন্ধে পরিপূর্ণ। করিডোরের শেষ প্রান্তে দুজন বিশালদেহী সার্বিয়ান গার্ড সাব-মেশিন গান হাতে দণ্ডায়মান। আয়লা অনুধাবন করল, সামনে থেকে এদের পরাভূত করা আত্মঘাতী হবে।

সে ডাক্তারকে ইশারায় দরজার সন্নিকটে পাঠালো। ডাক্তার স্বাভাবিক গলায় একজনকে সম্বোধন করল। প্রহরীটি ভেতরে প্রবেশ করার জন্য চৌকাঠ অতিক্রম করা মাত্রই, আয়লা হেমোস্ট্যাট দিয়ে লোকটির চোখের মণি বরাবর আঘাত হেনে তাকে অন্ধ করে দিল। যন্ত্রণার আর্তনাদ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার আগেই আয়লা ধারালো স্কালপেল দিয়ে তার কণ্ঠনালির জুগুলার ভেইন বিদীর্ণ করে দিল। গাঢ় লোহিত র*ক্তে করিডোরের কার্পেট সিক্ত হলো। মৃ'ত প্রহরীর কোমর থেকে সে একটি কমব্যাট নাইফ এবং একটি আরএফআইডি মাস্টার কার্ড উদ্ধার করল।

অন্ধকার করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সে একটি ফিউজ বক্স থেকে একটি সরু তামার তার ছিঁড়ে নিল। প্রতিটি বাঁকে সিসিটিভি এবং ইনফ্রারেড মোশন সেন্সর সক্রিয় থাকলেও আয়লা পাইপের সাথে শরীর মিশিয়ে শ্যাডো মুভমেন্ট কৌশলে এগোতে লাগল, এমনভাবে যেন সে এই যান্ত্রিক কাঠামোরই একটি অংশ। অবশেষে সে সেই অভিশপ্ত কার্গো হোল্ড-এর সামনে উপস্থিত হলো, যেখানে কোনো তালা নেই; বরং একটি অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক ও এনক্রিপ্টেড প্যাডলক মিটিমিটি জ্বলছে।

ডাক্তার রবার্ট আতঙ্কিত স্বরে বললেন, "আয়লা, দিস ইজ ইম্পসিবল! ইব্রাহিম আর আমিরা নূরের ডিজিটাল সিগনেচার ছাড়া এর অ্যাক্সেস পাওয়া অসম্ভব।"

আয়লা এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। সে দাঁত দিয়ে তামার সরু তারটি নির্দিষ্ট মাপে কেটে নিল। তারপর প্রহরীর কাছ থেকে নেওয়া মাস্টার কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপটি ঘষে একটি নির্দিষ্ট পজিশনে নিয়ে এলো।

তার ললাট বেয়ে ঘাম ঝরছে, মস্তিষ্কের আঘাতের কারণে হাত দুটো সামান্য কম্পিত হলেও তার সংকল্প অটল। সে বিড়বিড় করে বলল, "কারান বলত, ‘এভরি ইলেকট্রনিক লক ইজ জাস্ট আ সেট অফ লজিক গেটস’... জাস্ট নিড টু ওভাররাইড দ্য সার্কিট।"

আয়লা সেই তামার তারটি দিয়ে কি-প্যাডের সংযোগস্থলে একটি সূক্ষ্ম শর্ট সার্কিট তৈরি করল। কি-প্যাডটি মুহূর্তের জন্য ফ্লিকার করে বন্ধ হয়ে যেতেই আয়লা তার তৈরি করা সেই ধাতব টুকরোটি ভেতরে প্রবেশ করাল। সে কান পেতে অভ্যন্তরীণ পিনগুলোর যান্ত্রিক বিন্যাস বোঝার চেষ্টা করল। এক... দুই... তিন... প্রতিটি পিন সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থাপিত হওয়ার শব্দে তার ওষ্ঠাধরে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।

হঠাৎ কি-প্যাডটি র'ক্তিম আভা ত্যাগ করে কমলা এবং পরিশেষে গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করল। আয়লা মাস্টার কার্ডটি সোয়াইপ করতেই ইস্পাতের দরজাটি উন্মুক্ত হলো।

ভেতরে প্রবেশ করতেই আয়লার দৃষ্টিগোচর হলো সারিবদ্ধ গ্যালভানাইজড স্টিলের খাঁচা। প্রতিটির অগ্রভাগে একটি করে লাল এলইডি বাতি মিটিমিটি জ্বলছে। সম্মুখের দৃশ্যটি দেখে আয়লা শিউরে উঠল। সেখানে প্রায় নিরানব্বইজন নারী নিথর ও বিবর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। অর্থাৎ আয়লাসহ এই সংখ্যাটি শতকে পৌঁছাত। তাদের ধমনিতে ড্রিপ লাগানো, যার মাধ্যমে ক্রমাগত উচ্চমাত্রার ড্রাগ পুশ করা হচ্ছে, যেন তারা কোনো প্রকার প্রতিবাদ বা আর্তনাদ করতে না পারে। মেয়েগুলোর কেশ অবিন্যস্ত, দৃষ্টি শূন্য, আর দেহে পাশবিক নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট।

রবার্ট আতঙ্কিত স্বরে ফিসফিস করলেন, "আয়লা, উপরে ইব্রাহিম আর আমিরা নূর আছে। ওরা একবার টের পেলে এই কার্গো ভেসেলই আমাদের সমাধি হবে।"

আয়লা সেদিকে কর্ণপাত না করে একটি মেয়েকে আলতো করে নাড়া দিল; মেয়েটির অক্ষিপল্লব কাঁপছে, কিন্তু সে নারকোটিক প্রভাবে চোখ খুলতে পারছে না। হঠাৎ একজন প্রহরীর পদধ্বনি কানে আসতেই আয়লা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় একটি পাইপ বেয়ে উপরের স্টিলের বিমে ঝুলে পড়ল। প্রহরীটি ভেতরে প্রবেশ করে ডাক্তারকে রোগী চেক করতে দেখে কিছু একটা বিড়বিড় করে চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই আয়লা বিম থেকে বাজপাখির ন্যায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরীর গ্লক পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে সে তার সাইলেন্সর যুক্ত ট্রিগারে চাপ দিল। প্রহরীর দেহটি নিথর হয়ে পড়ল।

আয়লা ডাক্তার রবার্টের দিকে ফিরে নিচু স্বরে বলল, "ডক্টর, আপনি এই জাহাজের ইভাকুয়েশন ম্যাপ জানেন না, কিন্তু আমি জানি। এই কার্গো ভেসেলের নিচতলায় বিলজ পাম্প রুমের পাশে একটা সার্ভিস ডাক্ট আছে, যেটা সরাসরি ডেকের পেছনের দিকে গিয়ে মিশেছে।"

"কিন্তু ওটা তো বর্জ্য আর তেলের পিচ্ছিল পাইপ দিয়ে ঠাসা!"

আয়লা বিদ্রুপাত্মক হাসি হেসে বলল, "ম'রার চেয়ে নোংরা হওয়া অনেক বেশি লজিক্যাল, ডক্টর। ইব্রাহিমের গার্ডরা এখন মেইন করিডোর আর লিফ্‌ট শ্যাফ্ট পাহারা দিচ্ছে। ওরা কখনোই কল্পনা করবে না যে আপনি গারবেজ ডিসপোজাল সুড়ঙ্গ দিয়ে পালাবেন। সেখান থেকে সোজা নিচে নামলে আপনি ইঞ্জিন রুমের পেছনের দিকে একটি ছোট এস্কেপ হ্যাচ পাবেন। ওটা সরাসরি জাহাজের লাইফবোট ডেকে গিয়ে মিশেছে। এই আরএফআইডি কার্ডটা ব্যবহার করে হ্যাচটা খুলবেন।"

রবার্ট কাঁপাকাঁপা হাতে কার্ডটি গ্রহণ করলেন। তিনি বিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আর তুমি? তুমি যাবে না?"

আয়লা তার হাতের সেই র*ক্তমাখা টুকরোটি বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরল।

"আমার মিশন তো এখনো বাকি, ডক্টর। আপনি লাইফবোটে গিয়ে জিপিএস সিগন্যাল অন করে রেডি থাকুন। যদি পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি না ফিরি, তবে আপনি একাই রিলিজ লিভার টেনে দেবেন। অন্তত একজন জীবন্ত মানুষ এই নরককুণ্ড থেকে ফিরে গিয়ে বিশ্বকে এই জঘন্য সাম্রাজ্যের পৈশাচিক গল্পটা বলুক।"

রবার্ট কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু আয়লার চোখের সংকল্প দেখে দমে গেলেন। আয়লা তাকে ইশারায় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। রবার্ট রেলিং ধরে নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আয়লা ততক্ষণ মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ না ডাক্তারের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।

এবার আয়লা নিজের মনেই আওড়ালো, "গেম অন, ইব্রাহিম। লেটস সি হু সারভাইভস দিস নাইট।"

আয়লা পুনরায় সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে উপলব্ধি করল, প্রতিটি খাঁচার লকিং মেকানিজম ভিন্ন ভিন্ন কোডে বিন্যস্ত। সে নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তৈরি সেই কার্যকর সরঞ্জাম দিয়েই একের পর এক খাঁচার তালা খুলতে শুরু করল। ক্রমাগত ঘর্ষণে তার অঙ্গুলিগুলো র*ক্তাক্ত এবং নখ উপড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ঠিক যখন সে চূড়ান্ত খাঁচাটির তালা খুলতে উদ্যত হলো, তখনই সমগ্র জাহাজ প্রকম্পিত করে উচ্চ কম্পাঙ্কের ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম বেজে উঠল। আয়লার চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে বি'স্ফোরিত হলো।

সে দাঁতে দাঁত চেপে চরম বিরক্তি নিয়ে আওড়ালো, ​"লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এই হারা'মি ইব্রাহিম কোন বা'লের সেন্সর সেট করে রাখছে এখানে? শি*ট! সব প্ল্যান কি তবে ল্যাজেগোবরে হয়ে যাবে নাকি?" মাথা চুলকাতে চুলকাতে বাকিটা শুধালো, "ফা*ক, ম্যান! এই কু*ত্তারবাচ্চার অ্যালগরিদম তো দেখি আমার চেয়েও বেশি জাউরা!"

করিডোরের শেষ প্রান্তে ভারী বুটের আওয়াজ আর চাবুকের শপাং শব্দ সংকেত দিচ্ছিল যে, শিকারিরা তাদের শিকারের অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলেছে। আয়লা এক ঝটকায় দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। গাঢ় অন্ধকার চিরে চাবুক হাতে আমিরা নূরের সেই উদ্ধত ও দর্পিত অবয়ব ফুটে উঠল, আর তার ঠিক পশ্চাৎভাগেই যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে এই পৈশাচিক সাম্রাজ্যের অধিপতি ইব্রাহিম বিন জায়েদ। ইব্রাহিমের হাতে একটি সিগ সয়ার পিস্তল, যার নল থেকে তখনো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে।

নূর উপহাসের ভঙ্গিতে হাততালি দিয়ে তীর্যক হাসি উপহার দিল, "বাহ, আয়লা দেমির, বাহ! সবাইকে নিয়ে পালানোর তোমার এই কৌশল আর সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট সত্যিই আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। কিন্তু আফসোস... তোমার নাটকের শেষ দৃশ্যটা অনেক আগেই আমি লিখে রেখেছি, বেবিগার্ল।

ইব্রাহিম শীতল চাহনিতে এক পা এগিয়ে এলো। "কী ভেবেছিলে সোনামণি, আমার ডেরায় ঢুকে আমাকেই ধোঁকা দেবে?" সে পিস্তলের স্লাইড টেনে বুলেট লোড করতে করতে বলল, "একটা গুড নিউজ দিই তোমাকে, তোমার হিরো কারান চৌধুরি এখন মরুভূমির তপ্ত বালিতে মিশে একাকার হয়ে গেছে। আর তুমি? তুমি হবে আমার আজকের রাতের মোস্ট এক্সপেনসিভ ডিল।"

আয়লার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, ধমনিতে প্রবাহিত র*ক্ত যেন ফুটন্ত লাভার মতো উত্তপ্ত। তার পেছনে ড্রাগের ঘোরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা নিরপরাধ মেয়েগুলো, আর সামনে সাক্ষাৎ যম। এই নিঃসঙ্গ লড়াইয়ে তার একমাত্র আত্মিক ভরসা এখন কারানের সেই অমোঘ প্রতিশ্রুতি। সে মনে মনে আওড়ালো, "কারান, দিস ইজ দ্য মোমেন্ট। ইউ বেটার বি হিয়ার।"

🍁চলবে?🍁

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন