#Tell_me_who_I_am
#পর্ব_২৪_প্রথমাংশ
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
🍁২য় খণ্ড🍁
__________________________________________☞
[বি. দ্র. অনেক বড়ো পর্ব, তাই মেইন ফেসবুক থেকে পড়ুন। লাইটে পুরোটা আসবে না হয়ত।]
হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই ব্যস্ত ফুটপাত ধরে রিকশার দিকে পা বাড়াল কাব্য ও ইলিজা। রিকশায় চড়ার পর থেকে টানা ৩০ মিনিট ধরে ইলিজা একাই একনাগাড়ে কথা বলে গেল। অথচ কাব্য ছিল একেবারে নীরব। রিকশা ভাড়া মেটানোর পর যখন দুজনে পিচঢালা পথে পা রাখল, তখনও কাব্যের ঠোঁট দুটি বন্ধ রইল।
ব্যাপারটা ইলিজাকে দারুণ অস্বস্তিতে ফেলে দিল। ও একটু আড়চোখে কাব্যের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হিসাব মিলাতে লাগল, কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালে যখন মিরার সঙ্গে কথা বলছিল, তখনও তো সব বেশ স্বাভাবিকই ছিল! হুট করে কী এমন অমাবস্যা নেমে এল তার মেজাজে?
ইলিজা একটু পর ভ্রূ জোড়া সামান্য কুঁচকে, মুখ ভার করে বলেই ফেলল, "কিছু কি হয়েছে?"
কাব্য যথারীতি চুপ, কেবল একঘেয়ে গতিতে হেঁটে চলল।
ইলিজার কপাল এবার আরও সংকুচিত হলো। "কথা বলবেন না নাকি?"
কাব্য তা-ও কোনো উত্তর দিল না। রাস্তার ধারের আবছা সোডিয়াম লাইটের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়াটা ফুটপাতে গড়িয়ে যাচ্ছিল।
ইলিজা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল, "আরে, হয়েছেটা কী? তখন থেকে একটা কথাও বলছেন না কেন!"
"কিছু হয়নি," ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল কাব্য।
"হুহ! তা তো বুঝতেই পারছি!" ইলিজা মনে মনে ভেবে নিল। এই মানুষটার ভেতরের ঝড়ঝাপটা বোঝা সত্যিই দায়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, কাব্য যেন ধাঁধার মতো। ইলিজার ভেতরে একটা অদ্ভুত আক্ষেপ জন্ম নিল, কবে যে ও বয়সে ও অভিজ্ঞতায় কাব্যের মতো পরিপক্ব হবে! হয়ত তখন এসব না-বলা ভাষার অর্থ ও অনায়াসে বুঝে ফেলত।
বেশ কিছুটা পথ হাঁটার পর, অবশেষে কাব্যের বরফগলা কণ্ঠ শোনা গেল, "আপনি শুভ্রের সাথে অতক্ষণ ভেতরে ছিলেন কেন?"
কথাটা শেষ করেই সে চট করে ইলিজার ডান কবজিটা নিজের বলিষ্ঠ হাতের তালুতে পুরে নিল। অন্য হাত তুলে পথচলতি একটা কালচে সেডান গাড়িকে থামার ইশারা করে দুজনে ব্যস্ত রাস্তাটা পার হলো।
"অতক্ষণ কোথায়?"
"টানা ১১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড।"
"বাবাহ! আপনি আবার স্টপওয়াচ ধরে হিসাবও করে রেখেছেন! আর আপনিই তো আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন।"
"তো? দুই-একটা প্রথাগত কথা বলে তো বেরিয়ে আসা যেত, তাই না?" কাব্য বেশ কড়া স্বরেই ক্ষোভ প্রকাশ করল।
"উনি একজন অসুস্থ মানুষ, হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আমি মাঝপথে কথা ফেলে হুটহাট বেরিয়ে আসলে কেমন দেখাত বলুন তো?"
"পুরুষ তো পুরুষই, তা সে হাসপাতালের বেডেই থাকুক বা বাইরে। আমার হবু বউ আমাকে ছেড়ে অন্য কোনো পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় আলাপ করুক, এটা আমি চাই না।" কাব্য চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।
"হাস্যকর! ফরমালিটি বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি?"
"আপনারা মেয়েরা অজুহাত দাঁড় করাতে বড্ড বেশি পটু।"
অপমানের চোটে ইলিজার এবার মাথা গরম হয়ে গেল। সে ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পা ফেলে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলল, "আপনাকে আর দয়া দেখিয়ে আমাকে এগিয়ে দিতে হবে না। আপনি আসতে পারেন!"
"মিস ইলি, দাঁড়ান!" কাব্য গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল।
"হাঁ, আসছে উনি! খালি লেকচার দেবে আর উলটা পালটা রাগ দেখাবে," বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনালো ইলিজা।
"দাঁড়াতে বললাম কিন্তু আপনাকে!" কাব্য শেষবারের মতো সতর্ক করল।
"আপনি যান তো, আমি একাই বাড়ি যেতে পারব।"
ইলিজা ভেবেছিল কাব্য হয়ত পেছন থেকে এসে তার হাত ধরবে, কিছুটা অনুনয় করবে। কিন্তু কাব্য সত্যি সত্যিই ঠিক উলটো পথে হাঁটা দিল।
কয়েক মিনিট পর ইলিজা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সত্যি সত্যিই পেছনে কেউ নেই! চারপাশে খাঁ খাঁ করছে শুনশান নিস্তব্ধতা। রাস্তার দুপাশে থাকা সেগুন আর মেহগনি গাছের পাতার ফাঁক গলে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। রাত তখন সাড়ে সাতটা পার হয়েছে। যদিও হাসপাতালে থাকার সময় মিরা ফোন করে বাসায় জানিয়ে দিয়েছিল যে ইলিজা তার সাথেই আছে, নাহলে গভীর রাত পর্যন্ত কোনো ছেলের সাথে বাইরে থাকাটা রক্ষণশীল পরিবারে ঘোর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। কারণ তাদের এই গোপন অনুভূতির সম্পর্ক সম্পর্কে মা-বাবা বিন্দুমাত্র জানে না।
ইলিজা রাগে-ক্ষোভে গজরাতে লাগল, "গেল? আসলেই চলে গেল? সত্যি, ছেলেদের কোনোদিনই বিশ্বাস করতে নেই! কী পরিমাণে পাষাণ লোক হলে একটা মেয়েকে নির্জন রাস্তায় একা ফেলে চলে যায়! সঙ্গে গাড়িটাও আনিনি। একটু পর নিশ্চিত আম্মু ফোন দেবে। আরেকবার সামনে আসুক ব্যাটা, এমন সাইজ করব না!"
ভয়ে আর ক্ষোভে ঠোঁট কামড়ে এগোতে লাগল ইলিজা। পথটা চেনা হলেও রাস্তার মোড়ের সোডিয়াম বাতিটা নষ্ট হয়ে থাকায় পরিবেশটা ভূতুড়ে আঁধারে ডুবে গেছে। কোনো রিকশা বা যানবাহনও চোখে পড়ছে না। রাতের বেলা সে জীবনে প্রথমবার এভাবে একা হেঁটে বাড়ি ফিরছে। গলির মাথায় পৌঁছাতেই ইলিজার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। এমন বাতাসহীন থমথমে পরিবেশ ও আগে কখনো দেখেনি। সামনেই গলি, যা পার হলেই মেন রোড, আর রোড পার হলেই তাদের বাসভবন 'মিরা মঞ্জিল'।
ঠিক তখনই ইলিজার চোখে পড়ল গলির মাঝপথে, একটা জরাজীর্ণ লাইটপোস্টের নিচে তিন জন বখাটে যুবক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে ধরা সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ইলিজার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পেছনে ফিরে গিয়ে লাভ নেই, কারণ বাসায় পৌঁছাতে হলে এই সংকীর্ণ গলিটা পার হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। সে নিচের দিকে মাথা নিচু করে, যতটা সম্ভব হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়ে গলিটায় ঢুকে পড়ল। কিন্তু ছেলেগুলোর মুখোমুখি হতেই তাদের একজন বাঁকা হেসে বলে উঠল, "কোথায় যাওয়া হচ্ছে, আপু? পৌঁছাতে কোনো প্রবলেম হলে বলো, আমরা তো আছি!"
পাশের জন নিজের হাতের সিগারেট মাটিতে ফেলে ক্রূর হেসে যোগ করল, "আরে ভাই, ওভাবে বলছিস কেন? লিটল গার্ল ভয় পেয়ে যাবে তো! শোনো সোনামণি, উই আর অ্যাকচুয়ালি ভেরি গুড বয়েজ! তোমার উপকার করতেই দাঁড়িয়ে আছি। ফোন নাম্বারটা একটু কাইন্ডলি শেয়ার করো তো, রাত-বিরেতে তোমাকে ঠাকুরমার ঝুলি শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেব, ওকে?"
তৃতীয় বখাটেটা বিশ্রী ভঙ্গিতে হেসে যোগ করল, "না না, ঠাকুমার ঝুলি কেন? একদম ক্লাসিক নন্টে-ফন্টে! আমি তোমায় পুঁটি মাছের মাথা খিলাবো।"
নন্টে-ফন্টের ঠাকুরের সংলাপকে বিকৃত ভঙ্গিতে উগরে দিয়ে তারা খিলখিল করে হেসে উঠল। তাদের চোখের লোলুপ দৃষ্টি ও কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি বুঝতে ইলিজার এক সেকেন্ডও লাগল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে, ভয়ে বুক দুরুদুরু অবস্থায় নিজের হাঁটার গতি দ্বিগুণ করে দিল।
ঠিক তখনই তার পেছনে ভারী কয়েকটি জুতোর দ্রুত পদশব্দ পাওয়া গেল। ওরা পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করছে! তীব্র আতঙ্কে ও অসহায়ত্বে ইলিজার দুই চোখ এবার বাঁধভাঙা পানিতে ছলছল করে উঠল। দুই হাতে ওড়নার প্রান্ত চেপে ধরে মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল।
কিন্তু এরমধ্যেই ইলিজা খেয়াল করল, পেছনে ছেলেগুলোর জুতোর পদশব্দ আচমকা থেমে গেছে। হঠাৎ কেন তা থমকে গেল, সেই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে এই মুহূর্তে প্রাণ বাঁচানোই ইলিজার কাছে মুখ্য। সে নিজের হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল।
কিন্তু ঠিক পর মুহূর্তেই আকস্মিক আর্তচিৎকার আর ককিয়ে ওঠার শব্দ ভেসে এলো! এবার আর কৌতূহল সংবরণ করতে পারল না ইলিজা। চকিতে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল, গলির একপাশে পিচঢালা রাস্তায় বখাটে ছেলেগুলো গড়াগড়ি খাচ্ছে! প্রচণ্ড প্রহারে প্রত্যেকের গাল ও মুখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।
ইলিজা বিস্ময়ে ঠোঁট উলটে বিড়বিড় করে উঠল, "আশ্চর্যের বিষয় তো! এরা কি নেশার ঘোরে নিজেরাই নিজেদের পেটাচ্ছে নাকি?"
কথাটা শেষ করে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই গলির ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ সোডিয়াম আলোয় কাব্যের দীর্ঘায়িত অবয়ব ফুটে উঠল। কাব্য শার্টের হাতা দুটো গুটিয়ে নিচ্ছিল। তার গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ এত তীব্র যে, রাগে তার ফুসফুসের ওঠানামা ইলিজাও টের পাচ্ছে।
মুহূর্তের মধ্যেই ইলিজার ভীত, বিষণ্ন মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে, এক গাল হেসে হুট করে কাব্যের গলার চারপাশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"শয়তান লোক! অসভ্য, নষ্ট পুরুষ! ঢ্যামনার ঘরের নেওটা, কুমড়োপটাশ একটা! আমাকে ওভাবে একা ফেলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিলেন, অ্যাঁ? জমের বাচ্চা জম!"
ভয়ে ও রাগে গলার স্বর কাঁপতে থাকলেও, মুখ থেকে গালি আর অভিযোগের খই ফুটতে লাগল ইলিজার। ইলিজার পিঠটা তখনও আতঙ্কে কাঁপছিল। কাব্যের বুকের ওপরে তার চিবুক ঠেকানো। আর কিছুক্ষণ এভাবে একা থাকলে নিশ্চিত তার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসত।
কাব্য তির্যক হেসে ইলিজার কামিজের কলারটা পেছন থেকে দুই আঙুলে ধরে তাকে বেশ কিছুটা দূরে সরিয়ে দিল।
ইলিজা কিছুটা হাঁ হয়ে কাব্যের দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, "লোকটা কি এখনও আমার ওপর রেগে আছে নাকি?"
কাব্য একদম গম্ভীর মুখে, নিজের অবাধ্য চুলগুলো এক হাতে ব্যাকব্রাশ করতে করতে বক্রস্বরে বলল, "এমন একটা অন্ধকার গলির মধ্যে একজন পুরুষকে এভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, বলিহারি লজ্জা-শরমের বালাই কি সব হাসপাতালেই ফেলে এসেছেন, ম্যাডাম?"
কাব্য কথাটা কিছুটা রসিকতা করে বললেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এই অন্ধকার গলিতে কোনো স্থানীয় লোক যদি তাদের এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলে, তবে ইলিজার কিছু না হলেও, লোকজনের গণধোলাই কিন্তু কাব্যের পিঠেই পড়বে! তার ওপর সামাজিক ইজ্জত তো যাবেই।
ইলিজা মুখ ফুলিয়ে, রেগে লাল হয়ে বলল, "নাআআআআ! আমি মহা-নির্লজ্জ, তাই জড়িয়ে ধরেছি! এখন খুশি আপনি?"
ইলিজার এই বাচ্চাসুলভ রাগ দেখে কাব্যের পেটের ভেতর হাসির হররা উঠছিল, গাল দুটো চেপে ধরে হাসি সামলাতে গিয়ে পেশিতে রীতিমতো টান পড়ার জোগাড়! তবুও সে টেনেটুনে মুখটা যতটা সম্ভব থমথমে বানিয়ে বলল, "হুম, আমার তো মনে হয় হাসপাতালে থাকতে থাকতেই আপনাকে একটা লজ্জার ইনজেকশন দেওয়া উচিত ছিল।"
"ধুর!" ইলিজা কটমট করে তাকিয়ে গটগট করে বড় বড় পায়ে হাঁটা দিল। দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে বেঁধে বিড়বিড় করতে লাগল, "কী পরিমাণ জঘন্য আর অ'সভ্য লোক হলে এই অবস্থায় এমন কথা বলতে পারে! একে নাকি আমি আবার ফিউচারে বিয়ে করব? কাঁচকলা করব! বিচ্ছিরি লোক একটা!"
ইলিজা কিছুটা দূরে সরে যেতেই কাব্যের মুখের ঠাট্টার ছাপ উবে গেল।
সে গড়িয়ে পড়া বখাটেগুলোর সামনে গিয়ে এক হাঁটু মুড়ে বসল। কাব্যের কয়েকটা ঝোড়ো চড়-ঘুষিতে ছেলেগুলোর দু-একটার দাঁতের প্রাক-পতন অবস্থা, চোয়ালে র*ক্ত জমে গেছে। গাল চেপে ধরে ওরা ব্যথায় ককিয়ে উঠছে।
কাব্য দুটি ভ্রূ কুঁচকে শাঁসানো গলায় বলল, "এই মেয়েটাকে ভালো করে চিনে রাখ। ও এখন থেকে প্রতিদিন এই গলি দিয়েই যাতায়াত করবে। এর পর থেকে ওর যদি সামান্য কোনো ক্ষতি হয়, সেটা তোদের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে, আমি ধরে নেব সেটা তোরাই করেছিস। আজ তো শুধু মুখ মচকে দিয়ে গেলাম, পরের বার হাত-পাগুলো ভেঙে পাশের ওই নোংরা ডোবায় চুবিয়ে রাখব। কথাটা যেন মাথার নিউরনে সেভ থাকে!" বলতে বলতে সামনের ছেলেটার কপালে তর্জনী দিয়ে দুটো কড়া টোকা দিল সে।
ওরা তিনজনই মা'রের চোটে আর কাব্যের হিমশীতল চোখের ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠে হাত জোর করল।
তাদের মধ্যে রোগা-পাতলা গোছের ছেলেটা কাঁপতে কাঁপতে বলল, "ভাই, ভুল হয়ে গেছে! মাইয়াটা বয়সে ছোট হলেও ওরে আমরা এখন থেকে নিজের বড় বোনের মতো সম্মান করব। আর মারবেন না, ভাই!"
অন্য আরেকজন ফরসা, লম্বা কিন্তু গায়ে মাংস কম থাকা ছেলেটা থরথর করে কাঁপতে থাকা অবস্থাতেই কাব্যের ট্রাইসেপসের বাইসেপ মাসেল ধরে চেপে চেপে দেখতে লাগল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আপনার তো হেভি মাসেল ভাই! জিমে যান নাকি? কোনটা দিয়া ট্রেনিং নেন? আমার এক কাজিনের কিন্তু বডি বিল্ডারদের নিউট্রিশনের বিজনেস আছে। আপনাকে কিন্তু ওখানে মডেল হিসেবে নেওয়া যায়..."
এই চরম পরিস্থিতিতেও ছেলেটার অহেতুক কথা শুনে কাব্য বিরক্তিতে এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে মনে মনে আওড়ালো, "হুঁ, তোর ভাইয়ের ব্যবসায় এখন আমি গোলাপি বাত্তি জ্বালাতে যাব! তোরা চ্যাংড়ার দল দুটো চড়ে চিতপটাং হইছিস। কোনো রিয়েল বডি বিল্ডার যদি আমারে ধরে মারে, আমার শরীরের হাড়গোড়ও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না!"
কাব্য আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পদক্ষেপে হেঁটে ইলিজার পিছু নিল। গলির বাইরে এসে দেখল, ইলিজা ইতোমধ্যে নিজের বাসার গলির মুখে পৌঁছে গেছে। কাব্য ইলিজার ফোনে একটা কল দিল।
ফোনের রিংটোন বাজতেই ইলিজা পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল কিছুটা দূরে সোডিয়াম আলোর নিচে কাব্য এক হাতে ফোন কানে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার ইলিজা একটা ভেংচি কেটে নিজের জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। "হুহ, যাবই না বাসায়! আমিও দাঁড়িয়ে থাকব, ব্যাটাকেও রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখব।" মনে মনে গজরাতে লাগল সে।
এদিকে রাত ৮টা বাজতে চলল, কাব্যের ৮টায় একটা টিউশনি আছে। ইলিজার এই বাচ্চাদের মতো কাণ্ড দেখে কাব্য আবারও কল করল। ইলিজা ফোন দেখে কেটে দিল।
ফোন কাটতেই ইলিজা পেছনে তাকিয়ে দেখল, কাব্য নিজের এক হাত তুলে তাকে কাল্পনিক মার দেওয়ার ভঙ্গিমা করছে, আর কড়া চোখে ইশারা করছে বাসায় ঢোকার জন্য। ইলিজা আবার মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল।
কাব্য ধৈর্য না হারিয়ে তৃতীয়বার কল দিল। ইলিজা কলটা রিসিভ করতেই কাব্য বলল, "আপনি কি চান আজ রাতে আমি না খেয়ে থাকি?"
"এখন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে, তাই তো?"
"উঁহুঁ, একদমই না," কাব্য একহাত পকেটে পুরে মৃদু নিশ্বাস ফেলে বলল, "আটটার মধ্যে আমার টিউশনি আছে, মিস ইলি। আপনি তো ভালো করেই জানেন, একদিন অফ গেলেই ওরা মাসের পারিশ্রমিক থেকে টাকা কেটে নেয়। আপনি এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জেদ করলে আমি যাব কীভাবে?"
কাব্যের বাস্তবসম্মত আর অসহায় অবস্থাটা মুহূর্তেই ইলিজার রাগ গলিয়ে দিল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, "আপনাকে না আমি সত্যি মাঝে মাঝে একদম চিনতে পারি না! কখনো মনে হয় আপনার মতো নিখুঁত আর শুদ্ধ পুরুষ পৃথিবীতে আর দুটো নেই, আবার পরক্ষণেই মনে হয় আপনার মতো জঘন্য আর খাইস্টা লোক একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ!"
ফোনের ওপার থেকে কাব্যের একটা হালকা, খোলামেলা হাসির শব্দ ভেসে এলো। তবে মুহূর্তেই তার স্বর গম্ভীর ও ভারিক্কি হয়ে উঠল, "চেহারা দেখে যদি মানুষ চেনা যেত, তবে পৃথিবীর মানুষ সবার আগে নিজেকেই চিনতে পারত, ফ্রিসিয়া।"
কথাটার অমোঘ সত্যতা ইলিজাকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। সে আর কথা না বাড়িয়ে গেটের দিকে পা বাড়াল। তবে ভেতরের সীমানা অতিক্রম করার আগে শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। কাব্য তখনও রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইলিজার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাত তুলে 'বাই' ইশারা দিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।
ইলিজা ভেতরে ঢুকে পড়তেই কাব্য হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, হাতে একদম সময় নেই। দ্রুত পায়ে আবার মেন রোডের দিকে হাঁটা দিল সে। তবে টিউশনির আগে তাকে একবার হাসপাতালে ফেরত যেতে হবে।
শুভ্র ছেলেটা বিছানায় ছটফট করছে। একা একা নড়াচড়াও করতে পারছে না। এতক্ষণ মানসিকভাবে না জানি কত অসহায় বোধ করছে! কাব্যের নিজের মনের জমানো ঈর্ষা বা ক্ষোভ যাই থাকুক না কেন, অসুস্থ মানুষটার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব যে এখন অনেকটাই তার কাঁধে। গিয়ে স্যালাইন আর ড্রেসিংয়ের পর শুভ্রর গা-হাত-পা ভালো করে মুছে স্পঞ্জ করিয়ে দিতে হবে।
_______
বেসমেন্টের নিওন বাল্বের হলুদ আলোটা থেকে থেকে ফ্লিকার করছে, আর ঠিক তার নিচেই সুবিশাল একটা লোহার খাঁচা রাখা। আসাদের দীর্ঘ আঙুলগুলো শিকগুলোর ওপর আলতো করে বুলিয়ে গেল। খাঁচার ভেতরের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার এই আপাত-শান্ত চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর বিষাদ, যেটা দেখার সুযোগ খুব কম মানুষই পেয়েছে।
"তুমি আমাকে কেন ভালোবাসলে না, নীলপদ্মা? তুমি আমাকে একটু ভালোবাসলে তো আমি ভালো হয়ে যেতাম। পুরোপুরি বদলে যেতাম। আমাদের সুন্দর একটা সংসার হতো... আমাদের বাচ্চারা একই ছাদের নিচে তাদের প্যারেন্টসদের পেত। কেন ভালোবাসলে না, বিদেশিনি?"
কথাটা শেষ হতেই অন্ধকারের গভীর থেকে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে হা-হা করে হেসে উঠল কৌশিকা। সেই তাচ্ছিল্যের অট্টহাসিতে বেসমেন্টের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালগুলোও যেন কেঁপে উঠল। আসাদের বুকের ভেতরের এত বছরের সাজানো আত্মবিশ্বাসটুকু চোখের পলকে চুরমার হয়ে গেল। সে শুকনো মুখে ঢোক গিলে লোহার দুটো শিক শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। খাঁচার ভেতরে কৌশিকা এক পা বাড়াতেই তার পায়ে বাঁধা ভারী শেকলটা মেঝেতে আছড়ে পড়ে শব্দ তুলল।
কৌশিকা হাসতে হাসতেই আলোর সীমানায় চলে এলো। টিমটিমে লাইটের নিচে তার আভিজাত্যময় মুখশ্রীর প্রতিটি রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। কপালে এলোমেলো চুলের কয়েকটা থোকা গড়িয়ে পড়ছে, অথচ চোখের চাহনি লেজার রশ্মির মতো সোজা আসাদের চোখের মণিতে বিঁধে গেল।
তাকে দেখে কে বলবে তার বয়স ৫১? এই বন্দিত্বভরা লোহার খাঁচার জীবনেও, আসাদ তাকে রাজরানির মতো রেখেছে। সে কৌশিকার সম্পূর্ণ যত্ন নিত। তার ত্বক এখনো যুবতীর মতো টানটান, সতেজ। তার চোখের সম্মোহনী চাহনিতে এখনো যে-কোনো পুরুষ নিমেষেই কুপোকাত হয়ে যাবে।
কৌশিকা ঠান্ডা গলায় বলল, "ভালোবাসা? ডু ইউ ইভেন নো হোয়াট লাভ ইজ? তুমি জানো না, আসাদ। জাস্ট কিচ্ছু জানো না! তোমার মুখে এই শব্দগুলো বড্ড ফালতু শোনায়। লাভ, ফ্যামিলি, কিডস, এই প্রসেসিংগুলো তো তোমার ডিএনএতেই নেই! তোমার কাছে লাইফে একটাই জিনিস ইম্পর্ট্যান্ট, দ্যাটস ইওর সাইকোটিক ইগো। তুমি ভালোবাসো শুধু নিজের জেদকে। ইগো, অবসেশন, দ্যাটস ইট! ওটাই তোমার সো-কল্ড লাভ, ইউ গেট ইট?"
আসাদ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে খাঁচার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। "আর আমার সেই জেদের নাম তুমি, কৌশিকা," আসাদ নীচু গলায় হিস হিস করে বলল।
কৌশিকার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই পরিবর্তিত হয়ে গেল। ঘৃণায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। "ফা'ক ইউ, আসাদ! তোমার এই ফেসটা দেখলেও আমার বমি আসে," বলতে বলতেই খাঁচার ধুলোবালি জড়ো হওয়া মেঝেতে সশব্দে এক দলা থুতু ফেলল সে।
আসাদ আগের মতোই অবিচল হয়ে হালকা হাসল, যে হাসিতে মাতাল ভাব আর অবাধ্য উন্মাদনা জড়িয়ে রয়েছে। একদম ঠান্ডা চোখে কৌশিকার দিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে ভেতরের গাল ঠেলে হাস্কি টোনে বলল, "সো মেনি ইয়ার্স হ্যাভ পাস্ট, উই আর অ্যাবাউট টু বিকাম গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস, অথচ তুমি আজও আমার র প্যাশনটা ঠিকই মাথায় রেখেছ! ইয়েস... ফা’ক ইউ টু, সুইটহার্ট।"
কৌশিকা স্তম্ভিত গলায় বলল, "হোয়াট? আবরার... আমার আবরার বাবা হতে চলেছে? ইজ দ্যাট ট্রু?"
"ইয়েস মাই ফরেনার ডল, সেই গুড নিউজটাই তো তোমাকে দিতে এলাম। আই ওন দ্য বেট!" আসাদ বিজয়ের ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।
তবে কৌশিকার মস্তিষ্কে আসাদের এই অহংবোধের কথাগুলো আর প্রবেশ করছিল না। মুহূর্তের মধ্যেই তার তীব্র ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের জায়গাটা দখল করে নিল অমলিন, স্নিগ্ধ অনুভূতি। সে সব বন্দিত্ব ভুলে গিয়ে আনন্দে হেসে উঠল। তার ভেতরটা আকুল হয়ে উঠছিল, ইচ্ছে করছিল এখনই কারানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে অভিনন্দনে ভাসিয়ে দিতে।
কৌশিকা দ্রুত নিজের মাথার অগোছালো খোপাটা খুলে ফেলল। তার হাতে উঠে এল একটা 'কানজাশি'। এই সোনালি কাঠির ওপর ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে একটা সোনার সারস পাখি। সারসটির চারপাশে ফুটে রয়েছে গোলাপি রঙের চেরি ব্লসম। ফুল আর ডানার অলংকরণের ফাঁকে ফাঁকে বসানো নীলকান্ত পাথর। নিচ থেকে ঝুলছিল সোনার তৈরি সূক্ষ্ম শিকলের ঝালর, যার শেষ প্রান্তে অশ্রুবিন্দুর আকৃতিতে ঝুলছে আরও কয়েকটি নীল স্যাফায়ার। অতীতে কারানই তাকে জাপান থেকে আনিয়ে এই দুর্লভ জিনিসটি উপহার দিয়েছিল।
কৌশিকা কাঠিটা খাঁচার ফাঁক গলে আসাদের দিকে বাড়িয়ে দিল। "জীবনে তো কখনোই তোমার কাছে কিছু চাইনি..."
"কারণ তুমি চাওয়ার আগেই আমি সেটা হাজির করতাম।"
"আমার কথাটা শেষ করতে দাও, প্লিজ। আমার একটা ফেবার করো। এটা... এটা আমার বউমাকে দিও, আমার পক্ষ থেকে ওয়েডিং বা ওয়েলকাম গিফট হিসেবে। আর ওদের জন্য অনেক ব্লেসিংস রইল। আমার ভালোবাসা সবসময় ওদের সাথেই থাকবে।" হুট করেই কৌশিকা কৌতূহলবশত একটা প্রশ্ন করে বসল, "আচ্ছা... আমার বউমা দেখতে কেমন?"
কৌশিকার আকুল প্রশ্নের জবাবে আসাদ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। কৌশিকার মেদহীন, সুগঠিত শারীরিক গঠন, দুগ্ধফেননিভ মসৃণ ত্বক, সুগঠিত গ্রীবা আর চোখের কোণে সামান্য যে দু-একটি রেখা পড়েছে, তা তার দৃষ্টিকে আরও গভীর ও অনন্য করে তুলেছে। খাঁচার ভেতরে পায়ে ভারী শেকল বাঁধা অবস্থায়ও তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে সহজাত রাজকীয়তা ছিল।
আসাদ তৃষ্ণার্ত চোখে কৌশিকাকে দেখছিল। সে কৌশিকার হাত থেকে কাঠিটি নিজের আয়ত্তে নিল। "তোমার বউমা কেমন দেখতে?" আসাদ গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করল। "আমার মেয়ে মিরা তোমার মতোই উন্মাদনা, কৌশিকা। তবে তার সৌন্দর্য শান্ত নদীর মতো... আর তুমি? তুমি তো জ্বলন্ত তাণ্ডব, যা বহু বছর আগে আমার পুরো অস্তিত্ব ছারখার করে দিয়েছে। আর আজও... আজও তুমি ঠিক তেমনই অপরূপা।"
কৌশিকা বিস্মিত চোখে সামান্য ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করল, "তোমার মেয়ে?"
"হ্যাঁ, ওকে আমি কখনো সেরেফ বউমা হিসেবে দেখিনি। শি ইজ মাই ডটার।"
কৌশিকা তাচ্ছিল্যের সাথে বাঁকা হাসলো। সে খাঁচার শিকে এক হাত রেখে শরীরটা সামান্য ঝুঁকে বলল, "তুমি আবার সম্পর্কের মানে বুঝতে শিখলে কবে থেকে? ইউ নো ওয়াট? তুমি না কোনোদিন ভালো সন্তান হতে পেরেছ, না ভালো ভাই, না ভালো বাবা, আর না ভালো হাজবেন্ড! ড্যাম ইট... তুমি তো মানুষ হিসেবেই একটা কমপ্লিট ফেইলিওর। ইউ আর নট ইভেন আ গডড্যাম হিউম্যান!"
আসাদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু সে তার মাতাল হাসিটা ধরে রাখল। শীতল কণ্ঠে জবাব দিল, "হ্যাঁ, আমি ভালো নই। কারণ শ'য়তানরা কখনো ভালো হয় না। আই'ম ব্যাড... আই'ম সাইকোটিকালি ব্যাড!"
"তুমি খারাপ? এই 'খারাপ' শব্দটা তোমার জন্য বড্ড ক্রিঞ্জ আর মাইল্ড শোনায়। ইউ আর আ বিস্ট! আ ব্লাডি ডেভিল, আ ভ্যাম্পায়ার... আ সাইকো মনস্টার!"
"এতগুলো ডার্ক উপাধিতে ভূষিত করায় সত্যি বেশ ভালো লাগল, বিদেশিনি," আসাদ হাতের হেয়ারপিনটির দিকে তাকাল। সে কাঠিটার মেটালিক ফিনিশিং স্পর্শ করতে করতে হঠাৎ কৌশিকার চোখে চোখ রেখে বিষাদগ্রস্ত গলায় শুধালো, "বাই দ্য ওয়ে... তুমি আমাকে তো কোনোদিন কোনো গিফট দিলে না?"
"তোমাকে তো আমি আমার পুরো লাইফটাই স্যাক্রিফাইস করে দিয়েছি। এর চেয়ে বড়ো গিফট আর কী হতে পারে?"
আসাদ কাঠিটা সুটের পকেটে সযত্নে রাখতে রাখতে বলল, "দিয়েছ... দিয়েছ। এর চেয়েও বড়ো গিফট দিয়েছ তুমি আমাকে। আমার সন্তানদের!"
"উঁহুঁ," কৌশিকা এক পা পিছিয়ে গিয়ে মাথা নাড়ল। "ওরা আমার সন্তান! ওরা তো জানেও না ওদের জন্মদাতা বাবা কতটা ডেঞ্জারাস একটা জা'নোয়ার! অ্যান্ড আই চ্যালেঞ্জ ইউ আসাদ চৌধুরি... আমার ছেলে, আমার আবরার আসবে। ও আমাকে এই নরক থেকে বের করে নিয়ে যাবে। অ্যান্ড শিওর শট... ও তোমাকে একবারে ধ্বংস করে দেবে!"
আসাদের চেহারায় ফুটে থাকা হালকা ভাবটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। "আমি তো তোমার হাতে ধ্বংস হতে চেয়েছিলাম, জান। নিজের র*ক্তের হাতে ধ্বংস হলে বড্ড লাগবে বুকে... বড্ড বেশি পেইন হবে।" সে এক পা খাঁচার আরও কাছে এনে খুব মিনতিভরা গলায় যোগ করল, "আরেকবার আমাকে চ্যালেঞ্জ করো না, কৌশিকা। কারানকে আমি খুব ভালোবাসি... গড সোয়্যার, আই লাভ হিম! ওকে আমার থেকে দূরে ঠেলে দিও না।"
"ও ছিলই বা কবে তোমার কাছের? ও বরাবরই আমার ছিল। মাই সান, অলওয়েজ মাই বয়!"
আসাদ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। হঠাৎ সে কৌশিকার দিকে হাত বাড়িয়ে খাঁচার শিকের খুব কাছে মুখ এনে গাঢ় গলায় বলল, "আমার দীর্ঘ বছরের এই অপেক্ষাটার এবার অবসান ঘটাও, নীলপদ্মা। শুধু একবার... একবার বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো। আই প্রমিজ, আমি তোমাকে এই মুহূর্তেই মুক্ত করে দেব। এই শেকল, এই খাঁচা... এভরিথিং উইল বি গন!"
কৌশিকা আসাদের চোখের দিকে তাকাল। সে হালকা হেসে মাথা নাড়ল। "আমার জীবনের আর বাকিই বা কতটুকু আছে? রেস্ট অফ দ্য লাইফটাও যদি খাঁচায় কাটাতে হয়, আমি রাজি। তাও তোমার মতো একটা মনস্টারকে ওই পবিত্র শব্দটা কোনোদিন বলব না। নেভার!"
আসাদ কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই পুরোনো, রহস্যময় আর একগুঁয়ে হাসির রেখা ফিরে এল। সে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। চলে যেতে যেতে ঠান্ডা মাথায় বলে গেল, "তুমি বলবে, নীলপদ্মা। তোমার লাইফের একদম লাস্ট স্টেজে এসে হলেও... ইউ উইল সে ইট।"
আসাদের হেঁটে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে কৌশিকা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, "আফসোস, আসাদ চৌধুরি! তোমার জীবনের লাস্ট উইশটাও কোনোদিনও পূরণ হবে না..."
_______
শৌর্য তারান্নুমের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার সময় ফারহানের ছবি ঠিকই দেখেছিল; ফারহানের দৈনন্দিন দিনলিপি, কারানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমনকি তার প্রফেশনাল লাইফের খুঁটিনাটি ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্য—সবই শৌর্যের জানা ছিল। কিন্তু ফারহানের কণ্ঠস্বর কখনো স্বকর্ণে শোনার সুযোগ তার হয়নি। ফলে এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে তাকে কে এমন বিধ্বংসী হুমকি দিচ্ছে, তা শৌর্যের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক কোনোভাবেই বিশ্লেষণ করতে পারছিল না।
শৌর্যের শৈশব থেকেই একটা বিকৃত মানসিক সমস্যা ছিল, যাকে প্রথম দর্শনে তার পছন্দ হয়ে যেত, তাকে ঘিরে তার মনে উন্মাদতুল্য কৌতূহল জন্ম নিত। যখন তার পিতা শামসুজ্জামান তারান্নুমের সাথে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, শৌর্য গোপনে তারান্নুমের গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করে। তারান্নুমকে সত্যিই তার ভীষণ মনে ধরেছিল। এমনকি সে গোপনে তারান্নুমকে আগলে রাখত, গ্রামের কোনো যুবক যেন তার দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার দুঃসাহস না পায়। আর যে-ই সেই সীমানা অতিক্রম করার চেষ্টা করত, শৌর্য তাকে নির্মমভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিত। এসব খবর তারান্নুম ঘুণাক্ষরেও জানত না। কিন্তু পরবর্তীতে যখন আম্বিয়া বিয়ের প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন, শৌর্যের পুরুষ-অহংবোধে মারাত্মক আঘাত লাগল। যদিও শৌর্য ভেতরে ভেতরে অনুধাবন করতে পেরেছিল এর পেছনের রহস্য, আম্বিয়া নিশ্চয়ই তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের আঁচ পেয়ে গিয়েছিলেন।
এদিকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে ফারহান ধীরে ধীরে তার আসল রূপ ধারণ করতে শুরু করল। ঘাড়টা দুই দিকে কাত করতেই মটকা ভাঙার আওয়াজ হলো। আচমকা দেয়ালের কোণে রাখা পুরু একখানা লোহার শক্ত পাইপ এক ঝটকায় হাতে তুলে নিল সে। হঠাৎই শৌর্যের ডান ঊরুর মাংসপেশি লক্ষ্য করে প্রথম আঘাতটা করল। মাংস ও হাড় থেঁতলে যাওয়ার প্রচণ্ড শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল।
চোখ আর মুখ বাঁধা থাকায় শৌর্যের ভেতরের জ্বলন্ত ক্ষোভ ফারহান দেখতে পাচ্ছিল না, তবে প্রচণ্ড আঘাতে শৌর্যের পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। শৌর্য নিজের সহ্যশক্তি দিয়ে ফারহানের সামনে নিজেকে ভেঙে পড়তে না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু ফারহানের একের পর এক আঘাত ছিল র*ক্ত হিম করা! ফারহানের প্রতিটি আঘাতের পেছনে কাজ করছিল নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলার নরকযন্ত্রণা। ফারহানের শার্ট ঘামে ভিজে গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেছে, হাতের পেশিগুলো তীব্র উত্তেজনায় ফুলে উঠেছে। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপলেও সে নিজেকে কোনোমতে সংযত রাখছিল। এখনই যদি শৌর্যকে মৃ'ত্যুমুখে ঠেলে দেয়, তবে তার শাস্তিটা বড্ড সহজ হয়ে যাবে!
শৌর্য যন্ত্রণার মধ্যেও কেবল ফারহানের তপ্ত দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাচ্ছিল। শৌর্য মনে মনে গালি দিয়ে উঠল, "এর চেয়ে ঠুস করে একটা গুলি করে দিলেই তো পারতিস, ফা*কিং শি*ট!"
এক পর্যায়ে ফারহানের লোহার রডের আ'ঘাতে চেয়ারসহ উলটে কনক্রিটের মেঝেতে আছড়ে পড়ল শৌর্য। ব্যথায় তার ফুসফুস চিরে হাঁপানির মতো শব্দ বের হচ্ছিল। নিজেকে মুক্ত করার জন্য সাপের মতো ছটফট করতে লাগল সে। কিন্তু ফারহানের তোড়জোড় থামেনি; এবার সে লোহার পাইপ ফেলে এক কোণ থেকে একটি শক্ত হকিস্টিক তুলে নিয়ে এলো।
দাঁতে দাঁত চেপে শৌর্যের মাথার যেখানটায় ক্ষত আর ব্যান্ডেজ ছিল, ঠিক সেখানটায় নিখুঁত নিশানা করে একের পর এক আঘাত করতে লাগল ফারহান। ব্যান্ডেজ ভেদ করে র*ক্তের ফিনকি ফুটল, তাজা লাল র*ক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল তার মুখাবয়বে। শরীরের প্রতিটা জয়েন্ট, পাজরের হাড় যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। ফারহান যখন দেখল শৌর্য আর নিশ্বাস নিতে পারছে না এবং তার চেতনা হারানোর উপক্রম, তখন অবশেষে থামল সে। ফারহানের টানটান পেশি বেয়ে ঘাম ঝরছিল। সে চরম ঘৃণায় শৌর্যের শার্টের কলারটা এক হাতে আঁকড়ে ধরে মেঝের ওপর দিয়ে হিঁচড়ে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল। মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা লোহাচুর ও মেটালিক রেণু শৌর্যের ছাল-ওঠা কাঁচা জখমে গিয়ে বিঁধতে লাগল, আর শৌর্য যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছিল।
শহরের প্রধান আবর্জনার দুর্গন্ধময় ভাগাড়ের মধ্যে শৌর্যকে এক ধাক্কায় ছুঁড়ে ফেলল ফারহান। তারপর হাত দুটি এমন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ঝেড়ে ফেলল, যেন সে কোনো পচা ডাস্টবিন স্পর্শ করেছিল। কঠোর চোখে ফারহান শৌর্যের র*ক্তাক্ত মুখের দিকে এক দলা থুতু ফেলল, "দিস ইজ ইওর ডিজার্ভিং প্লেস, ট্র্যাশ।" কথাটি বলেই সে নিজের ব্ল্যাক কালারের ভি-৮ এসইউভিতে উঠে স্পিড বাড়িয়ে গায়েব হয়ে গেল।
শৌর্য তখন অচেতন হয়ে যাওয়ার একদম শেষ সীমায়। সমস্ত শরীর কাদা, র*ক্ত আর দুর্গন্ধে মাখামাখি। পুরো রাতটা সে ওই বিষাক্ত ভাগাড়েই আধম'রা হয়ে পড়ে রইল। ভোরের আলো ফুটতেই তার ক্ষতের চারপাশে মাছি আর পোকামাকড়ের দল ভিড় জমাল। যন্ত্রণায় সামান্য আঙুল নাড়ানো ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
এক পর্যায়ে অনাহার আর অতিরিক্ত র*ক্তক্ষরণের ক্লান্তি সামলাতে না পেরে সে আবর্জনার ওপরেই ঢলে পড়ল। এত কিছুর পরও কিন্তু নিজের পৈশাচিক পাপাচারের জন্য তার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা কাজ করেনি। সে কেবল ভেতরে ভেতরে হিসাব কষতে লাগল—এই লোকটা আসলে কে? কণ্ঠস্বর শুনে তো বেশ আধুনিক আর তরুণ বলেই মনে হলো!
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে প্রতিদিনের মতো একটি ১২ বছরের টোকাই ছেলে প্লাস্টিক আর বোতল কুড়াতে সেই ভাগাড়ে এলো। তার পরনে নোংরা গেঞ্জি আর ছেঁড়া হাফপ্যান্ট। হঠাৎ আবর্জনার স্তূপের নিচে একটি দেহাংশ নড়েচড়ে উঠতেই ছেলেটা এক লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেল, "ও মা গো! ভূত নাকি!"
ভয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে পাশে পড়ে থাকা একটি শক্ত ময়লা লাঠি তুলে নিয়ে শৌর্যের গায়ে সজোরে দুটি আঘাত করল।
আঘাতের চোটে শৌর্যের সংবিৎ আবার ফিরে এলো। ও মুখ বাঁধা অবস্থায় আর্তনাদ করে উঠতেই ছেলেটা অনুধাবন করল, এটা কোনো প্রেতাত্মা নয়, জ্যান্ত মানুষ! ছেলেটা লাঠি দিয়ে ময়লা সরিয়ে র*ক্তে ভেজা মুখটা দেখতে পেল। দয়াপরবশ হয়ে ছেলেটা কোনোমতে শৌর্যের হাতের শক্ত বাঁধনটা একটা ধারালো টিনের টুকরো দিয়ে কেটে দিল।
হাত মুক্ত হতেই শৌর্য ছোকরাটার মাথায় সশব্দে চাপড় বসিয়ে দিল! ভ্রূ কুঁচকে, নিজের চোখ আর মুখের বাঁধনটা এক ঝটকায় খুলে ফেলে হিংস্র চোখে বলল, "ফা'ক ইউ! ইচ্ছে করছে তোকে এখনই গলা টিপে এখানেই পুঁতে রাখি!"
টোকাই ছেলেটা মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ঘষতে ঘষতে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে রইল। শৌর্যের এমন প্রাণনাশী হুমকি সে হয়ত বুঝতে পারল না। "আপনার মাথাডা কি খারাব অইছে নাকি? ঘর-দুয়ার নাই? এই পচা ময়লার মইদ্দে শুইয়া আছেন ক্যালা?"
শৌর্য নিজের শরীরটা সামান্য সোজা করার চেষ্টা করল, কিন্তু পিঠের তীব্র যন্ত্রণা তাকে একদম অবশ করে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "আমাকে ধরে কোনো কাছের হাসপাতালে নিয়ে চলো। তার বদলে তোমাকে পাঁচ... না, দশ হাজার টাকা দেব।"
টাকার কথা শুনতেই ছেলেটার মুখটা যেন চকচক করে উঠল। মাথা দুলিয়ে বলল, "ঠিক আছে, ঠিক আছে! কিন্তু মুখের কথায় তো বিশ্বাস নাই সাব, আগে পকেট থেইকা ট্যাহাডা বাইর করেন, তারপর আপনারে টান দিমু।"
শৌর্য নিজের পকেটে হাত দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মানিব্যাগ উধাও। ফারহান হয়ত আগেই তা সরিয়ে নিয়েছে। বাধ্য হয়ে সে নিজের কবজিতে থাকা বহু মূল্যের লিমিটেড এডিশন ঘড়িটা খুলে ছেলেটার দিকে ছুঁড়ে দিল।
ছেলেটা বেশ উৎসাহ নিয়ে ঘড়িটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল। সে তো আর লাক্সারি ব্র্যান্ড বোঝে না, তবুও শৌর্যের সামনে বেশ অভিজ্ঞ জহুরির ভাব ধরে বলল, "হইব মনে লয় হাজার-দুই ট্যাহা! যহন এত চকচক করতাছে, ভালোই দাম পাইমু।" মনে মনে একটা কুটিল হাসি হেসে সে শৌর্যের একটা হাত ধরে টেনে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
নিজের প্রায় কোটি টাকার ঘড়িটা একটা টোকাইয়ের হাতে পানির দরে চলে যেতে দেখে শৌর্য তাচ্ছিল্যে মুখ বাঁকাল।
ছেলেটা শৌর্যকে তুলতে গিয়ে বেশ হিমশিম খাচ্ছিল। দম নিয়ে বলল, "আপনে কী খান সাব? এমন তাগড়া তাগড়া বডি বানাইছেন কেমনে? এক্কেবারে সিনেমার হিরোগো লাখান!"
শৌর্য এমনিতেই স্বল্পভাষী লোক। আর এসব বস্তির ছেলেদের সাথে তো কথা বলা তার ব্যক্তিত্বের পরিপন্থি! নাহলে সে এখনই গালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেখিয়ে দিত, সে হিরো নয়, হিরোদের শিকার করা এক সাইকোপ্যাথ ভিলেন।
এরপরের কিছুদিন শৌর্যের জীবনে যেন অভিশাপ নেমে এলো। প্রতিদিন বা একদিন পর পর কোনো না কোনো অন্ধকার ঘরে তাকে হাত-পা, চোখ-মুখ বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে পেটানো হতো। ক্রিকেট ব্যাট, হকিস্টিক, শক্ত লোহার রড—যেটা ফারহানের হাতে আসত, সেটা দিয়েই শৌর্যের শরীরে র*ক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া হতো। মাঝের একদিন শৌর্যের বাঁ পা-টা একদম ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আর একদিন তার বাম হাতের সবগুলো আঙুল ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে আলাদা করে ফেলা হয়েছে! অত্যাচার শেষে তাকে আবার একইভাবে ওই ভাগাড়েই ফেলে দেওয়া হতো।
শৌর্য এর মাঝে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে হামলাকারীর পরিচয় বের করতে। নিজের গোপন টিম দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কৌশলও অবলম্বন করেছিল সে। কিন্তু ওপাশ থেকে ফারহানের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল একদম নিখুঁত! কোনো ট্র্যাকিং, কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা গোপন পরিকল্পনা কাজ করেনি।
আজ এই শুক্রবারে তার ওপর যে মাত্রার শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তাতে আগামী অন্তত সাত দিন তার পক্ষে বিছানা ছেড়ে ওঠাও অসম্ভব! একটি কান এবং ডান পায়ের আঙুলগুলো কে'টে ফেলে তাকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এরই মাঝে খবর এসেছে, তার পুরো পরিবার হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেছে, এমনকি স্থানীয় থানার সেই দুর্নীতিগ্রস্ত ওসি-ও গায়েব! চরম বিশৃঙ্খলা আঁচ করতে পেরে শৌর্য আর নিজ ভিটের দিকে পা বাড়ায়নি। কারণ এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সে কাউকেই বিশ্বাস করে না, তা সে জন্মদাতা পিতা হোক কিংবা নিজের র*ক্তের ভাই!
_____
সেদিন হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর রোমানা ঠিক কতগুলো কিল যে আরিয়ানের পিঠে বসিয়েছিল, তার হিসাব বোধহয় খোদ আরিয়ানেরও অজানা! রোমানা পারলে ওখানেই ওর মুখে ডাক্ট টেপ এঁটে দিত। মারের চোটে আরিয়ানের সোজা পিঠটা প্রায় ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এত কিছুর পরও বউয়ের সম্মান রক্ষার্থে আরিয়ান ভেতরের পুরুষালি ইগোটা দমন করে দুই-চারটে কাউন্টার ঘুসি ঝাড়েনি। চাইলেই সে পারত, কিন্তু হঠাৎ করেই তার মাথায় উদয় হলো, প্রতিশোধ নিতে তার বউ যদি খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে দেয়? এই মেয়েকে কোনো ভরসা নেই!
কারান এখন প্রায় পুরোটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে। অসুস্থতার দিনগুলোতেও সে মিরাকে আগলে রাখতে একবিন্দু অবহেলা করেনি, আর এখন তো কথাই নেই। আপাতত মিরাকে দিনে কম করে হলেও পাঁচবার পুষ্টিকর খাবার গিলতে হচ্ছে। রুটিনটা অনেকটা এরকম—একবার কারান নিজে চামচ মেপে খাইয়ে দিচ্ছে, তো পরের বার ফাতিমা এসে হাজির। আশমিনি আর রোমানা জোড়ায় জোড়ায় এসে তদারকি চালাচ্ছে, এমনকি আসাদ চৌধুরী নিজেও নিয়ম করে হাতে থালা নিয়ে হাজির হন। এর ওপর বোনাস হিসেবে তুব্বা আর আয়াশের অতি-উৎসাহ তো আছেই! প্রথমে পুরো বাড়ির এই এলাহি কাণ্ড আর রাজকীয় আতিথেয়তা দেখে মিরা বেশ আনন্দ পেয়েছিল, কিন্তু এখন এই মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা তার গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে।
দরজায় পরপর দুটো পরিশীলিত ঠকঠক শব্দ হতেই মিরা গিয়ে দরজাটা আধখোলা করতেই থমকে গেল। সামনে ট্রের ওপর পুষ্টিকর সব খাবারের বাটি সাজিয়ে আসাদ মুখে স্নেহশীল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
মিরার চোখের মণি একদম ছানাবড়া! মাত্র আধঘণ্টা আগেই আশমিনি এসে তাকে একপ্রকার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বাটিভর্তি তাজা ফল গিলিয়ে দিয়ে গেছেন। মিরা শত অনুনয়-বিনয় করেছিল খাবে না বলে, কিন্তু আশমিনি সোজা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল—মিরা যদি প্লেট ফাঁকা করে, তবে সে আর আয়াশ এই বাড়ি ছেড়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে ফেরার সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে দেবে। অন্তত মিরার এই কনসিভ করার সংবেদনশীল সময়ে তো আশমিনি কোনোভাবেই তাকে ছেড়ে এক চুল নড়বে না।
সামনে আসাদকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিরা আতঙ্কে তোতলে উঠে বলল, "বা-ব্ব-বা...বাবা আপনি?"
"ভেতরে আসতে বলবে না?"
"না মানে... হ্যাঁ, অবশ্যই! আসুন," মিরা শুকনো মুখে ঢোক গিলে ভেতরের পথ ছেড়ে দিল। এখন কীভাবে আসাদকে মানা করা যায়, সেই বুদ্ধিই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ এই মুহূর্তে আর এক চামচ খাবার পেটে যাওয়া মানেই নিশ্চিত বমির উৎসব!
আসাদ ভেতরে এসে সোজা বিশালাকার খাটের পাশে বসলেন। থালাটা পাশের টেবিলে রেখে মিরাকে লক্ষ্য করে বললেন, "আরে তুমি এমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো, বসো।"
মিরা অতি কষ্টে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, "বাবা, আসলে... একটু আগেই কাকিমনি একগাদা ফল খাইয়ে গেলেন। বিশ্বাস করুন, এখন আমার পেটে এক ফোটা স্পেসও নেই। আই'ম কমপ্লিটলি ফুল!"
"তাই বলে বাবার হাতে একটুও খাবে না, মিষ্টি মা? তাহলে কিন্তু আমি খুব মন খারাপ করব!"
আসাদের এমন আন্তরিক আদরের সামনে মিরার সব অজুহাত নিমেষেই ভেস্তে গেল। সে বাধ্য হয়ে আসাদের পাশে গিয়ে বসল। আসাদ পরম মমতায় বাটি থেকে অল্প একটু খাবার চামচে তুলে মিরার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে স্নানঘরের কাচের দরজা ঠেলে কারান বাইরে বের হলো। তার ভেজা, বাদামি চুল থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে সুঠাম কাঁধে। অফিস থেকে এখন সে ছুটি নিয়েছে; বেশিরভাগ কাজ বাসা থেকেই সামলাচ্ছে। কারণ মিরার এই সময়ে ২৪ ঘণ্টা খেয়াল রাখাটা কারানের প্রধান দায়িত্ব। কারান তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াক-ইন ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে গেল। ক্যাজুয়াল একটা লিনেন শার্ট গায়ে গলিয়ে বোতাম আঁটতে আঁটতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এসে চুল ঠিক করার জন্য দাঁড়াল। ঘরে আসাদের উপস্থিতি দেখেও কারানের মুখে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না।
এদিকে কারানকে দেখতেই মিরা খুকখুক কাশি দিয়ে কারানের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করল, যেন কারান এসে এই অতিরিক্ত খাওয়ানোর অত্যাচার থেকে তাকে উদ্ধার করে! কিন্তু ফলাফল হলো সম্পূর্ণ উলটো!
মিরার সামান্য কাশির শব্দেই কারান আর আসাদ প্যানিকড হয়ে পড়ল! আয়নার সামনে থেকে কারান আর বেড থেকে আসাদ—দুজন একসাথে দুটো গ্লাসে মিনারেল ওয়াটার ঢেলে মিরার একদম মুখের সামনে ধরল।
মিরা বোকার মতো একবার নিজের শ্বশুরের দিকে তো আরেকবার নিজের স্বামীর দিকে তাকাতে লাগল।
কারান গ্লাসটা আরও কাছে এনে কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে শুধালো, "ঠিক আছ, সোনা? শ্বাস নিতে প্রবলেম হচ্ছে?"
অন্যদিকে আসাদও মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে ততোধিক উদ্বেগে জিজ্ঞেস করলেন, "খাবার গলায় আটকে যায়নি তো, মিষ্টি মা?"
মিরা অসহায় ভঙ্গিতে দুই দিকে মাথা নাড়ালো। এবার সে কারানের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আকুতি জানাল, যাতে সে কোনো একটা বাহানা বানিয়ে এই অতিরিক্ত খাওয়ার নির্যাতন থেকে উদ্ধার করে! কিন্তু কারান ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ঝুলিয়ে শার্টের কাপসের বোতাম আঁটতে লাগল।
কারানের এই উদাসীনতায় মিরা মনে মনে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট আর নির্দয় গালিগুলো ছুঁড়ে মারতে লাগল, লোকটা এত বুদ্ধিমান হয়েও কেন তার চোখের ভাষা বুঝতে পারছে না! অথচ কারান কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই সব আঁচ করতে পারছিল।
অবশেষে বাটির শেষ বিন্দুটুকু খাইয়ে তবেই ক্ষান্ত হলেন আসাদ। চামচটা ট্রে-তে রেখে তিনি পকেট থেকে বের করলেন কৌশিকার সেই অনন্য, দুর্লভ 'কানজাশি' কাঠিটি। সেটি মিরার কোমল তালুতে গুঁজে দিয়ে বললেন, "ধন্যবাদ, মা... আমাকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য। পুরো বাড়িটাকে পরম আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। আর... সবচেয়ে বড়ো ধন্যবাদ আমার অবাধ্য ছেলেটাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসার জন্য!"
তার এই আবেগঘন রূপ মিরা আগে কখনো দেখেনি; ফলে সে নিমেষেই কিছুটা বিহ্বল ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ল। হাতের ওপর রাখা উপহারটার দিকে মিরা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কাঠিটি এতটাই চোখধাঁধানো সুন্দর যে মিরার মনে হলো এটা কেবল জাদুঘরেই মানায়!
মিরা শ্রদ্ধার সঙ্গে বলল, "আমি আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এই উপহারের আমানত রক্ষা করব, বাবা। এমনকি আমার মৃ'ত্যুর পরও যেন এর ঐতিহ্য আর মূল্য না হারায়, আমি সেই ব্যবস্থাও করে যাব।"
আসাদ চওড়া হাসলেন। পরম স্নেহে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি দীর্ঘ পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
মিরা খেয়াল করল, কারান ততক্ষণে ল্যাপটপের মনিটর অন করে সোফায় কাজ নিয়ে বসে পড়েছে। শ্বশুরের প্রস্থানের পর মিরা আর নিজের জমে থাকা বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না। "আমি সত্যি ভীষণ বিরক্ত, কারান! এই বাড়ির কোনো কাজে আমাকে কেউ হাত পর্যন্ত দিতে দিচ্ছে না। সারাদিন একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি, শুধু খাও আর ঘুমাও! এভাবে একটা মানুষ বেঁচে থাকতে পারে?"
"থাকতে হবে," কারান ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রুত হাতে আঙুল চালাতে চালাতেই বেশ শান্ত গলায় বলল।
মিরা বাঘিনির মতো তীক্ষ্ণ চোখে কারানের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদিকে কারান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই শুধালো, "ড্যাড ওটা কী দিলেন?"
"জানি না!" মিরা চরম ক্ষোভ নিয়ে মুখ ঘোরালো।
"আচ্ছা!"
মিরা সোজা দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, "আচ্ছা? ওহ, বুঝেছি! এখন তো আর আমাকে ভালো লাগবে না, তাই না? কিছুদিন পর যখন একদম পান্ডার মতো গোল হয়ে যাব, তখন তো চেহারা দেখলেও বিরক্তি লাগবে!"
কারান মুখ টিপে হাসলেও নিজের গম্ভীর ভাবমূর্তি বজায় রেখে শান্তভাবে জবাব দিল, "ওই কিছুদিন আসতে এখনো অনেক দেরি। ইউ আর জাস্ট অন ইওর সেকেন্ড মান্থ, মাই ডিয়ার।"
"বাড়ির প্রত্যেকেই আমাকে কিছু না কিছু উপহার দিল, অথচ আমার নিজের স্বামীই আমাকে কিচ্ছু দিল না! আমি কীভাবে বুঝব যে তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো?"
কারান এবার কাজ থামিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল। তার ধারালো চোখের দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল মিরার ওপর। বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "আমার ভালোবাসা নিয়ে তোমার মনে কোনো সন্দেহ আছে, মিরা?"
"আলবাত আছে! কেন থাকবে না বলো?" মিরা হাতের আঙুল গুনতে গুনতে ঝরঝর করে বলতে লাগল, "কাকিমনি কত সুন্দর একটা শাড়ি আর সাথে ম্যাচিং ব্যাগ দিলেন! এমনকি বলে দিয়েছেন, মেয়ে নাকি ছেলে হবে সেটা জানার পর নাকি আসল উপহার দেবেন। কাকাই দিলেন ডায়মন্ডের ব্যাঙ্গেলস! রোমানা ভাবি আর আরিয়ান ভাইয়া একটা পোলারয়েড ক্যামেরা আর কাস্টমাইজড মেমোরি অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন, যাতে প্রতিটা মাসের পেটের ছবি তুলে জমিয়ে রাখতে পারি। ওই যে দেখো সেই অ্যালবামটা!"
কারান মিরার নির্দেশিত সাইড টেবিলের দিকে তাকাল। সেখানে রাজকীয়ভাবে সাজানো অ্যালবামের প্রথম পাতায় সাদা-কালো সোনোগ্রাফির এক ছোট্ট ভ্রূণের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যটা অসম্ভব কিউট।
মিরা বলতে লাগল, "মা তো নিজের হাতে কত রকমের টক-মিষ্টি আচার বানিয়ে পাঠিয়েছেন! আর এই ইউনিক লকেটটাও দিয়েছেন। যতটুকু শুনলাম, এটার ডিজাইন নাকি মাহি নিজে করেছে!"
কথাটা শেষ করে মিরা নিজের গলার সূক্ষ্ম সোনার চেইনটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। চেইনের ঝুলন্ত লকেটটায় অতি সূক্ষ্ম খোদাইয়ে ফুটে উঠেছে ভ্রূণের প্রথম আল্ট্রাসাউন্ডের হৃৎস্পন্দনের ওয়েভলাইন।
মিরা হাসতে হাসতে যোগ করল, "আর বাবা নাকি নিজ হাতে তার নাতি বা নাতনির জন্য দোলনা বানাতে লেগে পড়েছেন! মা তো এর মধ্যেই বাচ্চার ছোট্ট ছোট্ট জামাকাপড় সেলাই করা শুরু করে দিয়েছেন। আর মাহি যে কী লেভেলের এক্সসাইটেড, ও খালামণি হচ্ছে এই নিউজ মনে হয় পুরো মতিঝিলের প্রতিটা মানুষ জেনে গেছে! ও নাকি অলরেডি আনবর্ন বেবির জন্য ইমোশনাল লেটার লেখাও স্টার্ট করে দিয়েছে! আর ফুঁপির কথা কী বলব? বাচ্চার বালিশ, কাঁথা থেকে শুরু করে বেবি-সেটের যাবতীয় সব মনে হয় উনি নিজেই বানিয়ে ফেলবেন!"
একনিশ্বাসে সবকিছু বলে মিরা কারানের চোখের দিকে একদম সোজাসুজি তাকাল। কণ্ঠে চূড়ান্ত দাবি আর অভিমান মিশিয়ে বলল, "আর তুমি? তোমার তরফ থেকে আমার গিফট কই?"
কারান দুই হাত মাথার ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বেশ আমোদভরা কণ্ঠে বলল, "পিওর অ্যান্ড ফ্রেশ গ্যামেট! এটা আমি ছাড়া এই ধরণির আর কেউ তোমাকে দিতে পারত না, আর পারবেও না।"
কারানের এমন নির্লজ্জ, লাগামহীন কথায় মিরা মুহূর্তে লজ্জায় আরক্ত হয়ে লাল হয়ে উঠল। রেগে গিয়ে হাতের কাছে থাকা নরম বালিশটা সোজা কারানের দিকে ছুঁড়ে মারল। কারান হাত বাড়িয়ে বালিশটা লুফে নিল, এবং সেটা সোফায় রেখে তার দিকে এগিয়ে এলো।
মিরা অভিমানভরে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, "পুরো পৃথিবী মিলে হাজারটা উপহার এনে দিলেও আমার মন ভরবে না, কারান। অন্তত মাতৃত্বের এই সুন্দর মুহূর্তে আমার লোভী মন তার স্বামীর কাছ থেকে কিছু একটা পেতে চাইছে। এই মুহূর্তটা আমার জন্য কতটা স্পেশাল, তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। তুমি নাকি সেদিন আমার জন্য উপহার কিনতেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলে? তাহলে কোথায় সেটা? তুমি কি জানো, আমি কতটা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম?"
কারান পেছন থেকে এক হাতে তার কোমরটা প্যাঁচিয়ে ধরল। অন্য হাতটা বাড়িয়ে মিরার চোখের সামনে ধরে রাখল এক অপূর্ব কাস্টমাইজড আওয়ারগ্লাস। মিরা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল। বালুকাঘড়ির ওপরের অংশ থেকে ধীরে ধীরে তলার দিকে গলিত সোনা গড়িয়ে পড়ছে।
মিরা চরম বিস্ময়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শুধালো, "এটা... এটা কী, কারান? মানে, হঠাৎ বালুকাঘড়ি কেন?"
"এই নশ্বর পৃথিবীতে একমাত্র সময়কেই কোনো অমূল্য রত্ন দিয়ে কেনা যায় না, বেগম। বাট ফর ইউ... আই জাস্ট ফ্রোজ ইট। আগামী আট মাসের প্রতিটা সেকেন্ড, এই বালুঘড়ির প্রতিটি সোনালি বালুকণা ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, আমার সমগ্র রাজত্ব আর আমার অস্তিত্ব শুধু তোমার আর আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য উৎসর্গ করলাম।"
মিরা একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সত্যি বলতে, সে ভেবেছিল কারান হয়ত প্রচলিত ধারায় তাকে কোনো ডায়মন্ড সেট বা ওয়েস্ট-চেইন গিফট করবে। কিন্তু এই রাজকীয় আওয়ারগ্লাসের অর্থ যে এত গভীর হতে পারে, তা তার কল্পনার অতীত ছিল!
মিরা আওয়ারগ্লাসের নিচের প্ল্যাটিনাম বেসে তাকাল। সেখানে এনগ্রেভ করা অক্ষরে লেখা রয়েছে: 'It took 8 months to bring our universe into reality, but every drop of this gold is frozen for you, forever.'
ঠিক তখনই কারান একটি ব্ল্যাক ফোল্ডার বের করে মিরার দিকে ধরল। সেটি ছিল ক্যারিবিয়ান সাগরের এক নির্জন প্রাইভেট আইল্যান্ডের মালিকানার সার্টিফাইড আইনি দলিল। বর্তমানে এটি মিরার নামে নিবন্ধিত হলেও ভবিষ্যতে তা তাদের অনাগত সন্তানের নামে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
মিরা বিস্ময়বিস্ফোরিত চোখে সেই দাপ্তরিক কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে পরম নিবিড়তায় কারানের শক্ত, প্রশস্ত বুকে নিজের মাথাটি এলিয়ে দিয়ে বলল, "আমার জীবনটাকে এত মায়াময় আর সুন্দর করে তোলার জন্য ধন্যবাদ, স্বামী।"
কারান স্নিগ্ধ হেসে পরম অনুরাগে মিরার ললাটে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে এক দীর্ঘ চুম্বন আঁকল।
এরপর কারান হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসল। খুব যত্ন করে মাথাটা মিরার উদরের ওপর রাখল। চোখ দুটো আপনা-আপনিই বুজে এল। বাইরের পৃথিবী তাকে এক নির্মম, নির্দয় মানুষ হিসেবে চেনে; যার চোখে ভয়, হাতে র*ক্ত আর সিদ্ধান্তে কোনো দ্বিধা নেই। অথচ এই একটি স্পর্শই যেন তার ভেতরের সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে গলিয়ে জল করে দিল। মনে হলো, বুকের গভীরতম কোনো কোণে লুকিয়ে থাকা ওই এক ফালি কোমলতা শুধু মিরা আর তাদের এই অনাগত স্পন্দনের জন্যই আজীবন তোলা ছিল।
আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে পেটের ওপর বৃত্ত আঁকতে আঁকতে সে মৃদু হেসে বলল, "হেই, লিটল হার্ট... পাপা বলছি। কেমন আছো ভেতরে? ওখানকার ওয়েদার কেমন? চিল করছ তো? আশা করি রেন্ট-টেন্ট বেশি নিচ্ছে না!"
নিজের কথাতেই সে হালকা হেসে ফেলল। তারপর আঙুল দিয়ে খুব আস্তে একটা টোকা দিল।
"শোনো জুনিয়র, খুব ইমপর্ট্যান্ট একটা রুল আছে। পৃথিবীতে ল্যান্ড করার আগেই এটা মগজে ঢুকিয়ে নাও, মাকে একদম কষ্ট দেওয়া যাবে না। লাথি মারতে খুব ইচ্ছে করলে একটু জমিয়ে রাখো। বাইরে এসো, তারপর পাপার সঙ্গে ওয়ান-অন-ওয়ান ফেয়ার ফাইট হবে। তখন যত খুশি পাঞ্চ মারো, কিক মারো, চুল টানো, আই প্রমিস, পাপা একটুও কমপ্লেইন করবে না। কিন্তু মায়ের বেলায়? বিগ নো।" একটু থেমে দুষ্টু গলায় আবার বলল, "আর একটা কথা... তোমার মা দেখতে যতটা শান্ত, রাগ করলে কিন্তু একদম সুনামি। তাই আমরা বাপ-বেটা আগে থেকেই একটা সিক্রেট অ্যালায়েন্স করে রাখি, কেমন? মিশন একটাই, মাকে শুধু হাসিয়ে রাখা। কাঁদানোর দায়িত্ব পৃথিবীর কাউকেই দেওয়া হয়নি। ডিল?"
এবার সে ঢোক গিলে মিরার শাড়ির অংশ সরিয়ে উদরের নরম চামড়ায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "তাড়াহুড়ো নেই, প্রিন্স অর প্রিন্সেস। তোমার মা-ও দুনিয়ার প্রায় সব কাজেই একটু দেরি করে। তুমিও যদি একটু দেরি করো, বুঝব ডিএনএ ঠিকঠাকই কাজ করছে। সময় নিয়ে এসো। তবে যখনই আসবে, মনে রেখো, এই ক্রুয়েল পৃথিবীতে তোমার জন্য সবচেয়ে সেফ জোন হবে পাপার এই দুই হাত... আর সবচেয়ে বিউটিফুল জায়গাটা হবে তোমার মায়ের কোল। যেদিন প্রথমবার তোমাকে কোলে নেব, সেদিন হয়ত পৃথিবী বদলাবে না। বদলে যাবে শুধু আমার পৃথিবী। ততদিন... উই উইল বি ইগারলি ওয়েটিং ফর ইউ, মাই লিটল মিরাকল!"
কথাগুলো শেষ করে কারান মিরার কোমরটা দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার পেটে মুখ গুঁজে রইল। ধীর কণ্ঠে আওড়ালো, "মাই মাদার গেইভ মি দ্য ওয়ার্ল্ড... বাট ইওর মাদার উইল গেইভ মি মাই ওউন ওয়ার্ল্ড!"
অনুপম এই ভালোবাসার বন্যায় মিরার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কারানের ভেজা ও সুবিন্যস্ত চুলে মিশে গেল। মিরা কাঁপানো আঙুলে কারানের নরম চুলে হাত বোলাতে লাগল। যে লোকটা একসময় সন্তান বা পারিবারিক বাঁধনের নাম শুনলেই বিরক্তি প্রকাশ করত, সেই কঠোর কারান আজ পিতা হওয়ার আবেগে এত ব্যাকুল আর উদ্গ্রীব হতে পারে, তা ভাবতেই মিরার বুকটা অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
______
"কী হয়েছে বলো তো কারানের?"
"আমিও কিছু বুঝতে পারছি না, ভাবি! ও তো সচরাচর অসুস্থ হওয়ার পাত্র নয়। কিন্তু ইদানীং ওর শরীরের অবস্থা দেখে আমার সত্যিই ভীষণ চিন্তা হচ্ছে।"
কারান অ্যাটাচড ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে বের হয়ে এলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মোছার পরও তার চোখ-মুখের ক্লান্ত ভাবটা স্পষ্ট ফুটে উঠছে। বাসার কেউ ঠিক আঁচ করতে পারছে না আসলে ঘটনাটা কী! প্রথম দিকে সবাই ভেবেছিল, হয়ত প্রেগন্যান্ট বউ আর অনাগত বাচ্চাকে নিয়ে অতিরিক্ত মেন্টাল প্রেসার আর ওভারথিংকিংয়ের মাশুল দিচ্ছে সে। কিন্তু ইদানীং তার খাবারে অরুচি, পেশিতে সার্বিক ক্লান্তি, এমনকি রাতের স্বাভাবিক ঘুমটাও উবে গেছে। মধ্যরাতে হুটহাট জেগে উঠে অস্থিরভাবে বারবার মিরাকে পরীক্ষা করে, ওর পেটে হাত দিয়ে বাচ্চার স্পন্দন ঠিক আছে কি না নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, গর্ভাবস্থায় মিরার যে ধরনের মেজাজ পরিবর্তন বা গা-গোলানো শারীরিক উপসর্গ হওয়ার কথা, সেই অদ্ভুত লক্ষণগুলো কারানকে ধরেছে!
মিরার উদ্বেগজনক কথার উত্তরে কারান বলল, "এত ভাবনার কিছু নেই, আমি একদম ঠিক আছি। ভাবি, স্যুপটা কি একটু বানিয়ে নিয়ে আসবেন, প্লিজ? শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে... মনে হচ্ছে ঠিকভাবে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই! আমি এখনই রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসছি," রোমানা একচিলতে হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এদিকে মিরা কারানের এমন অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে বিছানা থেকে উঠতে উদ্যত হতেই কারান দ্রুত এগিয়ে এলো, "কী লাগবে বলো?"
"ধুর! আমি তো একদম ঠিক আছি। তুমি আগে নিজের দিকে তাকাও! তুমি কি সত্যিই ঠিক আছ?"
মিরার চোখেমুখে তার জন্য এই ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা দেখে কারানের সমস্ত শ্রান্তি এক মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কারান হালকা হেসে মিরার একদম মুখোমুখি ঝুঁকে এলো। পাশের টেবিল থেকে ক্র্যাব ক্ল কাঁকড়া ক্লিপ নিয়ে মিরার পিঠে ছড়িয়ে থাকা রেশমি চুলগুলো আলতো হাতে গুটিয়ে বেঁধে দিল। মিরার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে পরম অনুরাগে বলল, "একদিন আমি পুরো পৃথিবীটাকে নিজের কাঁধে তুলে নিতে চাই, বেগম।"
মিরা ভ্রূ সামান্য কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "পুরো পৃথিবী?"
"হ্যাঁ... তুমি আর আমাদের সন্তান! তোমরাই তো আমার পুরো পৃথিবী।"
মিরার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে আবদারের সুরে বলল, "তাহলে আর দেরি কীসের? তোলো!"
কারান পরম আবেশে মিরাকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুডোরে তুলে নিল। "শুধু দেখে যাও! খুব জলদি এমন একটা দিন আসবে, যেদিন আমার ডান বাহুতে থাকবে তুমি আর বাম বাহুতে আমাদের সন্তান... ইউ আর দ্য অনলি লাভ অফ মাই লাইফ, মিরা। এভরিথিং আই হ্যাভ অ্যান্ড এভরিথিং আই অ্যাম... ইজ টোটালি ইওরস।"
মিরা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে কারানের গলার ভাঁজে মুখ লুকাল। কারান মিরাকে নিজের প্রশস্ত বুকের সঙ্গে একদম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে কয়েক সেকেন্ড বুঁদ হয়ে রইল। চোখ দুটো বুজে সে নিজেকে পৃথিবীর সবচাইতে সুখী ও সম্পূর্ণ পুরুষ হিসেবে অনুভব করতে লাগল।
ঠিক সেই স্বর্গীয় মুহূর্তে দরজায় হালকা কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো। রোমানা বাটি হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসছে।
মিরা আর কারান দুজনেই চমকে উঠে চোখ মেলল। মিরার ফরসা মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল! কিন্তু কারান একদম ভাবলেশহীন মুখে মিরাকে সাবধানে বিছানায় নামিয়ে বসাল।
রোমানা ঘরে ঢুকে কিছুটা মজা নেওয়ার ভঙ্গিতে কারানের হাতে স্যুপের বাটিটা বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই হুট করে ঘরে এসে হাজির হলো আরিয়ান!
আরিয়ানকে সামনে দেখেই কারানের মেজাজ চড়ে গেল। হাসপাতালের সেই বেহায়াপনার কাণ্ড সে বিন্দুমাত্র ভোলেনি! তবে এখন নিজের ভেতরের বিরক্তিটুকু চেপে রেখে সে চামচ ভরে মিরাকে স্যুপ খাইয়ে দেওয়ার কাজে মন দিল।
আরিয়ান রুমে ঢুকেই কোনো লোকলজ্জার পরোয়া না করে পেছন থেকে রোমানাকে জড়িয়ে ধরল!
রোমানা চরম বিরক্ত আর অস্বস্তিতে পেছনে না তাকিয়েই আরিয়ানের পায়ে কষে একটা লাথি বসাল! তবুও আরিয়ানের হাতের বাঁধন আলগা হলো না। আরিয়ান উলটো রোমানার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে হুমকি দিল, "আরেকটা লাথি যদি মেরেছ মাই ডিয়ার ওয়াইফ, তবে সোজা কোলে তুলে নিজের রুমে নিয়ে খাটে আছাড় মারব! দেন ডোন্ট সে দ্যাট আই ডিডন্ট ওয়ার্ন ইউ ফাস্ট!"
রোমানার শ্বেতশুভ্র গালে তৎক্ষণাৎ লজ্জার চরম রক্তিম আভা ফুটে উঠল। অন্যদিকে মিরা চামচ ভরে স্যুপটুকু মুখে পুরে নিচ্ছে, তার হাবভাব এমন, যেন সে এই আলাপের কোনো শব্দই শুনতে পায়নি! কারানের তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি যদিও পুরোপুরি তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর দিকেই স্থির ছিল, তবুও বড়ো ভাইয়ের এই অবিরাম কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় সে সামান্যতম অবাকও হলো না। পরিবারের সবাই খুব ভালো করেই জানে যে আরিয়ানের মস্তিষ্কে বাস্তবতাবোধের বালাই অত্যন্ত কম। অবশ্য বউয়ের সামনে যেখানে কারানের নিজের মুখেরই কোনো লাগাম থাকে না, সেখানে তার র*ক্তের ভাইয়ের থেকে ভদ্রতা আশা করাটাও এক ধরনের বোকামি!
রোমানা কপালে রগ ফুলিয়ে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে আরিয়ানের দিকে কটমট করে তাকাল। কিন্তু আরিয়ান স্বাভাবিক গলায় হেসে বলে উঠল, "এভাবে হিংস্র চোখে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই, সুইটি! মিরা হয়ত টাইমিংয়ের দিক থেকে এগিয়ে গিয়ে আগে প্রেগন্যান্ট হতে পেরেছে, কিন্তু আগে বাবা হওয়ার খেতাবটা দিনশেষে আমার পকেটেই ঢুকবে, মিলিয়ে নিও! কারানের অনাগত বাচ্চা এই দুনিয়ায় ল্যান্ড করার আগেই আমি নিশ্চিত করব যেন আমার বাচ্চা ওর কোলে গান গাইতে গাইতে হিসু করে দিতে পারে! তাই আর এক মুহূর্ত ওয়েস্ট না করে চলো রুমে যাই, আজ রাতেই কামতামাম খালাস করব!" কথাটা শেষ করেই সে রোমানাকে আরও বাহুডোরে চেপে ধরল।
"আমার কনুই কিন্তু ঠিক এমন এক জায়গায় পজিশন করা আছে আরিয়ান, যেখানে একটা সলিড ঘুসি বসিয়ে দিলে তোর বাবা হওয়ার সমস্ত খায়েশ আজ রাতের মধ্যেই চিরতরে খালাস হয়ে যাবে!"
আরিয়ান ভ্রূ উঁচিয়ে ভেংচি কেটে বলল, "তোমার এসব দুই আনার সস্তার ঘরের বস্তাপচা পুরোনো ডায়ালগ শুনে এই আরিয়ান চৌধুরি আর ভয় পায় না, বুঝলে? আমি যে আসলেই সিংহের প্রজাতি, সেটা আজ রাতেই তোমাকে হাতে-কলমে প্রুভ করে ছাড়ব!"
রোমানা ক্ষোভে কিছু একটা পালটা ছুঁড়ে মারার আগেই হুট করে কারানের গা গুলিয়ে তীব্র বমি ভাব ধেয়ে এলো তার গলার কাছে! কারণ মিরাকে খাইয়ে দেওয়ার শুরুতেই স্যুপটি অতিরিক্ত উত্তপ্ত কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য কারান নিজেও মুখে নিয়ে টেস্ট করেছিল। ওদিকে ঠিক একই মুহূর্তে মিরার পাকস্থলীও উলটে এলো! দুজনই প্রায় একসাথে ছুট লাগাল অ্যাটাচড ওয়াশরুমের দিকে।
পরক্ষণেই বেসিন থেকে দুজনের অবিরত উগড়ে দেওয়ার বীভৎস আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রোমানা আর আরিয়ান সম্পূর্ণ হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।
আরিয়ান চোখ দুটো ছানাবড়া করে হা করে বলল, "এই স্যুপটা তুমি বানিয়েছ, তাই না?"
রোমানা একদম বোকা বনে গিয়ে বলল, "হ্যাঁ মানে... বানালাম তো আমিই! কিন্তু গড প্রমিস, আমি তো অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর আর তাজা সবজি দিয়েই তৈরি করলাম! ওদের দুজনের একসাথে এভাবে বমি আসছে কেন?"
"উঁহুঁ, আমার তো ডাউট হচ্ছে! তুমি নিশ্চিত স্যুপটা আমার পেট খারাপ করানোর জন্য বানিয়েছিলে, কিন্তু ভুলবশত ওদের কাছে চলে গেছে, রাইট? কোনো বিষ-টিষ ঢালোনি তো? নাকি রাঁধার সময় কোনো আরশোলা টুপ করে পড়ে গিয়েছিল ভেতরে? দাঁড়াও, আমি পরীক্ষা করে দেখছি!"
আরিয়ান সম্পূর্ণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বাটির দিকে পা বাড়াল। রোমানা নিজের দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে বেঁধে মুখ বিকৃত করে তার পতিদেবের এই মহামানবীয় পরীক্ষা দেখতে লাগল। আরিয়ান বাটি থেকে চামচ ভরে স্যুপটির দিকে তাকাল। ঘন, সুবাসিত স্যুপটিকে বেশ সুস্বাদু আর লোভনীয় বলেই মনে হলো। অনেকদিন হলো বউয়ের হাতের কোনো রান্না তার পেটে পড়েনি। সে কোনো তোয়াক্কা না করে এক চামচ মুখে পুরে দিল। সোয়াদ পেতেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—অপূর্ব স্বাদ! কোনো ক্ষতিকারক গন্ধ বা কেমিক্যাল নেই। সে তৃপ্তি নিয়ে আরও দুই চামচ গিলে ফেলল।
"কী রে, শ'য়তান? ম'রলি না যে এখনো? বিষ মিশিয়েছি না আমি! এবার তোকে আমি নিজে কবরে পাঠাব!"
আরিয়ান নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, "তাই তো! আমার পেটে তো কোনো বিক্রিয়া হচ্ছে না! একদম অ্যামেজিং টেস্ট!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুমের দরজায় শব্দ হলো। মিরা আর কারান দুজনই ক্লান্ত শরীরে ধীরপায়ে বের হয়ে এলো। তবে মিরার চেয়ে কারানের অবস্থা দৃশ্যমানভাবে অনেক বেশি শোচনীয়! তার ফরসা মুখমণ্ডল যেন এক লহমায় ফ্যাকাশে আর র'ক্তশূন্য হয়ে পড়েছে। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা তো দূরের কথা, কারান মিরাকেই পুরোপুরি ধরে রাখতে পারছে না; বরং মিরা নিজেই নিজের কাঁধে কারানের ভারী দেহের ওজন সামলে তাকে ধরে ধরে এনে সোফায় বসাল। মিরা পাশে বসে নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে কারানের কপালে জমে থাকা ঠান্ডা ঘাম আলতো করে মুছে দিতে লাগল।
ঠিক তখনই আরিয়ান এক হাত উঁচিয়ে আবিষ্কর্তার মতো চ্যাঁচামেচি করে উঠল, "হেই! আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে! মিরার পাশাপাশি কারানও আবার প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল না তো? এই দেখি দেখি, তোর পেট ফুলেছে কি না!"
আরিয়ানের এই অভাবনীয় আর চরম মূর্খতাপূর্ণ ডায়ালগ শুনে মিরা, রোমানা এবং কারান—তিনজনই একসাথে তার দিকে তীব্র চোখে তাকাল। বিশেষ করে কারানের চোখের হিংস্র ও র*ক্তচক্ষু চাহনি দেখে মনে হলো, সুযোগ পেলে সে আরিয়ানকে জ্যান্ত চিবিয়ে হাড়গুড় চূর্ণ করে ফেলবে!
______
হুইলচেয়ারে উপবিষ্ট শৌর্য আক্রোশে আর অদম্য হিংস্রতায় সামনের ঝুলন্ত চামড়ার পাঞ্চিং ব্যাগটার ওপর একের পর এক মুষ্টিপ্রহার চালিয়ে যাচ্ছে! আঘাতের গতি এতটাই শানিত যে এক পলকেই সে অন্তত ১০টি প্রাণঘাতী ঘুসি বসিয়ে দিল। তার বাম হাতের আঙুল চিরতরে বিচ্ছিন্ন; ফলে কেবল ডান হাতের শক্তির ওপর নির্ভর করেই সে তার পুরো শরীরের সমস্ত জমাটবদ্ধ ক্ষোভ ঝাড়ছে।
রাগের তীব্রতায় তার প্রতিটি পেশি থরথর করে কাঁপছে। পরনে কোনো আপার-ওয়্যার নেই, শুধুই একটি কালো শর্টস। তার সুঠাম, ফরসা ও সুগঠিত পুরুষালি শরীরের প্রতিটা শিরা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোয়াল দুটো ধাতব পাতের মতো শক্ত ও চেপে বসা। কপাল আর পিঠ বেয়ে ঘামের চকচকে ধারা গড়িয়ে পড়ছে।
"কীভাবে... কীভাবে ও প্রতিবার আমার প্রতিটা সিক্রেট লোকেশন জেনে যায়? আমি কী মুভমেন্ট নিচ্ছি, আমার পরবর্তী ব্লু-প্রিন্ট কী, সবটা ও আগে থেকেই ট্র্যাক করে কীভাবে? ফা*ক! আআআ..." রাগের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে সে সজোরে আবার পাঞ্চিং ব্যাগে একটা প্রচণ্ড ঘুসি মারল।
এটি শৌর্যের নিজস্ব আল্ট্রা-সিক্রেট পেন্টহাউসের পার্সোনাল জিমনেসিয়াম। স্থানটি সুরক্ষিত এবং সম্পূর্ণ নির্জন; এখানে কোনো দ্বিতীয় মানুষের প্রবেশাধিকার অসম্ভব। শৌর্যের ঘন চুল বেয়ে ঘামের ফোঁটা এসে তার ধারালো চোখের পাতায় পড়ছে।
সে বিড়বিড় করে দাঁত কিড়মিড় করল, "আই সোয়্যার... জাস্ট একবার যদি জানতে পারি তুই কে..."
"তাহলে কী করবি, শৌর্য?"
নিজের চরম সুরক্ষিত নিজস্ব সীমানায় হঠাৎ এই গভীর, নিরেট ও শান্ত কণ্ঠস্বর শুনে জীবনে প্রথমবার শৌর্যের মেরুদণ্ড বেয়ে হিমশীতল ভয়ের স্রোত বয়ে গেল! তার শরীর সামান্য কেঁপে উঠল। সে দ্রুততার সাথে হাত দিয়ে হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে সামনে তাকাল।
ছায়াবৃত ঘরের বিপরীত পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘকায় অবয়ব। লোকটার ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া উঁকি দিচ্ছে, আর ডান হাতে ঝুলছে চেইন শো! এই মারাত্মক অস্ত্রটি লোকটা প্রতিবারই সাথে বহন করে আনে। কেবল এটি চালু করে গড়গড় শব্দটা শোনায়, কিন্তু আজ পর্যন্ত শৌর্যের গায়ে স্পর্শ করায়নি। কিন্তু এর উপস্থিতিই পুরো বায়ুমণ্ডলে পৈশাচিক আতঙ্কের জন্ম দেয়।
শৌর্য নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, "কাপুরুষদের মতো আমার ছায়ার পেছনে লুকিয়ে ফালতু ফলো-আপ না করে আমার চোখের সামনে নিজের কুৎসিত চেহারাটা তোল! তোকে আজ এই জমিনে বসিয়েই আসমান ঘুরিয়ে আনব!"
ফারহান ঠোঁটে চেপে রাখা জ্বলন্ত সিগারেটটি মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। তারপর বুট জুতোর শক্ত তলা দিয়ে সেটাকে পিষে নিভিয়ে দিল। সে মন্থর পদক্ষেপে আলো-আঁধারির সীমানা টপকে সামনে এসে দাঁড়াল। আলোয় ফারহানের নির্দয়, সুগঠিত ও চেনা মুখাবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতেই শৌর্যের বুকের ভেতর যেন শত ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক লাগল! তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো।
ফারহান তার বিষণ্ন চোখ দুটি শৌর্যের ওপর নিবদ্ধ করে কুটিল হাসি হাসল। একদম গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "বাইশ বাচ্চার বাপ হওয়ার যে খেলাটা কুইনের সাথে খেলতে চেয়েছিলাম... আজ সেই খেলাটা হুবহু উলটো দিক থেকে তোর সাথেই রিপিট করব।"
🍁চলবে?🍁
ভালো বাচ্চাদের মতন বড় বড় কমেন্ট করবেন উখে? আপনাদের লেখিকা মনি আপা এত শব্দ কেমনে লেখে ভাই?আজকেও একসাথে পুরাটা দিতে পারলাম নট, অনেক বড়🙂🙌
~তমু
[ আইডির মালিক : এই পার্টের পর লেখিকা এখনো কোনো পার্ট দেয়নি তাই দয়া করে অপেক্ষা করুন পরবর্তী পার্টের জন্য। এবং উপন্যাসটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে অনুগ্রহ করে আমায় কমেন্ট করে জানাবেন। ]