*দুপুর ২:১৫ - ঢাকা মেডিকেল, মানসিক ওয়ার্ড, ৩য় তলা*
লম্বা করিডোর। সিলিং ফ্যান ঘুরে। দেয়ালে "শান্ত থাকুন" লেখা।
ওষুধ আর ডেটলের গন্ধ চারদিকে।
মায়া।
হাতে একটা নীল পলি ব্যাগ। ভিতরে:
কাঁচা আম - নীরার সবচেয়ে ফেভারিট। ছোটবেলায় লবণ-মরিচ দিয়ে খাইতো
২টা আপেল এক প্যাকেট চকলেট বিস্কুটএকটা ছোট খাতা আর কলম - নীরা আগে ডায়েরি লিখতো
পা কাঁপে। ৮ মাস ১২ দিন পর আসছে।
নার্স স্টেশনের আয়া: _"কার কাছে যাবেন মা?"_
*মায়া: "১৪ নাম্বার। নীরা চৌধুরী।
আয়া মুখ গম্ভীর করে: "ওই রুমের মেয়েটা? ও তো কারো সাথে কথা কয় না।যান, ৫ মিনিট। বেশি সময় দেয় না।"
মায়া মাথা নাড়ে। ১৪ নাম্বার রুমের সামনে দাঁড়ায়।
দরজায় ছোট জানালা। ভিতরে তাকায়।
---
*[রুমের ভিতর]*
সাদা দেয়াল। একটা খাট। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।
জানালা দিয়ে রোদ আসতেছে।
আর সেই রোদের মধ্যে চেয়ারে বসে "নীরা"।
২২ বছর। কিন্তু চেহারায় বয়স ৩৫ এর ছাপ।
চুল এলোমেলো, পিঠ পর্যন্ত। গায়ে হালকা নীল হাসপাতালের ড্রেস।
হাতে পুরান কাটার দাগ। সুইসাইডের।
ও জানালার কাঁচে আঙুল দিয়ে কি যেন লিখে, আবার মুছে ফেলে।
মায়া দরজা ঠেলে ঢুকে।
"ক্যাঁচ" শব্দ।
নীরা ঘোরে না।
মায়া টেবিলে ব্যাগটা রাখে। হাত কাঁপে।
মায়া: "আপু..."
নীরা চুপ।
মায়া ব্যাগ থেকে কাঁচা আম বের করে।
ছোটবেলার মতো লবণ-মরিচ মাখায়।
মায়া: "আপু দেখো।তোমার ফেভারিট কাঁচা আম আনছি। মনে আছে? ছোটবেলায় আমরা ছাদে বসে খাইতাম। তুমি বলতা 'মায়া বেশি ঝাল দে'।আর আমি বলতাম 'আপু পেটে ব্যথা হবে'। মনে আছে?"
নীরা কোনো সাড়া দেয় না।
মায়া আমের টুকরা নীরার মুখের কাছে ধরে।
মায়া: "খাও আপু। প্লিজ। একটা কামড়। আমার জন্য।"
নীরা মুখ ঘোরায়। খায় না।
মায়ার চোখে পানি। টপ করে আমের উপর পড়ে।
মায়া: "আপু আমি মায়া। তোমার ছোট বোন। তুমার নাম নীরা। আমার বড় আপু।আমরা একসাথে বড় হইছি। এক বিছানায় ঘুমাইছি। তুমি আমাকে রাতে ভূতের গল্প শুনাইতা। আর আমি ভয়ে তোমাকে জড়ায় ধরতাম। মনে আছে আপু?"
নীরা আঙুল দিয়ে কাঁচে লিখে: "ব্যথা"
তারপর মুছে ফেলে।
মায়া খাতা-কলম বের করে।
মায়া: "আপু, তুমি আগে ডায়েরি লিখতা না? এই নাও খাতা।কিছু লিখবা? আমাকে নিয়ে লিখো। লিখো 'আমার বোন মায়া'।"
নীরা খাতার দিকে তাকায়। হাত বাড়ায় না।
মায়া গলা ধরে আসে: "আপু, ৮ মাস আগে... ওই রাতে তোমার সাথে কি হইছে আমি জানি। ৪ জন। রনি আর ওর বন্ধুরা। ওরা তোমাকে...ভিডিও করছে আপু। তারপর ফেসবুকে ছাড়ছে। সবাই দেখছে।"
নীরা হঠাৎ কেঁপে উঠে।
নীরা: "না... না... ছাইড়া দাও... প্লিজ..."
দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে।
মায়া: "আপু শান্ত হও। আমি আছি। আমি মায়া। তোমার বোন। ওরা আর আসবে না।প্রমিজ।"
নীরা: "ময়লা... আমি ময়লা...আমাকে ছুঁইও না..."
মায়া কেঁদে ফেলে।
মায়া: "না আপু তুমি ময়লা না। তুমি আমার আপু। তুমি সবচেয়ে ভালো। ওরাই খারাপ। ওদের বিচার হবে আপু। হবেই।"
নীরা হঠাৎ মায়ার দিকে তাকায়। ৩ সেকেন্ড।
চোখে পানি। তারপর আবার জানালা।
নীরা ফিসফিস: "...মায়া?"
মায়া চমকে উঠে।
মায়া: "হ্যাঁ আপু! আমি মায়া! তুমি আমাকে চিনছো?? আবার বলো আপু। প্লিজ।"
নীরা আর কিছু বলে না। চুপ।
দরজায় নক। নার্স।
নার্স: "ম্যাডাম সময় শেষ। ও এখন অস্থির হইতেছে। ইনজেকশন দিতে হবে।"
মায়া উঠে দাঁড়ায়। চোখ মুছে।
মায়া: "আপু আমি আবার আসবো। প্রতিদিন আসবো। আম আর বিস্কুট নিয়ে আসবো। তুমি কথা বলবা আমার সাথে প্রমিজ?"
নীরা উত্তর দেয় না।
মায়া দরজার কাছে গিয়ে আবার পিছনে তাকায়।
মায়া: "আপু, যারা তোমার এই অবস্থা করছে...ওদের ছাড়বো না।কেউ না।"
বের হয়ে আসে। করিডোরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে।
ব্যাগের আমগুলা ভিজে যায় চোখের পানিতে।তবুও মুখে হাসি আর হেসে বিড়বিড় করে বলে,
_"আজ ৮ মাস পর আপু আমার নাম নিলো।_
_'মায়া'।_
_শুধু একবার।_
_কিন্তু ওই একবারের জন্য আমি ৮ মাস ওয়েট করতে রাজি।"_
_"আপু, তোমার বিচার আমি করবোই।_
_যে করেই হোক।"_