পরের দিন সকাল ৯টা। CID অফিস।
এসির ঠান্ডা বাতাস। টেবিল ভর্তি ফাইল। সামনে কম্পিউটার অন।
আরিয়ান চেয়ারে বসে আছে। গায়ে সাদা শার্ট, হাতা ফোল্ড করা।
সামনে তিনটা ফাইল খোলা। একটা মার্ডার কেস, একটা চুরির কেস, একটা মিসিং পারসন।
কিন্তু একটা লাইনও পড়া হয় নাই।
কলম ঘুরাচ্ছে। জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। আবার ঘড়ি দেখতেছে। ৯:১৫, ৯:৩০।
রাফি এসে কফি দিয়ে গেল। বলল," স্যার কালকে রাতের রিপোর্ট লাগবে।"
আরিয়ান মাথা নাড়ল। "হুম, দিচ্ছি।"
রাফি চলে যাওয়ার পর আরিয়ান ড্রয়ার খুলল।
ভিতরে একটা Law এর বই। কালকের কেনা। কভারের কোণায় একটু ভাঁজ পড়ে গেছে।
বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাল। কিন্তু অক্ষরগুলা ঝাপসা লাগতেছে।
মনে পড়তেছে মায়ার হাতের নীল চুড়ির টুংটাং শব্দ।
মনে পড়তেছে রমনার লেকে একই প্লেটে ভাত খাওয়া।
মনে পড়তেছে চায়ের দোকানে মায়ার ভয় পেয়ে যাওয়া মুখ।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করে রাখল।
১১টার দিকে মিটিং। বড় স্যার কেসের আপডেট চাইল।
আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। বলতে গিয়ে আটকে গেল।
বলল, "স্যার... কেসের নতুন কোনো লিড নাই। তদন্ত চলতেছে।"
মিটিং শেষে সবাই বের হয়ে গেল। আরিয়ান চেয়ারে বসে রইল।
ফোনে সকাল থেকে ৪টা মিসড কল। সব অফিসের।
কিন্তু সে ভাবতেছে, মায়া ক্লাসে গেছে কিনা। নাস্তা করছে কিনা।
দুপুর ১টা। লাঞ্চের সময়।
সবাই ক্যান্টিনে গেল। আরিয়ান গেল না।
ছাদে উঠে একা দাঁড়াল।
পকেট থেকে সিগারেট বের করল। ধরাল না। শুধু হাতে রাখল।
নিচে তাকিয়ে দেখল রাস্তায় রিকশা যাচ্ছে। নীল সালোয়ার পরা কোনো মেয়ে দেখলেই বুকের ভিতর কেমন করে উঠতেছে।
বিড়বিড় করে বলল, "কালকে কাজের কথা ভুলে গেছিলাম। আজকে আবার ভুলতেছি। এটা ঠিক না।"
৩টার দিকে একটা ফোন আসল। অজানা নাম্বার।
আরিয়ান ধরল। ওপাশ থেকে ভুল নাম্বার।
সে রাগ করে ফোন কেটে দিল। তারপর নিজেই আবার নাম্বার ডায়াল করল।
১১টা ডিজিট। মায়ার নাম্বার। মুখস্থ হয়ে গেছে কালকে।
রিং হচ্ছে। একবার, দুইবার...
আরিয়ান কেটে দিল। বলল, "না। ডিউটির সময় পার্সোনাল কল না।"
৪টায় আবার ফাইল নিয়ে বসল।
এবার একটু মন দিল। দুই পাতা পড়ল।
হঠাৎ দরজায় টোকা। পিয়ন আসল।
বলল," স্যার আপনার জন্য একটা পার্সেল।"
আরিয়ান অবাক হয়ে পার্সেল খুলল।
ভিতরে ছোট একটা টিফিন বক্স। আর একটা চিরকুট।
চিরকুটে লেখা: "স্যার কালকের জন্য ধন্যবাদ। আজকে দুপুরে খাবেন। আমি রান্না করছি।"
নিচে নাম লেখা নাই। কিন্তু হাতের লেখা চেনা।
আরিয়ান বক্স খুলল। গরম ভাত, আলু ভাজি আর ডিম ভুনা। ঘ্রাণটা পরিচিত।
সে এক লোকমা মুখে দিল। তারপর আর কিছু খেল না।
বক্সটা বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিল।
অফিস শেষে গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে বলল, "বাসায় না। ক্যাম্পাসের দিকে যাও।"
ক্যাম্পাসের গেটে ২০ মিনিট বসে রইল। মায়া বের হল না।
হয়তো আগেই চলে গেছে।
আরিয়ান গাড়ি ঘুরায় নিল।
যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল, "কালকে বলছিলাম প্রতি সপ্তাহে ঘুরব। কিন্তু আজকে অফিসে বসে বুঝলাম, প্রতি সপ্তাহ না। প্রতিদিন ওর কথা মনে পড়বে।"
রাতে বাসায় ফিরে আরিয়ান ফ্রেশ হয়ে ডায়েরি খুলল।
লিখল," আজকে অফিসে একটা কাজও ঠিক মতো হয় নাই। কারণ মাথায় শুধু একটা মেয়ের হাসি, একটা মেয়ের চুড়ির শব্দ, একটা মেয়ের রান্না। M এর ফাইলটা আজকে একবারও খুলি নাই। এটা ভালো নাকি খারাপ জানি না শুধু জানি, মনটা আজকে শান্ত ছিল।"
------------
------------
সেদিনের ঘোরার পর রাত থেকে আকাশের অবস্থা খারাপ।
সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। বেলা ১টার দিকে মুষলধারে।
মায়া ছাতা নেয় নাই। টিউশনি থেকে ফেরার পথে পুরা ভিজে গেছে।
বাসায় এসে কাঁপতে কাঁপতে জামা চেঞ্জ করল। রাতে জ্বর আসল।
পরের দিন সকাল। জ্বর ১০২। গা হাত পা ব্যথা। কিন্তু ক্লাস আছে। মায়া ভাবল একটা ক্লাস করে চলে আসবে। ওড়না দিয়ে মাথা পেঁচিয়ে বের হল।
ক্যাম্পাসে ঢুকতেই আরিয়ান দেখে ফেলল। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা শার্ট ভিজা ভিজা। হাতে ফাইল।
আরিয়ান কাছে এসে বলল, "এই তুমি?"
মায়া মাথা নিচু করে বলল, "জি স্যার। ক্লাস আছে।"
আরিয়ান কপালের দিকে তাকাল। মুখ লাল। চোখও লাল।তারপর কপালে হাত দিয়ে বলল, " তোমার গা এত গরম কেন?"
মায়া বলল, "কিছুনা স্যার। রাতে একটু জ্বর আসছিল। এখন ঠিক আছে। "
আরিয়ান ধমক দিল। "ঠিক আছে? এই অবস্থায় ক্লাস করতে আসছো? বাসায় যাও।"
মায়া আস্তে করে বলল, "স্যার ক্লাসটা ইম্পর্টেন্ট।
আরিয়ান আর কিছু বলল না। শুধু বলল," চলো।"
মায়া বলল, "কোথায় স্যার?"
আরিয়ান বলল, "বাসায়। আমি দিয়ে আসতেছি।"
রিকশায় দুইজন। মাঝখানে ছাতা।
আরিয়ান একবারও মায়ার দিকে তাকায় নাই। শুধু বলল, "পানি খাইছো?"
মায়া বলল, "না।"
আরিয়ান রিকশা দাড় করিয়ে পাশের দোকান থেকে একটা পানির বোতল কিনে মায়াকে দিলো।
বাসার সামনে নেমে আরিয়ান বলল, "শুয়ে থাকবা। ক্লাসের টেনশন করতে হবে না। "
মায়া বলল, "স্যার নোট?"
আরিয়ান বলল, "আমি দিব।"
বলে চলে গেল।
দুপুর ২টা।
মায়ার দরজায় টোকা। দরজা খুলে দেখে আরিয়ান। হাতে একটা ব্যাগ।
মায়া অবাক হয়ে বলল, "স্যার আপনি? "
আরিয়ান ভিতরে ঢুকল। বলল, "ডিউটি।"
ব্যাগ থেকে ঔষধ বের করল। নাপা, সেফিক্স, গ্যাসের ট্যাবলেট। সাথে কমলা, আপেল, আর গরম ভাতের টিফিন।
টেবিলে রেখে বলল, "আগে খাবার খাও। তারপর ঔষুধ ।
মায়া বলল, "স্যার আমি নিজে... "
আরিয়ান বলল, "চুপ। পানি দাও।"
মায়া পানি আনল। আরিয়ান টিফিন খুলে ভাত বেড়ে দিল। বলল, "খাও।"
মায়া খেতে খেতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "স্যার আপনি কেন আসছেন?"
আরিয়ান বলল, "কারণ তুমি আমার স্টুডেন্ট। স্টুডেন্ট অসুস্থ হলে টিচারকে আসতে হয়।"
খাওয়া শেষে আরিয়ান কপালে হাত দিল। জ্বর এখনো আছে।তারপর মায়াকে ঔষুধ খাইয়ে দিয়ে বলল,"ঘুমাও। আমি ১ ঘন্টা পর আবার আসব।"
মায়া বলল, "স্যার আপনার অফিস?"
আরিয়ান বলল, "আজকে ছুটি। মায়ার ডিউটি।"
বিকাল ৫টা।
আরিয়ান আবার আসল। হাতে নোটের খাতা। কালকের ক্লাসের নোট সুন্দর করে লিখে আনছে।
মায়ার পাশে বসে বলল, "পড়া বুঝায় দেই?"
মায়া মাথা নাড়ল।
আরিয়ান আস্তে আস্তে বুঝাতে লাগল। মাঝে মাঝে মায়ার কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বর কমছে কিনা।
সন্ধ্যা ৭টা।
যাওয়ার আগে আরিয়ান বলল," রাতে ফোন দিবা। জ্বর বাড়লে আমাকে বলবা।"
মায়া বলল, "স্যার আপনার নাম্বার? "
আরিয়ান একটা কাগজে নাম্বার লিখে দিল। বলল," এটা শুধু ইমার্জেন্সির জন্য।"
গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি আবার শুরু হল।
আরিয়ান ভিজতে ভিজতে গাড়িতে উঠল।
রাতে ১০টায় মায়ার ফোনে মেসেজ আসল।
অজানা নাম্বার থেকে। লেখা: "জ্বর কেমন? ঔষধ খাইছো?"
মায়া রিপ্লাই দিল: "জি স্যার। একটু কমছে। থ্যাংক ইউ।"
৫ মিনিট পর আবার মেসেজ: "ঘুমাও। কাল সকালে খবর নিব।"
রাতে মায়া ঘুমানোর আগে ডায়েরিতে লিখল,
"আজকে স্যার দুইবার আসছে। ঔষধ দিছে। খাবার দিছে। নোট দিছে। আর বলছে ডিউটি। মিথ্যাবাদী স্যার।"
আর আরিয়ান বাসায় ফিরে জামা ভেজা অবস্থায়ই ডায়েরি খুলল।
লিখল, "আজকে অফিস ফাঁকি দিছি। কিন্তু একটা মেয়ের জ্বর কমানোর ডিউটি করছি। এটাই আজকের সবচেয়ে জরুরি কেস ছিল।"
বাইরে বৃষ্টি। ভিতরে দুইটা মানুষের মন শান্ত।