#My_Angry_Albatross
#লেখিকা_রুমি_ইসলাম
#পর্ব_৮
❌কপি করা নিষিদ্ধ ❌
নই কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে গেল।
গভীর, ভারী একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— "আসিনি মানে? চলে এসেছি।"
সবার দৃষ্টি একসঙ্গে দরজার দিকে ঘুরে গেল।
ধূসর রঙের স্যুট পরিহিত, এক হাতে দামি ঘড়ি আর অন্য হাতে একটি ফাইল—গম্ভীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন আসিফ মির্জা।
চৌধুরী গ্রুপের চল্লিশ শতাংশ শেয়ারের মালিক তিনি।
সোজা জোরাভের সামনে এসে কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বললেন,
— "আজ আমাদের ছেলের প্রথম অফিস-ডে, আর আমি আসব না—তা আবার হয় নাকি?"
জোরাভের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে সে এগিয়ে গিয়ে আসিফ মির্জাকে জড়িয়ে ধরল।
-কিছুক্ষণ পর"
মিটিং শেষ হতেই আজাদ চৌধুরী বললেন,
— "আসিফ, কাল বাসায় ছোট্ট একটা গেট-টুগেদারের আয়োজন করেছি। ইনায়াকে নিয়ে অবশ্যই চলে আসবি।"
আসিফ মির্জা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— "অবশ্যই আসব, ভাই।"
★★★
সন্ধ্যা প্রায় সাতটা।
বাসায় ফিরতেই আমিনা চৌধুরী ছেলেকে দেখে মুচকি হেসে বললেন,
— "চলে এসেছিস বাবা? অফিসের প্রথম দিন... সব ঠিকঠাক ছিল তো?"
জুতার ফিতা খুলতে খুলতেই শান্ত গলায় জোরাভ বলল,
— "হ্যাঁ মা। Everything went well. তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।"
আমিনা চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
— "আলহামদুলিল্লাহ। তুই আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি।"
— "আচ্ছা মা।"
নিজের রুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল জোরাভ।
প্রায় আধঘণ্টা পর নিচে নামল সে।
কালো টি-শার্ট, কালো জিন্স, হাতে দামি ঘড়ি। চুলগুলো যত্ন করে সেট করা। সাদামাটা পোশাকেও তার ব্যক্তিত্ব আলাদা করেই চোখে পড়ছিল।
আমিনা চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
— "কোথাও যাবি নাকি?"
জোরাভ হালকা হেসে উত্তর দিল,
— "হ্যাঁ মা। সামিরদের সঙ্গে একটু দেখা করতে যাব।"
— "তাহলে আগে খেয়ে যা।"
ডাইনিং টেবিলে বসতেই আমিনা চৌধুরী নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করলেন।
খাওয়া শেষ করে আর সময় নষ্ট করল না জোরাভ।
লন্ডন থেকে ফেরার পর ব্যস্ততার কারণে বন্ধুদের সঙ্গে ঠিকমতো দেখা হয়নি। আজ সুযোগ পেতেই বেরিয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল সুমন চাচার চায়ের দোকানের সামনে।
শহরে একের পর এক আধুনিক ক্যাফে গড়ে উঠলেও তাদের আড্ডার ঠিকানা কখনো বদলায়নি। সুমন চাচার ছোট্ট চায়ের দোকানটাই ছিল তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। কত হাসি, কত ঝগড়া, কত তর্ক আর অগণিত স্মৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দোকানটা।
গাড়ি থামতেই দূর থেকে জোরাভকে দেখে সামির, লাবিব আর রিসাব একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
মুহূর্তের মধ্যেই তিনজন এগিয়ে এসে জোরাভকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
সামির হালকা অভিমানী গলায় বলল,
— "এই বুঝি সময় হলো আমাদের সঙ্গে দেখা করার?"
জোরাভ তিনজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
— "ব্যস্ত ছিলাম রে... But trust me, তোদের সত্যিই অনেক মিস করেছি।"
লাবিব মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— "লন্ডনে থাকতে আমাদের সঙ্গে প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা গ্রুপ কলে আড্ডা দিতি। আর এখন একই শহরে থেকেও দেখা করার সময় হয় না!"
ঠিক তখনই দোকানের ভেতর থেকে সুমন চাচা বেরিয়ে এলেন।
জোরাভকে এক নজর দেখে অবাক হয়ে বললেন,
— "আরে... এটা কি আমাদের জোরাভ নাকি?"
কাছে এসে ভালো করে দেখে আবার বললেন,
— "কেমন আছো বাবা? প্রথমে তো চিনতেই পারিনি। একেবারে বড় সাহেব হয়ে গেছো!"
জোরাভ মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে সুমন চাচার সঙ্গে কুশল বিনিময় করল।
— "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি চাচা। আপনি কেমন আছেন?"
— "আল্লাহর রহমতে ভালো আছি বাবা। এসো, সবাই ভেতরে বসো।"
চারজন গিয়ে বসল দোকানের এক কোণের সেই পুরোনো টেবিলটায়। কত বছরের আড্ডা জমে আছে টেবিলটার গায়ে, তার হিসাব বোধহয় কারও জানা নেই।
সামির গলা উঁচু করে বলল,
— "সুমন চাচা, জোরাভের জন্য এক কাপ চা দেন... মনে আছে তো?"
সুমন চাচা হেসে বললেন,
— "মনে থাকবে না কেন? চিনি ছাড়া চা। এখনই নিয়ে আসছি।"
কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপগুলো টেবিলে রেখে তিনি আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
সামির ধীরে ধীরে দু'হাত টেবিলের ওপর রেখে জোরাভের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ল।
তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় একটা হাসি।
— "এবার আসল কথায় আয়..."
এক মুহূর্ত থেমে সে জোরাভের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
— "তাকে দেখেছিস..?
জোরাভ একবার কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "হুম।"
লাবিব উত্তেজিত হয়ে বলল,
— "কেমন দেখতে রে? অনেক সুন্দর?"
পাশ থেকে রিশব বলে উঠল,
— "এটা আবার কেমন প্রশ্ন! জোরাভ ভাইয়ের পছন্দ অবশ্যই অনেক সুন্দর হবে। একদম পরীর মতো।"
এবার সামির ধমক দিয়ে বলল,
— "উফ! চুপ কর তোরা। জোরাভকে কিছু বলতে দে।"
তারপর জোরাভের দিকে ঝুঁকে আবার বলল,
— "দোস্ত, বল। কেমন দেখতে হলো? তোকে কিছু বলেছে? মনের কথা কবে বলবি?"
জোরাভ মুচকি হেসে বলল,
— "প্রথম দেখাটা একদম বাজেভাবে হয়েছে। I didn't expect এমন হবে।"
এরপর জোরাভ পুরো ঘটনাটা খুলে বলল।
সব শুনে লাবিব মাথা চুলকে বলল,
— "তুই তো লন্ডনে যাওয়ার পর থেকে ওকে কোনো দিন দেখতেই চাসনি। যদি বলতিস, একটা ছবি ম্যানেজ করে দিতাম। বলতিস না কেন?"
জোরাভ এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
— "আমি একবারে ওকে সামনে এসে দেখব বলেই তোদের নিষেধ করতাম। আমি যদি ওকে আগে দেখতাম, তাহলে লন্ডনে থাকতে পারতাম না। বারবার দেশে চলে আসতে ইচ্ছে করত। আর আমি ওকে এত তাড়াতাড়ি ধরা দিতেও চাই না। বুঝতে দিতে চাই না, আমার জীবনে ওকে কতটা চাই। আগে আমি ইনুকে বুঝতে চাই, ও কী চায়। আমার প্রতি ওর কোনো অনুভূতি আদৌ আছে কি না।"
কথাগুলো বলতে বলতে জোরাভ নিজের আঙুল ঘুরাচ্ছিল।
পাশ থেকে সামির গম্ভীর গলায় বলল,
— "আর যদি দেখিস, ও তোকে ভালোবাসেই না? তখন?"
জোরাভ চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "তাহলে ওর মনে আমার জন্য ভালোবাসা জন্মাব।"
ওমনি রিশব বলে উঠল,
— "এই না হলে আমার ভাই! একদম লাভ গুরু!"
পাশ থেকে লাবিব বলল,
— "আচ্ছা ভাই, এবার চল উঠি।"
সবাই উঠে দাঁড়াল। জোরাভও উঠল।
উঠেই সে চেয়ারটা টেনে টেবিলের সঙ্গে একদম সোজা করে সেট করল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা খালি চারটা চায়ের কাপ এক লাইনে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। এমনকি কাপগুলোর হ্যান্ডেলও একই দিকে ঘুরিয়ে দিল।
ওর কাণ্ড দেখে সবাই হেসে উঠল।
রিশব হাসতে হাসতে বলল,
— "ভাই, যাওয়ার সময় অন্তত একটু থাম.. তোর এই অভ্যাসের জন্য ইনায়া একদিন পালাবে!"
জোরাভ কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
— "হ্যাবিট।"
চারজন হাসতে হাসতে সুমন চাচার চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে এল।
বের হতে হতে জোরাভ সবাইকে পরের দিনের জন্য ইনভাইট করল
ঠিক তখনই চারদিকে মাগরিবের আজানের সুর ভেসে উঠল।
জোরাভ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— "চল, আগে নামাজটা পড়ে নিই।"
লাবিব সামির রিশব সম্মতি জানাল।
চার বন্ধু রাস্তার পাশের মসজিদের দিকে হাঁটা দিল। আড্ডা থেমে গেল, কিন্তু বন্ধুত্বের উষ্ণতা যেন আগের মতোই রয়ে গেল।
★★★
সন্ধ্যা ঠিক সাতটা।
পুরো চৌধুরী বাড়িটা যেন আজ নতুন রূপে সেজে উঠেছে। বাগানের চারপাশ জুড়ে ঝুলছে অসংখ্য সোনালি ফেয়ারি লাইট। নরম আলোয় পুরো পরিবেশটা যেন রূপকথার কোনো দৃশ্য। একপাশে হালকা বাদ্যযন্ত্রের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। অতিথিদের হাসি, গল্প আর কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি।
বাগানের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে আনোয়ার চৌধুরী আর রিদ চৌধুরী। যে-ই ভেতরে প্রবেশ করছে, হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে...
বাগানের এক কোণে রাখা সাদা কুশনওয়ালা চারটি চেয়ারে বসে আছে জোরাভ, সামির, লাবিব আর রিশব।
চারজনের হাতেই এক গ্লাস করে জুস। তবে জুসে কারও মন নেই। কথাবার্তার মাঝেও মাঝেমধ্যে চার জোড়া চোখ একসঙ্গে গিয়ে থামছে মূল গেটের দিকে।
সামির গ্লাসে আলতো করে চুমুক দিয়ে হেসে বলল,
— "মনে হচ্ছে, আমরা সবাই একই মানুষের অপেক্ষা করছি।"
লাবিব মুচকি হেসে যোগ করল,
— "আজ কিন্তু প্রথমবার ইনায়াকে দেখব। দেখি তো, আমাদের জোরাভ ভাইয়ের পছন্দ কেমন!"
রিশব হেসে বলল,
— "আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ভাইয়ের পছন্দ কখনো খারাপ হতে পারে না।"
তিনজনের কথা শুনেও জোরাভ কিছু বলল না।
শুধু ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। হাতে ধরা গ্লাসটা আলতো করে ঘুরাতে ঘুরাতে আবারও গেটের দিকে তাকাল সে।
চোখ দুটোতে স্পষ্ট অপেক্ষা।
ওদিকে...
জারা একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। কখনো এদিক, কখনো ওদিক হাঁটছে। হাতে ধরা ফোনটার স্ক্রিন বারবার অন করে সময় দেখছে।
মুখে বিরক্তির ছাপ।
— "উফ! এরা আসছে না কেন?"
আজ ইনায়া ছাড়াও সে অপেক্ষা করছে তাদের আরেকজন খুব কাছের বন্ধুর জন্য।
শ্রাবণী সিনহা।
স্বভাবের দিক থেকে একেবারেই জারার উল্টো। শান্ত, ভদ্র আর নরম মনের মেয়ে। খুব বেশি কথা বলে না, তবে সবাইকে নিজের ব্যবহার দিয়ে আপন করে নিতে জানে।
ঠিক তখনই আনোয়ার চৌধুরী রিদের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— "রিদ, তুই একটু গেটটা সামলে রাখ। ভেতরে আমার জরুরি একটা কাজ আছে।"
— "আচ্ছা, বাবা।"
আনোয়ার চৌধুরী ভেতরের দিকে চলে যেতেই রিদ একা দাঁড়িয়ে রইল গেটে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই...
গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল একটি মেয়ে।
হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি, খোলা চুল, কানে ছোট মুক্তোর দুল, মুখে একটুখানি লাজুক হাসি।
★★চলবে....
(★শুধু পড়েই চলে যাবে...🥺 একটা লাইক কমেন্ট তো করে যাও ☹️🫶 ★)