ফন্ট সাইজ:
থিম:
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে

১ম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালে যেমন একটা ধুলোমাখা গন্ধ বেরোয়, আমার জীবনটা ছিল ঠিক তেমনই। জানো আমার ফেলে আসা অতীতে আমি নামক একটা পুরুষ ছিল। পাড়ার মোড়ে কিংবা অফিসের ডেস্কে তাকে সবাই ‘অয়নবাবু’ বলেই ডাকত। তার না একটা নিজস্ব সময় ছিল। সেই সময়ের রঙ ছিল পুরনো চিঠির মতো হলদেটে। প্রতিদিন বিকেল নামলে তার ঘরের জানলা দিয়ে আস্ত একটা শহর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ত। জানলার শিকল গলে আসা তেরছা রোদে দেখা যেত হাওয়ায় ভাসমান ধুলিকণা। ঠিক যেন অয়নের জীবনের ছোট ছোট না বলা কথা ছিল।

এক কাপ লিকার চায়ের ধোঁয়াটে গন্ধ, টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কিছু অনুবাদ করা অর্ধেক ফরাসি বাক্য, আর মাসের পর মাস উল্টে পড়ে থাকা এক পৃষ্ঠা না পড়া বই এই নিয়েই ছিল তার বিকেলের কারবার। সেই মানুষটা আসলেই বড্ড অদ্ভুত। তার জীবনটা ছিল একটা পুরনো জরাজীর্ণ সরকারি অফিসের মতো, যেখানে ফাইলের স্তূপ আছে, আছে ধুলো জমা টাইপরাইটার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার আসল জীবনটা ওই অফিসঘড়ির কাঁটার বাইরেই পড়ে থাকত। পাঁচটার সাইরেন বাজার পর যখন সে বেরিয়ে আসত, তখন সে আর দশটা কেরানি নয়, সে তখন এক বিষণ্ণ জাদুকর।

সাদা-কালো জীবনে ফাইলের অভাব ছিল না। ডেবিট-ক্রেডিট, ভাউচার আর অডিট রিপোর্ট এসবের ভিড়ে তার কী-ই বা আসত-যেত? তার গম্ভীর মুখটা অফিসের বন্দি খাঁচায় নয়, বরং জানলা ভেদ করা নীল আকাশের দিকে চেয়ে থাকত। মনে হতো, ওই দিগন্তের ওপার থেকে কেউ একজন তাকে ডাকছে। রোববারে মশাই আবার ক্লাসিকাল গিটার বাজাত। যখন তার আঙুলগুলো তারের ওপর খেলা করত, তখন মনে হতো ঘরের দেয়ালগুলো যেন একে একে সরে যাচ্ছে ক্লাসিকাল সঙ্গীতের এক জাদুর নগরে। ডায়েরির শেষ পাতায় সে অদ্ভুত সব অঙ্ক কষত। তবে সেগুলো কোনো হিসাবের অঙ্ক নয়, বরং জীবনের না পাওয়া মুহূর্তগুলোর যোগফল ছিল। রাত হলে বাড়ি ফিরে লোকটা খুব নিয়ম মেনে এক কোণে জুতো জোড়া খুলে রাখত। খামে পুরে রাখত মায়ের ওষুধের টাকাটা। ছোট ছোট চিরকুটে লেখা থাকত বাবার পরের চেকআপের তারিখের। দায়িত্বের এই পাহাড় সে বয়ে বেড়াত নিঃশব্দে। শুধু ঘুমানোর আগে নিজের জন্য ছোট্ট করে লিখত, “একটা নতুন ডায়েরি কিনতে হবে।”

সেই পুরনো ডায়েরিটার একটা পাতায় গেলে সেই লোকটা প্রায়শো থমকে যেত। কারণ সেখানে একটা নাম লেখা ছিল। নামটা সে কতবার যে অভিমান করে ইরেজার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছেছে তার ইয়ত্তা নেই।

কাগজ পাতলা হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হতো, তবু মন মানত না। আবার গভীর অনুরাগে পেন্সিল দিয়ে যত্ন করে লিখত সেই নামটা—'কনকচূড়া’। তার মনের সমস্তটা জুড়ে ছিল ওই এক নাম, এক নারী।

সে ছিল এক মায়ার পাহাড়। রূপে লক্ষী, গুনে স্বরশতী। অয়ন তাকে ডাকত ‘বসন্তের আগের রাত্রি’ বলে। কারণ তার উপস্থিতিতে একটা আসন্ন উৎসবের আমেজ থাকত, কিন্তু সেই উৎসবটা আর কখনোই আসত না। বসন্ত আসার ঠিক আগের মুহূর্তের যে হাহাকার, যে প্রতীক্ষা কনকচূড়া ছিল ঠিক তেমনই। আজ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে অয়নের মনে পড়ল সেই শেষ বিকেলের কথা। কলকাতার ঘিঞ্জি গলিপথে শেষবার দেখা হয়েছিল তাদের। সেই রাতে শহরের আকাশটা ছিল কেমন এক অদ্ভুত তামাটে রঙের। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কনকচূড়ার মুখটা ম্লান দেখাচ্ছিল। “তুমি কি যাচ্ছই?” অয়ন তার গিটারের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে প্রশ্ন করেছিল।

কনকচূড়া ম্লান হেসেছিল। বলেছিল, “যেতে তো হয়ই অয়ন। সব বসন্ত কি আর সবার জন্য ফুল নিয়ে আসে? কারো কারো জন্য শুধু ঝরা পাতা থাকে।”

সেদিন কনকচূড়ার বিয়ের আগের রাত ছিল। গলি দিয়ে একটা সানাইয়ের সুর ভেসে আসছিল দূর থেকে। সেই সুরটা অয়নের বুকের পাজর ছিঁড়ে দিচ্ছিল। তারপর ভিড়ের মধ্যে কনকচূড়া হারিয়ে গেল। সেই যে গেল, আর কোথাও তাকে দেখা গেল না। কলকাতার অলিগলি, ট্রাম লাইন, কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকান কোথাও না। অয়ন আজও সেই গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঝে মাঝে। যদি হঠাৎ আবার সেই পুরনো হলুদ সময়ের মতো কোনো চেনা ছায়া এসে দাঁড়ায়!

নিজের ঘরে ফিরে এসে অয়ন আবার ডায়েরিটা খুলল। বাইরে তখন শহরটা নিঝুম হয়ে এসেছে। ডায়েরির পাতায় সেই নামটি আবার ঝাপসা হয়ে এসেছে চোখের জলে। সে জানে, এই নামটা তার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, মুছে ফেলাটা কেবল একটা অভিনয় মাত্র। সে বিড়বিড় করে বলল, “আছো তুমি হৃদয় জুড়ে, আছো বলেই হয়তো এই ভাঙা গিটারটা আজও সুর তোলে।”

অয়ন ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে জানলা দিয়ে আসা হালকা আলোয় দেখা গেল, টেবিলের ওপর রাখা সেই খামটা, যাতে মায়ের ওষুধের টাকা রাখা। আর তার পাশে পড়ে থাকা সেই ডায়েরি, যার পাতায় এক অভিমানী প্রেমিকের হাজারবার মুছে ফেলা এবং পুনরায় লিখে রাখা একটি নাম চিরস্থায়ী হয়ে বিরাজ করছে। রাত বাড়ে। শহর ঘুমায়। কেবল একলা এক ঘরে এক অদ্ভুত মানুষ তার অব্যক্ত ভালোবাসার পাহাড় নিয়ে বসে থাকে। বসন্ত আসে না, কিন্তু বসন্তের আগের রাতের সেই বিষণ্ণতা অয়নের সঙ্গী হয়ে থেকে যায়। জীবনের অডিট রিপোর্টে সব মিললেও, ওই একটা নামের হিসাব কিছুতেই মিলল না।

#আছো_তুমি_হৃদয়_জুড়ে

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

(ছোট গল্প)

( সমাপ্ত)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন