#মেঘের_ডানায়_রোদ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#শেষ_পর্ব
মানুষের অবচেতন মন বড় বিচিত্র এক নাট্যশালা। সে যে দৃশ্যে একবার আটকে যায়, হাজারো নতুন দৃশ্যপটের ভিড়েও মনের ব্যাকগ্রাউন্ডে সেই পুরনো নাটকটাই অবিরত চলতে থাকে। মানুষ বাইরে নাটকটা বদলানোর যতই চেষ্টা করুক না কেন, ভেতরে আসল কুশীলবেরা তাদের চেনা সংলাপগুলো আউড়ে যায়। অয়নান্ত আর অনন্যার বিয়ের আজ ২ বছর পূর্ণ হলো। এই ২ বছরে অনন্যা অয়নান্তকে চিনেছে, ভালোবেসেছে, নিজের মতো করে আগলে রেখেছে। অনন্যা মেয়েটা সহজ-সরল এবং ভীষণ সংসারী। তার চোখে জীবন নিয়ে কোনো জটিল দর্শন নেই। সে চৈত্র মাসের বৃষ্টি আর শীতের কুয়াশার তফাত বোঝে না, সে শুধু বোঝে অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরা স্বামীর কপালে কখন একটু লেবুর রস দিয়ে ঠান্ডা জল মাখিয়ে দিতে হবে, কিংবা কোন শার্টের সাথে কোন রঙের টাইটা ভালো মানাবে। এই ২ বছরে সে অয়নান্তের একজন আদর্শ স্ত্রী হয়ে উঠেছে। কিন্তু অয়নান্তের ভেতরের যে একটা নিঃশব্দ, অন্ধকার ঘর আছে, যেখানে চারকোল পেনসিলের দাগ আর নোনা জলের গন্ধ লেগে থাকে, সেই ঘরের চাবিটা অনন্যা কোনোদিন খুঁজে পায়নি। অনন্যা অবশ্য তা নিয়ে কখনো অভিযোগও করেনি। সে জানে, তার স্বামী অতিভদ্র, পরোপকারী এবং ভীষণ দায়িত্বশীল একজন মানুষ। পুরুষ মানুষের এর চেয়ে বেশি ভেতরের খবর জানার হয়তো কোনো প্রয়োজনও একটা সংসারী মেয়ের থাকে না। এবারের বিবাহবার্ষিকীর দিন সাতেক আগে অনন্যা হঠাৎ এক রাতে অয়নান্তের হাত ধরে বেশ আদুরে গলায় বলেছিল, "আচ্ছা অয়ন, বিয়ের পর থেকে তো আমরা শুধু ওই সিলেটে মা-বাবার কাছে গেলাম, আর নয়তো অফিসের কাজে তুমি ঢাকার বাইরে দৌড়ালে। এবার আমাদের ২ বছর পূর্তিতে একটু অন্য কোথাও যাওয়া যায় না?"
অয়নান্ত ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল, "কোথায় যেতে চাও বলো? রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে যাবে? নাকি শ্রীমঙ্গলের কোনো শান্ত চা বাগানে?" অনন্যা তখন আলমারির নিচের ড্রয়ার থেকে ধুলোবালি জমা একটা পুরনো স্কেচবুক বের করে অয়নান্তের সামনে রাখল। বুকটা সামান্য কেঁপে উঠল অয়নান্তের। অনন্যা পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, "তোমার চারুকলার এই পুরনো খাতাটায় একটা দ্বীপের খুব সুন্দর সুন্দর স্কেচ দেখেছিলাম। ভাঙা জেটি ঘাট, জং ধরা রেলিং, সারি সারি নারকেল গাছ, আর প্রবাল পাথর। এই যে এখানে ছোট করে লেখা, সেন্টমার্টিন। চলো না, এবার আমরা ওখানেই যাই? আমার খুব নীল জল দেখার শখ হয়েছে।"
অয়নান্ত সেদিন স্তব্ধ হয়ে অনন্যার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষের নিয়তি কত বড় এক জাদুকর! যে দ্বীপের নাম, যে দ্বীপের স্মৃতি সে নিজের মন থেকে জোর করে উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, ৫ বছর পর তার বর্তমান নিয়তি তাকে ঠিক সেই দ্বীপেরই মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিল। সে অনন্যার সেই চপল অনুরোধ আর চোখের আকুতি ফেলতে পারেনি। হয়তো মনের গভীর কোণে জমে থাকা এক অপরাধবোধ আর নিয়তির শেষ পরিহাসটুকু নিজের চোখে দেখার জন্যই সে মনে মনে একটা অদ্ভুত টান অনুভব করছিল।
সেন্টমার্টিনের রাতগুলো এখন আর আগের মতো এত নিঝুম নেই। পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে, নতুন নতুন আধুনিক রিসোর্ট হয়েছে, রাত বাড়লেও চারপাশ থেকে জেনারেটরের আওয়াজ আর মানুষের কোলাহল ভেসে আসে। কিন্তু সমুদ্রের সেই পুরোনো, নোনা গন্ধটা এখনো এক ফোঁটাও বদলায়নি। সমুদ্রের সেই চেনা গর্জন মানুষের তৈরি সমস্ত কোলাহলকে ছাপিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। রাত তখন আনুমানিক সাড়ে এগারোটা। দ্বীপের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। অনন্যা সারা দিনের জার্নির ক্লান্তিতে রিসোর্টের নরম বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। কিন্তু অয়নান্তের চোখে ঘুম এলো না। তার ঘরের জানলা দিয়ে যে সমুদ্রের হাওয়া আসছিল, তা যেন পাঁচ আগের একটা চেনা কণ্ঠস্বরের মতো তাকে ফিসফিস করে ডাকছে। সে অনন্যার ঘুমন্ত মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর আলতো পায়ে, যাতে কোনো শব্দ না হয়, একটা হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে এলো। বাইরে পা রাখতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস তার মুখ ছুঁয়ে গেল। আকাশ জুড়ে আজ এক বিশাল, মায়াবী পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চাঁদের সেই তীব্র আলো প্রবাল পাথরের ওপর আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সাদা ফেনায় লেগে রুপোলি রঙের জলছাপ তৈরি করেছে। চারপাশটা কেমন যেন মায়াময়, বাস্তব দুনিয়ার বাইরের কোনো এক গ্রহ বলে মনে হচ্ছে। অয়নান্ত গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলল সেই পুরনো জেটি ঘাটের দিকে। ঘাটটা এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে, কংক্রিটের প্রলেপ পড়েছে। কিন্তু অয়নান্তের চোখ তো আগের ভাঙা কাঠের পাটাতনটাই খুঁজছিল। সে ঠিক সেই জায়গাটাতে এসে দাঁড়াল, যেখানে সে ৫ বছর আগে ঝড়ের রাতে হাঁটু গেড়ে বসে অন্ধের মতো কেঁদেছিল। চারপাশটা এই গভীর রাতে একদম জনমানবহীন। কেবল জোয়ারের জল ফুঁসে ফুঁসে উঠছে জেটির পিলারে। অয়নান্ত পকেটে হাত দিয়ে সেই চাবির রিংয়ের সাথে লেগে থাকা ছোট কাঁচের লকেটটা স্পর্শ করল। তার মনে হলো, পাঁচ বছর ধরে সে আসলে এই দ্বীপেই বাস করছে, ঢাকার ওই বিজ্ঞাপনী সংস্থার এসি ঘর, বসের ঝাড়ি, ক্লায়েন্টের মিটিং সবকিছু ছিল একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর অভিনয়।
হঠাৎ অয়নান্তের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। তার মনে হলো, জেটি ঘাটের একদম শেষ মাথায়, যেখানে কংক্রিট শেষ হয়ে সমুদ্রের জলরাশি শুরু হয়েছে, সেখানে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। একটা শাড়ি পরা মেয়ে। বাতাসের তীব্রতায় তার শাড়ির আঁচলটা ডানার মতো উড়ছে। অয়নান্তের বুকের ধকধকানি এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তার চোখের চশমাটা কি আজ আবার সমুদ্রের নোনা ছাটে ঝাপসা হয়ে গেল? সে কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচটা মুছল। তারপর আবার তাকাল। না, এটা কোনো ভ্রম নয়। মেয়েটি আস্তে আস্তে নিজের মুখটা অয়নান্তের দিকে ফেরাল। চাঁদের আলো সরাসরি তার মুখের ওপর পড়েছে। সেই বিষাদগ্রস্ত মুখ, চোখের নিচে কাজলের আলতো কালচে ছাপ, আর ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা সেই চিরকালের মন খারাপ করা মায়াবী হাসি। তিস্তানি!
অয়নান্তের পা দুটো যেন কংক্রিটের মেঝের সাথে জমে বরফ হয়ে গেল। সে এক পা, দুই পা করে অতি কষ্টে এগিয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ, ফুসফুসে কোনো বাতাস নেই। অনেক চেষ্টার পর তার মুখ থেকে একটা ভাঙা, ফিসফিসানি আওয়াজ বের হয়ে এলো, "তিস্তানি? আপনি... আপনি এখানে?”
তিস্তানি ঘোরলাগা শান্ত গলায় মৃদু হাসল। বাতাসে তার গলার আওয়াজটা কেমন যেন ইথারের মতো ভেসে এলো, "আমি তো কোথাও যাইনি, অয়নান্ত সাহেব। আমি তো এই সমুদ্রেরই একটা অংশ হয়ে গেছি। প্রতিটা পূর্ণিমার রাতে আমি এই জেটি ঘাটে এসে বসি। কিন্তু আপনি এখানে কেন এলেন? আপনার তো এখানে আসার কথা ছিল না।"
অয়নান্তের চোখ ফেটে তপ্ত জল নামল। সে চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বলল, "আমি আসতে চাইনি, তিস্তানি। কিন্তু আমার বর্তমান আমাকে টেনে এনেছে। আমি পাঁচ বছর ধরে প্রতিটা মুহূর্ত এই নোনা জলের ছটফটানি বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। আমি খুব ভালো দামি শার্ট পরি, বড় পদে চাকরি করি, লোকে আমাকে সফল মানুষ বলে। কিন্তু আমার ভেতরের চারকোল পেনসিলটা যে ৫ বছর আগে আপনার ওই সাদা শাড়ির আঁচলের সাথে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে গেছে, সে খবর কেউ রাখে না। আমি আপনার এই মায়ার খাঁচা থেকে কিছুতেই বের হতে পারছি না। কেন এমন করলেন আমার সাথে?"
তিস্তানি চাঁদের আলোর দিকে মুখ তুলে তাকাল। সমুদ্রের জল যেন তার পায়ে এসে চুমু খাচ্ছে। সে খুব শান্ত, গভীর গলায় বলল, "মানুষ বড় অদ্ভুত জীব, অয়নান্ত সাহেব। খোদা মানুষকে একটা সুন্দর বর্তমান দেন, কিন্তু মানুষ সেই বর্তমানের কদর করতে পারে না। সে যা হারিয়ে ফেলে, যা কোনোদিন তার ছিল না, তাকে ‘মায়া’ নাম দিয়ে সারাজীবন হৃদয়ের ওপর একটা পাথরের মতো বয়ে বেড়ায়। আপনি যার হাত ধরে আজ এই দ্বীপে এসেছেন, সেই মেয়েটির দিকে কখনো ভালো করে তাকিয়েছেন?"
অয়নান্ত চুপ করে রইল। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তিস্তানি বলতে লাগল, "অনন্যা নামের মেয়েটি আপনাকে এক টুকরো আকাশ দিয়েছে। সেখানে কোনো কালবৈশাখী ঝড় নেই, কোনো চার নম্বর সতর্ক সংকেতের হাহাকার নেই। সে আপনার ঘর আগলে বসে থাকে। অনন্যাই তো এখন আপনার বাস্তব, আপনার ভবিষ্যৎ। মায়া জিনিসটা বড় নিষ্ঠুর, অয়নান্ত সাহেব। মায়া হলো শীতের সকালের কুয়াশার মতো, তার দিকে হাত বাড়ালে কেবল হাতটাই ভিজে যায়, শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ে না। মৃত মানুষের মায়ার পেছনে ছুটে জীবন্ত মানুষটার জীবনটাকে মরুভূমি করবেন না। আপনি এবার ফিরে যান।"
"কিন্তু আমার এই বুকের ভেতরের কমতিটা আমি কীভাবে পূরণ করব, তিস্তানি? এই শূন্যতা তো আমাকে প্রতিদিন মারে!" অয়নান্ত প্রায় কেঁদে ফেলল।
"কিছু শূন্যতা সুন্দর, অয়নান্ত সাহেব। সব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে যদি আপনি রঙ লেপে দেন, তবে আসল ছবিটা ফুটে ওঠে না। আপনার জীবনের ক্যানভাসে এই শূন্যতাটুকুই হোক আমার দেওয়া একমাত্র জলছাপ। এবার যান, আপনার স্ত্রী আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।"
"অয়ন? তুমি এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছ?" হঠাৎ একটা চেনা কণ্ঠস্বরে অয়নান্তের ভেতরের সেই মায়ার জগৎটা এক পলকে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সে ধড়ফড় করে চারপাশ তাকাল। তার ঘোর ভাঙল। সে দেখল, তার ঠিক পাশে অনন্যা দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে একটা সুতির চাদর জড়ানো, ঠাণ্ডা বাতাসে তার নাকটা সামান্য লাল হয়ে গেছে, আর চোখে এক আকাশ বিস্ময় আর উদ্বেগ। জেটি ঘাটের শেষ মাথায় কেউ নেই। সেখানে কেবল সমুদ্রের কালো ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে। কোনো সাদা শাড়ি পরা মেয়ে সেখানে ছিল না। অয়নান্তের বুকের ভেতরটা এক মস্ত বড় ধাক্কা খেল। সে দ্রুত চশমাটা চোখে পরে নিল এবং চশমা ঠিক করার উসিলায় হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের কোণের জলটুকু আড়াল করে ফেলল। সে নিজের মুখে চেনা হাসির আস্তরণ টেনে এনে বলল, "না... মানে, কেউ না অনন্যা। এমনিই... একটু ঘুম আসছিল না তো, তাই ভাবলাম জোছনাটা দেখি আর সাগরের শব্দটা শুনি। তুমি কখন উঠলে? রুমের দরজা খোলা রেখে চলে এসেছ?"
অনন্যা অয়নান্তের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। অয়নান্তের হাতটা তখনো বরফের মতো ঠাণ্ডা এবং কাঁপছিল। অনন্যা তার স্বামীর এই কাঁপুনি, এই চোখের কোণের জল আর মুখের ভেতরের উথাল-পাথাল কষ্টটা স্পষ্ট লক্ষ্য করল। সে ২ বছর ধরে এই মানুষটার সাথে সংসার করছে, সে বোকা নয়। সে বুঝল, তার স্বামীর মনের সেই গোপন কুঠুরিতে আজ আবার কোনো পুরনো ঝড় এসে হানা দিয়েছে। কিন্তু অনন্যা কোনো প্রশ্ন করল না। সে স্বামীকে কোনো অপরাধবোধে ফেলতে চাইল না। সে আরও একটু এগিয়ে এসে অয়নান্তের বুকের খুব কাছাকাছি দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় অনন্যার মুখটা আজ এক আশ্চর্য রকমের সুখে চকচক করছিল।
সে অয়নান্তের শার্টের বোতামটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে খুব ফিসফিস করে, এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো গলায় বলল, "তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব বলে আজ ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার পর থেকেই কথাটা চেপে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাদের বিবাহবার্ষিকীর রাতে এই সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েই তোমাকে কথাটা বলব। এর চেয়ে বড় উপহার তো আর কিছু হতে পারে না!"
অয়নান্ত কিছুটা বিভ্রান্ত চোখে অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, "কী উপহার, অনন্যা?"
অনন্যা লজ্জা পেয়ে নিজের মুখটা অয়নান্তের চওড়া বুকে লুকাল। সমুদ্রের গর্জনকে ছাপিয়ে তার অত্যন্ত মৃদু, কাঁপানো কণ্ঠস্বর অয়নান্তের কানে এসে পৌঁছাল, "আমাদের ঘরে নতুন অতিথি আসছে, অয়ন। আমি প্রেগন্যান্ট। আমরা মা-বাবা হতে যাচ্ছি।" এক মুহূর্তের জন্য অয়নান্তের মনে হলো চারপাশের মহাবিশ্বটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। সমুদ্রের রাক্ষুসে গর্জন, বাতাসের সাঁই-সাঁই শব্দ সবকিছু যেন একটা গভীর নীরবতায় রূপ নিল। একটা নতুন প্রাণের আগমন বার্তা, একটা নতুন জীবনের স্পন্দন তার মস্তিষ্কের সমস্ত জটিল জ্যামিতিক নকশাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিল। সে অনন্যার দিকে তাকাল। এই মেয়েটি তাকে একটা নতুন পরিচয় দিতে যাচ্ছে। সে অনন্যাকে দুই হাতে জড়িয়ে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে এবার যে জলটা নামল, তা আর বিষাদের নোনা জল নেই না, আছে কেবল মায়ার জল। সে অনন্যার কপালে উষ্ণ চুমু খেল। খুব শান্ত গলায় সে বলল, "আমি খুব খুশি হয়েছি, অনন্যা। আমি সত্যি খুব খুশি হয়েছি। খোদা আমাদের অনেক বড় একটা উপহার দিয়েছেন।" অয়নান্তের এই কথাগুলো, এই আনন্দটুকু এক্কেবারে সত্যি ছিল। একজন সাধারণ সংসারী পুরুষ হিসেবে, একজন হবু বাবা হিসেবে এই খুশির অধিকার তার অবশ্যই আছে। কিন্তু... ওই যে মায়া! জগতের আদি ও অন্তহীন এক গোলকধাঁধা। ভেতরের সেই গোপন খবরটা তো কেবল অয়নান্ত নিজেই জানে, যার হদিস পৃথিবীর কোনো আদালতে বা কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থার ফাইলে কোনোদিন পাওয়া যাবে না। সে অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই, তার থুতনিটা অনন্যার মাথায় ঠেকিয়ে আস্তে করে চোখ তুলে আবার সমুদ্রের দূর সীমানার দিকে তাকাল। চাঁদের রুপোলি আলোয় সে স্পষ্ট দেখল, সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে সেই সাদা শাড়ি পরা মেয়ে তিস্তানি শান্ত পায়ে হেঁটে হেঁটে গভীর থেকে আরও গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছে। সে আর একটিবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না। এক সময় একটা প্রকাণ্ড, আকাশচুম্বী ঢেউ এসে তাকে নিজের চাদরে মুড়িয়ে তলিয়ে নিয়ে গেল। তিস্তানি চিরতরে বিলীন হয়ে গেল সমুদ্রের অতলান্তিক অন্ধকারের বুকে। অয়নান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকটা হালকা লাগল, আবার একই সাথে শূন্যতায় ভরে গেল। সে অনন্যার হাতটা খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে মনে মনে ভাবল, হয়তো এটাই নিয়ম, হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ব্যাকরণ। মানুষের জীবন কোনো চারুকলার ক্যানভাস নয় যে সব রঙের অনুপাত নিখুঁত হতে হবে, কিংবা কোনো টানটান উপন্যাসের পাতা নয় যে শেষ দৃশ্যে এসে সব হিসাবের নিখুঁত মিটমাট হয়ে যাবে। কিছু কমতি, কিছু শূন্যতা আর কিছু হিসাব অমীমাংসিত রেখেই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, হাসতে হয়, সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হয়। সে অনন্যাকে বলল, "চলো অনন্যা, অনেক রাত হয়েছে। বাতাসটা বেশ ঠাণ্ডা, তোমার আবার ঠাণ্ডা লেগে যাবে। এবার রুমে ফিরি।"
অনন্যা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, "চলো।" তারা দুজনে হাত ধরাধরি করে রিসোর্টের দিকে পা বাড়াল। জগতে প্রেম আসে নিয়মের পরিপূরক হয়ে, দায়িত্বের হাত ধরে। মানুষ ঘর বাঁধে, বাজার করে, সন্তানের হাত ধরে স্কুলে যায়। কিন্তু মনের কোনো এক গোপন, নিভৃত চারকোল স্কেচে, মেঘের ডানায় লেগে থাকা এক চিলতে রোদের মতো, সেই মায়াটুকু চিরকাল অক্ষত থেকে যায় যার কোনো দ্বিতীয় সংস্করণ হয় না, যার কোনো ক্ষয় নেই, আর যার কোনোদিন কোনো মুক্তি নেই।
[সমাপ্ত]