ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

৫ম পর্ব

লেখক: Israt Jahan probah

এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

ইসরাত জাহান প্রভা

.৫

🚫কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ🚫

রাত তখন প্রায় নয়টা বেজে গেছে। ড্রয়িংরুমের দেওয়ালঘড়িটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে যে নাসিমা বেগমের মেজাজ এখনো সেদিনের সেই গরম ভাতের মতো তাতিয়ে আছে। বারান্দার গ্রিলের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নীল আর আদিলের অবস্থা শোচনীয়। গায়ে সেই ক্লাসের কাদামাখা কুর্তি, চুলে জট পাকানো ধুলোবালি—সব মিলিয়ে এক ভনভনে মশার উপদ্রব আর ভ্যাপসা গরমে দুজনই হাফিয়ে উঠেছে। একটু নড়াচড়ার উপায় নেই, কারণ অন্দরমহল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাসিমা বেগম মাঝে মাঝেই এসে তদারকি করে যাচ্ছেন।

নীল ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া, পা দুটো একদম অসাড় হয়ে গেছে রে। মনে হচ্ছে গ্রিল ধরে ঝুলে আছি। তোর ওই উগান্ডার নাতি মার্কা লাথিটার কথা মনে পড়লে এখনো আমার পিত্তি জ্বলে যায়।"

আদিল চোখ গোল গোল করে ফিসফিসাল, "চুপ থাক তো! তোর ওই ফাজলামো চোখের ইশারা আর পরীক্ষার হলের অফারটা যদি না দিতি, আম্মু কি আর এই শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকার অর্ডার দিতো? সব তোর অতিরঞ্জিত কারিশমা!"

ঠিক সেই মুহূর্তে বারান্দার স্লাইডিং দরজাটা সামান্য ফাঁক হলো। আল্পনা আর নিপা নিঃশব্দ পায়ে এসে উপস্থিত। দুজনের হাতে দুটো ঠাণ্ডা কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান আর লুকিয়ে আনা কিছু বিস্কুট। আল্পনা ফিসফিস করে বলল, "নীল! ভাইয়া! খুব কষ্ট হচ্ছে রে? আন্টি ঘুমানোর চেষ্টা করছেন, এই ফাঁকে এগুলো নে। ভেতরে আসার সাহস তো আমাদেরও নেই, তাই বাইরে থেকেই সাপ্লাই দিচ্ছি।"

নীল যেন হাতে চাঁদ পেল। কান থেকে এক হাত নামিয়ে এক টানে ক্যানটা নিয়ে বলল, "আহা রে আল্পনা! তুই না থাকলে আজ আমি বোধহয় এই বারান্দাতেই ডিহাইড্রেশনে মারা যেতাম। তুই একটা আস্ত ফেরেশতা রে!"

আদিলও কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে একটা ক্যান নিল। নিপা নিচ থেকে নিচু গলায় বলল, "দোস্ত, একটা মারাত্মক নিউজ আছে। জানিস তোরা আজ কলেজে কী কান্ড হয়েছে?"

নীল কোল্ড ড্রিংকসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে ভ্রু উঁচাল, "কী কান্ড আবার? ওই বজ্জাত নীলাদ্রি স্যারের আবার ডায়রিয়া হলো নাকি?"

"আরে না!" নিপা ফিক করে হেসে ফেলল, "কলেজের নোটিশ বোর্ডে তোদের ওই কাদামাখামাঝি খেলার ভিডিও কে যেন আপলোড করে দিয়েছে! সাথে ক্যাপশন দিয়েছে—‘রিয়েল ভার্সিটি লাইফ অ্যান্ড ফিমেল এম্পাওয়ারমেন্ট ইন মাড’। পুরো ক্যাম্পাস এখন এই ভিডিও নিয়ে তোলপাড়! স্পেশালি তুই যখন জাম্প দিয়ে বলটা মারলি, আর স্যার যে তোকে হাঁ হয়ে দেখছিল—সব ভাইরাল হয়ে গেছে।"

নীলের গলার কোল্ড ড্রিংকস আটকে যাওয়ার জোগাড় হলো। সে কাশি চেপে ধরে বলল, "কী বলিস! ভিডিও কে করল রে বাবা? কলেজের কোনো ছাত্র নাকি?"

আল্পনা মাথা নেড়ে বলল, "ছাত্র না তো! ভিডিওটার ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল আর জুম দেখে সবাই বলছে এটা কোনো প্রফেসরের কাজ। আর কে হতে পারে বল তো? আমাদের ওই কড়া হেডমাস্টার টাইপ নীলাদ্রি স্যার ছাড়া এমন নিখুঁত এডিটিং আর কে করবে?"

আদিলের মুখটা হাঁ হয়ে গেল। "কী বলিস! নীলাদ্রি স্যার ভিডিও করেছে? ক্লাসে যে মানুষটা আমাদের বের করে দিয়ে সাপ্লাই দিচ্ছিল ফায়ারিং লেকচার, সে লুকিয়ে লুকিয়ে ভিডিও শ্যুট করছিল? ওরে বাবা রে! এই স্যার তো আস্ত একটা ক্রিপ! ক্লাসে এক রূপ, বাইরে এসে টিকটক ভিডিও মেকার!"

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার চোখের কোণে এক দুষ্টু মিটমিটে হাসি খেলে গেল। সে ঠোঁট কামড়ে মনে মনে ভাবল, ‘ওহ আচ্ছা! তা স্যারের মনে এত ললিপপ ফুটছে? ক্লাসে গম্ভীর সাজার ফেসিয়াল আর বাইরে গিয়ে আমার অ্যাকশন প্যাকড ভিডিও শুট করা হচ্ছে! দাঁড়া নীলাদ্রি স্যার, তোর এই সিক্রেট আর্টিস্ট সত্তাটা কালকেই কলেজের সব দেয়ালে সাঁটিয়ে না দিলে আমার নাম নীল না!’

নিপা তাড়া দিয়ে বলল, "সাবধানে থাকিস তোরা। কালকে কলেজে গেলে না জানি কী ধমক খাস। আমরা আসি, আন্টি টের পেলে আমাদেরও কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেবেন।" এই বলে আল্পনা আর নিপা টিপাটিপে পালিয়ে গেল।

পরদিন সকালবেলা। রোদের তেজ ওঠার আগেই নাসিমা বেগম এসে বারান্দার দরজা খুলে দিলেন। কঠোর গলায় বললেন, "সকাল হয়ে গেছে। এবার ছিমছাম হয়ে টেবিলে আয়। তবে মনে রাখিস, তোদের অপরাধের শাস্তি এখনো শেষ হয়নি। আজকের দিনটা তোদের পকেট মানি জিরো! কোনো রিকশা নয়, হেঁটে কলেজে যাবি।"

নীল চোখ বড় বড় করে বলল, "কী! হেঁটে যাবো? আম্মু রাস্তা হলো প্রায় তিন মাইল! আমরা কি ম্যারাথন রানার নাকি?"

নাসিমা বেগম কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, "একটু বেশি কথা বললেই কিন্তু কাল রাতের মতো আজকেও বারান্দায় নাইট গার্ড হিসেবে ডিউটি দিতে হবে। চটপট তৈরি হয়ে নাও।"

অগত্যা নীল আর আদিল মুখ গোমড়া করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রোদে পুড়তে পুড়তে যখন তারা ক্যাম্পাসের গেটে পৌঁছাল, তখন তাদের ঘামে ভেজা দশা। গেটে পা রাখতেই চারপাশের ছাত্রছাত্রীদের ফিসফিসানি আর মুচকি হাসি তাদের স্বাগত জানাল। অনেকেই আড়ালে ফিসফিস করে বলছে, "ওই যে কাদাকান্তা নীল আসছে! সাথে ওই যে তার ভাইয়া!"

নীল তাতে একটুও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক ফুলিয়ে এমন ভাব নিয়ে হাঁটতে লাগল যেন সে কোনো নোবেল প্রাইজ জয়ী বিজ্ঞানী। আল্পনা আর নিপা দৌড়ে এসে তাদের সাথে যোগ দিল। আল্পনা ফিসফিস করে বলল, "নীল, কাল রাতের পর আজ সকালে তোকে আরও বেশি হট লাগছে! সবাই নোটিশ বোর্ডের সামনের ভিডিওটা নিয়ে কথা বলছে। স্পেশালি নীলাদ্রি স্যার আজ ক্লাসে ঢোকার সময় কী যে লাল হয়ে ছিলেন!

নীলের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল। "বলিস কী! স্যার কি লজ্জা পেয়েছেন?"

"শুধু লজ্জা না ভাই, স্যারের অবস্থা আজ দেখার মতো!" নিপা যোগ করল, "তিনি ক্লাসে এসেই গম্ভীর গলায় লেকচার শুরু করেছেন ঠিকই, কিন্তু বারবার তোর দিকে এমন চোরের মতো তাকাচ্ছিলেন যে বোঝার বাকি নেই উনি নিজেই ওই ভিডিওর ডিরেক্টর!"

ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রফেসর নীলাদ্রি। পরনে তার সেই কড়া ইস্ত্রি করা শার্ট আর চশমাটা নাকের ডগায় নামানো। নীলকে দেখেই তিনি একটু থমকে দাঁড়ালেন। তার চোখের চাউনিতে যেন একটু অস্বস্তি আর কিছুটা অদ্ভুত আকর্ষণ লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "মিস নীলিমা! কালকের সেই... মানে ওই অপ্রীতিকর এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর আজ সময়মতো ক্লাসে প্রেজেন্ট থাকা উচিত ছিল। গেটে দাঁড়িয়ে কি জটলা পাকাচ্ছেন?"

নীল এক পা এগিয়ে এসে একদম সোজাসুজি নীলাদ্রির চোখের দিকে তাকাল। তার মুখে সেই বিখ্যাত ডোন্ট কেয়ার হাসি। সে মিষ্টি কিন্তু কানের কাছে গিয়ে লাগার মতো গলায় বলল, "স্যার, অপ্রীতিকর তো বলবেনই! ক্লাসের বাইরে যে মানুষের হিডেন ট্যালেন্ট ক্যামেরা বন্দি করার বদভ্যাস আছে, তারা তো আর মাঠের আসল আনন্দ বুঝবে না। কি বলেন স্যার? ভিডিওটার এডিটিং আর সাউন্ড কোয়ালিটি কিন্তু ফাটাফাটি হয়েছে! কোন অ্যাপ দিয়ে এডিট করেছেন একটু আমাদেরও শেখাবেন নাকি?"

নীলাদ্রির মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত যেন বিদ্যুতের একটা শক খেল। তার মুখটা এক পলকে লাল থেকে একেবারে নীল হয়ে গেল। তিনি তোাগাড় করতে করতে মিনমিন করে বললেন, "কী... কী সব আজেবাজে বকছেন আপনি? আমি আবার কিসের ভিডিও করব? আমি একজন দায়িত্বশীল প্রফেসর!"

"অবশ্যই দায়িত্বশীল স্যার!" নীল আরও এক ধাপ এগিয়ে দুষ্টু হেসে চোখের পলক ফেলল, "দায়িত্ব নিয়ে একদম ডিরেক্টরের সিটে বসা উচিত আপনার। ইউটিউবে একটা চ্যানেল খুলে ফেলুন না স্যার—'প্রফেসরস ডেইলি ব্লগ'। ভালোই ভিউজ পাবেন!"

আদিল পাশ থেকে খুক খুক করে কেশে উঠল, আর আল্পনা-নিপা মুখ চেপে পকেটেই হাসিতে ফেটে পড়ার জোগাড় হলো। নীলাদ্রি বুঝলেন এই মেয়ের সাথে আর এক মুহূর্তও কথা চালালে তার প্রেসার সুগার দুটোই একসাথে বেড়ে যাবে। তিনি আর এক শব্দও খরচ না করে চশমাটা ঠিক করতে করতে হনহন করে কেবিনের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় শুধু ফিসফিস করে বলে গেলেন, "কী সাংঘাতিক বেহায়া একটা মেয়ে বাবা!"

নীল বিজয়ী বীরের মতো হাততালি দিয়ে বলল, "দেখলি তো ভাইয়া? উগান্ডার নাতি যতই লাথি মারুক, আর আম্মু যতবারই বারান্দায় দাঁড় করাক—এই নীলকে কাবু করার জন্ম এখনো কেউ নেয়নি!"

আদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। "তোর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস একদিন আমাকে জেলে না পাঠায়! চল এবার ক্লাসে চল, আমি অফিসে গেলাম বলেই আদিল গেইট এর দিকে অগ্রসর হয়ে আবারও পিছু ফিরে বলে ,,

দেখিস আজ স্যার কোন নতুন শাস্তি দেয়।"

তারা সবাই মিলে হাসতে হাসতে ক্লাসের দিকে পা বাড়াল। আকাশের কোণে তখন হালকা মেঘ জমছে, বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ—যেন নীলদের পরবর্তী কোনো বিশাল কান্ড ঘটানোর প্রস্তুতি চলছে প্রকৃতির তরফ থেকেও।

নীল ক্যান্টিনে টেবিলের উপর দুই পো ছড়িয়ে বসে আছে পাশে দুই দুই শয়তান ও আছে।

নীল হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে বসে বলে,, চল আজকে ক্লাস করবো না চল মার্কেটের দিকে যাবো।

আল্পনা বলে ,,, ওকে চল। তার সাথে নিপা ও তাল মিলায়।

তিনজন মার্কেটের উদ্দেশ্য মেইন্ট গেইটে কাছে এসে দেখে দূরে নীলাদ্রি স্যার এর কার রাখা। নীল সেই দিকে তাকিয়ে দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় আসতেই দেই দৌড়। হঠাৎ দৌড় দেখে নিপারা অবাক হয়ে নীলের পিছনে তারাও দৌড়াতে থাকে।

নীল গাড়িটির কাছে এসে থেমে যায়। দৌড়ে আসায় ভারী নিশ্বাসের ফেলে হাঁটু ভর দিয়ে নিচু হয় নীল।

কিরে মার্কেটে যাবি বলে এইখানে আসলি কেন? নিপা বলে।

নীল গাড়িটির দিকে তাকিয়ে বলে,,, আকাম করতে আসছি।

আল্পনা অবাক হয়ে বলে,, এই আবাল এটা স্যার এর গাড়ি মেরে তক্তা বানিয়ে দিবে চল এইখানে থেকে নীলের বাচ্চা।

সর মাঙ্গের নাতিন আমি যাইতাম না আমি আকাম করেই সর সর।

বলেই নীল গাড়িটির নিচে ঝুঁকে যায়।

নিপার দিকে তাকিয়ে বলে,, এই তোর কাছে ঠোট লম্বা জানি কি বলে ওই বোটকা ক্লিপ আছে?

নিপা বলে , হ্যাঁ আছে কেন?

নীল বিরক্তিতে বলে,, দে তো বাল এত্ত কেন প্রশ্ন করিস দে তাড়াতাড়ি আমরা এইখানে দাওয়াত খাইতে আসিনি যে কেউ দেখলে আমাদের কে স্বাগতম জানাবে।

আল্পনা দিকে তাকিয়ে নিপা ক্লিপ খুলে নীল কে দিয়ে দেয়।

নীল ক্লিপ পেয়ে যেন মহা খুশি সে ক্লিপ টা খেচ করে গাড়ির টায়ারে ঢুকে দেয় টায়ার পাংচার করে।

তারপর সামনের দুইটি পিছনের একটা সবগুলো আকাম করে নীল উঠে হাত ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিপা আল্পনা দিকে তাকিয়ে বলে,, চল এবার কাম শেষ।

বলেই

হাত কেলিয়ে হেসে গলা জড়াজড়ি করে মার্কেটের দিকে যেত থাকে।

( আকাইম্মা নীলি)

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন