ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

৭ম পর্ব

লেখক: Israt Jahan probah

এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

ইসরাত জাহান প্রভা

🚫কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ🚫

.৭

প্রিন্সিপালের রুম থেকে এক প্রকার একছুটে বেরিয়ে এসে নীল বারান্দার পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল। বুকের ভেতর তখন উত্তেজনায় ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে। একটু আগের সেই রিংটোন কান্ড আর প্রিন্সিপাল স্যারের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে ফিসফিস করে বিড়বিড় করে বলল, "বাঁচা গেল বাবা! ওই উগান্ডার নাতিন নীলাদ্রির সামনে যে আজ মানসম্মান যা একটু ছিল, তা তো বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দিল! আদিলের বাচ্চাটার কল দেওয়ার আর সময় পেল না?"

এদিকে প্রিন্সিপালের রুমের ভেতর তখনো বেশ থমথমে পরিবেশ। তোফাজ্জল চৌধুরী নিজের চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে গম্ভীর গলায় নীলাদ্রির দিকে তাকালেন। তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, "নীলাদ্রি, এই মেয়ের পাগলামি তো দিন দিন বেড়েই চলেছে! তুমি বলছ একে হালকা শাসন করতে, আর এ দেখি এসে আমার রুমের বারোটা বাজিয়ে দিল! ওর রিংটোনটা শুনলে তো মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়!"

নীলাদ্রি তখনো জানালার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসছেন। নীলের সেই উদ্দাম আর বেপরোয়া ভঙ্গিটা যেন তার চোখের ওপর বারবার ভেসে উঠছে। এত দিন কলেজে কোনো মেয়ে তার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে কথা বলার সাহস পেত না, আর এই নীলিমা নামের মেয়েটা পদে পদে তাকে যেভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে, তা বেশ অন্যরকম এক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। নীলাদ্রি নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বাবাকে বললেন, "আরে বাবা, ছাড়ো তো মেয়েটাকে! অতিরিক্ত ডানপিটে স্বভাবের তো তাই এমন করে। তবে ওর এই বাড়াবাড়ি বেশি দিন চলতে দেওয়া যায় না। কাল থেকে আমি নিজে ওর ক্লাসগুলো মনিটর করব। দেখি কত বড় চালাক মেয়ে!"

ওদিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে নীল যখন নিজের রাগ কমাচ্ছিল, তখনই দূরে আল্পনা আর নিপাকে টেনশনে এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেল। নীলকে দেখেই তারা দুজন একছুটে কাছে চলে এল।

আল্পনা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "দোস্ত! বল না জলদি! প্রিন্সিপাল স্যার তোকে কী বলল? সাসপেন্ড করল নাকি আস্ত একটা জেলে দিল?"

নীল চোখ গোল গোল করে ভং ধরে বলল, "জেলে তো দিলই, সাথে আবার ফাঁসির হুকুমও দিয়ে দিয়েছে! তোদের এই মহান বন্ধু আজ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরেছে রে!"

নিপা কপালে হাত দিয়ে বলল, "ফাজলামো রাখ তো! যা অবস্থা দেখছি, আজ বাড়ি গেলে আন্টি তোকে আস্ত সেদ্ধ করে খাবেন। পকেটমানি তো আগেই জিরো, আজ তোকে বোধহয় ঘরের বাইরে বের হতে দিবে না।"

"দূর বোকা! নীল কি এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী?" নীল নিজের ভেজা চুলগুলো এক ঝটকায় পিছে সরিয়ে আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বলল, "চল তো ক্যান্টিনে যাই। প্রিন্সিপাল স্যারের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর পেটের সব এনার্জি শেষ হয়ে গেছে। আগে ফুচকা কিংবা অন্য কিছু পেটে চালান করা যাক, তারপর দেখা যাবে বাকি দুনিয়া!"

দুপুরে কলেজ ছুটির পর ক্যাম্পাসের গেটে আসতেই দেখা গেল আজ রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। আকাশে মেঘের আনাগোনা না থাকলেও ভ্যাপসা গরমটা ঠিকই বজায় রয়েছে। নীল, আল্পনা আর নিপা একসাথে হেঁটে মেইন রোডের দিকে এগোচ্ছিল।

ঠিক তখনই পাশ দিয়ে একটা কালো রঙের গাড়ি শোঁ করে বেরিয়ে গেল। গাড়ির কাঁচ নামানো থাকাতে দেখা গেল খোদ প্রফেসর নীলাদ্রি ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন। তিনি যাওয়ার সময় নীলের দিকে এক পলক তাকিয়ে বাঁকা একটা মুচকি হাসি দিয়ে গাড়িটি চালিয়ে চলে গেলেন।

নীল দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল, "দাঁড়াও মিস্টার নিরামিষ! তোমার ওই মুচকি হাসির এমন বিচ্ছিরি দশা করব যে সারাজীবন মনে রাখবে।"

বাড়ি ফেরার পর অবশ্য যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তেমনটাই ঘটল। নাসিমা বেগম ড্রয়িংরুমে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নীল ঘরে ঢোকার মুখেই শুরু হলো আসল প্যান্ডোরামিক শো। নাসিমা বেগম কড়া গলায় বললেন, "কী রে বাহাদুর মেয়ে? প্রিন্সিপাল নাকি আজ তোর নামে বিচার দিয়েছিল কলেজে? তোর এই বাঁদরামি কবে কমবে বল তো?"

নীল এবার আর মুখে কোনো টু শব্দ করল না। সে খুব মায়াবী একটা মুখ বানিয়ে মায়ের সামনে গিয়ে হাতজোড় করে ফেলল। আম্মুর হাত দুটো ধরে একটু কেঁদে দেওয়ার ভান করে বলল, "আম্মু গো! ওই বুড়ো প্রিন্সিপাল আর ওই নিরামিষ প্রফেসর মিলে আজ আমাকে আস্ত একটা ককটেল বানিয়ে খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল! তুমি যদি আজ আমাকে রক্ষা না করতে, তা হলে তো তোমার মেয়ে আর আস্ত থাকত না!"

নাসিমা বেগম মেয়ের এই নাটক দেখে আর হাসি ধরে রাখতে পারলেন না। শত রাগের মাথাতেও মেয়ের এমন অভিনয়ে তিনি ধমক দিয়ে বললেন, "যা ভাগ এখান থেকে! সারাদিন শুধু মুখে মুখে জবানজোড়ি আর ফাজলামো। তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়, দুপুরের খাবার টেবিলে দিচ্ছি।"

নিজের রুমে এসে নীল ব্যাগটা ছুড়ে ফেলল বিছানার ওপর। সে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা খুলল। আজকের পুরো দিনের ঘটনাটা একটা মজার কার্টুন স্কেচ আকারে ফুটিয়ে তুলে সেটার নিচে লিখে রাখল—"উগান্ডার নাতিন আর নিরামিষ স্যারের সাথে এক অসমাপ্ত যুদ্ধ!"

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। আজকের সকালটা বেশ রোমাঞ্চকর হতে চলেছে, কারণ নীল মনে মনে একটা দুর্দান্ত প্ল্যান এঁকে ফেলেছে। কলেজে পৌঁছানোর পর থেকেই তার চাঞ্চল্যের মাত্রা একটু বেশিই ছিল। আল্পনা আর নিপা তো ভয়ে ভয়ে ছিল যে আজ আবার নতুন কোন বিপদে পড়তে হয়।

কলেজের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই নীলাদ্রি স্যারের সাথে দেখা হয়ে গেল। নীলাদ্রি আজ বেশ ক্যাজুয়াল লুকে আছেন। তিনি নীলকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু থেমে গম্ভীর গলায় বললেন, "কী ব্যাপার মিস নীলিমা? কালকের ধমক কি একদম গায়ে লাগেনি? আজকেও দেখছি বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন!"

নীল একটুও ভয় না পেয়ে পিছে হাত দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, "স্যার, দুশ্চিন্তা মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয়। আর আমি তো আয়ু বাড়াতে ভালোবাসি! তাছাড়া আপনার মতো গম্ভীর মানুষকে দেখলে তো আমার বরং হাসির রোল ওঠে।"

নীলাদ্রি সামান্য অবাক হলেন। এই মেয়ের মুখে এমন কথা শোনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চোখ কুঁচকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কলেজের স্পিকার বেজে উঠল এবং জরুরি ঘোষণা এলো—আগামীকাল কলেজ ক্যাম্পাসে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটিকা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সকল শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক।

এই ঘোষণা শোনার পর নীলের চোখের কোণে এক অদ্ভুত দুষ্টুমি ঠিকরে বের হলো। সে মনে মনে ভাবল, এই নাটিকা প্রতিযোগিতাতেই মিস্টার নিরামিষকে এমন এক শিক্ষা দেওয়া যাবে, যা সে সারা জীবনেও ভুলবে না।

নীল নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে চতুর হাসি হেসে বলল, "তাহলে স্যার, কালকের নাটকে কি আপনিও পারফর্ম করছেন? আমরা কিন্তু আপনার সেই গম্ভীর রূপ দেখতে মুখিয়ে আছি!"

নীলাদ্রি ঠান্ডা গলায় বললেন, "নিজের চরকায় তেল দিন, মিস নীলিমা। কালকের নাটকে কে কী করবে, সেটা সময় বলে দেবে।"

এই বলে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন। নীল যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হেসে বন্ধুদের বলল, "চল রে! কালকের নাটকে এমন একটা টুইস্ট আনব, যাতে পুরো কলেজ কাঁপতে বাধ্য!"

বাইরে তখন দুপুরের সোনালী রোদের আলোয় চারপাশটা ঝলমল করছে। আগামীকালের সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর নীলের নতুন কোনো পাগলামির অপেক্ষায় পুরো কলেজ চত্বর যেন একটা থমথমে উত্তেজনার ভেতর দিন কাটাচ্ছে।

কলেজের করিডোরে নাটকের নোটিশ টাঙানোর পর থেকেই চারদিকে এক অদ্ভুত হইচই পড়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে কে কোন নাটকে অংশ নেবে, কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবে। আল্পনা আর নিপা নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল।

আল্পনা মুখ গোমড়া করে বলল, "দোস্ত, কালকে আবার কিসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান! এমনিতেই তো প্রিন্সিপাল স্যার আর ওই নীলাদ্রি স্যারের কালো তালিকায় আমাদের নাম একদম ওপরের দিকে আছে। এর মধ্যে আবার নাটক! কে কোন নাটকে অংশ নেবে কে জানে? আমার তো ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

নিপা ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলল, "ঠিকই বলেছিস। স্যারেরা সুযোগ খুঁজছেন আমাদের ওপর রাগ ঝাড়ার। আর তুই না জানি আবার কোন নতুন বিপদের ফাঁদ পাতছিস, নীল!"

নীল নিজের চুলে আঙুল দিয়ে একটা পনিটেল বাঁধতে বাঁধতে বাঁকা হেসে বলল, "আরে তোরা এত ভয় পাচ্ছিস কেন রে? জীবনটা একটা সিনেমা, আর সেখানে রোমাঞ্চ না থাকলে কি কোনো মজা আছে? কালকের নাটকে আমি এমন একটা কাণ্ড ঘটাব, যেটা দেখে ওই মিস্টার নিরামিষ প্রফেসর নীলাদ্রি আস্ত আকাশ থেকে মাটিতে পড়বেন!"ধুর না মতো থেকে আকাশে উঠে যাবেন।

নীলের কথা শুনে আল্পনা ও নিপা আঁতকে উঠল। নিপা ফিসফিস করে বলল, "খোদা! তুই আবার স্যারের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার প্ল্যান করছিস নাকি? প্লিজ নীল, এবার অন্তত শান্ত থাক। কাল যদি আবার কোনো কেলেঙ্কারি করিস, তবে কলেজ থেকে আমাদের একদম আস্ত দেশছাড়া করে ছাড়বে!"

"দেশছাড়া তো দূরের কথা, কালকের পর থেকে প্রফেসর নীলাদ্রি আমার নাম শুনলেই ভয়ে তেরছা পথে হাঁটবেন!" নীল চোখের পলক ফেলে চতুর ভঙ্গিতে একটা মুচকি হাসি দিল।

তারপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সোজা নাটকের রিহার্সাল রুমের দিকে পা বাড়াল।

ওদিকে স্টাফ রুমে বসে প্রফেসর নীলাদ্রি তখন একটি রেজিস্টার খাতা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। তাঁর মাথায় তখনো গতকালের সেই ফুচকার স্টলের ঘটনা আর প্রিন্সিপালের রুমে ঘটে যাওয়া কান্ডকারখানা ঘুরছে। এত সহজে তিনি নীলকে ছাড়বেন না—এই জেদটা তার মাথার ভেতরে শিকড় গেড়ে বসেছে। ঠিক তখনই ডিপার্টমেন্টের হেড এসে বললেন, "নীলাদ্রি স্যার, কালকের বার্ষিক নাটিকার জন্য কিন্তু আপনাদের বিভাগের কিছু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের কো-অর্ডিনেট করতে হবে। বিশেষ করে ছাত্রীদের দিকটা একটু সামলানো দরকার, বুঝতেই তো পারছেন কিছু ডানপিটে মেয়ে সবসময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।"

নীলাদ্রির চোখের সামনে ভেসে উঠল নীলের সেই ডানপিটে, নির্ভীক মুখটা। তিনি চশমাটা একটু ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন, "চিন্তা করবেন না স্যার, কালকের নাটকে কে কোথায় কী করবে, তার ওপর আমার কড়া নজর থাকবে। বিশেষ করে কিছু অতিরিক্ত চালাক চরিত্রের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা জরুরি।"

পরের দিন সকাল থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। গেট থেকে শুরু করে অডিটোরিয়াম পর্যন্ত রঙিন কাগজ আর ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় মুখরিত পুরো চত্বর। একেকটি ডিপার্টমেন্ট থেকে একেকটি নাটক বা নাচ পরিবেশন করার কথা রয়েছে।

অডিটোরিয়ামের পেছনে গ্রিন রুমে তখন সাজসাজ রব। নীল, আল্পনা আর নিপাও সেখানে উপস্থিত। নীল আজ একটি সাধারণ সাদা সালোয়ার-কামিজ পরেছে, তবে তার চোখের চাউনিতে সবসময়কার মতো সেই দুষ্টুমি আর চতুরতার ঝিলিক স্পষ্ট।

সে চুপিসারে একটা ছোট্ট থলে থেকে কিছু প্রপস বের করে আল্পনার হাতে দিল আর ফিসফিস করে বলল, "শোন, এই ডায়ালগ শিটটা আর এই নকল গোঁফটা ঠিক সময়ে স্টেজে নিয়ে যাবি। আর মিস্টার নীরামিষ যখন স্টেজে বক্তব্য রাখতে উঠবেন, ঠিক তখন সাউন্ড সিস্টেমে এই মিউজিকটা প্লে করে দিবি।"

আল্পনা ভয়ে ভয়ে সেটা হাতে নিয়ে বলল, "বলিস কী নীল! এটা কি কোনো সাংঘাতিক বিপদ ডেকে আনবে না তো?"

"বিপদ নয় রে বোকা, একে বলে এন্টারটেইনমেন্ট!" নীল খিলখিল করে হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পরেই অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। সামনের সারির বিশেষ চেয়ারগুলোতে বসে আছেন প্রিন্সিপাল তোফাজ্জল চৌধুরী, অন্যান্য অধ্যাপকগণ এবং অবশ্যই প্রফেসর নীলাদ্রি।

অডিটোরিয়ামের লাইটিং একটু মিম হয়ে আসতেই ঘোষণা হলো আজকের বিশেষ নাটিকা—"শিক্ষক বনাম ছাত্রীর অসমাপ্ত যুদ্ধ"।

নাম ঘোষণা হতেই দর্শকসারিতে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। খোদ প্রিন্সিপাল সাহেব ভ্রু কুঁচকে নীলাদ্রির দিকে তাকালেন। নীলাদ্রিও কিছুটা অবাক হলেন, কারণ এই নামের কোনো নাটক তো লিস্টে থাকার কথা ছিল না! তিনি সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন।

মঞ্চের পর্দা ধীরে ধীরে সরে গেল। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল এক অদ্ভুত রহস্যময় সুর। মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে নীল। তার পরনে একটা ওভারসাইজড কলারওলা শার্ট আর চোখে একটা নকল চশমা—ঠিক অবিকল প্রফেসর নীলাদ্রির মতো হাঁটার ভঙ্গি করে সে মঞ্চে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা নকল লাঠি আর মুখে সেই গম্ভীর ভঙ্গি।

দর্শকসারিতে বসে থাকা ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে ফেটে পড়ল হাসিতে। আল্পনা আর নিপা পর্দার আড়াল থেকে মুখ টিপে হাসতে লাগল।

নীল স্টেজের ঠিক মাঝখানে গিয়ে নীলাদ্রির গলার স্বরে অনুকরণ করে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "মিস নীলিমা! ক্লাসে লেকচার দেওয়ার নাম নেই, আর প্রতিদিন কলেজের বাইরে ফুচকা খাওয়ার পার্টি চলছে! আপনাদের কি একটুও আক্কেল জ্ঞান নেই?"

পুরো অডিটোরিয়াম তখন হাসির রোল পড়ে গেছে। সামনের সারিতে বসা প্রফেসর নীলাদ্রির মুখ তখন রাগে লাল হয়ে গেছে। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সিটের হাতল খামচে ধরে বসে রইলেন। তিনি বুঝতেই পারছেন না এই মেয়ে এত সাহস কোথায় পেল যে একদম সবার সামনে তাকে এভাবে ব্যঙ্গ করছে!

তোফাজ্জল চৌধুরী ছেলের দিকে এক চিলতে তাকিয়ে মুচকি হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পরিবেশের গম্ভীরতা বজায় রাখতে গম্ভীর থাকার ভান করলেন।

নীল কিন্তু থামার পাত্রী নয়। সে স্টেজে এদিক-ওদিক হাঁটতে হাঁটতে আরও উচ্চস্বরে বলতে লাগল, "কাল সকালে আমার গাড়ির টায়ার কে পাংচার করেছে আমি ভালোই জানি! ওই লিপ ক্লিপটা কার ড্রেসিং টেবিল থেকে এসেছে, তার হিসেব আমি কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেব!"

ঠিক সেই মুহূর্তে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিপা একদম পারফেক্ট টাইমিংয়ে বাজিয়ে দিল সেই গান—"ওহ বন্ধু লাল গোলাপি কই রইলা রে..."

এই গানটা বাজার সাথে সাথেই অডিটোরিয়ামের ছাত্রছাত্রীরা সমস্বরে তালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল।

নীলাদ্রি আর এক মুহূর্তও নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোজা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলে উঠলেন, "মিস নীলিমা! দিস ইজ টু মাচ! এখনই স্টেজ থেকে নেমে আসুন!"

নীল একটুও ঘাবড়াল না। সে স্টেজের মাঝখান থেকে হাত নেড়ে মিষ্টি হেসে বলল, "আরে স্যার! নাটক তো সবেমাত্র শুরু হয়েছে, এখনই রাগ করলে কীভাবে চলবে? নাটকের ক্লাইম্যাক্স তো এখনও বাকি আছে!"

এই বলেই নীল এক লাফে স্টেজ থেকে নিচে নেমে সোজা অডিটোরিয়ামের পেছনের দরজা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। নীলাদ্রি রাগে কাঁপতে কাঁপতে স্টেজের দিকে এগোতে লাগলেন। তোফাজ্জল চৌধুরী তখন আর হাসি আটকে রাখতে না পেরে মৃদু হেসে ফেললেন। তিনি নীলাদ্রির কাঁধে হাত রেখে বললেন, "শান্ত হও নীলাদ্রি! মেয়ের বুদ্ধি আছে মানতেই হবে।"

নীলাদ্রি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, আজ এই মেয়েকে হাতেনাতে ধরে একটা উপযুক্ত শিক্ষা না দিয়ে তিনি ছাড়বেন না।

ছুটির পর পুরো কলেজ চত্বর যখন ফাঁকা হয়ে আসছে, তখন নীল একাই কলেজের পেছনের আমবাগানের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। সে জানত নীলাদ্রি তার পিছু নেবেন। ঠিক তাই হলো। কিছুদূর এগোতেই পেছন থেকে গম্ভীর গলায় ডাক শোনা গেল, "একদম এক পাও নড়বেন না, মিস নীলিমা!"

নীল ধীরেসুস্থে ঘুরে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি। সে কোমর দুপাশে হাত দিয়ে বলল, "বলুন স্যার! নাটকে আমার পারফরম্যান্স কেমন লাগল? আপনার অ্যাক্টিংটা কি ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি?"

নীলাদ্রি লম্বা লম্বা পা ফেলে নীলের একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখের চাউনিতে তখন এক অদ্ভুত তীব্রতা। তিনি একটু ঝুঁکے এসে কঠিন গলায় বললেন, "খুব শখ হয়েছে না আমাকে নিয়ে মশকরা করার? কাল থেকে প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে শাস্তিমূলক ক্লাসে বসবেন। দেখি তখন এই মুখের হাসি কোথায় থাকে!"

নীল একটুও ভয় না পেয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলল, "শাস্তি দিতে চাইলে দিতে পারেন স্যার, তাতে আমার ভয় পাওয়ার পাত্রী আমি নই। তবে একটা কথা কি জানেন? আপনি যখন রেগে যান, তখন আপনাকে দেখতে ওই নাটকের চরিত্রের চেয়েও বেশি ফানি লাগে!"

নীলাদ্রির কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম হলো। নিজের সমস্ত রাগ আর সংযমের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি হুট করে নীলকে নিজের আরও কাছে টেনে নিলেন এবং শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে সোজা করিডোরের দেয়ালে ঠেসে ধরলেন। মুহূর্তের মধ্যে নীলের দুই হাত পিছন দিকে মুচড়ে ধরে তিনি নিজের সমস্ত রাগ ও জেদ এক নিমিষে মিশিয়ে দিয়ে নীলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন।

সেই চুম্বন ছিল যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই তীব্র আর ঝড়ের মতো বুনো। চারপাশের করিডোর, শিক্ষার্থীদের গুঞ্জন, প্রিন্সিপালের ভয়—সবকিছু যেন এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। সময়ের কাটা যেন ঠিক ওই মুহূর্তেই আটকে গেল। এক মিনিট, দুই মিনিট করে কাটতে লাগল সময়; কিন্তু নীলাদ্রির ভেতরের জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ যেন ওই একটানা চুম্বনে গলে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

তিনি যেন কিছুতেই থামতে পারছিলেন না, আর নীলও এই চরম আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তার চোখের পলক ফেলা বন্ধ হয়ে গেল, বুকের ভেতরটা হাপরের মতো দুলতে লাগল। একটানা তিরিশ মিনিট ধরে চলা এই রুদ্ধশ্বাস আবেগের বন্যায় নীলের ফুসফুসে অক্সিজেনের ঘাটতি শুরু হলো। তার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল, চোখের সামনে সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।

অবশেষে একটানা দীর্ঘ সময় পর যখন নীলাদ্রি সামান্য আবেশে চোখ মেললেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন নীল আর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নেই। অতিরিক্ত উত্তেজনায়, অক্সিজেনের অভাবে এবং এই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতায় নীল পুরোপুরি সংজ্ঞাহীন হয়ে নীলাদ্রির বুকের ওপর ঢলে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল!

নীলাদ্রি ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত তাকে শক্ত করে নিজের বাহুডোরে সামলে নিলেন এবং ডাকলেন, "মিস নীলিমা! নীল! কী হলো আপনার?"

ছেহ নীলাদ্রি এই হাঁটুর বয়সী মেয়ে কে কিস করে দিলি তো অজ্ঞান করে এবার ঠেলা সামলা।

চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন