সকালে সকালেই ফোনের রিংটোনে ঘুমটা ভেঙে গেল।
— ধুর! কেন যে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলাম না!
ঘুম জড়ানো চোখে ফোনটা হাতে নিতেই দেখি মাবিহা কল দিয়েছে।
— কী রে তানু! এখনো ঘুমাচ্ছিস নাকি? কতক্ষণ ধরে কল দিচ্ছি!
তানিশা হাই তুলে বলল,
— হ্যাঁ রে, ঘুমাচ্ছিলাম। বল, কী হয়েছে?
— কলেজের সময় হয়ে গেছে, আর তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস! আমি কি তোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকব নাকি?
কলেজের কথা শুনেই তানিশা তাড়াতাড়ি ঘড়ির দিকে তাকাল।
— আরে! সত্যিই তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুই দাঁড়া মাবু, আমি এখনই আসছি।
তাড়াহুড়ো করে তৈরি হতে হতে তানিশা মনে মনে বলল,
"আচ্ছা, নিজের পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি!"
আমার নাম তানিশা আক্তার। এবারই কলেজে ভর্তি হয়েছি। কমার্স বিভাগে পড়ি। ছোটবেলা থেকেই হিসাব আর গণিত আমার খুব ভালো লাগে।
আমার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। মা শাহানা আক্তার একজন গৃহিণী। আমরা তিন ভাইবোন।
আমার ছোট ভাই তুষার রহমান, সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট বোন সিদরাতুল আক্তার, সে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী।
বাবারা তিন ভাই। বড় চাচার নাম মোঃ রাশেদুল ইসলাম, মেজো চাচার নাম মোঃ কামরুল হাসান।
বড় চাচার তিন সন্তান। বড় মেয়ে তানিয়া, তার বিয়ে হয়ে গেছে। মেজো মেয়ে তাসনিম, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোট ছেলে সাফওয়ান, সে আমার সমবয়সী, তবে অন্য কলেজে পড়ে।
মেজো চাচার দুই সন্তান। বড় মেয়ে মিম, তারও বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছোট ছেলে সিয়াম, এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে।
এই হলো আমার ছোট্ট সুন্দর পরিবার।
সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হতে যাব, এমন সময় মা ডাকলেন।
— কী রে, নাস্তা করে যা।
— না আম্মু, অনেক দেরি হয়ে গেছে। মাবিহা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কলেজে গিয়েই কিছু খেয়ে নেব।
— আচ্ছা, সাবধানে যাস।
মায়ের কথা শুনে হাসিমুখে বের হয়ে গেলাম।
বাসার সামনে এসেই দেখি মাবিহা দাঁড়িয়ে আছে।
আমাদের বাসা কাছাকাছি হওয়ায় প্রতিদিন একসঙ্গেই কলেজে যাই। কলেজে পৌঁছাতে প্রায় বিশ মিনিট লাগে।
আমাকে দেখেই মাবিহা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— এত দেরি করিস কেন? রাতে কী করছিলি?
আমি হেসে বললাম,
— আর বলিস না! কাল একটা কোরিয়ান ড্রামা দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেছে।
— তুই আর তোর কোরিয়ান ড্রামা! এগুলোর নেশা কোনোদিন যাবে না।
— আরে, দেখতে ভালো লাগে বলেই দেখি।
হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— আচ্ছা, কলেজের পড়া শেষ?
— হ্যাঁ। তোর?
— হ্যাঁ, তবে অ্যাকাউন্টিংয়ের একটা অঙ্ক বুঝতে পারিনি। আজ স্যারকে জিজ্ঞেস করব।
— ঠিক আছে।
আমি আর মাবিহা ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো বন্ধু। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না—সবকিছুই আমরা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিই।
কলেজের সামনে পৌঁছাতেই আরও দুই বান্ধবী নুসরাত আর আফরিনের সঙ্গে দেখা হলো।
চারজন গল্প করতে করতে ক্লাসে ঢুকে পড়লাম।
সকাল নয়টায় ক্লাস শুরু। আমরা প্রতিদিনই আটটা চল্লিশের মধ্যে কলেজে চলে আসি।
কিছুক্ষণ পর স্যার এসে উপস্থিতি নেওয়া শুরু করলেন। তারপর পড়ানো শুরু হলো।
পড়ার মাঝেই আমি আর মাবিহা আস্তে আস্তে গল্প করছিলাম।
হঠাৎ স্যারের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— তানিশা, মাবিহা! কী হচ্ছে? পড়ায় মন দাও।
আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় হেসে ফেললাম।
তারপর মন দিয়ে ক্লাস করতে লাগলাম।
এভাবেই দেখতে দেখতে বিকেল চারটায় কলেজ ছুটি হয়ে গেল।
আমি, মাবিহা, নুসরাত আর আফরিন গল্প করতে করতে কলেজ গেট থেকে বের হলাম। তারপর সবাই একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ বাসায় চলে গেলাম।
বাসায় ফিরে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। তারপর দুপুরের খাবার খেয়ে একটু ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলাম।
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আমার কোচিং। তাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।
যেদিন কোচিং থাকে না, সেদিন বাসায় একজন স্যার এসে পড়ান। কিন্তু আজ স্যারের আসার দিন নয়।
ঠিক তখনই তুষার আমার রুমে ঢুকল।
— কী করো আপু?
— কিছু না। বল, কী হয়েছে?
— কিছু না, এমনি গল্প করতে এলাম।
আমি হেসে বললাম,
— আচ্ছা, বল।
তুষারের প্রতিদিনের অভ্যাস, স্কুলে কী হয়েছে, কোন স্যার কী বলেছে, কোন বন্ধু কী করেছে—সব আমাকে এসে বলতে হবে।
ওর কথা শুনতে শুনতে আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। আমিও একসময় স্কুল থেকে ফিরে আম্মুকে সব গল্প বলতাম। কলেজে ওঠার পর সেই অভ্যাসটা আর নেই।
অবশ্য ছোট বোন সিদরাতুল খুব একটা কথা বলে না। তবে আমরা তিন ভাইবোন একসঙ্গে থাকলে বাড়িটা হাসি-আনন্দে ভরে ওঠে।
তুষার কিছুক্ষণ গল্প করে চলে গেল।
আমিও কোচিংয়ের জন্য বের হলাম।সন্ধ্যা সাতটায় বাসায় ফিরলাম।আব্বু অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল।
আব্বু বাসায় ফিরতেই আমরা তিন ভাইবোন ছুটে গেলাম তাঁর কাছে। প্রতিদিনের মতো গল্প, হাসি আর ছোট ছোট দুষ্টুমিতে পুরো বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেল।
রাতের খাবার খাওয়ার পর নিজের রুমে এসে কিছুক্ষণ কোরিয়ান ড্রামা দেখলাম।
তারপর চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
এভাবেই আমার সাধারণ, ছোট ছোট আনন্দে ভরা দিনগুলো কেটে যেতে লাগল...
ঘুমানোর আগে প্রতিদিনের মতো আমি আমার ছোট্ট ডায়েরিটা হাতে নিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার একটা অভ্যাস আছে—দিন শেষে নিজের মনের কথাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখা।
আজ লিখলাম—
"নতুন কলেজ, নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই ধীরে ধীরে আপন হয়ে উঠছে। জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পথ চলা শুরু করেছি। জানি না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রতিটি দিন সুন্দরভাবে কাটাতে চাই।"
লেখা শেষ করে ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম।
হঠাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসল। দেখি কলেজের ক্লাস গ্রুপে আগামী সপ্তাহের একটি অ্যাসাইনমেন্টের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সবাই একে অপরকে মেসেজ করছে।
মাবিহা লিখল,
— "কাল যেন দেরি না করিস কিন্তু!"
আমি হেসে রিপ্লাই দিলাম,
— "ইনশাআল্লাহ, কাল আর দেরি হবে না।"
কিছুক্ষণ গ্রুপের মেসেজ পড়ে ফোনটা পাশে রেখে দিলাম।
জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। দূরের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। এমন নীরব রাত আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয়, সব দুশ্চিন্তা যেন বাতাসের সঙ্গে কোথায় হারিয়ে যায়।
ঠিক তখনই আম্মু রুমে এসে বললেন,
— "এখনো ঘুমাসনি?"
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— "এই তো, এখনই ঘুমাতে যাচ্ছি।"
— "বেশি রাত জেগে থাকিস না। সকালে আবার কলেজ আছে।"
— "আচ্ছা আম্মু।"
আম্মু চলে যাওয়ার পর ঘরের লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো, জীবনের প্রতিটি নতুন দিন যেন নতুন কোনো গল্প নিয়ে আসে। হয়তো আগামীকালও তেমনই নতুন কিছু অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
কী হবে আগামী দিনে, কার সঙ্গে নতুন পরিচয় হবে, কিংবা কী নতুন ঘটনা ঘটবে—এসব কিছুই তখন আমার অজানা ছিল।
এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
নতুন দিনের শুরুটা ছিল একেবারে সাধারণ। কিন্তু আমি জানতাম না, এই সাধারণ দিনগুলোর মাঝেই ধীরে ধীরে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করবে, যা আমার পুরো জীবনটাই বদলে দেবে...
(এটা পুরাই কাল্পনিক কেউ সিরিয়াস নিবেন না যদি কোন ভুল হয়ে থাকে ক্ষমার দৃষ্টিকে দেখবেন । আমার এইটা ফাস্ট লিখা। যদি ভালো লাগে তাহলে রিভিউ দিবেন তাহলে আমি আরও সুন্দর সুন্দর করে দিবো । আরও বড় বড় পার্ট দিবো)