#প্রণবীনা
#লামিয়া_ইসলাম_স্বর্ণালী
পর্বঃ৫
শীতের দিন মানেই পিঠা আমাদের দেশে, রাস্তার মাঝে সকাল সকাল কতগুলো দোকান তো আছেই। কী ভিড় হয়ে থাকে। কিছু দিন পর কলেজ খুলবে, বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে। এত কিছুর পর এখন ভয় হচ্ছে। আসলে আমরা মানুষকে যেমন দেখি তেমন হয় তো? আম্মু পিঠা বানাচ্ছে রান্নাঘরে, আমি টুকটাক সাহায্য করছি। সবার আদরে থেকে কখনো কাজ করতে হয় নি আমার। ভাপা পিঠা তৈরি হচ্ছে সৌরভ খাচ্ছে। আমার মায়ের মুখটা ভীষণ মায়াময়। পাতলা ঠোঁট ছোট্ট ছোট্ট চোখ। বয়স ধরা দায় বড়। আমার দিকে তাকিয়ে আবারও কাজে মন রেখেই জিজ্ঞেস করলেন,
"কিরে সৌরভী তোর কি অর্ণবকে পছন্দ?"
লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলাম আমি, উত্তর না পেয়ে মা আবার বললেন,
"তোর ১৪-১৫ বছর বয়স ছিলো তখন থেকে আবিদ তোর প্রতি অন্যরকম ভাবে নজর রাখে, আরও তো মেয়ে আছে আমাদের বাড়িতে কিন্তু ছেলেটা তুই বলতে পাগল। কখন কী লাগবে না লাগবে তোর আব্বুর দেখতে হয় নি। ছেলেটার মুখের দিকে আজকাল তাকানো দায়।"
"হুম আবিদ ভাইয়া খুব ভালো আম্মু।"
সৌরভ আমার দিকে তাকিয়ে খুক করে বলে ওঠে, "পিঠা দে আমার প্লেটে স্কুলে যেতে হবে।"
পাশ থেকেই তুলে ওর প্লেটে দিলাম, কানে খুব চেনা পরিচিত একটা স্বর ভেসে আসে আমার আর মুখে হাসি ফুটে,
"উফফ চাচি পিঠা? বুড়ি আমাকে না ডেকেই সব সাবাড় করে দিচ্ছিস?"
হেসে উত্তর করলাম,
"তোমাকে না দিয়ে খেলে পেট ব্যথা করবে আসো আসো।"
সামনে এসে ঠিক আমার বরাবর মুখ করে বসে পড়লো আবিদ ভাইয়া, ঠোঁটে পরিচিত দুষ্টুমি মিশ্রিত হাসি। আম্মুর সামনে থেকে একটা স্টিলের বাটি নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। ওনাকে একটা পিঠা দিলাম, উনি খেয়ে মধুর ধ্বনি তুলে আম্মুর প্রশংসা করে বলছেন নানান কথা। মাঝে আমার সাথে ঠুকরো ঠুকরি করেছেন কয়েক বার। কথার মাঝে আমার ভাইটা বলে ওঠে,
"আবিদ ভাইয়া বেশি করে খেয়ে নাও, সৌরভীর বিয়ে হয়ে গেলে আর এমন করে খাওয়াবে না আমাদের ও যা ফেসকুন্নি।"
রাগে ওর মাথায় একটা থাপ্পড় দিলাম আমি, বেহায়া ছেলে এটা বলে কি লজ্জাটা না দিলো। তবে আম্মু আর আবিদ ভাইয়া থেমে গেলেন। আম্মুকে দেখলাম আবিদ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ নামালেন, আবিদ ভাইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এত সময়ের হাসিমুখটা কেমন মিইয়ে গিয়েছে৷ তবুও হেসে হেসে খাচ্ছে। আম্মু সৌরভকে ধমক দিয়ে বললেন,
"যা এবার খাওয়া তো শেষ, স্কুলে যা।"
আবিদ ভাইয়া আধাখাওয়া প্লেটটা রেখে বলল, "সৌরভী আর আমাকে বেরে খাওয়াবি না?"
ওনার চোখের দিকে কেনো যেনো তাকাতে পারছিলাম না, আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
"হুম আমার শ্বশুরবাড়ি গেলে নিজেই বেরে খাওয়াবো।"
"বুড়ি তোর বিয়ের পর তোর হাতের রান্না খাওয়ার জন্য হলেও সপ্তাহে সপ্তাহে গিয়ে থাকবো।"
আম্মু ওনাকে আরো পিঠা দিলে, সে বলে,
"না চাচি, খাবো না, কেমন যেনো গলায় বাঁধছে। গুড় বেশি করে দিও।"
কথাটা বলে উঠে চলে গেলেন, আধাখাওয়া পিঠার দিকে চেয়ে ছিলাম শুধু। অদ্ভুত রকম লাগছে। আম্মু আমার সামনে বসেই নরম স্বরে বলে উঠলেন, "অর্ণবের সাথে কথা হয় তোর? ছেলেটা বেশ ভালোই মনে হয়। ওর মায়ের ব্যবহার তো আরো মিষ্টি।"
"হুম হয়।"
ছোট করে উত্তর দিয়ে উঠে চলে আসলাম, ভালো লাগছে না, আবিদ ভাইয়ার ব্যবহারে পরিবর্তন হয়েছে খুব। আমি ওনার এমন ব্যবহারের অভ্যস্ত নই। নিজের রুমে আসতেই ফোনের শব্দ কানে আসে। কলটা রিসিভ করি আমি। ওপাশ থেকে অর্ণব আদুরে স্বরে বলে,
"এতগুলো কল দিলাম সুর কোথায় ছিলেন?"
হেসে বললাম, "আম্মুর সাথে রান্নাঘরে।"
"বাহ রান্না শিখছেন?"
"ইশ এমন করে বলছেন যেনো রান্না না জানলে আমাকে বসিয়ে খাওয়াবেন?"
"স্বপ্ন দেখুন ম্যাডাম, আমার জন্য আপনারই রান্না করতে হবে। আমি অন্য কারো হাতের রান্না খাবো না।"
"আগেই বলে দিচ্ছেন, তবে আপনার বউ কি রান্না করার জন্য বানাবেন?"
"আহাম আহাম আরো অনেক কিছু করতে চাই, করাতে চাই। সাথে এক হালি বাচ্চার মা বানানোর জন্য আপনাকে বউ বানাবো।"
ধুর বেয়াদব লোকের সাথে কি কথা বলবো আর, কি সব নির্লজ্জ কথা বলে এই লোক, মনে মনে এমন আরো কত কথা বলে, না বলেই কলটা কেটে দিলাম আমি। জানালার কাছে গিয়ে বসতেই অভিমানী মেসেজগুলো আসছে। লজ্জায় ওগুলোও সিন করলাম না। পরপর মেসেজ টুংটাং শব্দ আসছেই, লোকটা আমাকে মেসেজ দিয়ে ক্লান্ত হয় না। রোজ এমন সময় কাজে যাওয়ার আগে কল দিয়ে আমাকে জ্বালাবে। বাইরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি, কিছু পিঠার দোকানে লোকের ভিড় জমে আছে। আবিদ ভাইয়াকে দেখলাম, সামনেই একটা ফ্লেক্সিলোডের দোকানে বসে আছে। মনটা বরাবরের মতোই খারাপ করে। দেখতে পারলাম না, জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম আবারও বিছানায়।
---------
দিন যায় কত দ্রুত, পরিবারের সলা পরামর্শের পর কালকেই তো আমাদের বিয়ে। কিছু সময় পর হলুদ, তাদের বাড়ির লোক আসবে না, দূর হওয়াতে এটাই জানি আমি। হলুদ রঙের শাড়িতে বউ সেজে বসে আছি স্টেজে, চোখজোড়া ছোট থেকে পেয়ে আসা সঙ্গীটিকে খুঁজে চলেছে। আবিদ ভাইয়াকে দেখছি না, পাশেই কয়েকজনকে দেখলাম কেমন কানাঘুষা করছে। কারণ আমার গায়ে কাঠগোলাপের গহনা। তারা কি বুঝবে এই ফুলের অমূল্যতা? তবে আমি নিজেকে দেখে খারাপ লাগছে না। একে একে সবাই হলুদ দিয়ে গেলো আমাকে, আমার বড় আপা ডাকছে বসা থেকে উঠানোর জন্য, স্টেজে নাচ হবে। কিন্তু না কোনোভাবেই আমি নামবো না,
"আবিদ ভাইয়া কোথায়? উনি কেনো আসছে না?"
"ওর কাজ আছে তাই আসতে পারেনি। কালকে আসবে।"
হুট করেই মাথায় রাগ চড়ে বসলো আমার, জেদ করে বসা থেকে উঠে স্টেজ থেকে নেমে গেলাম, আব্বুর ধমক খেলাম, বড় ভাই ও আপুদের বকাও শুনলাম খুব। তবুও যেই লোক আমার জন্য নিজের সব কাজ ফেলে কলেজে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সে কি না আমার হলুদে কাজে আটকে আছে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা?
আমার কাজিন বোনগুলো আমার হাত ধরে টেনে নিচের দিকে নামাচ্ছে। এত সময় বসে থাকার জন্য বললো এখন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ছাদে প্যান্ডেল করা হয়েছিলো, সিঁড়ি থেকে একটি পা নামাতেই নিচ থেকে চেঁচামেচির ধুম শব্দ কানে আসে। নিচে বিশাল গেটের সামনে টেনে নিয়ে যায়। সামনে তাকাতেই পরিচিত কয়েকটা মুখ দেখলাম, রায়ান মামা ও তার বন্ধুরা, অর্ণবের কয়েকটা বন্ধু, অরিণ আর কয়েকটা মেয়ে। দুটো ছেলের হাতে মিনি সাউন্ড বক্সে গান বাজছে। অবাক না হয়ে পারলাম না, তাদের তো আসার কথা ছিলো না। আচমকাই ফুলে সাজানো একটি বাইক এসে ঠিক আমার সামনে থামে। চার পাশে সবাই হৈ–হুল্লোড় বেঁধে গেলো৷ অর্ণব হাসিমুখে বাইক থেকে নেমে এক মুঠো চকলেট এগিয়ে দিয়ে বললো,
"এক মুঠো চকলেটের সাথে আমাকে নিয়েছিলেন সুর, আজ এই মুঠো চকলেটের পরিবর্তে আপনাকে দিয়ে দিন।"
অর্ণবের উপস্থিতি আমাকে আজ খুশি করতে পারলো না, কিঞ্চিৎ ভাবনায় আমি আবিদ ভাইয়াকে খুঁজে চলেছি। একটু লোক দেখানো হাসি। অর্ণব আবারও কিছু বলতে যাবে তখন কারো হালকা হাতে মাথায় থাপ্পড় পড়লো আমার, পেছনে তাকিয়ে দেখি সেই চোখে হারানো নিখোঁজ লোকটা, আবিদ ভাইয়া হেসেই ধমক দিয়ে বলল,
"তোর জন্যই এত সারপ্রাইজ প্ল্যান করলাম, জামাইকে দেখে তুই মুখ কেনো বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস?"
হাসলাম, হ্যাঁ মনটা প্রফুল্ল হলো, অর্ণবকে উপেক্ষা করে প্রথম বারের মতো আবিদ ভাইয়াকে সামনে থেকে জড়িয়ে ধরলাম, ওনার শরীর ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। একটু নরম ও কাতর স্বরে কান্নাভাব এনে বলেই ফেললাম,
"আমার জন্য এতগুলো বছর এত কিছু করেছো তুমি। আমার বাবারও কখনো আমাকে নিয়ে ভাবতে হয়নি। আমি ভেবেছিলাম এত দিনের এত কিছুর পর তুমি হয়তো আমার এই আনন্দের দিনগুলোতে আসবে না।"
চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে আমার, আবিদ ভাইয়া মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
"ধুর বুড়ি, তুই বোকা নাকি? যাই হয়ে যাক তোর দিন সুন্দর করতে আমি আছি। ভাবলি কি করে আমি রাগ করে নষ্ট করে দেবো এত সুন্দর দিনটা?"
কান্না করছি আমি, সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, উনি একটু ঝুঁকলেন, জড়িয়ে রেখেই কানের কাছে হিসহিসিয়ে বলতে থাকেন,
"তুই হয়তো আমাকে তেমনভাবে দেখিসনি। তবে আমি সবসময় তোকে ভালোবাসি, তোকে কষ্ট দেয়া যে বড় কঠিন আমার জন্য।তোর জন্য তোকেও ছাড়তে পারবো। সৌরভী ভাইয়াকে ভুলে যাস না, এতটুকুই চাই।"
আমাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে উনি হেসে দিলেন, আমিও চোখ মুছে নিলাম, অর্ণব আমার দিকে তাকিয়ে আছে আগের মতোই হাসিমুখে। ওর কাছে এগিয়ে যেতেই হেসে দিলো লোকটা। একটু আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না। এতগুলো লোকের সামনেও লোকটা আমায় কিছু বললো না। সে এগিয়ে আমার হাতে সেদিনের মতো জোর করে চকলেটগুলো গুঁজে দিয়ে বলে উঠলো,
"লেনদেন শেষ, চকলেটগুলো আপনার আর আপনি আমার, কালকে যেনো কোলে নিতে না হয়। তবে কোলে নিতেও সমস্যা হবে না।"
হাস্যস্বরে বললাম,
"সেদিন নিজের দায়িত্বও তো এমন জোর করে হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন। আজকেও আমাকে ঘুষ দিচ্ছেন জোর করে, আর আমাকেই নিয়ে নিচ্ছেন? মানি না আমি।"
পুরো বাড়িতে হাসির তোর, রায়ান মামার চোখে আজ সেদিনের মতো অনুভূতি দেখলাম না। বুঝলাম রায়ান মামার অ্যাট্রাকশন ছিলাম আমি। আমাদের নিয়ে আবারও ছাদে যাওয়া হলো। সবাই নাচগান করে নিলো মন ভরে, আবিদ ভাই হলুদও দিলো আমাকে। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে, লোকজন কমে যাচ্ছে। অর্ণবদের যাওয়ার সময় হয়ে আসছে। অর্ণব আমার পাশ ঘেঁষে বসে হাতগুলো শক্ত করে ধরলো। পরিচিত হাসি রাখলো চোখে আর বিরবির করে বলল,
"এত সাজ কেনো সুর? আপনাকে তো ন্যাচারাল সাজেই দারুণ লাগে।"
"এখন ভালো লাগছে না?"
"লাগছে, আপনাকে আমার চোখে সব রূপেই অপূর্ণ সুন্দরী লাগে। তবে আপনার ঠোঁটে পিঙ্ক শেড বেশি মানায়। একদম আমাকে প্রেমে ফেলে দেয়ার মতো।"
লজ্জায় মাথা নত করে বসে আছি আমি, ভয়ও আছে মনের মাঝে, কাল না জানি আমার জীবন কতটা পরিবর্তন আনে। একটি হাত আমার পেছন থেকে বাহুতে রেখে আলতো করে ধরে নিজের একটু কাছে নিয়ে নেয় অর্ণব। ওর দিকে তাকাতেই নরম স্বরে বলল, "চিন্তা করছেন সুর?"
"একটু তো হচ্ছে, নতুন লোক, পরিবেশ, নতুন সম্পর্কের বাঁধন।"
"শুধু আমাকে নিয়ে ভাবুন, আর বাকি সব আমি ভেবে নেবো।"
একটু আস্থা পেলাম আমি, মাথা দুলিয়ে স্বায় দিয়ে দিলাম, অর্ণব উঠে আমাদের সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আবিদ ভাইয়াকে দেখলাম, পরের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাছু আমার সাথে দেখা করে চলে গেলো। ছাদটা পুরো নীরব হয়ে যায় আমি একটি কোনায় একটি চেয়ার নিয়ে বসেছি। যতই কেউ আস্থা দিন, বিয়ের বিষয়টা প্রতিটি মেয়ের জীবনে চিন্তা ও অপ্রস্তুতকর অনুভূতি দেয়।
বাতাসে শরীরটা কনকন করে কাঁপছে, দূর আকাশে আজ চাঁদটা বিশাল বড় ও সুন্দর। ছাদে ফুলের গাছগুলো দুলছে। আবিদ ভাইয়া আমার গোলাপ গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে,
"বউ যদি গোলাপ না দেয় তাহলে অপূর্ণ লাগে।"
কথাটা আমার কানে গোলাম গুঁজে দিয়ে বললেন, পাশেই একটা চেয়ারে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে বসে সে। আমাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলল,
"বসে আছিস কেনো? গিয়ে ঘুমিয়ে পর, কালকে সকালে উঠে পার্লার যেতে হবে।"
ওনার দিকে তাকালাম আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে। মুখে হাসি রেখে উত্তর করলাম,
"হুম যাবো। আচ্ছা ভাইয়া বিয়েটা কি বেশি তারাহুরো করে হচ্ছে মনে হয়?"
"না ঠিকই আছে, ভালো পাত্র কখনো হাত ছাড়া করতে নেই।"
"অর্ণব খুব ভালো, দূরে থেকেও লোকটা পাশে আছে মনে হয়।"
"হ্যাঁ তোকে খুব ভালোবাসে, ওর সব কথা শুনবি সব সময়।"
দু’জন চুপ করে আছি আকাশের দিকে তাকিয়ে, হালকা শীতে কাপতেই নিজের গায়ের কোট এগিয়ে দিলেন,
"রুমে যা বুড়ি ঠান্ডা লেগে যাবে, আর কাল তোর বিয়ে।"
উঠে ওনার কোট ওনার গায়ে জড়িয়ে দিলাম, আর বললাম,
"আমি রুমে যাচ্ছি ভাইয়া, তুমিও চলে যাও।"
"সৌরভী, আমি তোর ১৫ বছর বয়স থেকে ভালোবাসি, তার পর থেকে কখনোই কোনো ছেলেকে তোর কাছে আসতে দিতাম না, আমি বখাটে ছেলে না, তোর জন্য স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কোনো ছেলে তোর সাথে কথা বললে তাকে মেরে ধরে তোর সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিতাম। ভয় হতো রে খুব, যদি তুই কাউকে ভালোবেসে ফেলিস তবে আমি যে তোর বিপক্ষে যেতে পারবো না। তাই ছেলেদের থেকে দূরে রাখতাম।"
এই পর্যায়ে ওনার কণ্ঠ কাঁপছিলো, সাথে আমিও। শুধুই শুনছি ওনার কথা, একটু থেকে ঢোক গিলে নেয়,
"সেদিন চাচিকে বলেছিলাম তোকে একা না ছাড়তে, তবে তুই হয়তো অর্ণবের ভাগ্যে ছিলি। ভেবে নিয়েছিলাম তুই এলে আমি বিয়ের কথা বলবো বাড়িতে, আর বলেছিলাম, সেদিন তুই বললি আমি তোর ভাই! তবে তুই এতটা বোকা? সারাক্ষণ কি লাগবে, কি করবি, কোথায় যাবি, কি সমস্যা? সব দেখতাম তবুও বুঝলি না তোকে কতটা চাই আমি? আচ্ছা ওগুলো বাদ,অর্ণবের সাথে পরিচয় না হলে কি আমাকে বিয়ে করতি?"
উত্তর করতে পারলাম না, মাথা দুলিয়ে নাকোচ করলাম,আর বলার চেষ্টা করলাম,
"আবিদ ভাইয়া আমি আস…"
বলার আগেই আমাকে আবার থামিয়ে দিলেন তিনি,
"থাক আমকেই বলতে দে বুড়ি, আমি প্রকাশ করতে চাই, অপ্রকাশিত ভালোবাসায় কষ্ট বেশি আর আমি এর চেয়ে বেশি কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। তোকে সেদিন যেতে দেয়াই ছিলো আমার ভুল, আর ভুল করেছি তার হিসেব তো গুনে গুনে দিতেই হবে। কিন্তু আমি একটাই ভুলের মাশুল দিচ্ছি সেটা তুই। সৌরভী একটা রিকুয়েস্ট করবো তোকে?"
চুপ করে থাকাতে সে নিজেই আবার বললো,
"আজকে সন্ধ্যায় যা করেছিস আর কখনো করবি না। তোর প্রয়োজনে আর কখনো আমাকে ডাকবি না। মনে রাখবি এখন অর্ণব আছে। তোর আসে পাশে থাকলে কেমন যেনো কষ্ট হয় ভেতরটায়। তাই আমার থেকে যতটুকু পারিস দূরে দূরে থাকবি। আমি তোকে পর করছি না বা অভিমানও করে নেই। শুধু নিজেকে সামলাতে চাই তুই বারবার এসে আবিদ ভাইয়া আবিদ ভাইয়া বলে ডাকলে তোকে আবার চাওয়ার ভূত চাপে। অবুঝ মেয়ে তুই আমার অভ্যাস।"
শেষের কথাগুলো কেমন যেনো ঘোলাটে ছিলো, উনি থেমে থেমে বলছিলো, আমার কানে বাজছে বারবার আমাকে সব প্রয়োজনে ডাকবি না। ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম লাল হয়ে আছে। আমার সাথে চোখ মিলতেই অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন,
"যা ঘুমা, সকাল সকাল পার্লারে যেতে হবে।"
ওনাকে বলার মতো কথা আজ ছিলো না, অন্য সময় হলে হয়তো তর্ক করতাম বেশ জোরেশোরে। ওনাকে বকে ঝেড়ে একখানা করে দিতাম ঠিক। কিন্তু আজ না।
চলে আসার সময় পেছন ফিরে একটি বার ওনাকে দেখার জন্য চোখ ফেরাতেই বুঝলাম লোকটা ফুপিয়ে কান্না করছেন। অন্ধকারে ওনার ছায়াটা কেমন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিয়ে কান্না করছে।
চাইলেই অর্ণবকে ছেড়ে এই মানুষটাকে বিয়ে করতে পারবো। আমি জানি অর্ণব আমার দ্বিমত করবে না। কিন্তু ভাই, যাকে আমি ভাই ভেবে, শৈশব–কৈশোর কাটালাম তাকে স্বামী?
যদিও মেনে নিলাম, কিন্তু ভালো কি আদৌ কখনো বাসতে পারবো? নাহ পারবো না। হয়তো ওনার কষ্ট দেখে আজ বিয়ে ভেঙে ওনাকে বিয়ে করতে পারবো, তবে মন আমার অর্ণবকেই চাইবে সারাক্ষণ–সারাজীবন। এতে আবিদ ভাইয়াকে ঠকানো হবে, যার কষ্ট হবে অপরিসীম।
_____
সকালে মৃদু আলোতেই হৈচৈ এর শব্দ আসছে কানে। আর চেঁচিয়ে আমার নাম ধরেই ডাকাডাকি করছে আমারই আম্মু, বিয়ের আমেজ সকালের রোদ দেখা যায় আমি ঘুম থেকে উঠলাম না এখনো।
"এই মেয়ে আজকে তোর বিয়ে শশুরবাড়িতে গিয়ে কি ঘুমাবি এমন করে? স্বভাব পাল্টা এবার। তাছনু এসেছে উঠে পার্লার যা।"
আম্মুর চেচামেচিতে উঠে গেলাম, সবাই কাজ করছে, আবিদ ভাইয়াকে দেখলাম বড় বড় হাঁড়ি নিয়ে চেচামেচি করছে কয়েকজনের সাথে। সে রান্না ও ডেকোরেশনের কথা।
আর কথা হলো না পার্লার চলে আসি সবার সাথে, সিঁদুর লাল একটা লেহেঙ্গা, বিশাল ঘের আর ভারি কাজ। আমার মনে আছে, কাপড়ের কথা বলার সময় অর্ণব সবার আগে লাল রঙের কথা বলেছিলো। সবাই বিরোধিতা করায় সে মুখের ওপর বলেছে,
"আমার বউ আমি দেখবো। লাল রঙ ছাড়া অন্য রঙের কাপড়ে ওকে সাজানো হবে না।"
উফ এই জেনারেশনে কি কেউ এমন টকটকে লাল লেহেঙ্গা পরে? কেমন লাগবে ভেবেই বিরক্ত হচ্ছি। লোকটা খুব খাঁটেরামো করে। কিন্তু ভাবনার ছেদ করে একজন মেক-আপ আর্টিস্টের কথা কানে আসলো,
"উফ কি সুন্দর লেহেঙ্গা আপু, আপনার শশুরবাড়ির লোকের রুচি ভালো।"
তাছনুও বেশ প্রশংসা করলো। এমন নয় যে আমি কম সুন্দর কিন্তু লেহেঙ্গার রঙ ও ডিজাইন আমার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিচ্ছে এটা আমি আয়নার সামনে গিয়ে বুঝলাম। সেদিন আমি বেশ অস্থির ছিলাম, বিয়ের পরের জীবন কেমন হবে কে জানে?
_________
পার্লার থেকে এসে একটি কক্ষে আমাকে বসানো হয়েছে। ইতিমধ্যে আমাকে খাবার তুলে খাইয়ে দিলো আমার খালামনি। বাহিরে বরপক্ষের উপস্থিতি টের পাচ্ছি হৈচৈ হচ্ছে। শরীরের কম্পন বেড়েই চলেছে। চোখজোড়া স্থির নেই। দুজন মানুষকে খুব করে খুঁজছে। আবিদ ভাইয়া আর আম্মু। খাবার খাওয়ার কিছু সময় পর বিয়ের আমেজ জমলো আরো ধুমধাম করে। অর্ণবের বাড়ির লোক এসেছে তবে অর্ণবের সাথে দেখা হয় নি একটি বারের জন্য। আমার ননদ ও কয়েকজন মিলে ছাদে নিয়ে যাচ্ছে। চোখটা আমার সামনে বসে থাকা সাদা শেরওয়ানি পরা লোকটির দিকে। নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। সারাদিন সবার চোখে যা মুগ্ধতা দেখেছি তার চেয়ে হাজারো গুণ বেশি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে। ঠোঁটে পরিচিত হাসি লেপ্টে রেখেছে। অর্ণব দাঁড়িয়ে আমার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। ওর হাত ধরেই উঠলাম স্টেজে। চোখে চোখ রেখে আছি ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে। সে নিজের হাতের দিকে ইশারায় দেখতে বলে, আমি তাকালাম ঘড়িটা ঠিক চোখের সামনে অন্য হাতে দেখিয়ে ইশারায় বলল সেদিনের মতো, অপেক্ষা সমাপ্ত। ওর কাণ্ড দেখে ফিক করে হেসে দিলাম। সে বসার সোফা থেকে পুরো একগুচ্ছ কাঠগোলাপ আমার হাতে দিয়ে বললো,
"সুর, বলে ছিলাম মাত্র একটা মাস অপেক্ষা করুন আমার জন্য। আমি কিন্তু একদিনও বেশি অপেক্ষা করাই নি। হিসেব করে দেখতে পারেন।"
পাশ থেকে কাজিনগুলো মজা করে বলে ওঠে,
"জিজু কি এতটাই কিপ্টে যে আমাদের বোনকে সামান্য কাঠগোলাপ দিচ্ছে?"
"কাঠগোলাপকে তুচ্ছ ভাববেন না, ওরা অন্যরকম সুন্দর। এর সৌন্দর্যের তুলনা হয় না।"
সেদিন বিয়েটা সুন্দর করেই হয়েছে। শুধু কবুল বলার সময় আমি পেলাম না আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাই, অভিভাবক ও বন্ধুকে। আবিদ ভাইয়ার খোঁজ করে প্রায় দুই ঘণ্টা বিয়ে পিছিয়ে দিয়েছিলাম। এতে নানান কথাও শুনেছি লোকের। অবশেষেও তার দেখা পেলাম না। তাছুর কাছ থেকে শুনতে হলো, আবিদ ভাইয়া নাকি তার কোনো এক অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে গিয়েছেন। আমাকে বলেছেন সমস্যা না করে ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে। আমি জানি মিথ্যা ছিলো সব। অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম অর্ণবের কষ্ট হচ্ছে। হওয়ারই কথা নিজের হবু বউ অন্যজনের জন্য বিয়ে আটকে রেখেছে। সবার সামনেই আমার বাহুতে হাত রেখে শান্ত করে কিছু কথা বললো। কতক্ষণ এতগুলো লোককে অপেক্ষা করানো যাবে? রাত হয়েছে। তাই আর অপেক্ষা করা হলো না।
চলবে,,,,