#উপন্যাসের নাম: Blue Ink & Thorns'
#লেখিকার নাম: রহমাতুন্নেছা
৮ পর্ব
রোহানের ছবিগুলো দেখা শেষ করে সবাই যখন আবার আড্ডায় মন দিল, সারা তখন হঠাৎ একটা বিষয় খেয়াল করল। ও সোহান আর রোহানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, ""আচ্ছা সোহান ভাই, রোহান ভাই—আপনারা আমাদের বারবার 'আপনি' বলছেন কেন? আমরা তো আপনাদের চেয়ে দুই বছরের ছোট। আমরা সোহান ভাইকে 'ভাইয়া' বলি, আপনিও আমাদের 'তুমি' বা 'তুই' করে বলতে পারেন।""
সোহান আর রোহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। সোহান গিটারের তারে আলতো টোকা দিয়ে বলল, ""আচ্ছা ঠিক আছে! আমাদের ছোট বোনদের দাবি মেনে নিলাম। আজ থেকে তুই আমাদের ছোট বোন।""
পিউ পাশ থেকে চোখ টিপে বলল, ""আমিও তাহলে কি ছোট বোন?
সোহান বলল, তুইও তো আমার বোন?"" সোহান মজা করে 'তুই' সম্বোধন করল।
সারা এবার হাসতে হাসতে আনিতার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ""আর আনিতা? আনিতাও কি আপনার ছোট বোন হবে সোহান ভাই?""
সারার এই প্রশ্নে ক্যান্টিনের সবাই এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। আনিতা ও মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সোহান বেকায়দায় পড়ে গেল। সোহান হঠাৎ কাশতে শুরু করল।
""খক! খক! খক!""
আরাফ তড়িঘড়ি করে সোহানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ""কী হলো ভাইয়া? হুট করে কাশি শুরু হলো কেন? সারার কথা শুনে কি আপনার আনিতাকে 'বোন' হিসেবে পছন্দ হচ্ছে না?""
আরাফের কথায় ক্যান্টিনে হাসির রোল উঠল। সিয়াম হেসে বলল, ""সোহান ভাই, আপনার এই কাশি কিন্তু অনেক কিছু বলে দিচ্ছে!""
সোহান মুখ লাল করে এক চুমুক পানি খেয়ে বলল, ""আরে না না! ধুলোবালি লেগে কাশি হয়েছে। আর আনিতা... আনিতাও তো আমাদের বন্ধুই।"" ও আনিতার দিকে সরাসরি তাকাতে পারল না।
সারা পরিস্থিতিটা একটু হালকা করার জন্য রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল, ""রোহান ভাইয়া, আপনি তো গান গাইতে পারেন বললেন। আজ আমাদের একটা গান গেয়ে শোনান না! আপনার মন যা চায়, তাই গান।""
রোহান কিছুটা দ্বিধা করছিল। ও তো সবসময় ক্যামেরার পেছনে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু সবাই মিলে ধরল, গান গাইতেই হবে।
রোহান বলল, ""ঠিক আছে, গাইব। কিন্তু একটা শর্ত। তোরা সবাই আমাকে 'তুমি' বা 'তুই' করে বলতে হবে।""
সবাই একসাথে বলে উঠল, ""আচ্ছা! রাজী!""
রোহান তখন গিটারটা হাতে নিয়ে ক্যান্টিনের জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে তাকাল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ধানমন্ডি লেকের পাড়ের সেই 'মায়াবী কন্যা'র বিষণ্ণ মুখ। ও চোখ বন্ধ করল, ওর বুকের ভেতর থেকে যেন একটা সুর আপনাআপনি বেরিয়ে এল।
রোহান গাইতে শুরু করল এক অদ্ভুত মায়াবী কণ্ঠে:
তুমি কোন গ্রামে থাকো কন্যা,
কোথায় তোমার বাড়ি
মায়াবী কন্যা আমার মনটা নিলা কারি ।(+২)
মায়াবী কন্যা আমার মনটা নিলা কারি ।
..............🎺
দীঘর কালো চুল তোমার ডাগর ডাগর আঁখি মন ভরে না মন ভরে না যতই চাইয়া থাকি।
............🎷
দীঘর কালো চুল তোমার ডাগর ডাগর আঁখি মন ভরে না মন ভরে না যতই চাইয়া থাকি দিলের সুতায় টান লাগে গো দিলের সুতোয় টান লাগে গো একটু দিলেই আড়ি ।
.........🎸
তুমি কোন গ্রামে থাকো কন্যা,
কোথায় তোমার বাড়ি
মায়াবী কন্যা আমার মনটা নিলা কারি
মায়াবী কন্যা আমার মনটা নিলা কারি।
🎧💔💓💓💘💌🥀🎸
রোহানের গানটা শুনে ক্যান্টিনের কোলাহল থেমে গেল। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কন্ঠস্বর শুনছিল। গানটার প্রতিটা কথায় যেন এক অব্যক্ত ভালোবাসা আর অপেক্ষার সুর মিশে আছে।
সারা তাকিয়ে ছিল রোহানের দিকে। ও বুঝতে পারছিল, রোহান এই গানটা কোনো এক বিশেষ মানুষের কথা মনে করেই গাইছে। ওর মনের কোনো এক কোণায় যেন রোহানের জন্য একটু মায়া জন্মাল। ও জানত না রোহান কাকে 'মায়াবী কন্যা' বলেছে, কিন্তু গানটা ওর খুব ভালো লাগল।
আনিতা লজ্জা ভুলে রোহানের গানের দিকে তাকিয়ে রইল। সিয়াম, আরাফ, পিউ—সবাই অবাক হয়ে রোহানের প্রতিভার প্রশংসা করতে লাগল।
গান শেষ হওয়ার পর পুরো ক্যান্টিনে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এল। তারপর সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠল।
সোহান রোহানের কাঁধে হাত রেখে বলল, ""শান, তুই তো ফাটায় দিলি! আমি তো ভাবতাম তুই শুধু ছবিই তুলতে পারিস, কিন্তু তুই তো আস্ত একটা সিঙ্গার!""
রোহান মৃদু হাসল। ও জানত না, এই গানটা কোনোদিন তার মায়াবী কন্যা শুনবে কি না। কিন্তু বন্ধুদের এই প্রশংসা ওর মনে একটু আনন্দ দিল।
সেদিনের সেই অভাবনীয় ঘটনার পর ইশতিয়াক আহমেদ ইমনের আলিশান অফিসের পরিবেশটা যেন একটু থমথমে, আবার অদ্ভুতভাবে শান্ত। ইমন তার বিশাল কেবিনের কাঁচের জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে ঢাকা শহরের ব্যস্ততা, কিন্তু ইমনের মনে তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে সেই চঞ্চল মেয়েটির মুখ, যে মাঝরাস্তায় তার শার্ট খুলে নিয়েছিল।
ইমন এখন একটা নতুন নেভি ব্লু কালারের শার্ট আর ব্লেজার পরা, কিন্তু তার মনের ভেতর অস্বস্তিটা কাটছে না। ওর কানের লতির সেই ছোট তিলটা রাগে যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই দরজায় নক করে কেবিনে ঢুকল আয়ান। ও ফাইলপত্র টেবিলে রেখে ইমনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আয়ানের এই মিটিমিটি হাসি দেখে ইমনের মেজাজ আরও বিগড়ে গেল।
সে জানালার দিক থেকে ঘুরে আয়ানের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, ""তোর এত হাসির কী আছে? কাল থেকে দেখছি শুধু মিটিমিটি হাসছিস। কাজের কাজ কিছু না করে শুধু দাঁত বের করে আছিস!""
আয়ান হাসিটা কোনোমতে চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, ""আরে না ভাইয়া, হাসব কেন? আমি তো জাস্ট... জাস্ট ভাবছিলাম।""
""কী ভাবছিলি?"" ইমন এক পা এগিয়ে এল। ""ওই মেয়েটার কথা? যে মাঝরাস্তায় আমার শার্ট খুলে নিয়েছে?""
আয়ান এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও হো হো করে হেসে উঠল। ""ভাইয়া! বিশ্বাস করেন, আমি এখনো ওই মোমেন্টটা ভুলতে পারছি না। আপনার মতো এমন ভয়ঙ্কর মানুষকে ওই ছোট্ট মেয়েটা কী অবস্থাটাই না করল! আপনি তো এক মুহূর্তে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। গেঞ্জি পরা অবস্থায় আপনাকে কিন্তু দেখতে আসলেও ভালো লাগছিল!""
ইমন রাগে চেয়ারে ধপাস করে বসে বলল, ""চুপ কর আয়ান! ওই মেয়েটা একটা আস্ত অসভ্য। আমি ওকে ছাড়ব না। ও দুইদিন আগে আমার কার্ড ছিঁড়েছে, কাল শার্ট নষ্ট করেছে। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে।""
আয়ান হাসতে হাসতে বলল, ""উচিত শিক্ষা! ভাইয়া, আমার মনে হয় ওই মেয়েটাই আপনাকে শিক্ষা দিয়ে গেছে। আপনি তো কাউকে ডর পান না, কিন্তু ওই মেয়েটা আপনাকে এক মুহূর্তে কাবু করে ফেলল। তবে যাই বলেন, মেয়েটার সাহসের প্রশংসা করতে হবে।""
ইমন আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাল। "" প্রশংসা? তুই কি আমার ভাই না ওই মেয়েটার চামচা? ও যদি আবার আমার সামনে পড়ে, তবে আমি ওকে বাজেয়াপ্ত করব বলে দিয়েছি।""
আয়ান কাঁধ নাচিয়ে বলল, ""বাজেয়াপ্ত করবেন! কী করবেন, ওর স্কুটি? নাকি ওকে নিজেই? ভাইয়া, এই আহমেদ পরিবারের ছেলেরা কাউকে বাজেয়াপ্ত করতে চাইলে কিন্তু সেটা করে ছাড়ে।""
ভাইয়া আমি একটা ভালো প্ল্যান দিচ্ছি
ইমন আয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, যেমন কি প্ল্যান
তুমি ওই মেয়েকে বিয়ে করে নাও তাহলে তাকে শাস্তি দিতে ভালোভাবে পারবে বুদ্ধিটা কেমন ভাইয়া
আয়ান একটা চোখ টিপে দিল।
ইমন আয়ানের দুষ্টুমি বুঝতে পেরে একটা কলম ছুড়ে মারার ভান করল। ""ফালতু কথা বাদ দিয়ে কাজের কথা বল। ওই মালয়েশিয়ান প্রজেক্টের ফাইলটা কই?""
ঠিক তখনই ইমনের সেক্রিটারি মিস রিতা কেবিনে ঢুকলেন। উনি কিছুটা ঘাবড়ানো অবস্থায় ইমনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ""স্যার, ওই মেয়েটা... আপনার সাথে দেখা করতে চাই ""
ইমন কপাল কুঁচকে বলল, ""কোন মেয়েটা?""
""স্যার, ওই শারিন সরকার সারা। উনি আপনার শার্ট ফেরত দিতে এসেছেন। উনি বলছেন উনি নাকি আপনার শার্ট দিতে এসেছে,আর উনি ওনার কথা রেখেছেন।""
ইমনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। আয়ান পাশে দাঁড়িয়ে আবার মুচকি হাসতে লাগল।
ইমন গম্ভীর গলায় বলল, ""ওকে ভেতরে আসতে দিন।""
কিছুক্ষণ পর কেবিনে ঢুকল সারা। ওর হাতে একটা সুন্দরভাবে প্যাক করা প্যাকেট। ও ইমনের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। ""এই নিন, আপনার শার্ট। আমি ধুয়ে পরিষ্কার করে ইস্ত্রি করে এনেছি। আমি আমার কথা রাখি, কারো ধার রাখি না।""
ইমন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সারার দিকে তাকিয়ে রইল। সারার চোখে সেই একই তেজ আর চঞ্চলতা। ওর মনে হলো, এই মেয়েটা হয়তো কেবল তার শার্টই নয়, তার গুছিয়ে রাখা একঘেয়ে জীবনেও কোনো এক বড় ধাক্কা দিতে এসেছে।
আয়ান পাশ থেকে বলে উঠল, ""সারা আপু! আপনি আসলেও দুর্দান্ত। আমাদের এই বড় ভাইয়াকে কাবু করার জন্য তো আপনাকে মেডেল দেওয়া উচিত!""
সারা হেসে বলল, ""মেডেল লাগবে না। আমি শুধু অপমান হজম করি না, এটাই বুঝিয়ে দিলাম।"" ও ইমনের দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপে দিল, তারপর গটগট করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
ইমন তাকিয়ে রইল সেই চলে যাওয়ার পথের দিকে। ওর মনের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ কাজ করছে—রাগ না কি অন্য কিছু, সে নিজেও জানে না।
আয়ান পাশে এসে বলল, ""ভাইয়া, এইবার তো শার্টও ফেরত পেয়ে গেলেন। এবার ওই মেয়েটাকে বাজেয়াপ্ত করার প্ল্যানটা একটু ভাবেন!""আপনি চাইলে আমার প্ল্যান ব্যবহার করতে পারেন,
ইমন আয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এই হাসির আড়ালে যে কী লুকিয়ে আছে, সেটা কেবল '' ইশতিয়াক আহমেদ ইমনই জানে।
ইমনের কেবিন থেকে দর্পের সাথে বেরিয়ে এলেও সারার জেদ যেন পুরোপুরি মিটছিল না। লিফটে নিচে নামার সময় ওর মনে হলো, অপমানটা তো ও সামনাসামনি করেছে, কিন্তু ওই রাজকীয় অহংকারটা তো এখনো ওই কালো গাড়িটার গায়ে লেগে আছে।
পার্কিং লটে পা রাখতেই সারার চোখে পড়ল ইমনের সেই চকচকে কালো G-Wagon। সূর্যের আলোয় গাড়িটা যেন ধকধক করে জ্বলছে। সারা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। ও চট করে ওর ব্যাগ থেকে টকটকে লাল রঙের ম্যাট লিপস্টিকটা বের করল। গাড়ির বনেটের ওপর ঝুঁকে পড়ে বড় বড় অক্ষরে লিখতে শুরু করল— ""ডাস্টবিন ব্যাটা""।
সারা এতটাই মনোযোগ দিয়ে লিখছিল যে ওর চারপাশের পৃথিবীর কথা ও ভুলে গেল। লেখার সময় ওর অবাধ্য চুলগুলো বারবার মুখের ওপর চলে আসছিল, ওর দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছিল। সারা বারবার ফু দিয়ে চুলগুলো সরানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সেগুলো যেন ওর সাথে লুকোচুরি খেলছিল।
হঠাৎ করেই এক জোড়া শক্ত কিন্তু কোমল আঙুল খুব সন্তর্পণে সারার গাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।
সারা এতটাই লিখতে মনোযোগী ছিল যে ও ভাবল হয়তো আনিতা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ও বিড়বিড় করে বলল, ""আরে আনিতা, একটু দাঁড়া! নামটা জুতমতো হচ্ছে না, এই ব্যাটাকে আজ আমি শেষ করেই ছাড়ব।""
পুরো নামটা লেখা শেষ করে সারা সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের হাতের কাজের দিকে তাকিয়ে এক গাল বিজয়ের হাসি দিল। ""ব্যাস! একদম পারফেক্ট!""
পাশ থেকে খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ""অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না?""
সারা আনমনেই উত্তর দিল, ""তা তো একটু হয়েছেই। এই জাঁদরেল গাড়ির ওপর লিপস্টিক দিয়ে লেখা কি আর সহজ কাজ...""
বলতে বলতেই সারার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ খেলে গেল। কণ্ঠস্বরটা তো আনিতার নয়! ও ধীরপায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল—ইশতিয়াক আহমেদ ইমন চোখে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা খেলা করছে।
আয়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করছিল, ""এই মেয়েটার সাথে দেখা হবে আর ও কোনো অঘটন ঘটাবে না, এটা তো ইনপন্সিবল! আল্লাহ বাঁচাও আজ!""
সারা ভয়ে আর বিস্ময়ে এবার আসলেও জমে গেল। ইমন ওর দিকে এক পা করে এগোতে লাগল। সারা পেছাতে পেছাতে গিয়ে নিজের হাতে আঁকা সেই লাল লিপস্টিকের লেখার ওপরই ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। ইমন ওর খুব কাছে এসে ওর দুই পাশে গাড়ির ওপর হাত দিয়ে সারাকে আটকে দিল।
ইমন সারার ওপর ঝুঁকে পড়ল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস সারার কপালে লাগছে। ইমন দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে বলল, ""বেয়াদব মেয়ে! তোমার স্পর্ধা তো দিন দিন আকাশ ছুঁতে চাইছে।""
সারা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। বুক ধকধক করলেও ও ইমনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ""স্পর্ধা তো আপনার! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আবার আমাকে অপমান করার সাহস পান কোত্থেকে?""
ইমন সারার মুখের দিকে আরও একটু এগিয়ে এল। এতটাই কাছে যে সারার মনে হলো ইমন ওর চোখের মণির ভেতরটা পড়ে ফেলছে। ইমনের কানের লতির সেই তিলটা এখন সারার চোখের খুব কাছে। ইমনের তীব্র ব্যক্তিত্ব আর ওর গায়ের সুগন্ধ সারাকে মুহূর্তের জন্য দিশেহারা করে দিল। সারা বুঝতে পারল না ও রাগ করবে নাকি এই মায়াবী টানে হারিয়ে যাবে।
ইমন ওর ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ধরা গলায় বলল, ""এই লিপস্টিকের দাগ মোছা তো সহজ, কিন্তু আমার মেজাজ যেটা তুমি বিগড়ে দিলে, সেটার ঠিক কি করে হবে?""
সারা ঢোক গিলল। ওর মনে হলো এই ভিলেনটা যতটা রাগী, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি আকর্ষণীয়। পার্কিং লটের সেই নিস্তব্ধতায় দুজনের নিশ্বাসের শব্দ তখন একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল।
পার্কিং লটের সেই নিস্তব্ধতায় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ইমনের তপ্ত নিঃশ্বাস সারার ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সারার দ্রুত হওয়া নিঃশ্বাসের শব্দ ইমনের কানে বাজছে। সারার পুরো শরীর এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠছে, যেন ওর পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি কোষ অবশ হয়ে আসছে, অথচ এক অজানা উত্তেজনায় ও জমে পাথর হয়ে আছে।
ইমন এক দৃষ্টিতে সারার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সারার টানা টানা কাজল কালো চোখ দুটো আজ এক অদ্ভুত মায়ায় ভরা। ঘন আর লম্বা চোখের পাপড়িগুলো যেন ইমনের মনে হুল ফোটাচ্ছে। সারার চোখের মণি দুটো রোদের আলোয় সোনালী আভা ছড়াচ্ছে, আর অপমানে বা অজানা এক আবেগে চোখ দুটো হালকা ভেজা। সারার গোলাপি ঠোঁটের ঠিক নিচে বাম সাইডে থাকা সেই ছোট্ট তিলটা—যা দূর থেকে বোঝা যায় না—তা এখন ইমনের চোখের খুব কাছে। সেই তিলটা যেন সারার সৌন্দর্যকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
হঠাৎ এক ঝাপটা বাতাসে সারার অবাধ্য কয়েকটা চুল ওর মুখের ওপর এসে পড়ল। ইমন ঘোরের মধ্যেই নিজের বড় হাতটা বাড়িয়ে অতি আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। সারার গালের চামড়ায় ইমনের আঙুলের স্পর্শ লাগা মাত্রই সারা শিউরে উঠে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। ইমনের মনে হলো সে কোনো এক নিষিদ্ধ নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে। এই চঞ্চল মেয়েটার ভেতরে এমন এক মায়া লুকিয়ে আছে, তা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আয়ান এই বিরল আর শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তটার ছবি তুলে নিল। ও জানত, ওর এই পাথর হৃদয়ের বড় ভাইয়াকে এমন অবস্থায় আর কখনও দেখা যাবে না। ইমন তখন ঘোরের বশেই সারার দুই হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
ঠিক তখনই পার্কিং লটের গেট দিয়ে একটা গাড়ি ঢোকার শব্দে ইমনের হুঁশ ফিরে এল। সে যেন এক নিমিষেই সেই মায়ার জগত থেকে বাস্তবে আছড়ে পড়ল। নিজের অবস্থার কথা চিন্তা করে সে প্রচণ্ড বিরক্তিতে সারাকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। আকস্মিক ধাক্কায় সারা পেছনের গাড়ির শক্ত বডির সাথে বাড়ি খেল এবং ব্যথায় ওর মুখ কুঁচকে গেল।
সারা লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে দাঁড়াল। ও দেখতে পেল আয়ান ফোন উঁচিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইমন আড়চোখে তাকিয়ে দেখল আয়ান পুরো দৃশ্যটার ভিডিও করছিল। নিজের ওপর আর পরিস্থিতির ওপর চরম বিরক্ত হয়ে ইমন আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাল।
ইমন গম্ভীর গলায় গর্জে উঠল, ""আয়ান! ডিলিট দ্যাট ভিডিও রাইট নাউ!""
আয়ান দাঁত বের করে হাসল, কিন্তু বড় ভাইয়ের মেজাজ দেখে ফোনটা পকেটে ঢোকাল। সারা তখন নিজের ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে ইমনের দিকে শেষবারের মতো এক ঝলক অগ্নিদৃষ্টি হেনে নিজের স্কুটির দিকে দৌড় দিল। ওর মনে তখনো ইমনের স্পর্শের সেই শিহরণ আর বুকের ভেতর এক অজানা তোলপাড়।
চলবে,,,,,,"
"প্রিয় পাঠক, আমার এই গল্পের পর্ব কেমন লাগলো তা অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন। আপনার গঠনমূলক মতামত আমার লেখার পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
একটি বিশেষ অনুরোধ, এই সম্পূর্ণ গল্পটি আমার একান্তই নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত। যদি কখনো মনে হয় যে কোনো গল্পের সাথে এর কিছুটা মিল খুঁজে পাচ্ছেন, তবে দয়া করে আমাকে জানাবেন; আমি গল্পের মোড় ঘুরিয়ে এটিকে আরও অনন্য করে তোলার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ, আমার গল্পটি সম্পূর্ণ মৌলিক থাকবে।
আপনারা কষ্ট করে ধৈর্য ধরে আমার লেখাটি পড়ছেন, তার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। সবশেষে, বিনীত অনুরোধ রইল—কারও কষ্টার্জিত সৃজনশীল কর্ম বা লেখা কপি করা থেকে বিরত থাকুন। নিজের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দই আলাদা। ⚔️❌
নিজের কল্পনায় লিখুন, নতুন গল্প গড়ে তুলুন! ✅"