Blue Ink & Thorns' উপন্যাস
লেখিকা রহমাতুন্নেছা
পর্ব১৪
ঠিক তখনই গলির মুখে হুট করে চারটে কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে ব্রেক কষল। গাড়ি থেকে কালো স্যুট পরা, হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ১০-১২ জন পেশাদার বডিগার্ড নেমে এল। তারা REX-কে দেখা মাত্রই একযোগে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের লিডার এসে বলল, ""বস! আমরা চলে এসেছি। আপনার এই অবস্থা কারা করেছে?""
সারা তো বডিগার্ড আর তাদের হাতের আসল বন্দুক দেখে ভয়ে এক লাফ দিয়ে REX-এর পেছনে গিয়ে লুকাল। সে REX-এর হুডি খামচে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, ""ওরে বাবারে! হুডি ভাইয়া, এরা কারা? এরাও কি আপনাকে মারতে এসেছে? নাকি আপনি কোনো বড় ডাকাত দলের সর্দার?""
REX সারার এই ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া দেখে হুডির আড়ালেই মুচকি হাসল। সে তার গার্ডদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল ও গম্ভীর গলায় আদেশ দিল, ""রনি আর তার দলবল এই গলি দিয়েই গেছে। ওদের জ্যান্ত ধরো। এমন শাস্তি দাও যেন আর কোনোদিন অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে দাদাগিরি করার সাহস না পায়।""
""ইয়েস বস!""
বলে গার্ডরা চোখের পলকে রনিদের ধরতে অন্ধকারের দিকে ছুটে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দূর থেকে রনি আর তার গুন্ডাদের করুণ আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজ ভেসে এল
—""ওরে বাবারে! আর মারবেন না!আমরা আর REX পিছনে লাগবো না কখনো,,
আমাদের মাফ করে দেন!""
সারা REX-এর পেছনে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে শুনল। সে চোখ বড় বড় করে REX-এর সামনে এসে দাঁড়াল, ""ও মা! আপনি... আপনিই সেই ভিলেন REX? যার খবর আমি সকালে ফোনে দেখছিলাম?"" বলুন না আপনি সত্যি REX
REX কোনো কথা না বলে শান্ত দৃষ্টিতে সারার দিকে তাকিয়ে রইল। সারার চঞ্চলতা দেখতে থাকলো
সারা নিজের মাথায় একটা চড় মেরে বলল,
""ও আল্লাহ! আমি তো ভেবেছিলাম কোনো সাধারণ পাবলিককে গুন্ডারা পেটাচ্ছে! আমি কার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসলাম? স্বয়ং ডন! আচ্ছা ভাইয়া, আপনি ভিলেন হতে পারেন, কিন্তু দেখতে তো বেশ হিরোদের মতো বডি আপনার! আর শুনুন, আমি কিন্তু আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছি, তাই দয়া করে আমাকে আবার গুলি-টুলি করে দেবেন না যেন! আমি খুব ভালো মেয়ে।""
REX কি হুডি ভিতরে মুচকি হাসলো কি জানি,
REX-এর জীবনে আজ পর্যন্ত কেউ এভাবে সোজাসুজি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পায়নি। সবাই তার নাম শুনে কাঁপে, আর এই মেয়ে তাকে 'হুডি ভাইয়া' বলে ডাকছে, কি সুন্দর শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আবার নিজের প্রশংসাও করছে। মেয়েটির চোখের কোনো ভয় বা ব্যাকলতা নেই ,শুধু আছে চঞ্চল এবং নিষ্পাপ এক অদ্ভুত মায়া ,REX-এর মনে হলো, এই মেয়েটা আসলেও একটা পাগল, কিন্তু তার এই পাগলামিটাই যেন এই মুহূর্তে REX-এর অন্ধকার জগতের সবচেয়ে সুন্দর আলো।
REX আলতো করে পকেট থেকে একটা দামি চেইনের লকেট বের করে সারার হাতের তালুতে রাখল। তারপর তার সেই গম্ভীর ও মায়াবী গলায় বলল, ""ধন্যবাদ, আমার জীবন বাঁচানোর জন্য। এটা তোমার কাছে রাখো। কোনো বিপদে পড়লে এই লকেট টাই
নিজের বিপদের কথা বলবে, সাহায্য পাবে।""
সারা লকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, ""বাঃ! লকেটটা তো বেশ সুন্দর! তা এই লকেট সাহায্য করবে মানে?
সারার পুরো কথা বলার আগে REX হাত দিয়ে ইশারা করে থামিয়ে দিল,
বেশি কথা আমার পছন্দ না যেটা বলছি সেটা করবেন,
সারা যখন লকেটের দিকে তাকিয়ে আছে, REX তখন নিঃশব্দে হেঁটে তার কালো গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়িটা যখন স্টার্ট নিয়ে চলে যাচ্ছিল, সারা পেছন থেকে চিল্লিয়ে বলল, ""এই যে হুডি ভাইয়া! আমার ওড়নাটা কিন্তু ফেরত চাই! ওটা আমার খুব পছন্দের ওড়না ছিল!""
গাড়ির পেছনের সিটে বসে REX জানালার কাঁচ দিয়ে সারার চঞ্চলতার দিকে তাকিয়ে রইল। মাথা দিয়ে রক্ত পড়লেও, তার ঠোঁটের কোণে আজ এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে বলল, ""শারিন সরকার সারা... তুমি আসলেও একটা অদ্ভুত আগুন। আজ থেকে তুমি এই REX-এর নজরবন্দী হলে।""
সারা তখন লকেটটা ব্যাগে পুরে নিজের হোস্টেল দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, ""আজকের রাতটা যা অ্যাডভেঞ্চারাস গেল না! কাল আবার ওই হিটলার বসের অফিসে যেতে হবে। উফ, জীবনটা পুরো সিনেমা হয়ে গেছে!""
গাড়ির পেছনের সিটে বসে (REX) তার মাথা থেকে সারার সেই ওড়নাটা খুব আলতো করে খুলে নিল। ওড়নাটা হাতে নিতেই তার নাকে এসে লাগল এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস—দাবদাহের পর প্রথম বৃষ্টির মাটির গন্ধের মতো এক সতেজ ঘ্রাণ। আরএক্স ওড়নাটা নিজের নাকের কাছে ধরল। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে সে চোখ দুটো বন্ধ করল। এই সুবাস যেন তার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি আর মাথার তীব্র যন্ত্রণাকে এক নিমেষে ভুলিয়ে দিল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই নিষ্ঠুর, পাথর হৃদয়ের ডন নিজের অজান্তেই ওড়নাটা বুকের সাথে চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে তখন লেগে ছিল এক মায়াবী হাসির রেখা।
এদিকে গলির কাছে আসতেই সারার চোখ তো ছানাবড়া! সে দেখল আরএক্সের সেই আলিশান, কুচকুচে কালো রাজকীয় গাড়িটা তার রাজপথ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ড্রাইভার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দরজা খুলে দিয়ে বলল, ""ম্যাডাম, বস হুকুম করেছেন আপনাকে সসম্মানে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। প্লিজ উঠুন।""
সারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে এক লাফ দিয়ে গাড়ির নরম সিটে গিয়ে বসল। সে হাত-পা নেড়ে নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, ""ও মাই গড! ও মাই গড! আমি স্বয়ং আরএক্সের গাড়িতে বসে আছি? যে ভিলেনের খবরের জন্য আমি পুরো পাগল, যাকে আমি টিভির পর্দায় দেখি, আজ সে আমার সামনে ছিল! আমি তার জীবন বাঁচিয়েছি! ইয়েসসস!""
গাড়ি চলতে শুরু করলে সারা তার ব্যাগ থেকে আরএক্সের দেওয়া সেই লকেটটা বের করল। গাড়ির ভেতরের মৃদু আলোয় লকেটটা হাতে নিতেই সারার চোখ জুড়িয়ে গেল। লকেটটার ঠিক মাঝখানে বসানো আছে এক অদ্ভুত, অপার্থিব নীল রঙের পাথর। পাথরটা সাধারণ কোনো নীল নয়, যেন এক গভীর নীল সমুদ্রের রহস্য লুকিয়ে আছে তার ভেতরে। আলো পড়তেই সেটা থেকে এক মায়াবী দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সারা লকেটটা বুকের কাছে ধরে বলল, ""কী অদ্ভুত সুন্দর রে বাবা! হুডি ভাইয়া তো ভিলেন হতে পারে, কিন্তু ওনার চয়েস আছে বলতে হবে!""
গাড়িটা যখন সারার বাসার সামনে এসে থামল, সারা ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে সোজা এক দৌড়ে নিজের রুমের ভেতর ঢুকল। ঘরের দরজা লক করে সে খুশিতে বিছানায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। তার ভেতরের পাগলামি যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না।
সে বিছানা থেকে উঠে আলমারি খুলে দেখল তার বাবা রফিক সরকারের একটা ইস্ত্রি করা সুতি চশমখোর লাল-সবুজ চেক লুঙ্গি রাখা আছে। সারার মাথায় তখন ভূত চাপল। সে এক টানে নিজের থ্রি-পিসের ওপর দিয়েই বাবার সেই বিশাল লুঙ্গিটা কোমরে কায়দা করে পেঁচিয়ে নিল। তারপর কুচিটা একটু ওপরে তুলে গিঁট বাঁধল।
ফোনটা হাতে নিয়ে ফুল ভলিউমে 'লুঙ্গি ডান্স' গানটা ছেড়ে দিল সারা। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে কোমরে হাত দিয়ে পুরো দমে নাচ শুরু করে দিল!
কখনো সে এক হাত আকাশে তুলে কোমর দুলিয়ে নাচছে, কখনো আবার লুঙ্গির দুই কোণা হাত দিয়ে ধরে গোল হয়ে ঘুরছে। আয়নার সামনে গিয়ে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে চোখ টিপে বলল, ""কী সারা ম্যাডাম? আজ তো তুমি ডনের জান বাঁচিয়ে এলে! তোমার তো এখন ডান্স করাই উচিত!"" গান বাজছে আর সারা পুরো ঘর জুড়ে পাগলের মতো লুঙ্গি ডান্স দিয়ে নিজের আনন্দ প্রকাশ করছে। তার এই চঞ্চলতা, এই নিখাদ পাগলামিই যেন তাকে বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। সে ভুলেই গেছে যে কাল সকালে তাকে আহমেদ গ্রুপের সেই খিটখিটে বসের মুখোমুখি হতে হবে!
সকাল ঠিক ৯:০০টা। সারার ঘরের জানালায় কড়া রোদ এসে পড়েছে। আনিতা বিরক্ত মুখে সারার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ওকে ধাক্কা দিচ্ছে, ""এই সারা! ওঠ বলছি! ৯টা বেজে গেছে। তোর না আজ আহমেদ গ্রুপে যাওয়ার কথা?""
সারা এক চোখ খুলে ঘুম জড়ানো গলায় বলল, ""ধুর রেণু, আর একটু ঘুমাতে দে না... এত সকালে কেউ ডাকে?""
""সকাল ৯টা তোর কাছে সকাল? জলদি ওঠ!"" আনিতা জোর করে ওর গায়ের কম্বলটা টান দিতেই হাঁ হয়ে গেল। সে দেখল, সারা এখনো ওর বাবার সেই লাল-সবুজ চেক লুঙ্গিটা পরেই গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে!
আনিতা কপালে হাত দিয়ে বলল, ""ওরে আল্লাহ! তুই লুঙ্গি পরে ঘুমিয়ে আছিস কেন? তোর মাথায় কি আসলেও কোনো স্ক্রু ঢিলে আছে?""
সারা ঘুম চোখে মুচকি হেসে লুঙ্গিটা ঠিক করতে করতে মনে মনে ভাবল, ""আরে তোকে কীভাবে বলি কাল রাতে আমি স্বয়ং ডন REX-এর জান বাঁচিয়ে এসেছি!"" তবে মুখে সে চঞ্চলতা লুকিয়ে বলল, ""আরে, লুঙ্গি পরে ঘুমালে যে কী বাতাস লাগে, তুই বুঝবি না মিম! এটা এক্কেবারে ইন্টারন্যাশনাল কমফোর্ট!""
আসলে কাল ভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার পর থেকে সারার চোখ থেকে ঘুম এক্কেবারে উবে গিয়েছিল। তার মনে বারবার একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—আরাফ! বিকেলে পিউ যখন আরিয়ানের কথা বলল, তখন আরাফের মুখটা হঠাৎ অমন কালো হয়ে গেল কেন? যে ছেলে সারাক্ষণ আড্ডা মাথায় করে রাখে, সে ওভাবে মন খারাপ করে চলে গেল কেন?
বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারা ভাবছিল, ""আরাফ কি তবে পিউকে...? না না, ওটা হতেই পারে না! ওই বাঁদরটা আবার পিউয়ের প্রেমে পড়বে কীভাবে!"" এই চিন্তায় ঘুমাতে না পেরে সে মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছিল আর বারবার পাশে ঘুমানো আনিতার দিকে তাকাচ্ছিল, মেয়েটি কি শান্তভাবে শুয়ে আছে, একদম নিশ্চিন্তায়, মুখে কি মায়া অন্ধকারের হালকা আলোয় কি সুন্দর মায়াবতী লাগছে, সে যা ভাবছে যদি সত্যি হয় তাহলে কি হবে! না না না এটা হতে পারে না 🥲 🥹 বিড়বিড় করলো সারা, সারা চাইনা তার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কষ্ট পায়, টেনশনে তার মাথা ছিড়ে যাচ্ছে সে বুঝতে পারছে না কি করবে, ঘরে পায়চারি করতে থাকলো, অতিরিক্ত টেনশনে তার যেন ঘুম আসতেছে না, কি হবে,,
পাইচারি করতে করতেই সারার হুট করে মনে পড়েছিল ওই 'ডাস্টবিন বস' ইমনের সেই ২৫ হাজার টাকার শার্টটার কথা। সে আলমারি থেকে শার্টটা বের করে দেখল, আয়রনের গরমে বাম পাশে বুকের ঠিক ওপরে বেশ খানিকটা অংশ পুড়ে গোল হয়ে গেছে।
কোনোভাবেই ওটা আর পরার যোগ্য নেই।
কিন্তু সারা তো দমে যাওয়ার পাত্রী নয় তার ৩০০ টাকা নষ্ট হয়েছে এই শার্টের জন্য সেই টাকা তো উসুল করতে হবে! সে শার্টটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করল। তার মাথায় একটা দুর্দান্ত বুদ্ধি খেলে গেল। সে কাঁচি দিয়ে পুড়ে যাওয়া গোল অংশটা নিখুঁতভাবে কেটে ফেলল এবং সেখানে একটা কালো কাপড়ের টুকরো বসিয়ে দিল। যখন সেলাই করছিল, তখন তার মনে হলো—এই কালো কাপড়ের ওপর যদি লাল সুতো দিয়ে 'REX' লিখে দেওয়া যায়, তবে কেমন হয়? সে তো REX-এর মস্ত বড় ফ্যান!
কিন্তু ঘরে কোনো লাল সুতো ছিল না। তখনই সারার মাথায় ভূত চাপল সুতো কিনতে যাওয়ার। নিচতলায় সারাদেন হোস্টেল হওয়ায় ওর বের হতে কোনো সমস্যা হয়নি। দারোয়ান মামা তখন চেয়ারে বসে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। সারা চোরের মতো পা টিপে টিপে পার্স নিয়ে গেট গলে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল—আর তারপরই তো রাস্তায় REX-এর সাথে সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল!
স্মৃতির পাতায় কাল রাতের সেই মারদাঙ্গা আর রোমান্টিক মুহূর্তটা মনে পড়তেই সারার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে আনিতার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে কম্বলটা টেনে নিল।
আনিতা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে সারা এখনো বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। সে রেগে গিয়ে বলল, ""সারা! তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? ১০টার সময় তোকে ইমন ভাইয়ার অফিসে যেতে হবে না? ক্যারিয়ার শেষ করে দেবে বলেছে না?""
সারা কম্বলের ভেতর থেকেই হাত নেড়ে বিরক্ত হয়ে বলল, ""আরে রেণু, বিরক্ত করিস না তো! ওই খিটখিটে হিটলারের কাছেই তো যাচ্ছি, ফাঁসির মঞ্চে তো আর যাচ্ছি না! তুই যা, আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।""
সারা মনে মনে হাসল। সারা না চাইতেও উত্তেজনা নিয়ে অবশেষে বিছানা ছাড়ল।
আনিতা চলে যাওয়ার পর সারা আলসেমি ভেঙে বিছানা থেকে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো চুল আর লুঙ্গি পরা রূপ দেখে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর তোয়ালে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সারা আলমারি খুলল আজ কী পরবে সেটা ঠিক করার জন্য। অনেক ঘেঁটে সে একটা গাঢ় নীল রঙের গোল জামা বের করল। জামাটা অপূর্ব সুন্দর! এর হাতার কিনারা আর নিচের ঝুল দিয়ে নিখুঁত সোনালি রঙের পাইপিং করা, যা গাঢ় নীলের ওপর দারুণ মানিয়েছে।
জামাটা বের করতে গিয়েই সারার হাতে ঠেকল ইমনের সেই ২৫ হাজার টাকার সাদা শার্টটা। সারা শার্টটা হাতে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। শার্টের ঠিক বুকের কাছে, যেখানে পুড়ে গিয়েছিল, সেখানে একটা কালো রঙের নিখুঁত লাভ কাপড় বসানো। আর সেই কালো কাপড়ের ওপর লাল সুতো দিয়ে অত্যন্ত যত্ন আর শিল্পময় হাতে লেখা— 'REX'। শুধু তাই নয়, নামের চারপাশ দিয়ে লাল আর সোনালি সুতো দিয়ে ছোট ছোট ফুলের নকশা আঁকা। সারা নিজের হাতের এই মাস্টারপিস দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। সে আলতো করে শার্টটার 'REX' লেখা অংশে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিল। তারপর সেটা পরম যতে্নে ব্যাগে ভরে রাখল।
আজ সারার মনটা অকারণে খুব ভালো। সে নীল রঙের সেই গোল জামাটা গায়ে জড়াল। আয়নার সামনে বসে ঠোঁটে হালকা লাল রঙের লিপস্টিক লাগাল, চোখে গভীর করে কাজল দিল। চোখের পাতার ওপর হালকা লাল আইশ্যাডো তার মায়াবী চোখ দুটোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলল। ঠোঁটের ঠিক ওপরের সেই ছোট কালো তিলটা আজ যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে! লম্বা রেশমি চুলগুলো খোলা রেখে একপাশে একটা ছোট্ট সোনালি ক্লিপ আটকে দিল। গাঢ় নীল রঙের একটা ওড়না সে নিজের গায়ের সাথে খুব সুন্দর করে পেঁচিয়ে জড়াল।
সবশেষে, সারা গত রাতের সেই আরএক্সের (REX) দেওয়া নীল পাথরের লকেটটা গলায় পরল। নীল জামার সাথে লকেটের ওই অপার্থিব নীল পাথরটা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ তৈরি করল। দুই হাতে পরল একগুচ্ছ নীল কাঁচের চুড়ি, আর পায়ে রুপোর ভারী নূপুর। হাঁটার সময় রিনিঝিনি শব্দে পুরো ঘর মেতে উঠল। আজ তাকে একদম একটা নীল পরীর মতো দেখাচ্ছে!
সারা স্কুটি চালিয়ে আহমেদ গ্রুপের বিশাল অফিসের সামনে এসে পৌঁছাল। অফিসে ঢুকতেই রিসেপশনের সবাই তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এই সাধারণ মেয়েটার নীল রূপ আজ পুরো অফিসকে যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে। কানে নীল ঝুমকা আর চোখের কাজল—সব মিলিয়ে তাকে যে কতটা স্নিগ্ধ আর সুন্দর দেখাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
রিসেপশনিস্ট মিতাকে সারা জিজ্ঞেস করল, ""এক্সকিউজ মি, ইমন... আই মিন, আপনাদের বড় স্যার কোথায়? উনি আমাকে ১০টায় দেখা করতে বলেছিলেন।""
মিতা একটু ইতস্তত করে বলল, ""ম্যাডাম, বড় স্যার তো আজ অফিসে আসেননি। উনি নাকি গত রাতে অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন, এখন হাসপাতালে আছেন। স্যার আপনাকে ওই হাসপাতালেই যেতে বলেছেন।""
অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনে সারার বুকটা কেন যেন একটু কেঁপে উঠল। সে দেরি না করে হাসপাতালের দিকে রওনা দিল। যাওয়ার পথে সে ইমনের জন্য সুন্দর নীল গোলাপের একটা বুকে কিনে নিল।
হাসপাতালের ১০ তলার ভিআইপি ফ্লোরে পৌঁছে সারার চোখ কপালে উঠে গেল। ইমনের কেবিনের দরজার সামনে সারি সারি কালো স্যুট পরা, রোবটের মতো বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে।
সারা একটু ভয় পেয়ে গুটিসুটি মেরে এগোচ্ছিল। ঠিক তখন একজন বডিগার্ড সারাকে দেখে চমকে উঠল। সে তার পাশের জনকে ফিসফিস করে বলল, ""এই! একে তো আমি গত কালকে বসের সাথে রোমান্স অবস্থায় দেখেছি! তার মানে... ইনিই আমাদের বস-ম্যাডাম!""
বডিগার্ডের কথায় মুহূর্তের মধ্যে আট-দশজন বডিগার্ড একযোগে ৯০ ডিগ্রি ঝুঁকে সারাকে স্যালুট করে বলে উঠল, ""গুড মর্নিং, ম্যাম!""
সারা এই কাণ্ড দেখে চমকে দুই কদম পিছিয়ে গেল। সে নীল গোলাপের বুকেটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, ""ওরে আল্লাহ! এরা কি সবাই একসাথেই পাগল হয়ে গেল নাকি? এদের কি মাথায় কোনো তার-টার ছেঁড়া আছে?""
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে আয়ান বাইরে এল। সারাকে এই নীল পোশাকে দেখে আয়ান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সে মনে মনে ভাবল, ""ওহ মাই গড! এই মেয়েটা তো পুরো নীল পরী হয়ে এসেছে! বড় ভাইয়া তো আজ এমনিতেই শেষ!""
আয়ান মুচকি হেসে বলল, ""আরে সারা! তুমি এসে গেছ?
এইতো মাত্র ভাইয়া কিন্তু ওরা,,,?
ওরা পাগল , তুমি ভেতরে এসো।""
সারা একটু ইতস্তত করে আয়ানের সাথে কেবিনে ঢুকল।
কেবিনের ভেতরে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিল ইমন। তার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ইমনের মেজাজ তখনো খিটখিটে। কিন্তু দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সে যেই না দরজার দিকে তাকাল, তার চোখের পাতা যেন আর পড়ল না।
চলবে,,,,,,,,,