#আযদাহা
#দ্বিতীয়_খন্ড (পর্ব নাম্বার ৫)
#লেখিকাঃসাবিলা_সাবি
-----
দরবারের আবহাওয়া তখনও ভারী,যেন ফ্লোরাস প্রাসাদের প্রতিটি ইট-পাথর ফিওনার ফিরে আসার এই অভূতপূর্ব ঘটনার ভার বহন করছে।
সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লিয়ারা দ্রুত এগিয়ে এলো। ফিওনার অজ্ঞান দেহ তখনও জ্যাসপারের বুকের সঙ্গে মিশে ছিল।তার নিথর মুখে গভীর এক শান্তি,যেন এই অবস্থাতেই সে নিরাপদ।কিন্তু লিয়ারার চোখে সেই নিরাপত্তার ছায়া ছিল না।এক ঝটকায় ফিওনাকে জ্যাসপারের বুক থেকে আলতো করে ছাড়িয়ে নিলো লিয়ারা।ফিওনার কোমল দেহটিকে নিজের হাতে ধরে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।অন্য দুই নারী ড্রাগন সদস্য তাকে সহায়তা করছিল।
জ্যাসপার থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। তার অনুভূতিতে যেন একধরনের শূন্যতা ছড়িয়ে পড়লো। মনে হলো, কেউ তার কলিজাটা টেনে নিয়ে গেলো। ফিওনার ওভাবে চলে যাওয়ার দৃশ্য তার হৃদয়ে গেঁথে গেলো।তার হাত আপনা থেকেই সামনের দিকে বাড়ল, যেন ফিওনাকে আরেকবার ছুঁতে চায়। তার পা প্রায় এগিয়ে গেল, কিন্তু সে তখনই থেমে গেল।
ড্রাকোনিস,তার বাবা,শক্ত হাতে তার কব্জা ধরে ফেললেন। জ্যাসপার পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল,ড্রাকোনিসের চোখে কেমন এক কঠোর অথচ রহস্যময় দৃষ্টি।সেই দৃষ্টিতে ছিল সতর্কতার ইঙ্গিত।যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা আর পাহাড়ের মতো অটল।
জ্যাসপার ড্রাকোনিসের চোখে তাকাতেই মুহূর্তেই থেমে গেলো।সে চোখে ছিলো এমন কিছু,যা সব কথা না বলেও বুঝিয়ে দিলো যে আর এক পা এগিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস করোনা।
জ্যাসপারের মনে তবু অসংখ্য ঝড়।তার সামনে তখন একমাত্র চিন্তা,ফিওনা—অচেতন,নির্জীব,কিন্তু তবু তার অস্তিত্ব যেন সমস্ত ভেনাস ছাড়িয়ে শুধু তার নিজের।তার বুকের ভেতর ক্রমাগত অস্বস্তি আর যন্ত্রণা ছটফট করছিলো। তবু ড্রাকোনিসের সেই দৃষ্টি তাকে স্থির থাকতে বাধ্য করলো। সে জানতো,তার বাবার আদেশ অমান্য করা মানে রাজ্যের বিরুদ্ধে যাওয়া।
ড্রাকোনিস কিছু না বলেই মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সিঁড়ির দিকে ইঙ্গিত করলো।সেই দৃষ্টি জ্যাসপারকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলো—‘এখানেই থেমে যাও।’
জ্যাসপার গলা শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো।সিঁড়ি বেয়ে লিয়ারা আর বাকিরা ফিওনাকে নিয়ে উপরে উঠে গেলো।তার প্রতিটি ধাপের আওয়াজ যেন জ্যাসপারের কানে ধ্বনিত হচ্ছিলো কোনো শূন্য কক্ষে।সে স্থবির দাঁড়িয়ে রইলো,আর ড্রাকোনিস তার পাশে পাথরের মতো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে পাহারা দিলো। যেন এই যুদ্ধে জ্যাসপারের কাছে পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জ্যাসপার চোখ নামিয়ে ফেলে পেছনে সরে গেলো, কিন্তু তার মন পড়ে রইলো সেই সিঁড়ির ওপর। যেখানে তার কলিজার অংশটুকু কিছু মুহূর্ত আগেই ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
.
.
.
অ্যালিসার ক্রোধ যেন দরবারের পরিবেশকেও উত্তপ্ত করে তুলেছিল।তার ঠোঁট কেঁপে উঠছিল,আর চোখে ছিল এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,যা সে কোনোভাবেই লুকাতে পারছিল না।তার মুষ্টিবদ্ধ হাত আর দৃঢ় দাঁড়ানোর ভঙ্গি স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল, সে এই পরিস্থিতিকে এক বিন্দুও মেনে নিতে পারেনি।
সিলভাও অ্যালিসার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল,কিন্তু তার মুখেও স্পষ্টতই বিরক্তির ছাপ। “কি এক অবস্থা!” ফিসফিস করে অ্যালিসার দিকে ঝুঁকে বলল সে।“এক সাধারণ মানবী হঠাৎ এসে রাজকুমারী হয়ে গেলো!আবার কিছুক্ষন আগের পরিস্থিতি একদম প্রিন্সের বুকেই পড়তে হলো আর বাকি সবাইকে দেখো আপু,যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে মেনে নিচ্ছে!”
অ্যালিসা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“আমি এটা মেনে নেব না। ফ্লোরাসের দরবারে এমনটা আর কখনো হতে দেব না।”
তবে ঠিক বিপরীত দিকের কোণে থারিনিয়াস,আলবিরা, এথিরিয়ন,আর অ্যাকুয়ারা নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মুখে এক ধরনের মৃদু হাসি খেলা করছিল।তারা যেন পরিস্থিতিকে বেশ আনন্দের দৃষ্টিতে দেখছিল।
থারিনিয়াস আলবিরার দিকে চোখ টিপে বলল,“তোমার কী মনে হচ্ছে,ফিওনা আর প্রিন্সের প্রেম কি আবার হবে?”
আলবিরা মৃদু হেসে উত্তর দিল, “আমার মনে হচ্ছে, প্রিন্সের মুখ দেখেই এই ঘটনার ক্লাইম্যাক্স বুঝে নেওয়া যায়।তার মুখের অভিব্যক্তি বলছে,কিছু একটা বড়সড় হতে চলেছে সামনে।”
অ্যাকুয়ারা এক গ্লাস রক্তরঙা পানীয় তুলে নিয়ে বলল, “রাজনীতি আর রাজকীয় কূটকৌশল,সবই তো চলবে।কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি,প্রিন্স সহজে হাল ছাড়বে না।”
এদিকে এথিরিয়ন ঠোঁটে চেপে থাকা মৃদু হাসি লুকিয়ে বলল, “বাবার মুখের দিকে তাকাও।এমন মনোভাব আমি আগে কখনো দেখিনি,তার চোখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।”
ড্রাকোনিস সত্যিই অন্য সবার থেকে আলাদা ছিল।তার মুখে চিন্তার রেখা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।তার চোখ গভীর আর ভ্রু সামান্য কুঁচকে আছে।তিনি জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ,যেন তার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন।
রাজা জারেন,অন্যদিকে,সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিংহাসনে বসে ছিলেন।তার চোখে কোনো অবাক হওয়ার চিহ্ন নেই। যেন সবকিছুই তার পরিকল্পনার অংশ।তিনি এক হাতে রাজকীয় লাঠি ধরে সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন,“এই ঘটনা আমাদের সবার জন্য আশীর্বাদ।আমরা প্রাসাদের হারানো উত্তরাধিকারীকে ফিরে পেয়েছি।এবার সবকিছু ঠিকঠাক হবে।”
তবে তার এই কথার পরেও দরবারজুড়ে অস্বস্তির বাতাস রয়ে গেল।একপাশে অ্যালিসা আর সিলভা ক্রোধে ফুঁসছিল, আর অন্যদিকে থারিনিয়াস,আলবিরা অ্যাকুয়ারা,আর এথিরিয়ন দৃশ্যটা উপভোগ করছিল।
ড্রাকোনিস চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন,কিন্তু তার মনে একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।আর জ্যাসপারের চোখ তখনও ফিওনার চলে যাওয়ার পেছনে স্থির।তার হৃদয়ের গভীরে এক অস্থিরতা বারবার ধাক্কা দিচ্ছিল।
.
.
.
.
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে রাজপরিবারের সদস্যরা সবাই উপস্থিত।টেবিলজুড়ে সাজানো হয়েছে রাজকীয় খাবারের বাহার—হরেক রকমের মাংস,নানারকমের ফলের মিষ্টান্ন আর পাশে রক্তের মতো লাল ওয়াইনের গ্লাস। আলো-আঁধারির এই পরিবেশে যেন এক নিখুঁত চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে।কিন্তু এই জমকালো পরিবেশের মাঝেও কারও মুখে স্বাভাবিক আনন্দের ছাপ নেই।সকলেই নিঃশব্দে খাবার খাচ্ছে,কেউ কেউ একে অপরের দিকে সন্দেহমিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।ডাইনিং টেবিলের চারপাশে তখন নীরবতা। অ্যালিসা রাগে আগেই কক্ষ ত্যাগ করেছে, কিন্তু সিলভা যায়নি। তার স্থির সিদ্ধান্ত—এথিরিয়ন যেখানে আছে, সে ওকে একা রেখে যাবে না। তাই সবার চোখ এড়িয়ে সে ধীর পায়ে এসে এথিরিয়নের ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লো।
এথিরিয়ন চেয়ারের নড়াচড়া আর সিলভার উপস্থিতি অনুভব করেই বুঝতে পারলো, কে এসে বসেছে। ভেতরে ভেতরে তার বিরক্তি ক্রমশ বাড়ছিল। সিলভার এই ধরণের জেদ আর নিজের উপস্থিতি জাহির করার অভ্যাস তাকে বরাবরই অস্বস্তিতে ফেলে। তবে সে মুখে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো না। ঠোঁটের কোণে হালকা নিরপেক্ষ হাসি ধরে রেখে সে নিজের মনোযোগ সামনে থাকা পানীয়ের দিকে কেন্দ্রীভূত রাখলো।
সিলভা ধীরে ধীরে কথা শুরু করলো, তবে গলায় একধরনের কৌশলী মাধুর্য মেশানো। "এথিরিয়ন, তুমি কেমন করে এতোটা স্থির থাকতে পারো? এতকিছুর মাঝেও যেন তোমার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। সত্যি বলতে, এই গুণটা কিন্তু বিরল।"
এথিরিয়ন পানীয়ের গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে চোখে চোখে রাখলো না। কেবল হালকা স্বরে বললো, "বহু অভিজ্ঞতা মানুষকে স্থির থাকতে শেখায়। তবে তুমি কি এই নীরবতা উপভোগ করছো?"
সিলভা একটু হেসে বললো, "তোমার নীরবতাকে উপভোগ করা তো আমার কাছে অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু কখনো ভেবেছো, এই নীরবতার মাঝেই কতকিছু লুকিয়ে থাকে?"
এথিরিয়ন এবার গ্লাস নামিয়ে তাকালো সিলভার দিকে। তার চোখে একধরনের সতর্কতা, যেন সে বোঝাতে চাইছে, সিলভা যতই ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করুক, তার সীমানা অতিক্রম করার অধিকার কেউ পাবে না। "সত্যিই? তাহলে নীরবতায় লুকিয়ে থাকা কথাগুলো তুমি কি জানো, সিলভা?"
সিলভা একটু থমকে গেলেও হাল ছাড়লো না। "আমি জানি, এথিরিয়ন।তবে আমি চাই,তুমি নিজেই একদিন আমাকে বলো। কারণ তোমার কথা শুনতেই ভালো লাগে।"
এথিরিয়ন মুখে একটুকরো হাসি আনলো,তবে তার চোখে কোনো উষ্ণতা নেই
.
.
.
ফিওনা নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নরম বালিশে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে থাকা তার ক্লান্ত চেহারায় যেন সমস্ত অস্থিরতার ছাপ ফুটে উঠেছে।তার মাথার পাশে বসে ছিলেন তার মা লিয়ারা।এক হাত দিয়ে ফিওনার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলেন,“এখন কেমন লাগছে,ফিওনা?”
ফিওনা চোখ খুলে ধীরে ধীরে উঠে বসল।তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।লিয়ারা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলো,ফিওনার মনে কিছু বলার আছে।তিনি ধৈর্য ধরে ফিওনার মুখ থেকে কথা শোনার অপেক্ষায় থাকলেন।
“মা...” ফিওনার কণ্ঠটা ভাঙা ভাঙা শোনাল।“আমি তোমাকে একটা কথা বলিনি।”
লিয়ারা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে ফিওনার হাত ধরে বললেন,“কী কথা,মামনি?বলো।”
ফিওনা একটু দম নিয়ে বলল,“আমার গ্র্যান্ডপা আমাকে এখানে আসার আগে বলেছিলেন... প্রিন্স জ্যাসপার অরিজিনের সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু সে আমার মেমোরি রিমুভ করে দিয়েছে।”
লিয়ারার চোখ বড় হয়ে গেল।“তুমি কী বলছ,ফিওনা?”
ফিওনা একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,“গ্র্যান্ডপা বলেছিলেন,আমি আর ওই প্রিন্স একে অপরকে ভালোবাসতাম।কিন্তু সে আমাদের সবকিছু ভুলে যেতে বাধ্য করেছে।আমার সমস্ত স্মৃতি রিমুভ করেছে,যেন আমি তার অস্তিত্বই ভুলে যাই।”
লিয়ারা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।তার মনের ভেতর নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করল।“এত বড় সত্যি যদি হয়,তবে কেন জ্যাসপার এমন করল?আর কেনই-বা গ্ৰান্ডপা এমন কথা বললেন?”
লিয়ারা গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লেন।তিনি বুঝতে পারলেন,এই সত্যিটা যদি প্রকাশ পায়,তবে রাজ্যের পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠবে।তার কন্যার জীবন যে কতটা কঠিন হতে চলেছে,তা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ফিওনা মৃদু গলায় বলল,“মা,তুমি বলো,এটা কি সত্যি হতে পারে?”
লিয়ারা শান্তভাবে ফিওনার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আমি জানি না,মা।তবে আমি এটুকু জানি,তোমার জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন,আমি তোমার পাশে থাকব।তুমি শুধু স্ট্রং হয়ে থেকো।” ফিওনার চোখে জল এসে গেল।সে তার মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে রইল।
.
.
.
ডাইনিং টেবিলে আলো-আঁধারিতে সোনালী ঝাড়বাতির আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। তখন ওপরিবেশটা নিস্তব্ধ,তবুও একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল চারপাশে।ফিওনা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।পুর্বের গাউন পাল্টে নিয়েছে।এখন তার পরনে ছিল হালকা রঙের একটি গাউন যা তার ত্বকের উজ্জ্বলতাকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছিল। তার চলাফেরা যেন আত্মবিশ্বাস আর অভিজাত্যের মূর্ত প্রতীক।
লিয়ারার সাথে ফিওনা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল।প্রায় সবাই ইতোমধ্যে নিজেদের জায়গা নিয়েছে।ফিওনা এক মুহূর্তের জন্যও জ্যাসপারের দিকে তাকালো না।তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়লো ড্রাকোনিসের দিকে।ড্রাকোনিস তখন শান্ত ভঙ্গিতে ওয়াইনের গ্লাস হাতে বসে ছিল।কিন্তু ফিওনার চোখে যেন ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল।
ফিওনা নিজের অনুভূতিকে লুকানোর কোনো চেষ্টাই করলো না।সে ইচ্ছে করে পায়ের ওপর পা তুলে বসল,যেন তার উপস্থিতি সবাইকে বুঝিয়ে দেয়।রাজকীয় শিষ্টাচার রক্ষা করা তার কাছে তুচ্ছ।ড্রাকোনিসের দিকে সে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো,যেন তার চোখ দিয়ে বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিচ্ছে।তার মুখে ছিলো এক ধরনের চ্যালেঞ্জের ছাপ।
জ্যাসপার পাশ থেকে ফিওনাকে লক্ষ্য করছিল।তার চোখ এক মুহূর্তের জন্যও ফিওনার উপর থেকে সরেনি।ফিওনার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি,তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,এমনকি তার চুপচাপ থাকা—সবকিছুই যেন জ্যাসপারকে এক অদৃশ্য টানে তার দিকে আকৃষ্ট করছিল।কিন্তু সে বুঝতে পারছিল না,ফিওনা হঠাৎ ড্রাকোনিসের প্রতি অসম্মান কেনো প্রদর্শন করছে।
ফিওনা তখন প্লেটে খাবার তুলে নিল।খাবার খেতে খেতেও তার দৃষ্টি মাঝে মাঝে ড্রাকোনিসের দিকে চলে যাচ্ছিল।তার চোখে স্পষ্ট এক প্রশ্ন ফুটে উঠছিল—“আপনি কেন আমার আর আমার মায়ের জীবনে এত কিছু করেছেন?আমার মাকে অনেক কষ্টে দেখেছিলেন কেনো?”
ড্রাকোনিস বুঝতে পারছিল ফিওনার দৃষ্টি তাকে বিদ্ধ করছে। কিন্তু সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে রইল।তার মুখের এক কোণায় এক ধরনের অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল,যেন সে ফিওনার ক্রোধকে তুচ্ছজ্ঞান করছে।
এদিকে,জ্যাসপার নিজের ভেতরে এক অজানা অস্থিরতা অনুভব করছিল।সে ফিওনাকে লক্ষ্য করতে করতে নিজের মনেই ভাবল,“ও কী এতটাই বদলে গেছে?নাকি ওর এই আচরণের পেছনে কোনো গভীর ব্যাথা প্রকাশ পাচ্ছে?”
এই নীরব যুদ্ধের মাঝেই চারপাশে সবার খাবার খাওয়া চলতে থাকল।কিন্তু টেবিলজুড়ে চাপা টানটান পরিবেশ এত ঘনীভূত হয়ে উঠছিল যে, মনে হচ্ছিল কেউ একটুও শব্দ করলেই সবকিছু ভেঙে পড়বে।
ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় ভোজের আয়োজন জমে উঠেছে। টেবিলে জমকালো পাত্রে সাজানো খাবারের মধ্যে হঠাৎ ফিওনার চোখ পড়লো এক অদ্ভুত ফলের ওপর। সোনালী-সবুজ রঙের মসৃণ চামড়ার ফলটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়,কিন্তু ফিওনা কখনো এমন কিছু দেখেনি। কৌতূহলের বশে সে ফলটি তুলে নিল হাতে।
ফলের গা স্পর্শ করার সাথে সাথেই ফিওনার মনে হলো এটি অন্যরকম—শীতল,কিন্তু মসৃণ ও নরম।সে একবার টেবিলের দিকে তাকালো।অন্যদের কেউ সেই ফল খাচ্ছে কি না খেয়াল করার চেষ্টা করল,কিন্তু কেউই তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না।
ফিওনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।কীভাবে এটি খেতে হয়, তা সে জানে না।ফলটি কি চামড়া ছাড়িয়ে খেতে হয়?নাকি সরাসরি কাটা হয়?যদি ভুল করে কিছু করে ফেলে,তবে সবাই কি হাসবে?তার মনে একধরনের সংকোচ বোধ দেখা দিল।
তখনই জ্যাসপার এক পাশে বসে তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি গভীরভাবে লক্ষ্য করছিল।ফিওনার দ্বিধাগ্রস্ত মুখ দেখে সে বুঝতে পারল কী ঘটছে।এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই সে তার নিজের সামনের বাটি থেকে ওই ফলের আরেকটি তুলে নিল। তার লম্বা,চমৎকার আঙ্গুল দিয়ে দক্ষতার সাথে ফলটির খোসা ছাড়াতে শুরু করল।
ফলের সুমিষ্ট গন্ধ মুহূর্তেই টেবিলের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। জ্যাসপার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খোসা ছাড়িয়ে,এক টুকরোও খালি না ফেলে,পরিপাটি করে ফলটি ফিওনার প্লেটে দিয়ে দিল।
ফিওনা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো তবে সাথে সাথে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।সে নিজেকে সামলে নিল।মুখে কিছু না বলেই প্লেটে রাখা ফলটির দিকে তাকিয়ে রইল।তার হৃদয় ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল,যেন অদ্ভুতভাবে এই ছোট ঘটনাটাও তার মনে এক গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে।
জ্যাসপার তখন ঠাণ্ডা স্বরে বলল,যেন ঘটনাটি একদম সাধারণ, “এটা এভাবেই খেতে হয়।এটার নাম 'লুমিসেলা'!
ফিওনা তাকে কোনো উত্তর দিল না।কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা অনুভব করল।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো,জ্যাসপারের এই ছোট আচরণ যেন তাকে অজান্তেই সুরক্ষার একটা অনুভূতি দিচ্ছে।
টেবিলের অন্যরা কেউ এই ছোট্ট ঘটনায় মনোযোগ দিল না। তবে ড্রাকোনিসের চোখের কোণে এক কঠিন অভিব্যক্তি ফুটে উঠল।সে জ্যাসপারের দিক থেকে চোখ সরিয়ে,নীরবে খাবারে মন দিল।
ফিওনা ধীরে ধীরে ফলটি খেতে শুরু করল।এটি ছিল নরম, রসালো,আর একেবারে অদ্ভুত মিষ্টি স্বাদের।তার মনে হলো এমন কিছু সে আগে কখনো খায়নি।তবে এই নতুন স্বাদের চেয়েও বেশি ওজন ছিল তার ভেতরের সেই প্রশ্নের,যা সে এড়িয়ে যেতে পারছিল না।
ফলের প্রতিটি কামড়ে তার চোখ যেন জ্যাসপারের দিকে চলে যাচ্ছিল,তবে সরাসরি চোখে তাকানোর সাহস নেই।
মুখের দিকে তাকিয়েই সে ভাবতে লাগল,এই ড্রাগন প্রিন্সটা,যে মুহূর্তে তার সমস্যার সমাধান করল,কীভাবে এত স্বাভাবিক আর নির্লিপ্ত থাকতে পারে?
মনে মনে সে নিজেকেই প্রশ্ন করল,“আমি কি সত্যিই এই প্রিন্সকে ভালোবেসেছিলাম?”
এই প্রশ্নটি যেন তার মস্তিষ্কে জ্বলতে থাকা এক আগুনের মতো।যদি সত্যিই ভালোবেসে থাকি,তবে কেন তাকে মনে নেই?আর যদি কিছুই না থাকে,তবে কেন এই অদ্ভুত হৃদয়ের ধুকপুকানি,কেন তার দিকে তাকালেই বুকের ভেতর এমন শূন্যতা আর আকর্ষণ তৈরি হয়?
তার মনে পড়ে গেল গ্ৰান্ডপার সেই কথাগুলো—“তোমার আর জ্যাসপারের একসময় গভীর সম্পর্ক ছিল।তবে সে তোমার মেমোরি রিমুভ করেছে।”
ফিওনার মন যেন ভেঙে পড়ল।“কেন করবে সে এমনটা?যদি সত্যি সে ভালোবাসত,তবে কীভাবে সে এমন নির্মম কাজ করতে পারল?”
ফল কামড়ে খাওয়ার সাথে সাথে তার ভেতরের এই দ্বন্দ্ব আরও গভীর হচ্ছিল।সে মনে মনে স্বীকার করল,এই প্রিন্সের দিকে তাকালে তার মনের কোণে একটা গভীর টান অনুভব হয়।অথচ এই টান কীসের,কেন,সে নিজেও জানে না।
সে আবার নিজের মনে বলল,“যদি ভালোবাসতাম,তবে সেটা কি সত্যিই মুছে ফেলা সম্ভব?ভালোবাসা কি এতই দুর্বল যে স্মৃতি মুছে দিলেই তা শেষ হয়ে যায়?”
জ্যাসপার তখনও নিজের জগতে,খাবার খেতে খেতে চুপচাপ ফিওনার দিকে নজর রাখছিল।তার চোখে একটা অস্পষ্ট উত্তেজনা,যেন সে ফিওনার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি পড়ার চেষ্টা করছে।
ফিওনা তার মন থেকে এই সমস্ত প্রশ্ন দূরে ঠেলে দিয়ে শেষমেশ নিজেকে বলল,“আমাকে এসব ভাবা বন্ধ করতে হবে।যদি কিছু ছিলও,তবে সেটা এখন নেই।আমি শুধু আমার জীবনটা নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যাব।”
তবু তার হাতের ফলটি শেষ হতে হতে,মনের মধ্যে অজান্তেই এক শব্দ আবার ভেসে এল—"প্রিন্স।”
.
,
.
.
ডাইনিংয়ের পরে সোনালি ঝাড়বাতির আলোয় ভরা বিশেষ কক্ষে সবাই একে একে জড়ো হলো।বড়সড় রাজকীয় টেবিলের চারপাশে বসেছে ড্রাকোনিস,রাজা জারেন, অ্যালিসা,সিলভা,এথিরিয়ন আর প্রাসাদের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।কিন্তু এই মুহূর্তে ফিওনার কোনো উপস্থিতি নেই।
ড্রাকোনিস গম্ভীর মুখে রাজা জারেনের দিকে তাকিয়ে বললেন,“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।অ্যালিসা আর জ্যাসপারের বিয়ে দু’টি রাজ্যের মৈত্রী আরও দৃঢ় করবে।”
রাজা জারেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,“আমিও তাই ভাবছি।এনগেজমেন্টটা এই সপ্তাহের মধ্যেই করা যাক।বিয়ের তারিখ নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করতে পারি।”
কথাগুলো শুনে জ্যাসপারের ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল।সে শান্ত থাকতে চেষ্টা করলেও,তার চোখে-মুখে এক ধরনের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অ্যালিসা,যে এতক্ষণ চুপ ছিল,তার ঠোঁটের কোণে এক গর্বিত হাসি ফুটে উঠল।সে ভাবছিল,তার পরিকল্পনাগুলো সফল হতে চলেছে।তবে জ্যাসপারের সেই দৃষ্টির চাহনি তাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
হঠাৎই,জ্যাসপার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,“আমি অ্যালিসার সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।”
কথাটা শুনে কক্ষ জুড়ে এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো। ড্রাকোনিসের কপালে ভাঁজ পড়ল।তিনি ধীর গলায় বললেন, “তার প্রয়োজন নেই। যা বলার,এখানে সবার সামনেই বলো।”
তবে রাজা জারেন জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে একঝলক হাসলেন। “আমার মতে,এটাতে কোনো সমস্যা নেই।ওদের নিজেদের মধ্যেও কিছু কথা বলার অধিকার থাকা উচিত।”
অ্যালিসা মুখে মিষ্টি হাসি এনে বলল,“আমি তো এমন প্রস্তাবের অপেক্ষাতেই ছিলাম,প্রিন্স।”
ড্রাকোনিস কিছু বলতে যাচ্ছিলেন,কিন্তু রাজা জারেন তার হাতে ইঙ্গিত করে থামিয়ে দিলেন।তিনি সায় দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে,তুমরা দু’জনে কথা বলো।তবে বেশি সময় নেবে না।সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত নিতে হবে।”
জ্যাসপার কোনো উত্তর দিল না,শুধু মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে ছিল অনড় এক অভিব্যক্তি।
অ্যালিসা নিজের গাউনের পাড় সামলে উঠে দাঁড়াল।মনে মনে সে বিজয়ের স্বাদ পেতে শুরু করেছিল।তার বিশ্বাস,এই কথোপকথনের পর জ্যাসপার আর কিছুতেই তার থেকে দূরে থাকতে পারবে না।
ড্রাকোনিস ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে জ্যাসপারের দিকে তাকালেন,কিন্তু মুখে আর কোনো আপত্তি করলেন না।তার চোখে এক ধরনের উদ্বেগ ছিল,যেন তিনি আগাম কোনো বিপদের আঁচ পাচ্ছেন।
জ্যাসপার আর অ্যালিসা বিশেষ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর,ড্রাকোনিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের আসনে বসে রইলেন।তার মনে যেন কিছু একটা অজানা শঙ্কা ভর করল।
রাজা জারেন ড্রাকোনিসের দিকে তাকিয়ে বললেন,“ওদের একটু নিজের মতো থাকতে দাও,ড্রাকোনিস।তুমি জানো তো, কখনো কখনো এ ধরনের কথোপকথন সম্পর্কের জন্য জরুরি হয়।”
ড্রাকোনিস এক মুহূর্ত রাজা জারেনের কথার উত্তর দিলেন না।তার চোখ তখনও দরজার দিকে আটকে ছিল,যেন তিনি বোঝার চেষ্টা করছিলেন,ওই দরজার ওপাশে ঠিক কী ঘটতে চলেছে।
বারান্দার একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অ্যালিসা তার গাউনের পাড় সামলাতে সামলাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল,কিন্তু তার মনে চলছিল তীব্র এক ঝড়।আর ঠিক তখনই,জ্যাসপার তার শক্ত পায়ের শব্দ করে ধীর পদক্ষেপে তার কাছে এলো।তার মুখে ছিল দৃঢ়তা আর চোখে অনড় এক অভিব্যক্তি।
জ্যাসপার এক মুহূর্ত সময় নিল।তারপর সরাসরি বলল, “অ্যালিসা,তুমি ভালো করেই জানো আমি ফিওনাকে ভালোবাসি।আমার হৃদয়,আমার সমস্ত অস্তিত্ব,সবকিছু শুধু তার জন্যই।এটা নতুন কিছু না, ্বরং বহুদিন ধরেই তুমি এটা জানো।”
অ্যালিসা তার কথা শুনে মৃদু হাসল,কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।বরং তাতে ছিল এক ধরনের গোপন কষ্ট আর অভিমান।
জ্যাসপার তার চোখ থেকে এক মুহূর্ত দৃষ্টি সরাল না।সে আরও বলল,“তুমি যদি ভেবে থাকো,ফিওনা এখানে আছে বলে আমি এই বিয়েতে রাজি হচ্ছি না,তাহলে ভুল ভাবছ। ফিওনা এখানে না থাকলেও আমি তোমাকে এই কথাগুলোই বলতাম।কারণ আমি জানি,আমার হৃদয় কখনোই তোমার জন্য স্পন্দিত হবে না।তুমি আমার থেকে কখনো ভালোবাসা পাবে না,অ্যালিসা।আর শুধু তাই নয়,কোনো দাম্পত্য মিলনও পাবে না।”
অ্যালিসা এবার পুরোপুরি তার দিকে ফিরে দাঁড়াল।তার চোখে ছিল আহত অথচ রাগান্বিত এক চাহনি।তার ঠোঁট কাঁপছিল,কিন্তু সে চুপ করে থাকল।
জ্যাসপার এবার একটু ঝুঁকে এসে বলল,“তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো,তবে জেনে রাখো,তুমি নিজের জীবনকেই ধ্বং*স করবে।আমি কখনোই তোমাকে সুখী করতে পারব না।আর যদি তুমি সাহস করে এই সম্পর্কটাকে সবার সামনে না করতে চাও,আমি সেটাকেই সম্মান জানাব।তবে সিদ্ধান্ত তোমার।”
অ্যালিসা এবার ঠোঁট কামড়ে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করল।তার কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা শোনাল,“আপনি কি জানেন প্রিন্স,এই বিয়ে আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?এটা শুধু আমাদের দুই রাজ্যের জন্য নয়,আমার নিজের সম্মানের জন্যও।আপনি কি একবারও ভেবেছেন,আমি এই অসম্মান সহ্য করব কীভাবে যেখানে অনেক আগে থেকেই আমাদের বিবাহের সফটওয়্যার ম্যাচ করা ছিলো?”
জ্যাসপার শান্ত গলায় বলল,“অ্যালিসা,তুমি ভালো করেই জানো আমার কাছে এসব সফটওয়্যার জনিত বিয়ে প্রেম কোনোটারই মানে নেই।আমি যা বলছি তা মেনে নিতে তোমার কষ্ট হবে,আমি জানি।কিন্তু মিথ্যে সম্পর্ক নিয়ে জীবন কাটানোর চেয়ে সত্যকে মেনে নেওয়া অনেক ভালো। নিজেকে এতটা কষ্ট দিও না।”
অ্যালিসা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।তার মনের ভেতরে যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।বারান্দার ঠান্ডা বাতাস তার চুলের গোছাগুলো এলোমেলো করে দিল,আর সে এক মুহূর্তের জন্য জ্যাসপারের চোখে তাকাল।
“তাহলে আমি কী করব প্রিন্স?”অ্যালিসা ধীরে ধীরে বলল। তার কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি আর হতাশা।
জ্যাসপার এক পা পেছনে সরিয়ে বলল,“বাকি সিদ্ধান্ত তোমার।তুমি চাও,তো আমাকে বিয়ে করো আর নিজের জীবন নষ্ট করো।আর যদি সত্যকে মেনে নিতে পারো,তাহলে সবার সামনে সাহস করে এই বিয়েতে না করো।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো।অ্যালিসা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল,আর জ্যাসপার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে চলে গেল বারান্দা থেকে।পেছনে থেকে গেল এক গুমোট পরিবেশ,আর অ্যালিসার হৃদয়ে জমা হলো একরাশ অপূর্ণতা আর ক্রোধ।
.
.
.
অ্যালিসা বারান্দা থেকে কক্ষে প্রবেশ করতেই উপস্থিত সবাই তার দিকে তাকালো।তার মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।চোখেমুখে হতাশা ও রাগ মিশে থাকলেও সেটা যেন এক চতুর মুখোশের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল।
সে সোজা রাজা জারেনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "বাবা,দর্জিদের খবর পাঠাও।পোশাক বানানোর কাজ শুরু করতে হবে।এনগেজমেন্ট আর বিয়ের প্রস্তুতি যেন সময়মতো শেষ হয়।"
কক্ষের ভেতর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।কেউই এই কথা শোনার পর কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝতে পারছিল না।
ড্রাকোনিস চোখ সরু করে জ্যাসপারের দিকে তাকাল।মনে হচ্ছিল,তার মনের ভেতরে কিছু একটা উথালপাথাল করছে। কিন্তু রাজা জারেন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, "তোমার ইচ্ছাই প্রাধান্য পাবে,মাই প্রিন্সেস অ্যালিসা।আমি দর্জিদের দ্রুতই খবর পাঠাব।"
জ্যাসপার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অ্যালিসার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে হচ্ছিল,এতক্ষণ যা কিছু বলল,তার কোনো প্রভাবই পড়েনি অ্যালিসার ওপর।তার ভেতর তীব্র এক অস্থিরতা কাজ করছিল।
জ্যাসপার এবার আর কোনো কথা না বলে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
ড্রাকোনিস এবার নিজের চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "তোমার সিদ্ধান্তে আমি অন্তত খুশি হয়েছি,খুব দ্রুত সবকিছু করতে হবে।"
অ্যালিসা মাথা নিচু করে কেবল বলল,"হ্যাঁ,আমি ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
কিন্তু তার ভেতরে চলছিল অন্য এক যুদ্ধ।অ্যালিসার মুখে দৃঢ়তার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর কষ্ট।সে জানত, জ্যাসপার তাকে ভালোবাসবে না। তবু,তার অভিমান আর জেদ আর ফিওনার প্রতি ঈর্ষা তাকে এই বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য করছিল।
জ্যাসপার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সবার কথা শুনছিল।সে এবার বুঝতে পারল,অ্যালিসা এই বিয়েতে এখনো পুরোপুরি রাজি।তার হৃদয়ে এক অজানা ভার নেমে এলো।'অ্যালিসা আমার কথা শুনেও এমন সিদ্ধান্ত নিল কেন?'মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল সে।কিন্তু কিছুই না বলে জ্যাসপার দ্রুত বেরিয়ে গেল,নিজের মনের এই জটিলতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে।
.
.
.
জ্যাসপাররা অবশেষে রাজপ্রাসাদ থেকে বিদায় নিয়ে এল্ড্র রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলো।বিদায় মুহূর্তে সবাই যেন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল,রাজকীয় পরিবেশে একটি অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এল।
অ্যালিসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে রইল,তার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি।অন্যদিকে ফিওনা নিজের কক্ষ থেকে পুরোটা চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছিল।
বিদায়ের পর অ্যাকুয়ারা একা ফিওনার কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।দরজায় কড়া নাড়তেই ফিওনা কিছুটা বিস্মিত হয়। দরজা খুলে দাঁড়াতেই অ্যাকুয়ারা তার হাসি মাখা মুখে বলল, "আমি অ্যাকুয়ারা।এল্ড্র রাজ্যের একজন ড্রাগন সদস্য,কিন্তু তোমার সাথে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে হলো তাই এসেছি।"
ফিওনা একটু হেসে বলল, "তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই লাগলো,অ্যাকুয়ারা।"
অ্যাকুয়ারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,"তুমি হয়তো ভাবছো, কেন আমি এখানে এলাম।আসলে,আমি চাই তুমি জানো যে প্রিন্স শুধুমাত্র এল্ড্র রাজ্যের প্রিন্স নন,তিনি একজন ভিন্ন হৃদয়ের ড্রাগন।আর তোমার উপস্থিতি এই ভেনাসের সব পাল্টে দিবে।"
ফিওনা মৃদু হাসল,তবে তার মনে তবুও সংশয় কাজ করছিল। অ্যাকুয়ারা বিদায় নেওয়ার আগে তার দিকে এক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,"তুমি এই রাজ্যে নতুন,তবে তুমি যে প্রিন্সের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা হয়তো এখনো বুঝতে পারোনি।"
ফিওনা কিছু বলার আগেই অ্যাকুয়ারা নিচের দিকে এগিয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত জ্যাসপার ও তার সঙ্গীরা চলে গেলো।প্রাসাদ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।তবে ফিওনার মনের মধ্যে এক গভীর দোলাচল কাজ করতে থাকল।অ্যাকুয়ারার কথা যেন তার হৃদয়ে অজানা এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গেল।
.
.
.
ফিওনা তখন তার কক্ষের জানালার ধারে বসে ছিলো,বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।হঠাৎ দরজা খুলে তার মামা,রাজা জারেন,প্রবেশ করলেন।চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।তিনি কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সরাসরি বললেন,
"ফিওনা,তুমি ড্রাকোনিস কে জানো?তিনি ভেনাসের কিং। তাঁর সামনে তুমি পায়ের ওপর পা তুলে বসলে!আর সেই সঙ্গে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলে কেনো?এটা কি রাজকীয় আচরণ?"
ফিওনা ধীরে ধীরে জানালা থেকে সরে এসে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।তার চেহারায় একধরনের কঠোরতা ফুটে উঠলো, যেন সে নিজেকে কোনোভাবে দুর্বল দেখাতে চায় না।শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, "হ্যাঁ,আমি জানি ড্রাকোনিস কে। পুরো ভেনাসের কিং।কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তাঁকে ভয় পেয়ে নিজের সম্মান বিসর্জন দেবো।আমি যেমনটা অনুভব করি,তেমনটাই প্রকাশ করি।তিনি যদি আমার আচরণে অসন্তুষ্ট হন,সেটা তাঁর সমস্যা,আমার নয়।"
রাজা জারেন এত স্পষ্ট ও কঠিন উত্তর আশা করেননি।তাঁর কণ্ঠে কঠোরতা ফিরে এলো,"তুমি বুঝতে পারছো না তুমি কী বলছো,ফিওনা। ড্রাকোনিস এই রাজ্যের নিয়ম ও সম্মানের প্রতীক।তাঁর সামনে এমন আচরণ মানে পুরো ফ্লোরাস রাজ্যের মর্যাদার অবমাননা।তুমি একজন সাধারণ মেয়ে নও, তুমি এখন ড্রাগন।"
ফিওনা একধাপ এগিয়ে এলো।তার চোখে তীব্র আত্মবিশ্বাস। সে বলল, "মামা,সম্মান জোর করে অর্জন করা যায় না।আর আমি ফ্লোরাস রাজ্যের মর্যাদা নষ্ট করতে চাই না।কিন্তু ড্রাকোনিসের সামনে আমি নিজেকে ভয় পেয়ে ছোট করে তুলতে পারি না।যদি ভেনাসের রাজা হয়েও তিনি ড্রাগনদের মনের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন,তবে তিনি আমার কাছ থেকে কোনো সম্মান আশা করতে পারেন না।"
রাজা জারেন ফিওনার এমন তীক্ষ্ণ যুক্তিতে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেলেন।তিনি ধীরে ধীরে বললেন, "তোমার এই আচরণ শুধু তোমার জন্য নয়,আমাদের সবার জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে,ফিওনা।ড্রাকোনিস যা করার ক্ষমতা রাখেন, তার সামনে আমাদের কারো কোনো শক্তি নেই।তুমি যদি তাঁর রোষানলে পড়ো,পুরো ফ্লোরাস তার খেসারত দেবে।এটা মনে রেখো।"
ফিওনা ধীরে ধীরে রাগে ফুঁসতে লাগলো।রাজা জারেনের কথা শুনে তার চোখে জল চলে এলেও সে নিজেকে কোনোভাবে সামলে রাখলো।সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে,চোখে তীব্র ক্রোধ আর দুঃখ নিয়ে ফিওনা বলল,
"আমি তাকে ঘৃণা করি,আর আমিও আপনাকেও আমার মামা হিসেবে ভাবতে পারছি না।কিভাবে পারলেন নিজের বোনের সঙ্গে এমনটা করতে?আমি জানি,সবকিছু ওই রাজা ড্রাকোনিসের আদেশেই হয়েছে।আমার মাকে বন্দি করা হয়েছে গত ১৮ বছর ধরে।তিনি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত এক অন্ধকার কারাগারে ছিলেন।কেন?শুধুমাত্র আমার বাবাকে ভালোবাসার অপরাধে?কারণ আমার বাবা একজন পৃথিবীর সাধারণ মান ছিলেন?"
ফিওনার কণ্ঠ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো,আর তার চোখে যেন আগুন জ্বলছিল।সে এক পা এগিয়ে এসে আরও বলল,
"আপনারা কি জানেন,আমার মা আমার মুখ পর্যন্ত দেখতে পাননি আমি জন্মানোর পরে?তাকে এতটাই শাস্তি দেওয়া হয়েছে যে নিজের সন্তানের মুখটাও দেখতে পারেননি।আর আমার বাবা?তাকে শেষবারের মতো দেখার অধিকারটুকুও পাননি আমার মা।আমার মা কি এতটা অপরাধ করেছিলেন, যে এই শাস্তি তাঁর প্রাপ্য ছিলো?"
রাজা জারেন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।তিনি ফিওনার চোখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেন,কিন্তু পারলেন না।ফিওনার প্রতিটি কথা তাঁর হৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল।কিন্তু ফিওনা থেমে থাকলো না।তার ভেতরের সমস্ত জমে থাকা রাগ,দুঃখ,আর হতাশা যেন এবার বেরিয়ে এলো।
"ওই রাজা ড্রাকোনিস কি কোনোদিন এটা বুঝবে?তিনি সন্তানের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হননি,তাই এর মূল্যটা কখনো বুঝবেন না।আমার মাকে তাঁর নিজের পরিচয় থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে এতোটা বছর, আর আমাকে আমার সত্যিকারের পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।কিন্তু এবার সময় এসেছে।এবার তিনিও বুঝবেন,যন্ত্রণা কাকে বলে।"
ফিওনার চোখে ঝকঝকে অশ্রু ছিলো,কিন্তু তার ভেতরের শক্তি আর প্রতিজ্ঞা ছিলো অপরাজেয়।রাজা জারেন কিছুক্ষণ চুপ করে ফিওনার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তাঁর মুখে কিছু বলার ভাষা ছিল না।ফিওনার প্রতিটি কথা যেন তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছে।দীর্ঘক্ষণ পর,গভীর এক শ্বাস নিয়ে তিনি শুধু বললেন,"ফিওনা,তুমি যা বললে,তা আমি বুঝি।কিন্তু সবকিছুর পেছনে একটা কারণ থাকে।সময় আসলে সবকিছু জানবে।"
তিনি ধীরে ধীরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।ফিওনা একা দাঁড়িয়ে রইলো।তার মুখে কঠোরতা,চোখে প্রতিজ্ঞা।জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিলো,কিন্তু ফিওনার মনে ঝড় যেন আরও জোরে বইতে শুরু করলো।
(চলবে...…..)
#আযদাহা
#দ্বিতীয়_খন্ড ( পর্ব নাম্বার ৬)
#সাবিলা_সাবি
-----
ফিওনা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।বাইরে অসংখ্য তারা ঝলমল করছে,কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছে এই আলো শুধুই এক বিভ্রম,এক ধোঁকা।ভেনাস যতই সুন্দর হোক,তার ভেতরে আটকে আছে অদৃশ্য শিকল—একটা নিঃশ্বাস বন্ধ করা বন্দিত্ব।
লিয়ারা পিছন থেকে ফিওনার কাঁধে আলতো হাত রাখলেন। মায়ের স্পর্শে ফিওনা কিছুটা নরম হলো,কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে যে আগুন জ্বলছে,সেটার উত্তাপ কমেনি একটুও।
"তুমি কি সত্যিই মনে করো,মা,আমি এই নিয়মগুলো মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকব?" ফিওনার গলায় দৃঢ় প্রত্যয়।
লিয়ারা গভীর দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন।একসময় তিনিও এমনই ছিলেন—স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে চেয়েছিলেন,ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় তিনি হেরে গিয়েছিলেন।
"তুমি যা ভাবছো,তা সহজ হবে না,ফিওনা।ড্রাকোনিস শুধু একজন শাসক নয়,সে এক কঠিন ধাতুতে গড়া শাসনব্যবস্থার প্রতীক,"ফিওনা,এটাই ভেনাসের নিয়ম। এখানে ভালোবাসা আর মানবিক সম্পর্কের চেয়ে শাসন আর আইন বড়।"
লিয়ারার কথা শুনে ফিওনার ক্রোধ যেন আরও বেড়ে গেলো। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,"মা,কেমন নিয়ম এটা?যেখানে ভালোবাসাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়?যেখানে ড্রাগনের ইচ্ছা আর স্বাধীনতাকে মূল্য দেওয়া হয় না?আমাদের পৃথিবী এমন নয়,মা।"
ফিওনার কণ্ঠে হতাশা আর ব্যথা স্পষ্ট। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখ মুছলো,তারপর আরও বলল,"যদি আমি হাজার অপরাধ করি,তবুও আমার গ্র্যান্ডপা কখনোই আমার সঙ্গে এমন কঠোর আচরণ করতে পারতেন না।পৃথিবীতে এমন কোনো নিয়ম নেই,যা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলোকে কেড়ে নেয়।এখানে তৈরি করা এই নিয়মগুলো আসলে ড্রাগনের সময় আর সুখ কেড়ে নেয়। এমন নিয়মের কোনো মূল্য নেই, মা।"
ফিওনার কণ্ঠ যেন পুরো কক্ষ ভরিয়ে তুললো।লিয়ারা কিছুক্ষণ চুপ করে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।তার চোখে দুঃখের ছাপ।সে ফিওনার পাশে বসে তার হাত ধরে বলল, "আমি জানি,ফিওনা।তুমি যা বলছো,তা ঠিক।কিন্তু ভেনাসে এই নিয়মের শিকড় অনেক গভীর।ড্রাকোনিস কখনোই নিজের শাসন আর নিয়ম ভাঙতে দেবে না।"
ফিওনা রাগে আর হতাশায় দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকালো।তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো মায়ের সেই বন্দি জীবনের ছবি।সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,"তাহলে সময় এসেছে,মা। আমি দেখিয়ে দেবো,এই নিয়ম আর শাসন কেমন করে ভাঙতে হয়।আমি চাই না আর কেউ আমার মায়ের মতো এতটা কষ্ট সহ্য করুক।এবার এসব থামাতে হবে।"
লিয়ারা তার মেয়ের মধ্যে জন্মানো এই আগুনকে অনুভব করলো।সে জানতো,ফিওনার ইচ্ছাশক্তি অসীম।সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু স্বরে বলল,
"তুমি যা ভাবছো,তার জন্য অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হবে, ফিওনা।কিন্তু আমি জানি,তুমি থামবে না।আমি তোমার পাশে আছি।"
মায়ের কথায় ফিওনার চোখে জল চলে এলো।কিন্তু সে দৃঢ় ছিলো।ফিওনার মনে আজ একটাই প্রতিজ্ঞা—ভেনাসের অন্যায় নিয়ম আর শাসন ভেঙে,সত্যিকারের স্বাধীনতার আলো দেখাবে।
লিয়ারা ফিওনার হাতটি নিজের হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আমার লিটল প্রিন্সেস,শান্ত হয়ে যাও।তোমার রাগের জন্য পুরো ভেনাস কাঁপাতে হবে না।এখন বরং আসল কথাটা শোনো।"
ফিওনা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,"আসল কথা?এখন আবার কী?"
লিয়ারা ধীর কণ্ঠে বলল,"তোমাকে তো ভেনাসের ভার্সিটিতে যেতে হবে।"
ফিওনা অবাক হয়ে বলল,"কেন?আমি পৃথিবীতে পড়াশোনা করেছি।আর পড়ার দরকার কী?"
লিয়ারা শান্ত গলায় ব্যাখ্যা করল,"তুমি পৃথিবীতে পৃথিবীর নিয়মে পড়াশোনা করেছো।কিন্তু ভেনাসের নিয়ম আর এখানকার বাস্তবতা ভিন্ন।তুমি নতুন ড্রাগন,এখনো নিজের শক্তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে জানো না।তাছাড়া তলোয়ার চালানো,যুদ্ধের কৌশল,এবং ভেনাসের ইতিহাস ও ড্রাগনদের সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই।এসব শেখার জন্য তোমাকে ভেনাসের ভার্সিটিতে যেতে হবে।সেখানে শুধু পড়াশোনা নয়,প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিংও হয়।সব শেখানো হবে।"
ফিওনা বিরক্ত গলায় বলল,"স্কুল বা কলেজ ছাড়াই সোজা ভার্সিটিতে?"
লিয়ারা হেসে বলল,"হ্যাঁ,ভেনাসে এমনটাই নিয়ম। যখন ড্রাগনদের বয়স ১৮ হয়,তারা সরাসরি ভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করে।তোমারও সময় হয়েছে।"
ফিওনা একটু ভেবে বলল,"আর যদি না যাই?"
লিয়ারা চোখ বড় করে বলল,"তাহলে তোমার শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে কোনোদিন বড় কোনো বিপদ ডেকে আনবে। আর সেটা তোমার জন্যই নয়,ভেনাসের জন্যও ক্ষতিকর হবে।"
ফিওনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,"ঠিক আছে।তাহলে কীভাবে যাবো?"
লিয়ারা হাসি মুখে বলল,"তোমাকে কাল আমি নিজে ভর্তি করিয়ে আসবো।সব ব্যবস্থা আমি দেখবো।"
ফিওনা তবুও অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলল,"ঠিক আছে।তবে মনে রেখো,আমি ভেনাসের নিয়মটা এখনো পছন্দ করিনি।"
লিয়ারা মাথা নাড়িয়ে বলল "তোমার পছন্দ করার সময় আসবে,লিটল প্রিন্সেস।"
.
.
.
জ্যাসপার নিজের প্রাসাদের ল্যাবে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে গবেষণা করছে।তার টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি আর পেপার স্ক্রল।প্রতিটি মুহূর্তে তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—কীভাবে ফিওনার হারানো স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনা যায়।
এমন সময় দরজার ওপাশ থেকে এথিরিয়ন প্রবেশ করল। কৌতূহল নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,"এত রাতে ল্যাবে?কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করছ নাকি জ্যাসু ভাইয়া?"
জ্যাসপার তার চোখ সরিয়ে বলল,"ফিওনার স্মৃতি ফেরানোর উপায় খুঁজছি।"
এথিরিয়ন অবাক হয়ে বলল,"কোনো সুত্র জানা গেছে?কিছু পেয়েছো?"
জ্যাসপার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,"না,এখনো কিছু পাইনি। তবে নিশ্চিত,সেই লকেট ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।"
এথিরিয়ন ভ্রু কুঁচকে বলল,"তাহলে সেই লকেটটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছ না কেন?"
জ্যাসপার মাথা নাড়িয়ে বলল,"আমি সিগন্যাল ট্র্যাক করার চেষ্টা করেছি।কিন্তু সেটা কোনো কাজ দেয়নি।মনে হচ্ছে লকেটটা হয়তো কোনো মাছের পেটেই চলে গেছে,কিংবা এমন গভীরে হারিয়ে গেছে যেখানে সেটা আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।আর লকেট ছাড়া ফিওনার স্মৃতি ফেরানো অসম্ভব।"
এথিরিয়ন চিন্তিত মুখে বলল,"তাহলে এখন কী করবে ভাই?"
জ্যাসপার একটু থেমে গভীরভাবে তাকাল,তারপর দৃঢ় স্বরে বলল, "আমি আবার নতুন করে শুরু করবো।ফিওনাকে আবার আমার প্রেমে ফেলবো।নতুন করে,নতুন ভাবে।এবার তার স্মৃতি না থাকলেও সে আমাকে ভালোবাসবে।আমি ওর হৃদয়ে সেই জায়গাটা আবার তৈরি করবো।"
এথিরিয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,"তুমি জানো,এটা সহজ হবে না।ও তো এখনো তোমার প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারবেনা।"
জ্যাসপার মৃদু হাসল,"আমি জানি।কিন্তু আমি যে তাকে অনেক ভালোবাসি।তার হৃদয় জয় করতে হলে আমি আবারও আমার সমস্তটা দিয়ে চেষ্টা করবো।এটা আমার জন্য যুদ্ধের মতো।আর আমি এই যুদ্ধে জিতবো।"
এথিরিয়ন তার ভাইয়ের মুখের দৃঢ়তা দেখে মৃদু হাসল,
"ঠিক আছে।আমি তোমার পাশে আছি।তবে ভুল কিছু করো না, জ্যাসু ভাইয়া।একবার যদি আবার তার আস্থা হারাও, তাহলে সে চিরদিনের জন্য তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে।"
জ্যাসপার একমুহূর্তের জন্য থমকাল,তারপর মাথা নাড়ল, "এইবার আমি আর কোনো ভুল করবো না।এবার আমার ভালোবাসা বিশ্বাস সবকিছু দিয়েই ওকে জয় করবো।"
ড্রাকোনিস দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে।তার কালো চামড়ার বুটের নিচে পাথরের মসৃণ মেঝে প্রতিবার ধাক্কা খেয়ে ধাতব শব্দ তুলছে।বাইরের আলো সোনালী,কিন্তু তার মনে যেন এক গভীর অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে।আজকের এই পথচলা শুধুই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য নয়—এটা তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ভেনাস দেবতা আভ্রাহার চেম্বারে প্রবেশ করার আগেই দরজা আপনাআপনি খুলে গেল।ভেতরে দেবতার উপস্থিতি যেন গোটা পরিবেশে এক ভারী শক্তির চাপ তৈরি করেছে।নীলাভ স্ফটিকের সিংহাসনে বসে থাকা আভ্রাহা ধীর,কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে ড্রাকোনিসের দিকে তাকালেন।
"আমি জানতাম তুমি আসবে ,ড্রাকোনিস,"দেবতার কণ্ঠে এক অবিচল শক্তি। "আরে আমি জানি,তুমি কেন এসেছো।"
ড্রাকোনিস এক মুহূর্ত থমকে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। "তাহলে নিশ্চয়ই আপনি জানেন দেবতা,সেই মানবী মেয়ে ফিওনা এখন ভেনাসে।"
আভ্রাহার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো।
"সে এখন কেবল মানবী নয়,ড্রাকোনিস।সে এখন ড্রাগন। ফ্লোরাস রাজ্যের লিয়ারার কন্যা—আর প্রকৃত এলিজিয়া।"
ড্রাকোনিসের চোখ কঠিন হয়ে উঠলো,কিন্তু সে নিজের রাগ প্রকাশ করলো না।
"আমি তোমাকে অনেক আগেই সতর্ক করেছিলাম," আভ্রাহার ধীরে ধীরে বললেন,যেন প্রতিটি শব্দ ওজনের মতো ভারী হয়ে বাতাসে ঝুলে থাকছে।"একদিন এলিজিয়া তার সত্যিকারের রূপ ধারণ করবেই।"
ড্রাকোনিস গভীর শ্বাস নিলো,তারপর শক্ত স্বরে বলল, "জ্যাসপারকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল।সে বিশ্বাস করে, এলিজিয়া হচ্ছে অ্যালিসা।আর আমি নিশ্চিত করবো,সেই বিশ্বাস কখনো ভাঙবে না।"
দেবতা আভ্রাহার চোখ গভীর হয়ে উঠলো। "সত্য চাইলেই চাপা রাখা যায় না,ড্রাকোনিস।মিথ্যার উপর ভরসা করে ভবিষ্যৎ গড়তে গেলে তা একদিন ধ্বংস হবেই।"
ড্রাকোনিস এবার এক পা এগিয়ে এল।"আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি," তার গলায় দৃঢ়তা। "খুব দ্রুত জ্যাসপার আর অ্যালিসার বিয়ে সম্পন্ন হলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।"
দেবতা আভ্রাহা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ড্রাকোনিস, তুমি কি সত্যিই মনে করো, মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে সত্য লুকিয়ে রাখা সম্ভব?এলিজিয়া তার সত্য পরিচয় জানবেই তখন।"
ড্রাকোনিস এবার রাগ চেপে বলল,"আমি সেটাই চাই না! আমি চাই না ও জানুক।ওর জন্মই এক অভি*শাপ আমার ছেলের জন্য।"
দেবতা তখন চোখ বন্ধ করলেন, যেনো ভবিষ্যতের কোনো দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন।
আভ্রাহা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,"তুমি কি সত্যিই মনে করো,একটি ভুল সম্পর্কের বাঁধনে বেঁধে তুমি নিয়তি বদলে দিতে পারবে?আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি তবে এখন বুঝতে পারছি নিয়তি চেয়েছে বলেই সেই মেয়ে এখন পৃথিবী থেকে ভেনাসে।"
ড্রাকোনিস এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ থাকলো।তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,"আমি যা চাই,তা অর্জন করবোই।"
আভ্রাহার আর কিছু বললেন না,শুধু এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "সাবধান, ড্রাকোনিস।তুমি যা করতে চলেছো,তা কেবল তোমার নিজের ধ্বং*স ডেকে আনবে না—এই পুরো সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।"
ড্রাকোনিস কোনো উত্তর দিল না।সে পেছন ফিরে এক দৃঢ় পদক্ষেপে চেম্বার ছেড়ে চলে গেল।বাতাসে দেবতার শেষ কথাগুলো ধ্বনিত হলো—
"ভাগ্যকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া যায় না, ড্রাকোনিস। এলিজিয়ার সত্য তার কাছে ফিরে যাবে, ঠিক যেমন প্রবল বাতাস সাগরের ঢেউকে তীরে ফিরিয়ে আনে। তুমি যদি সত্যকে রুখতে যাও, তাহলে তা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়বে।"
.
.
.
.
পরেরদিন সকালে ফিওনাকে নিয়ে লিয়ারা রওনা দেয়।স্টেলার একাডেমি—ভেনাসের সবচেয়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়।ফিওনা যখন মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল,তার মনে হলো যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করছে।বিশাল ভবনগুলো কাঁচ ও ধাতব সংমিশ্রণে তৈরি,যেন কোনো মহাজাগতিক শিল্পকর্ম।পুরো ক্যাম্পাসের বায়ুমণ্ডল স্বচ্ছ,কৃত্রিম সূর্যালোক ঠিক পৃথিবীর দিনের মতো উজ্জ্বল,অথচ তাতে সূর্যের প্রখরতা নেই। বাতাসে যেন একধরনের নীলচে আভা ভাসছে,যা আরও বেশি অতিপ্রাকৃত মনে করাচ্ছে।
পথঘাটে শূন্যে ভাসমান তথ্যপ্যানেল,শিক্ষার্থীদের জন্য হোভারিং ট্রান্সপোর্ট,আর দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বিশাল এক স্কাইল্যাব,যেখানে ড্রাগন ভেনাসীয় শিক্ষার্থীরা মহাকর্ষ ও শক্তি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
ফিওনা থমকে গেল।তার পরিচিত পৃথিবীর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমন ছিল না।এখানে সবকিছু যেন ভবিষ্যতের নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি অগ্রসর।
"এটা কি সত্যি কোনো ভার্সিটি?" ফিসফিস করে বলল ফিওনা।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লিয়ারা হেসে বলল,"স্বাগতম, স্টেলার একাডেমিতে।এখানেই তুমি জানতে পারবে কে তুমি, আর কী করতে সক্ষম।"
ফিওনা চারপাশে তাকিয়ে দেখল,শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই দেখতে মানুষের মতো,কিন্তু তাদের চোখের গভীরতা, চলাফেরার ভঙ্গি,এমনকি কারও কারও গায়ের হালকা আভা বুঝিয়ে দিচ্ছে—এরা সাধারণ কেউ নয়।সে ফিসফিস করে বলল,"এখানে কি সবাই ড্রাগন?"
লিয়ারা মাথা নাড়িয়ে বলল,"হ্যাঁ,ওরা সবাই ড্রাগন।তবে ড্রাগনদের মধ্যেও জাত আছে। সেটা তুমি ভার্সিটিতে পড়ার মাধ্যমেই জানতে পারবে,কারা কোন রাজ্যের,কী তাদের ক্ষমতা।এখানে এল্ড্র,ফ্লোরাস,অ্যাকুয়ার,শ্যাডো, ইনফার্নাস—প্রতিটি রাজ্যের ড্রাগনরা আসে।প্রত্যেকেরই আলাদা শক্তি, আলাদা বৈশিষ্ট্য।"
ফিওনা অবাক হয়ে চারদিকে তাকালো।হঠাৎ সে দেখল, কিছু শিক্ষার্থীর চোখ গাঢ় লাল,কারও আবার জলরঙা নীল,কেউ কেউ কুয়াশার মতো স্বচ্ছ।কিছু ছাত্রের শরীরের ছায়া যেন দুলে ওঠে,আবার কারও শরীরে সূক্ষ্ম সোনালি আঁশ ঝিলিক দেয় সূর্যের আলোয়।
তার নিজের গায়ের দিকে তাকিয়ে ফিওনা ভাবল—সে কি শুধু সাধারণ ড্রাগন,নাকি তার মধ্যেও এমন কিছু আছে যা সে এখনো জানে না?
লিয়ারা একটু থামল,তারপর গভীর দৃষ্টিতে ফিওনার দিকে তাকিয়ে বলল, "তবে তুমি আলাদা,ফিওনা।তুমি পৃথিবী থেকে এসেছো,আর সবচেয়ে বড় কথা,তুমি অর্ধেক মানবী।"
ফিওনা বিস্মিত চোখে তাকাল,যেন এই সত্যটা তার মনকে নতুন করে নাড়া দিল।"আমি কি তাহলে কখনো সত্যিকারের ড্রাগন হতে পারব না?"
লিয়ারা মৃদু হাসল। "রক্তের মধ্যে যা আছে,তা বদলানো যায় না,তুমি সত্যিকারের ড্রাগন তবে তোমার মধ্যে আছে মনুষ্যত্ব।কিন্তু নিয়তি তোমার হাতে।তোমার ক্ষমতা কীভাবে বিকশিত হবে,কীভাবে তুমি নিজের জায়গা করে নেবে,সেটা শুধু তোমার ওপর নির্ভর করে।"
ফিওনা তখন চারপাশের অন্য শিক্ষার্থীদের দিকে তাকাল। তারা সবাই জন্মগতভাবে শক্তিশালী ড্রাগন,নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন।আর সে?সে ছিল এক সাধারণ মানবীর মতো,অথচ এখন এক নতুন পরিচয়ের মুখোমুখি।
হয়তো এখানে তার পথ সহজ হবে না,কিন্তু সে জানত, একদিন সে নিজের শক্তির সত্যিকারের রূপ খুঁজে বের করবে।
.
.
.
.
ফিওনা জানালার ধারে বসে ছিল,রাতের ভেনাস এক অন্যরকম সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছে আকাশজুড়ে।কাল থেকে তার ক্লাস শুরু,কিন্তু তার মনে এখনো হাজারো প্রশ্ন।এখানে সবাই ড্রাগন,তাদের মনুষ্যত্ব কেমন?তারা কি অনুভব করতে পারে,ভালোবাসতে জানে?নাকি এরা নিছকই শক্তির উপাসক?
তার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ চোখ পড়ল জানালার বাইরে, একটা ছোট ড্রোন বাতাসে স্থির হয়ে আছে,যেন তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।ড্রোনটা বেশ উন্নত প্রযুক্তির,কালো ধাতব গায়ে নীল আলো জ্বলছে,মাঝে মাঝে সেটার পাখাগুলো নিঃশব্দে কেঁপে উঠছে।
ফিওনা কপাল কুঁচকে তাকাল।এটা কার?সে এখনো ভেনাস সম্পর্কে ভালোভাবে জানে না,কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারছে, এখানে এমন জিনিস স্বাভাবিক নয়।
সে আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে গেল,ড্রোনটা যেন তার গতিবিধি লক্ষ্য করছে।হঠাৎ সেটা একটু দূরে সরে গেল,তারপর আবার ঘুরে জানালার আশেপাশে উড়তে লাগল।ফিওনা কিছুক্ষণ সেটা লক্ষ করল,তারপর মনে হলো, হয়তো এটা ভেনাসের পাহারাদার ড্রোন,যারা রাতের পাহাড় বা আশপাশের পরিবেশ নজরদারি করে।
কিন্তু একটা অস্বস্তি তার মনে খোঁচা দিতে থাকল—এই ড্রোন কি শুধু পাহাড় পাহারা দিচ্ছে,নাকি বিশেষভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে?
ফিওনা বিরক্ত হয়ে জানালাটা ধপ করে বন্ধ করে দিল। ড্রোনের অতিরিক্ত কৌতূহল তার ভালো লাগছিল না।এখানে আসার পর থেকেই সবকিছুই যেন তাকে পর্যবেক্ষণ করছে—মানুষের বদলে ড্রাগন,রাজপ্রাসাদের মতো জীবন,আর এখন এই ড্রোন!
কিন্তু জানালা বন্ধ করার মুহূর্তেই,বহু দূরে এক গোপন কক্ষে, এক স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে মাথা হেলিয়ে বলল,"শিট!এত তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করা কি খুব জরুরি ছিল,হামিংবার্ড?আরেকটু দেখতে দিতে পারতে তোমাকে।"
তার ঠোঁটের কোণে এক ধরণের রহস্যময় হাসি,চোখে এক ধরণের হতাশা।স্ক্রিনের উপর ড্রোনের ফিড বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু তার মনে ততক্ষণে একটা চিন্তা পাক খাচ্ছে—ফিওনা কীভাবে এত সহজে এড়িয়ে গেল?সে কি কিছু টের পেয়েছে?
সে হালকা হাসল,একগ্লাস পানীয় হাতে তুলে নিয়ে চোখ সরিয়ে নিল স্ক্রিন থেকে।"কোনো সমস্যা নেই… কাল থেকে তো তোমার ক্লাস শুরু হচ্ছে।সামনে অনেক সুযোগ আসবে,হামিংবার্ড।"
তার আঙুল ধীরে ধীরে ডেস্কের উপর ছন্দময় তাল তুলল, যেন সে একটা নতুন খেলা শুরু করার অপেক্ষায় আছে।
জ্যাসপার টেবিলের ওপর এলিয়ে ছিল,চোখ দুটো স্ক্রিনে আটকে,কিন্তু মনটা কোথাও হারিয়ে গেছে।ফিওনার প্রতিটা অভিব্যক্তি,প্রতিটা প্রতিক্রিয়া তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঠিক তখনই তার ল্যাপটপের স্ক্রিন ঝলমল করে উঠল—একটা ইনকামিং ভিডিও কল।সে ভ্রু কুঁচকালো,স্ক্রিনের ওপরে নামটা দেখেই বিরক্তি আরও বেড়ে গেল।
কল রিসিভ করতেই অ্যালিসার মুখ দেখা গেল—তার চোখেমুখে সামান্য বিরক্তির ছাপ,মনে হচ্ছে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে।
"অবশেষে ধরলেন কল!এতক্ষণ কী করছিলেন প্রিন্স?"
জ্যাসপার ক্লান্ত গলায় বলল,"যথেষ্ট জরুরি কিছু না হলে, আমাকে বিরক্ত কোরো না,অ্যালিসা।"
কিন্তু অ্যালিসা যেন তার কথায় কানই দিল না।সে হঠাৎই উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, "আচ্ছা,আপনি বলেন তো,আমার এনগেজমেন্টের জন্য কোন রঙের ড্রেস ভালো হবে? সিলভার না গোল্ডেন?"
জ্যাসপারের বিরক্তি এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।সে এক হাত চুলে চালিয়ে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,"তুমি এই রাতবিরাতে ফোন করেছ এসব বলার জন্য?"
অ্যালিসা যেন বুঝতেই পারল না কেন জ্যাসপার এত বিরক্ত হলো। সে ঠোঁট উল্টে বলল,"এটা কি ছোট ব্যাপার নাকি? আপনি আমার তো হবু বর!নিজের এনগেজমেন্ট নিয়ে এত কম আগ্রহ কিভাবে থাকে কারও?"
জ্যাসপার এক মুহূর্ত চুপ করল,তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, "এটা আমার বিয়ে না,অ্যালিসা।এটা রাজ্যের সিদ্ধান্ত।আর আমার জন্য এই এনগেজমেন্টের চেয়ে জরুরি অনেক কিছু আছে।"
অ্যালিসার মুখ শক্ত হয়ে গেল।সে ঠোঁট চেপে ধরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল,তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, "আপনার তো কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই,প্রিন্স।আমি জানি না আপনি আদৌ কখনো বদলাবে কি না!"
এই বলে সে কল কেটে দিল,স্ক্রিনে এক মুহূর্তের জন্য তার ক্ষুব্ধ মুখটা ফুটে উঠল,তারপর নিঃসাড়ে মিলিয়ে গেল।
জ্যাসপার মাথা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।ফিওনার মুখটা আবার মনে পড়ে গেল তার।
"বদলাতে হবে নাকি?"সে নিজেকেই প্রশ্ন করল,কিন্তু উত্তরটা জানা ছিল না তার।
.
.
.
.
ফিওনা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো,তার দেহ বিশ্রামে থাকলেও মন যেন কোথাও উড়ে চলেছিলো।হঠাৎ,স্বপ্নের মধ্যে সে দেখলো—দুইটি ড্রাগন,একটি সবুজ,অন্যটি বাদামি।তারা একসঙ্গে আকাশে উড়ছিল,বাতাস তাদের ডানা ছুঁয়ে যাচ্ছিলো,যেনো তারা মুক্ত, সুখী।
কিন্তু হঠাৎই দৃশ্য বদলে গেলো।একদল কালো ড্রাগনের ঝাঁক সবুজ ড্রাগনটিকে আ*ক্রমণ করলো,বিশাল নখর ও আ*গুনের আঁ*চড়ে তাকে বি*ধ্বস্ত করতে লাগলো। সবুজ ড্রাগনটি ছটফট করছিল,প্রাণপণে লড়াই করছিলো,কিন্তু সংখ্যায় কম ছিলো বলে পেরে উঠছিল না।
আর তখনই বাদামি ড্রাগনটি এক মুহূর্ত দেরি না করে সবুজ ড্রাগনকে রক্ষার জন্য সামনে এগিয়ে এলো।প্রবল শক্তিতে শত্রুদের ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো,কিন্তু নিজেই ভয়ানকভাবে আহত হলো।এক চিলতে আগুন তার ডানায় লাগলো,তীক্ষ্ণ দাঁত আর নখরে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হলো।
তারপর,এক চরম আঘাতে বাদামি ড্রাগনটি পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচের দিকে পড়ে যেতে লাগলো।বাতাসে ধুলোর ঝড় উঠলো,সমস্ত দৃশ্য যেন ধোঁয়ায় ঢেকে গেলো।ঠিক সেই মুহূর্তে, সে করুণ স্বরে চিৎকার করে উঠলো—
"জাইরন!"
আর ওপরে,সবুজ ড্রাগনটি ধীরে ধীরে আবছা মানব রূপ নিতে নিতে কেঁপে উঠে বললো—
"এলিজিয়া!"
ফিওনা ধপ করে উঠে বসল।বুক ধড়ফড় করছে,শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।তার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো,
"জাইরন!"
তারপর,মুহূর্তের মধ্যেই সে থেমে গেলো।ফিওনা অবাক হয়ে চারপাশ দেখলো—এ তো তার নিজের কক্ষ,ফ্লোরাস রাজ্যের নরম বিছানা।
কিন্তু এই স্বপ্ন?কেনো সে এমন কিছু দেখলো?কে এই এলিজিয়া?আর জাইরন কে?
স্বপ্নের ভেতরের দৃশ্যগুলো একটার পর একটা তার মাথায় ভেসে উঠছিলো।বাদামি ড্রাগনটির জায়গায় সে নিজেকে ভাবতে লাগলো,আর সবুজ ড্রাগনের জায়গায় জ্যাসপারকে! কিন্তু… এ কীভাবে সম্ভব?
ফিওনা মাথায় হাত রাখলো।গলাটাও যেন শুকিয়ে গেছে। সবকিছু ভীষণ বাস্তব মনে হচ্ছিলো,যেন কোনো ভুলে যাওয়া স্মৃতি হঠাৎ করে ফিরে এসেছে।কিন্তু এমন কিছু তো কখনো ঘটেনি!
তারপর,হঠাৎই একটা প্রশ্ন তার মনে উদয় হলো—
"এসবের সাথে আমার সম্পর্ক কী?কেনো আমি এই স্বপ্ন দেখলাম?এলিজিয়া কে?জাইরনই বা কে?"
কোনো উত্তর ছিলো না,শুধু এক অজানা রহস্য,যা ক্রমেই গাঢ় হতে লাগলো।
ফিওনা ধপ করে উঠে বসার পরও বুকের ধড়ফড়ানি কমছিলো না।স্বপ্নের দৃশ্যগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো—জাইরন,এলিজিয়া,সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ,পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়া…
কিন্তু হঠাৎই সে আরেকটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পেলো।
তার ঘাড়ের ট্যাটুটা হালকা গরম হয়ে উঠলো।
ফিওনা চমকে উঠলো,হাত দিয়ে স্পর্শ করলো জায়গাটা। কিন্তু স্পর্শ করতেই যেন তার সারা শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো।ব্যথা!এক ধরণের অদ্ভুত ব্যথা ট্যাটু থেকে ছড়িয়ে পড়ছে,যেনো কিছু সিগন্যাল দিচ্ছে!
"এটা…এটা আবার হচ্ছে কেন?" ফিওনা চাপা গলায় ফিসফিস করলো।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখার চেষ্টা করলো।ট্যাটুটার গাঢ় নকশা যেন হালকা জলজল করছিলো,ঠিক যেন কোনো এক্টিভ শক্তি এতে জেগে উঠেছে!
আর তখনই তার মাথায় ভেসে উঠলো স্বপ্নের সেই শব্দ…
"জাইরন!"
ফিওনার চোখ বড় হয়ে গেলো।এই নামটা কোথা থেকে এল? আর কেনই বা তার শরীর এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে?
তারপর সে ধীরে ধীরে টের পেলো—এটা শুধুই ব্যথা নয়,এটা যেনো একটা বার্তা!
কিন্তু বার্তাটা কী?কে দিচ্ছে?
ফিওনা বুঝতে পারলো,তার অতীতের সঙ্গে এই ট্যাটুর,এই স্বপ্নের,আর এই নামগুলোর গভীর কোনো সংযোগ আছে। কিন্তু কী সেই সংযোগ,তা জানার জন্য তাকে আরও গভীরে যেতে হবে।
কক্ষের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছিলো।ফিওনা হাত দিয়ে ট্যাটুটার ওপর চেপে ধরলো,মৃদু কাঁপতে কাঁপতে বললো "আমাকে জানতে হবে…স্বপ্নটা কিসের ইঙ্গিত?এলিজিয়া কে?"
ঠিক তখনই,বাইরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ হলো।
একটা ঝড় যেন তার অতীতকে তুলে আনতে চলেছে…
.
.
.
এদিকে জ্যাসপারও গভীর ঘুমে ছিলো,কিন্তু হঠাৎই তার শরীরে একটা তীব্র ধাক্কা অনুভব করলো।
তার ঘাড়ের সবুজ ড্রাগনের ট্যাটুটা যেন জ্বলতে শুরু করলো!
সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। কক্ষের অন্ধকারের মধ্যেও তার গাঢ় সবুজ ট্যাটু জ্বলজ্বল করছিলো,যেন কারও সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চাইছে।
"আবারও?"জ্যাসপার ফিসফিস করে বললো,নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে।
তার মনে পড়ে গেলো,শেষবার যখন এমন হয়েছিলো,তখন সে পৃথিবীতে ছিলো।আর এবার?এবার তো ফিওনা ভেনাসে। তাহলে কি এর সঙ্গে ফিওনার কোনো সম্পর্ক আছে?
সে নিজের হাতের মুঠি শক্ত করলো।
"না,এখানে কিছু একটা ঠিক নেই।"
জ্যাসপার ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের ড্রাগন ইন্দ্রিয়কে ব্যবহার করে ট্যাটুর সংকেত বোঝার চেষ্টা করলো।কিন্তু কোনো উত্তর পেলো না।বরং মনে হলো,কারও উপস্থিতি সে অনুভব করতে পারছে…কারও যার অস্তিত্ব অনেক গভীরে চাপা পড়ে আছে।
তারপর হঠাৎই মনে পড়ে গেলো দেবতা আভ্রাহার কথা।
"তিনি বলেছিলেন আমি জাইরনের পুনর্জন্ম আর এলিজিয়া হচ্ছে অ্যালিসা।"
"এলিজিয়া?" জ্যাসপার ধীরে ধীরে নিজের মনে কথাটা আওড়ালো।
তার হাত দুটো কাঁপছিলো।যদি অ্যালিসা সত্যিই এলিজিয়া না হয়…তাহলে কি এতদিন সে ভুল বুঝেছে?
সে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।
"কালকেই আবার দেবতা আভ্রাহার কাছে যেতে হবে।"
জ্যাসপার জানে,দেবতা কিছু লুকিয়ে রেখেছে।সে আজ আর বিশ্রাম নেবে না।কাল যে করেই হোক,তাকে সত্যটা জানতে হবে।
(চলবে.........)
#আযদাহা
#দ্বিতীয়_খন্ড(পর্ব নাম্বার ৭)
#লেখিকাঃসবিলা_সাবি
ভেনাসের আকাশ আজ স্বচ্ছ, সূর্যের আলো নীলাভ মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে।ফিওনার পা প্রথমবারের মতো স্পর্শ করল স্টেলার একাডেমির মসৃণ, ধাতব-মিশ্রিত পথ। এখানকার মাটি কাঁচের মতো স্বচ্ছ, নিচে ভেসে থাকা বিশাল সব শক্তি-কেন্দ্র দেখা যায়, যা পুরো ক্যাম্পাসের ভারসাম্য বজায় রাখছে। আশেপাশের ভবনগুলো যেন কেবল ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার নিদর্শন নয়, বরং শিল্পকর্ম—নির্মল আকাশের নিচে ভাসমান, মাধ্যাকর্ষণের শৃঙ্খলা অস্বীকার করে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্যাম্পাসে ঢোকার মুহূর্তেই ফিওনা টের পেল শত শত দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ মুখের কোণে চাপা হাসি, কেউ আবার বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। নতুন শিক্ষার্থী এখানে আসে প্রতি বছর, কিন্তু আজ যেন পরিস্থিতি কিছুটা অন্যরকম।
“ও কি নতুন?”
"প্রাইম ডিভিশনের ছাত্রী?”
“কোন রাজ্য থেকে এসেছে?”
ফিসফিসগুলো ফিওনার কানে আসছিল, কিন্তু সে ভান করল যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল,যদিও গলা শুকিয়ে আসছিল।
"তুমি ঠিক আছ তো?" পাশে থাকা লিয়ারা ধীরে ধীরে বলল।
ফিওনা মৃদু মাথা নাড়ল।
একাডেমির প্রবেশদ্বার স্বচ্ছ, নীলাভ স্ফটিকের তৈরি, যার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতেই চারপাশের বাতাসে অদ্ভুত এক ভারী অথচ আরামদায়ক অনুভূতি ভেসে এলো। বিশাল গ্রাভিটেশনাল প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই এক ভবন থেকে অন্য ভবনে চলে যেতে পারে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ কিন্তু কঠিন পদার্থের তৈরি ফ্লোরে মহাকাশের তারার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, যা হাঁটার সময় এক অনন্য অনুভূতি দেয়।
এখানে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অনুযায়ী প্রাইম ক্যাডেটস (প্রথম স্তর) →নতুন শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়।
ইন্টারমিডিয়েট ক্যাডেটস (দ্বিতীয় স্তর) →যারা কিছু বছর পড়েছে,কিন্তু এখনো বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে যায়নি।
অ্যাডভান্সড ক্যাডেটস (তৃতীয় স্তর) → যারা গবেষণা ও জটিল বিষয়গুলোতে পারদর্শী হতে শুরু করেছে।
এলিট স্টেলার গার্ডস (চূড়ান্ত স্তর) →যারা শিক্ষার শেষ ধাপে এসে বাস্তব প্রশিক্ষণ ও মিশনে অংশ নিচ্ছে।
এটি একাডেমির সর্বোচ্চ স্তর,যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনাই করে না, বরং বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা, যুদ্ধ কৌশল,ও স্টেলার টেকনোলজি-তে প্রশিক্ষিত হয়।
অন্যদিকে,ফিওনা "প্রাইম ক্যাডেটস"-এ নতুন ভর্তি হয়েছে,যেখানে তাকে মূলত স্টেলার ফিজিক্স,কসমিক ইতিহাস,আর বেসিক মহাকাশ প্রযুক্তি শেখানো হবে। এই ক্যাম্পাসে পৃথিবী থেকে ফিওনাই একমাত্র সদস্য।
হঠাৎ পুরো ক্যাম্পাসে মৃদু ঝঙ্কার শোনা গেল। একাডেমির মূল ভবনের সামনে বিশাল এক হলোগ্রাফিক স্ক্রিন জ্বলে উঠল,যেখানে ধীর কণ্ঠে ঘোষণা এল,
"সম্মানিত শিক্ষার্থীরা,আজ আমরা আমাদের নতুন সহপাঠীকে স্বাগত জানাচ্ছি।"
তারপরই কণ্ঠ বদলে গিয়ে পরিচিত হয়ে উঠল।
"ফিওনা।সামনে আসো।"
গলার স্বর প্রফেসর লেক্সান্দ্রাসের।
ফিওনার বুক ধক করে উঠল। এত শিক্ষার্থীর সামনে?
ক্যাম্পাসের ওপেন-এয়ার সেমিনার হলে বিশাল এক জমায়েত, চারপাশে শূন্যে ভাসমান সিটিং এরিয়া, যেখানে শিক্ষার্থীরা বসে আছে। প্রত্যেকের চোখ এখন ফিওনার দিকে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল, অনুভব করল অদৃশ্য এক চাপে সে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।
প্রফেসর লেক্সান্দ্রাস তার দিকে তাকালেন। তার চোখ গভীর, প্রজ্ঞায় ভরা, তবে ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি।
"এই শিক্ষার্থী আমাদের প্রাইম ডিভিশনের নতুন সদস্য।"
সবাই নীরব। শুধু কিছু ফিসফিস শোনা যাচ্ছে,
"সে কোন রাজ্যের?"
"আগে কখনো নাম শুনিনি।"
"তার শক্তি কী?"
প্রফেসর এবার এক মুহূর্ত থেমে বললেন, "ফিওনা এসেছে পৃথিবী থেকে।"
এবার যেন এক মুহূর্তে পুরো ক্যাম্পাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
পৃথিবী থেকে?
যারা এই নাম কখনো শোনেনি,তারা কপাল কুঁচকে তাকাল। যারা জানত,তারা শিহরিত হলো।ভেনাসের বাইরের কেউ এখানে?একাডেমির ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি।
ফিওনা টের পেল, এখন সবাই তাকে শুধু কৌতূহলের চোখে নয়, অবিশ্বাস আর শঙ্কার চোখে দেখছে।
একজন শিক্ষার্থী চাপা গলায় বলল, "এটা কি সম্ভব? একজন পৃথিবীর মেয়ে আমাদের ভেনাসের ক্যাম্পাসে?"
অন্যজন ফিসফিস করল,"তার কি বিশেষ শক্তি আছে?"
ফিওনা কেবল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।তার চারপাশের গুঞ্জন ধীরে ধীরে বাড়ছে।সে জানে,এই জায়গা তার জন্য সহজ হবে না।
কিন্তু সে জানে এটাও—এই ক্যাম্পাসে তার আসার পিছনে কোনো না কোনো কারণ আছে।হয়তো এই একাডেমি, হয়তো এই রাজ্য,হয়তো পুরো ভেনাসই তার ভাগ্যে লেখা ছিল।
সে গভীর শ্বাস নিলো।
এই যুদ্ধ তাকে একাই লড়তে হবে।
তারপর প্রফেসর বললেন, "ফিওনা, তোমার প্রথম ক্লাস হবে ‘স্টেলার ফিজিক্স’ বিষয়ে। তুমি ক্লাসরুম বি-৩ এ চলে যাও।"
ফিওনা এক মুহূর্ত দম নিলো। সে জানে, এটা শুধুই শুরু। এখন তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে, এই উন্নত গ্রহের মেধাবীদের মাঝে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হবে।
স্টেলার একাডেমির ক্লাসগুলো ছিল হোলোগ্রাফিক থিয়েটার-এর মাধ্যমে পরিচালিত, যেখানে বাস্তবের মতোই জিনিস অনুভূত হয়। প্রথম ক্লাস ছিল "কসমিক এনালিটিক্স", যেখানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন গ্রহ ও সভ্যতার বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পুরো কক্ষটাই যেন ভবিষ্যতের কোনো গবেষণাগার, চারদিকে স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল, যার ওপাশে মহাজাগতিক নীল আভা ভেসে বেড়াচ্ছে। শূন্যে ভাসমান স্ক্রিনে ক্লাসের বিষয়বস্তু ফুটে উঠছে, আর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফেসর লেক্সান্দ্রাস—ভেনাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, ড্রাগন ইতিহাস ও শক্তির ওপর বিশেষজ্ঞ।
ফিওনা ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। আজ তার প্রথম ক্লাস, আর প্রথম দিনেই তাকে নিজের পরিচয়, নিজের শক্তি নিয়ে নতুন কিছু শিখতে হবে।
প্রফেসর ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, "ফিওনা, তুমি জানো কি, তোমার ভেতরে যে শক্তি রয়েছে, তা খুব সাধারণ কিছু নয়?"
ফিওনা কিছুটা চমকে গেল।
"আমি... আমি তো জানি না," সে মৃদু স্বরে বলল।
প্রফেসর হালকা হাসলেন, তারপর স্ক্রিনের দিকে ইঙ্গিত করলেন। সেখানে বিভিন্ন রঙের ড্রাগনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল—নীল, লাল, রূপালী, সবুজ... আর একদম শেষে একটি বাদামী ড্রাগনের প্রতিচ্ছবি।
"এটা হলো বাদামী ড্রাগন।খুব বিরল।
ফিওনার চোখ বড় হয়ে গেল।"আমি কি...আমি কি বাদামী ড্রাগনের উত্তরাধিকারী?"
প্রফেসর মাথা নাড়লেন। "ঠিক তাই।বাদামী ড্রাগনের বিশেষত্ব হলো—তারা শুধু শারীরিক শক্তিতেই শক্তিশালী নয়,বরং তাদের মানসিক শক্তিও অসাধারণ। তারা অনুভব করতে পারে এমন অনেক কিছু,যা সাধারণ ড্রাগনরা পারে না। তাদের কাছে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যতের কিছু আভাসও আসে।"
ফিওনার মনে পড়ল তার স্বপ্নগুলোর কথা। কখনো অদ্ভুত আলো, কখনো অস্পষ্ট চিত্র, কখনো এক রহস্যময় কণ্ঠস্বর... তবে কি এই সব কিছুই তার ভেতরের ক্ষমতার অংশ?
"তবে মনে রেখো," প্রফেসর এবার কঠোর কণ্ঠে বললেন, "ভেনাসে খুব কম ড্রাগন রূপ ধরবে।বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ড্রাগন রূপ ধারণ করা বিপ*জ্জনক হতে পারে।"
ফিওনা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
"কেন?বিপ*জ্জনক কেন?"
প্রফেসর গভীর চোখে ফিওনার দিকে তাকালেন।
"কারণ ভেনাসের নিয়ম বদলাচ্ছে,আর তোমার শক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে,তাহলে তা এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"
.
.
.
.
প্রথম ক্লাস শেষ হতে না হতেই ফিওনার মাথা ভরে আছে হাজারো নতুন তথ্য দিয়ে।বাদামী ড্রাগনের বিশেষত্ব, ভেনাসের নিয়মকানুন,আর তার নিজের অজানা শক্তি—এসব ভাবতে ভাবতেই সে হাঁটছিল স্টেলার একাডেমির বিশাল করিডোর দিয়ে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ক্যান্টিনে পৌঁছাল। ষক্যান্টিনটা যেন সাধারণ কোনো খাবারের জায়গা নয়,বরং ভবিষ্যতের এক ভোজনশালা।টেবিলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাবার পরিবেশন করছে,শূন্যে ভাসমান মেন্যু স্ক্রিন থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের খাবার অর্ডার করছে।
ফিওনার পাশেই বসেছে কিছু নতুন বান্ধবী—রায়না,মেলিয়া আর সেরেনা।তারা সবাই প্রাইম ডিভিশনের শিক্ষার্থী আর ফিওনাকে দেখে খুবই আগ্রহী।
"তাহলে তুমি পৃথিবী থেকে এসেছো?মানবী থেকে ড্রাগনে পরিনত হয়েছো?এটা তো অবিশ্বাস্য!" রায়না চওড়া চোখে তাকিয়ে বলল।
মেলিয়া হাসল, "আমাদের ক্যাম্পাসে প্রথমবার কোনো মানুষ ভর্তি হলো,এটা ইতিহাস!"
ফিওনা একটু অস্বস্তি বোধ করলেও মেলিয়াদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে স্বস্তি পেল।
ঠিক তখনই,একটা ছেলেকে দেখা গেল।লম্বা,ছিপছিপে গড়ন,চোখে যেন দুষ্টুমি ঝলক দিচ্ছে।সে একদম ফিওনার সামনে এসে বসে বলল—
"শুনেছি,তুমি পৃথিবী থেকে এসেছো।একবার বলে দাও তো, পৃথিবীর খাবারের স্বাদ কেমন?কারণ এই ক্যান্টিনের খাবার তো মনে হচ্ছে এলিয়েনদের জন্য বানানো!"
ছেলেটির কথায় ফিওনা প্রথমে চমকে গেলেও পরে হেসে ফেলল।"তোমার নাম কী?"
ছেলেটি চোখ টিপে বলল,"আমি লুকাস!আর তুমি?অবশ্যই তুমি ফিওনা।কারণ এখন পর্যন্ত পুরো ক্যাম্পাস তোমার কথা বলছে!"
ফিওনা অবাক হলো,"আমার কথা?"
লুকাস কাঁধ ঝাঁকাল,"অবশ্যই!এতদিন ধরে কেউ জানতেও পারেনি যে পৃথিবী থেকে কেউ এখানে পড়তে আসতে পারে। আর এখন তুমি এখানে!আমি বাজি ধরে বলতে পারি,তুমি শুধু ক্লাসে নয়,পুরো একাডেমিতেই আলোড়ন তুলে ফেলবে!"
ফিওনা হাসল।লুকাসের মজার কথাবার্তা আর সহজাত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ তাকে স্বস্তি দিচ্ছিল।এতদিন ধরে সে শুধু নিজের ভেতরে ভয়ের সঙ্গে লড়াই করছিল,কিন্তু এখানে এসে নতুন বন্ধু পাওয়াটা সত্যিই একটা স্বস্তির ব্যাপার।
"তাহলে?" লুকাস আবার বলল,"তুমি কি আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে?আমি কিন্তু খুবই ভালো বন্ধু!"
ফিওনা চোখ সরু করে তাকাল,"তুমি কি সবসময় এত কথা বলো?"
লুকাস হাসল, "এটাই আমার বিশেষত্ব!"
ফিওনা হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল, "ঠিক আছে,লুকাস।উই আর ফ্রেন্ডস নাও!"
লুকাস উচ্ছ্বসিত মুখে বলল, "তাহলে বন্ধুত্বের প্রথম নিয়ম, ক্যান্টিনের সবচেয়ে ভালো খাবার খুঁজে বের করা!চল,শুরু করা যাক!"
ফিওনা বুঝতে পারল,লুকাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানেই একগাদা হাসি,মজা,আর রহস্যময় সব কাণ্ডকারখানা হবে!
.
.
.
দুই দিন কেটে গেছে,আর ফিওনা বুঝতে পারছে স্টেলার একাডেমিতে তার জীবনটা এখন বেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।নতুন পরিবেশ,নতুন বন্ধুরা—সবকিছুতেই সে নিজেকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে।তবে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিচ্ছে লুকাস।ওর হাসিখুশি স্বভাব,ঠাট্টা-মশকরা,আর দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে ফিওনার একাকীত্ব যেন উধাও হয়ে গেছে।
লুকাসের সঙ্গে প্রতিদিন ক্লাস করা,ক্যান্টিনে খাওয়া, লাইব্রেরিতে পড়াশোনা—এসব যেন এক রুটিন হয়ে গেছে ফিওনার জন্য।কিন্তু আজকের দিনটা একটু অন্যরকম।
ক্যান্টিনে ঢুকেই ফিওনা টের পেল,কেউ একজন তাকে দেখছে।অস্বস্তি বোধ করল সে।চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল,কোণের এক টেবিলে বসে থাকা একজন দীর্ঘদেহী ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে।চোখজোড়া আকাশী রঙের, মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভাব।
ফিওনার মনের মধ্যে মুহূর্তেই ঝলক দিয়ে উঠল—এই ছেলেটাকে সে আগেও দেখেছে!কোথায়?
ফ্লোরাস রাজ্যের দরবারে।
ফিওনার মুখ ভ্রু কুঁচকে গেল।সে এই ছেলেটাকে ড্রাকোনিসের ছোট ছেলে হিসেবে দেখেছে, প্রিন্স জ্যাসপারের ছোট ভাই।কিন্তু সে এখানে কী করছে?
ছেলেটি ধীর পায়ে এগিয়ে এল।
"ফিওনা, তুমি এখানে?"
তার গলার স্বর গভীর,কিন্তু অবাক লাগছিল না,বরং যেন সে অনেক কিছু জানে।
ফিওনা চোখ সরু করে তাকাল,তারপর পাল্টা প্রশ্ন করল, "আপনি এখানে কেন?"
ছেলেটি একটু হাসল। "আমি এখানে পড়ি। অ্যাডভান্সড লেবেল আপাতত ফাইনাল ইয়ারে আছি,এলিট স্টেলার গার্ডসের সদস্য।"
ফিওনা বিস্ময়ে চোখ বড় করল। "তাহলে তো আপনার পড়ালেখা শেষ পর্যায়ে?"
এথিরিয়ন মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ কিন্তু তুমি?"
ফিওনা সোজা হয়ে দাঁড়াল। "আমি প্রাইম ডিভিশনের।"
এথিরিয়নের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল। তারপর সে মুখে রহস্যময় এক হাসি এনে বলল,"বেশ,তাহলে তুমি আর আমি এখন একই একাডেমিতে তবে আমি তোমার সিনিয়র।"
ফিওনা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,"এতো বড় ছেলে হয়ে এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি?"
এথিরিয়ন হেসে পাশের চেয়ার টেনে বসে বলল,"তোমার কি আমাকে বয়স্ক মনে হয়?আমি কচি একটা ছেলে,সবেমাত্র ২৪ বছর বয়স হয়েছে।জ্যাসু ভাইয়ের মতো ২৮ নয়।"
ফিওনা একটু থমকালো।কথাটা শুনে তার মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করল।সে তো শুধু একটা সাধারণ প্রশ্ন করেছিল,আর এথিরিয়ন তার উত্তরে হুট করে জ্যাসপারের প্রসঙ্গ টেনে আনল কেন?
সে কি ইচ্ছে করেই জ্যাসপারের কথা তুলল?নাকি এটা নিছকই কাকতালীয়?
ফিওনা চট করে নিজের অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলল।সে আর দাঁড়াল না। সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল, "ঠিক আছে,দেখা হবে। বিদায়।"
কথা শেষ করেই সে দ্রুত ক্যান্টিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
তার ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি বাসা বাঁধছিল।
ড্রাকোনিসের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে এমন কাউকে দেখতে বা কথা বলতে কেনো যেনো ভালো লাগে না!
.
.
.
.
রাত গভীর।ফিওনার কক্ষে নরম আলো জ্বলছিল,জানালাটা হালকা খোলা,আর বাতাসে বইয়ের পাতাগুলোর ধীরে ধীরে ওলট-পালট হওয়ার শব্দ।সারা দিন ক্লাস আর বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে কখন যে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে, সেটা সে নিজেও জানে না।পাতার নিচে রাখা হাতটা ধীরে ধীরে উঠে-নামছে,গভীর ঘুমের নিঃশ্বাসে।
কিন্তু সে জানে না—এই ঘুমের পাহারায় আছে আরেকজন।
এল্ড্র রাজ্যের ল্যাব থেকে কেউ একজন মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
জ্যাসপার।
সে পর্দার স্ক্রিনে চোখ রাখলো।তার ছোট্ট,নিখুঁতভাবে তৈরি ড্রোনটি এখন ফিওনার কক্ষে।জানালার ফাঁক গলে নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে।
ড্রোনটি ধীরে ধীরে ফিওনার মুখের কাছাকাছি এলো।স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ফিওনার প্রশান্ত মুখ,তার চোখের লম্বা পাপড়ি, নিঃশ্বাসে সামান্য কাঁপতে থাকা ঠোঁট।জ্যাসপার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
ড্রোনটি একটু নিচে নামল,একদম ঠোঁটের কাছে।
জ্যাসপার নিজের অজান্তেই স্ক্রিনের সামনে ঝুঁকে এলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।যেনো এই স্ক্রিন পেরিয়েই...
তার ঠোঁট স্ক্রিনের উপর ছোঁয়া লাগলো।
একটা দীর্ঘ মুহূর্ত কাটল।
সে জানে, এই চুম্বনের কোনো অস্তিত্ব নেই।
সে জানে, ফিওনা কিছুই টের পাবে না।
তবুও কেন জানি মনে হলো—সে এক মুহূর্তের জন্য সত্যিকারের স্পর্শ অনুভব করলো।
কিন্তু…
ফিওনা তখনই একটু নড়েচড়ে উঠে, যেন ঘুমের মধ্যেও কিছু অনুভব করেছে। শ্বাস একটুখানি গভীর হয়ে এলো।
জ্যাসপার দ্রুত ড্রোনটি ফিরিয়ে নেয়।
রাতের আকাশে ফ্লোরাস রাজ্যের নরম আলো ছড়িয়ে আছে, কিন্তু বাতাস আজ অস্বাভাবিক ঠান্ডা।জানালার ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত বাতাসে ফিওনার শরীর একবার কেঁপে উঠল।ঘুমের গভীরেও তার মুখটা অস্বস্তিতে কুঁচকে গেল।
স্ক্রিনের ওপার থেকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে জ্যাসপারের ভ্রু একসাথে কুঁচকে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।এল্ড্র রাজ্যের রাজকীয় মহলে বসে থাকার সময় নেই তার।
এক মুহূর্তের মধ্যে সে ড্রাগন রূপ ধারণ করল।তার বিশাল ডানা রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ল,যেন আকাশে নীরব এক আতঙ্ক।সবুজ আঁশের শরীরে চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে,আর সে এক প্রবল বেগে ফ্লোরাস রাজ্যের দিকে উড়ে চলল।
শূন্যে ভেসে এসে জ্যাসপার ফিওনার বারান্দায় নামল,তার ডানা গুটিয়ে নিলো নিঃশব্দে ফিরে এলো মানব রুপে।
হালকা ঠান্ডা বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।
বারান্দার দরজায় হাত রাখতেই টের পেল,দরজাটা খোলা!
সে এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে ভেতরে প্রবেশ করল।
ফিওনা ঘুমিয়ে আছে,ছোট্ট শিশুর মতো নিস্তব্ধ।
বালিশের পাশে খোলা বই,তার একপাশে গড়িয়ে পড়েছে নোটবুক।লম্বা বাদামী চুলগুলো বিছানার চাদরে ছড়িয়ে আছে।জানালার দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসে তার শরীর কেঁপে উঠছে বারবার।
জ্যাসপার নিঃশব্দে তার পাশে বসল।
একদম ধীর হাতে রাজকীয় কম্বলটা তুলে নিলো,তারপর সাবধানে ফিওনার গায়ে জড়িয়ে দিল।যেন সে একটুও অস্বস্তি না পায়।যেন তার ঘুমে একটুও ব্যাঘাত না ঘটে।
ফিওনার চোখের পাতাগুলো এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল, যেন কোনো স্বপ্নের ভেতর সে কিছু অনুভব করেছে।
কিন্তু জ্যাসপার জানে,মানুষ চিরকাল স্বপ্নের ভেতরেও কিছু স্মৃতি ধরে রাখে…জ্যাসপার স্থির হয়ে বসে আছে ফিওনার পাশে,একদৃষ্টিতে তাকিয়ে।
কতো মাস!
কতো মাস পেরিয়ে গেছে,অথচ আজ এই প্রথমবার আবারও সে ফিওনাকে এভাবে দেখছে।
নিঃশব্দ,নিশ্চুপ,কোমলীয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
এভাবেই তো দেখত সে ফিওনাকে মাউন্টেন গ্লাস হাউজে— যখন রাতের আকাশের নিচে,কাঁচের দেয়ালের ওপাশে, শুধুমাত্র চাঁদের আলোয় ফিওনার নিঃশ্বাসের ওঠানামা দেখতে পেতো।সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যাসপার।
তার হাত অজান্তেই একটু বাড়িয়ে দিল ফিওনার দিকে।
অস্ফুট স্বরে ফিসফিস করে বলল,“আমার হামিংবার্ড…
ঠিক আগের মতোই নাজুক,কোমল।”
তার ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি খেলে গেল।
একদিকে অভিমান,অন্যদিকে গভীর এক আকর্ষণ।
ইচ্ছে করছে…
কপালে আলতো করে একটা চুম্বন দিতে।
কিন্তু পারছে না।
জ্যাসপার জানে,এটা এক মুহূর্তের দুর্বলতা।সে যদি একবার ফিওনাকে ছুঁয়ে ফেলে,তাহলে সে আর নিজেকে সামলাতে পারবে না।
সে জানে,তার মতো কারও কোনো অধিকার নেই ফিওনার এতটা কাছে আসার।
ফিওনার ঘুমের মাঝে ঠোঁট একটু নড়ল,যেন সে কোনো স্বপ্ন দেখছে।
জ্যাসপার গভীরভাবে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।
সে এখনো বন্দি তার নিজের নির্মম বাস্তবতার মধ্যে।
একবারও পেছনে না তাকিয়ে জ্যাসপার আবার অন্ধকার রাতের আকাশে মিলিয়ে গেল—ফ্লোরাস রাজ্যের বাতাসে তার সবুজ আঁশের ঝলক এক মুহূর্তের জন্য খেলে গেলো,তারপর সব নিঃশব্দ হয়ে গেল।
.
.
.
সকাল থেকে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল।ফিওনা যথারীতি ভার্সিটিতে এসেছে,ক্লাস করছে।স্টেলার একাডেমির সুবিশাল,আধুনিক ক্লাসরুমের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে হঠাৎ কিছু একটা দেখতে পেলো—
একটা ড্রোন।
ফিওনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
এই ড্রোনটা কোথায় দেখেছিলাম?
তার মনে হালকা সন্দেহ জাগলো।কিন্তু সেই মুহূর্তে ড্রোনটা জানালার পাশ দিয়ে উড়ে গেল।
কেন যেন মনে হলো,সে আগেও এটা দেখেছে।
সেদিন...
সেদিন রাতে,ফ্লোরাস রাজ্যে...জানালার বাইরে দেখছিলো।
ফিওনা গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলো।
তারপর হঠাৎই লুকাসের ডাক এল—
"ফিওনা!এইদিকে মন দাও!আজকের লেকচারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ!"
ফিওনা চমকে উঠলো।ড্রোনের কথা মুহূর্তেই ভুলে গেল।
কিন্তু সে বুঝতে পারেনি,এই ছোট্ট মনোযোগের ভিন্নতায় কী যেন এড়িয়েছে তার দৃষ্টি থেকে—
ক্লাসরুমের এক কোণে,জানালার ধারে একটানা স্থির হয়ে থাকা ড্রোনটির ভেতর থেকে তাকে কেউ পর্যবেক্ষণ করছিলো...
ফিওনা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে ক্যান্টিনে গেলো। চারপাশের পরিবেশ আজ বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। সকলে হাসছে,গল্প করছে,খাবার নিচ্ছে— সবকিছু যেন একদম রুটিন মাফিক চলছে।
কিন্তু হঠাৎই ক্যাম্পাসজুড়ে একটা অদ্ভুত উন্মাদনা শুরু হলো।
সারা ইউনিভার্সিটিতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো—
"প্রিন্স অরিজিন এসেছে!"
এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের আলোড়ন বয়ে গেলো।শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিন ছেড়ে দৌড়ে বাইরে যেতে লাগলো,করিডোরে ভিড় জমতে লাগলো।অনেকেই জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো,কেউ বা রিসেপশনের দিকে ছুটলো।
ফিওনা থমকে গেল।
প্রিন্স অরিজিন?
তার মনে হলো এই নামটা সে আগেও শুনেছে,কিন্তু মনে পড়ছেনা।
"কে এই অরিজিন?"ফিওনা পাশের লুকাসকে জিজ্ঞেস করলো।
লুকাস শ্বাস নিলো গভীরভাবে,মুখে এক ধরনের রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললো, "তুমি জানো না?সে ভেনাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাগনদের একজন। কিংবদন্তি ড্রাকোনিসের ছেলে প্রিন্স জ্যাসপার অরিজিন।রাজপরিবারের প্রতীক।অনেকে বলে,তার শক্তি এতটাই ভয়ংকর যে সে যদি সত্যিই রেগে যায়, পুরো এক গ্রহ ধ্বংস করতে পারে।"
ফিওনার কপালে ভাঁজ পড়লো।প্রিন্স জ্যাসপার স্টেলার একাডেমিতে কেন এসেছে?
তারপর এক মুহূর্তের জন্য একটা চিন্তা তার মনে বিদ্যুৎের মতো খেলে গেলো—
"উনি এখানে কেনো আসলেন?"
ঠিক তখনই বাইরে বিশাল এক ছায়া পড়লো।
প্রিন্স অরিজিন এসে গেছে।
ফিওনার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো।তার হৃদস্পন্দন এতটাই জোরে ধুকপুক করছে যেন মুহূর্তের জন্য পুরো বিশ্বটাই থমকে গেছে।সে পালাতে চেয়েছিল,কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে এক টানে সে আটকে গেল কঠিন প্রাচীর আর শক্তিশালী শরীরের মাঝে।
গভীর,তীব্র শ্বাস ফেলে জ্যাসপার তার মুখের এতটা কাছে চলে এলো যে ফিওনার ত্বকে তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। এক হাতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে,অন্য হাতে ফিওনার কব্জি শক্ত করে ধরে রেখেছে,যেন সে নিশ্চিত করতে চায় যে এইবার তাকে ফিওনা আর এড়িয়ে যেতে পারবে না।
ফিওনার বুক ধড়ফড় করছে।
সে জানে,এখান থেকে তাকে পালাতে হবে।
কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে— জ্যাসপার।
ফিওনা অনুভব করলো,তার শরীর জমে গেছে।চারপাশে সব শব্দ যেন হারিয়ে গেছে।ক্যান্টিনের কোলাহল,শিক্ষার্থীদের গুঞ্জন— সব কেমন ধোঁয়াশার মতো দূরে সরে গেছে।
শুধু টের পাচ্ছে বুকের খুব কাছে উষ্ণ এক নিঃশ্বাস।
জ্যাসপার ওকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরেছে,শক্ত হাতে ফিওনার পথ আটকে রেখেছে।তার একটা হাত ফিওনার মাথার পাশে ঠেসে ধরে আছে,আর অন্য হাত আলতো করে ফিওনার কব্জিতে বাঁধার মতো ধরা।
ফিওনা চোখ বন্ধ করে ফেললো।
কেনো যেন মনে হচ্ছে,আরেকবার ওর চোখের দিকে তাকালে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
কিন্তু এইবার...জ্যাসপার সতর্ক।
সে সানগ্লাস পরে এসেছে।
তবে ফিওনা জানে,ওই অন্ধকার কাচের আড়ালে যে চোখদুটো আছে,সেগুলো হয়তো নির্মম,হয়তো আগুনের মতো জ্বলছে,কিংবা হয়তো একেবারে শীতল।
জ্যাসপার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে খুব ধীর স্বরে বললো—
"আমাকে দেখে পালাচ্ছ কেন,হামিংবার্ড?"
ফিওনা গলা শুকিয়ে গেল।সে একটা শব্দও বের করতে পারলো না।
জ্যাসপার আরও ঝুঁকে এলো।এতটাই কাছে যে,তার কেশর সুবাস স্পষ্ট অনুভব করা যায়।
"আমার চোখে তাকাতে ভয় পাচ্ছ?"
ফিওনা শক্ত করে ঠোঁট কামড়ে ধরলো।
কিন্তু তখনই...
জ্যাসপার তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গা ছমছম করা স্বরে ফিসফিস করে বললো—
"তবে আজ সানগ্লাস আছে... তাকাতে পারো,হামিংবার্ড।"
“তুমি এই ছেলেটির সাথে কেনো?”জ্যাসপারের গলা যেন ভেঙে পড়ছে।তার কণ্ঠে একটি জোরালো আবেগ,যার আঁচ ফিওনার মনে পৌঁছায়।
ফিওনা বিস্ময়ে তার দিকে তাকায়। “তাতে আপনার কি?আপনি আমার কি হন?” সে চ্যালেঞ্জিং গলায় প্রশ্ন করে।
জ্যাসপার কিছুক্ষণ চুপ থেকে, যেন তার অন্তরের ক্রোধ ও উদ্বেগের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। এরপর,গভীর গলায় বললো,“আমি তোমার জীবন থেকে হারানো রাত্রির তারা,হামিংবার্ড।আমি তোমার হৃদয়ে বসবাসকারী এক অন্ধকারের প্রহরী।তুমি যখন অন্য কারো সাথেও হাসো,তখনও আমি অনুভব করি,সেই হাসির প্রতিধ্বনি আমার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।তুমি জানো না,এই জগতের প্রতিটি জিনিস আমাকে তোমার দিকে টেনে আনে।
ফিওনা হতবাক হয়ে যায়, তার মনে ঝড়ের মতো অনুভূতি বয়ে যায়। “আমার কিছু মনে নেই,আমি আপনাকে চিনি না!”সে কঠোর গলায় উত্তর দেয়।
জ্যাসপারের কণ্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে যায় “কিন্তু তুমি এখনো আমাকে ভালোবাসো,তোমার অজান্তেই,”জ্যাসপারের চোখে একটি ক্রোধের ঝলক।"স্মৃতি মুছে গেলেও আমি তোমার হৃদয়ে সবসময় থাকবো।তুমি মহাবিশ্বের যেখানেই যাওনা কেনো হামিংবার্ড!তবুও আমি তোমার হ্নদয়ের আকাশে নক্ষত্র হয়ে থাকবো চিরকাল।"
ফিওনার হৃদয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগ্রত হয়। জ্যাসপারের কথাগুলি তাকে আঘাত করে, তার অজান্তেই।এই মুহূর্তে, সে বুঝতে পারে যে,তার স্মৃতি না থাকার পরেও, জ্যাসপারের আবেগগুলো তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
ফিওনা ভ্রু কুঁচকালো,তার কণ্ঠে কৌতূহল মেশানো বিরক্তি।
"আপনি আমাকে হামিংবার্ড কেন ডাকছেন?এটা তো পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট পাখি,কিন্তু আমি এখন ড্রাগন।"
জ্যাসপার একটু হেসে এগিয়ে এলো,তার গভীর চোখজোড়া যেন এক বিশাল মহাজাগতিক রহস্য ধারণ করে আছে।
"হামিংবার্ড ছোট,কিন্তু এর রঙিন পালক,এর কোমলতা,আর এর দুরন্তপনা একে অন্যদের থেকে আলাদা করে।এটা দেখতে নাজুক,কিন্তু এর ভেতর এক অদম্য শক্তি আছে।"
তার কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো, তারপর গভীরভাবে ফিওনার চোখে চোখ রেখে বললো,
"এই পাখিটা ছোট হলেও অনেক দূর যেতে পারে,তার সীমা শুধু আকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না।যেমন তুমিও একদিন পৃথিবী থেকে আমার জন্য,আমার খোঁজে স্পেসশিপে করে এই দূর ভেনাসে চলে এসেছিলে।"
ফিওনা স্তব্ধ হয়ে গেলো।তার বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা অনুভূতি কাজ করলো।
জ্যাসপার একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,"তুমি আমার হামিংবার্ড,পৃথিবীর সেই ছোট পাখির মতো—নাজুক,কোমল কিন্তু তোমার ভেতর এক অদ্ভুত শক্তি আছে,এক দুর্দমনীয় স্পৃহা।তুমি যতই দূরে যাও,যতই পালাতে চাও,আমার মহাবিশ্বের মাধ্যাকর্ষণ তোমাকে টেনে আনবেই হামিংবার্ড।"
ফিওনা চোখ সরিয়ে নিলো,কিন্তু তার হৃদস্পন্দন যেন সত্যিই সেই হামিংবার্ডের মতো দ্রুত হয়ে উঠলো।
তার হৃদয়জুড়ে যেন একধরনের অচেনা অথচ পরিচিত আবেগের ঝড় বইতে শুরু করলো।
জ্যাসপার তখনও তাকে গভীরভাবে দেখছে,তার চোখের সেই অপরিচিত অথচ অপরিহার্য টান ফিওনার সমস্ত অস্তিত্বকে ঘিরে ধরছে।
“আপনি আমার কি হন,আমি আপাকে চিনি না?”
ফিওনার নিজের প্রশ্নটাই যেন ফিরে আসছে তার দিকে,কিন্তু এবার অন্যভাবে।
ফিওনা ভাবলো সে কি সত্যিই জানে না জ্যাসপার তার কি হয়?নাকি নিজের অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার করার জন্যই এমন বলছে?
জ্যাসপার একধাপ এগিয়ে এলো।বাতাসে তার সুবাস ছড়িয়ে পড়লো,একধরনের অগ্নিমাখা শীতলতা,যা একসাথে ভয়ংকর এবং মায়াময়।
“তোমার কিছু মনে নেই,তাতে কিছু যায় আসে না, হামিংবার্ড,”জ্যাসপার গভীর গলায় বললো।“কিন্তু আমি জানি,আমি কী ছিলাম,এবং আমি কী আছি।তুমি যতবার আমাকে ভুলে যাবে,,আমি ঠিক ততবার তোমার সামনে এসে দাঁড়াবো— যতবার প্রয়োজন,ততবার।”
ফিওনার গলা শুকিয়ে গেল।
তার মনে হচ্ছে,সে যেন এক অতল সমুদ্রে পড়ে গেছে, যেখানে স্মৃতি নেই,অথচ অনুভূতি আছে।
লুকাস তখনো কিছু দূরে দাঁড়িয়ে,কিন্তু এখন যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে ফিওনার দৃষ্টির জন্য।
এখন মাত্র জ্যাসপার আছে চোখের সামনে।
ফিওনা কঠিন কণ্ঠে বললো, “আপনি কিছুই জানেন না।”
জ্যাসপার একটু ঝুঁকে এলো,তার চোখের গাঢ় দৃষ্টি ফিওনাকে আবদ্ধ করে ফেললো যেন।
“আমি জানি, হামিংবার্ড।তোমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে আমি আছি।”
ফিওনার হৃদপিণ্ড তখনও অস্বীকার করছে,কিন্তু তার ভেতরের কোনো এক অংশ...সে যেন জানে, জ্যাসপার মিথ্যা বলছে না।
ফিওনা তখন বললো, "আমাকে যেতে দিন,ক্যাম্পাসের কেউ দেখে ফেলবে।"
জ্যাসপার নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,"দেখুক,আমার তাতে কিছু যায় আসে না।"
ফিওনা বিরক্ত হয়ে বললো,"আপনি এসেছেন,আর পুরো ভার্সিটি গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে।যদি কেউ এভাবে দেখে তাহলে কী হবে?"
জ্যাসপার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,"হ্যাঁ,আমি এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম।আমার ওপর সবাই ক্রাশ খেতো।মাঝে মাঝে প্রোগ্রামে আসি,তখনও মেয়েরা এমনটাই করে।"
ফিওনা হতভম্ব হয়ে গেল।
"আপনি... এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলেন?"
জ্যাসপার একটু বাঁকা হাসলো, যেন ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক।
"হ্যাঁ,আমি এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম।আমার ওপর সবাই ক্রাশ খেতো,এখনো খায়।মাঝে মাঝে প্রোগ্রামে আসলে মেয়েরা এভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায়।"
তার কথার ভঙ্গিতে এমন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল,যা ফিওনাকে একধরনের রাগ আর বিরক্তির মিশ্র অনুভূতি এনে দিলো।
ফিওনা এক ঝলক তাকালো জ্যাসপারের ঠোঁটের দিকে—আসলেই অদ্ভুত!সবার থেকে আলাদা,ঠোঁটজোড়া যেন রক্তিম বেগুনি ছায়ায় মোড়ানো।অজান্তেই তার মনে এলো, "ভাগ্যিস চোখে সানগ্লাস!যদি ওই চোখ দেখতে পেতাম, তাহলে কি হতো?"
জ্যাসপার একদৃষ্টিতে ফিওনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল। ফিওনা দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো,কিন্তু মনে মনে স্বীকার করলো, "এই প্রিন্সটা…কোয়াইট হ্যান্ডসাম।ড্যাশিং।"
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে একপ্রকার আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে বললো,"তুমি কি কিছু ভাবছিলে হামিংবার্ড?"
ফিওনা দ্রুত বললো,"একদম না!" তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো,কিন্তু মনে হলো,জ্যাসপারের চোখ না দেখেও সে তার নজরের ওজন অনুভব করতে পারছে।
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বললো, "আজ কি একটু বেশি হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে আমাকে, হামিংবার্ড?"
ফিওনা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। কী জবাব দেবে বুঝতে পারলো না। তার হৃদয় যেন একটু দ্রুত চলতে লাগলো।
ফিওনা কঠিন গলায় বললো,"আপনি তো অ্যালিসা,আমার বোন,তাকে বিয়ে করছেন,তাহলে?"
জ্যাসপার এক মুহূর্ত চুপ করে ফিওনার চোখে গভীরভাবে তাকালো,তারপর ধীরে ধীরে বললো,"তুমি একবার বলো, হামিংবার্ড...একবার শুধু বলো যে তুমি আমাকে বিয়ে করবে, তাহলে সবার সামনেই অ্যালিসার সঙ্গে বিয়ের কথা আমি না করে দেবো।"
ফিওনার হৃদয় মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো,কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,"আপনি যা খুশি করুন, আমার কিছু যায় আসে না।"
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললো, "তুমি কি সত্যিই তাই মনে করো?"
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিলো, দ্রুত পেছনে ঘুরে বললো, "আমার কাছে আর আসবেন না প্লিজ।"
তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না—দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করলো, যেন পালিয়ে বাঁচলো।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাসপার তার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করলো,ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা আরও গভীর হলো। "তুমি যতই পালাও,হামিংবার্ড,আমি ঠিক তোমার কাছেই চলে আসবো," নিজের মনে বললো সে।
.
.
.
জ্যাসপার দৃপ্ত পায়ে স্টেলার একাডেমির প্রিন্সিপালের চেম্বারে প্রবেশ করলো।কাচের জানালা দিয়ে দূরের গ্রহরাজি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল,আর সামনে বসে ছিলেন গম্ভীর মুখের প্রিন্সিপাল,যিনি এক নজরে জ্যাসপারকে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"আপনার আসার কারণ প্রিন্স?"
জ্যাসপার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়ার টেনে বসল।তার চোখে ছিল এক ধরনের জেদ,যা ভেনাসের কোনো যুক্তিতেই দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
"এলিসন ফিওনা,"সে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো, "ওকে আলাদাভাবে সবার চেয়ে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিবেন।ও আমার গার্লফ্রেন্ড ওর যেনো কোনোকিছুতে কোনপ্রকার অসুবিধা না হয়।"
প্রিন্সিপাল ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,যেন তার সামনে বসে থাকা এল্ড্র রাজ্যের প্রিন্স যা সমগ্র ভেনাসের প্রিন্স তার মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করছেন।কিন্তু জ্যাসপার তার কোনো ব্যাখ্যার অপেক্ষা না করেই উঠে দাঁড়ালো,তার কালো কোটের প্রান্ত বাতাসে দুলে উঠলো।
"আমি যা বলেছি,সেটা মনে রাখবেন।"
তারপর কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করেই সে বেরিয়ে গেলো।
প্রসিদ্ধ মার্বেলের করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে জ্যাসপারের সামনে এসে দাঁড়ালো এথিরিয়ন।তার চোখে ছিল কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা বিদ্রূপের ছাপ।
"কি ব্যাপার?"এথিরিয়ন নির্লিপ্ত গলায় বললো,"একদম রাজকীয় আদেশ দিয়ে বেরিয়ে আসলে মনে হলো?"
জ্যাসপার থমকে দাঁড়ালো,তারপর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,"তোর ভাবির দিকে একটু নজর রাখবি।"
এথিরিয়ন চোখ গোল করলো,কিন্তু কিছু বলার আগেই জ্যাসপার কটাক্ষপূর্ণ হাসিতে যোগ করলো,"ওই লুকাসের সাথে যেন বেশি কথা না বলে।কিন্তু হ্যাঁ,নজর রাখতে বলেছি মানে এই না যে খুব বেশি নজর দিবি।আমার প্রেয়সীর দিকে তোর চোখ বেশি গেলে আমি কিন্তু একটুও পছন্দ করবো না।"
তার কথার গাম্ভীর্য আর হালকা হুমকির সুরে এথিরিয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।সে জানে,জ্যাসপার কখনো নিজের জিনিসের ওপর দাবি ছাড়তে শেখেনি,আর ফিওনার ক্ষেত্রে সেটা যেন আরও প্রবল।
জ্যাসপার কোনো উত্তর না দিয়েই আবার হাঁটা ধরলো,তার লম্বা ছায়া স্টেলার একাডেমির রূপালি করিডোরে মিলিয়ে গেলো।এথিরিয়ন এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হাসলো।
(চলবে......…..)
#আযদাহা
#দ্বিতীয়_খন্ড( পর্ব নাম্বার ৮)
#লেখিকাঃসাবিলা_সাবি
আকাশে নিস্তব্ধতা।এক নিঃসঙ্গ চাঁদ তার বিবর্ণ আলো ছড়িয়ে রেখেছে ভেনাসের বুকে।পাহাড়ের ওপরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।চারদিকে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ভাসছে, যেন অজানা কোনো অতীতে ডুবে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।জ্যাসপার গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে,তার নিঃশ্বাস ধীর,কিন্তু হঠাৎই কপালে শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ,দৃশ্য বদলে যায়—
চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা,মাটিতে গলিত লাভার ধারা,আর তার মাঝখানে তিনটি ড্রাগন!
একটি সবুজ ড্রাগন,একটি কালো ড্রাগন,আর একটি বাদামী ড্রাগন।
ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে।আকাশ কেঁপে উঠছে তাদের বজ্রধ্বনিতে। কালো ড্রাগন রাগে দাউ দাউ করে জ্বলছে,তার পাখাগুলো ছি*ন্নভিন্ন হলেও সে অনড়,যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।বিপরীতে, সবুজ ড্রাগনের চোখে এক দহনশীল অগ্নিশিখা,যেন প্রতিশোধে উন্মত্ত।তাদের সংঘর্ষে পাহাড়ের শৃঙ্গ ধ্বংস হচ্ছে, বাতাসে ধূলি আর ছাই উড়ছে।সবুজ ড্রাগন কালো ড্রাগনের দিকে তেড়ে এসেছে, যুদ্ধ ভয়ঙ্কর!
আগুন আর থাবার আঘাতে আকাশ কেঁপে উঠছে, বাতাসে ধাতব গর্জন!
ঠিক তখন—
বাদামী ড্রাগন ছুটে আসে সবুজ ড্রাগনের দিকে!
সে যেন বাধা দিতে চায়, রুখতে চায় এই ধ্বংস!
কিন্তু…
তার দেহে আচমকা কালো ড্রাগনের থাবার আঘাত!
এক ভুল।
এক ভয়ংকর ভুল।
বাদামী ড্রাগন আকাশ থেকে ছিটকে যায়,পাহাড়ের কিনারায় তার দেহ দুলতে থাকে সে জোরে চিৎকার করে ডাকে জাইরন বলে।
ঠিক তখনি কালো ড্রাগনের চোখ বিস্ফারিত!
সে মুহূর্তের জন্য সবকিছু ভুলে ছুটে যায় তাকে বাঁচাতে!
সবুজ ড্রাগনও থমকে যায়।
তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে এক আর্তনাদ—
"এলিজিয়া!"
কালো ড্রাগনের গর্জনও একসাথে মিশে যায়—
"এলিজিয়া!"
তাদের একই চিৎকার!
ভয়ংকর পরিণতি
কালো ড্রাগন কিছু না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, বাদামী ড্রাগনকে বাঁচানোর জন্য।
সবুজ ড্রাগনও ছুটে আসে, কিন্তু তার চোখ জ্বলছে ক্রোধে।
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে পারে না!
কালো ড্রাগনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!
কিন্তু…
কালো ড্রাগন আর আক্রমণ করে না।
সে কেবল আহত হয়ে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে…
তার ডানা দুর্বল, শরীর থেকে রক্ত ঝরছে।
সে তাকিয়ে আছে বাদামী ড্রাগনের দিকে, যার মুখে একরাশ আতঙ্ক।
পরের মুহূর্তে—
কালো ড্রাগন পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যায়।
বাদামী ড্রাগনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়, যেন তার সমস্ত জীবন এক নিমিষে ধসে গেলো।
সবুজ ড্রাগন সেই দৃশ্য দেখে এক মুহূর্ত থমকে থাকে।
তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে।
তার চোখে এক অভিব্যক্তি খেলা করে—
ক্ষোভ, যন্ত্রণা…আর অপরিসীম শূন্যতা।
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না।
নিজেই নিজকে হত্যা করে পাহাড়ের নিচে ঝাঁপ দেয়।
সেখানে,শূন্যতার গভীরে,তিনটি ভাগ্য এক বিন্দুতে মিলিত হয়— তিনটি দেহ নিস্তব্ধ পড়ে থাকে,সময়ের গহ্বরে বিলীন হয়ে যায়।
জ্যাসপার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে জেগে ওঠে!অতীতের ছায়া
জ্যাসপার ধীরে ধীরে শ্বাস নেয়।তার দেহ এখনো ঘামে ভেজা, বুক ধড়ফড় করছে।
এই স্বপ্ন—এটা নতুন কিছু নয়,বহুদিন ধরে একই দৃশ্য ফিরে ফিরে এসেছে তার কাছে।
সবুজ ড্রাগন— জাইরন।
বাদামী ড্রাগন— এলিজিয়া।
এরা তো চিরচেনা,কিন্তু…
আজকের স্বপ্নে নতুন এক ছায়া এসেছে!
এক কালো ড্রাগন।
সে লড়াই করছিল জাইরনের সাথে,
কিন্তু যুদ্ধের মাঝেও,সে এলিজিয়াকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল!
আরও ভয়ংকর এক ব্যাপার…
সেও এলিজিয়াকে "এলিজিয়া" বলে ডাকছিল!
জ্যাসপারের দেহ এক মুহূর্তে জমে গেলো।
এটা অসম্ভব!
দেবতা আভ্রাহার তো বলেছিলেন—
"শুধুমাত্র জাইরন এই নামে ডাকতো তাকে অন্য কেউ না!"
তাহলে এই কালো ড্রাগন কে?
কেন তার কণ্ঠে একই আবেগ?
কেন তার চিৎকারেও ছিল সেই একই আকুলতা?
থেরন…?
হঠাৎ,তার মনে পড়ে গেলো।থেরন!
তাদের একমাত্র শত্রু।…
তবুও আজকের স্বপ্নে সে ঠিক তেমন ছিল না।
সেই কালো ড্রাগনটা লড়াই করেনি,প্রতিহিংসার বদলে সে ছুটে গিয়েছিল এলিজিয়াকে বাঁচাতে।
তাহলে কি… ইতিহাসের পাতায় ভুল লেখা হয়েছিল?
থেরন কি সত্যিই শুধু একজন ভিলেন ছিল?
না কি তার গল্পের আরেকটি অজানা দিক ছিল,যা সময়ের অতলে হারিয়ে গিয়েছিল?
জ্যাসপার ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো।
সে নিশ্চিত— এই রহস্যের সমাধান তাকে করতেই হবে।
.
.
.
অন্যদিকে......
গভীর রাত।নিঃস্তব্ধতার মাঝে এক ঘরের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো প্রবেশ করছে।ঘরের ভেতর কেউ একজন হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো।
তার নিঃশ্বাস ভারী,বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।
স্বপ্ন?
না,এটা শুধু স্বপ্ন নয়।এটা ছিল এক ভিন্ন বাস্তবতা— যা সে আগে কখনো দেখেনি,কখনো অনুভবও করেনি!
তার পাশে রাখা টেবিলে এক গ্লাস পানি ছিল,কাঁপা কাঁপা হাতে সেটি ঠোঁটে তুললো।
সে ভাবতে লাগলো…
এই তিন ড্রাগন কারা?
কেন তাদের যুদ্ধ হচ্ছিল আর তারা কেনো আমার স্বপ্নে আসলো?
সবুজ ড্রাগন,কালো ড্রাগন,আর বাদামী ড্রাগন…
আর…
"এলিজিয়া!"
এই নামটা কেন তার মনের মধ্যে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে?
কে সে?
আর… "জাইরন"…
কেন এই নাম শুনে তার বুকের ভেতর চাপা এক কষ্ট অনুভূত হলো?কেন তার মনে হচ্ছে,এই নামের সাথে তার এক গভীর সম্পর্ক আছে?সে জানে না কেন,কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।যেন সে এই নামগুলো ভুলে গেছে,অথচ এগুলো একসময় তার নিজেরই ছিল।
এই স্বপ্ন…এই স্মৃতি…সত্যি তো?
না কি ভুলে যাওয়া অতীত তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে?
সে জানে না।কিন্তু সে একদিন জানবেই।
.
.
.
.
সকালের প্রথম আলো জানালার পর্দায় নরম পরশ বুলিয়ে দেয়,কিন্তু ফিওনার জন্য সকালটা স্বাভাবিক ছিল না।
গভীর রাত থেকেই ঘাড়ের সেই ট্যাটুতে অসহনীয় ব্যথা হচ্ছে।
প্রতিদিনই হচ্ছে,তবে আজ যেন আরেক ধাপ বেশি।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড়ের সেই জায়গাটা স্পর্শ করলো,যেন কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু এই অদ্ভুত ব্যথার অর্থ কী?কেন এটা প্রতিদিন বাড়ছে?
আর কেনই বা মনে হচ্ছে,এটা শুধুই শারীরিক ব্যথা নয়, বরং এক গভীর কিছু… এক হারানো স্মৃতির ডাক?
এবার আর চুপ করে থাকা সম্ভব নয়।
ফিওনা দ্রুত তার মায়ের কাছে ছুটে গেলো।
লিয়ারা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন,কিন্তু মেয়ের উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে ঘুরে তাকালেন।
"মা,এটা আর সহ্য করতে পারছি না আমি!"
ফিওনার কণ্ঠ কাঁপছিল।
লিয়ারা অবাক হয়ে তার মেয়ের কথা শুনলেন,তার ব্যথার কথা,তার অদ্ভুত অনুভূতির কথা আর অদ্ভুত স্বপ্নের রহস্যের কথা।
কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে গেলো।
এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর লিয়ারা গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।"তুমি এখন ভার্সিটিতে যাও," লিয়ারা শান্ত কণ্ঠে বললেন।"আমি সন্ধ্যায় তোমাকে দেবতা আভ্রাহারের কাছে নিয়ে যাবো।ওনার কাছেই এর উত্তর আছে।" লিয়ার বুঝতে পারলো বিষয়টি স্বাভাবিক না,খুব বড় কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে।
ফিওনার বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠলো।
দেবতা আভ্রাহার!কিন্তু কেন?এই ব্যথার সাথে কি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্য লুকিয়ে আছে?ফিওনার মনে হাজারো প্রশ্ন,কিন্তু আজ সন্ধ্যার অপেক্ষা করা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই।
.
.
.
সকাল থেকে ক্লাসের চাপ,সঙ্গে ঘাড়ের অসহনীয় ব্যথা—ফিওনার মন আজ ঠিকমতো ক্লাসে ছিল না।
অবশেষে বিরতির ঘণ্টা বাজল।
সে ক্লাসের ব্যাগ কাঁধে ফেলে বেরিয়ে যেতে যাবে,ঠিক তখনই একজন অপরিচিত ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল।
"এই পার্সেলটা আপনার জন্য,"ছেলেটা বলল,যেন সে শুধুই একজন বার্তাবাহক।
ফিওনা অবাক হয়ে পার্সেলটা নিলো।
"কে দিয়েছে?"
ছেলেটা কেবল মাথা নেড়ে চলে গেলো,কোনো উত্তর না দিয়ে।
ফিওনা কৌতূহলী হয়ে পার্সেল খুলল।ভেতরে তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার—চাইনিজ ডাম্পলিং আর চাউমিন!
এক মুহূর্তের জন্য সে হতভম্ব হয়ে গেলো।
ভেনাসে এই খাবার কোথা থেকে এলো?
আর এই খাবার পাঠালোই বা কে?
কিন্তু তার ভাবনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেল ক্ষুধা।
না, এখন এসব চিন্তার সময় নয়!
সে খাবারের প্যাকেটটা শক্ত করে ধরে দ্রুত ক্যান্টিনের দিকে ছুটে গেলো,মুখে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসের হাসি।
তবে একটাই প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরছিল—যদি ভেনাসে এসব খাবার না থাকে,তাহলে কে জানলো যে এগুলো ওর সবচেয়ে প্রিয়?
ফিওনা ক্যান্টিনে ঢুকতেই লুকাসের মুখে প্রশস্ত হাসি দেখে তার মনে হলো— এটা নিশ্চয়ই লুকাসের কাজ!
সে এক মুহূর্তও দেরি না করে সরাসরি লুকাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।"অনেক অনেক ধন্যবাদ!এমন একটা সারপ্রাইজের জন্য!"
লুকাস কিছু বলতে যাবে,কিন্তু ফিওনা তাকে থামিয়ে বলল,
"তবে তুমি কিভাবে জানলে আমার পছন্দের খাবার এগুলো?আর...এগুলো কোথা থেকে পেলে?"
লুকাস এবার পুরোপুরি থ হয়ে গেলো।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো,ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ফিওনার দিকে।"সারপ্রাইজ? কী বলছো তুমি?"
ফিওনা এবার চমকে উঠল।
লুকাসের চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে,সে সত্যিই কিছু জানে না।
তাহলে কে পাঠালো এই খাবার?ফিওনা এক মুহূর্ত ভাবল।
এই ভার্সিটিতে আর কে থাকতে পারে?তার খুব বেশি পরিচিত কেউ নেই... হঠাৎ এথিরিয়নের কথা মনে পড়লো!কিন্তু সে কেনো পাঠাবে?তাদের মধ্যে তো সেরকম গভীর বন্ধুত্ব নেই!তাহলে?ফিওনা এবার সত্যিই বিভ্রান্ত হয়ে গেলো।
তার সামনে রাখা খাবারের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো—এর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কেউ আছে!
ফিওনা আর বেশি ভাবতে পারল না।তার খিদে পেয়ে গেছে, আর খাবারগুলো দেখতে এতটাই সুস্বাদু যে আর দেরি করা সম্ভব নয়।
সে চপস্টিক হাতে তুলে নিয়ে প্রথমেই ডাম্পলিং মুখে দিলো—নরম আর রসালো স্বাদটা মুহূর্তেই তার জিভে ছড়িয়ে পড়লো।
"উফ!অসাধারণ! একদম পারফেক্ট!"
লুকাস পাশে বসে ফিওনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলো।
সে হাসতে হাসতে বলল, "তুমি এতটা এক্সাইটেড কেন ফিওনা আজকে,এর আগেও তো ক্যান্টিনে অনেক খাবার খেয়েছো?"
ফিওনা মুখ ভরে চাউমিন তুলতে তুলতে বলল,
"হুম...কিন্তু এটা পৃথিবীর চাইনিজ খাবার!ভেনাসে তো এর স্বাদ কখনো পাইনি!"
তার কথায় লুকাসের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
"তাই নাকি?তাহলে আমাকেও একটা দাও দেখি!"
ফিওনা শুধু লুকাসকেই নয়,বরং তার আশপাশে থাকা কয়েকজন ক্লাসমেটকেও খাবার দিতে লাগলো।
ফিওনা হাসিমুখে সবাইকে খাবারের ভাগ দিলো। লুকাস, লেনোরা, আর আরও কয়েকজন ক্লাসমেট আশ্চর্য হয়ে স্বাদ নিতে লাগলো।
"দারুণ! পৃথিবীর মানুষ এত সুস্বাদু খাবার বানাতে পারে, এটা জানা ছিল না!" লেনোরা খুশিতে বললো।
"হ্যাঁ! বিশেষ করে এই ডাম্পলিং,ভেতরে এত রসালো আর মসৃণ স্বাদ! আমাদের ভেনাসের খাবারের চেয়ে একদম আলাদা!" আরেকজন যোগ করলো।
ফিওনা মুচকি হেসে বলল,"পৃথিবীর খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়,এর পিছনে অনেক ঐতিহ্যও আছে।
যেমন এই ডাম্পলিং,এটা বিশেষ উৎসবে তৈরি করা হয়, আর চাউমিন হলো একটা জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড!"
সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিলো।খাবারের স্বাদ আর নতুন সংস্কৃতির গল্প তাদের মন ভরিয়ে তুলেছিলো।
কিন্তু ফিওনার মনে তখনো একটা প্রশ্ন ঘুরছিলো—
এই খাবারগুলো কে পাঠালো?
ভেনাসে পৃথিবীর খাবার তো সহজে পাওয়ার কথা নয়...
.
.
.
ক্লাস শেষ করে ফিওনা ব্যাগ নিয়ে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। বাতাসে প্রশান্তি ছিল, কিন্তু তার মনের মধ্যে অস্থিরতা linger করছিল। মাঠের দিকে পৌঁছানোর আগেই, হঠাৎ করে তার সামনে কেউ একজন এসে দাঁড়াল। সে একটি বোতল এগিয়ে দিল, বোতলের মধ্যে তার প্রিয় ওয়াটারমেলন জুস ছিল।
ফিওনা প্রথমে বোতলটির দিকে তাকালো,তারপর উঁচু কণ্ঠে প্রশ্নটি শুনতে পেলো। "খাবার কেমন ছিলো? আপাতত তোমার এই জুসটা খাওয়ার প্রয়োজন,তাই না?"
ফিওনা বোতলটা হাতে নিলো,চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।সে ধীরে ধীরে মুখ তুলতেই দেখতে পেলো—জ্যাসপার!
তার ঠোঁটের কোণে হালকা রহস্যময় হাসি,চোখে চিরচেনা সেই অনুচ্চারিত দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা।
ফিওনা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি এখানে আজকেও?আর…আপনি সেই খাবার পাঠিয়েছেন?আপনি কিভাবে জানলেন ওগুলো আমার পছন্দের?আর আপনি এগুলো পেলেনই বা কোথায়?"
জ্যাসপার এক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থাকলো,
তারপর কোমল বিরক্তির সুরে বললো,"উফ,হামিংবার্ড! এত প্রশ্ন একসাথে কেউ করে?নিশ্চয়ই প্রশ্ন করতে করতে গলা শুকিয়ে গেছে।আগে জুসটা খাও।"
ফিওনা ঠোঁট কামড়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেও,ওয়াটারমেলন জুসের ঠান্ডা স্বাদ কল্পনা করতেই আর দেরি করলো না। বোতলের মুখ খুলে এক চুমুক দিতেই স্বস্তির একটা শ্বাস ফেললো।কিন্তু ঠিক তখনই জ্যাসপার হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বোতলটা ওর হাত থেকে নিয়ে নিলো।
ফিওনা হতভম্ব হয়ে দেখলো,কোনো সংকোচ ছাড়াই জ্যাসপার একই বোতল থেকে এক চুমুক নিয়ে ফেলেছে।
তার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেলো, "আপনি…!"
কিন্তু জ্যাসপার নির্বিকার ভঙ্গিতে বোতলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, "কি হলো?তোমার কি জুস কম পড়ে গেলো নাকি?"
ফিওনা বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো,গাল গরম হয়ে উঠছে কিনা সেটা জানার জন্য তাকানোর দরকার ছিল না।
কড়া রোদ মাথার ওপরে তেতে উঠেছে, গরম বাতাস গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফিওনা কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে হঠাৎ শুনলো জ্যাসপারের কণ্ঠ,
"রোদে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে তোমার শরীরের গ্লুকোজ কমে গেছে।তোমাকে এখন গ্লুকোজ খাওয়াতে হবে।"
ফিওনা ভ্রু কুঁচকে তাকালো, "মানে? এখনই কি গ্লুকোজের’র জুস খাওয়াবেন?"
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বললো,"না, অরিজিনাল গ্লুকোজ খাওয়াবো।চলো।"
ফিওনা আরও বেশি অবাক হলো,"কোথায়?"
কিন্তু উত্তর দেওয়ার বদলে জ্যাসপার ওর হাত ধরে এক টান দিলো,ফিওনা কিছু বোঝার আগেই ওকে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলো দোতলায়,একটা ফাঁকা ক্লাসরুমের দিকে।
ফাঁকা ক্লাসরুমে ঢুকতেই ফিওনা একধাপ পিছিয়ে গেলো, সন্দিহান দৃষ্টিতে জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে বললো, "আপনি আমাকে এখানে কেনো এনেছেন?"
জ্যাসপার দরজাটা ধীরে বন্ধ করে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো।এক মুহূর্ত চুপ থেকে,চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক নিয়ে বললো,
"পড়তে পড়তে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছো,আর অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলতেও নিশ্চয়ই খুব পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছো,তাই না?"
ফিওনা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।"মানে?"
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললো,"এই জন্যই তোমার শরীরে এখন গ্লুকোজের দরকার।"
ফিওনা কিছু বুঝতে পারছে না।কথাগুলো কী রসিকতা করে বলছে,নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অর্থ?তার মন বলছে,জ্যাসপার নিশ্চয়ই বিরক্ত—কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছে না,কারণ ওর চোখে সানগ্লাস।যদি চোখ দেখতে পেতো,তাহলে হয়তো বুঝতে পারতো কথাগুলো রাগে বলছে, নাকি…অন্য কোনো অনুভূতিতে!
জ্যাসপার ধীরে ধীরে ফিওনার দিকে এগিয়ে এলো, যেন সময় থমকে গেছে। ফিওনার হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে উঠলো, যখন সে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেলো।তার কাঁধে চাপ পড়লো,আর সে ভয় আর উত্তেজনার মিশ্রণে জিজ্ঞেস করলো,“আপনি কি করতে যাচ্ছেন?”ফিওনার কণ্ঠে একটি সংকীর্ণতা ছিল,।
জ্যাসপার তার চোখের গভীরতায় ডুব দিতে দিতে বললো, “গ্লুকোজ খাওয়াতে যাচ্ছি।” বলার সঙ্গে সঙ্গেই জ্যাসপার ফিওনার চোয়াল চেপে ধরে তার ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে দিলো।
ফিওনা প্রথমে নিজেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করলো,কিন্তু জ্যাসপারের স্পর্শে তার শরীর এক অজানা আকর্ষণে মোহিত হয়ে গেল।জ্যাসপারের ঠোঁটের স্পর্শে ফিওনার হৃদয় তোলপাড় করতে লাগলো।জীভে গ্লুকোজের স্বাদ পেয়ে ফিওনা যেন এক নতুন জগতে প্রবেশ করলো।ফিওনার ভিতরে এক অদ্ভুত উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়লো। সে যেনো এক মুহূর্তে সব কিছু ভুলে গেলো,কেবল জ্যাসপারের ঠোঁটের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লো।উন্মাদের মতো,সে জ্যাসপারের ঠোঁটজোড়াকে আরো গভীরভাবে চুম্বন করতে লাগলো,যেন মিষ্টি স্বাদের জন্য তাঁর অসীম তৃষ্ণা ছিল।তাঁর প্রতিটি শ্বাস যেন সেই মিষ্টির পরশে ভরে উঠছিলো।
ফিওনার নিঃশ্বাস দ্রুত চলছিল, হৃদস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠেছে। জ্যাসপার তার মুখটি শক্ত করে ধরে রেখেছিল, আর ফিওনা বাধ্য হচ্ছিল তার গভীর, দাবিদার চুম্বনের জবাব দিতে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে, প্রতিরোধের বদলে ফিওনা নিজেই জ্যাসপারকে আরও কাছে টেনে নিল, তার শার্টের কলার মুষ্টিবদ্ধ করে এমনভাবে চেপে ধরল যেন এটি জীবনের একমাত্র আশ্রয়।
জ্যাসপার অবাক হয়ে অনুভব করল ফিওনার প্রতিক্রিয়া। প্রথমে সে ভেবেছিল, ফিওনা নিশ্চয়ই পালানোর চেষ্টা করবে, তার চুম্বন প্রত্যাখ্যান করবে। তাই সে তার শরীরের গ্লুকোজ ব্যবহার করেছিল—একটি চালাকি, যাতে ফিওনা বাধ্য হয় প্রতিক্রিয়া জানাতে। কিন্তু সে যা প্রত্যাশা করেনি, তা হলো ফিওনার উন্মাদনার মতো সাড়া।
ফিওনার ঠোঁট নরম অথচ দাবিদার, যেন এতদিন ধরে লুকিয়ে রাখা তৃষ্ণা এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। তার নখ জ্যাসপারের ঘাড়ে গভীরভাবে বসে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসা নিঃশ্বাসে তার শরীর কাঁপছে।
জ্যাসপারের রক্ত গরম হয়ে উঠল। এই অনুভূতি তার জন্য নতুন নয়, তবু আজকের মুহূর্তটা অন্যরকম। সে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ শক্ত করে ধরে রেখেছে, কিন্তু ফিওনার আচরণে বুঝতে পারল, সে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।
ফিওনা তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জ্যাসপারকে আঁকড়ে ধরেছে, যেন তার অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু এখন এই পুরুষটি। তার জীভ স্পর্শ করল জ্যাসপারের, মধুর স্বাদে যেন নিজেই তলিয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য ফিওনার মনে হলো, সে যদি এই মুহূর্তে মরেও যায়, তাতেও কিছু যায় আসে না।
জ্যাসপারও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। তার আঙুল ফিওনার কোমরে চেপে বসলো, সে আরও গভীর করে ফিওনাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
হঠাৎ,বাস্তবতা তাকে আঘাত করল।জ্যাসপারের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল,কপালের শিরাগুলো টান টান হয়ে গেল।
না,এটা চলতে দেওয়া যাবে না!
এক ঝটকায় জ্যাসপার ফিওনাকে ঠেলে দিল না ঠিকই,তবে
তার আঙুল এখনো ফিওনার চোয়ালে স্থির,ফিওনা তখনো বিভোর,তার চোখ আধখোলা,নিঃশ্বাস দ্রুত চলছে।
“রিল্যাক্স হামিংবার্ড,”জ্যাসপার ফিসফিস করে বলল,
কণ্ঠে সামান্য কাঁপুনি।
ফিওনার দৃষ্টি তখনো ঝাপসা, তার ঠোঁট লাল হয়ে উঠেছে, নিঃশ্বাসে এক ধরনের অস্থিরতা। কিন্তু যখন সে একটু সরে এল, তখনই খেয়াল করল—
জ্যাসপারের ঠোঁটের কোণে রক্ত!
হঠাৎই তার সম্বিত ফিরে এলো।
সে দ্রুত নিজের ঠোঁট হাত দিয়ে চেপে ধরল, যেন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এটা সত্যি ঘটেনি। কিন্তু মিষ্টি স্বাদ এখনো তার জীভে লেগে আছে।
ফিওনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। এটা কি করলাম আমি?
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না, দ্রুত ঘুরে দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, মাথা ঝিমঝিম করছে।সে করিডোরের এক কোণে গিয়ে কাঁচের দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল,যেন এখনই পড়ে যাবে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।আমি… আমি ওই প্রিন্সকে চুম্বন করেছি!
ফিওনা ধীরে ধীরে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল,কিন্তু যতবার সে তা করছিল,ততবারই সেই মিষ্টি স্বাদ জিহ্বায় ছড়িয়ে পড়ছিল। যেন কোনো অদ্ভুত মধুর আস্বাদ,যা একবার পেলে আর ভুলে থাকা সম্ভব নয়।
তার নিঃশ্বাস তখনো ভারী,বুক ধকধক করছে।
এটা কীভাবে সম্ভব?সে কি ভুল দেখছে?নাকি সত্যিই জ্যাসপারের ঠোঁট থেকে কিছু বেরিয়ে এসেছিল?
ফিওনা নিজের ঠোঁট আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। না,কোনো চিনি বা মধু মাখানো নেই।তবু কেন সেই স্বাদ এখনো এত প্রকটভাবে লেগে আছে?
তার মস্তিষ্ক নানা সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করতে লাগল।
ড্রাগনরা কি… চুম্বনের সময় গ্লুকোজ ছাড়ে?
কিন্তু এটা তো কল্পনার মতো শোনায়!
তারপরই মনে পড়ল,জ্যাসপার প্রথমবার যখন বলেছিল, "গ্লুকোজ খাওয়াতে যাচ্ছি," তখন সে ভেবেছিল এটা নিছকই রসিকতা।কিন্তু এখন…না,এটা সাধারণ কিছু নয়।
ফিওনার জানা ছিল না,ভেনাসের অন্য কোনো ড্রাগনের মধ্যে এই ক্ষমতা আছে কি না।
কারণ এই বিশেষ ক্ষমতা শুধুমাত্র জ্যাসপারের।
তার শরীরের গভীরে এমন এক বৈশিষ্ট্য আছে,যা অন্য কারো নেই।জ্যাসপার চাইলে তার চুম্বনের মাধ্যমে শরীর থেকে একধরনের প্রাকৃতিক গ্লুকোজ নির্গত করতে পারে,যা মানুষকে এক মুহূর্তেই দুর্বল করে দেয়,একরকমের মিষ্টি নেশার মধ্যে ফেলে দেয়।
ফিওনা জানত না,তার ভেতরকার অস্থিরতা জ্যাসপারের ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি।সে শুধু অনুভব করছিল,তার ঠোঁট থেকে সেই স্বাদ মিলিয়ে যাচ্ছে না,বরং আরও গভীরে বসে যাচ্ছে।
আর সত্যিটা জানার আগেই সে হয়তো আবার সেই স্বাদ পেতে চাইবে…যা জ্যাসপার খুব ভালো করেই জানত।
জ্যাসপার ক্লাসরুমের নীরবতা ভেঙে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোল। বের হওয়ার আগেই, এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। নিজের ঠোঁটের কোনায় আঙুল চেপে ধরল, তারপর ধীরে ধীরে সামনে আনল।
রক্ত।
চোখের কোণে এক ঝলক শয়তানি হাসি খেলে গেল।
হাহ… অবশেষে।
এর আগে প্রতিবার সে-ই ফিওনাকে উন্মাদের মতো চুম্বনে ডুবিয়েছে, তার প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজ—
আজ প্রথমবার ফিওনা নিজেই তার দিকে ঝুঁকেছিল, নিজেই তাকে আকড়ে ধরেছিল, যেন কোনো অজানা তৃষ্ণায় পুড়ছে।
এই অনুভূতি… অদ্ভুত, নতুন।
সে ভেবেছিল, সাধারণ চুম্বনে ফিওনা বাধা দেবে, তাই গ্লুকোজ বের করেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই গ্লুকোজের মিষ্টি স্বাদ শুধু ফিওনাকেই দুর্বল করেনি—একভাবে তাকেও আক্রান্ত করেছে।
গ্লুকোজের প্রভাব শেষ হওয়ার পর কি ফিওনা আবার আগের মতো হয়ে যাবে?
নাকি এই অনুভূতি তার মাঝেও রয়ে যাবে?
জ্যাসপার দরজার ফাঁক দিয়ে শেষবারের মতো ক্লাসরুমের ভেতর তাকাল।
কাঠের ডেস্কগুলো এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, বাতাসে হালকা তার আর ফিওনার গায়ের সুবাস মিশে আছে।
সে মৃদু হাসল।
হুমিংবার্ড, তুমি নিজেও জানো না তুমি কী করেছ।
তারপর সে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল, যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মৃদু হাসিটা এখনো মিলিয়ে যায়নি।
জ্যাসপার আজ ভার্সিটি এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদ্দেশ্যে—লুকাসকে হুমকি দেওয়া,তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া যে সে যেন ফিওনার কাছ থেকে দূরে থাকে।
কিন্তু এখন?
সব ভুলে গেছে।
ফিওনার উন্মাদ প্রতিক্রিয়ার পর তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে।
সে স্পষ্টই মনে করতে পারছে ফিওনার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো,তার ক্ষু*ধার্ত চাহনি,সেই নরম ঠোঁটের আগ্রাসন…
জ্যাসপার এক ঝলক আকাশের দিকে তাকাল, তারপর ধীর পায়ে করিডোর ধরে হাঁটা দিল, তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে থাকল পিছনে—অন্ধকারের মতো, যা আস্তে আস্তে ফিওনাকে গ্রাস করতে চলেছে।
(চলবে….........)