#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
১৩.
রাতের অন্ধকার কেটে ঝলমলে আলোয় আলোকিত হয়েছে ভুবন। বিলাসবহুল ভবনের দুতলার এক কক্ষে জড়োসড়ো হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে ইরা। তার পাশেই বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে বসে আছে ইলহাম, কখনো চোখ দুটো বন্ধ করে ঘুমে ঢুলছে কখনো আবার সচেতন চোখে চেয়ে প্রেয়সীকে পর্যবেক্ষন করছে। জ্বরের তীব্রতায় সারা রাত কাতরেছে ইরা, রাত জেগে তার সেবা করেছে ইলহাম। ঠান্ডা পানিতে ভেজা কাপড় ছুঁয়ে দিয়েছে তার কপালে, সে যখন জ্বরের তীব্রতায় থরথর করে কাঁপছিল পরপর দুটো কম্বল টেনে ঢেকে দিয়েছে তাকে। গরম গরম স্যুপ রান্না করে খাইয়েছে, তার গলা যখন বার বার শুকিয়ে আসছিলো তখন গরম জল খাইয়েছে। ভোরের দিকে যখন তার জ্বরের তীব্রতা কিছুটা কমে এলো তখন সস্থির নিশ্বাস ফেলল সে। ইরা ঘুমিয়েছে দেখে তার ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলো বিছানার মাথায়। তবুও এক চোখে ঘুম আর এক চোখে প্রেয়সীর টান নিয়ে জেগে আছে। জ্বরের ঘোরে সারারাত বিরবির করেছে ইরা। তার মুখের কাছে কান পেতে ঘোর প্রলাপ শুনেছে ইলহাম। বার বার মাকে ডেকেছে সে, মায়ের কাছে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। মা কে অভিযোগ করেছে 'আমাকে কেউ ভালোবাসে না মা'। তখন অসহায় চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তার। সে কি করে বুঝাবে তাকে? তার ভালোবাসার মায়াজালে সে জড়িয়েছে বহু আগে। এক অপরূপ ভালোবাসা রেখেছে তার জন্য যে ভালোবাসা তার আগে কারো হয়নি। যে ভালোবাসার স্পর্শ তার আগে কাউকে ছুঁয়ে দেয়নি। কবে বুঝবে সে?
সূর্যের কিরন যখন ছড়িয়ে পড়লো আকাশ জুড়ে। তার মৃদু স্পর্শ জানালার ফাঁক গলে এসে ছুঁয়ে দিলো ইরাকে। নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো সে, চারপাশে তাকিয়ে নিজের অবস্থান পরখ করলো। ইলহামকে তার শিয়রে বসা দেখে কিছুটা থমকালো সে, দু হাতে মাথা চেপে উঠে বসলো। অনেক ভাড়ী ভাড়ী লাগছে মাথা, চোখ মুখ কুঁচকে আসলো তার। ঘাড় বাকিয়ে তাকালো ইলহামের পানে, সে এখন গভীর ঘুমে। তাকে এভাবে বসে ঘুমাতে দেখে কিছুটা খারাপ লাগলো ইরার। জ্বরের ঘোরে পড়ে থাকলেও যখন ভেতরে ভেতরে কিছুটা হুশ ছিল তখন দেখেছে ইলহাম তাকে খাইয়ে দিচ্ছে, জলপট্টি দিচ্ছে বার বার জিজ্ঞাসা করছে বেশি কষ্ট হচ্ছে মুনলাইট? হাতে ব্যাথা করছে? ডাক্তার ডাকবো? কথা টা মনে পড়তেই আনমনে হাসল ইরা। লোকটা কি তার চিন্তায় ভুলে গিয়েছিল যে সে নিজেই ডাক্তার! নাকি সে ভেবেছিলো তার চিকিৎসা ওর জন্য যথেষ্ট নয়? ঘাড় নাড়িয়ে শরীর টেনে উঠে দাড়ালো সে, শরীরের ভাজে ভাজে ব্যাথার তীব্রতা অনুভব করলো। কেমন মেজ মেজ করছে, বুঝতে পারলো জ্বরের প্রভাবে এমন হয়েছে। ফের তাকালো ইলহামের পানে, মায়া লাগলো ছেলেটার জন্য। সারা রাত তার সেবা করে এখন এভাবে বসে ঝিমুচ্ছে নিজের কাছে খারাপ লাগলো তার। ইতস্তত করে মৃদু কন্ঠে ডাক দিলো তাকে
"শুনছেন? ডাক্তার সাহেব?
ধড়ফড় করে জেগে উঠলো ইলহাম, ব্যস্ত হলো ইরাকে দেখে
"তুমি উঠেছো কেন মুনলাইট? কি লাগবে আমাকে বলো।"
ফুস করে নিশ্বাস ফেলল ইরা, নরম কন্ঠে জবাব দিলো তাকে
"শান্ত হোন, আমি ঠিক আছি। আপনি রুমে গিয়ে ঘুমান"
"হাতটা একটু দেখি! ব্যাথা করছে?
"কোনো প্রয়োজন নেই, আমি ঠিক আছি"
কাট কাট জবাব দিলো ইরা,তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে অগ্রসর হলো সে। ইলহাম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। মিনিট কয়েক পর ইরা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো ইলহাম দাঁড়িয়ে আছে। ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালো সে
"কি হলো আপনি এখনো যান নি কেন?"
সে ছুটে গেলো ইরার কাছে, তড়িঘড়ি করে কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা পরখ করলো। পূর্বের তুলনায় অনেক কম তবে এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। সে চিন্তিত কন্ঠে সুধালো
"এখনো তো রয়ে গেছে ডাক্তার দেখালে ভালো হয়না?"
বিরক্ত হলো ইরা, এবার মনে হচ্ছে এই লোকটা একটু বেশি বেশি করছে। ধমকে উঠলো তাকে
"দেখুন মিস্টার, কারো সিমপ্যাথি আমার সহ্য হয়না। তবুও বলছি, অসুস্থ আমিটার সেবা করেছেন তাই ধন্যবাদ আপনাকে এবার আসতে পারেন প্লিজ।"
"আচ্ছা ঠিক আছে চলে যাবো, কিন্তু একটা রিকুয়েষ্ট প্লিজ, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আজ কোথাও যেও না।"
"হুম"
ছোট করে উত্তর দিলো ইরা, ইলহাম খুশি হলো তার কথা রাখাতে। কিন্তু ইলহাম তো জানে না, আজ ইরার তেমন কোনো কাজ নেই তাই বের হবে না নয়তো কাজ থাকলে তাকে ধরে বেধে আটকে রাখা ক্ষমতা ইলহামের ছিলো না। আর কথা না বাড়িয়ে দরজার দিকে অগ্রসর হলো ইলহাম। পেছন থেকে ডেকে উঠলো ইরা
"শুনুন"
"হুম বলো"
"আমার একটা প্রাইভেট রুম লাগবে, আর্জেন্ট আজকের মধ্যে গুছিয়ে নিতে পারলে ভালো হয়"
ইরার কথা বোধগম্য হলো না তার, প্রাইভেট রুম কেন লাগবে? সে তো একা থাকছে এক রুমে এটা কি তার প্রাইভেট রুম না?
"প্রাইভেট রুম লাগবে মানে? তুমি তো পারসোনাল রুম নিয়েই আছো"
"হুম, আরেকটা রুম লাগবে আমার প্রাইভেট কাজের জন্য"
"প্রাইভেট কাজ?"
"এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই, আপনি কি আমাকে রুম দিতে পারবেন নাকি না?"
"কিন্তু এই ফ্লাটে তো আর ফাঁকা রুম নেই।"
"মিরা তো সব সময় এখানে থাকবে না, ওর রুম দিয়ে দিন। ও যখন আসবে তখন আমার কাছে থাকতে পারবে কোনো সমস্যা নেই"
ভাবুক হলো ইলহাম, ইরার প্রাইভেট রুম লাগবে ঠিক আছে কিন্তু মিরার সাথে যদি রুম শেয়ার করে তাহলে সে তো ইরার কাছে আসতে পারবে না। কিছুটা ভেবে উত্তর দিলো সে
"মিরার থাকা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না ও ইনায়ার কাছে থাকতে পারবে। তুমি অনেক রাত অব্দি জেগে থাকো আবার কখনো অনেক রাত করে বাড়ি ফিরো মিরার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তার চেয়ে ভালো ও ইনায়ার কাছে থাকুক"
ইলহামের কথা ভুল নয়, এই দিক ভেবে দেখলে মিরার সমস্যা হবে এটা স্বাভাবিক। তার কথায় সহমত পোষণ করলো ইরা
"তাহলে আমি মিরাকে বলে দিবো ইনায়ার রুমে যেতে। আপনি ইনায়াকে বলে দিবেন"
"হুম"
নিজের কক্ষে ফিরে ঘড়িতে সময় দেখলো ইলহাম। আটটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট,রাত জেগে বউয়ের সেবা করেছে তাতে হসপিটাল কর্তৃপক্ষের কিছু যায় আসেনা। সময় মতো তাকে সেখানে উপস্থিত থাকতেই হবে। এখন ঘুমানোর সময় নেই, এক ঘন্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে হসপিটালে পৌছাতে হবে। ফ্রেশ হয়ে নিলে শরীর মন দুটোই ফ্রেশ হবে তাই না ঘুমিয়ে শাওয়ার নিতে চলে গেলো । প্রায় আধঘন্টা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে একেবারে ডাইনিংয়ে গেলো সে। ততক্ষনে আয়ুশ আর ইরহাম সেখানে উপস্থিত হয়েছে। আশে পাশে তাকিয়ে ইরাকে খুজলো ইলহাম, কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না। সার্ভেন্টকে বলল তাকে ডেকে দিতে। বোনের খুঁজে ভাইকে জিজ্ঞাসা করলো
"ইনু উঠেনি?"
"উঠেছে, বাদর টা এখানে কতক্ষন লাফিয়ে আবার রুমে গেছে। আমি ডেকে এসেছি, চলে আসবে এক্ষুনি"
হাসল তিনজন। দূর থেকে ভেসে হলো আরেক মেয়েলী হাসি আওয়াজ। মিরা হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল
"বিয়াই আপনি যে বিয়াইনকে বাদর বলেছেন এটা যদি আমি তার কানে দেই তবে কেমন হবে?"
"খুব খারাপ হবে বিয়াইন, মানুষের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়া খুব খারাপ কাজ"
মুখ বাকালো মিরা, চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল
"আপনি যে মানুষকে এসব বলেন তার বেলায় কিছু না।"
"কি নিয়ে কথা হচ্ছে?"
ইনায়া ছুটে এসে প্রশ্ন করলো তাদের। চোখে চোখে কথা বলল তিনজন। ইলহাম হেসে বলল
"তোকে নিয়েই কথা হচ্ছে বুচি তুই আসতে দেরি করছিস তাই খুজছিলাম তোকে"
আয়ুশের পাশে খালি চেয়ার টেনে বসল ইনায়া। হেসে বলল
"আমি জানতাম আর কেউ না খোঁজুক আমার ভাইয়া আমাকে খুঁজবে"
আড়চোখে তাকালো আয়ুশের পানে, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলো আয়ুশ। তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল
"হাহ্ আসছে ভাইয়ের বোন"
ফুসে উঠলো ইনায়া, কাটা চামচ হাতে তুলে তাক করলো আয়ুশের দিকে। নাক ফুলিয়ে বলল
"তোমাকে আমি কিছু বলেছি? পাষাণ লোক। আমার ভাইয়া বেস্ট তোমার মতো না"
"হাহ্"
আয়ুশকে এমন উপহাস করতে দেখে পুনরায় চেতে উঠলো ইনায়া। হাসল সকলে, বোন কিছু বলতে না দিয়ে হাত ধরে টেনে বসালো ইলহাম। তাকে শান্ত করতে বলল
"ছাড় তো বনু, ওর কথায় কান দিস না। তোকে আদর করি দেখে ওর লাগে বুঝিস তো"
সে চোখ টিপ দিলো আয়ুশকে। ঠোঁট টিপে হাসল আয়ুশ। তাকে মুখ বাকালো ইনায়া, বিরবির করে বলল
"হিংসুটে লোক"
ভাইবোনের এমন ভালোবাসা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিরা। হা হুতাশ করে বলল
"আজ একটা ভাই নেই বলে"
হাসল ইলহাম, তাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল
"আমি কি তোমার ভাই না?"
মন খারাপের ভান করে গাল ফুলিয়ে বলল মিরা
"তাইতো শুধু বোনকে আদর করছেন"
ইলহাম হেসে তার মাথায় হাত রেখে চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। টেনে টেনে বলল
"ওরে হিংসুটে, আসো তোমাদের দুজনকে খাইয়ে দিই"
আয়ুশ হেসে ইনায়ার পানে ঠেরা চোখে তাকিয়ে মিরাকে বলল
"বিয়াইন আমি কিন্তু তোমার আরেক ভাই, আসো আমি তোমাকে খাইয়ে দিই"
তীর্যক চোখে তাকালো ইনায়া, চোখ দুটো জ্বলে উঠলো তার। তাকে কোনো রিয়াক্ট করার সুযোগ দিলো না মিরা। সে হেসে বলল
"আপনার হাতে অন্যদিন খাবো বিয়াই আজ ভাইয়ার হাতে খাই"
ইরহাম হেসে বলল
"আমার হাতে খাবে বিয়াইন?"
মুখ বাকালো মিরা, তাকে ভেঙছি কেটে বলল
"জীবনেও না"
শব্দ করে হেসে উঠলো সবাই, ইরহাম ঠোঁট কামড়ে হাসল। বিয়াইন প্রত্যাখ্যান করেছে তাতে সমস্যা নেই কিন্তু এমন করে ভেঙচি কাটলো কেন? সে তো আবার তার চঞ্চলতার প্রেমে পড়ে গেলো।
ইলহাম খাইয়ে দিচ্ছে দুজনকে, গাল ফুলিয়ে চুপচাপ খাচ্ছে ইনায়া। মিরা খাচ্ছে আর এটা ওটা বলছে ইরা এসে দেখলো এই দৃশ্য। বোনের পানে তাকিয়ে তাকে এতো প্রফুল্ল দেখে খুব ভালো লাগলো তার। এই দুদিনে এটা বুঝেছো ইলহাম আর যাই হোক ভাই হিসেবে বেস্ট।
সবাই খাওয়াতে মনযোগী। ইনায়া আর মিরাকে খাইয়ে দিয়ে ইলহাম সবে খেতে শুরু করেছে। তৎক্ষনাত বেজে উঠলো কলিংবেল। একে অপরের মুখপানে তাকালো সবাই, এই সকাল বেলা কে আসলো? সার্ভেন্টকে ডেকে বলল ইলহাম
"দেখেন তো খালা কে এসেছে"
আঁচলে হাত মুছে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন রিতা খালা। তিনি দরজা খুলতে উদ্দোত্ত হলে। বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল আয়ুশ
"কতবার বলেছি খালা, দরজা খোলার আগে দেখবেন কে এসেছে"
বোকা হেসে উত্তর দিলেন তিনি
"হেহে, মনে থাকে না স্যার, এক্ষুনি দেখছি"
পিপহোলে চোখ রাখতেই আতকে উঠলেন তিনি। পেছনে অপেক্ষমান সকলের দিকে তাকিয়ে চেচিয়ে উঠলেন
"ও স্যার পুলিশ আসছে গো"
#চলবে