#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
৩১.
পড়ন্ত বিকেল। আকাশের রঙ তখন ধীরে ধীরে মলিন সোনালি থেকে গাঢ় ধূসরতার দিকে ঝুঁকছে। বাতাসে দিনের ক্লান্তি মিশে আছে, কিন্তু ক্লান্তি নেই বিজয়ী জনসমাজের মুখে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সীমাহীন উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে চারপাশ স্লোগান আর মানুষের ভিড়ের গুঞ্জন। বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে ইরা আহসান, জেলা সভানেত্রীর পদোন্নতি হয়েছে তার। সে এখন গাজীপুর -২ আসনের সংসদ সদস্য। ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর কলেজের মাঠে বিশাল জন সমাগমে কথা বলেছে ইরা, সাধারণ জনগনের কাছে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। তাদের দিয়েছে মনোরম প্রতিশ্রুতি মানুষগুলোর ইচ্ছে পূরণে তার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবে।
বিজয় মিছিলের পর দলীয় অফিসে অবস্থান করছে সে, ছোট বড় অনেকেই আসছে দেখা করতে। সংবর্ধনা দিচ্ছে, নামি দামি ব্যাক্তিবর্গ গন আসলে চা, কফি পান করিয়ে দিচ্ছে। কিছু ছেলে মেয়েরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার আশে পাশে। মিলি, ইসরাত, আকিব তার পাশেই বসা, তাদের থেকে কিছুটা দূরে কয়েকটি ছেলে ও মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওরা তার দলের কর্মি নয় তবে তার ভীষণ ভক্ত, বিজয় উল্লাস করতে এসেছিলো। তাদের জন্য নাস্তা পানির ব্যাবস্থা করেছে ইরা, মাথা একটু ভাড়ী ভাড়ী লাগছে তাই কড়া লিকারের এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে নিরবে বসে আছে সে। মাঝে মধ্যে দু আঙুলে কপাল ঘষছে। তার সামনে এলাকার চেয়ারম্যান রমিজ সাহেব বসা, ভদ্রলোক তার বিজয় উল্লাসে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন, এসেছেন থেকে ননস্টপ কথা বলেই যাচ্ছেন। তার পাশে তার একজন এসিস্ট্যান্ট। কথার ফাঁকে ফাঁকে সুড়ুৎ করে চুমুক দিচ্ছে চায়ের কাপে, ইরার ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। একেতো এতো দখল গেলো সারাদিন, আর এখন এই লোকটা কিনা অযথাই এতো কথা বলছে আর চা তো খাচ্ছে না মনে হচ্ছে হাতির শুড় লাগিয়ে পুরো নীলনদ গিলে নিচ্ছে
“বলছি দাদু চা পান করা হলো আপনার? শুধু চা তো পান করছেন না দেখে মনে হচ্ছে পুরো বঙ্গোপসাগর চুষে নিচ্ছেন। আপনার চা পান করার চাপে পড়ে বউটার তো আমার মাথা ধরে গেলো”
আকস্মিক পুরুষালি কন্ঠ পেয়ে অফিস কক্ষে অবস্থানরত সকলে তাকালো দরজার দিকে, টকটকে লাল গোলাপের বড় এক তোরা হাতে নিয়ে হেটে আসছে ইলহাম। দৃষ্টি তার ইরাতে নিবদ্ধ, মাঝে আবার আড়চোখে তাকাচ্ছে সামনে বসা রমিজ সাহেবের দিকে। তিনি অপ্রস্তুত হলেন, হাটুর বয়সী এক ছেলে কিনা তাকে চা খাওয়া নিয়ে মশকরা করছে? গলা খাকারি দিয়ে কিঞ্চিৎ হুংকার দিলেন তিনি
“এই ছেলে তুমি জানো কার সাথে কথা বলছো? বে*য়া*দব ছেলে”
“সে আপনি যেই হোন দাদু, আপনার জন্য আমার বউয়ের সমস্যা হলে আমি কিন্তু আপনাকে ছেড়ে কথা বলবো না। দেখছেন না আপনার অতিরিক্ত সুড়ুৎ সুড়ুৎ আর বকর বকরের চাপে পড়ে আমার বউটার মাথা ধরে গেলো”
লোকটার কথার পাছে ত্যাড়া জবাব দিয়ে ইরার মাথায় হাত রেখে আহ্লাদী স্বরে সুধালো
“মাথা কি বেশি ধরেছে বউ? হেটে যেতে পারবে নাকি কোলে নিবো?”
দাত কিড়মিড় করে তাকিয়ে আছে ইরা, যেনো এক্ষুনি পারলে খেয়ে ফেলবে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে মেয়ে গুলো ঠোঁট টিপে হাসছে। নাক মুখ কুচকে বসে আছেন রমিজ সাহেব, ছেলেটা বড্ড বেশি'ই বেশরম। খানিক উঁচু স্বরে বলে উঠলেন তিনি
“অ*স*ভ্য ছেলে”
“এটা আমাকে বউ প্রতিদিন নিয়ম করে সাত বেলা বলে দাদু, আপনি অন্য কিছু বলুন”
মুহুর্তের মধ্যেই হাসির কলরবে ভরে উঠেছে কক্ষ, ছেলে মেয়ে গুলো এ পর্যায়ে এসে আর নিজেদের সামলে রাখতে পারেনি। ইলহাম গর্বের সহিত বুক ফুলিয়ে তাকালো সবার দিকে, ঠোঁটে ঝুলছে বিস্তর হাসি যেনো কত নামের কাজ করলো সে।
রমিজ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, ইরা দাতে দাত পিষে হিসহিসিয়ে উঠল
“অ*স*ভ্য লোক আপনি যাবেন এখান থেকে?”
“দেখলেন দাদু, এইযে লাইভ প্রমাণ পেয়ে গেলেন তো! বউটা আমার বড্ড আদুরে গো, আমাকে আদর করে সব সময় এই নামে ডাকবে”
রমিজ সাহেব মুখ ঝামটা দিয়ে গটগট শব্দ তুলে চলে গেলেন সেখান থেকে, ছেলেটার প্রতি বেজায় বিরক্ত তিনি। এমন বে*য়া*দব ছেলে বাপের জন্মে দেখেননি। পাছে এমপি সাহেবার স্বামী নয়তো গালে কটা লাগিয়ে সিধে করে দিতেন।
“আপনি কেন এসেছেন এখানে?”
রাগে ফেটে পড়ছে ইরা, রাগের চেয়ে তার অস্বস্তিটাই বেশি হচ্ছে। অস্বস্তি আড়াল করতে রাগটাকেই প্রাধান্য দিলো, শত হোক সে কাটখোট্টা স্বভাবের তাই বলে বাবার বয়সী একটা লোকের সামনে এমন লাগামছাড়া কথা শুনবে? ছোট ছোট ভাই বোন রয়েছে এখানে, সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে। অস্বস্তি আর রাগের মিশেলে রাগ দেখিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে কথা বললেও কেন যেনো প্রকৃত রাগ দেখাতে পারেনি ইরা, প্রকৃতপক্ষে সে অতিরিক্ত রেগে গেলে কখনোই আপনি করে বলে না কিন্তু এই রাগান্বিত সময়েও এখন ইলহামের কথা ভেবেছে সে, এখন যদি তাকে ছোট করে কথা বলতো তাহলে এতোগুলো জুনিয়দের সামনে ইলহামকে অপমান করা হতো যা ইরা না চাইতেও করতে পারেনি। নিজের কাজে নিজে'ই অবাক, এই মানুষটাকে নিয়ে কবে থেকে এতো ভাবে সে?
“কংগ্রাচুলেশনস ওয়াইফি, আরো আগে'ই আসা উচিত ছিলো কাজে আটকে গিয়েছিলাম তাই আসতে পারিনি।”
সেই তরতাজা ফুলের তোরাটি ইরার দিকে বাড়িয়ে রেখেছে ইলহাম, ঠোঁটে ঝুলছে চমৎকার হাসি। ইরার রাগটুকু যেনো কোথায় উবে গিয়েছে, মুহুর্তের ব্যাবধানে হৃদয়জুড়ে কোথাও ভালো লাগার শীতল বাতাস ছুঁয়ে গেলো। বিমোহিত নয়নে তাকালো তার চোখের দিকে যেই চোখ তার পানেই নিবদ্ধ। কয়েক মুহুর্ত কেটে গেলে হুশ ফিরলো ঘরময় জোরালো করতালির শব্দে, সবাই হেসে হেসে হাত তালি দিচ্ছে সাথে কেমন অদ্ভুত শব্দে চেচিয়ে উঠলো, যেনো মজার কিছু তাদের সামনে প্রদর্শন করা হয়েছে। ইলহাম চোখ টিপ দিলো, অপ্রস্তুত ইরা চোখ ফিরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো কি মনে করে আবার হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নিয়ে নিলো।
তাজা টকটকে গোলাপগুলো থেকে মন মাতানো সুগন্ধি ভেসে আসছে। চোখ বন্ধ করে লম্বা নিশ্বাস টানলো ইরা, তবে ফুলগুলো স্বাভাবিক ভাবে হাতেই পড়ে আছে। হয়তো নাকের কাছে ধরে সুঘ্রাণটুকু অনুভব করার দ্বিধা কাজ করছে। ফুলের প্রতি ঝোঁক তার কোনো কালেই ছিল না, ফুল প্রেমিরা তো কোমল হৃদয়ের অধিকারী হয় কিন্তু তার মনটা তো পাথরের। ঘটা করে কখনো ফুল ছুঁয়ে দেখা বা ঘ্রাণ শুকার অভিজ্ঞতা নেই। তবে আজ এই ফুলগুলো খুব টানছে তাকে, এর কারন ফুলটি কোনো বিশেষ মানুষের দেওয়া নাকি কোনো বিশেষ উপলক্ষে দেওয়া?
“বলেছিলাম অপেক্ষা করবো, কিন্তু হিসেব করে দেখলাম অপেক্ষায় থাকলে রাত পেরিয়ে ভোর হবে কিন্তু বউয়ের দেখা আর পাবো না।”
ইলহামের কথায় মৃদু হাসির রেখা ফুটলো ইরার ঠোঁটে তবে সেটি কারো দৃষ্টিগোছর হওয়ার আগেই মিলিয়ে গেলো। ঠোঁট কামড়ে হাসিটুকু সংযত করে সকন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল
“আমার কাজ শেষ হলেই ফিরতাম”
“হ্যাঁ সেটা তো জানি, তবে সেই কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে আমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতাম”
গালের ভেতর জ্বিভ ঠেলে হাসল ইরা, তবে কোনো প্রতিত্তোর করলো না। ইলহাম ফুস করে নিশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলে উঠল
“তোমার ভাবনা চিন্তা জুড়ে তো শুধু জনগণের বসবাস আমি তো শা*লা বানের জলে ভেসে এসেছিলাম”
“এতোদিনে একটি ভালো কথা বললেন আপনি, একদম ঠিক ধরেছেন। আমার জীবনে আপনার অবস্থান বানের জলে ভেসে আসা কচুরিপানার মতোই”
অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে রইলো ইলহাম, সে তো মজা করে বলেছিলো তবে এটা যে ইরা হেসে হেসে এতো নির্মম সত্য বলে ঘোষণা করবে তা হয়তো ভাবনাতে ছিল না।
ইরা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো, তখন কি মনে করে একবার চারপাশে চোখ বুলালো। মেয়ে গুলো সব কেমন করে তাকিয়ে আছে ইলহামের দিকে, ওদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও তাকালো। উজ্জ্বল গায়ের রঙে ইন করা কালো শার্ট দেহের সাথে মিশে আছে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভর্তি মুখশ্রীতে গোলাপ রাঙা ঠোঁট দুটোই আগে চোখে পড়ে। তারপর সরু নাক, কপাল ছুঁই ছুঁই চুল। এক দেখাতে যে কোনো মেয়ের নজড় কাড়তে বাধ্য। কোথায় যেনো চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলো, তার স্বামীকে এতোগুলো মেয়ে এভাবে দেখবে কেন? চোখ ঘুরিয়ে পুনরায় মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু ধমকের সুরে বলল
“কাজ শেষ, এবার আসতে পারো তোমরা”
ছেলে মেয়েগুলো বেরিয়ে যেতে লাগলো, যেতে যেতে আবার হাতে গুনা কয়েকটা মেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে তার পাশে দাঁড়ানো ইলহামের দিকে। জ্বলে উঠলো ইরা, নাকের পাটা ফুলিয়ে কর্কশ কন্ঠে বলল
“সমস্যা কি? এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
গা দুলিয়ে হেসে উঠলো ইলহাম, ইরার চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। ইলহামের হাসির বেগ বাড়লো, সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ইরা তাকে নিয়ে জেলাস। মেয়েগুলোর দিকে তাকানো জ্বলন্ত দৃষ্টি তার প্রমান। সে হাসতে হাসতে বলল
“কচুরিপানার জন্য এই অবস্থা মুনলাইট? যদি স্যালমন ফিস ভেসে আসতো তাহলে কি করতে?”
রেগে গেলো ইরা, তাকে নিয়ে হাসাহাসি বিষয়টি হজম করতে পারলো না। কিছু বলতে যেয়েও কি মনে করে থেমে গেলো। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করবে? এটা একজন সংসদ সদস্যকে মানায় না। হাতে থাকা ফুলের গুচ্ছ ঝাকি দিয়ে টেবিলে ফেলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো সে। ভেবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ইলহাম, যখন বুঝতে পারলো ইরা চলে যাচ্ছে তখন ফুলের তোরাটি মুষ্ঠিবন্ধ করে বড় বড় পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে।
ইরা এগিয়ে গেছে অনেকটা, ইলহাম তার থেকে কিছুটা দূরত্বে তবে ইরার থেকে তার গতিবেগ বেশি যার ধরুন কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে সে ইরাকে অতিক্রম করলো। ইরা গাড়ি কাছে দাঁড়িয়েছে, গাড়িতে উঠতে যাবে তখন তার হাত টেনে ধরলো ইলহাম। গাড়ির থেকে কিছুটা দূরত্বে কালো রঙের বাইকটি চোখে ইশারা করে বলল
“আমার সাথে এসো”
ইরা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলো তাকে, নিজের হাত ছাড়িয়ে পুনরায় হাত রাখলো গাড়ির দরজায়। এ পর্যায়ে রেগে গেলো ইলহাম, মেয়েটা কি মনে করে তাকে? কিছু বলে না তাই যখন যা খুশি করবে? শক্ত হাতে তার পেলব হাত খানি চেপে ঝড়ের গতিতে টেনে নিলো তাকে, দাতে দাত পিষে হিসহিসিয়ে বলল
“তুমি আমার সাথে যাবে মানে যাবে ইটস ফাইনাল। কাম”
“আমি যাবো ন…”
“ইরাহ”
আকস্মিক এক চিৎকারের সাথে ঝাকি দিয়ে উঠলো ইলহাম, অন্ধকারে তীক্ষ্ণ আলোর ছটার সাথে কিছু ছুটে আসতে দেখে ইরাকে বুকের সাথে পেছিয়ে ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে সে। বুলেটের আঘাতে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝড়ছে, তাজা গোলাপের লাল বুকেটি অদূরে পড়ে আছে মাটিতে। বিস্ময়বিমূঢ় ইরা আহত ইলহামের বাহুবন্ধনে থেকে ডেব ডেব করে তাকিয়ে আছে। মস্তিষ্ক যখন ধরতে পারলো ঘটমান প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের তান্ডব তখন তাকে আঁকড়ে ধরা ইলহামের হাত ধীরে ধীরে শীতিল হয়ে আসলো। আতংকিত ইরা তখন গগন কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো
“ইলহাম”
#চলবে