ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছায়াবৃত রোদ্দুর

৩৪তম পর্ব

লেখক: আয়রা ইবনাত

#ছায়াবৃত_রোদ্দুর

#আয়রা_ইবনাত

৩৪.

সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুক জুড়ে যেন ক্লান্ত দিনের কাঁধে কেউ আলতো করে গাঢ় নীল এক চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যেতে যেতে উঁচু দালানগুলোর কাঁচে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠছে আগুনরঙা আভা। ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখনও মানুষের পদচারণা আর যানবাহনের শব্দে মুখর, তবু সেই কোলাহলের মাঝেও সন্ধ্যার এক অদ্ভুত কোমলতা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

রাস্তাজুড়ে একে একে জ্বলে উঠছে হলদে আলোর বাহার। সেই আধো আলোয় কয়েক গাড়িকে পেছনে ফেলে শিববাড়ির ছয় নং বাড়ির গেটে সেই চারতলা ভবনের সামনে থামলো এক শুভ্র রঙের কার। ইরহাম গাড়ি থেকে নেমে দরজা খোলে পাশে দাড়ালে বেরিয়ে আসলো ইরা, হাত বাড়িয়ে আগলে নিলো ইলহামের এক বাহু। স্ত্রীর সহযোগিতায় ধীরে ধীরে নামলো ইলহাম। যদিও সে একাজ নিজেই করতে পারতো কিন্তু বউয়ের যত্নটুকু তো মিস করে যেতো। খানিকটা হেয়ালিপনাতে যদি প্রিয় মানুষটার একটু স্পর্শ, একটু যত্ন আর একটু বেকুল অনুভূতি পায় তাতে মন্দ কি!

আজ চারদিন পর বাসায় ফিরেছে সে, তবুও বউয়ের সাথে সে কি যুদ্ধ করে আজ ফিরলো।

সে তো এখন যবরদস্ত চাঙ্গা আছে, চাইলে বউকে নিয়ে কয়েক রাউন্ড রেসলিং খেলে নিতে পারবে অথচ তার এই সক্ষমতা বেয়াদব বউটা বুঝতেই চায়না। তাকে এমন ভাবে বিছানায় শুইয়ে রাখবে মনে হয় সে নাদান শিশু, এইটুকু ব্যাথাতে একদম মিইয়ে আছে। এই যে, তার ব্যাথা বুকে হাটবে তো পা দিয়ে কিন্তুও তাতেও তার বউটা ভাবছে তার হাটার ক্ষমতা নেই। না হলে কি এভাবে মুমূর্ষু ব্যাক্তিদের মতো ধরে ধরে নিয়ে যায়? কিছুটা বিরক্তি আর কিছুটা দুষ্টুমি থেকে ইরাকে জ্বালানোর জন্য কি মনে করে বলে উঠল ইলহাম

“এই বউ আরেকটু ভালো করে ধরো না! পড়ে যাবো তো। কাছে আসো, এইযে এইভাবে ধরো।”

তার হাতের উপর ইরার আঁকড়ে ধরা হাত ছাড়িয়ে তাকে কাছে টানলো ইলহাম। তার হাত নিয়ে নিজের কোমড়ে পেছিয়ে দিয়ে নিজেও কোমড় চেপে ধরলো ইরার। দাত বের করে চমৎকার হেসে নিজেই প্রশংসা করলো

“এইতো এবার ঠিক আছে”

বিরক্তিতে ‘'চ’’ সূচক শব্দ করলো ইরা। শতই হোক অসুস্থ শরীর নিয়ে হাটাচলা করছে তাই একটু ভারসাম্য ধরে রাখছিলো সে।

কত রক্ত ঝড়লো শরীর থেকে তারপর আবার রক্ত দেওয়া হলো। শরীরে এতো বড় এক ক্ষত দুর্বলতা তো স্বাভাবিক থাকবেই। হঠাৎ করে কোনো অসুবিধা হলে যাতে তার উপর ব্যালেন্স রাখতে পারে তাই হাতটুকু আগলে রেখেছিলো সে। কিন্তু এই লোককে দেখো এখন এমন ভান করছে যেনো তার ব্যাথা বুক থেকে পায়ে চলে গেছে। সে কি হাটতে না পারার মতো এতোই অসুস্থ?

এই অ*স*ভ্যটা হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তাকে আচ্ছা মতোন জ্বালিয়েছে। স্বাধে কি আর অ’স’ভ্য বলে? লোকটা মারাত্মক নির্লজ্জ বটে। ছোট ভাইয়ের সামনে কেমন বউ বউ করছে তাও ঠিক ছিলো কিন্তু এমন চিপকাচিপকি করা কি মানায়?

ইরহাম তাদের দু সিড়ি উপরে আগে আগে যাচ্ছে, ভাইয়ের কন্ঠে এমন আহ্লাদী কথা শুনে পেছন ফিরে তাকায়নি তবে ঠোঁট এলিয়ে ঠিকই হেসেছে। তার রসকষহীন ভাইটা যে এমন বউ পাগল হবে তা তো অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মতো ছিল। তবে সেই অমাবস্যাতেও চাঁদের দেখা মিললো যাইহোক। কিন্তু সে তো জন্ম থেকেই চরম রোমান্টিক, ভাবা যায় এতোটা রোমানটিক ছিলো যে জন্মের সময়ও বস্রহীন জন্মেছিলো। পাছে বউটা যদি দেরি সহ্য করতে না পারে কিন্তু পঁচিশ বছরের ধামড়া হয়ে গেলো আজও বউটা আসলো না। তাও যা একটাকে পেয়েছিলো সেই ভার্সিটিতে প্রথম প্রথম, ভেবেছিলো বউ বুঝি এবার হলো তার। কিন্তু এই শা*লিটাও তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টাকলা এক বুড়োকে বিয়ে করে লন্ডনে চলে গেছে। তারপর তো ভেবেছিলো এ জীবনে আর প্রেম বিয়ের নাম নিবে না কিন্তু তার ডেঞ্জারাস ভাবির ভোলাভালা বোনটা তো প্রথম দেখাতেই মন চুরি করে নিলো। এখন এই মন ফেরত আনতে হলেও বিয়েটা তো তাকে করতেই হবে। নিজের এতো দামি মনটা অন্যের কাছে আর কতদিন রাখা যায়?

আপন মনে এসব ভেবে এগুচ্ছিলো ইরহাম। তখন কানে ভাসলো ইরার ডাক

“ভাই তোমার ভাইকে একটু ধরো তো, বেচারা নাকি পড়ে যাবে। এতো বড় ধামড়া এক ছেলে পড়ে গেলে তাকে ধরার মতো শক্তি তো আমার নেই। তারচেয়ে ভালো তুমি ধরো তাকে, পড়লে নাহয় আমিও সাহায্য করবো তোমায়”

ইরার এমন খোঁচা মারা কথা শুনে চেচিয়ে উঠলো ইলহাম। আরেকটু শক্ত করে তাকে চেপে ধরে দুপাশে মাথা নেড়ে বলল

“না না আমি পড়বো না শুধু একটু সুন্দর করে হাটবো কিন্তু তুমি না ধরলে তো সুন্দর করে হাটতে পারবো না বউ, কি জানি কথা অসুস্থ শরীর নিয়ে একটু ভালো করে হাটতে গিয়ে সিড়ি থেকে পড়ে না পা টাকেই আবার ভেঙে ফেলি”

তারপর গলার জোর খানিকটা বাড়িয়ে ইরহামকে বলল

“এই তুই যা একদম আমাকে ধরতে আসবি না।”

ইরহাম কাউকেই পাত্তা দিলো না, ইরার ডাকে না সাড়া দিলো আর না তো ইলহামের কথা শুনেছে বলে প্রমান দিলো বরং সে নিজের মতো নির্দ্বিধায় হেটে চলল।

ইরা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে তার। এই অ”স”ভ্য বে”হা”য়া লোকটাকে একটু কেয়ার করা তার ইহজনমের ভুল। সে যখনই একটু এটা করতে যায় ওটা করতে যায় ছেলেটা লাই পেয়ে যেনো মাথায় উঠে নাচে। থাক তাহলে সিড়িতেই পড়ে এবার হাটুক একা একা সুন্দর করে সে ধরবেনা তাকে

“আপনার পা নিয়ে আপনি জাহান্নামে যান, সেখানে গিয়ে বরং সুন্দর করে হাটুন। আমি গেলাম”

ধপাধপ পা ফেলে চলে গেছে ইরা, ইলহাম কত চেচালো কিন্তু একবার ফিরেও তাকালো না। অসহায় কন্ঠে বলে উঠল সে

“নাহ্ এই বউটাকে নিয়ে আর পারা যায়না। বলি এই বে”য়া”দবটাকে কোনোভাবে কি রিপিয়ারিং করা যায়না?

কি ভেবে নিজেই নিজেকে উত্তর দিলো

“হ্যাঁ যাবে তো সারাক্ষণ মাইরের উপর রাখতে হবে তাতে যদি একটু লাইনে আসে”

“হ্যাঁ আমিও আপনাকে ওয়াশিং মেশিনে ফেলে ধুয়ে তুলবো, তাতে যদি বেয়াপনাটা একটু কমে। শা*লা ল”ম্প”ট”

ইরার কন্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকিয়েছে ইলহাম। উপর থেকে বলছে ইরা। মানছে সে কথাটি একটু জোড়ে বলেছে তাই বলে শুনে নেবে আর এতোক্ষণ যে চেচালো তখন তো শুনলো না

লিভিং রুমের সোফায় গা ছেড়ে বসে পড়লো ইলহাম। গায়ের কালো রঙা শার্টের তিনটে বোতাম খোলা, কাধ পেছিয়ে বুকের বাম পাশে সাদা কাপড়ের মোটা ব্যান্ডেজ। সেই ব্যান্ডেজে যেনো চাপ না পড়ে তার জন্যই বোতাম গুলো খোলা রাখা হয়। ঘর্মাক্ত শরীরে স্বস্তিবোধ ফিরে পেতে এবার শার্টের সব গুলো বোতাম খোলে দিলো সে। কাধ ছাড়িয়ে ঝরঝর করে পড়তে লাগলো দু-চারটে ফুলের পাপড়ি। দরজায় ফুল দিয়ে বরন করেছে বোন আর শালি, বাবাহ্ বাবা যায়? রাজ্য জয় করে ফিরলো কিনা!

সেন্টার টেবিলের উপর একে একে নাস্তার প্লেইট গুলো সাজিয়ে রাখছেন রিতা খালা। হাসপাতাল ফেরত অসুস্থ ব্যাক্তির জন্য ঠান্ডা ঠান্ডা অনেক জল খাবারের আয়োজন করেছেন তিনি।তাকে সাহায্য করছে ইনায়া আর মীরা। ইরহাম আর ইরা ফ্রেশ হতে গেছে আয়ুশ বসে আছে ইলহামের পাশে। এক চুমুকে শরবতের গ্লাস ফাঁকা করে আয়ুশকে চোখে ইশারা করে ইলহাম

“কাজ হয়েছে?”

“হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক”

“গুড”

পাশে বসা বোন শা”লিকা ও বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলল

“তোরা খা, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি”

মিনিট দশেক পর একদম পরিপাটি হয়ে রুম থেকে বেরিয়েছে সে। তখন লিভিং রুমে সকলেই বসে আছে। ইরহাম আর ইরার মধ্যে সেই মনোমালিন্য আর নেই। সেদিন সকাল হতে না হতেই তোড়জোড় চালিয়ে ইরহাম ও আয়ুশকে জরুরী তলব করেছিলো ইলহাম। তাদের কড়া কন্ঠে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে সার কথা পেয়েছে। তার জন্য ইরহামের সাথে অনেক রাগ ঝাড় করে ইরাকে স্যরি বলিয়েছে সে। কড়া করে নিষেধ করে দিয়েছে মা বাবা যেনো এসব বিষয়ে কিছু না জানে। তারপর ফারিয়াকে আচ্ছামত কথা শুনিয়েছে, কঠিন হুমকি দিয়ে বলেছে

“এরপর যদি কখনো শুনেছি আমার বউয়ের পেছনে লেগেছো তাহলে তোমার পেছনে আগুন লাগাতে আমি দুবার ভাববো না তখন কিন্তু কেঁদেকেটেও কুল পাবে না। বুঝেছো বেবি? যাও এবার দুদু খাও গিয়ে। সাবধান দুধ না পেলে আবার আমার বউয়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করে বলোনা আম্মু ডুডু দাও। আমার বউয়ের আশেপাশেও যেনো তোমাকে না দেখি”

সেদিন শুধু বোবা প্রাণীর মতো ডেব ডেব করে তাকিয়েছিলো ফারিয়া। ভাগ্যিস আর কেউ শুনেনি না হলে মান ইজ্জত বলতে তো কিছুই থাকতো না। যাকে সারাক্ষণ নিজের একান্ত পুরুষ করার স্বপ্ন দেখে সে কিনা প্রত্যক্ষ ভাবে নিজেকে তার বাবা বানিয়ে দিলো!

কি ভেবে সেদিন কথাগুলো হজম করে নিয়েছিলো সে, রাগে ক্ষোভ ফেটে পড়েছিলো তবুও যেনো কিছুই করার ছিলো না তার।

“আপু, ভাইয়াকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে কবে যাবে? বাবা তো ভাইয়াকে অনেক পছন্দ করেছে। দেখলে না? কত খুশি ছিলো তখন। আম্মুও আমাকে বলেছেন ভাইয়া নাকি সোনার টুকরো ছেলে”

মীরার কথায় ঠোঁট কামড়ে হাসল ইলহাম, মনে পড়লো গত দুদিন আগের কথা। রিয়াজ আহসান ও মালিহা আহসান তাকে দেখতে হসপিটালে গিয়েছেন। হসপিটালে বসেই সে কি জামাই আদর করলেন মালিহা খান। বলতেই হয় মানুষ হিসেবে তিনি অনেক ভালো সৎমেয়ে বা তার জামাই নিয়ে যেই আদর কেয়াল আছে তার তাতে কেউ বুঝতেই পারবে না তিনি আপন মা নয়। রিয়াজ আহসানও অনেক ভালো মনের মানুষ, ঠান্ডা গম্ভীর স্বভাবের তবে জীবনের এক পর্যায়ে গিয়ে যে ভুল করেছেন তার কোনো ক্ষমা হয়না। কিন্তু মালিহা খানকে দোষারোপ করার মতো কিছু পায়নি ইলহাম। রিয়াজ আহসানের প্ররোচনায় তিনি প্রভাবিত হয়েছেন তবুও যদি জেনেশুনে এমন করে থাকেন তবে তাকেও ছেড়ে দেওয়া যায় না।

“আমার জীবনে আহসান বাড়ির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুলে যা, আমি ওই বাড়িতে আর পা রাখছি না”

“কিন্তু আপু…

“আর একটা কথা বললে তোকেও আর আমার সাথে রাখবো না”

চুপসে গেলো মীরা, বোন ক্ষেপে গেছে ভেবে নিজেকে দমিয়ে নিলো। বাকি সবাই দু বোনের তর্কবিতর্ক দেখলো, ইনায়ার সাথে থাকার সুবাধে বোনের সম্পর্কে সব কথাই জানিয়েছে মীরা। আপাতদৃষ্টিতে এখন ইরহাম সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দু বোনের কথা সবটাই মাথার উপর দিয়ে গেলো তার। সে খেয়াল করেছে সেদিন হাসপাতালেও মা বাবার সাথে কথা বলেনি ইরা তবে কি এখানে কোনো কিন্তু আছে?

“আমি একটু বের হবো ফিরতে রাত হবে। তোমরা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো আমার জন্য অপেক্ষা করো না”

ইলহামের কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইরা, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এতো রাতে কি কাজ তার? আয়ুশ ছাড়া ভাইবোন সকলেই কিছুটা উৎসুক চোখে তাকালো। তাদের হয়ে ইরা'ই প্রশ্ন করলো

“এতো রাতে কি কাজ আপনার? হসপিটাল তো নেই”

“আমাদের এক ফ্রেন্ড এক্সিডেন্ট করেছে সন্ধ্যায়, তার অবস্থা নাকি খুব গুরুতর সেখানেই যাবো।”

ইরার প্রশ্নের সাথে কালবিলম্ব না করে উত্তর দিলো ইলহাম যেনো আগে থেকেই জানা ছিলো। ইরার সন্দেহ দূর করতে না চাইতেও আয়ুশকে সুধালো

“কি রে তুই যাবি?”

আড়চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিলো সে। আর কাউকে কোনো প্রশ্ন করতে না দিয়ে বেরিয়ে গেলো দুজন। যাওয়ার আগে বলে গেলো ইলহাম।

“তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে যেয়ো মুনলাইট, রাত জাগবে না একদম”

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন