#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
৪৮.
ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতা। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। খাটের এপাশ-ওপাশ ছটফট করছে ইরহাম। বালিশটা একবার মাথার নিচে দিচ্ছে, পরক্ষণেই সেটা টেনে বুকের ওপর চেপে ধরছে, কখনো তো আবার মাথার উপর চেপে ধরে ধুম মেরে পড়ে রইছে। কিন্তু কিছুতেই স্বস্তি মিলছে না। চোখে ঘুম নেই, এক ফোঁটা ঘুমও যেন তার চোখের পাতা ছুঁতে চাইছে না। দীর্ঘ একটা দিন পেরিয়ে গেছে। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা, অথচ গত চব্বিশ ঘণ্টায় সে একটা পাতাও উল্টাতে পারেনি। টেবিলের ওপর সেমিস্টার ফাইনালের ব্লু-প্রিন্ট জটিল সব কোডিং-ম্যাথের বইগুলো হা করে খোলা পড়ে আছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছে না সে। যখনই বইয়ের পাতায় চোখ রাখছে, জটিল সব সূত্রগুলো কেমন যেন আবছা হয়ে যাচ্ছে। আর সেই আবছা অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে উঠছে এক মায়াবী মুখ, ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই বাঁকা দাঁতের এক চিলতে মিষ্টি হাসি। সে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। নিজেকে বড্ড দমিয়ে রাখতে চাইছে সে। নিজের ভেতরের এই অবাধ্য অনুভূতিগুলোকে, এই তীব্র ভালোলাগার স্রোতটাকে শক্ত বাঁধ দিয়ে আটকে রাখতে চাইছে। শুধু তার রোজের কথা ভেবে সে নিজেকে বারবার থামাচ্ছে। মেয়েটা বড্ড ছোট, ভালো-মন্দ বোঝার মতো বয়স এখনো তার হয়নি। দুনিয়ার জটিলতা কিংবা ভালোবাসার গভীরতা মাপার পরিপক্বতা এখনো তার আসেনি। ইরহাম খুব ভালো করেই জানে, সে যদি এখন কোনোভাবে মেয়েটাকে একটুও সায় দেয়, নিজের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তবে মেয়েটার পড়াশোনায় এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে সবকিছু ভুলে যেতে চায়। অন্তত আগামী দু-তিনটে বছরের জন্য নিজের মন থেকে মেয়েটার স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলতে চায়। নিজেকে বোঝায়, আগে ক্যারিয়ারটা গড়ে নেওয়া দরকার। কিন্তু তার এই অবাধ্য মন তো কোনো যুক্তি মানে না, কোনো নিয়মের শিকলে তাকে বেঁধে রাখা যায় না। যতবার সে ভুলে যেতে চায়, মন ততবারই বিদ্রোহ করে ওঠে। মধ্যরাতের এই নির্জনতায় তার ভেতর থেকে এক তীব্র হাহাকার জেগে ওঠে। মন বলে যদি পারতাম, এখনই সব নিয়ম ভেঙে, সব দূরত্ব মুছে মেয়েটাকে বুকের খাঁচায় আগলে নিতাম!
বুকের ভেতর চলমান ছটফটানিটা কোনোভাবেই থামানো গেল না। ঘরের চার দেয়ালের নীরবতা যেন তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। একসময় নিজের আকুলতা সইতে না পেরে ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনে চোখ আটকে গেল। রাত দুটো ছত্রিশ মিনিট। সে থমকালো, এত রাতে মেয়েটার মিষ্টি ঘুম ভাঙানো ঠিক হবে কি? কিন্তু তার উত্তাল ঝড়ো তান্ডব চালানো মনটা সব যুক্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। আঙুলের এক ছোঁয়ায় রোজ নামের পাশে জ্বলজ্বল করা লাল রঙের লাভ চিহ্ন দিয়ে সেভ করা নাম্বারে ডায়াল করে ফোন কানে ধরলো। তার বুকের ভেতর যখন উত্তাল ঢেউ। অপর পাশে তখন মীরা বুদ হয়ে ঘুমুচ্ছে। ফোনের কর্কশ আওয়াজে গভীর ঘুমের ঘোরে সে চরম বিরক্ত হলো, চোখ না খুলেই পাশ হাতড়ে ফোন নিয়ে কল কেটে দিয়ে ওপাশ ফিরে শুলো।
ওদিকে স্ক্রিনে ‘Call Ended’ লেখাটা দেখে ইরহাম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা পারলো তার ফোন কেটে দিতে? বুক ভরা জেদ আর আকুলতা নিয়ে সে ফের ডায়াল করল। এবারও ওপাশ থেকে কলটা কেটে আসলো। এভাবে পরপর দুই-তিনবার দেওয়ার পর ইনায়াও জেগে গেছে বার বার এমন বিরক্তিকর আওয়াজ পেয়ে। ঘুমু ঘুমু কন্ঠে সে বলে দিলো
“ফোনটা ধরে দেখো মীরা, নয়তো বন্ধ করে রাখো”
পরের বার রিং হতেই ধৈর্যের বাধ ভাঙলো তার। ঘুম জড়ানো ঝাঁঝালো স্বরে ধমকে উঠল সে
"এই কোন গাঞ্জাখোর আসছিস রে এত রাতে ফোন করে জ্বালাচ্ছিস? বলি, তুই কি মঙ্গল গ্রহে থাকিস? জানিস না এখন রাত, মানুষ ঘুমোচ্ছে? দিলি তো সাধের ঘুমটা নষ্ট করে!"
ইরহাম থতমত খেলো, চোখের পলকে তার মনের সব আকুলতা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তবে সেখানে ভীড় করলো এক বুক শীতল পরশের ভালোলাগা। সে কান থেকে ফোন নামিয়ে স্ক্রিনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এটা সেই শান্ত, লাজুক মীরা? যে মীরা সামনে এলে লজ্জায় চোখ তুলে তাকায় না, সে এত রাতে এমন গুন্ডাদের মতো কথা বলছে! অপ্রস্তুত হয়ে হালকা গলা ঝেড়ে কাশলো ইরহাম, নিজেকে স্বাভাবিক করে ঠোঁট পিষে হেসে বলল
"উহুম...বেয়াইন সাহেব, আমি আপনার বেয়াই বলছিলাম!”
মীরা প্রবল এক ঝটকা খেলো, ঘুম তার উবে গেছে এমন মশকরা করা কোনো কথা শুনে। চোখ কপালে তুলে ফোনখানা সামনে ধরে ডেব ডেব করে তাকিয়ে দেখলো। অপরিচিত নাম্বার তবে এর আগেও দুয়েকবার দেখা হয়েছে। লজ্জায় চোখ মুখ খিচে ফেলল সে, অপাশ হতে ভাড়ী নিশ্বাসের শব্দ শুনে ইরহাম ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তার লজ্জাকে আরেক ধাপ বাড়িয়ে দিতে কন্ঠে দুষ্টুমি ফুটিয়ে বলল
“গাঞ্জার অভাবে ঘুম আসছে না বেয়াইন। তোমার কাছে হবে কি একটু গাঞ্জায়ায়া..”
শেষ কথাটি একটু টেনে টেনে বলল আর তাতেই মেয়েটা লজ্জায় হাসফাস করে উঠলো। বেশ বুঝলো ইচ্ছে করেই তাকে এমন হেনস্তা করা হচ্ছে। তাই নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে কথা কাটাতে মিনমিন করে বলল
“দেখুন, ঘুমের ঘোরে আমি বুঝতে পারিনি। তাই…”
“হুম তাই এমন উপাধি দিয়ে দিলে? ইট'স নট ফেয়ার রোজ। আমাকে নির্ঘুম রেখে নাক টেনে ঘুমাচ্ছো। যেই না একটু বিরক্ত করলাম এতেই এমন জঘন্য উপাধি দিয়ে দিলে? কিন্তু আমি যদি বলি সত্যিই আমি নেশায় আছি তবে গাজার নয় তোমার তবে কি বিশ্বাস করবে?”
ইরহামের এক নিশ্বাসে বলা এমন অকপটে কথা শুনে মেয়েটা কিঞ্চিৎ নুয়ে এলো, লজ্জায় আবির রাঙা হলো তার ফর্সা পেলব গাল দুটো। এর আগেও সে অনেক দুষ্টুমি করেছে তবে এতো গভীর ভাবে কখনো অস্বস্তিতে ফেলেনি। লজ্জা, সংকোচ সবমিলিয়ে কি বলবে না বলবে ভেবে না পেয়ে সে নিশ্চুপ হয়ে রইলো। ফের ভেসে এলোর অপর পাশ হতে নেশালো এক সম্মোধন
“রোজ!”
শিউরে উঠলো সপ্তদশীর কায়া, এই সম্মোধন তার সর্বাঙ্গে শিহরণ জাগায়। নাহ তো সইতে পারে আর তো মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা যেনো কন্ঠনালি চেপে ধরে তার। তবুও ভাঙা ভাঙা কন্ঠে কুন্ঠিত হয়ে বলল
“আ..আপনি কিন্তু আমায় ফ্লার্ট করছেন বেয়াইন”
“উহুম, আমি প্রেম করছি তো”
এতোটুকু বুঝি যথেষ্ট ছিল না? মুখের উপর এমন শিহরিত কথা বলতে পারলো। মেয়েটার পায়ের তালু শিরশির করে উঠলো। লাজে রাঙা মুখশ্রীজুড়ে ভীড় করলো অস্বস্তিকর মৃদু হাসির রেখা। তবে লোকটার সাথে আর বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়, তা নয়তো লজ্জায় হয়তো হুশ জ্ঞান হারিয়ে বসবে। কাজেই তড়িঘড়ি করে রাখছি বলে কেটে দিলো ফোন। আর তারপর একচাপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ছুড়ে ফেললো বিছানার উপর। ইরহাম শব্দ করে হেসে উঠলো, মন উতাল পাতাল করা ঝড় যেন এবার স্মিথ হয়ে এসেছে। প্রশান্তির এক শীতল ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে বুকের বা পাশ জুড়ে। সে মাথার পেছনে দুহাত রেখে সঠান হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। সিলিংয়ের পানে তাকিয়ে ঠোঁট পিষে বিরবির করে বলে উঠল
“হ্যাভ আ সুইট ড্রিম রোজ, এন্ড অফকোর্স ইট'স উইথ মি”
_____
চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ক্যানভাস, রঙের টিউব আর নানা আকৃতির তুলি। ঘরের এক কোণে রাখা ইজেলের ওপর আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা। এই আর্ট রুমটাই যেন আজ এক টুকরো নীরবতার দ্বীপ। বাইরে তখন নিস্তব্ধ গভীর রাত, পৃথিবীর সব কোলাহল যেন এই ঘরের দরজায় এসে থমকে গেছে। খোলা জানালা দিয়ে আসা হালকা দক্ষিণা বাতাস ঘরের ভেতরের রঙের চড়া সুবাসকে এক মায়াবী গন্ধে রূপ দিচ্ছে। ঘরের ঠিক মাঝবরাবর একটি কাঠের ইজি চেয়ারে বসে আছে ইলহাম। তার পরনের কালো টি-শার্টটা পরম অবহেলায় পড়ে আছে মেঝের এক কোণে। ইলহামের উন্মুক্ত সেই চওড়া বুকে আবছা আলো এসে স্পষ্ট করে দেখা দিচ্ছে একটি কালচে আঁকাবাঁকা গভীর ক্ষতচিহ্ন। ইরা তখন তার সমস্ত অধিকার আর ভালোবাসা নিয়ে বসে আছে ইলহামের উরুর ওপর। তার রেশমি চুলগুলো ইলহামের কাঁধ ছুঁয়ে নিচে নেমে এসেছে। ইরা তার উষ্ণ হাতের তালুটা পরম মমতায় চেপে ধরলো ইলহামের অমসৃণ, শক্ত ক্ষতের ওপর। সে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক রাশ গভীর আকুলতা।
"এর গভীরে আর কি লুকিয়ে আছে ইলহাম?"
ইলহাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার এক হাতে ইরার কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাতটা রাখল ইরার হাতের ওপর। জানালার বাহিরে রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা তার চোখের মণি দুটো যেন মুহূর্তেই নিষ্প্রাণ হয়ে ধরা দিলো। তার কণ্ঠস্বর এই নিস্তব্ধ ঘরের দেয়ালে এক ভারী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
"আজ থেকে বছর সাত-আট আগে আমি এই শান্ত, সৌম্য ডা. ইলহাম ছিলাম না। আমার রক্তে তখন ছিল অন্যায় প্রতিরোদের আগুন, আর দু চোখে ছিল এক সুন্দর সমাজের স্বপ্ন। সিলেটের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে আমার জন্ম। বাবা ছিলেন ওখানকার অসম্ভব নামকরা নীতিবান ডাক্তার। তার স্বপ্ন ছিল আমিও তাঁর মতো স্টেথোস্কোপ হাতে সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে শুধু রোগীদের সেবা করব। বাবার চাপে মেডিকেলে ভর্তি হলাম ঠিকই, কিন্তু অ্যানাটমি আর ফিজিওলজির কঠিন ক্লাসের চেয়েও আমাকে বেশি টানত রাজপথ। মেডিকেলের পড়াশোনা ঠিক রেখে যেটুকু অতিরিক্ত সময় পেতাম, সব ঢেলে দিতাম রাজনীতিতে। আমি কিন্তু ক্ষমতার লোভী বা উগ্র ক্যাডার ছিলাম না মুনলাইট, আমি ছিলাম আদর্শে বিশ্বাসী এক তরুণ। যারা ছিল সমাজের কীট, যারা ক্ষমতার দাপটে গরিবের ওপর অত্যাচার করত, মাদক কিংবা চাঁদাবাজির মতো সমাজ নষ্টের খেলায় মেতে থাকতো আমি তাদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতাম। সমঝোতায় যখন তাদের পোষাতো না তখন তাদের চোখে যমদূত হয়ে দেখা দিতাম। সিলেটজুড়ে তখন আমার নামে ভিন্ন সমীহ তৈরি হয়েছিল। অল্প দিনেই দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে আমার এই নিঃস্বার্থ সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। আর এটাই কাল হলো। সবার মতো বাবাও জেনে গেলেন সত্যিটা। বাবা সেদিন ভীষণ রেগেছিলেন, আঙুল তুলে শাসিয়ে বলেছিলেন”
“রাজনীতি ভদ্রলোকের জায়গা নয় ইলহাম। তুমি ডাক্তার হতে এসেছ, গুন্ডা হতে নয়!”
এইটুকু বলে মলিন হাসলো ইলহাম, তার হাসিতে প্রকাশ পেলো এক বুক তাচ্ছিল্য। ইরা এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে এই শুকনো মুখের পানে। যেনো স্পষ্টই দেখে নিতে পারছে মানুষটার ভেতরে চলমান হাহাকার।
“মায়ের চোখে ছিল অফুরন্ত জল আর আমাকে দমানোর আকুতি। কিন্তু আমি জেদি ছিলাম, বাবার সেই তীব্র রাগ আর ঘরের অশান্তি, মায়ের আকুতি সব বুকে চেপেও আমি মানুষের সঙ্গ ছাড়িনি। তখনই আমার জীবনে ছায়ার মতো এলেন আহমেদ শাহরিয়ার আঙ্কেল। তিনি ছিলেন আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য। তবে প্রচলিত কোনো চাণক্য রাজনীতিবিদ নন, একেবারে খাঁটি, সাদা মনের একজন মানুষ। মানুষের কল্যাণ করাই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান। আমার নিঃস্বার্থ জনসেবা, সাংগঠনিক দক্ষতা আর সমাজের অন্যায় দূর করার আপসহীন মনোভাব দেখে তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে নিলেন। খুব দ্রুতই আমি তাঁর আত্মার একাংশ হয়ে উঠলাম। যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক কাজ কিংবা ব্যক্তিগত পরামর্শ আমাকে ছাড়া তিনি এক পা-ও বাড়াতেন না।
কিন্তু আলো বাড়লে তো ছায়াও বাড়ে, তাইনা মুনলাইট? শাহরিয়ার আঙ্কেলের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা আর আমার মতো এক তরুণ নেতার উত্থান সহ্য হলো না কিছু কুচক্রী মহলের। তারা দেখল, আমাদের সৎ রাজনীতির কারণে তাদের দুর্নীতি আর পাপের সাম্রাজ্য ধসে পড়ছে। ব্যস, শুরু হলো নোংরা খেলা। আমাদের নামে মিছে অপবাদ ছড়ানো হলো, চরিত্র হননের চেষ্টা করা হলো, সামাজিকভাবে অপদস্ত করার জন্য কোনো কুৎসিত পথ নেই যা তারা অবলম্বন করেনি। শুধু তাই নয়, আমাদের ওপর বেশ কয়েকবার ছোটখাটো অতর্কিত হামলাও চালানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা থামিনি। শাহরিয়ার আঙ্কেলের শান্ত নির্দেশনা আর আমার ভেতরের তারুণ্যের জেদ সব বাধা মাড়িয়ে আমাদের আরও শক্তিশালী করে তুলছিল। তারপর এলো সেই অভিশপ্ত কালরাত। শহরের এক বড় জনসভা শেষ করে আমরা গাড়িতে করে ফিরছিলাম। হুট করেই চারপাশ থেকে একদল সশস্ত্র কুচক্রী আমাদের লক্ষ্য করে বোমা আর গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে আমাদের লোকেরা সব তাদের কবজায়। আমি শাহরিয়ার আঙ্কেলকে বাঁচাতে তাঁকে আড়াল করে জড়িয়ে ধরেছিলাম। ঠিক তখনই বুলেটের সীসা আমার বুক চিরে চলে যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না...চোখের সামনে আমার সেই পিতৃতুল্য রাজনৈতিক গুরু, সেই মানুষটিকে রক্তে ভেসে যেতে দেখলাম। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। আর আমি গুরুতর আহত অবস্থায় আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লাগলাম।
হাসপাতালে যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমার শিয়রে মা বসে আছেন। মায়ের চোখ দুটো ততদিনে কান্নায় অন্ধ হওয়ার জোগাড়। আমার ক্ষতবিক্ষত বুকের দিকে তাকিয়ে মা আমার মাথায় হাত রাখলেন। কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“তোমার বাবার আদর্শ তোমাকে ফেরাতে পারেনি, আমার চোখের জলও তোমাকে ফেরাতে পারেনি তবে কি আমাদের লা'শ তোমাকে ফেরাতে পারবে ইলহাম? তবে তাই হোক এবার যদি সেই রাজনীতিতে ফিরতেই হয় আমার লা'শের উপর দিয়ে যেও”
এইটুকু বলতে গিয়ে কন্ঠনালি কেপে উঠলো তার, সে শুকনো ঢোক গিললো। তেতো হয়ে আসা কন্ঠনালির ব্যাথাটুকু গিলে নিলো। ফের বলতে লাগলো।
"মায়ের সেই আর্তনাদ আর শাহরিয়ার আঙ্কেলের নিথর দেহ আমার প্রেরণাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল। আমি মায়ের মাথায় হাত রেখে ওয়াদা করলাম। সুস্থ হয়েই সিলেট ছেড়ে চলে গেলাম রাজশাহীতে, জীবনের সব চেনা গণ্ডি, চেনা মানুষ আর চেনা অতীতকে পেছনে ফেলে রাজশাহীর এক মেডিকেল কলেজে গিয়ে বাকি পড়ালেখা আর ইন্টার্নশিপ শেষ করলাম। এরপর চাকরি নিয়ে চলে এলাম এই শহরে। আজকের এই ডা. ইলহাম আসলে ওই ছাইচাপা অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত মানুষ।"
ইলহাম থামল। ইরা নিঃশব্দে তার মাথাটা ইলহামের কাঁধে এলিয়ে দিলো, দুহাতে পেছিয়ে ধরলো তার গ্রীবাদেশ। তার চোখে তখন জলে টলমল করছে। কে বলবে এই মানুষটা জীবনে এতো কিছু অতিক্রম করে এসেছে। ইরা নিঃশব্দে চুমু আঁকল তার কপালে। তার মাথা নিজ বুকের সাথে চেপে ধরে ফ্যাসফ্যাস করে বলল
“আমি কখনো এই পথ ছাড়বো না ইলহাম, আপনি আমার পাশে থাকবেন। দেখবেন আপনি যা করতে পারেন নি তা আমরা দুজন মিলে করে নিবো”
ইলহাম মলিন হাসলো, রুক্ষ হাতে পেছিয়ে ধরলো প্রেয়সীর কোমল কায়া। বক্ষভাজে চেপে ধরে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল
“আমার বিশ্বাস, তুমি পারবে মুনলাইট, তোমার মাঝে আমি নিজেকে দেখতে পাই। তোমার এই অদম্য সাহস আমার সেই তরুন সত্বাকে স্বরণ করায়। আমি সত্যিই অনেক ভাগ্যবান, যে তোমাকে পেয়েছি। ইউ আর মাই গ্রেইটেস্ট ডিলাইট।”
#চলবে