#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৫৮♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
"রোড এক্সিডেন্ট" শব্দটা কানে পৌঁছোতেই পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো আমার। সামান্য আওয়াজ করবার মতোও শক্তি অবশিষ্ট নেই যেনো।
"এক্সিডেন্ট" শব্দটা আমার ডিকশনারিতে খুবই সুপরিচিত হলেও "রোড এক্সিডেন্ট" শব্দটা না আমার ডিকশনারির পাতা ঘাটলে পাওয়া যাবে আর না আমার কল্পনার রাজ্যে। এই শব্দটাকে আমি ছোট থেকেই বড্ড বেশি ভয় পাই।
আর আজ সেই শব্দটাই আঘাত হানলো রুশো ভাইয়ার ওপর?
.
আজ বিকেলবেলায় অগ্নি ভাইয়া আর আমি বাড়ির দোলনায় গা এলিয়ে দিয়ে প্রকৃতির হাওয়া গা মাখছিলাম। "এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন" লাইনটার সাথেই যেনো মিলে গিয়েছে আজকের দিনটা। যেহেতু নীবিড় ভাইয়া বা নিত্য আপু কেউই ছিলো তাই ভাইয়া আর আমিই বেড়িয়েছিলাম একটু রিল্যাক্স করতে। এমনিতেই কারো মন ভালো নেই রুশো ভাইয়ার চিন্তায়। তারওপর ঘরে বসে একা একা বড্ড তমসাবৃত লাগছিলো।
একটু হাটাহাটি করে ভাইয়া আর আমি দোলনায় বসে প্রকৃতির হিমেল হাওয়ায় গা ভাসাচ্ছিলাম ঠিক তখনই কেউ ঝড়ের বেগে ছুটে আসে আমাদের কাছে। ব্যক্তিটিকে দেখবার জন্য সচেতন চোখে তাকাতেই আঁতকে উঠি আমি। আর যাই হোক রাত্রির ওপর অভিমান থাকলেও ওকে এভাবে কাঁদতে দেখে ধরে রাখতে পারিনি নিজেকে। চটজলদি উঠে পড়ে ব্যস্ত হয়ে "কি হয়েছে?" জিজ্ঞেস করতেই রাত্রি বার কয়েক জোড়ে জোড়ে শ্বাস টেনে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
.
---- রু... রুশো...! রুশোর এ...এ...এক্সিডেন্ট হয়েছে! হয়তো গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ তীব্র আওয়াজে হর্ণ দিতে দিতে বিকট শব্দে ফোনের লাইন কেটে যায়।
আ...আমি সাথেসাথেই ছুটে বেড়িয়ে এসেছি। তোর নম্বরে অনেকবার ডায়াল করেছি কিন্তু তুই ধরিস নি। তোদের কাছে আসার পথেই আবার উনার নম্বর থেকে কল আসে। আমি রুশো ভাইয়া ভেবে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ বলে "এই ফোনের মালিক কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে। রোড এক্সিডেন্টে খুবই বাজে অবস্থা, তাড়াতাড়ি চলে আসুন।"
সেই শুনেই আমি ছুটে তোদের জানাতে এসেছি। প্লিজ তোর যতো রাগ আছে তুই পরে ঝাড়িস। আমাদের রুশোর কাছে যেতে হবে।
.
রাত্রির বলা বাক্যের শুধুমাত্র "রোড এক্সিডেন্ট" শব্দটাই তীক্ষ্ণভাবে আঘাত হানছে আমার মস্তিষ্কে। অগ্নি ভাইয়া রাত্রি পুরো কথা শুনবার আগেই "নাহহহ....!" বলেই চেঁচিয়ে পাগলের মতো হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে গাড়ি বের করতে গিয়েছে। রাত্রিও ছুটেছে ভাইয়ার পেছন পেছন। মাঝখান থেকে শুধু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। রাত্রির পুরো কথাটার অর্থ পুরো ৩ মিনিট পর বুঝতে পেরে কাঁপাকাঁপা পায়ে ছুট লাগালাম আমি। অগ্নি ভাইয়া গাড়ি বের করে আমায় ধরে বসিয়ে দিয়ে স্টার্ট দিলো তৎক্ষণাৎ। এতো স্পিডে গাড়ি এর আগে কোনোদিনোও ভাইয়া চালিয়েছে কিনা স্মৃতির পাতায় নেই আমার। ভাইয়া গাড়ি চালাতে চালাতেই হন্তদন্ত হয়ে আম্মুর নম্বরে ডায়াল করলো। আম্মু কল রিসিভ করতেই অগ্নি ভাইয়া দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে চোখে জমা নোনাজলগুলো গড়তে না দিয়ে বলে উঠলো,
.
---- আম্মু যেখানেই থাকো এক্ষুনি মেডিকেল হসপিটালে চলে এসো। রু..রুশোর এক্সিডেন্ট হয়েছে। আন্টি-আংকেল কে জানিয়ে দিও।
.
বলেই ফোনটা কেটে আবারও তীব্র গতিতে ছুটে চললো হসপিটালের উদ্দেশ্যে। আজ যেনো এতোটুকু পথও বড্ড বেশি বলে মনে হচ্ছে আমার। মাথাটা কেমন যেনো ঝিমঝিম করে চলেছে। রাত্রি এতোক্ষণে কান্না করতে করতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে।
কিছুদূর যেতেই রাস্তার একপাশে ভীড় জমায় ভীরের কেন্দ্রবিন্দুতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম আমি। একটি গাড়ি দুমড়েমুচড়ে উল্টো হয়ে রাস্তার পাশের বটগাছটায় লেগে রয়েছে। গাড়িটা ঠিক কেমন বা কোন কোম্পানির তা চেনারও বিন্দু মাত্র অবকাশ নেই। অগ্নি ভাইয়া ভীড় দেখেও সেদিকে পাত্তা দিলো না। ভাইয়ার কাছে বর্তমানে মূখ্য শুধুই রুশো ভাইয়ার কাছে পৌঁছানো। আর রাত্রি একনাগাড়ে কান্না করছে যার ফলে এদিকটা নজরেই পড়লো না তার। শুধুমাত্র উইন্ডোর পাশ থেকে মাথাটা হাল্কা উঁচু করে দেখলাম আমি। তবে কি এটাই রুশো ভাইয়ার গাড়ি?
.
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। ২০ মিনিটের রাস্তা ১৫ মিনিটেই পাড় করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম তৎক্ষণাৎ। একই সময় আমাদের সামনে ব্রেক কষলো একটা হোয়াইট কার। গাড়িটা চিনতে বেশি বেগ পেতে হলো না আমার। এই গাড়িতে বহুবার চড়ে চড়কার মতো ঘুরেছি আমি।
নীবিড় ভাইয়া আর নিত্য আপু গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে আমাদের কাছে আসলো। বুঝতে বাকি নেই এই মধ্যে আম্মুই ফোন করে উনাদের জানিয়েছেন। নীবিড় ভাইয়াদের বাসা হসপিটালের খুব কাছে হওয়ার সুবাদেই অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছেন উনারা।
.
নীবিড় ভাইয়া আমার কাছে এসে আমার ডান হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় অাঁকড়ে ধরে এগোতে লাগলেন। আমিও উনার সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে লাগলাম। বর্তমানে নিজেকে একটা রোবটের মতো বলেই মনে হচ্ছে আমার। কেমন যেনো অনুভুতি শূন্য অনুভূতি! আমি এখনো ঘোরের মধ্যে রয়েছি। বিশ্বাস করতে পারছিনা নিজের কান কে। সবকিছু কেমন যেনো এলোমেলো লাগছে আমার। "অতি শোকে পাথর" টাইপ অবস্থায় উপনীত হয়েছি আমি।
.
হসপিটালে ঢুকেই এক ছুটে রিসেপশনিস্টের কাছে গেলাম আমরা। আমাদের পেছন পেছন নিত্য আপু অগ্নি ভাইয়া আর রাত্রিকে সামলাতে সামলাতে হসপিটালের ভেতর প্রবেশ করলো।
আমাদের দেখে রিসেপশনিস্ট নরম গলায় শান্ত হয়ে বলে উঠলেন,
---- হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?
.
নীবিড় ভাইয়া হসপিটালের রিসেপশনিস্টের কাছে গিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিয়ে ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন,
.
---- র..রুশো...! আই মিন প্রায় একঘন্টা আগে রোড এক্সিডেন্ট কেসে যাকে এডমিট করানো হয়েছে সে কোথায়? আমরা ওর বাড়ির লোক!
.
নীবিড় ভাইয়ার কথায় মাথা নিচু করে ফেললো রিসেপশনের মেয়েটা। এভাবে মাথা নিচু করে চুপ হয়ে যাওয়ায় ক্ষেপে গেল অগ্নি ভাইয়া। রেগেমেগে ভাইয়া বললো,
---- কি হলো চুপ করে আছেন কেনো? বলুন রুশো কোথায়? কোথায় আমার ভাই?
.
মেয়েটা অগ্নি ভাইয়ার ধমক খেয়ে কেঁপে উঠলো, নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় জবাবে বলে উঠলো,
---- আপনারা দেড়ি করে ফেলেছেন। পেশেন্টকে এডমিট করানোর পর আইসিইউ এ নিয়ে যার আগেই উনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
.
একটু থেমে মেয়েটা আবারও বলে উঠলো,
---- বডি রাখা আছে, বাড়ির লোক আসারই অপেক্ষায় ছিলাম আমরা।
.
মেয়েটার বলা বাক্যগুলো মেনে নিতে পারিনি আমরা কেউই। সাথেসাথেই নিস্তেজ শরীরটা ক্রমশই ছেড়ে দিয়ে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লাম আমি। মাথাটা ঘুরছে, চারদিক থেকেই কেমন যেনো আধার ঘনিয়ে আসছ। অগ্নি ভাইয়া রেগেমেগে আবারও মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
---- ফাইজলামি করার জায়গা পান না? কি যা তা বলছেন? আপনি একজন রিসেপশনিস্ট হয়ে এইধরনের জঘন্য মিথ্যে বলছেন, আপনার সাহস তো কম না!
.
মেয়েটি ভয়ে ভয়ে অগ্নি ভাইয়াকে শান্ত হতে বলে ডক্টরকে ডাক দিলো। এর মাঝেই উনি আইসিইউর দিকে যেতে গিয়ে ডাক পড়ায় আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। মেয়েটি আজকের এক্সিডেন্ট কেসের পেশেন্টের বডি আমাদের দেখাতে অনুরোধ করতেই মুখ কালো করে ফেললেন ডক্টর। এর মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে আম্মু-আব্বু, খালু-খালামুনি হসপিটালে প্রবেশ করলো। খালামুনি অশ্রুসিক্ত নয়নে অগ্নি ভাইয়াকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো "রুশো কোথায়? কোথায় আমার ছেলে? কি হয়েছে ওর?"
অগ্নি ভাইয়া খালামুনিকে শান্ত হতে ইশারা করে বলে উঠলো,
---- দেখো না খালামুনি এরা আমাদের সাথে মজা করছে! কি সব আজেবাজে বকছে। বলছে রুশো নাকি আর নেই!
.
বলেই কান্না করতে লাগলো অগ্নি ভাইয়া। এতোক্ষণ ধরে আটকে রাখা নোনাজলগুলো আর বাঁধ মানলো না তার। অঝোরে ঝড়তে শুরু করলো তারা নির্মমভাবে।
রাত্রি একেবারেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এতোবড় শক নিতে পারে নি সে। "সব আমার জন্য হলো! আমি দোষী, খু..খুনি আমি" বাক্যটা বার কয়েক আওড়াতেই জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো রাত্রি। নার্সরা রাত্রিকে সেন্সলেস হতে দেখে ধরে তৎক্ষণাৎ উঠিয়ে একটি কেবিনে নিয়ে যাবার জন্য ছুট লাগালো।
অগ্নি ভাইয়ার বলা "রুশো আর নেই" কথাটা বজ্রপাত সৃষ্টি করলো সকলের ওপর। খালু-খালামুনিরা নিজেদের সামলাতে পারলো না। কোন বাবা-মাই বা জীবিত থাকতে নিজের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনে নিজেদের ঠিক রাখতে পারবে? আম্মু আব্বু নিজেরাই শোকে ভেঙে পড়েছে। ওদের আর কি সামলাবে? নীবিড় ভাইয়া আমার পাশে বসে পড়ে আমায় নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন উদ্দেশ্য আমায় সামলানো। অথচ আমি পাথর! নিত্য আপু কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। আমাদের শোকে শোকাহত যেনো পুরো হাসপাতালের প্রতিটি সদস্য! আমাদের এভাবে ভেঙে পরা অবস্থা দেখে ডক্টর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন,
.
---- আমরা আপনাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছি, কিন্তু প্লিজ আপনারা বাস্তবতা মানতে শিখুন। পেশেন্টের অবস্থা ভীষণ ক্রিটিকাল ছিলো। প্রচুর ব্লাড বেড়িয়েছিলো। সেই হিসেবে আমরা যতদ্রুত সম্ভব তার ট্রিটমেন্ট করাতে আইসিইউতে নিয়ে যাবার আগ মুহুর্তেরই তিনি মারা যান। উই আর সরি! আমাদের হাতে কিছুই করার ছিলো না। জন্ম-মৃত্যু সবই উপর ওয়ালার হাতে।
আপনারা অপেক্ষা করুন। বডি রাখা আছে। একটু পরই আপনাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
.
বলেই দুজন নার্সকে বডি নিয়ে আসতে ইশারা করলেন। ডক্টরের আদেশ মতো চোখের ইশারায় সম্মতি জানিয়ে স্থান ত্যাগ করে ছুটলো তারা লাশ নিয়ে আসার জন্য।
আম্মু-আব্বু, খালামুনিকে-খালু সহ সবাই কাঁদছে। অগ্নি ভাইয়া পাগলের মতো আর্তনাদ করে যাচ্ছে। নীবিড় ভাইয়ার বুকের মাঝে মাথা রেখেই উনার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি আমি তীব্রভাবে। আমারও ইচ্ছে করছে কাঁদতে, খুব করে কাঁদতে। কিন্তু না, আমি কাঁদতে পারছিনা। পাথরে পরিণত হয়ে গিয়েছি আমি। আমার প্রাণ থেকেও বোধহয় নেই।
রুশো ভাইয়ার মৃত্যুটা কেউই মানতে পারছে না। আর না পারছি আমি। তবে কি আর কেউ আমায় ছুটকি বলে ডাকবে না? মাঝরাতে ঘুম না আসায় কেউ কি আর বলবে না " এই ছুটকি আইসক্রিম খাবি?"
অফিস যাওয়ার সময় কি তবে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না "আসার সময় তোর জন্য কি নিয়ে আসবো রে ছুটকি?"
কেউ কি আর মজার মজার জোক্স বলে হাসাবে না? খুশির মুহুর্তে কেউ কি আর হাত ধরে নাচবে না?
কেউ কি আর বাড়িটা মাথায় করে রাখবেনা? মন খারাপের দিনে হুট করেই উদ্ভট সব কান্ডে চমকে দেবে না?
বাড়িটা কি তবে নিঃস্ব হয়ে যাবে? না থাকবে কোনো হাসি আর না থাকবে কেউ খুশি। সারাটা জীবন তবে অশ্রুপাত করেই কি কাটিয়ে দিতে হবে আমাদের?
.
🌸
.
---- ছুটকি.....!!!
.
হঠাৎ সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই চটজলদি মাথা উঁচু করে সচেতন চোখে তাকালাম আমি। মাথায় ব্যান্ডেজ তার একপাশে জমাট বাঁধা রক্ত, পায়ের হাটুতে প্যান্টের ছিঁড়ে যাওয়ায় ভেতরের ছিঁলে যাওয়ায় ক্ষতটা স্পষ্ট।
রুশো ভাইয়াকে এই অবস্থায় হেটে আরো দুধাপ এগোতে দেখেই হুশ ফিরলো আমাদের। নাহ! এটা কোনো স্বপ্ন নয়, এ বাস্তব! ছেড়ে যায়নি রুশো ভাইয়া আমাদের।
.
রুশো ভাইয়াকে দেখে সবাই যে যার স্থান ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। নীবিড় ভাইয়া অবাক হয়ে হাতের বাঁধন আলগা করতেই আমি এক ছুটে গিয়ে রুশো ভাইয়াকে ঝাঁপটে ধরলাম। ভাইয়ার বুকে কিল ঘুষি মারতে মারতে অবশেষে কান্নায় ভেঙে পড়লাম আমি। কান্না করতে করতেই বলে উঠলাম,
.
---- তু... তুমি খুব পঁচা রুশো ভাইয়া! এভাবে কেউ ভয় দেখায়? তুমি জানো না আমরা তোমায় কতটা ভালোবাসি? তাহলে কেনো এভাবে আমাদের একলা ফেলে চলে যাওয়ার অভিনয় করলে? জানো দম বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার!
.
রুশো ভাইয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
---- কি বলছিস এসব ছুটকি? এইতো আমি! কোথায় যাবো তোদের ছেড়ে বল? তোদের ছেড়ে কি আমি থাকতে পারবো?
.
এর মধ্যেই আম্মু-আব্বু, খালু-খালামুনি, অগ্নি ভাইয়া-নীবিড় ভাইয়া আর নিত্য আপু আমাদের ঘিরে ধরলো। আমি রুশো ভাইয়াকে ছেড়ে দিতেই খালামুনি রুশো ভাইয়ার গালে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। সবার চোখ থেকেই এতোক্ষণ বেদনার অশ্রু ঝড়লেও এখন তা প্রাপ্তির অশ্রুকণায় পরিণত হয়েছে। খুব কাছের মানুষটাকে হারাতে হারাতে আবারও ফিরে পেয়ে সবার চোখ থেকেই খুশির অশ্রুপাত ঘটছে। এর মাঝেই অগ্নি ভাইয়া রুশো ভাইয়ার এলোমেলো চুলগুলো আরোও একটু এলোমেলো করে দিয়ে অগ্নিমূর্তি রূপ ধারণ করলো। তেড়ে গেলো ভাইয়া সেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটার কাছে। অগ্নি ভাইয়ার পেছনে ছুট লাগালো নীবিড় ভাইয়াও।
.
----- ইউ ইডিয়ট! জিন্দা মানুষটাকে কিভাবে আপনারা মৃত ঘোষণা করেন? জানেন পরিবারের ওপর দিয়ে ঠিক কি পরিমাণ ঝড় বইছিলো? মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলতে আপনাদের লজ্জা করেনা?
.
রিসেপশনের মেয়েটা ভয়ে আঁতকে উঠে আমতাআমতা করে বলে উঠলো,
---- উই আর এক্সট্রেমলি সরি স্যার। কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে মেইবি।
.
বলেই সেই ডক্টরকে ডেকে পাঠালো মেয়েটা। ডক্টর আসতেই অগ্নি ভাইয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
---- আপনারা যে বললেন আমার ভাই এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে? আরে ওইতো আমার ভাই। দিব্যি বেঁচে আছে। কোনোকিছু শিওর না হয়ে একজন জ্যান্ত মানুষকে তার পরিবারের কাছে কিভাবে আপনারা মৃত বলতে পারেন?
.
ডক্টর রুশো ভাইয়াকে দেখে চমকে উঠলেন। বিস্ময়ে বলে উঠলেন,
---- আরে ইনি কেনো ভিক্টিম হতে যাবেন? ইনিই তো ভিক্টিম কে হসপিটালে নিয়ে এসেছেন।
.
তখনই একজন ভদ্রলোক রিসেপশনের সামনে ভীড় জমতে দেখায় এগিয়ে এলেন। আমাদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
---- আপনারা কি আজকের এক্সিডেন্টের ভিক্টিমের বাড়ির লোক? এই ফোনটা এক্সিডেন্ট স্পটে পড়ে ছিলো। আমি ফোনটা তুলে নিয়ে কললিস্টে প্রথম যার নম্বর দেখি তাকেই ফোন করে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু পেশেন্ট তো ট্রিটমেন্টের আগেই মারা গেল।
.
বলেই অগ্নি ভাইয়ার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলেন লোকটি। ফোনটা ভালো করে দেখে নিয়ে ভাইয়া বলোলো,
---- আরে এতো রুশোর ফোন! ওহ গড.....! কি হচ্ছে এসব? এতো কনফিউশন কেনো?
.
রুশো ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাটু চেপে ধরে কয়েকধাপ এগিয়ে গেলো। ফোনটা হাতে নিয়ে লোকটিকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,
---- এই ফোনটা আমার আংকেল। আপনি মেবি আমার ফোনটা পড়ে থাকতে পেয়ে ট্রাক ড্রাইভারের ফোন ভেবে নিয়েছিলেন।
.
রুশো ভাইয়ার কথায় লোকটা অবাক হয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো,
---- তারমানে আপনি ওই গাড়িতে ছিলেন? আর যিনি ট্রাকচালক ছিলো তিনি মারা গেছেন?
.
বিনিময়ে রুশো ভাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
----- জ্বি আংকেল! ট্রাকটা আমার গাড়িতে ধাক্কা মেরে উল্টে ফেলে দিলেও ড্রাইভারেরই মাথায় খুব খারাপ ভাবে চোট লেগেছিলো। আর আমার ফোনটাও তখন আকস্মিক ঘটনায় হাত থেকে পড়ে গিয়েছিলো। আপনি বোধহয় গাড়ির ওমন বাজে অবস্থা দেখে ভেবেছিলেন ভিক্টিম গাড়ির ভেতরে যিনি ছিলো তিনি। বাট একচুয়ালি হয়েছে তার উল্টো। ফোনটা আমার হলেও ভিক্টিম আমি নই।
.
এবার কনফিউশন যেনো আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। মাথার মধ্যে ভনভন করে হাজারো প্রশ্ন জটপাকিয়ে একাকার হতে লাগলো। নীবিড় ভাইয়া অনেক ভেবেও অবশেষে সমীকরণের সমাধান করতে না পেরে প্রশ্ন করলেন,
.
----- তাহলে কিভাবে কি হলো? রুশো ক্লিয়ার করে বলো ফার্স্ট টু লাস্ট!
.
রুশো ভাইয়া সবাইকে শান্ত হতে বলে, জোরে একটা দম ফেলে বলতে শুরু করলো,
----- আজ অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম এমন সময় রাত্রি আমায় কল করে। কল রিসিভ করে ওর গলা শুনেই আমি গাড়ি থামিয়ে ফেলি। এমন সময় ওর কথার মাঝেই একটা ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঠিক আমার দিকেই আসছিলো। সম্ভবত ব্রেক ফেইল করেছিলো। আমি গাড়ি ঘুড়িয়ে তৎক্ষণাৎ সরে যাবো তার আগেই ট্রাকটা সজোড়ে আমার গাড়িতে আঘাত করে, আমি সুযোগ বুঝে গাড়ির দরজা খুলতেই গড়িয়ে এক সাইডে পরে যাই। ঠিক তখনই ফোনটা আমার হাত থেকে পড়ে যায় যতদূর সম্ভব। আর ট্রাকের আঘাতে গাড়ি উল্টে গিয়ে বেশ কিছুদূর গিয়ে থামে। ট্রাকটা বিপরীত দিকে ঘুরে গিয়ে একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায় কিন্তু ভেতরে ভীষণ বাজে ভাবে চোট পায় ট্রাক ড্রাইভার। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে ট্রাকড্রাইভারের কিছু হয়নি যা হওয়ার গাড়ির ভেতরে যে ছিলো তার হয়েছে বাট ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে যাই আর মাথায় গভীর ভাবে চোট লাগায় প্রচুর ব্লিডিং হয় ট্রাক ড্রাইভারের। কথায় আছে না রাখে আল্লাহ মারে কে! আমার কপালে আর হাটুতে চোট লাগে স্রেফ। নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েকজন লোকের সাহায্যে উনাকে তৎক্ষণাৎ হসপিটালে নিয়ে আসি আমি। ট্রিটমেন্টের পেমেন্ট আমি করবো বলেই এডমিট করিয়ে দেই উনাকে। আর আমার ড্রেসিং করিয়ে নেই পাশের কেবিনে। খুব করে প্রে করেছিলাম যাতে উনি বেঁচে যান কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। ট্রিটমেন্ট এর আগেই মারা গেলেন উনি।
.
বলেই ঠোঁট চেপে ধরে চোখ দুটো বুজে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রুশো ভাইয়া। এমন সময় আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সকলেই নিস্তব্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করলাম আমি। হঠাৎ সবার মধ্যে দুজনকে দেখতে না পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অভিমানের পাহাড় যেখানে আকাশ সমান ছিলো বর্তমানে তা শুধুই ধোঁয়াশা! আমি ভুল ছিলাম। ভেবেছিলাম কোথাও না কোথাও ভাইয়ার এক্সিডেন্টের পেছনে রাত্রির দোষ রয়েছে। কিন্তু রাত্রির আদৌ কোনো দোষ নেই। গাড়ি স্থির থাকা অবস্থাতেই এক্সিডেন্টটা ঘটে যেহেতু ট্রাকটা নিয়ন্ত্রণহীন ছিলো।
.
---- আম্মুউউ রাত্রি? ও তো সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলো! কোথায় ও? আর নিত্য আপু?
.
ভেতর থেকে একজন নার্স এসে আম্মুকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
---- একটু আগে যিনি সেন্সলেস হয়ে পড়েন, উনাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে রাখা হয়েছে। এমনিতেই শরীর অনেক দূর্বল ছিলো তার ওপর এতোবড় একটা শক নতে পারেন নি।
.
নার্সকে পাশ কাটিয়ে নিত্য আপু আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
---- রাত্রি ভাবছে রুশো ভাইয়ার এক্সিডেন্ট এর জন্য ও দায়ী তাই সেন্স ফেরা মাত্রই সেই এক কথা বলেই ছোটাছুটি করছিলো। এমন চলতে থাকলে আবারও সেন্সলেস হয়ে যেতো। অনেক বোঝানোর পরও ওর সাথে না পেরে ইঞ্জেকশন দিয়ে শুইয়ে রেখেছি। বাড়ি নিয়ে গিয়ে একেবারে রুশো ভাইয়াকে দেখালেই হয়তো শান্ত হবে ও।
.
নিত্য আপুর কথা নিশ্চিত হলাম আমরা। রুশো ভাইয়া হাটু চেপে ধরে ছুটতে ছুটতে কেবিনে গেলো রাত্রির কাছে। ক্ষনিকের মধ্যেই রাত্রিকে কোলে করে নিয়ে ফিরলো রুশো ভাইয়া। যেখানে এমনিতে হাটতেই ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠছে সেখানে রাত্রিকে কোলে নিয়ে কতো সুন্দর নির্দ্বিধায় এগিয়ে চললো ভাইয়া। এর মধ্যে অগ্নি ভাইয়া বিল পে করিয়ে নিলো। হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে রওনা হলাম আমরা সেই আগের ঠিকানায়। আমাদের বাসভবনে!
.
🍂
.
রাত্রিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে এক নজরে তার মুখখানায় তাকিয়ে আছে রুশো ভাইয়া। যেনো কতোশত দিন তৃষ্ণার্ত ছিলো এই মুখখানা দেখবার জন্য। খুব কম ডোজেরই ইঞ্জেকশন পুশ করায় কিছুক্ষণের মাঝেই জ্ঞান ফেরার কথা রাত্রির। এই মুহুর্তে রুশো ভাইয়া আর রাত্রিকে নিজেদের মধ্যে স্পেস দেওয়া দরকার তাই আমরা বেড়িয়ে এলাম ঘর থেকে। দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। আন্টির নম্বরে কল করে জানিয়ে দিলাম যাতে চিন্তা না করে, রাত্রি এখানেই আছে।
.
কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ পিট পিট করে খুলতেই রুশোকে এক ধ্যানে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এক লাফ মেরে উঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রাত্রি। এভাবে হুট করে জড়িয়ে ধরায় হতভম্ব হয়ে গেলো রুশো। রাত্রি রুশোকে জড়িয়ে ধরেই ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলে উঠলো,
.
---- আ...আপনি ঠিক আছেন রুশো! আ..আমার জন্য আপনার এ..এক্সিডেন্ট হয়েছে! আমি খুনি! আমি মেরে ফেলেছি আপনাকে। আমায় শাস্তি দিন। মেরে ফেলুন আমায়।
.
রুশো বুঝলো রাত্রি তাকে আত্মার সাথে তুলনা করছে মাত্র। ব্যাপারটায় সে নিজেই আহাম্মক হয়ে গিয়েছে রাত্রিকে কি সামলাবে! রুশো জোরে একটা শ্বাস নিলো। সে নিজেও রাত্রিকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে আবদ্ধ করে নিলো। রাত্রির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলো,
.
---- আমি বেঁচে আছি এটম বোম্ব! মরে ভূত হয়ে যাইনি। এতো তাড়াতাড়ি তোমার ভালোবাসা না পেয়েই চলে যাবো ভাবলে কি করে?
.
.
.
চলবে...............💕