🖤 পর্ব_ ৭২ ( দ্বিতীয় অংশ)
শেহেজাদার আদর 🖤
কঠোর ভাবে কপি করা নিষিদ্ধ **
রাতের গভীরতা তখন চৌধুরী ভিলাকে নিঃশব্দতার চাদরে ঢেকে ফেলেছে।চারপাশের সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই। বিশাল ভিলার করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে আছে মৃদু হলুদ আলো। জানালার ওপাশে রাতের বাতাসে গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। চারপাশের এই শান্ত পরিবেশের মাঝেও ইউভির ঘরে তখনও আলো জ্বলছে।ইউভি ইনায়াকে নিজের কোলে বসিয়ে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ইনায়া বেশ কয়েকবার তার বাহুর বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ইউভির শক্ত আলিঙ্গন থেকে মুক্তি পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না।
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ইনায়া ইউভির বুকেই মুখ গুঁজে দিল।
ইউভির এক হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তার স্ত্রীকে। অন্য হাতে ল্যাপটপে কাজ করে চলেছে সে।
ASU Group-এর পাশাপাশি IVA Group-এর দায়িত্বও ইউভির কাঁধে । যদিও IVA Group-এর CEO ইনায়া নিজেই, তবুও ইউভি কোনোভাবেই চায় না তার স্ত্রী অতিরিক্ত চাপ নিক। ইনায়া নিজের কাজ সামলাবে, নিজের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবে—কিন্তু তার ওপর অযথা কোনো চাপ পড়ুক, সেটা ইউভি কখনোই চায় না।
তাই নিজের কাজের পাশাপাশি ইনায়ার কাজেও নিঃশব্দে সাহায্য করে চলেছে সে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইউভির কাজ শেষ হলো।
সে ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে পাশে রাখল। তারপর নিচে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ইনায়ার ঘুমন্ত মুখে।মুহূর্তেই ইউভির বুকের ভেতর দিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি বয়ে গেল। যেন এই নারীটাকে দেখলেই তার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত বিরক্তি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।ইউভি ধীরে ধীরে ঝুঁকে ঘুমন্ত ইনায়ার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল।
তারপর খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল—
— “আমার আদর… তোকে ছাড়া আমি এক ন্যানোসেকেন্ডও থাকার কথা ভাবতে পারি না। আর তুই কিনা একটা পুরো রাত আমাকে ছাড়া থাকার পরিকল্পনা করলি? মিসেস চৌধুরী… এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারলি?
ঘুমন্ত ইনায়া অবশ্য কোনো উত্তর দিল না।
ইউভি কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল সে। পরিস্থিতিটা তার কাছে একটুও স্বাভাবিক লাগছিল না।
তাই আর এক মুহূর্তও দেরি করল না ইউভি।
ঘুমন্ত ইনায়াকে কোলে তুলে বিছানার দিকে নিয়ে গেল সে।বিছানায় গিয়েও ইনায়াকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখল ইউভি। তারপর তার চুলের কাছে মুখ নিয়ে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল।
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “ইশ্… কী মিষ্টি ঘ্রাণ!”
★★**★★
সকালের নরম রোদে চৌধুরী ভিলা ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে।রাতের নিস্তব্ধতা কেটে ভিলার প্রতিটি কোণ ভরে উঠেছে ব্যস্ততায়। বিশাল ডাইনিং হলের টেবিলে তখন পরিবারের সবাই সকালের নাশতা করতে ব্যস্ত লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। অন্যদিকে আয়াত, আতিকা আর রিদও স্কুলে যাওয়ার তাড়ায় ব্যস্ত। বিশেষ করে রিদ আজ ভীষণ ব্যস্ত। কারণ আজ তার ডান্স কম্পিটিশন।
তাই নাশতা খাওয়ার পাশাপাশি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে।ইনায়া আর পিয়াসারও আজ থেকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু। মাঝখানে বেশ কিছুদিনের দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে আজ তাদের ক্লাসে ফিরতে হবে। দুজনেই তাই একসঙ্গে বসে নিজেদের ব্যাগ, ক্লাস আর দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল।
ঠিক তখনই নুসরাত চৌধুরী হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে বললেন,“আচ্ছা, ইউভি আর রেদোয়ান কোথায়? ওরা তো নাশতা না করেই বেরিয়ে গেল!”
রাতিব চৌধুরী শান্ত গলায় বললেম আজ ওদের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। বাইরে নাশতা করে নেবে। তুমি চিন্তা কোরো না।
নুসরাত চৌধুরী একটু চিন্তিত মুখে বললেন,
দুজনই নিজেদের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে এত সিরিয়াস! কিন্তু কাজের চাপে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারে না পিয়াসা তখন ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
বেবি, আজ তো তোরও মিটিং আছে। তার ওপর ক্লাস। এত কাজ একসঙ্গে কীভাবে সামলাবি?
ইনায়া তখন তাড়াহুড়ো করে নাশতা শেষ করতে করতে বলল,
কী আর করব! সবই সামলাতে হবে। তবে এখন চল, আমাদের দ্রুত বের হতে হবে। কথা শেষ করে ইনায়া আর পিয়াসা উঠে দাঁড়াতেই হঠাৎ একজন গার্ড এসে সামনে দাঁড়াল।ম্যাম, ইউভি স্যার আয়াত আর আতিকা মামনিদের জন্য কিছু পাঠিয়েছেন।
কথাটা কানে যেতেই আয়াত আর আতিকা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
— “কী পাঠিয়েছে?”
তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দুজনেই ছুটে গেল গার্ডেনের দিকে।তাদের পেছনে পেছনে বাড়ির প্রায় সবাইও গিয়ে দাঁড়াল।
আর তারপর গার্ডেনের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ছোট্ট গোলাপি রঙের কিউট বাইক দেখে আয়াত আর আতিকা আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
— “হুররররররে!”
দুজনেই খুশিতে লাফাতে লাফাতে বাইকের কাছে ছুটে গেল। তারপর একে একে নিজেদের বাইকে উঠে বসে দুজন একসঙ্গে চিৎকার করে বলল,
থ্যাঙ্ক ইউ, বিগ ব্রো! বাড়ির প্রতিটি সদস্য তাদের আনন্দ দেখে মুচকি হাসল।সাবিহা চৌধুরী মুগ্ধ চোখে বাইক দুটির দিকে তাকিয়ে বললেন,নুসরাত চৌধুরী কে বললো ইউভি ছেলেটা কখনো ক্লান্ত হয় না নাকি? সবদিকেই কীভাবে এত খেয়াল রাখে!”
ইনায়া মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল,
কেন হবে না? আমার কাছে এলেই তো বলে
—‘বড্ড ক্লান্ত লাগছে, বউ… একটু বুকে আয়।’”
কথাটা পিয়াসার কানে যেতেই সে মুচকি হেসে বলল আজ অফিসে বের হবি নাকি আমার ভাইয়াকে গালি দিবি।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে পিয়াসার হাত ধরে টেনে বলল,চল, চল! আমাদের অনেক কাজ। মিটিং প্লাস ক্লাস—আজ কিন্তু একটুও সময় নেই!”
দুজনেই দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
পিয়াসা গাড়িতে উঠতে উঠতে হঠাৎ পিছনে ফিরে বলল আর বেবি কে যে কথা দিলি আজ দেখা করবি ইনায়া চোখ বড়ো করে তার দিকে তাকাল।
— “আজ? এত কাজের মাঝে?”
গাড়িতে উঠে বসে কিছুক্ষণ পর ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,ইশ্! কতদিন হলো মন্টু চাচার দোকানের আইসক্রিম আর চা খাওয়া হয় না! আজ তো একটুও সময় নেই। পিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ গোপনীয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল,
বেবি চল ক্লাস ফাঁকি দিই?ইনায়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
— “কী বললি?”
পিয়াসা মুচকি হেসে আবার বলল,চল, আজ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে । মন্টু চাচার দোকানে যাই।
ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই চকচক করে উঠল।ওহ্ বেবি! কী বলছিস তুই! চল! তারপর একটু থেমে গম্ভীর মুখে বললো তবে তোর ভাইয়াকে জানানো যাবে না।”পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,হুম। একদম না। এরপর পিয়াসা দ্রুত মুঠোফোন বের করে তুবাকে মেসেজ করল মন্টু চাচার দোকানে চলে আয়। আজ ক্লাস করবো না আমরা।
★★**★★
বেশ কিছুক্ষণ পর ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা এসে পৌঁছাল মন্টু চাচার দোকানের সামনে।
কিন্তু দোকানের সামনে এসে তিনজনই থমকে দাঁড়াল।দোকান বন্ধ!তিনজন কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।ইনায়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বন্ধ দোকানটার দিকে তাকিয়ে বলল,“চা গেল কোথায়?”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বলল,সত্যিই তো! এমন দৃশ্য তো জীবনে দেখিনি! তুবা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
মন্টু চাচার দোকান বন্ধ? পিয়াসা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।এই মানুষটা তো ঝড়-বৃষ্টি, তুফান, সাইক্লোন, নারকেল সরু নারগিচ সবকিছুকে উপেক্ষা করে দোকান খোলে! আর আজ দোকান বন্ধ?
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,কিছু একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে হয়তো চার সাথে তুবা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “চল, পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি।”
তিনজন দ্রুত পাশের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
দোকানদারকে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,মন্টু ভাই? আরে, উনি তো তিন দিন ধরে দোকানই খোলেননি! কথাটা শুনে তিনজনের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— “তিন দিন?”
— “জি।”
পিয়াসা চোখ বড়ো করে তাকাল।টানা তিন দিন?”
দোকানদার মাথা নাড়লেন।হ্যাঁ, টানা তিন দিন।”
তুবা ধীরে ধীরে বলল,মন্টু চাচা কী অসুস্থ?”
দোকানদার মাথা নেড়ে বললেন,না তো!”
তিনজন একসঙ্গে বলল,তাহলে?”লোকটি একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে বললেন,তোমরা গিয়ে দেখে আসো ওনার বাড়ির ঠিকানা চাইলে দিতে পারি।”
তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,দেন! এখনই দেন!”কারণ ব্যাপারটা এখন আর সাধারণ মনে হচ্ছে না।মন্টু চাচা তিন দিন দোকান খোলেননি!
---
কিছুক্ষণ পর তিনজন এসে দাঁড়াল পুরান ঢাকার এক পুরোনো একতলা বাড়ির সামনে।
ইনায়া আশেপাশে তাকিয়ে বলল এই বাড়িটাই?”
তুবা ঠিকানা মিলিয়ে মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ, মনে হচ্ছে এটাই। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোককে ইনায়া জিজ্ঞেস করল,ভাই, এটা কি মন্টু চাচার বাড়ি? লোকটি মাথা নেড়ে বলল,জি।”
তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল।তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দুপুরের খাবার খাওয়ার পর মন্টু চাচা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।ইনায়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল,
— “মন্টু চাচা… ও মন্টু চাচা…”ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না।পিয়াসা ইনায়ার কনুইয়ে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,আরও সুন্দর করে ডাক। ইনায়া গলা পরিষ্কার করে এবার মিষ্টি করে ডাকল,
— “মন্টু চাচা… ও মন্টু চাচা
তুবা হঠাৎ ইনায়ার হাত ধরে থামিয়ে দিল।
তারপর চোখ বড়ো বড়ো করে ঘরের দরজার সামনে রাখা জুতোর দিকে ইশারা করল।
মেয়েদের জুতো!ইনায়া জুতোর দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল।তারপর ফিসফিস করে বলল,এই জুতো কারপিয়াসা চোখ কুঁচকে জুতোর দিকে তাকিয়ে বলল,মেয়েদের জুতো তো!”
তুবা রহস্যময় গলায় বলল,“চাচি তো গ্রামের বাড়িতে থাকে, তাই না?ইনায়া ধীরে ধীরে পিয়াসার দিকে তাকাল।তাহলে… এই মহিলা কে?”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে বলল,
— “চাচির সতীন নাকি?”ইনায়া দাত দিয়ে নক কাটতে কাটতে চিন্তা করে বললো মাল টা নতুন বউ পেয়ে তিন দিন রুমের দরজা খোলে না।
তুবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও জোরে ডাকল, “বাবা মন্টু! নাক ডেকে ঘুমিয়ে থেকো না! দোকানে চলো!”ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না।ইনায়াও দরজায় টোকা দিয়ে ডাকল,
“মন্টু চাচা! বাইরে আসো! তিন দিন ধরে অনেক ফাঁকি দিয়েছো। এবার দোকানে চলো!”
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভেতর থেকে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন তাকে দেখে তিনজনই থমকে গেল।
ইনায়া ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে আন্টি ?”ভদ্রমহিলা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “আমি কুদ্দুসের মা... নূরবানু। ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা তিনজনই একসঙ্গে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
ইনায়া ধীরে ধীরে পিয়াসা আর তুবার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কুদ্দুসের মা মন্টু চাচার ঘর থেকে বের হলেন কেন?”
পিয়াসা চোখ বড় বড় করে বলল,
— “সেটাই তো আমিও ভাবছি মনে হয় আমাদের চাচি ”ইনায়া বললো এই সুযোগে চাচাকে একটু মজা দেখিয়ে দেয় তোরা শুধু আমাকে সাপোর্ট কর।
ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে মন্টু চাচা বেরিয়ে এলেন। চোখে তখনও ঘুম লেগে আছে। এক হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে তিনজনকে দেখে তিনি হেসে উঠলেন, “আরে! আমার তিন শালিক যে! তাই তো বলি, কিচিরমিচির করে কারা এত ডাকাডাকি করতেছে!”পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “মন্টু চাচা, দোকান খোলেন না কেন? তিন দিন ধরে দোকান বন্ধ! দোকানে চলুন, ভীষণ গরম পড়েছে। চা খেতে হবে।”মন্টু চাচা তাড়াতাড়ি বললেন, “আরে ঘরে আসো। আমি এক্ষুনি চা বানাইয়া দিতেছি।”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না চাচা, দোকানে চলো। ভুলে গেছো? চায়ের সঙ্গে আইসক্রিমও লাগবে!”
মন্টু চাচা তিনজনের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে বললেন, “আচ্ছা, আচ্ছা! চলো। তারপর হঠাৎ নূরবানুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “শালিকেরা, দেখো তো তোমাদের চাচি! তুবা বললো তোমার বউ বুঝি মন্টু চাচা হেসে বললো হ্যাঁ মা আমার বউ। পিয়াসা বললো কেমন বউ চাচা মন্টু চাচা হেসে বললো আমার আপন বউ
ইনায়া কোনো কিছু না ভেবেই মুখ ফসকে বলে ফেলল,
“হ্যাঁ, দেখছি। তবে কুদ্দুসের মায়ের থেকে আমাদের আগের চাচিই ভালো ছিল!”
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।নূরবানু ধীরে ধীরে চোখ বড় বড় করে মন্টু চাচার দিকে তাকালেন।মন্টু চাচার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— “না মানে ইনায়া মা, তুমি এইডা কী কইলা?”
“কেন? আগের চাচি তো ভালোই ছিল!”মন্টু চাচা ভয়ে ঘামতে লাগলেন নিচু সুরে বললো আগের চাচি মানে ইনায়া পালটা উত্তর দিলো ওই যে... মনে নাই? আমাদের আগের চাচি! ওইটা ভালো ছিল, কী বলিস তোরা?”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— “হ্যাঁ, । কী সুন্দর ছিল জানেন না, কুদ্দুসের মা?”
নূরবানুর চোখ আরও বড় হয়ে গেল।
পিয়াসা আবার বললো এক কথায় অসাধারণ! শুধু দাঁতগুলো একটু মুলোর মত বড় বড় আর সাদা ছিল মন্টু চাচা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
— “আহারে আল্লাহ! পিয়াসা আবার বলল,আর চুলগুলোও সাদা ছিল। ঠিক মন্টু চাচার চুলের মতো। দেখতে রাস্তার পাগলের মত মনে হলেও মানুষটা অনেক সুন্দর ছিল
তুবা এবার গম্ভীর মুখে বলল,
— “যাই হোক, চাচা, আমরা দোকানে যাচ্ছি। আপনি আসছেন তো?ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা কথা বলতে বলতে হাঁটা শুরু করে দিল।
পেছনে দাঁড়িয়ে মন্টু চাচা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,ওই ইনায়া মা! সত্যি কথা কইয়া যাও মা! নাইলে আমার কপালে কষ্ট আছে!।তিনজে থামল না বরং হাটার গতি আরো বেড়িয়ে দিল মন্টু চাচা আরও জোরে চেঁচিয়ে বললেন,
এই যে তোমাদের চাচি! আমার আর কোনো বউ নাই! সত্যি কইতেছি! ইনায়া মা, সত্যি কইয়া যাও!”
ইনায়া এবার পেছনে ফিরে তাকাল।
— “না চাচা! আমাদের এই চাচি ভালো আছেন। আগের চাচির মতো না!”
মন্টু চাচা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
ইনায়া আবার বলল,আর আপনাকে মারবে ও না। আপনি আসেন!”কিন্তু কে শোনে কার কথা!
মন্টু চাচার গলা শুকিয়ে কাঠ।তিনি নূরবানুর দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে বললেন,
— “নূরবানু... বিশ্বাস করো, আমার একটাই বউ তুমি! আল্লাহর কসম, আর কোনো বউ নাই!”
নূরবানু কোনো কথা না বলে শুধু চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলেন।
*★
ASU গ্রুপের বিশাল অফিসরুমে তখন বিরাজ করছে গভীর নীরবতা।কাঁচঘেরা বিশাল জানালার ওপাশে শহরের ব্যস্ততা চোখে পড়লেও ঘরের ভেতরের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। টেবিলের এক পাশে বসে ইউভি আর রেদোয়ান নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং নিয়ে আলোচনা করছিল।ঠিক তখনই ইউভির ফোনটা বেজে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই ইউভির দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।ইউভি সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল।
ওপাশের ব্যক্তির কথা রেদোয়ান শুনতে পেল না। শুধু ইউভির শান্ত কণ্ঠস্বরটুকুই শোনা গেল—
Okay. I’m looking into it.”
কথাটা বলেই ইউভি কল কেটে দিল।
তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে নুসরাত চৌধুরীকে ফোন করল মেঝো মা আদর আর বোনু কোথায়? ওপাশ থেকে নুসরাত চৌধুরীর স্বাভাবিক কণ্ঠ ভেসে এল,ওরা তো ভার্সিটিতে গেছে। কেন?”
ইউভি আর কোনো কথা বলল না।সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিল।
তারপর রিটার সাথে কথা বলে কিছু একটা শিওর হয়ে ইনায়ার নম্বরে ফোন করল।কিন্তু কোনো উত্তর এল না।রাগে ইউভির কপালের শিরা গুলো ধীরে ধীরে ফুলে উঠল।রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “কী হয়েছে?”ইউভি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। আবার ইনায়াকে ফোন করল।এবারও কোনো সাড়া নেই।এদিকে পিয়াসাকেও একাধিকবার ফোন করা হলো। কিন্তু ইনায়ার মতো পিয়াসাও ফোন ধরল না।ইউভির ধৈর্যের বাঁধ ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল।শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না দেখে সে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,তোর বোনকে ফোন দে।”রেদোয়ান কিছুটা অবাক হলেও ইনায়া কে কল না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পিয়াসাকে ফোন করল।কয়েকবার রিং হওয়ার পর অবশেষে পিয়াসা ফোন ধরল।
— “হ্যালো?”রেদোয়ানের কণ্ঠ এবার বেশ কঠিন শোনালো কোথায় তোমরা?”পিয়াসা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।তারপর আমতা আমতা করে বলল,
কেন? ভার্সিটিতে তে রেদোয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।সত্যি কথা বলো।”পিয়াসা চুপ করে রইলো
রেদোয়ান এবার আরও ঠান্ডা গলায় বলল,
— “তোমরা ভার্সিটিতে নেই—এই খবর আমরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছি। আর রিটার র সঙ্গে কথা বলেও সব জেনে গেছি তোমরা IVA গ্রুপ এ নাই
কথাটা শুনতেই পিয়াসার মুখ শুকিয়ে গেল।
সে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
ইনায়া তখন অস্বস্তিতে নিজের হাতের আঙুল কামড়াচ্ছে।।তারপর পিয়াসাআবার তুবার দিকে তাকাল তিনজনের মুখেই তখন ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক।ঠিক সেই মুহূর্তে ওপাশ থেকে রেদোয়ান এর কঠিন গলা শোনা গেল তোমরা সত্যি কথা বলো। কোথায় গেছো? পিয়াসা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বাইরে থেকে তন্ময়ের গলা ভেসে এল—
এই! তোমরা এখানে? আজ ভার্সিটিতে যাওনি কেন?পিয়াসা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— “তন্ময়! তুমি এখানে? কথাটা শোনামাত্র রেদোয়ানের ফোনের ওপাশে নেমে এল অদ্ভুত নীরবতা।কারণ ফোনটা তখন স্পিকারে ছিল।
আর ইউভি সব শুনছিল একটা কথাও তার কান এড়ায়নি।পরের মুহূর্তেই
ইউভি টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা তুলে সজোরে ছুড়ে মারল।কাঁচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।রেদোয়ান চমকে উঠে বলল সাবধান ভাইয়া কি করছো তুমি
ইউভি গর্জে উঠে বলল
— “ফোন রাখ!”
চলবে......................
®️ সুমাইয়া ইসলাম নূর