#crown_of_shadows
#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
পর্ব
পরদিন সকাল।
মির্জা ভিলার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম পরোটা আর কফির মৌ মৌ গন্ধে পুরো বাড়িটা মুখর হয়ে উঠেছে।
নাইরা ঘুম থেকে উঠতেই বুঝতে পারল, আজ তার জেট ল্যাগের ক্লান্তিটা অনেকটাই কেটে গেছে। জানালার ভারী পর্দাটা একপাশে সরিয়ে বাইরে তাকাতেই রোদে ভেজা সবুজ বাগানটা চোখে পড়ল।
সে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো।
ডাইনিং টেবিলে ততক্ষণে প্রায় সবাই জমে গেছে। আয়ান ফোনে কিছু একটা দেখতে দেখতে ভীষণ ব্যস্ত, যমজ দুজন বরাবরের মতো নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করছে, আর জায়ান শান্ত ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে।
নাইরা চুপচাপ গিয়ে খালি একটা চেয়ার টেনে বসল।
ঠিক তখনই কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো ইহান।
কালো টি-শার্ট আর হালকা ধূসর ট্রাউজার্স পরা, চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে। তাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গত রাতে অনেকটাই দেরি করে ঘুমোতে গিয়েছিল সে।
নাইরার অজান্তেই মনটা মুহূর্তের জন্য গত রাতের লাইব্রেরির সেই শান্ত দৃশ্যটায় ফিরে গেল। সে দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
জায়ান অবশ্য নাইরার এই ছোট পরিবর্তনটুকু খেয়াল করে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসল।
ইহান এসে ডাইনিং টেবিলের ঠিক নাইরার মুখোমুখি চেয়ারটায় বসল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো তাদের মাঝে।
তারপরই আয়ান হাত বাড়িয়ে নাটকীয় গলায় বলে উঠল—
— “গুড মর্নিং, ব্যারিস্টার সাব!”
ইহান কফির কাপটা নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে একদম শান্তভাবে জবাব দিল—
— “গুড মর্নিং।”
যমজদের একজন হঠাৎ কৌতুহল নিয়ে বলে উঠল—
— “ইহান ভাইয়া, আপনি আর নাইরা আপু ছোটবেলায় সারাক্ষণ ঝগড়া করতেন, না?”
নাইরা সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল—
— “এই টপিক এখন ব্রেকফাস্ট টেবিলে কেন আসছে?”
জায়ান হাসতে হাসতে যোগ করল—
— “কারণ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিস্টরিক্যাল ইনফরমেশন!”
ফারহান মির্জা হাতের পত্রিকাটা সুন্দর করে ভাঁজ করতে করতে হেসে বললেন—
— “সত্যি বলতে কী, তোদের ওই মিষ্টি ঝগড়াগুলো শুনলে পুরো বাড়িটা একদম জমে যেত।”
নাইরা খানিকটা বিরক্ত হয়ে জুসের গ্লাসে চুমুক দিল।
ইহান এবার গম্ভীর কিন্তু শান্ত স্বরে বলল—
— “এখনও খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে তো মনে হয় না।”
নাইরা একজোড়া সরু ভ্রু তুলে তাকাল।
— “মানে?”
— “তুই এখনও আগের মতোই কথায় কথায় রেগে যাস।”
জায়ান মুখ চেপে চাপা হাসি দিল।
নাইরা চোখ সরু করে শোধ নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল—
— “আর আপনি এখনও অযথা মানুষকে অবজার্ভ করতে খুব পছন্দ করেন।”
ইহান এবার আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু নীরব থেকে কফিতে একটা ছোট চুমুক দিল।
এই ছোট্ট নিঃশব্দ মুহূর্তটা যেন আবারও দুজনকে গত রাতের লাইব্রেরির সেই নির্জন পরিবেশটার কথা মনে করিয়ে দিল।
আফরোজা মির্জা গরম গরম পরোটার থালাটা টেবিলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন—
— “আচ্ছা, আজ তোদের কারো কি বাইরে কোনো কাজ আছে?”
জায়ান বলল—
— “হ্যাঁ মা, আমার অফিসে যেতে হবে।”
ইহানও হালকা মাথা নাড়ল।
— “আমারও কোর্ট আর কিছু ক্লায়েন্ট মিটিং আছে।”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে নাইরার দিকে ফিরে বলল—
— “আপু, তোমার প্ল্যান কী?”
নাইরা একটু চিন্তা করে বলল—
— “আজ বাসাতেই থাকব। কতদিন পর এলাম, সবাইকে একটু সময় দিতে ইচ্ছে করছে।”
শাহরিয়ার মির্জা সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন—
— “হ্যাঁ, সেটাই ভালো সিদ্ধান্ত।”
ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার পর সবাই ধীরে ধীরে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে যার যার কাজের দিকে চলে গেল।
নাইরা টেবিল থেকে নিজের কফি মগটা হাতে নিয়ে দোতলার বারান্দার দিকে হাঁটছিল। ঠিক তখনই ইহান তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য থামল।
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা।
তারপর খুব সহজ আর স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল—
— “গত রাতের বইটা শেষ করেছিস?”
নাইরা সামান্য অবাক হলো। তবে পরক্ষণেই হালকা হেসে জবাব দিল—
— “না, শেষ করা হয়নি। তবে মনে হয় আজ পড়ে শেষ করে ফেলব।”
ইহান শুধু একবার মাথা নাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
নাইরা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
কথাটা খুবই সাধারণ ছিল, আড়ম্বরহীন।
তবু মনের গহীনে অদ্ভুত এক অনুভূতি দোলা দিল—
তাদের দুজনের মাঝে এতদিন ধরে জমে থাকা বরফ আর অচেনা দূরত্বটা যেন ধীরে ধীরে, একদমই অজান্তে গলতে শুরু করেছে।
(চলবে…)