#crown_of_shadows
#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
Part 15
মির্জা গ্রুপের বহুতল স্কাইস্ক্র্যাপার ভবনের পঁচিশ তলায় অবস্থিত আভিজাত্যপূর্ণ বিশাল বোর্ড রুমে তখন এক অত্যন্ত থমথমে, গম্ভীর ও ভারী নীরবতা বিরাজ করছিল। কাঁচের বিশালাকার দেয়াল ভেদ করে ঢাকার বিকেলের রক্তিম রোদ এসে পড়েছে নিখুঁত পলিশ করা মেহগনি কাঠের দীর্ঘ কনফারেন্স টেবিলের ওপর। ঘরের শেষ মাথায় টাঙানো হাই-ডেফিনিশন প্রজেক্টর থেকে দেয়ালে ভেসে উঠছিল একের পর এক জটিল ফাইনান্সিয়াল চার্ট, আন্তর্জাতিক শিপমেন্টের জটিল সময়সূচী, ট্যাক্স ডকুমেন্টেশন আর বিভিন্ন ফরেন ব্যাংক ট্রানজ্যাকশনের পরিসংখ্যান।
নাইরা অত্যন্ত শান্ত ও মার্জিত ভঙ্গিতে জায়ানের ঠিক পাশের নরম চামড়ার এক্সিকিউটিভ চেয়ারটিতে বসে ছিল। তার প্রখর ও মনযোগী নজর প্রজেক্টরের প্রতিটা স্লাইড আর সামনে ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্রের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছিল। জীবনের প্রথমবার কর্পোরেট জগতের এই চরম পেশাদার ও হিসেবি পরিবেশ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে তার মস্তিষ্কে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের এক স্পষ্ট তুলনা ভেসে উঠল। হসপিটালের কনফারেন্স রুম আর এই বিশাল বিজনেস সাম্রাজ্যের পাওয়ারফুল বোর্ড রুমের মধ্যে মূল তফাতটা আজ তার কাছে একদম পানির মতো পরিষ্কার।
ওখানে সাদা অ্যাপ্রন পরা ডাক্তাররা একজোট হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাকুল আলোচনা করে কীভাবে একটা মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানো যায়, একটা স্পন্দন থমকে যাওয়া হৃদয়কে আবার সচল করা যায়।
আর এখানে কোটি টাকার সুট-টাই পরা এক্সিকিউটিভরা বরফের মতো ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত হিসেব কষে সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করা যায়, বাজার দখল করা যায় আর আন্তর্জাতিক প্রভাব বজায় রাখা যায়।
কনফারেন্স টেবিলের ঠিক উল্টো পাশে হেলান দিয়ে বসে ইহান একটা কালো ফোল্ডারের লিগ্যাল ডকুমেন্টের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল। তার পরনে থাকা ক্লাসি ট্রিমড ফর্মাল ব্ল্যাক সুট, রেনল্ডস ওয়াচ আর থমথমে চেহারায় তাকে আজ যেন মির্জা ভিলার সেই পরিচিত ইহানের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক ব্যক্তিত্ব বলে মনে হচ্ছে। প্রখর ফোকাসড, অপ্রতিরোধ্য, বিচক্ষণ আর অদ্ভুত এক ডমিনেন্টিং ক্ষমতার মালিক সে।
মিটিং চলার প্রায় এক ঘণ্টা পর হঠাৎ একজন প্রবীণ ডিরেক্টর প্রজেক্টরের ডেটার দিকে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে অত্যন্ত দুশ্চিন্তার সুরে বলে উঠলেন—
— “ইফ দ্য কার্ডিয়াক ইকুইপমেন্ট শিপমেন্ট অ্যারাইভস আফটার দ্য এইটটিনথ, তাহলে কিন্তু আমাদের পুরো নিউ হসপিটাল উইংয়ের ইনস্টলেশন প্রসেস মারাত্মকভাবে ডিলে হয়ে যাবে। কিন্তু ওদিকে সাপ্লায়ারদের অ্যাডভান্স পেমেন্ট অলরেডি রিলিজ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে এই বিশাল ফাইনান্সিয়াল লস এভয়েড করার সবচেয়ে বেস্ট অপশন কী হতে পারে?”
কথাটা শেষ হতেই পুরো কনফারেন্স রুমে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক ভারী ও দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এল। সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রবীণ ডিরেক্টর ও ম্যানেজার নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে জটিল আর্থিক হিসেব, পেনাল্টি ক্লজ আর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করলেন।
নাইরা এতক্ষণ একদম নীরব দর্শক হয়ে পুরো আলোচনা শুনছিল। কিন্তু ডিরেক্টরের মুখ থেকে “কার্ডিয়াক ইকুইপমেন্ট” শব্দটা শুনতেই তার ভেতরের পেশাদার মেডিকেল মাইন্ড আর প্রখর মনোযোগ শতভাগ সক্রিয় হয়ে উঠল। সে সামনে রাখা প্রিন্টেড প্রজেক্ট রিপোর্টের পাতাগুলোর দিকে কয়েক সেকেন্ড গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। সেখানে থাকা ইকুইপমেন্টের লিস্ট আর টাইমলাইন দ্রুত মেলালো।
তারপর অত্যন্ত ধীর, পরিষ্কার ও আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল—
— “এক্সকিউজ মি…”
হঠাৎ এমন এক অনভিজ্ঞ ও নবাগত তরুণীর স্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনে ঘরের সবাই একসাথে অবাক হয়ে তার দিকে মুখ ফেরাল। জায়ানও কিছুটা চমকে গিয়ে বোনের দিকে তাকাল।
নাইরা টেবিলের ওপর হাত দুটো হালকা রেখে খুব শান্ত ও সোজা ভঙ্গিতে বলল—
— “শিপমেন্ট যদি কোনো কারণে পোর্ট বা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে আটকে যায়, তাহলে পুরো হসপিটালের ইকুইপমেন্ট ইনস্টলেশন একসাথে আটকে না রেখে ফেজ-ওয়াইজ বা ধাপে ধাপে করা যেতে পারে।”
প্রবীণ ডিরেক্টর তার কথা শুনে বেশ কৌতূহল নিয়ে চশমাটা ঠিক করে নিয়ে শুনতে লাগলেন।
নাইরা এবার তার নিজস্ব ডাক্তারি অভিজ্ঞতা আর প্র্যাকটিক্যাল নলেজ থেকে বিষয়টাকে আরও সহজ করে বুঝিয়ে বলল—
— “আইসিইউ সাপোর্ট সিস্টেম আর কার্ডিয়াক মনিটরিং ইউনিট যদি প্রথম লটে ইনস্টল করে ফেলা যায়, তাহলে হসপিটালের মূল ক্রিটিক্যাল আর ইমার্জেন্সি বিভাগগুলো আংশিকভাবে হলেও তাৎক্ষণিক চালু করা সম্ভব। এতে কোটি কোটি টাকার ইম্পোর্টেড ইকুইপমেন্টগুলো অকেজো হয়ে পোর্টে বা গোডাউনে ফেলে রাখতে হবে না, অপারেশনের কাজও থামবে না এবং একই সাথে কোম্পানির ওপর থাকা ফাইনান্সিয়াল প্রেসারও এক ধাক্কায় অনেকটা কমে আসবে।”
নাইরার সুচিন্তিত ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা শেষ হতেই পুরো বোর্ড রুম একমুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
জায়ান, ইহান, শাহরিয়ার মির্জা, ফারহান মির্জা—মির্জা পরিবারের প্রতিটি প্রধান সদস্য এবং প্রবীণ ডিরেক্টররা পরম বিস্ময় আর শ্রদ্ধার চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
প্রবীণ ডিরেক্টর দ্রুত নিজের প্যাডে নাইরার দেওয়া আইডিয়া অনুযায়ী কয়েকটি খসড়া নোট মেলালেন। তারপর ধীরে ধীরে তার চিন্তিত ও গম্ভীর মুখে এক প্রশান্তির বিস্তৃত হাসি ফুটে উঠল।
— “দ্যাট অ্যাকচুয়ালি সলভস দ্য এন্টার শিডিউলিং অ্যান্ড লজিস্টিক ইস্যু!”
তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ও প্রফুল্ল গলায় বললেন—
— “থ্যাংক ইউ সো মাচ, ডক্টর নাইরা। আপনি মেডিকেল সাইডের এই প্র্যাকটিক্যাল সলিউশনটা পয়েন্ট আউট না করলে হয়তো আমরা প্রজেক্টের এই বিশাল লস আর সময়ের অপচয় এড়াতেই পারতাম না!”
নাইরা ঘরের প্রতিটি মানুষের নজর নিজের ওপর অনুভব করে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো, কিন্তু নিজের ভেতরের জন্মগত আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে শান্তভাবে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
জায়ান পাশে একটু হেলে এসে চাপাহাসি দিয়ে ফিসফিস করে বোনের কানে বলল—
— “আই মাস্ট সে, তুমি তো শুরুতেই সবাইকে চমকে দিলে! ফাইনালি, ওয়েলকাম টু দ্য কর্পোরেট জঙ্গল, ডক্টর নাইরা মির্জা!”
নাইরা তার কনুইতে আলতো করে এক গুঁতা মেরে নিজের ভেতরের হাসি চেপে রাখল।
অন্যদিকে টেবিলের একদম অপর প্রান্তে বসে থাকা ইহান প্রথমবার খুব গভীর ও জটিল দৃষ্টিতে নাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার তীক্ষ্ণ চোখে স্পষ্ট চমক আর অন্যরকম এক মূল্যায়নের ছাপ। সে মনে মনে উপলব্ধি করল, নাইরা কেবল আবেগপ্রবণ বা জেদী মেয়ে নয়—যেকোনো জটিল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে মাথা অত্যন্ত ঠান্ডা রেখে নিখুঁত প্র্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক অসাধারণ দক্ষতা ও ক্ষুরধার বুদ্ধি তার রক্তে লুকিয়ে আছে।
মিটিং শেষ হতে হতে আরও প্রায় আধঘণ্টা সময় পার হয়ে গেল। বোর্ড রুমের সব এজেন্ডা শেষ হতেই ডিরেক্টররা একে একে ফাইলপত্র গুটিয়ে কুশল বিনিময় করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই জায়ান একটা অত্যন্ত জরুরি আন্তর্জাতিক ফোন কল পেয়ে নাইরাকে কিছু সময় দাঁড়াতে বলে হাত ইশারায় বাইরে চলে গেল।
নাইরা বিশালাকার খালি হয়ে আসা বোর্ড রুমটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশটা অনুভব করার চেষ্টা করছিল। কাঁচের বিশাল দেয়ালের ওপারে পুরো ঢাকা শহর বিকেলের আবছায়ায় ধূসর হয়ে আসছে, আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা।
ঠিক তখনই তার চঞ্চল দৃষ্টি গিয়ে পড়ল টেবিলের একদম শেষ কোণে নিঃসঙ্গভাবে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দেওয়া একটা ঘন কালো ফাইলের ওপর।
ফাইলটার ডার্ক কাভারের ওপর স্পষ্ট আর বড় বড় লাল অক্ষরে এমবস করে লেখা—
CONFIDENTIAL
নাইরার ভেতরের সুপ্ত কৌতূহলটা মুহূর্তে প্রবল হয়ে জেগে উঠল। সে মনে মনে একবার দ্বিধায় পড়ল—‘কারোর ব্যক্তিগত বা কোম্পানির গোপন ফাইল এভাবে স্পর্শ করা কি ঠিক হবে?’
কিন্তু ফাইলটার সেই লাল কালির লেখাটা অদ্ভুত এক রহস্যময়তায় তার দৃষ্টি আর মনকে টানছিল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল, চারপাশে কেউ নেই নিশ্চিত করে ফাইলটা হাতে নিল এবং চামড়ার কাভারটি খুলল।
ভেতরে চোখ বোলাতেই তার কপাল কুঁচকে গেল, চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। সেখানে কয়েকটা বেশ পুরনো শিপমেন্ট ডকুমেন্ট, কিছু কোডেড ফরেন ট্রানজ্যাকশন আইডি, আর একটা অচেনা অফশোর শেল কোম্পানির নাম লেখা। শুধু তাই নয়, বেশ কিছু নির্দিষ্ট বড় অংকের পেছনের হিসেব আর নামের পাশে লাল কালি দিয়ে অদ্ভুত ও রহস্যময় সব চিহ্ন এঁকে রাখা হয়েছে।
নাইরা প্রখর মনোযোগ দিয়ে পেপারগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর অর্থ বোঝার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক শান্ত, নিচু কিন্তু অত্যন্ত গম্ভীর ও শাণিত গলা ঘরের বাতাসে প্রতিধ্বনি করে উঠল—
— “ওটা তোর দেখার কথা নয়, নাইরা।”
নাইরা ভয়ে চমকে উঠে দ্রুত পেছনে ঘুরে দাঁড়াল।
বোর্ড রুমের বিশাল ও ভারী মেহগনি দরজার পাশে দু হাত পকেটে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইহান। তার চোখের দৃষ্টি এবার আগের মতো শান্ত বা স্বাভাবিক নয়—বরং অস্বাভাবিক রকমের সতর্ক, কঠোর আর তীক্ষ্ণ।
নাইরা নিজের নার্ভাসনেস সামলে নিয়ে দ্রুত ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
— “আমি... আমি আসলে ইচ্ছে করে দেখিনি। সামথিং ইম্পরট্যান্ট মনে হলো তাই অনায়াসে চোখ চলে গিয়েছিল...”
ইহান ধীর ও মাপজোখ করা পায়ে এগিয়ে এসে ফাইলটা নিজের শক্ত হাতে তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড সে একভাবে নাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে কিচ্ছু বলল না। ঘরটাতে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক টানটান উত্তেজনা তৈরি হলো। তারপর সে নিচু কিন্তু পেশাদার গলায় বলল—
— “মির্জা গ্রুপের এমন কিছু অতি-সংবেদনশীল ডকুমেন্টস থাকে, যেগুলো দেখার বা জানার পারমিশন শুধু নির্দিষ্ট কিছু অথরাইজড মানুষেরই থাকে।”
নাইরা নিজেকে কিছুটা অপরাধী মনে করে লজ্জিত ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নিল।
— “আই আম রিয়েলি সরি, ইহান। আমার ভুল হয়েছে।”
ইহানের মুখের কঠোর ও সতর্ক ভাবটা নাইরার এমন সোজা আর আন্তরিক সরি শুনে কিছুটা শিথিল ও নরম হলো। সে ফাইলটা বুকের সাথে চেপে ধরে ধীর গলায় বলল—
— “আমি তোকে বকা বা দোষ দিচ্ছি না, নাইরা। শুধু এই জটিল জগতটার ছায়া আর গভীরতার ব্যাপারে সতর্ক করছি।”
নাইরা এবার নিজের কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে তার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে প্রশ্ন করল—
— “একটা সাধারণ বিজনেস বা ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট ফাইল নিয়ে এত গোপনীয়তা আর কনফিডেন্সিয়ালিটির কী থাকতে পারে, ইহান?”
ইহান কয়েক সেকেন্ড একদম নীরব ও নিস্পৃহ থেকে নাইরার কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব সংক্ষিপ্ত, গম্ভীর ও ভারী গলায় জবাব দিল—
— “কারণ বিজনেসের আসল জগতটা হসপিটালের মতো অতটা সহজ, সোজা আর আলোয় ভরা নয়, নাইরা। এখানে ফ্রন্টস্টেজের চকচকে পারফরম্যান্সের চেয়ে ব্যাকস্টেজের অদৃশ্য খেলাগুলো অনেক বেশি ভয়ংকর আর অন্ধকার।”
কথাটা শেষ করেই ইহান ফাইলটা নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে আর একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দীর্ঘ পদক্ষেপে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল।
নাইরা সম্পূর্ণ একা সেই বিশাল বোর্ড রুমে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তার মস্তিষ্কে আর ভাবনায় ইহানের শেষ কথাগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। একটা অর্ডিনারি ইকুইপমেন্ট বা কোম্পানির শিপমেন্ট ফাইল নিয়ে ইহান এত বেশি ওভার-প্রোটেক্টিভ, গম্ভীর আর সতর্ক কেন হলো? কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে ওই লাল চিহ্ন দেওয়া নামগুলোর পেছনে?
কিছুক্ষণ পর জায়ান নিজের ফোন কল শেষ করে হালকা মেজাজে রুমে ফিরে এল।
— “কী রে নাইরা? অনেক বোর হয়ে গেছিস তো? চলো এবার নিচের লবির দিকে যাওয়া যাক।”
নাইরা নিজের ভেতরের মানসিক তোলপাড় আর হাজারো প্রশ্নের ঝড় লুকিয়ে ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
— “হুম, কিছুটা বোরিং তো বটেই। তবে নতুন অভিজ্ঞতার জন্য মন্দ না।”
জায়ান হেসে উঠে তার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বলল—
— “তোমাকে তো আগেই ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম বোন, দিস ইজ আ রিয়েল অ্যান্ড ডেঞ্জারাস জঙ্গল!”
নাইরা মুখে একটু কৃত্রিম ও বাধ্য হয়ে হাসি ফোটালেও, তার মন ও চিন্তা তখনও সেই গোপন কনফিডেন্সিয়াল ফাইলের ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা সংকেত আর রহস্যে আটকে রইল।
অফিসের মূল গ্র্যান্ড লবি পার হয়ে গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় নাইরা শেষবারের মতো অদ্ভুত এক টানে পেছনে ফিরে তাকাল। বহু দূরে দোতলার বিশাল কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ইহান কারোর সাথে ফোনে অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠোর ভঙ্গিতে কথা বলছে, আর তার অপর হাতে তখনও শক্ত করে ধরা সেই রহস্যময় কালো ফাইলটা।
আর জীবনের প্রথমবারের মতো নাইরার মনের গহীন কোণে খুব স্পষ্ট, তীব্র ও সত্য একটা অনুভূতি জেগে উঠল—
এই বিশাল, ক্ষমতাশালী ও উজ্জ্বল মির্জা গ্রুপের চকচকে আলোর আড়ালে অন্ধকার এমন কিছু গভীর ঐতিহাসিক রহস্য ও সত্য লুকিয়ে আছে, যা বাইরের কেউ কখনোই দেখতে পায় না... এমনকি হয়তো সে নিজেও না!
(চলবে…)