ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

১ম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্পঃ প্রেমের আলোড়ন

লেখক: এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

~সূচনা পর্ব🥀~

[বিশেষ দ্রষ্টব্য-"এই গল্পটি মূলত গভীর প্রণয় ও সূক্ষ্ম জীবনবোধের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এখানে যেমন ফুটে উঠেছে হৃদয়ের তীব্র রোমান্টিক অনুভূতি, তেমনি সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে কঠোর সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র। আশা করি, অনুভূতির এই বিচিত্র রঙ আপনাদের স্পর্শ করে যাবে।"]

মিউনিখের ঝলমলে পার্টির জমকালো আমেজের মাঝখানেই আচমকা এক নাটকীয় করা ঘটনা ঘটে গেল। সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে সুহানার গালে সপাটে একটা চড় এসে পড়ল। আঘাতের তীব্র চোট আর আকস্মিকতায় ওঁর চোখের চশমাটি মুখ থেকে ছিটকে দূরে কোথাও গিয়ে পড়ল, কোথায় গেল ওঁর জানা নেই। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের আড্ডারত লোকজন তাকে গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে এক মস্ত বড় বৃত্ত তৈরি করে ফেলল। সুহানা তার চশমা ছাড়া চোখের দৃষ্টিতে চারপাশের সবকিছু বড্ড ঝাপসা দেখছে; তাই এই ভরা মজলিশে তাকে চড় মারা সেই চড় দাতার মুখটা সে কোনোভাবেই স্পষ্ট বুঝতে পারছে না।

সে ওখানেই মাটিতে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে আশেপাশের মেঝেটা হাতড়ে হাতড়ে ব্যাকুলভাবে নিজের চশমাটা খুঁজছে সে। ঠিক তখনই একটি মেয়ে ওঁর দিকে ওঁর চশমাটি এগিয়ে দিল। চশমাটা চোখে পরে দ্রুত উঠে দাঁড়াতেই সুহানা দেখল, তার ঠিক সামনে আক্রোশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বিদেশি নারী। যার পরনে একটি গাঢ় নীল রঙের নামী ওয়েস্টার্ন পোশাক, মুখে গাঢ় মেকআপের ছোঁয়া, আর চুলগুলো পরিপাটি করে পনিটেল করে রাখা—জার্মানির মাটিতে এমন গেটআপ অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। মেয়েটি এবার সুহানার দিকে আঙুল উঁচিয়ে নিজের মাতৃভাষা জার্মানে চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করল, যা সুহানা নিজের ভাষাগত দক্ষতার কারণে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হলো, কারণ সে নিজেও জার্মানি বাসিন্দা।

— “পকেটমার! বড়লোকের হাই-প্রোফাইল পার্টি দেখে অমনি চোরের মতো ভেতরে ঢুকে পড়েছিস বল? ভেবেছিলি দামী কিছু চুরি করে সটকে পড়বি, তাই না? এখন থেকে চুরি করে বেরোনো এত সহজ ভেবেছিস? গার্ডস...!”

সুহানা নিজের ভেতরের চরম অপমান আর থমথমে পরিস্থিতিটা কোনোমতে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল — “লিসিন, আপনার কোথাও মস্ত বড় ভুল হচ্ছে। আমি এখানে...”

সুহানা মুখের সম্পূর্ণ কথাটি শেষও করতে পারল না, তার আত্মপক্ষ সমর্থনের আগেই আরও একটি জোরালো চড় সপাটে এসে পড়ল ওঁর অন্য গালে। সুহানা পুরো হতভম্ব হয়ে গেল, ওঁর গাল দুটো অপমানে আর আঘাতে লাল হয়ে উঠল। ঠিক তখনই সেই বিদেশি নারীর ডাকে দুজন বিশালদেহী সিকিউরিটি গার্ড এসে সুহানাকে দু-দিক থেকে শক্ত করে ধরে ফেলল। ওনারা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সুহানার নরম দু-হাতে লোহার ঠাণ্ডা হাতকড়া পরিয়ে দিল এবং ওনাকে জোরপূর্বক আবার ওই মাটির ওপর বসিয়ে দিল।

—"চুরি করে আবার আমায় শেখাতে এসেছিস? তোদের মতো অনেক দেখেছি রে আমি।"

এমিলিয়া নিজের ভেতরের আক্রোশে সুহানাকে আরও একটা চড় মারার জন্য বাতাসে হাত তুলল, ঠিক তখনই এক তীব্র ও বজ্র-কঠিন পুরুষালী হাত মাঝপথেই ওঁর কবজিটা খপ করে চেপে ধরে সেটাকে থামিয়ে দিল। তার হাতের রাশ এতই শক্ত ছিল যে এমিলিয়ার নড়াচড়া করার সাধ্য রইল না।

বাতাসে গমগমে এক ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো — “কী হচ্ছে কী এখানে?!”

আচমকা এই বাধায় এমিলিয়া থমকে গেল। সে ওঁর চড়া, তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে বলল — “ওকে তো আমি জেলেই পাঠাব! পুলিশে দেবো ওকে!”

সেই পুরুষালী কণ্ঠ এবার বড্ড শীতল ও গম্ভীর শোনাল — “মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?”

এমিলিয়া সুহানার দিকে অবজ্ঞার আঙুল উঁচিয়ে বলল — “মানে আর কী! তোর পার্সটা এই মেয়েটাই চুরি করেছে!”

— “হোয়াট... (কী...)!”

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের বাতাস জমে বরফ হয়ে গেল। জাহির ওঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল নিচে মাটির ওপর বসে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটির মুখটা দেখা যাচ্ছে না; ওঁর মাথার রেশমি চুলের অবিন্যস্ত ভারে মুখটা পুরোপুরি ঢেকে গেছে। ওঁর দুটো হাত পেছনের দিকে মোচড় দিয়ে শক্ত করে লক করা, আর একজন বিশালদেহী গার্ড ওঁর কাঁধে নিজের ভারী হাত রেখে তাকে জোর করে চেপে ধরে রেখেছে। মেয়েটির পরনে একটি কালো রঙের ট্রাঙ্ক প্যান্ট, সাথে সাদা রঙের লেডিস টপ আর ওপরে একটি ফুল স্লিভ জ্যাকেট গলানো...। মেয়েটির অবয়ব আর পোশাকের ধরনটা দেখেই জাহির অবাক হলো।

এমিলিয়া ওঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বান্ধবীর দিকে চোখের ইশারা করতেই, সেই মেয়েটি বিন্দুমাত্র দয়ামায়া না দেখিয়ে এক ঝটকায় সুহানার বাদামী রঙের রেশমি চুলগুলো মুঠি করে ধরল। তারপর অবিন্যস্ত চুল ধরে ওঁর মুখটা ওপরের দিকে তুলতেই সামনের অবাধ্য চুলের গোছা ওঁর মুখমণ্ডল থেকে সরে গেল এবং সুহানার পুরো চেহারাটা সবার সামনে দৃশ্যমান হলো।

জাহিরের চোখ সবার আগে গিয়ে পড়ল সুহানার সবুজ রঙের দুটো চোখের দিকে—যা এক নজরেই যেকোনো মানুষের দৃষ্টি টেনে নিতে সক্ষম। এমন নিখাদ গাঢ় সবুজ চোখের মণি সচরাচর দেখাই যায় না। তবে এই মুহূর্তে অন্যায় অপমানে ওঁর সেই চোখের আশপাশটা লালচে হয়ে উঠেছে। অথচ এত অপমানের পরেও তাঁর চোখের গভীর চাহনিতে এক অদ্ভুত শান্ত, গভীর এবং তেজি ভাব স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। সেই চোখ দুটির ঠিক ওপরে রয়েছে ঘন, কালচে এবং সুবিন্যস্ত এক জোড়া ভ্রু, যা তাঁর মুখের গঠনে একটি তীক্ষ্ণ ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছে। ওঁর গায়ের রং বিদেশি নারীদের মতো ধবধবে ফর্সা বা শুভ্র নয়, অন্যদের তুলনায় কিছুটা চাপা; তবে তাকে কোনোভাবেই কালো বলা যাবে না। ওঁর গায়ের গড়ন শ্যামলা থেকে বেশ কিছুটা উজ্জ্বল। সেই উজ্জ্বল ত্বকের কারণে ওঁর হাত আর মুখে একটা সহজাত লালচে আভা খেলা করছে। ওঁর দুই গালে প্রাকৃতিকভাবেই যে লাল আভা থাকে, ভেতরের চেপে রাখা চরম রাগের কারণে এখন সেটা অনেক বেশি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, যা তাঁর ত্বকের সতেজতা ও তারুণ্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওঁর সেই সুন্দর চুলগুলো মেসি বান করে মাথার ওপর আটকানো , যা এখন কিছুটা খসে পড়েছে।

তাঁর নাকটি একদম সোজা এবং তীক্ষ্ণ ‘পেন্সিল নোস’, যা তাঁর পুরো অবয়বকে আরও বেশি স্পষ্ট ও ধারালো করে তুলছে। ঠোঁটের গড়নটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং আকর্ষক; প্রাকৃতিকভাবেই বেরী রঙের সেই ঠোঁট দুটি সামান্য পুরু। তাঁর মুখমণ্ডলের সামগ্রিক গঠনটি একটি হার্ট শেপের মতো। কাচের মতো চকচকে সেই মুখমণ্ডলে কিছুটা তেলতেলে ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে—এই আকস্মিক ধকল আর ঘেমে যাওয়ার কারণে তা আলোয় ঝলমল করছে। ওঁর চোয়ালের হাড় যাকে আমরা জ – লাইন বলে বেশ সুগঠিত অথচ নরম। এই মুখের দিকে তাকিয়ে জাহিরের মনে হলো, মেয়েটি ছোটো, কমবয়সী। ওঁর বুকের ভেতরের নিঃশ্বাসটা এক নিমেষে বড্ড ধিমে আর ভারী হয়ে এলো।

ঠিক তখনই পুরো হলের নিস্তব্ধতা চিরে এমিলিয়া উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করে আদেশ দিল — “কল দা পুলিশ (পুলিশকে ফোন করো)!”

এমিলিয়ার তীক্ষ্ণ চিৎকারে জাহিরের ঘোর ভাঙল। সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুত এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে উঠল। জাহির বলল — “বাদ দে, বাচ্চা মেয়ে! করে ফেলেছে হয়তো ভুল করে... তার হয়তো খুব প্রয়োজন ছিল টাকার।”

এই বলেই জাহির এমিলিয়ার হাত থেকে নিজের পার্সটা এক টানে কেড়ে নিল। তারপর সেই পার্স থেকে গোছা গোছা কিছু অগণিত ইউরোর নোট বার করে ও কুৎসিত অবজ্ঞায় সুহানার দিকে বাড়িয়ে দিল। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিকে তাকিয়ে ওঁর স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল — “লিভ হার (ওকে ছেড়ে দাও)!”

এমিলিয়া এই সিদ্ধান্তে তীব্র বাধা দিতে গিয়ে চিৎকার করে উঠল — “জাহির! তুই থাম তো! এই সব নিচু জাতের চোরদের...”

— “শাট আপ (একদম চুপ কর)!”

জাহির ওঁর বজ্র-কঠিন ধমকে এমিলিয়াকে থামিয়ে দিল। তারপর মাটিতে বসে থাকা সুহানার দিকে সেই টাকার গোছাটা আরও কিছুটা এগিয়ে দিয়ে হুকুমের সুরে বলল — “টেক ইট (এটা নাও)!”

সুহানা ওঁর চড়া আর দয়ার দান দেখতে একবারের জন্যও নিজের চোখ তুলে তাকাল না। তার দৃষ্টি তখনো মাটির দিকেই স্থির হয়ে রইল; কিন্তু ওঁর বাহ্যিক এই শান্ত অবয়বের আড়ালে, ওঁর মস্তকে তখন চলছিল প্রলয়ঙ্কারী বিদ্রোহ। ওঁর আত্মসম্মানে এই অবজ্ঞা তীরের মতো বিঁধেছিল।

সে মাটিতে বসেই গম্ভীর আর তেজি কণ্ঠস্বরে পুরো হলরুম কাঁপিয়ে বলে উঠল — “আপনাদের এই সো-কল্ড স্ট্যাটাসফুল পার্টিতে কি কোনো সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা নেই? সেটা একবার এক্সামিন করলেই তো আমার তথাকথিত অপরাধের আসল প্রমাণ মিলবে! রাইট?”

সুহানার মুখে এমন স্পষ্ট আর ধারালো প্রতিবাদের ভাষা শুনে জাহির মনে মনে কিছুটা চমকে গেল। সে ওঁর দিকে এক পলক তাকিয়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল — “তার মানে তুমি বলতে চাইছ, তুমি এই কাজটি করোনি, তাই তো?”

সুহানা এর প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না, তাচ্ছিল্যের সাথে নীরব রইল। ওঁর এই মৌনতাই যেন ওঁর সুপ্ত অহংকারকে প্রকাশ করছিল। জাহির পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাতের টাকাগুলো আবার নিজের মানিব্যাগে ঢুকিয়ে নিল, তারপর ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকা নিজের বিশ্বস্ত এক লোককে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিল। এমিলিয়া অপমানে আর রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগল; কিন্তু সেখানে জাহিরের একচ্ছত্র উপস্থিতি আর দয়ালু ব্যক্তিত্বের কারণে সে মুখ ফুটে আর নতুন করে কিছু বলতে পারল না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহিরের লোকটি ল্যাপটপে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে হলের মাঝখানে হাজির হলো সেটা কানেক্ট করে দিলো বড়ো প্রজেক্টর এর সাথে। অপমানিত সুহানা ছাড়া হলের ভেতরে উপস্থিত বাকি সবাই কৌতূহল নিয়ে প্রজেক্টর এর দিকে তাকাল।

বড় পর্দায় তখন ফুটেজটি স্পষ্ট ভেসে উঠল:

দেখা গেল, সুহানা নিজের হাতে একটি মাঝারি আকারের পার্সেল বা বাক্স নিয়ে গেটের ভেতরে প্রবেশ করেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে ওঁর ফোন থেকে কাউকে একটা কল করল এবং ঠিক দুই মিনিটের মাথায় পার্টির একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী এসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ওঁর কাছ থেকে সেই বাক্সটি বুঝে নিল। এর পরিবর্তে সেই কর্মীটি সুহানার পারিশ্রমিক টাকাগুলো ওঁর হাতে তুলে দিল। সুহানা মূলত এখানে একটি জিনিষের ডেলিভারি করতেই এসেছিল। সে সাধারণ মানুষের মতো নিজের কষ্টার্জিত পাওনা টাকাগুলো একে একে গুনে নিজের পকেটে রাখল। তারপর সে যেই দিক দিয়ে ভেতরে এসেছিল, ঠিক সেই পথ ধরেই আবার বাইরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু-চার পা এগোতেই তার নজর পড়ল মেঝের ওপর; অবহেলায় পড়ে ছিল জাহিরের মানিব্যাগটি। সেটা দেখে সে সরল মনে ওটা কুড়িয়ে নিজের হাতে তুলল, যাতে মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। আর ঠিক এর পর মুহূর্তেই এমিলিয়া হন্তদন্ত হয়ে এসে তাকে চোর অপবাদ দিয়ে প্রথম চড়টা মারল এবং বাকি সব নাটকীয় ঘটনা ঘটল।

পুরো সত্যটা এভাবে সবার সামনে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যেতেই এমিলিয়া চরম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য এবং জাহিরের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে মিনতির সুরে ওঁর দিকে এগিয়ে আসল।

সে জাহিরের বাহু চেপে ধরে আমতা আমতা করে বলল — “জাহির... আমি আসলে এত কিছু বুঝতে পারিনি রে!”

তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুহানার দিকে ফিরে এক প্রকার লোকদেখানো সুরে বলল — “সরি (আমি দুঃখিত)!”

জাহির এমিলিয়ার সাজানো দুঃখপ্রকাশ আর কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। ওঁর বরফ-শীতল চোখ দুটো তখনো গার্ডদের দিকে স্থির। সে বড্ড কড়া গলায় রক্ষীদের আদেশ দিল সুহানার হাতের বাঁধন খুলে দিতে। জাহিরের আদেশ পাওয়া মাত্রই গার্ডসরা এক মুহূর্তও দেরি না করে সুহানার হাতের লোহার হাতকড়াটা চটপট খুলে দিল।

সুহানাকে মুক্ত হতে দেখে জাহির তাকে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য নিজের হাতটা যত্নে ও আশ্বাসে ওঁর দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সুহানা ওঁর সাহায্যের দিকে ফিরেও তাকাল না, কোনো সাহায্যই সে নিল না। সে নিজের শরীরের সমস্ত জোর আর আত্মসম্মান এক করে একাই শক্ত পায়ে মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

জাহিরকে পুরোপুরি পাস কাটিয়ে, তাকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করেই সুহানা নিজের পরনের কালো ট্রাঙ্ক প্যান্টে লেগে থাকা ধুলোবালিগুলো হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে সোজা এমিলিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এমিলিয়া সাথে ওখানে উপস্থিত অন্য কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সুহানা তার হাতে টেনে তুলে নিলো এবং তার পুরো শরীরের সমস্ত শক্তি আর জমানো আক্রোশ এক করে এমিলিয়ার গালে সপাটে এক চড় কষিয়ে দিল! চড়ের তীব্র আঘাত আর অভাবনীয় চোটে নিজের শরীরের টাল সামলাতে না পেরে এমিলিয়া ছিটকে ওখানেই উলটে মাটিতে পড়ে গেল।

সুহানা ওঁর ফুল স্লিভ জ্যাকেটের হাতা দুটো দৃঢ়তার সাথে কনুই পর্যন্ত গোটাতে গোটাতে ওখানে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে এক চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করল —“গেট আপ (উঠে দাঁড়া)! আরেকটা চড় এখনো বাকি আছে। আমার এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গেছে... ফার্স্ট আই হ্যাভ টু গো (আগে আমাকে এখান থেকে বেরোতে হবে)।”

সুহানা ওঁর চোখ থেকে চশমাটা আলতো করে খুলে নিল। তারপর ওঁর ফুল স্লিভ জ্যাকেটের হাতা দিয়ে কাচ দুটো ভালো করে মুছে নিয়ে আবার সেটা চোখে পরে নিল। চশমাটা ঠিকঠাক সেট হতেই সে নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো মটকে জ্যাম ছাড়াতে ছাড়াতে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা এক পলক দেখে নিল। ওঁর তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে ঠেকল হলের পিলারের পেছনে আধো-লুকিয়ে থাকা ওই মেয়েটির দিকে—যে একটু আগে অত্যন্ত বর্বরভাবে সুহানার চুল মুঠো করে ধরে ওঁর মুখটা ওপরে তুলেছিল।

সুহানা মেয়েটির দিকে এক পা এগোতেই, পরিস্থিতি সামাল দিতে দুজন বিশালদেহী সিকিউরিটি গার্ড চট করে ওঁর সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল। তারা বিনীত অথচ সতর্ক গলায় বলল — “প্লীজ মিস, থামুন! আর কোনো ঝামেলা করবেন না।”

সুহানা ওনদের চোখের দিকে তাকিয়ে উপহাসের সুরে প্রশ্ন করল — “এতক্ষণ ধরে ভরা মজলিশে আমার সাথে হচ্ছিল, তখন আপনাদের এই নীতি আর দায়িত্ববোধ কোথায় লুকিয়ে ছিল, ?”

তার ধারালো আর যৌক্তিক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে গার্ড দুজন চরম অপ্রস্তুত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।সুহানা তাদের থমকে যেতে দেখে ঠান্ডা গলায় বলল — “যদি মার খেতে না চান, তবে ভদ্রভাবে আমার সামনে থেকে সাইডে যান!”

হলের ভেতরে উপস্থিত সমস্ত নামী-দামী মানুষ আর অতিথিরা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছে। কেউ টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। পিলারের পেছনে থাকা সেই মেয়েটি সুহানার ওমন রণংদেহী মূর্তি দেখে চরম ভয়ে ওখান থেকে হলের বাইরের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। সুহানাও ওঁর পিছু পিছু দ্রুত পা বাড়াল।

কিন্তু ওঁর এই ধেয়ে যাওয়ার মাঝপথেই এমিলিয়ার অন্য এক চেনা ছেলে বন্ধু সুহানাকে আটকানোর জন্য আচমকা সামনে চলে এলো। ছেলেটি সুহানার হাত চেপে ধরার জন্য হাত বাড়াতেই, সুহানা ক্ষিপ্র গতিতে নিজের ডান পা চালিয়ে ছেলেটির হাঁটুতে সপাটে এক লাথি কষিয়ে দিল। ওঁর নিখুঁত অ্যাটাকের চোটে ব্যথায় ককিয়ে উঠে ছেলেটি ওখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে বাধ্য হলো। ছেলেটি পুরোপুরি মাটিতে পড়ার আগেই সুহানা ওঁর হাতের ধারালো কোপ দিয়ে ছেলেটির ঘাড়ের এক বিশেষ নার্ভের ওপর নিখুঁত আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যে মাথা ঘুরে ছেলেটি অবশ হয়ে ওখানেই মাটিতে আছড়ে পড়ে গেল।

মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটির দিকে এক পলক তাকিয়ে সুহানা তেজি গলায় মনে মনে বলল — “ইট মারার আগেই পাটকেল খাওয়ার জন্য রেডি হতে হয়!”

এদিকে মেয়েটি হলরুম পার হয়ে বেশি দূর দৌড়ে যেতে পারল না। সুহানার চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্র গতির হাত থেকে ওঁর নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না। সুহানা এক ঝটকায় মেয়েটিকে পেছন থেকে ধরে ফেলল। একটু আগে মেয়েটি যেভাবে সুহানার চুল মুঠো করে ধরে ওনাকে অপমান করেছিল, সুহানাও ঠিক একই কায়দায় ওঁর মাথার চুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে টেনে ধরল।

ব্যথায় আর আতঙ্কে মেয়েটি শিউরে উঠতেই সুহানা ওঁর কানের কাছে নিজের বরফ-শীতল কণ্ঠস্বরে আউড়ে গেল — “কাউকে বিনা কারণে মারার বা অপমান করার আগেই, ওঁর বিষয়ে অন্তত ব্যাকগ্রাউন্ডটা ভালো করে জেনে নিতে হয় ! ইউ মেক এ বিগ মিসটেক (তুমি বড্ড বড় একটা ভুল করে ফেলেছ)...!”

ঠিক তখনই সুহানার পকেটে থাকা ফোনটি তীব্র শব্দে বেজে উঠল। ফোনের আওয়াজে সুহানা যেই না নিজের পকেটের দিকে এক পলক তাকাল, সেই সুবর্ণ সুযোগটা লুফে নিল সামনে থাকা মেয়েটি। মেয়েটি নিজের ঠিক সামনেই টেবিলের ওপর একটা ওয়াইনের বোতল রাখা দেখতে পেল। নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না পেয়ে সে মরিয়া হয়ে ওখান থেকে বোতলটা তুলে নিল এবং ওটার নিচের অংশটা ভেঙে উল্টো করে ভাঙা কাচের ধারালো দিকটা দিয়ে সরাসরি সুহানার দিকে সপাটে আঘাত করল।

সুহানা সহজাত রিফ্লেক্স দিয়ে চট করে নিজেকে সেভ করতে চাইল, কিন্তু ফোনের কারণে ওঁর টাইমিংয়ে সামান্য হেরফের হয়ে যাওয়ায় নিজেকে পুরোপুরি বাঁচানো ওঁর পক্ষে পসিবল হলো না। বোতলের ভাঙা কাচের ধারালো একটা টুকরো ওঁর হাতে ঢুকে গিয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করল, আর সাথে সাথেই ওঁর ডান দিকের কপালটাও কেটে গিয়ে সেখান থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরতে শুরু করল।

কপালে আর হাতে তীব্র আঘাতের যন্ত্রণা সুহানার ভেতরের ঘুমন্ত বাঘিনীকে পুরোপুরি জাগিয়ে তুলল। সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নিজের সমস্ত শক্তি এক করে ওই মেয়েটির মাথার চুলগুলো আরও শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল, তারপর এক ঝটকায় টেনে এনে সজোরে ‘ফট’ করে সামনের কাঠের টেবিলের ওপর ওঁর মুখটা আছাড় মারল!

অভাবনীয় কায়দায় সুহানার কাউন্টার অ্যাটাক দেখে এবার খোদ জাহির নিজে হা করে চেয়ে রইল। সুহানা এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের ঠিক সামনে থাকা অ্যালকোহলের বোতলটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিল এবং নিজের মাথার ওপর আর চোট পাওয়া হাতে সেই তরলটা ঢেলে দিল। অ্যালকোহলের তীব্র ছোঁয়ায় ওঁর ক্ষতস্থানগুলো জ্বলে উঠল আর কপাল থেকে কাঁচা লাল রক্ত মিশ্রিত সেই তরল গড়িয়ে ওঁর মুখ বেয়ে নিচে পড়তে লাগল। চরম বিরক্তিতে সুহানা নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল— “সকালে আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে! ছ্যাঃ!”

এদিকে ওপাশে মাটিতে পড়ে থাকা এমিলিয়ার তখন যন্ত্রণায় মাথা ঘুরছে, সুহানার চড়ের চোটে ওঁর পুরো গালটা আগুনে পুড়ার মতো জ্বলে যাচ্ছে, আর মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সুহানা এমিলিয়ার দিকে আর একটা কথাও বলল না।

সে মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা নিজের কষ্টার্জিত ডেলিভারির টাকাগুলো এক এক করে তুলে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল, তবে কিছু টাকা হাতের ভাজে রাখলো। সুহানা ওঁর দিক থেকে নিজের বিষাক্ত ও তেজি দৃষ্টিটা এক মুহূর্তের জন্যও সরাল না; বরং বাকি টাকাগুলো নিয়ে সটান জাহিরের সামনে গিয়ে ওঁর মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল! আকস্মিক এই আঘাতে জাহির নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আলতো করে চোখ বন্ধ করে নিল।

সুহানা ওঁর দিকে তাকিয়ে ধারালো আর তেজি গলায় বলল — “টাকা কামাতে যে কতটা কষ্ট করতে হয়, তা আপনার মতো মানুষের জানা নেই। বড়লোকের বেটার এই জমিদারি প্রথা অন্য কোথাও গিয়ে চালাবেন, আমার সামনে নয়! ক্ষমতা থাকলে এই টাকা দিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া ইজ্জতটা বাজার থেকে কিনে আনুন, ইডিয়ট!

এবার ওঁর পাশ দিয়ে সটান, অহংকারী পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জাহিরের মুখের ওপর অবহেলার সাথে খালি এটুকু ছুড়ে দিয়ে গেল —“ব্লাডি ম্যানার্সলেস (অভদ্র ছোটলোক)!”

জাহির ওঁর এই অপমানেও একদম নীরব রইল, কথাটি মুখ বুজে হজম করে নিল। মনে মনে সে খুব ভালো করেই জানে যে আজ ওঁর মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে; নিজের এই অন্যায় অবজ্ঞার কাজে সে ভেতরে ভেতরে ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত।

ঠিক তখনই ওখান থেকে আফ্রিদি তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল— “ঠিক হয়েছে! বিনা দোষে একটা নিরীহ মানুষকে বড় বড় কথা শোনানো! এই ধরনের মানুষের সাথে এমনটাই হওয়া উচিত। সবসময় খালি ‘জাহির জাহির’ করে মরে, যত সব গায়ে পড়া মেয়েমানুষ!”

আফ্রিদির এই ঝাঁজালো কথাগুলো শুনে জাহির একবার এমিলিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করল। সে দেখল, এমিলিয়ার অবস্থা খারাপ যে দুটো মেয়ে তাকে দু-দিক থেকে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। জাহির সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে আফ্রিদিকে নিজের সাথে টেনে ধরে ওখান থেকে হনহন করে হলের বাইরে বেরিয়ে এলো। পার্কিং এরিয়া থেকে নিজেদের গাড়িটা বার করে দুজনে সরাসরি নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

এদিকে সুহানা অপমানে আর রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের স্কুটিটা স্টার্ট দিল এবং ঝড়ের গতিতে ওখান থেকে নিজের হোস্টেলের দিকে চলে গেল।

গাড়ির ভেতরে আফ্রিদি নিজেই ড্রাইভ করছে, আর জাহির পাশের সিটে বসে বেখেয়ালিতে জানালার বাইরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। ওঁর মাথায় তখনো সুহানার রক্তাক্ত, তেজি মুখের ছবিটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন জার্মানিতে শরৎকাল; রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেশ কমতে শুরু করেছে এবং জানালার ফাঁক গলে এক হিমেল বাতাস ভেতরে এসে গায়ে বিঁধছে। চারপাশের শান্ত ও রঙিন পরিবেশটা যেন জাহিরের ভেতরের অপরাধবোধকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে।

জাহিরের শ্যামল ঘন কেশরাশি কপাল ছুঁয়ে পেছনের দিকে নেমে গেছে। তাঁর সেই ঢেউখেলানো চুলের বিন্যাসটিতে আধুনিকতার ছাপ সুস্পষ্ট, যা তার মুখাবয়বে এক দৃঢ় ও চিন্তাশীল অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছে। তার চুলের প্রতি এই বিশেষ যত্নশীলতা খুব সহজেই লক্ষ করা যায়।

তার সুগঠিত মুখমণ্ডল একাধারে বুদ্ধিমত্তা ও স্থিরতার পরিচয় বহন করে। তার চোখগুলো বেশ বড় বড় এবং অভিব্যক্তিতে ভরপুর চোখের বাদামী মনি দুটো; তার নামের সাথে তার চোখের খুব মিল আছে। আর চোখের ওপর থাকা ভ্রুগুলি ঘন, কালো এবং অত্যন্ত সুন্দর আকারযুক্ত। তার উন্নত নাসা ও দৃঢ় চিবুক তার পৌরুষদীপ্ত কাঠিন্যকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তার গায়ের বর্ণ ধবধবে ফর্সা হওয়ায় শরীরের কালো রঙের একটি সাধারণ টি-শার্ট তার প্রশস্ত কাঁধ ও বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের পেশিগুলোকে অত্যন্ত প্রকটভাবে তুলে ধরেছে এবং কালো রঙটি তার ত্বকে আরও বেশি ফুটে উঠেছে। টি-শার্টের এই সরলতা তার শারীরিক কাঠামোর শক্তি ও আকর্ষণকে মুখ্য করে তুলেছে। তার উচ্চতা ৬ ফিট ২ ইঞ্চি মাঝে মাঝে চেহারা বাড়লে আরোও এক ইঞ্চি বেড়ে যায়, যা ফুটবলের জন্য একদম পারফেক্ট বডি, নিখুঁত শারীরিক গঠন তাকে জার্মানি এর তরুণ স্ট্রাইকার হতে সাহায্য করেছে।

অন্যদিকে আফ্রিদির পরনে রয়েছে একটি নীল টি-শার্ট। সেও দীর্ঘ ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তার মুখের আকৃতি অত্যন্ত সুগঠিত ও তীক্ষ্ণ, বিশেষত তার চিবুক এবং চোয়ালের রেখা ছিল স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। তার চুলগুলো ঘন কালো, যা মাথার ঠিক ওপরে খানিকটা উঁচু করে আঁচড়ানো এবং দু-পাশ অপেক্ষাকৃত ছোটো করে ছাঁটা। তবে জাহির তার চেয়ে একটু বেশি লম্বা, সেই তুলনায় আফ্রিদি উচ্চতায় একটু কম। তার চোখগুলো আকারে ছোটো ছোটো এবং তার নাকের বাঁ পাশে একটি সুন্দর তিল আছে।

জাহিরের পুরো নাম মুহাম্মাদ জাহির উদ্দিন। তার বাবা মুহাম্মাদ জাহাঙ্গীর উদ্দিন বার্লিন মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মুখ্যসচিব ছিলেন এখন ট্রান্সফার হয়ে মিউনিখ এ এসেছেন এখানে গভর্মেন্ট হাসপাতাল এর HOD এবং স্বাস্থ্য বিভাগের মুখ্য সচিব। মা সাবেরা জাহান একজন প্রতিব্রতা গৃহিণী। জাহির তাদের একমাত্র সন্তান। জাহাঙ্গীর সাহেবরা মোট চার ভাই; তিনি তাদের মধ্যে সবার বড়ো। তার সাথে তার ছোটো ভাই বিহান এখানে থাকেন। বাকি দুই ভাই—জাসমির ও জিসান—তাদের নিজ দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশে থাকেন। জাহাঙ্গীর সাহেব মূলত পড়াশোনার জন্য এখানে এসেছিলেন, পরে চাকরির খাতিরে এখানেই স্থায়ী হন; তবে মাঝে মাঝে তিনি দেশে যান। আফ্রিদি শেখ হলো সাবেরা জাহানের একমাত্র ভাইয়ের একমাত্র পুত্র। ছোটোবেলায় মা মারা যাওয়ায় সেই থেকেই সে তার ফুপ্পির ভীষণ আদরের ভাইপো; ফুপ্পি তাকে নিজের কাছেই এখানেই রেখেছেন। আফ্রিদির বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় ফুপ্পি তাকে আর বাবার কাছে ফেরত দেননি।

সেই ছোট্ট বেলা থেকে জাহির আর আফ্রিদি একে অপরের বেস্টফ্রেন্ড, আবার সম্পর্কে তারা কাজিন ব্রাদারও। তাদের বন্ধুত্ব আর ব্রাদারহুডের কোনো বিকল্প নেই, এক দুর্লভ বন্ধন যাকে বলে আর কি! যেমন এই মুহূর্তে, দুজনেই একযোগে জার্মানির ন্যাশনাল ফুটবল টিমে নির্বাচিত হয়েছে, যা ছিল তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। এই সুবাদেই তাদের বন্ধুরা মিলে আয়োজন করেছিল এক জমকালো সারপ্রাইজ পার্টির।

চারপাশের এত উচ্ছ্বাসের মাঝেও জাহিরকে এমন গভীর চিন্তায় মগ্ন দেখে আফ্রিদি তার কাছে এসে বলল —“কী হয়েছে তোর? এমন মনমরা করে আছিস কেন?”

জাহির সংক্ষেপে উত্তর দিলো — “আমার ভালো লাগছে না।”

আফ্রিদি একটু ব্যঙ্গের সুরেই কথাটা বলল —“কেন? এমিলিয়াকে থাপ্পড় মেরেছে বলে?”

কিন্তু জাহিরের একদম পছন্দ হলো না তার এই ঠাট্টা। সে দাঁত কিড়মিড় করে রেগে বলল —“ফালতু কথা বলবি না গাধার মতো! আমি ওই মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তিত, আমার খারাপ লাগছে। আমি তো দোষ-গুণ না দেখেই ওকে...”

আফ্রিদি তখন সুহানার সেই তেজি ভঙ্গিমা অনুকরণ করে বলে উঠল —“ব্লাডি ম্যানার্সলেস!”

বলেই সে জোরে হাসতে শুরু করল, আর জাহিরও তার সেই হাসি দেখে নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারল না, তার সাথে হাসিতে যোগ দিল।তবুও জাহিরের মন কোনোভাবেই মানছিল না। তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে কেবল রাজত্ব করছিল সেই অষ্টাদশী রমণী।

এদিকে সুহানা হোস্টেলের সামনে এসে দেখল ভেতরের সব আলো নিভে গেছে। সে নিজের হাতঘড়ির দিকে নজর দিল—সময় তখন রাত ১১টা ২৫ মিনিট। স্কুটিটা তো সে আগেই গ্যারেজে রেখে এসেছে। এখন ভেতরে ঢোকার তার উপায় কী?

উপায় আবার কী! সেই রোজকার অভ্যাসের মতোই পাঁচিল টপকে পাইপ বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। সুহানা চারদিকে একবার সতর্ক চোখ বুলিয়ে নিয়ে আলতো করে পাঁচিলটা টপকে গেল। একদম নিঃশব্দে, সতর্কতার সঙ্গে, শুঁয়োপোকার মতো গুটিগুটি পায়ে সে চারতলার ৪০৭ নম্বর রুমের জানলার দিকে ওপরে উঠতে থাকল। জানালার কাচে আলতো করে পরপর তিনটি টোকা দিতেই ভেতর থেকে সেটা খুলে গেল। সে বড্ড ধীরে সুস্থে জানালার গলতি গলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।

ঘরের লাইট জ্বলতেই সুহানাকে দেখে ফিনা চমকে উঠল! ওঁর কপালে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে হয়ে আছে। ফিনা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আলমারি থেকে একটা পরিষ্কার টাওয়াল নিয়ে এলো এবং ওঁর ক্ষতস্থানে চেপে ধরল। তখনই তার চোখ গেল সুহানার ভাঙা চশমা আর সুগঠিত চোয়ালের দিকে; সেখানে স্পষ্ট তিনটি আঙুলের দাগ বসে লাল হয়ে আছে।

ফিনার কণ্ঠে চরম উদ্বেগ ঝরে পড়ল — “এই সব হলো কী করে?! গালে এমন দাগ কী করে হলো? কে মেরেছে তোকে?”

সুহানা কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের পকেট থেকে টাকাগুলো বার করে ফিনার হাতে দিল এবং সংক্ষেপে আজকের ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি জানাল। সব শুনে ফিনার মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল—মনে মনে সে খুব ভালো করেই জানে যে তার নিজের কাজের গাফিলতির জন্যই আজ মেয়েটার এমন রক্তাক্ত অবস্থা হয়েছে। সে যদি নিজের কাজটা একদম ঠিক সময়ে নিজে করত, তবে সুহানাকে আজ এমনটা সহ্য করতে হতো না।

ফিনা অনুতপ্তভাবে ওঁর দিকে তাকিয়ে বলল — “সরি, আমার জন্য আজ তোকে এভাবে মার খেতে হলো...।”

সুহানা ওঁর এই সান্ত্বনা গায়ে না মেখে উদাসীনভাবে বলল — “নাটক না করে আমায় যেতে দে। রাস্তা ছাড়।”

ফিনা ওঁর রক্তারক্তি কাণ্ড দেখে বাধা দিতে গিয়ে বলল — “কিন্তু তোর...”

সুহানা ওঁর কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল — “সর, আমি দেখছি।”

ফিনা আর জোর না করে ওঁর পথ ছেড়ে পাশে দাঁড়াল। সুহানা সোজা চলে গেল ওয়াশরুমের দিকে।

সুহানার পুরো নাম কেবলই ‘সুহানা’; সে নিজের নামের সাথে কোনো সামাজিক বা পারিবারিক টাইটেল ব্যবহার করে না। তার বাবা নামের একজন মানুষ দুনিয়ায় বেঁচে থাকতেও ওঁর জীবনে নে তাকে সে বাবা বলে মানেই না, আর ওঁর জন্মদাত্রী মা-ও তাকে এই স্বার্থপর দুনিয়ায় একা করে চলে গেছেন বহু বছর আগে—সুহানাকে জন্ম দেওয়ার পর মাত্র মিনিট বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। সুহানার জন্ম মূলত এই জার্মানির মাটিতেই। ওঁর মা ছিলেন এখানকারই স্থানীয় মেয়ে, কিন্তু ওঁর বাবা ছিলেন একজন বাংলাদেশি নাগরিক এতো টুকুই জানে সে তাকে এটাই জানানো হয়েছে সমাজ এবং তার নানার কাছ থেকে।

হয়তো সেই মিশ্র রক্তের কারণেই তার চেহারায় এক অন্যরকম ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। ছোটখাটো ও মিষ্টি এক গোল মুখমণ্ডল তার। গায়ের রঙ ফর্সাও না, আবার পুরোপুরি শ্যামলাও না—সব মিলিয়ে একেবারেই আলাদা ধরনের এক অনন্য গায়ের রঙ তার। তার নাকটি একদম খাড়া, সুঠাম ও সূক্ষ্ম, যা ওপর থেকে সামান্য বাঁক নিয়ে কপোল বেয়ে ঠোঁটের ঠিক ওপরে এমন নিখুঁতভাবে শেষ হয়েছে, যেন কোনো এক দক্ষ শিল্পী নিজের ক্যানভাসে পরিপূর্ণতার এক শেষ রেখা এঁকে দিয়েছেন। চোখের কালো ফ্রেমের চশমাটির আড়ালে সবসময় লুকিয়ে থাকে কাঠবাদাম আকারের দুটি মায়াবী চোখ, যার মণির রঙ এক অসাধারণ সবুজ রঙের আলো পড়লে আরো আকর্ষণীয় দেখায়। আলো ঠিকঠাক পড়লে ওঁর সেই মণিদ্বয়ে হলদে-সবুজের এক হালকা ও অপার্থিব আভা স্পষ্ট দেখা যায়। ওঁর চোখের পাতাগুলো বেশ ঘন—যা তার সমগ্র অবয়বের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। ঠোঁটের গড়নটি অত্যন্ত পরিপূর্ণ ও সুডৌল; ওপরের ঠোঁটের কোমল বাঁক আর নিচের ঠোঁটটি প্রাকৃতিকভাবেই সামান্য পুরু, যা তার মুখের সামগ্রিক মাধুর্য ও সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। উচ্চতায় সে প্রায় পাঁচ ফুট।

একটু বড়ো হওয়ার পর থেকেই সে মূলত স্কুলের হোস্টেলে বসবাস করত। এই যান্ত্রিক ও চেনা দেশে আপন বলতে কেউ নেই। —মূলত সেই পারিবারিক অবহেলা আর তিক্ততার কারণেই তার এভাবে বছরের পর বছর হোস্টেলের চার দেওয়ালে পড়ে থাকা। তাদের ঘরে তুহিনা নামের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তুহিনা এখন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এই পুরো পরিবারে তুহিনাই হয়তো একমাত্র মানুষ, যে তাকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে এবং আগলে রাখে।

সুহানা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে মাত্র বাইরে বেরিয়েছে, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা আবার তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল।

চলবে.........

{“এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা এবং কাল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। এছাড়া, অনিচ্ছাকৃত কোনো বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি, আপনারা গল্পের মূল ভাবাবেগটুকুই গ্রহণ করবেন”}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন