গল্প: প্রেমের আলোড়ন
লেখক: সুহান জয়
পর্ব: ১০
(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)
এমনিতেই মলের হালকা আওয়াজ ছিল, কিন্তু সুহানার পিক যখন তারে আঘাত করল, তখন একটি মিষ্টি ও বিষণ্ণ সুর এম্প্লিফায়ারে বেজে উঠল। সুহানা গানটির মূল সুরটি তুলতে শুরু করল—শুধুমাত্র গিটার দিয়ে, কোনো কণ্ঠস্বর ছাড়াই।
~I’m in love with a fairytale
Even though it hurts~…
গিটারের টিউন কানে আসতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সেই সুরের আকর্ষণে সবাই এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। পাশে আরেকজন ড্রাম বাজাতে শুরু করতেই সেই বিট যেন পুরো পরিবেশটিকে একটি কনসার্ট কনসার্ট ফিল দিলো।
ফিনা দ্রুত ফোন বার করে ভিডিও করতে শুরু করল। জাহির দেখছে সুহানা কে তার সরু আঙুল গুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে গিটারের স্ট্রিংস গুলো মধুর শব্দ তৈরী হচ্ছে সেখান থেকে সুহানাকে। তার সরু আঙুলগুলো গিটারের স্ট্রিংস ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সেখান থেকে তৈরি হচ্ছে সেই মধুর শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে বেশ ভিড় জমে গেলো।
“আহহ!”
কারোর আর্তনাদে থেমে গেলো সবকিছু। সুহানার আঙুল সামান্য কেটে গেছে। সামনে এত লোকজনের ভিড় দেখে সে দ্রুত গিটারটা রেখে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে গেলো।
জাহির আফ্রিদির কানে কিছু একটা বলল, তারপর সুহানার পিছু পিছু ছুটল। পেছনের স্টাফটি ডাকল, কিন্তু সে কথায় কান দিল না সুহানা।
জাহিরকে যেতে দেখে ফিনা নিজেও গেলো না। বরং তুহিনাকেও কোনো এক বাহানায় আটকে দিলো। ফিনা চায় মেয়েটা একটা আশ্রয় পাক, নিজের নাম পাক। তার জন্য সেই ছোটো থেকে সে নিজের সবটা করে যাচ্ছে।
তারা একে অপরের রক্তের কেউ নয়, শুধু একটাই সম্পর্ক—বন্ধুত্ব। এই সম্পর্কের ঘানি এখনো টানছে মেয়েটা। সে বিরাট ঋণী এই অদ্ভুত চোখওয়ালি মেয়েটির কাছে। জাহিরের চোখে সুহানার প্রতি স্পষ্ট মায়া লক্ষ্য করেছে ফিনা।
“আচ্ছা ফিনা, তোর আমাকে কী মনে হয়?”
ফিনা বুঝল না কোন বিষয়ে বলছে , “মানে?”
“মানে এই যে—জাহির আর সুহানার মধ্যে কিছু একটা চলছে তোরা সবাই জানিস কিন্তু আমাকে বলছিস না। অথচ আমার সামনেই ইশারা চলছে! তাই বলছি, আমাকে কি তোদের গরু মনে হয়?”
তুহিনা যে এই বিষয় আগে থেকেই অবগত, তা জেনে ফিনা অবাক হলো। চঞ্চল চোখে আশেপাশে তাকাল, কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার হাত-পা নিশপিশ করছে। আফ্রিদি ভিতরে একটা কাজ করছে, সে এখনো আসেনি।
তুহিনা সবটা লক্ষ্য করে বলল: “আমাকে জানালে আমি কি বাঁধা দিতাম? উল্টে খুশি হতাম! মেয়েটা আমার সাথেই থাকবে। আরো উস্কে দিতাম জাহিরকে! কিন্তু তোরা তো একেকটা গাদ্দার, আমারে জানাসনি!”
ফিনা করুণ স্বরে বলল: “দি, বিশ্বাস করো, আমাদের মাঝে কোনো কথা হয়নি সুহানাকে নিয়ে। আমার একে অপরেরটা জানি না। ওটা তো আমার প্রেডিকশন মাত্র।”
“বুঝলাম। তবে সুহানা এত সহজে তো মানবে না, মানবে কি রে? পাত্তা দিলে তো! জাহির এই ভালো তো এই খারাপ। ওর কাহিনী তোকে অন্যদিন বলব। এখন চল দেখি, ঐ গরুটা কোথায় গেলো।”
জাহির জোরে পা চালিয়ে সুহানার কাছে গেলো। হাত ধরে টেনে সাইডে নিয়ে এলো। প্লেস্টেশনের সাইডে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালো। এইদিকে লোকজন নেই, মাঝে দু-একটা আসে আবার পাশ দিয়ে চলে যায়।
সুহানা অস্বস্তি কমাতে হেঁটে ওই জায়গা থেকে দূরে যাচ্ছিল। অনেকদিন পরে শখের জিনিস হাতে পেয়ে বেচারি আবেগী হয়ে বিবেক হারিয়ে আলতু ফালতু কাজ করে ফেলেছে। সামনে অতগুলো ফোন দেখে সেটা আরো বেড়ে গিয়েছিল তাই সে বেড়িয়ে এসছে কোনো কিছু না ভেবেই।
জাহির সুহানার কেটে যাওয়া হাত ধরে চোখের সামনে আঙুলগুলো মেলে ধরল। ভালোই কেটেছে, অনেকটা বড় ক্ষত হয়েছে। মনে হয় কিছু গেঁথে গেছে।
সুহানা এতক্ষণ ভাবলেশহীন থাকলেও এখন তার চেতনা ফিরে এল। সে জাহিরের কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়াতে চাইছে, কিন্তু জাহির শক্ত করে হাতের কব্জি ধরে রেখেছে। অনেক টানাটানির পরে জাহির বিরক্ত হয়ে এক ধমক দিলো:
“এই! চুপ করে দাঁড়াতে পারে না? খেয়ে ফেলছি তোমায়?”
সুহানা আরো টানাটানি শুরু করল। রাগ লাগছে তার—কেনো ছুঁবে তাকে? তার ভালো লাগে না এইসব ন্যাকামি, ছোঁয়াছুঁয়ি। তাকে কি লোকাল ভেবেছে নাকি? যখন তখন ছুঁয়ে যাচ্ছে! শুধু দিদির জন্য কিছু বলতে পারছে না, নয়তো এতক্ষণে মুখটা ফাটিয়ে দিতো।
“আমায় ছাড়ুন! আমার ভালোলাগে না এইসব! ছাড়ুন আমায়! কী ভেবেছেন কী? যখন তখন এইসব! কী অসভ্যের মতো বারবার একটা মেয়েকে টাচ করছেন কেনো? ব্লাডি ভালগার!”
জাহিরের পারদ এবারে উঠলো এতক্ষণ চুপ করে ছিল কিছু বিলেনি বলে কি ভেবেছে যা তা বলবে । আচমকা ডানহাত দিয়ে খপ করে সুহানার বাঁ-হাত ধরল। একটানে নিজের উল্টোদিকে ঘুরিয়ে কোমরের সাথে হাত চেপে ধরল। সুহানার পিঠ ঠেকালো জাহিরের বুকে।
সুহানার সব ছটফটানি শেষ। জাহির নিজের দুই পা সুহানার দুই পায়ের পাশে নিয়ে জ্যাম করে দিলো। সামনের কাচে স্পষ্ট হলো দুটো অবয়ব।
জাহির সামনের কাচে সুহানার মুখের উপরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল:
“কী মনে হয়? চেহারা দেখে একজন ভদ্রলোক? নো নো মাই ডিয়ার, ভুল। আমি না ভদ্রলোক, না ভালোমানুষ। আমি হলাম 420, এ থার্ড ক্লাশ চিট! সোজা সাপটায় বাংলায় যাকে বলে চারশো বিশ, বুঝলে? এই ইনস্টাগ্রামের জামানায় সবই তো জানো!”
সুহানা চোখ নিচে নামিয়ে রেখেছে। চোখের পাতা কাঁপছে। জাহিরের দিকে তাকাতে পারছে না। জাহিরের ছোঁয়া তার অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। যতই হোক, সে তো আর মেয়েমানুষ। তখন ছেলেটি দেখছিল, তার ভীষণ রাগ হচ্ছিল, গা জ্বালা করছিল। কিন্তু এই লোকটারটা তেমন নয়, তবে তার ইগোতে লাগে বড্ড।
এই পুরুষটির কাছে সে হারতে পারে না কোনোভাবেই না। কিন্তু তার লজ্জা লাগছে ভীষণ, সেটা বুঝতে দিতে চায় না সে। তাই এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে চারদিকে।
জাহির সেটা বুঝতে পারল। আরেকটু হাতটা চেপে ধরল কোমরের সাথে। সুহানার কেটে যাওয়া হাতটা নিজের হাতের মুঠো থেকে বার করল। হাতের চাপের জন্য আবার রক্ত বেরোচ্ছে।
হঠাৎ একটা অসহনীয় কাজ করে বসল জাহির। টুপ করে কেটে যাওয়া আঙুলটা মুখে পুরে নিলো। রক্ত থামানোর বৃথা চেষ্টায় আঙুলটা শুষে নিলো। সুহানা যেন কারেন্ট খেল! তড়িৎগতিতে চোখ তুলে তাকাল। সুহানার সারা শরীর শিরশির করে উঠল, নিশপিশ করছে হাত-পা।
সুহানার মৃদু কম্পন অনুভব করল জাহির। এতক্ষণ মজা করলেও এখন তার অন্যরকম ফিলিংস হচ্ছে। মুখ থেকে আঙুল বার করে দেখল রক্ত বন্ধ হয়েছে। আয়নার দিকে তাকিয়েই হাতের উপরে একটা গাঢ় চুমু খেল জাহির।
হাত শিথিল হতেই সুহানা নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। দ্রুত প্রস্থান করল সেখান থেকে। জাহির এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সুহানার দিকে নিক্ষেপ করা—সুহানা চলে যাচ্ছে সামনের দিকে।
জাহির কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে থাকল, নিজেকে শান্ত করতে হবে কেনো এমন হচ্ছে বার বার ?
সুহানাকে আসতে দেখে ফিনা আর তুহিনা এগিয়ে গেলো, কিন্তু সুহানা তাদের পেরিয়ে চলে গেলো সোজা।ফিনা আর তুহিনা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তুহিনা জোরে পা চালিয়ে সুহানার হাত ধরল,
“ওই দিকে কোথায় যাচ্ছিস?”
তুহিনার স্পর্শে ভ্রম ছুটে গেলো সুহানার। “কো... কোথাও না তো। তোমাদের খুঁজছিলাম।”
“আমরা তোর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম! তুই তো আমাদের সামনেই চলে এলি।”
“ওহ, খেয়াল করিনি। তবে সরি, সরি।”
তুহিনা আর কিছু বলল না। আশেপাশে খুঁজলো জাহিরকে। নেই সে, কোথায় তবে? বেটা করেছে কি সুহানার সাথে? মেয়েটা এমন কেনো করছে?
“চল।”
“হম।”
ফিনা তুহিনাকে জিজ্ঞাসা করল কী হয়েছে। তুহিনা বলল, “জানি না।”
আফ্রিদি নিজের কাজ মিটিয়ে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে, তবে জাহিরকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝে সুহানাকে একবার জেরা করেছে—জাহির তার পেছনে গেছিল, কিন্তু সুহানা বলেছে সে জানে না। ব্যাপার গোলমাল আছে কিছু, কিন্তু সেটা কী? এই রহস্য উদঘাটন না করলে যে ফিনার ঘুম হবে না।
আফ্রিদি সুহানার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বড্ড মায়া হয় এই মেয়েটাকে দেখলে। কেমন মায়াবী চেহারা, বিশেষ করে চোখগুলো তার ভীষণ ভালো লাগে। তার যদি ছোটো বোন হতো, তবে এরকম হতো তার কল্পনা অনুযায়ী। আফ্রিদি নিজের কথা একটু পালটে নিলো। বোনের মতো নয়। ছোটো বোন। তারও কেউ নেই, সুহানারও কেউ নেই। কিন্তু মেয়েটা এমন শান্ত হয়ে গেছে কেনো এতক্ষণ তো মজা করছিল সবার সাথে ? আর ঐটা কোথায় গেলো? আসে পাশে তাকাতে তাকাতে কল করলো জাহিরকে।
তখনি পেছন থেকে বিদঘুটে গলায় কেউ গান গাইতে গাইতে এলো...
~তুমি দেখিয়াও দেখলা না
শুনিয়াও শুনিল না
জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন
নিভাইয়া গেলা না।~
চলবে......
{“এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা এবং কাল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। এছাড়া, অনিচ্ছাকৃত কোনো বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি, আপনারা গল্পের মূল ভাবাবেগটুকুই গ্রহণ করবেন”}