ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

১৮তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ১৮

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। জাহির দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল, আফ্রিদিও তার পিছু পিছু এলো। ডাক্তার কিছু বলার আগেই জাহির ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “What happened doctor? How is she? Is everything fine?”

ডাক্তার একসাথে এতগুলো প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসলেন। কার উত্তর আগে দেবেন তা ভেবে তিনি জাহিরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “Calm down young boy, she is fine now.” ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করে আরও বললেন:

“পেশেন্ট এখন অনেকটাই বিপদমুক্ত। আগের তুলনায় ওনার ভাইটালস এখন স্টেবল আছে। আমরা যে ভয়টা পাচ্ছিলাম, সেটা কেটে গেছে। তবে শরীরে বেশ চোট থাকায় পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা এখনই ওনাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে শিফট করতে পারছি না। যিনি পেশেন্টের সার্জারি করেছেন, তিনি সকালে এসে আবার কিছু টেস্ট করবেন; তারপর আপনাদের বাকি সব জানানো হবে। আমি ওনাকে অলরেডি কল করে দিয়েছি।”

জাহির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “Okay, thank you so much doctor.”

ডাক্তার হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “It’s my duty, dear.”

ডাক্তার চলে যেতেই সে আফ্রিদির দিকে তাকাল। জাহিরের চোখে এখন প্রশান্তির এক উজ্জ্বল ঝিলিক। আফ্রিদি একটা দীর্ঘ হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল। জাহিরের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল, “শুনলি তো? এবার অন্তত বাড়ি যা। ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে আয়। সারারাত তো কেঁদে-কেটে অস্থির ছিলি, খেয়ালই করিসনি যে এখন পর্যন্ত তুই খালি পায়ে আছিস।”

জাহির নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তার পায়ে জুতো নেই। এতক্ষণ টেনশনে বিষয়টি তার মাথাতেই ছিল না। সে একবার কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকাল; ভেতরে একজন নার্স আছেন আর সুহানা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।

দেয়ালের বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল চারটে বাজে। শীতের শেষ রাত, সূর্যের দেখা মিলতে এখনো বেশ দেরি। হঠাৎ জাহিরের মনে কিছু ভাবনার উদয় হলো। সে দেখল আফ্রিদি ক্লান্তিতে হাসপাতালের সিটেই গা এলিয়ে দিয়েছে। জাহির তার পাশে গিয়ে বসল এবং গম্ভীর গলায় বলল, “এক্সিডেন্টটা কোন স্কাউন্ড্রেল (Scoundrel) করেছে, এখন সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।”

আফ্রিদি চোখ বুজেই উত্তর দিল, “সেটা ফিনা না আসলে জানতে পারব না। ও-ই সবটা জানে।”

ফিনার কথা মনে পড়তেই জাহির পকেট থেকে ফোনটা বের করল তাকে জানানো উচিত, ফোন দেখল ফোনের চার্জ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

আফ্রিদি দেখলো তারপর বলল, “আমি একটু আগেই ফোন করেছিলাম, কিন্তু সুইচ অফ বলছে।”

জাহির বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। মেয়েটা একা আছে, তার ওপর ফোন সুইচ অফ—বিষয়টা সে ঠিক হজম হলো না তার। সে নিজেই একবার নম্বরটি ডায়াল করল, কিন্তু ওপাশ থেকে সেই একই যান্ত্রিক স্বর ভেসে এল—ফোন বন্ধ।

জাহির আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই বাড়ি থেকে ফ্রেশ হয়ে আয়। তুই ফিরলে তারপর আমি যাব।”

আফ্রিদি সোজা হয়ে উঠে বসল। কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “এখন তো সুহানা ঘুমাবে তাকে মেডিসিন দেওয়া হয়েছে, এখানে বসে থেকেও লাভ নেই। চল দুজনেই বাড়ি যাই। একটু ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে নিই, তারপর সকালে একসাথে আসব। আমি মিকি কে বলে দিচ্ছি, ও এখানে থাকবে; কোনো সমস্যা হবে না। আর ফেরার সময় ফিনাকে সাথে করে নিয়ে আসব।”

জাহির প্রথমে রাজি হতে চায়নি, কিন্তু নাছোড়বান্দা আফ্রিদি তাকে এক প্রকার জোর করেই নিয়ে গেল। গত দুদিন এই ছেলের চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই, খাওয়া-দাওয়ারও কোনো ঠিক ছিল না। আফ্রিদি নিজেও ভীষণ ক্লান্ত। অবশেষে মিকিকে সুহানার পাহারায় রেখে তারা হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এলো।

ড্রাইভার ড্রাইভ শুরু করল, জানলা দিয়ে আসা কনকনে ঠান্ডা বাতাস জাহিরের শরীর ছুঁয়ে গেল। এতক্ষণ তীব্র মানসিক চাপের কারণে নিজের শরীরের অবস্থা বুঝতে পারেনি সে; কিন্তু এখন অবসাদ আর ক্লান্তি যেন তাকে জেঁকে ধরল। তার সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে।

ফিনা কোনো রকমে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। ডেনিয়েল তখনও ঘুমাচ্ছে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ফিনা আয়নায় নিজেকে দেখল; ঠোঁটের এক কোণ কেটে গেছে, গলায় কয়েক জায়গায় কালচে লাল দাগ—পুরো চোখে-মুখে এক বিধ্বস্ত ছাপ। রাতের সেই বীভৎস স্মৃতি মনে পড়তেই গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল তার, সে হরহর করে বমি করে ফেলল। পেটে তেমন কিছু নেই, তাই বমি করতে গিয়ে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। কোনোমতে মুখে পানি দিয়ে সে ফ্লোরে বসে পড়ল। মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল সে—নিজের জীবনের সবথেকে মূল্যবান সম্পদটাও আজ হারিয়ে ফেলল, আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না তার।

সুহানার জন্য ফিনার মনটা হাহাকার করে উঠল; ওর জন্যই তো এত কিছু করা। আর মাত্র এক ঘণ্টা বাকি আছে বারো ঘণ্টা হতে। ফিনা মনেপ্রাণে প্রার্থনা করছে, সৃষ্টিকর্তা যেন একবার ওকে ফিরিয়ে দেন—সে আর কোনোদিন কিছু চাইবে না।

সে কোনোমতে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু মাথাটা ভীষণ ঘুরছে। কোনোমতে জামাটা গায়ে জড়িয়ে সে ওয়াশরুমে এসেছে সামনে এক পা বাড়াতেই মাথা ঘুরে ফ্লোরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তীব্র শব্দে ডেনিয়েলের ঘুম পাতলা হয়ে এল। সে পাশ ফিরে ফিনাকে না পেয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সারা ঘরে চোখ বোলালো, কোথাও নেই সে। শেষে দেখল ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ।

ডেনিয়েল দ্রুত কোনোমতে প্যান্টটা পরে নিয়ে ওয়াশরুমের সামনে ছুটে গেল। দরজায় কয়েকবার নক করে ডাকল, “ডার্লিং...?”

ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই, কোনো সাড়াশব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। সে আবারও অস্থির হয়ে ডাকল, “ফিনা, are you okay?”

ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ডেনিয়েল ভয় পেয়ে গেল। কালক্ষেপণ না করে সে লক ঘুরিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ফিনাকে নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে তার পা জমে গেল। দ্রুত ফিনার কাছে গিয়ে সে ওর গালে আলতো চাপ দিয়ে ডাকতে শুরু করল— “এই, কী হয়েছে তোমার? ফিনা? ওঠো প্লিজ!”

কিন্তু ফিনার কোনো সাড়া নেই, সে পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়েছে। ডেনিয়েল ওর মুখে পানির ঝাপটা দিল, তাতেও কোনো কাজ হলো না। নিরুপায় হয়ে সে ফিনাকে কোলে তুলে নিল। ওর শরীর পরিষ্কার করা প্রয়োজন ভেবে সে দ্রুত শাওয়ার নিল এবং সেই সাথে ফিনাকেও ফ্রেশ করিয়ে দিল।

এরপর দ্রুত নিজের কাপড় বদলে সে ফিনাকে ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ডেনিয়েল দেখলো ফিনার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, প্রথমবারই হয়তো সে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।

সে তড়িঘড়ি করে তার এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিয়ে সব জানাল। ডক্টর শুনে বললেন—অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং হরমোনাল ডিসব্যালেন্সের কারণে এমনটা হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। ডাক্তার তাকে কিছু জরুরি ওষুধের নামও বলে দিলেন। ডেনিয়েল তৎক্ষণাৎ একজন সার্ভেন্টকে ডেকে ওষুধ আনতে পাঠিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর সার্ভেন্ট ওষুধ এবং সেই সাথে কিছু খাবার নিয়ে এল। ডেনিয়েল ফিনাকে মৃদু স্বরে ডাকল—

“hey wake up. খেয়ে নাও, তারপর না হয় আবার ঘুমিও।”

কিছুক্ষণ ডাকার পর ফিনা ধীরে ধীরে চোখ মেলল, তার মাথা তখনো ঝিমঝিম করছে। ডেনিয়েলকে সামনে দেখে রাতের সব স্মৃতি তড়িৎবেগে ফিরে এল। সে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীর সায় দিল না। ডেনিয়েল তাকে আলতো করে ধরে উঠে বসিয়ে দিল। সে নিজে হাতে ফিনাকে খাইয়ে দিতে চাইলে ফিনা অনীহা প্রকাশ করল। ডেনিয়েল তখন শান্ত গলায় বলল:

“দেখো, খেয়ে নাও। দুটো ওষুধ খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলে শরীরটা ভালো লাগবে, তারপর আমি তোমাকে তোমার জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসব। সুহানার সামনে কি তুমি এই অবস্থায় যাবে?”

বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে ফিনা আর দ্বিমত করল না। সে সামান্য কিছু খেয়ে ওষুধগুলো গিলে নিল। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা, ডেনিয়েল যত্ন করে ফিনার গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দিল। ফিনা এই লোকটার মতিগতি কিছুই বুঝতে পারে না—কখন কী করে বসে কে জানে? এখন এমন আচরণ করছে যেন ফিনা সত্যি সত্যিই তার গার্লফ্রেন্ড। সুহানা মাঝেমধ্যেই বলত, “মানুষ বহুরূপী রে, শ্যাম্পুর ফ্যানা,এদের আসল রূপ বোঝা দায়।” আজ ফিনা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

ডেনিয়েল ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে পড়ল। তাকে শুতে দেখে ফিনা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দূরে সরে গেল। ডেনিয়েল বিষয়টি লক্ষ করে নিজেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে বলল:

“Relax, আমি তোমাকে আর কিছু করছি না। ঘুমাও তুমি।”

ফিনা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘ ধকলের পর একসময় সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

সুহানা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। অবচেতন মনে সেই স্বপ্নের কথাগুলোই বার বার ঘুরেফিরে আসছে তার। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে, কিন্তু আফসোস—মায়ের কোনো স্মৃতিই তার কাছে নেই। একটি মুহূর্তও মায়ের সঙ্গে কাটানো হয়নি তার; সুহানা যেদিন প্রথম এই পৃথিবীর আলো দেখে চোখ মেলেছিল, তার মা সেদিনই চিরতরে চোখ বুজেছেন। হয়তো মা-ও সবার মতো তাকে একসেপ্ট করতে পারেননি— চারিদিকে বিষণ্ণতা ঘিরে ধরলো তাকে

পরক্ষণেই জাহিরের সেই কান্নারত মুখটা মনে পড়তেই সুহানার মনে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। ছেলেটা বড্ড পাগলামি করে! কিন্তু তার জন্য কাঁদার কী আছে? পরক্ষণেই নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল—সে আমার জন্য কাঁদবে কেন? কিন্তু সে তো কাঁদছিল! কেন কাঁদছিল সে?

ধীরে ধীরে এক্সিডেন্টের আগের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। রেবেকার উদ্দেশ্য নিয়ে সে আগে থেকেই কিছুটা অনুমান করেছিল, কিন্তু রেবেকা যে এতটা গভীরে গিয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছে, তা সে ভাবেনি । ডেনিয়েল, রেবেকা—সবাইকে নিয়ে তার ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু ফিনা? ফিনা কোথায়?

সুহানা চোখ খুলল কিন্তু বেশিদূর দেখতে পেলো না ঝাপসা চশমা নেই চোখে বেশিদূর দেখতে পাইনা । সে যখন শেষবার জ্ঞান হারায়, তখন সে ফিনার কোলেই ছিল। ফিনার কান্নাভেজা মুখটাই ছিল তার দেখা শেষ দৃশ্য। তারপর আর কিছু মনে নেই। এখন শরীরে সামান্য নড়াচড়া করার শক্তি থাকলেও কোথাও যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তবে সুহানা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—ফিনার যদি কিছু হয়, তবে সে নিজের হাতে নিজ দায়িত্বে তাদের দাফন সম্পন্ন করবে।

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমেরআলোড়ন

#suhanjoy

Thank You

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

(আমি একটা ছোট মন্তব্যের আশা রাখছি খারাপ-ভালো-বাজে- জঘন্য যা মনে আসে , just one little sentence, কেউ যদি পড়ে থাকেন তবে ইচ্ছে হলে দেবেন 🍀)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন