ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

২০তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ২০

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

ডাক্তার সাহেব নিজের চেম্বারের ভেতরে আরামেই আছেন, বাইরে যে বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল সে খবর তার কানে পৌঁছায়নি। আফ্রিদি অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে সুহানার স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে শেষমেশ জাহিরকে শান্ত করতে সক্ষম হলো। জাহির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উৎসুক ভিড়টাকে লক্ষ্য করে বিকট ধমক দিয়ে উঠল— “What?!” মুহূর্তের মধ্যে সব স্টাফ যে যার কাজে হাওয়া হয়ে গেল।

এদিকে ফিনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। জাহির গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করলেও তার গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। — ওই ডাক্তারের বাচ্চা একটু আগে একা রুমে সুহানার চেকআপ করছিল, নিশ্চয়ই ওকে ছুঁয়েও দেখেছে! এই আস্ত হাসপাতালে কি কোনো লেডি ডাক্তার ছিল না? ব্লাডি বাস্টা*র্ড!

আফ্রিদি তখনও বুকে হাত দিয়ে হাপাচ্ছে। মনে মনে বিড়বিড় করল, “শালা, কী জোর গায়ে! আমার বুকে ব্যথা উঠে গেছে একে সামলাতে গিয়ে!”

কিচ্ছু মুহুর্ত অতিবাহিত হতেই জাহিরের গমগমে কন্ঠস্বর শোনা গেল— “ফিনা!”

ফিনা চমকে উঠে জাহিরের দিকে তাকাল। জাহির চোখের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। ফিনা কাঁপাকাঁপা পায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জাহির শান্ত কিন্তু কঠোর স্বরে বলল, “সেদিন ঠিক কী হয়েছিল, প্রথম থেকে সবটা আমাকে খুলে বলো।”

ফিনা এই মুহূর্তটার ভয়েই এতক্ষণ কুঁকড়ে ছিল। সে জানে না কী উত্তর দেবে, কী বলবে সে ? তার চোখের আতঙ্ক দেখে জাহির নরম স্বরে যোগ করল, “ভয় পেও না, যা যা হয়েছে সব বলো আমাকে।”

ফিনা কয়েক মুহূর্ত ভাবল, তারপর নিজেকে প্রস্তুত করলো একটা মিথ্যে কাহিনী সাজাল। সে বলল, “সেদিন রাতে একটা বড় অর্ডার এসেছিল, কিন্তু ততক্ষণে ডেলিভারি সার্ভিসের লোক চলে গিয়েছিল। সুহানা তাই একাই ডেলিভারি দিতে গিয়েছিল। আমি তখন উপরে ছিলাম না, তাই মানাও করতে পারিনি। পরে একজন কল করে জানাল ওর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে এবং এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে; আমাকেও তখনই আসতে বলল।”

জাহির আর আফ্রিদি খুব মন দিয়ে ওর কথাগুলো শুনল। আফ্রিদি তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, “অ্যাক্সিডেন্টটা ঠিক কোথায় হয়েছিল?”

“সেটা তো জানি না! আমি তো বললামই, আমি তখন ওখানে ছিলাম না,” ফিনা মাথা নিচু করে উত্তর দিল।

জাহির এবার সরাসরি জানতে চাইল, “ডেলিভারি অ্যাড্রেসটা কী ছিল? কোথায় যাচ্ছিল ও?”

ফিনা এবার ঘোর বিপদে পড়ল। আর কত মিথ্যে সে বানিয়ে বলবে? তোতলাতে তোতলাতে সে বলল, “সেটা... সেটা তো আমার ঠিক মনে নেই।”

আফ্রিদি ছাড়ার পাত্র নয়, সে আবারও জেরা করল, “আচ্ছা, অর্ডারটা কীভাবে এসেছিল? ফোন কলে না কি মেসেজে?”

ফিনা আমতা আমতা করে বলল, “সেটা তো সুহানাই জানে। ওর ফোনেই বোধহয় এসেছিল।”

জাহির এবার নড়েচড়ে বসল, “ওর ফোনটা কোথায়? দেওয়া যাবে !”

ফিনা একটা ঢোক গিলে বলল, “সেটা তো নষ্ট হয়ে গেছে, সার্ভিসিংয়ে দেওয়া আছে।”

জাহির বিরক্ত হয়ে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, “শিট! এত বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল, অথচ আমাদের হাতে কোনো ক্লুই নেই?”

জাহির দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে মনে মনে ভাবল, এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটল আর কোনো চিহ্ন থাকবে না, এটা হতেই পারে না। সে কিছুক্ষণ পায়চারি করল, তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আফ্রিদির দিকে তাকাল।

আফ্রিদি বুঝতে পারল জাহিরের মাথায় কেছু ঘুরছে। জাহির বলল, “আফ্রিদি, যে ওকে নিয়ে এসেছিল তার নাম হাসপাতালের রেজিষ্টারে তো থাকার কথা, ওকে কে নিয়ে এসেছিল।

ফিনা এবার রীতিমতো ঘামতে শুরু করল। একটার পর একটা মিথ্যে বলতে গিয়ে সে নিজেই নিজের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে।-“আসলে... সেটা তো অনেক দূরে, ওই লোকের নাম আমি জিজ্ঞাস করিনি সুহানা কে নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলাম, জায়গার নাম ঠিক মনে পড়ছে না।”

ফিনা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, সে শুধু অন্যদেরই নয়, বরং নিজের সঙ্গেই চরম প্রতারণা করছে। একবার তার মনে হলো, সব সত্যি কি বলে দেবে? যদি ওরা কোনো সাহায্য করতে পারে! কিন্তু পরক্ষণেই রেবেকার নিষ্ঠুর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে শিউরে উঠল। রেবেকা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়; উল্টে জানাজানি হলে সে আরও ভয়ংকর কিছু করে বসবে।

জাহির আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গটগট করে সুহানার কেবিনের দিকে চলে গেল। বাইরে করিডোরে তখন শুধু আফ্রিদি আর ফিনা দাঁড়িয়ে। আফ্রিদির মস্তিষ্ক ততক্ষণে অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছে—আজ সকালে ফিনা কেন ডেনিয়েলের গাড়িতে ছিল? এক দিন ধরে ওর ফোন কেন বন্ধ ছিল? ফিনা কি কোনো কিছু গোপন করছে, না কি সে কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাচ্ছে? সুহানার পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারেও ওর অদ্ভুত আপত্তি! সুহানা যদি পরীক্ষা দিতে পারে, তবে তাতে সমস্যা কোথায়? এক বছর পিছিয়ে পড়লে তো মেয়েটারই ক্ষতি।

আফ্রিদি এবার গলার স্বর কিছুটা নরম করে জিজ্ঞেস করল, “ফিনা, তুমি কি কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাচ্ছ?”

ফিনা চমকে উঠে আমতা আমতা করে বলল, “না না, ভয় পাব কেন? তেমন কিছু না।”

আফ্রিদি ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আবারও প্রশ্ন করল, “শিওর তো?”

ফিনা জোর করে মুখে হাসি টেনে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম শিওর!”

আফ্রিদি মনে মনে ভাবল, “মুখের কথায় শিওর বললেই কি আর সব সত্যি হয়ে যায়? তোমার চোখের চঞ্চলতা অন্য কথা বলছে, খুকুমণি।” তবে সে আপাতত আর জোরাজুরি করল না। সে জানে, এই মুহূর্তে চাপ দিলে ফিনা আরও বেশি গুটিয়ে যাবে।

আফ্রিদি ফিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সকালে কিছু খেয়েছ?”

ফিনা মাথা নেড়ে ছোট করে উত্তর দিল, “না।”

“ আমিও তো খাইনি! চলো, দুজনে একসাথে ব্রেকফাস্ট করে আসি। আর এদিকে আমাদের এই ‘রোমিও-জুলিয়েট’কে একটু একান্ত সময় কাটাতে দাও, জাহির একতরফা কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করুক ।”

আফ্রিদির কথায়ে ফিনা কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “না না ভাই, আপনি খেয়ে নিন। আমি বরং এখানেই বসি।”

আফ্রিদি আবারো , “আরে চলো তো! না খেয়ে শরীর খারাপ করবে , আর আমার একা একা খেতে একদম ভালো লাগে না। প্লিজ, চলো না!”

আফ্রিদির বারবার অনুরোধে ফিনা আর না করতে পারল না, শেষমেশ রাজি হলো। “চলো, যাওয়ার সময় মেডিসিনগুলোও নিয়ে নিতে হবে। আমাদের জাহির সাহেব তো সুহানার প্রেমে মশগুল হয়ে ওষুধের কথা ভুলেই গেছেন!”

জাহির কেবিনে প্রবেশ করতেই সুহানা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। জাহির কোনো কথা না বলে সোজা এসে সুহানার সামনে দাঁড়াল। সুহানা ঘাড় উঁচিয়ে জাহিরকে দেখছে; লোকটার চেহারা আজ বেশ গম্ভীর, তবে দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। এই গাম্ভীর্য যেন তাকে আরও বেশি ‘হ্যান্ডসাম’ করে তুলেছে! সুহানা নিজের ভাবনার রাশ টেনে ধরল— ছি ছি! এই সব কী ভাবছে সে?

জাহির বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করল, “তুমি Abitur exam টা এই ইয়ার এ দিতে চাও?”

সুহানা নিচু স্বরে ছোট করে উত্তর দিল, “হুম।”

পরক্ষণেই জাহির ‘ধপ’ করে দুই হাত বেডের ওপর রাখল এবং সুহানার দিকে ঝুঁকে এল। সে দাঁত কিড়মিড় করে একটু ধমকের সুরে বলল, “তা পরীক্ষা দেওয়ার কথাটা আমাকে বলতে তোমার কী হয়েছিল? ওই ডাক্তারের কাছে আবদার করতে গেলে কেন তুমি?”

জাহিরের এভাবে হঠাৎ ঝুঁকে আসায় সুহানা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে পিছিয়ে গেল। সে আবার একটু মুখ তুলে জাহিরের চোখের দিকে তাকাল। জাহির ওর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আবারও তাগাদা দিল, “কী হলো? চুপ করে আছ কেন?”

সুহানা উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ নাড়াতে চাইল, কিন্তু পারল না। ড্রেসিং করার পর ক্ষতস্থানগুলো যেন নতুন করে চনমন করে উঠেছে, ব্যথায় তার মুখ কুঁচকে এল।

এদিকে জাহির একদৃষ্টে সুহানার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের মণি দুটোর দিকে তাকাতেই জাহিরের রাগটা যেন আবার চড়চড়িয়ে বাড়তে শুরু করল—কারণ ওই ‘হারামজাদা’ ডাক্তার এই চোখ দুটোরই তারিফ করছিল! রাগের মাথায় সে আবারও হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “এই যে! কী বলছি আমি? উত্তর দিচ্ছ না কেন?”

জাহিরের এই হঠাৎ চিৎকারে সুহানা ভয় পেয়ে চোখ খিঁচে পেছনের দিকে হেলে গেল। তীব্র চিৎকারের শব্দে তার মাথায় যেন হাতুড়ির ঘা পড়ল, আর হুড়মুড় করে সরতে গিয়ে ড্রেসিং করা হাতে চাপ লাগায় সে কুঁকড়ে গেল। ওর মুখ দিয়ে যন্ত্রণার একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরোল— “আহহ!”

সুহানার আর্তনাদ শুনে জাহিরের হুঁশ ফিরল। তার মনে পড়ল, ডাক্তার তো ওর কথা বলা একদম নিষেধ করে দিয়েছেন! নিজের বোকামিতে নিজেই লজ্জিত হয়ে সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সুহানার ডান কাঁধটা ধরতে গেল। কিন্তু সেখানেও সুহানার একটা কাটা জখম ছিল, স্পর্শ লাগামাত্র সে যন্ত্রণায় শিউরে উঠল।

জাহির দিশেহারা হয়ে পড়ল—কোথায় ধরবে আর কীভাবে ওকে , বুঝতে পারল না। সে তড়িঘড়ি করে বেডের পাশে এসে খুব আলতো করে সুহানার পিঠের পেছনে হাত দিয়ে ওকে আগলে ধরল। ব্যাকুল হয়ে বলতে লাগল, “সুহু! সরি, সরি... আমি সত্যিই খুব সরি! আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম যে তোমার কথা বলা বারণ। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও, সো সরি!”

সুহানার শরীরটা যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ছিল, সে ব্যথার তীব্রতায় নিজেকে সামলাতে না পেরে জাহিরের বুকের ওপর হেলে পড়ল। ওর চোখের এক কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সেই জলের ধারা জাহিরের চোখে পড়তেই তার নিজের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হলো; নিজেকে কষিয়ে দুটো লাথি মারতে ইচ্ছে করল তার। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা সে কীভাবে বেমালুম ভুলে গেল!

সে খুব আদুরে গলায় ডাকল, “সুহু! খুব বেশি ব্যথা করছে?”

সুহানা জাহিরের ডাকটা শুনতে পেল। এই অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেও জাহিরের কণ্ঠস্বর ওর কানে যেন এক পশলা শান্তির মতো শোনাল। কেন এমন হচ্ছে, সেটা সুহানা নিজেও বুঝতে পারছে না।

জাহির অতি সাবধানে সুহানার মাথায় হাত রাখল। কালকের মতো আজও ওর ভেতরটা কান্নায় ফেটে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর সুহানা কারো নাক টানার মতো শব্দ শুনতে পেল। সে অনেক কষ্টে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল, জাহির সত্যিই কাঁদছে! ওর নাক ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে, আর চোখে টলটল করছে জল।

সুহানাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাহির দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। সে খুব সাবধানে সুহানাকে কোলে করে একটু পেছনের দিকে সরিয়ে দিল এবং বালিশটা সোজা করে সেখানে ওকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল। তারপর পাশে বসে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে করুণ স্বরে বলল, “সরি!”

সুহানা অবাক হয়ে ভাবছে—একটা পুরুষ মানুষ এতোটা ‘ছিঁচকাঁদুনে’ হয় কী করে? এই মাত্র লোকটা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গিয়েছিল, আবার এখন কেমন বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে! সুহানার মনে মনে বেশ হাসি পেল, কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সে হাসি চেপে রাখল।

সুহানা জাহিরের কাছে তার ফোনটা চাইল। জাহির প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না, সে বিভ্রান্ত হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সুহানা তখন হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিল যে তার ফোনটা দরকার।

জাহির পকেট থেকে ফোন বের করে সুহানার হাতে দিল। সুহানা ফোন ওন করে দেখল কোনো পাসওয়ার্ড দেওয়া নেই। সে নোটপ্যাডে গিয়ে দ্রুত টাইপ করল:

“আমি পরীক্ষা দিতে চাই। আজকের দিন বাদ দিলেও এখনো চার দিন সময় আছে। আমি যেকোনো মূল্যে পরীক্ষায় বসবই। আপনার কি এতে কোনো সমস্যা আছে?”

লেখা শেষ করে সে ফোনটা জাহিরের হাতে দিল। জাহির লেখাটা পড়ামাত্রই অস্থির হয়ে উঠল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল— “কিন্তু তুমি এই অবস্থায় কীভাবে...”

সুহানা হাত তুলে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। তার দৃঢ় চাহনি দেখে জাহির কথা বাড়ানোর সাহস পেল না, চুপ হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আফ্রিদি আর ফিনা জাহিরের জন্য স্যান্ডউইচ আর ওষুধের ব্যাগ নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল।

আফ্রিদি আর ফিনা ভেতরে ঢুকতেই কেবিনের থমথমে ভাবটা লক্ষ্য করল। জাহির তখনো ফোনটা হাতে নিয়ে সুহানার দিকে চেয়ে আছে, আর সুহানার চোখেমুখে এক অনড় জেদ।

আফ্রিদি ওষুধের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপার? তোদের দুই মূর্তিকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো নতুন ঝামেলা হলো নাকি?”

জাহির কোনো উত্তর না দিয়ে সুহানার লেখা নোটপ্যাডটা আফ্রিদির দিকে এগিয়ে দিল। আফ্রিদি লেখাটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সুহানার দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল, সুহানাকে এই সিদ্ধান্ত থেকে ফেরানো কঠিন হবে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “পরীক্ষা দিবি সেটা তো ভালো কথা”।

ফিনা এতোক্ষণ চুপচাপ ছিল, সে প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে বলে উঠল, “না সুহানা, তুই একদম পাগলামি করিস না। তোর স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় কি পরীক্ষা? এই অবস্থায় পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয় । জাহির ভাই, আপনি ওকে বোঝান!”

জাহির এতক্ষণ ঝিম মেরে ছিল, এবার সে সোজা হয়ে বসল। ফিনার দিকে একবার তাকিয়ে সে সুহানার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। সুহানা চুপ করে আছে সামনে তাকিয়ে, জাহির গম্ভীর গলায় বলল, “এক্সাম এর আগে সুস্থ হতে পারলে দেবে এখন অনেক দেরি ওই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাব নেই”

জাহির স্যান্ডউইচের প্যাকেট খুলতে খুলতে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল, “আফ্রিদি, জানিস—একজন মানুষ কথা বলতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু সে সব শুনতে তো পাচ্ছে। তার আবার গান খুব পছন্দ, অথচ সে এখন হেডফোন লাগিয়ে গানও শুনতে পারবে না, কী বিড়ম্বনা বল তো ভেরি মাচ ইমোশনাল ব্যাপার সাপার!”

সুহানা স্পষ্ট বুঝতে পারল জাহির তাকে উদ্দেশ্য করেই খোঁচাটা দিয়েছে। সে স্যান্ডউইচে একটা কামড় বসাল। আফ্রিদি জাহিরের এমন রসিকতা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল। কিন্তু ফিনা এই হাসাহাসিতে যোগ দিল না; সে কিছুটা দূরে গিয়ে বসল। তার মনের ভেতর এখন অন্য চিন্তা তোলপাড় করছে—সুহানা যদি সত্যিই পরীক্ষা দিতে যায়, তবে সেখানে কী ঘটবে?

সুহানা চোখের ইশারায় আফ্রিদিকে ইঙ্গিত করল ফিনাকে ডাকার জন্য। আফ্রিদি গলা বাড়িয়ে ডাকল, “ফিনা, সুহানা তোমাকে ডাকছে।“

ফিনা ধীরপায়ে সুহানার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। সুহানার পাশে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “কোনো সমস্যা হচ্ছে? শরীর খারাপ লাগছে তোর?”

সুহানা মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। সে স্থির দৃষ্টিতে ফিনার দিকে তাকিয়ে রইল। সুহানা বেশ বুঝতে পারছে মেয়েটার মনের ভেতর ঝোড়ো হাওয়া বইছে। কেন ফিনা এতটা চিন্তিত, তার কারণটাও সুহানার অজানা নয়—কিছু কথা ইতিপূর্বেই তার কানে এসেছে। তবে এখন এই জনসমক্ষে সেসব নিয়ে কথা বলার একদমই পরিবেশ নেই।

সুহানা হাতের ইশারায় ফিনাকে বোঝাল, “এখন এখানে সময় নষ্ট না করে বাড়ি যা। গিয়ে পড়তে বস। কাল আসার সময় আমারনোটসগুলো নিয়ে আসিস।“

সুহানার চোখের ভাষা ফিনা খুব সহজেই পড়তে পারে। সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আমি এক্সাম দেব না, আর তুইও দিবি না”

সুহানা কোনো কথা বলল না, শুধু একরাশ শান্ত ও গভীর দৃষ্টিতে ফিনার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতেই যেন সব উত্তর লুকিয়ে ছিল। ফিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “আগে তুই ঠিক হ, তারপর সব হবে। আমি এখন তোকে ফেলে বাড়ি যাব না।“

অনেকক্ষণ বোঝানোর পর শেষমেশ ফিনা রাজি হলো। আফ্রিদির ওপর দায়িত্ব পড়ল ফিনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার। অবশ্য আফ্রিদির মনে মনে অন্য একটা পরিকল্পনাও আছে, ফেরার পথে সেই কাজটা তাকে সারতে হবে। তারা দুজনে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু জাহির নড়ল না। সে ঠাঁয় বসে রইল সুহানার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। চারপাশের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ সে গুনগুন করে গেয়ে উঠল...

🎼 “জিস পে রাখে তুম নে কদম,

আব সে মেরা ভি রাস্তা হ্যায়...

জ্যায়সে মেরা তুম সে কোয়ি

পিছলে জনম কা ওয়াস্তা হ্যায়...” 🎶

সুহানা অবাক হয়ে জাহিরের দিকে তাকাও, তার প্রেডিকশন অনুসারে জাহির হিন্দি পারে না জেনেও না তবে গান । জাহির থামল না, গানের প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসছিল তার সামনে থাকা রমণী কেই উদ্দেশ্য করে বলছিল সে:

🎵 “অধুরে অধুরে...

থে ও দিন হামারে,

তুমহারে বিন জো

গুজারে থে সারে...

🎵 সিতারে সিতারে...

মিলে হ্যায় সিতারে,

তভি তো হুয়ে হ্যায়

নাজারে তুমহারে।” 🎼

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমেরআলোড়ন

#suhanjoy

#midnight_tales_by_joy

Thank You 🎀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন