ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

২৩তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ২৩

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

ইন্টারভিউ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। কিন্তু জাহির আর আফ্রিদির সেদিকে খেয়ালই নেই; তারা তখনো একে অপরের কলার ধরে ধস্তাধস্তিতে লিপ্ত। টানাটানিতে দুজনেরই নাজেহাল অবস্থা। ঠিক সেই মুহূর্তে মিকি দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরে এই দুই 'মক্কেলের' কাণ্ড দেখে সে কপালে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে বসে পড়ল।

মিকি আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠল, “স্যার! আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। আপনারা কি এই বিধ্বস্ত অবস্থায় ইন্টারভিউ দিতে ভেতরে যাবেন?”

মিকির কথায় হুঁশ ফিরল ওদের। জাহির এক ঝটকায় আফ্রিদিকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাত দিয়ে অবিন্যস্ত চুলগুলো সেট করতে করতে বিড়বিড় করল, “এত সেজেগুজে এলাম, আর শেষে কী হাল হলো! ছ্যাঁ!”

সে এবার নজর দিল আফ্রিদির দিকে। আফ্রিদি ভেতরে একটা টিশার্টের ওপর সি-গ্রিন কালারের একটা শার্ট পরে আছে। জাহির ঠোঁট বাঁকিয়ে এক কুটিল শয়তানি হাসি দিতেই আফ্রিদি প্রমাদ গুনল। সে নিজের জামাকাপড় ঠিক করতে করতে তর্জনী উঁচিয়ে সতর্ক করে দিল, “ জাহির! এখন এসব ভেতর চেপে রাখ। পরে সময়মতো সুদ-আসলে সব উসুল করব। এখন নাটক বাদ দিয়ে চল!”

জাহির নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “যাবই তো! তবে তার আগে তোর শার্টটা দে।”

আফ্রিদি আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল, “না! আমার শার্ট আমি দেব না।”

“আরে আমার কাছে তো জামাই নেই! জলদি দে বলছি।”

“ইম্পসিবল! আমি কিছুতেই দেব না।” আফ্রিদি তখন দরজার দিকে পিছিয়ে যাচ্ছে, “শালা, আমি এটা তোকে দেবই না!”

কিন্তু জাহির কি আর অত সহজে মানার পাত্র? সে জোরজবরদস্তি করে আফ্রিদির গা থেকে শার্টটা একপ্রকার খুলে নিল। উপায়ান্তর না দেখে আফ্রিদি গজগজ করতে লাগল। জাহির দ্রুত হাতে সি-গ্রিন শার্টটা গলিয়ে নিল, ওপরের দুটো বোতাম সে খোলাই রাখল। ধার করা শার্টে সে এখন পুরোপুরি ফিটফাট।

আফ্রিদি নিজের শার্ট হারিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বলল, "তোর নামে আমি 'পুরুষ বস্ত্রহরণ' মামলা দেব, দেখে নিস!"

জাহির আয়নায় নিজের কলার ঠিক করতে করতে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, "ওকে, ফাইন। দেখা যাবে!"

বাইরে তখন হাড়কাঁপানো শীত, অথচ ভেতরে এই দুই মক্কেলের কারো গায়েই এখন শীতের পোশাক নেই—একজন তো অন্যের থেকে শার্ট ছিনিয়ে নিয়ে পরেছে। জাহির নিজের গম্ভীর গলায় বলল, "চল, এবার প্রফেশনাল হওয়া যাক।"

ভেতরে ছয়জন ইন্টারভিউয়ার বসে আছেন। তাদের মধ্যে নামকরা সব স্পোর্টস পারসন রয়েছেন, আছেন দুইজন সিনিয়র জার্নালিস্ট। জাহির আর আফ্রিদি রুমে পা রাখতেই পুরো পরিবেশটা মুহূর্তেই বদলে গেল। বিচারকরা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বসতে বললেন। বিশেষ করে জাহিরের সেই অদম্য 'র' চার্ম আর ব্যক্তিত্ব দেখে সবাই বেশ মুগ্ধ হলেন।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রশ্ন-উত্তরের পর্ব বেশ জমিয়ে চলছিল। হঠাৎ মাঝপথে বড় স্ক্রিনে জাহিরের আজকের এন্ট্রির ভিডিওটি চালানো হলো। সেখানে দেখা যাচ্ছে জাহিরকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা আর তার নাজেহাল অবস্থা। ভিডিওটি দেখে ইন্টারভিউ রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। আফ্রিদি তো জাহিরের গম্ভীর মুখের রিঅ্যাকশন দেখে হেসেই খুন! ভিডিওতে চিৎকারের কারণে সব কথা স্পষ্ট শোনা না গেলেও দৃশ্যগুলো ছিল বেশ মজাদার।

একজন ইন্টারভিউয়ার হাসিমুখে জাহিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এই ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন তুঙ্গে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতি আর আপনার এই 'ফ্যান ক্রেজ' নিয়ে আপনি কী বলতে চান, মিস্টার এম.জে (MJ)?"

জাহির বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, "এটাকে বলে ‘পাবলিক লাভ’। আমি আর আমার এই বর্তমান অবস্থা—সবই আমার ফানদের অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন। তারা আমাকে এতটাই ভালোবাসে যে, মাঝেমধ্যে আমার পোশাকটাকেও স্মারক হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দিতে চায়।"

জাহিরের এমন উপস্থিত বুদ্ধি আর রসিকতা শুনে বিচারকমণ্ডলী হো হো করে হেসে উঠলেন। আফ্রিদি পাশে বসে মনে মনে বলল, “শালা! এখানেও টিকে গেলি!”

এরপর শুরু হলো মূল আলোচনা। আগামী দিনের খেলার পরিকল্পনা, ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং ব্যক্তিজীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন করা হলো। জাহির আর আফ্রিদি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিল। তাদের কোচও আলোচনায় অংশ নিয়ে তাদের দুজনের সম্পর্কে দেশবাসীকে নতুন নতুন তথ্য দিলেন এবং তাদের পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। এভাবেই দীর্ঘ তিন ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিটের এই ম্যারাথন সেশনটি চলতে লাগল।

টানা বসে থাকতে থাকতে দুই বন্ধুরই কোমর ধরে গিয়েছিল। সেশন শেষ হতেই তারা আড়মোড়া ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকালো। জাহিরের বুকটা ধক করে উঠল—সুহানার পরীক্ষা শেষ হতে আর মাত্র কুড়ি মিনিট বাকি!

আর এক মুহূর্তও দেরি করার উপায় নেই। তারা দ্রুত কর্তৃপক্ষের দেওয়া গিফট হ্যাম্পারগুলো হাতে নিয়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এল।

গাড়ি স্টার্ট হতেই জাহির ড্রাইভারকে কড়া গলায় নির্দেশ দিল, "যত দ্রুত সম্ভব চলো ফাস্ট ফাস্ট!"

গাড়ি চলছে ঝড়ের গতিতে। জাহির সিটে হেলান দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ সে নিস্তব্ধতা ভেঙে আফ্রিদিকে জিজ্ঞেস করল, "সুহানার অ্যাক্সিডেন্টের বিষয়ে নতুন কোনো খবর পেলি?"

আফ্রিদি জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, "নাহ্। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো সূত্রই মেলাতে পারছি না। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত—ফিনা কিছু একটা হাইড করছে। ও সবটা জানে, কিন্তু মুখ খুলছে না।"

জাহির এবার বেশ সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে আফ্রিদির দিকে তাকালো। জাহিরের চাউনি দেখে আফ্রিদি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "ওভাবে দেখছিস কেন? হোয়াট?"

জাহির নির্লিপ্ত গলায় বলল, "কী লুকাচ্ছে ও?"

"সেটাই তো জানি না ব্রো ওকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু সে কিছুই বলেনি। তবে আমি দেখছি কী করা যায়। তুই এখন ওকে কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আগে ওর এক্সামটা শেষ হোক, ও একটু টেনশন ফ্রি হোক; তারপর নাহয় দেখা যাবে।"

জাহির শক্ত হাতে গিফট হ্যাম্পারটা চেপে ধরল। চোয়াল শক্ত করে সে বিড়বিড় করে বলল, "হুম। তবে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজটা একবার হাতে পেলেই বোঝা যাবে ওকে সেদিন ঠিক কে ওখানে নিয়ে এসেছিল। সব ধোঁয়াশা তখন কেটে যাবে।"

জাহির গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, "সুহানার ফোনটা আমি চেক করেছি। কোনো ফুড অর্ডার বা সন্দেহজনক কিছুর হদিস পাইনি। তবে কয়েকটা আননোন নম্বর থেকে কল এসেছিল। নম্বরগুলো সার্চ করে দেখলাম, সেগুলো এখন আর সচল নেই। রেকর্ড ঘেঁটে একজনের নাম এসেছে—ব্র্যাক। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ডকুমেন্ট বলছে সে এখন মৃত। বিষয়টা বড্ড জটিল হয়ে যাচ্ছে , এত সহজে সমাধান মিলবে বলে মনে হয় না।"

গাড়ি যখন সুহানার পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে গিয়ে থামল, ঘড়িতে তখনো পরীক্ষা শেষ হতে পাক্কা তিন মিনিট বাকি। জাহির একদম সঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে। আফ্রিদি গাড়ির দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল, অমনি জাহির পেছন থেকে ওর শার্টের কলার টেনে ধরল।

আফ্রিদি বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "কিরে! ছাড়, শার্টটা তো এবার ছিঁড়েই যাবে!"

জাহির নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, "বাইরে হাড়কাঁপানো শীত। সোয়েটার জ্যাকেট না পরে ওভাবে নামছিস কেন? যা গিয়ে ঠাণ্ডায় মর এবার!"

আফ্রিদি নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে জিভ কাটল, "উপস! ভুলেই গিয়েছিলাম।"

আফ্রিদি আবার ভেতরে ঢুকে জ্যাকেটটা টেনে নিল। জাহির জানালার কাঁচ নামিয়ে শান্ত চোখে গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।

গাড়ির ভেতরে হিটার চলায় আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক ছিল, কিন্তু বাইরের অবস্থা একদম ভিন্ন—হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শরীর জমে যাওয়ার জোগাড়। জাহির নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকে নিয়ে বাইরে বেরোল। দুই হাতে হ্যান্ড গ্লাভস, পায়ে মোজা, মাথায় মাফলার আর হাই-বুট ,ক্যাপ, মুখে মাস্ক আর চোখে সানগ্লাস- সে এখন প্যাকেট হতে দাঁড়িয়ে আছে।

লের লাস্ট বেল বাজতেই জাহির চটজলদি গেটের দিকে এগিয়ে গেল। আফ্রিদি ওর কাণ্ডকারখানা দেখছিল আর অবাক হচ্ছিল। জাহিরের এই দশা দেখলে তার ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের 'প্রফেসর জোন্স' নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবেন! এই সেই ছেলে, যে একসময় প্রফেসরের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্কে মেতে থাকত যে ভালোবাসা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। প্রেমের বিপক্ষে কত অকাট্য যুক্তিই না সে দিয়েছিল!

আর আজ দেখো—নিজের সমস্ত কিছু ভুলে একদম বেহায়ার মতো একটা মেয়ের পেছনে পড়ে আছে। তাও আবার নিজের চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট একটা মেয়ে, যে কিনা ওকে পাত্তাই দিচ্ছে না! জাহিরের এই একতরফা মগ্নতা দেখে আফ্রিদির মনে আজ বড্ড মায়া হলো। বন্ধুটা যে বড্ড কঠিনভাবে প্রেমে পড়েছে।

আফ্রিদি মনে মনে বিড়বিড় করল, “আহারে জাহির! একদিকে মেয়েরা তোকে পেলে ছিঁড়েখুঁড়ে ন্যাংটা করে দেয়, আর অন্যদিকে এই একজন—যে তোর দিকে ঠিক করে তাকায় পর্যন্ত না! ছি ছি, সমাজ এই অনৈতিক বৈষম্য কিছুতেই মেনে নেবে না।”

জাহির তাকিয়ে দেখল, সেই নার্সটি সুহানাকে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে আসছেন, আর পেছনে ফিনা একরাশ ক্লান্তি নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। সিঁড়ির কাছে আসতেই তারা থামল। জাহিরকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুহানা বিন্দুমাত্র অবাক হলো না; সে যেন আগে থেকেই জানত লোকটা এখানেই থাকবে।

জাহির গতবারের মতো এবারও অবলীলায় হুইলচেয়ারটি তুলে ধরে নিচে নামিয়ে দিল। তারপর নার্সের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল, “Thank you so much for taking care of her.”

নার্স মাথা নেড়ে সৌজন্য বিনিময় করলেন। জাহির খুব সাবধানে সুহানাকে নিয়ে বের হয়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল। ওদিকে ফিনা নিজের জগতেই নেই; সে বেখেয়ালিতে গাড়ির পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছিল। আফ্রিদি সেটা খেয়াল করে ওকে ডাক দিল—

"ফিনা! ওই দিকে কোথায় যাচ্ছ?"

ফিনা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে কিছুটা ভেবাচেকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলল, "হ্যাঁ!?"

আফ্রিদি ভ্রু কুঁচকে আবার জিজ্ঞেস করল, "বললাম যে ওই দিকে কোথায় যাচ্ছ?"

ফিনা নিজেকে সামলে বলল "কোথাও না তো!" ।

"তবে ওদিকে কেন যাচ্ছিলে?"

"না না, কিছু না। এমনিই।"

আফ্রিদি আর কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "পরীক্ষা কেমন হলো?"

"ভালো।"—সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ফিনা গিয়ে সুহানার পাশে দাঁড়াল।

জাহির তখন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সুহানার সব মেডিসিন চেক করছে এবং সে সময়মতো ওষুধ খেয়েছে কি না, তার তদারকি করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রেবেকা হাসতে হাসতে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু সুহানাকে জীবন্ত অবস্থায় সেখানে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়! রেবেকাকে দেখামাত্রই ফিনার শরীর শক্ত হয়ে গেল; সে দ্রুত সুহানার সামনে এসে দাঁড়াল যেন তাকে আড়াল করতে চায়। কারণ, রেবেকার মতো মেয়ের কোনো ঠিক নেই, সে যেকোনো সময় আবারও কোনো অঘটন ঘটাতে পারে।

ওদিকে রেবেকার মাথা রীতিমতো বনবন করে ঘুরছে। এটা কীভাবে সম্ভব? সুহানা এখানে এল কীভাবে? তার সব পরিকল্পনা কি তবে ভেস্তে গেল? একরাশ আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে সে ভাবল—এখন উপায় কী?

ফিনার হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুহানা বেশ বিরক্ত হলো। সে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "সর আমার সামনে থেকে।"

ফিনা নড়ল না, বরং আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে জবাব দিল, "নাহ্।"

সুহানা সন্ধিহান কন্ঠে আওড়ালো -"কেন?" ।

সে ফিনাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে ঘাড় কাত করে সামনের দিকে তাকালো। দেখল, কিছুটা দূরে রেবেকা স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। রেবেকার চোখেমুখে আতঙ্কের যে ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা দেখে সুহানার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে কোনো কথা না বলে ফিনাকে হাত ধরে একপাশে সরিয়ে দিল।

সুহানার মনে এক অদ্ভুত বিদ্রূপাত্মক হাসির উদয় হলো। সে মনে মনে বলল —"কত বড় ননসেন্স হলে ! সাপকে আধমরা করে রেখে চলে গিয়েছিল, ভেবেছিল সব শেষ। কিন্তু সে কি জানে না, সাপ যখন প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসে, তখন পালানোর আর কোনো পথ থাকে না? ইডিয়েট এর দল "

সুহানার স্থির আর জ্বলজ্বলে দৃষ্টি রেবেকার ওপর বিঁধে রইল। এক নিঃশব্দ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল সেখানে।

মেডিসিন আর ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে জাহির সুহানার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা স্থির দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সুহানার দৃষ্টি অনুসরণ করে জাহিরও সেদিকে চোখ ফেরালো। দেখল দূরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—বড্ড চেনা চেনা মুখ। কোথায় যেন দেখেছে একে?

স্মৃতির ওপর কিছুটা চাপ দিতেই মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে! এই সেই মেয়ে, যে সেদিন সবার সামনে ফিনাকে চড় মেরেছিল। জাহিরের বুঝতে বাকি রইল না যে, এখানে সাধারণ কোনো ঝামেলার চেয়েও বড় কিছু একটা আছে। সুহানার এই পরিস্থিতির পেছনে এই মেয়েটার কোনো না কোনো যোগসূত্র নিশ্চিতভাবে রয়েছে।

এমন সময় রেবেকার গাড়িটা এসে থামল। সে এক মুহূর্ত আর সেখানে দাঁড়ালো না, দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। জাহির তীক্ষ্ণ নজরে পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করল। তার নজর এড়ালো না ফিনার কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থাটা; মেয়েটা ভয়ে একদম চুপসে গেছে।

জাহিরের চোখের মণি সরু হয়ে এল। সে মনে মনে স্থির করল, এই রহস্যের শেষ দেখে তবেই সে শান্ত হবে।

জাহির পরম যত্নে সুহানাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিল। সবাই যার যার জায়গায় থিতু হওয়ার পর গাড়ি চলতে শুরু করল। জাহির শান্ত গলায় দুজনকে জিজ্ঞেস করল, "পরীক্ষা কেমন হলো তোমাদের?"

ফিনা আর সুহানা দুজনেই মৃদুস্বরে জানালো—ভালো হয়েছে।

গাড়িটা এখন ধীরগতিতে সুহানার রেস্তোরাঁ অভিমুখে এগোচ্ছে। সুহানা সিটে বসে থাকতে থাকতেই কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। জাহির মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঘুমের ঘোরে সুহানার ঠোঁট দুটো গোল হয়ে ফাঁক হয়ে আছে, সে মুখ দিয়ে হালকা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। জাহির একটু চিন্তায় পড়ে গেল—নাক বন্ধ কেনো ?ভেতরে কোনো সমস্যা হলো না তো ! ফিনা সেটা লক্ষ্য করলো জাহিরকে বলল শীত কালে ওর এমন হয়। জাহির নিশ্চিন্ত হলো। ফিনা পাশে বসে ওর বেণি করা চুলগুলো আলতো হাতে ঠিক করে দিল, যাতে ঘুমে ওর কষ্ট না হয়।

ওদিকে আফ্রিদি সুহানার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে দেখলেই তার ভেতর কেমন একটা বড় ভাইয়ের মতো আগলে রাখার অনুভূতি কাজ করে। কেন যে এমন হয়, সে নিজেও জানে না। তবে এই মায়াবী মেয়েটাকে দেখলে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় তার মনটা ভরে ওঠে।

গাড়িটা রেস্তোরাঁয় পৌঁছানো মাত্রই জাহির নিঃশব্দে নেমে পড়ল। সে খুব সতর্ক, যেন কোনো শব্দে সুহানার কাঁচা ঘুমটা না ভেঙে যায়। আফ্রিদিকে নিচু স্বরে বলল, "হুইলচেয়ারটা সাবধানে ওপরে নিয়ে আয়।"

জাহির পরম মমতায় সুহানাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। রেস্তোরাঁর পেছনের সিঁড়ি দিয়ে সে খুব সাবধানে পা টিপে টিপে ওপরে উঠতে লাগল। ফিনা আগে আগে গিয়ে চট করে ঘরের তালাটা খুলে দিল। জাহির ঘরে ঢুকে সুহানাকে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিল। ওর প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল গভীর যত্ন।

ফিনা জাহিরের দিকে একটি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, "ভাইয়া, আপনি বসুন। আমি আসছি।"

জাহির শান্ত গলায় বাধা দিয়ে বলল, "ফিনা, তোমার এখন মেহমানদারি করার দরকার নেই। আগে নিজে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর ওর খেয়াল রাখতে হবে। সুহানার প্রয়োজনীয় সবকিছু কোথায় কী আছে, এদিকে এসো—আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি।"

ততক্ষণে আফ্রিদি হুইলচেয়ারটা নিয়ে ওপরে চলে এল। জাহির খুঁটিনাটি সবকিছু ফিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে সুহানার গায়ের কম্বলটা টেনে দিল। যাওয়ার আগে অবলীলায় সুহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে। সুহানা তখন একপাশে ফিরে গভীর ঘুমে মগ্ন। কাজ শেষ করে জাহির আর আফ্রিদি দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ফিনা আর কথা বাড়াল না, সে নিজেও আজ ভীষণ ক্লান্ত। ওদের এগিয়ে দিয়ে সে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল। তবে মনের কোণে একটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে—রেবেকা এবার কী চাল চালবে? পরক্ষণেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, "যা হয় হোক, আর কতদিন এভাবে ভয় পেয়ে বেঁচে থাকা যায়? যা করার করবে, এবার আর ভয় পাব না।"

রেবেকা উন্মাদের মতো ঘরের সমস্ত জিনিস তছনছ করে ফেলেছে। ভাঙা কাঁচ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আসবাবপত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে সে যেন এক ধ্বংসলীলায় মেতেছে। মা শত চেষ্টা করেও তাকে শান্ত করতে পারছেন না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে মেঝে থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে ড্যানিয়েলকে কল করল।

ড্যানিয়েল তখন ল্যাপটপে জরুরি একটা কাজ করছিল। আদরের বোনের ফোন আসতেই সে কাজ থামিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরল।

“হ্যালো...”

ড্যানিয়েল কথা শেষ করার আগেই রেবেকা চিৎকার করে উঠল, “কিসের হ্যালো হ্যাঁ? তুমি একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারো না! তুমি একটা স্টুপিড ভাই ইউ আর ইউজলেস!”

ড্যানিয়েল কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আরে হয়েছেটা কী?”

“ওই হারামজাদিটা আজ পরীক্ষা দিতে এসেছিল! আমি বলেছিলাম না ও কই মাছের প্রাণ, এত সহজে মরবে না? ওকে শেষ করে দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার কথা শোনোনি। এখন আমার কী হবে? আমার রেপুটেশন কী হবে?”

ড্যানিয়েল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সুহানা পরীক্ষা দিতে গেছে? এটা কীভাবে সম্ভব! সে বিস্ময় নিয়ে বলল, “কী! তোর দেখার ভুল হয়েছে রেবেকা। এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। আমি আজ সকালেও খবর নিয়েছি, ও পরীক্ষা দেওয়ার মতো অবস্থাতেই নেই। কীভাবে কী হলো?”

“তুমি যে একটা অকর্মা সেটা স্বীকার করো ,তুমি কোনো কাজের নও! ড্যাড ঠিকই বলেন, তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। সবসময় শুধু বাবার নাম ভাঙিয়ে চললে, তবুও কোনো উন্নতি হলো না তোমার, আর কোনোদিন হবেও না। আমি হেরে গেছি ভাই, ওই সাধারণ মেয়েটার কাছে আমি হেরে গেছি শুধু তোমার জন্য! সব তোমার জন্য! আমি তোমাকে ছাড়ব না ড্যানিয়েল, আই হেট ইউ!”

ড্যানিয়েল কলটা কেটে দিল, আর এই চিৎকার শোনার ধৈর্য তার নেই। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা—ফিনা তাকে মিথ্যে বলেছে! কিন্তু কেন? নাকি ফিনা ইচ্ছে করেই এতদিন তাকে এই মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে সব কিছু তার পরিকল্পনা মতোই এগোচ্ছে? ড্যানিয়েল ভাবল, সে একবার ফিরুক, তারপর তাকে মজা বোঝাবে।

সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “বিট্রে! তাও আবার আমার সাথে? এর মাশুল তো তোমায় দিতেই হবে ডার্লিং। আমার খারাপ রূপটা তুমি এখনো দেখনি। সবসময় তোমার সাথে অনেক নরম ছিলাম আমি, কিন্তু তাতে তোমার মন ভরেনি। এখন দেখো আমি কী করি—এবার তোমাকে বোঝাবো আমি কি ? আমার সাথে গেম খেলেছো তুমি ? ।”

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেল আর নিউজফিড—সর্বত্রই এখন জাহিরের জয়জয়কার। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে জাহিরের সেই নাজেহাল অবস্থা, ভক্তদের ভিড়ে তার জামা ছিঁড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে উপস্থিত বুদ্ধিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া—সবটাই এখন ইন্টারনেটে ভাইরাল।

বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সুহানা আর ফিনা যখন ফোনের স্ক্রিনে জাহিরের এই কীর্তি দেখল, তখন তাদের হাসি আর থামে না। জাহিরের মতো একজন মানুষের এমনা অবস্থা দেখে তারা হেসেই খুন। তার ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো, আফ্রিদি আবার ফিনাকে সেই ঘটনার একটা ফুল এইচডি ভিডিও পাঠিয়েছে।

ভিডিওতে জাহিরের সেই অসহায় মুখটা দেখে দুই বান্ধবীর হাসির রোল পড়ে গেল। কাল যে পরীক্ষা আছে, সেদিকে কারো কোনো হুঁশ নেই; তারা কেবল ভিডিওটা দেখছে আর গড়াগড়ি খাচ্ছে। এই মুহূর্তে জাহিরের 'দুর্দশা' যেন তাদের সব ক্লান্তি আর টেনশনকে এক নিমেষে উধাও করে দিয়েছে।

রাত তখন একটা। আফ্রিদি আপনমনে ফোন স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ থমকে গেল। দেখল, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশের এক নামী সেলিব্রিটির সাথে জাহিরের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আপডেট হয়েছে! আফ্রিদি এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রাগে আর উত্তেজনায় ফুঁসতে ফুঁসতে বিড়বিড় করল, “মানে কী? শালা তলে তলে টেম্প চালাও তুমি ? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!”

সে ঝড়ের গতিতে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে জাহিরের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় পাসওয়ার্ড দিতেই খট করে খুলে গেল। রুম তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। আফ্রিদি লাইট জ্বালিয়েই হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে ধপাস করে বেডে বসে পড়ল। জাহিরকে উদ্দেশ্য করে সে চেঁচিয়ে বলল, “এই বেটা ওঠ! রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে, না? এই দেখ, আমি সব স্ক্রিনশট মেরে রেখেছি। এখনই সুহানাকে পাঠাবো, তারপর বুঝবি মজা!”

কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরও জাহিরের কোনো সাড়াশব্দ নেই। আফ্রিদি বিরক্ত হয়ে গায়ের কম্বলটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। কিন্তু একি! বিছানায় কেউ নেই, পুরো বেড ফাঁকা। জাহির গেল কই?

ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার কোণ থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ আফ্রিদির কানে ভেসে এল। নিস্তব্ধ ঘরে সেই শব্দটা শোনামাত্রই আফ্রিদির মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরে তাকালো। যা দেখল, তাতে তার শরীরের সব রক্ত হিম হয়ে গেল! বড় বড় চোখ করে সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোলো না। এক সেকেন্ডের মাথায় আতঙ্কে সে টুপ করে জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#midnight_tales_by_joy

#suhanjoy

Thank You 🍀

(Don’t copy without permission🤞)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন