ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৪৩তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৪৩

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

সুলেমানের বাড়ির প্রাঙ্গণে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছে এই ‘বিচার’ দেখার জন্য। সুহানা মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে কোনো ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা।

ভেতর থেকে গটগট করে বেরিয়ে এলেন জাহাঙ্গির সাহেব। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। বারান্দার চেয়ারে বসতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানের স্ত্রী চিৎকার করতে করতে সেখানে ঢুকলেন।

“ওরে আমার কলিজার টুকরা পোলারে শেষ কইরা দিছে! এই ডাইনি মাইয়া আমার সোনার চাঁদ পোলারে মারছে! জাহাঙ্গির ভাই, আপনে বিচার করেন! আমার পোলার গায়ে হাত তোলার সাহস পায় কই এই উটকো মাইয়া?”

জাহাঙ্গির সাহেব ধীরস্থিরভাবে সুহানার দিকে তাকালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “সুহানা, লোকজন যা বলছে তা কি সত্যি? তুমি প্রধানের ছেলেকে মেরেছ?”

সুহানা এক মুহূর্ত নীরব থেকে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, আমিই মেরেছি। ও যদি আবার একই কাজ করে, তবে আমি আবারও মারব।”

বাড়ির মহিলারা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে সুহানার দিকে তাকিয়ে আছেন। সবার দৃষ্টি এখন সুহানার ওপরই স্থির। তার প্রতিটি শব্দ বেশ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। সাবেরা নিজের কান্না থামিয়ে বিস্ময়ে সুহানার দিকে চেয়ে রইলেন। সবার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। এদিকে আফ্রিদি ভাইদের নিয়ে রাস্তায় পাহারা দিচ্ছে যাতে জাহির কোনোভাবেই এখানে আসতে না পারে। সামির গাড়ি আনতে গেছে। ফুফার কড়া নির্দেশ—জাহিরকে যেন এখন বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া না হয়। আশপাশে গ্রামের মানুষের ফিসফাস গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে:

“দেহো দেহো, কারবারটা দেহো! মাইয়ার কলিজা কত বড়! জাহাঙ্গীর সাবের সামনে খাড়ায়া কেমনে ফটফট কইরা কথা কয়!”

“হায়রে কপাল! মতির মাইয়ার কপালে আজ যে কী আছে! প্রধানের বউ তো ওরে কাঁচা চিবাইয়া খাইবো দেহি!”

ঠিক হেই সময় প্রধানের বউ আবার চিল্লাইয়া উঠলেন, “এক্কেরে মিছা কথা! আমার পোলার মতো সোনার টুকরা পোলা এই তল্লাটে নাই। এই ছেমড়িই আমার পোলারে ফুঁসলাইয়া ওই পুহুরপাড়ে নিয়া গেছে। অহন উল্টা আমার পোলার ঘাড়েই দোষ চাপাইতাছে!”

জাহাঙ্গীর সাহেব হাতের ইশারায় সবাইকে শান্ত হতে বললেন। তিনি সেই ছোট মেয়েটির দিকে তাকালেন, যে তখনো ভয়ে সুহানার পেছনে লুকিয়ে আছে আর তার গায়ে জড়ানো সেই ঢিলেঢালা সবুজ রঙের শার্টটা।

প্রধান সাহেব জাহাঙ্গীর সাহেবের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নালিশ শুরু করলেন, "দেহেন সাব, এই মাইয়া দেহেন আমার পোলানগো কী অবস্থা করছে! আপনের বাড়িত মেহমান হইয়া আইছে দেইখা কিছু কইতাছি না। এইডার একটা বিহিত আপনের করা লাগবো। আমার পোলায় কোনো কামে হাত দেয় নাই, সব ওই মতির মাইয়ার উস্কানি!"

মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। মেম্বাররাসহ গ্রামের অনেকেই এগিয়ে এসে হট্টগোল শুরু করল। মহিলারা আড়ালে দাঁড়িয়ে কটু কথা শোনাতে লাগল। মেয়েটির বাবা অসহায়ভাবে মাটিতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। মা-মরা মেয়েটাকে তিনি একাই আগলে বড় করেছেন, আজ তার সেই মেয়েই অপবাদের মুখে।

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন টিপ্পনী কাটল, “আরে থাউক! মাইয়া মাইনষে উস্কানি না দিলে কি আর কোনো ব্যাটা পোলায় গায়ে হাত দিবার সাহস পায়? যত দোষ নন্দ ঘোষ!”

আরেকজন তেড়ে এসে বলল, “সব দোষ ওই ছেমড়ির! হ্যায় ক্যান মারতে গেল? বাইরে থাইকা আইসা আমাগো ঘরের পোলানগো গায়ে হাত তুলবো, এত সোজা? ওরে আজকাই উচিত শিক্ষা দিয়া ছাড়ুম!”

এরই মধ্যে অভিযুক্ত সেই ছয়জন ছেলের একজন কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "“আমরা কিচ্ছু করি নাই গো কাকা ওই মাইয়াই আইসা আমাগো উল্টাপাল্টা কথা কইছে। বিশ্বাস করেন, ও নিজেই নিজের জামা ছিঁইড়া আমাগো ভাইরে ফাঁসানোর ধান্দা করতাছে!”

আরেকজন নিজের কাঁধ ঘষতে ঘষতে যোগ করল, “হ হ! হ্যায় তো ভাইরে ফঁাসাইয়া বিয়া বসার লাইগা এই নাটক সাজাইছে!”

বিহান এই পরিস্থিতিতে কী করবে তা বুঝতে পারছে না। জাসমীর আর জিশানকে সাহেব আটকে দিয়েছেন তাকে। তিনি অত্যন্ত গভীর নজরে সুহানাকে পর্যবেক্ষণ করছেন; সুহানার চোখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই, বরং সেখানে কেবল জমাটবদ্ধ ক্রোধ জ্বলজ্বল করছে। তার চেহারায় এক অদম্য তেজ ফুটে উঠেছে।

ইতিমধ্যেই বিচার বসে গেছে এবং সুহানাকে নিয়ে চারপাশ থেকে নানা কটু কথা ভেসে আসছে। ছোট মেয়েটি সুহানাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রামের প্রধান ইমতিয়াজ এবং তার ছেলে রায়হান মুখ খুলল। রায়হান নির্লজ্জের মতো দাবি করল, “মিলি আমারে ভালোবাসে। ও অনেকদিন ধইরাই আমার পিছনে লাগছে, আমারে এসব কইতাছে। আমি রাজি হই নাই দেইখাই ও আজ এই নাটক সাজাইছে, যাতে আমি ওরে বিয়া করতে বাধ্য হই!”

মতির মেয়ে মিলি এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে সুহানাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বিশ্বাস করেন আপা, আমি হেইনে ইচ্ছা কইরা যাই নাই। আমি খালি চুলার লাইগা পুহুরপাড় থাইকা একলা মাটি আনতে গেছিলাম, আর তখনি...”

আশপাশের মহিলারা সুহানার কথা শুনতে পেয়ে রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে এলেন। তারা কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগলেন, “এই কি রে! হেই থাইকা তোর ঢং-তামশা দেখতাছি। বেহায়া মাইয়া কোথাকার! পোলানগো কি খাইয়া-দাইয়া কাম নাই যে তোর পিছে পিছে ঘুরবো? তোর শরীলে এমন কী সোনা ফলছে যে পোলানগো আর কোনো কাম নাই, খালি তোর পিছেই ছুটবো?”

আরেকজন তাল মিলিয়ে বলে উঠলেন, “ঠিকই কইছেন ভাবি, এই ছেমড়ির চল-চরিত্র এক্কেরে খারাপ!”

মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামের মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল এবং সুহানাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কটু কথা বলতে শুরু করল। জাহাঙ্গীর সাহেব পরিস্থিতি দেখে বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। এমন প্রতিকূল অবস্থায় তিনি আগে কখনো পড়েননি। তবে ছোটবেলায় তার বাবাকে এই কেদারায় বসেই বহু বিচার করতে দেখেছেন। তখন মানুষ ভয়ে থরথর করে কাঁপত, টুঁ শব্দ করার সাহস পেত না। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন, সে সামলাতে পারছে না।

মানুষের সেই নোংরা গুঞ্জনগুলো সুহানার কানে আসছে। মিলি আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে সুহানার গায়ে থাকা চেক শার্টটা শক্ত করে খামচে ধরল। পরিস্থিতি যখন চরম উত্তেজনাকর, ঠিক তখনই কয়েকজন মহিলা মারমুখী ভঙ্গিতে সুহানার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন।

“এইই…....!”

সুহানার এক প্রচণ্ড ধমকে মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এক তুষারশীতল বাতাস বয়ে গেল চারদিকে। সেখানে উপস্থিত প্রায় শখানেক এর বেশি মানুষ এক নিমেষে নিশ্চুপ হয়ে গেল, সুহানার কণ্ঠের তীক্ষ্ণ তেজ সবার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এমনকি স্বয়ং জাহাঙ্গীর সাহেবও পরিস্থিতির আকস্মিকতায় নিজের ধৈর্য হারিয়ে থমকে গেলেন।

সুহানা মিলিকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে জাহাঙ্গীর সাহেবের সামনে নিয়ে এলো। তার রুদ্রমূর্তি দেখে সবাই ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে জায়গা করে দিল। সুহানা মিলিকে সামনে দাঁড় করিয়ে জাহাঙ্গীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলল, “লুক অ্যাট হার (ওর দিকে তাকান)!”

জাহাঙ্গীর সাহেব মিলির বিধ্বস্ত অবস্থার দিকে তাকিয়ে সইতে পারলেন না, দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানের স্ত্রী মিলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চুলের মুঠি ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি স্পর্শ করার আগেই সুহানা খপ করে তার হাত চেপে ধরল। মাঝবয়সী মীরাবি সুহানার হাতের শক্ত বাঁধনে মুহূর্তেই কুঁকড়ে গেলেন। সুহানা এক ঝটকায় তার হাতটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গর্জে উঠল, “একটা আঙুলের টোকাও যদি ওর গায়ে লাগে, তবে সেই হাত আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব!নিজের ছেলের অপরাধ কি চোখে পড়ছে না আপনার?”

এরপর সুহানা গ্রামের বাসিন্দাদের দিকে ফিরে বলল, “আপনাদের প্রমাণ লাগবে, তাই তো? ওয়েট”

সবার সামনেই সুহানা নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে দুই পা এগিয়ে গেল। তারপর আচমকাই রায়হানের এক খাবলা চুল মুঠো করে ধরে তাকে হিঁচড়ে টেনে আনল। রায়হান যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, “মা! আব্বু! বাঁচাও!”

সুহানা উপস্থিত সবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রায়হানের মাথাটা সজোরে মেম্বারের টেবিলের ওপর ঠুকে দিল। পরিস্থিতি দেখে সবাই তেড়ে আসতে চাইল, কিন্তু সুহানার এমন উগ্র আর বিধ্বংসী রূপ দেখে কেউ আর এগোনোর সাহস পেল না। রায়হানের মা চিৎকার করে উঠলেন, “ওরে আল্লারে! আমার ব্যাটা রে তো মাইরা ফালাইলো রে! ওরে কেউ থামান, আমার রায়হান রে বাঁচান!”

মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুহানা টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা বলপেন তুলে নিল এবং কোনো দ্বিধা না করে সেটি সরাসরি রায়হানের হাতের ওপর গেঁথে দিল।

সুহানার এই বিধ্বংসী রূপ দেখে পুরো চত্বরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। কলমটা গেঁথে দেওয়ার পর রায়হানের গগনবিদারী চিৎকার ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। জাহাঙ্গীর সাহেব স্তব্ধ হয়ে নিজের কেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

সবার চোখ চড়কগাছ! সুহানা রায়হানকে ছাড়িয়ে তার সাঙ্গপাঙ্গ এর মধ্যে মিঠুনের দিকে এগোতেই সে ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। জীবন বাঁচাতে সুহানার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে হাতজোড় করে বলতে লাগল, “আমারে ছাইড়া দেন আপা! আমি সব সত্যি কথা কইতাছি!”

সেখানে উপস্থিত সবাই আতঙ্কে চুপ হয়ে আছে। সাবেরা থেকে শুরু করে রুবাইদা—সবারই চক্ষু চড়কগাছ। এমন দৃশ্য তারা বাপের জন্মেও দেখেনি। থমথমে পরিবেশে মিঠুন একে একে সব উগরে দিতে শুরু করল।

সে বলল, “অনেকদিন ধইরাই রায়হান ভাইয়ের নজর ছিল মিলির ওপর। আমাদের বলছিল সবটা হওয়ার পর আমাদেরও ভাগ দিব। আমরা সুযোগ খুঁজতাছিলাম। আজ বাগানে যখন আমরা নেশা করতাছিলাম, তখন দেখলাম মিলি পুকুরপাড়ে মাটি নিতে আইছে। ভাই ওরে দেইখাই আমাদের ডাক দিল, তারপর আমরা ওরে ধইরা... বিশ্বাস করেন আমরা কিছু করি নাই, তখনি এই আপা আইসা আমাদের মারা শুরু করসে!”

পিনপতন নীরবতায় সবাই এই বীভৎস সত্যিটা শুনল। মিঠুনের কথা শেষ হতে না হতেই সুহানা সজোরে তার গালে উল্টো হাতের এক চড় বসাল। ঘৃণাভরে বলল, “স্কাউন্ড্রেল কোথাকার!”

একপাশে দাঁড়িয়ে বিহানের মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে আগেই বুঝেছিল এই মেয়ে একটা চাবুক! অন্যদিকে প্রধান সাহেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মীরাবি নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। মেম্বারদের মুখ কালো হয়ে গেছে।

সুহানা এবার সেখানে উপস্থিত পুলিশের দিকে এগিয়ে গেল। পকেট থেকে ফোন বের করে দুটো ছবি দেখাল—সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রাইহান এর দল মিলিকে ঘিরে রেখেছে। সেই বিপদে এইটুকুই ছবি তুলতে পেরেছিল সে। সুহানা দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “বাকিটা তো নিজের কানেই শুনলেন। এরপরও যদি ক্ষমতার জোরে আসামি পার পেয়ে যায়, তবে ওই যে দেখুন সিসিটিভি ক্যামেরা—It's all captured there (সব ওখানে রেকর্ড করা আছে)। যখন একটা ছোট বাচ্চাকে সবাই মিলে অপমান করছিল, আপনি তাকে রক্ষা না করে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি এই দেশের নাগরিক নই ঠিকই, কিন্তু প্রশাসন প্রতিটা দেশে ঠিক কী কারণে রাখা হয় তা আমার জানা।”

দারোগাবাবুর প্রথমে রাগ হলেও পরক্ষণেই লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেল। নিজের মেয়ের চেয়েও ছোট এক তরুণীর কাছ থেকে এমন কথা তিনি আশা করেননি, তবে সুহানা যা করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। সুহানার এই রুদ্রমূর্তি দেখে দারোগাবাবুর মনে একটি বিখ্যাত কবিতার লাইন ভেসে উঠল।

“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?

মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন

‘মানুষ হইতে হবে’ – এই যার পণ।”

তবে ছেলে নয় মেয়ে হবে। মতি মিয়া সুহানার সামনে এসে দুই হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। কৃতজ্ঞতায় তার গলা বুজে আসছিল, তিনি শুধু বলতে পারলেন, ““তোমারে কী বইলা শুকরিয়া জানামু মা, আমি হেইডা জানি না। তুমি আমার মিলিরে আজ...” মতি মিয়া আর কথা শেষ করতে পারলেন না, কান্নায় তার বুক ফেটে আসছিল।

এবার সুহানা সেইসব মহিলাদের দিকে চোখ তুলে তাকাল, যারা এতক্ষণ মিলিকে নিয়ে বিষোদগার করছিল। সে নিজের চশমাটা একবার ঠিক করে নিয়ে মিলির হাত ধরে বারান্দায় উঠে গেল। জাহাঙ্গীর সাহেবকে পাশ কাটিয়ে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আর মুরুব্বিদের দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল:

“এখন তো সব সত্যিটা জানলেন। এরপরও যদি এই মেয়েটাকে নিয়ে কোনো আজেবাজে কথা বা খারাপ ব্যবহার শুনি, তবে তার পরিণতি কিন্তু ভালো হবে না, আইন সম্পর্কে নিশ্চয় জ্ঞান আছে”।

এরপর সেই মহিলাদের দিকে তাকিয়ে সরাসরি আক্রমণ করল, “আর আপনাদের বলছি, একজন নারী হয়ে এই বাচ্চা মেয়েটাকে ওভাবে গালি দিতে আপনাদের বুক কাঁপল না? লজ্জা লাগে না এই বয়সে এসে আল্লাহর নাম না করে পরের মেয়ের বদনাম করতে? আপনারা তো আমাকে বেয়াদব বলছেন, কিন্তু আপনারা যারা এত নীতিবান, তারা এই পুরুষদের ভরা মজলিসে কী করছেন?”

সুহানার এমন সোজাসাপ্টা কথায় মহিলারা দ্রুত নিজেদের মুখ ঢেকে আড়ালে চলে গেলেন। এই মেয়ে সবার সামনে হাড়ি ভেঙে দিচ্ছে।

ঠিক তখনই একজন মেম্বার ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “তোমাকে এখানে কে মাতব্বরি করতে বলেছে? আমরা আছি তো সব দেখার জন্য। তুমি কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছ না?”

সুহানা মেম্বারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “আমার ধর্ম আমাকে মাতব্বরি করতে বলেছে, কোনো নিপীড়িত ব্যক্তিকে সাহায্য করা আর জালিমের হাত থেকে তাকে রক্ষা করা ইবাদতেরই অংশ বিশেষ। শুধু নিজেকে মুসলিম বললেই সত্যিকারের মুসলিম হওয়া যায় না, তার জন্য মজবুত ইমান লাগে। সত্য কথা বলতে হয় এবং সত্যের পথে চলতে হয়। কাউকে কটু কথা বলার আগে দশবার ভাবতে হয়। ইসলাম অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে নিষেধ করে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করার নির্দেশ দেয়। আমি নিজের জায়গায় যা করা ঠিক মনে করেছি, ঠিক সেটুকুই করেছি। আমার ইসলাম আমাকে এই অধিকার দিয়েছে। ধর্ম সম্পর্কে আমার গভীর জ্ঞান হয়তো নেই, তবে যতটুকু আছে, তা আমৃত্যু সঠিকভাবে পালন করে যাব ইনশাআল্লাহ।”

সুহানা কিছুটা থামল, একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলল, “মিলি আর ওর বাবার যদি ভবিষ্যতে কোনো রকম সমস্যা হয়, তবে তার পরিস্থিতি কিন্তু খুব খারাপ হবে, এর পরে প্রশাসন কাউকে ছাড়বে না। আজ থেকে তাদের খেয়াল রাখার দায়িত্ব এই সমস্ত গ্রামবাসীর। তাদের জন্য আপনাদের চেয়ে বড় রক্ষক আর কেউ নেই।”

এরপর সেই অভিযুক্তদের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো সতর্ক করল, “মেয়েটার কিছু হয়নি বলেই আজ এরা বেঁচে গেলো,নয়তো আল্লাহর কসম—সবার কটার ধড় থেকে মাথা আলাদা পাওয়া যেতো! আল্লাহ ছাড়া আমি আর কারো বাপকেও ভয় করি না।”

নিজের কথা শেষ করে সুহানা যখন পেছনে সরে আসছিল, তখনই মিলি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করো হাততালির শব্দে সবার নজর সেদিকে গেল। সুহানা তাকিয়ে দেখল, মসজিদের ইমাম সাহেব মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিচ্ছেন। তাকে দেখে জিশান, জাসমীর এবং বিহানও চওড়া হাসিমুখে হাততালি দিয়ে উঠল আর সমস্বরে বলে উঠল, “ওয়েল ডান!”

ধীরে ধীরে উপস্থিত সবার করতালিতে পুরো প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠল। সবাই নিজের ভুল বুঝতে পেরে সুহানার প্রতি শ্রদ্ধায় নত হলো। সুহানা মিলিকে তার বাবার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে এল। করিডোর থেকে বাড়ির সবাই হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন; বিশেষ করে রুবাইদা সুহানার সাহসিকতায় দারুণ মুগ্ধ হয়েছেন। তবে আতিফ অনেকক্ষণ ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সুহানাকে পর্যবেক্ষণ করছিল।সে এখন গভীর চিন্তায় পড়েছে, এই মেয়েকে বাগে আনা মোটেও সহজ কাজ নয়; এই ক্ষ্যাপা বাঘিনীকে খাঁচায় বন্দী করা যে বড্ড কঠিন!

এদিকে জাহাঙ্গীর সাহেব এখনো এক ঘোরের মধ্যে আটকে আছেন। তিনি বিচার করতে এসেছিলেন, কিন্তু তাকে ছাপিয়ে অন্য একজন এত বড় সমস্যার সমাধান করে দিয়ে চলে গেল। বাড়ির চূড়ায় থাকা সিংহের মূর্তিটায় কড়া রোদ লেগে আজ অন্য দিনের চেয়ে বেশি চকচক করছে। মনে হচ্ছে, সিংহটি মাথা উঁচু করে একজন দক্ষ শাসককে বাহবা দিচ্ছে—যাকে স্বয়ং আল্লাহ নিজ হাতে গড়েছেন। তবে জাহাঙ্গীর সাহেবের মনে কোথাও কি একটা খটকা জাগছে? তিনি কি কোথাও কোনো ভুল করছেন?

আস্তে আস্তে ভিড় কমতে শুরু করল। পুলিশ মিলি এবং তার বাবাকে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দিল। আর রায়হানসহ বাকি অপরাধীদের নিয়ে রওনা দিল থানার দিকে। যাওয়ার আগে দারোগাবাবু নিজের কর্তব্যে অবহেলার জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন।

ধীরে ধীরে সবাই চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই বিহান কাউকে ফোন করল। ওপাশে কল রিসিভ হতেই ও বলল, “বাড়িতে আয় এবার, সব ঠান্ডা হয়ে গেছে।”

ওপাশ থেকে ছোট জবাব এল, “আচ্ছা।”

রাস্তার মোড়েই জাহিরের সাথে দেখা হয়েছিল আফ্রিদির। আফ্রিদি তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিজের গাড়িতে তুলে নিল আর বুলেটটা গ্রামের এক মেকানিকের দোকানে সারাই করতে দিয়ে এসেছে। জাহির বারবার প্রশ্ন করলেও আফ্রিদি শুধু এটুকু বলল, “বাড়ি চল, গেলেই সব বুঝতে পারবি। অনেক বড় কাহিনী ভাই, একটু সবুর কর।”

জাহির অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আমাকে বলবি তো!”

আফ্রিদি পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, “আরে তেমন কিছুই হয়নি। তোর দয়াবান বাপ খুব রেগে আছেন, তাই চাচু বলল তোকে এখন বাইরে রাখতে। মাথা ঠান্ডা হলে উনিই আমাদের জানাবেন।”

জাহির দমে না গিয়ে বলল, “কিন্তু...”

ঠিক তখনই আফ্রিদির ফোনে কল এল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বিহানের হাস্যোজ্বল কণ্ঠ শোনা গেল। আফ্রিদি মাথা নেড়ে সায় দিল এবং জাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই যে, ঝামেলা মিটে গেছে। এবার বাড়ি গিয়েই সব শুনিস, আমি আর মুখে বলতে পারছি না ভাই!”

সামির গাড়ি ঘোরাতেই গাড়ির ভেতরের পরিবেশ বেশ গম্ভীর হয়ে উঠল। জাহিরের মন কিছুতেই মানছে না; তার বারবার মনে হচ্ছে কোথাও বড় কোনো গণ্ডগোল হয়েছে। কিন্তু বাকিরা কেন তাকে কিছুই জানাচ্ছে না। সে নিজেও আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। গাঢ় রঙের জিপ গাড়িটি মেঠো পথ ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে। জিপটি কিছুটা যেতেই দেখা গেল দলে দলে মানুষ ফিরছে। জাহির ভ্রু কুঁচকে লক্ষ্য করল, এখান থেকেই তাদের বাগান শুরু। দশ বিঘার বেশি জমির সেই বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বিশাল বাড়িটি। এখানে এত মানুষের ভিড় মানেই হলো তাদের বাড়িতে কিছু একটা...।

এদিকে বাড়ির ভেতরে সাবেরা বেগম সুহানার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সুহানা একদম চুপ, পাশেই ফিনা শুয়ে আছে। মালেহা চোখের ইশারায় সুহানাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। সুহানা মাথা নিচু করে রইল। সাবেরা আরেকটু এগিয়ে সুহানার কাছে এলেন; উচ্চতায় দুজনেই প্রায় সমান। দরজার আড়াল থেকে তানি আর আয়েশা উঁকি মারছে। রুবাইদা, রুহানি আর মিহু একপাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের কারও মুখেই হাসির লেশমাত্র নেই। সুহানা কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ল, তার কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু জমেছে।

সাবেরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সুহানাকে আরও একবার দেখলেন। খাড়া নাকের ওপর চশমা, ঘন ঘন চোখের পলক ফেলা আর ফোলা ফোলা ঠোঁট—সব মিলিয়ে সাবেরা সুহানাকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে কল্পনা করে ফেললেন। চোখ, নাক, ঠোঁট গাল—সুহানার সৌন্দর্যে কোনো খুঁত খুঁজে পেলেন না তিনি। এরপর তিনি সুহানার মাথায় হাত রাখলেন এবং শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় গিয়েছিলি তুই?”

সুহানা তার দিকে তাকাল ঠিকই, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। সে মালেহার দিকে অসহায়ভাবে তাকাতেই মালেহা তার হয়ে সুপারিশ করে বললেন, “বাদ দাও না বড় বুবু। রাগ করে একটু ঘুরতে গিয়েছিল, আবার চলেও এসেছে। এমনিতেও ও যদি আজ না যেত, তবে মতি ভাইয়ের মেয়েটার যে কী হতো একবার ভেবে দেখো!”

সাবেরা বেগম আপাতত আর কোনো কথা বাড়ালেন না। এসব জটিল প্যাঁচাল তাঁর মাথায় ঢুকছে না, আর তিনি এখনই এসব নিয়ে ভাবতে চাইছেন না। তাঁর ছেলে বাড়িতে ফিরলে যে আরেকদফা অশান্তি শুরু হবে, তা তিনি ভালো করেই জানেন। ছেলের মনের খবর তিনি অনেক আগেই পেয়েছেন, তাই সিদ্ধান্ত নিলেন আর দেরি করা ঠিক হবে না—আজই তিনি কর্তার সাথে কথা বলবেন।

সাবেরা সুহানাকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বলে সেখান থেকে চলে গেলেন। মালেহা সুহানার মাথায় হাত বুলিয়ে একটা প্রশান্তির হাসি দিয়ে বিদায় নিলেন। তাঁরা যেতেই বাড়ির মেয়েদের দল সুহানাকে ছেঁকে ধরল। আজ তাদের দলে রুবাইদাও আছেন; তিনি সুহানাকে নিজের কোলের কাছে বসিয়ে পুরো ঘটনাটা জানতে চাইলেন। সুহানা কথা বলতে বলতে একবার ফিনার দিকে তাকাল। সে বেশ কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছে, ফিনা কেমন যেন হঠাৎ করে মোটা হয়ে যাচ্ছে; গাল দুটো ফুলে গেছে এবং মুখের আকৃতিতেও পরিবর্তন এসেছে। মাঝে মাঝেই ফিনার মধ্যে এমন নানা পরিবর্তন সুহানার চোখে পড়ছে।

“কী রে?”

রুবাইদার ধাক্কায় সুহানার ঘোর ভাঙল। সে থমকে গিয়ে তাকাতেই রুবাইদা হেসে ফেলল। এরপর সুহানা ধীরে ধীরে পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সবার কৌতূহল মেটাতে সবটা খুলে বলল।

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন