ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৫৪তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৫৪

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

____________আগের ঘটনা__________

পুলিশ কর্মকর্তা জাহিরের গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার কে সতর্ক করে দিলেন যে, সামনে যাওয়া আর সম্ভব নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হবে, তাই নিরাপদ কোনো স্থানে ফিরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। জাহির সবটা শুনল এবং ম্যাপে যাচাই করে দেখল যে, শপটি এখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ।

— “গাড়ি ঘোরাও।”

ড্রাইভার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। ঠিক তখনি জাহির চেঁচিয়ে উঠল, “থামো!”

গাড়ি থামতেই জাহির ক্ষিপ্রগতিতে নেমে পড়ল। তার সাথে বডিগার্ড মিকি আর পিএ রোমানও তড়িঘড়ি করে নামল। জাহির তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা যাও, আমি আমার কাজ সেরেই ফিরব।”

জাহির পুলিশের ব্যারিকেডের দিকে দৌড় দিল এবং এক লাফে সেটি পার হয়ে গেল। পুলিশ চিৎকার করে তাকে থামানোর চেষ্টা করলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় তার নেই। মিকিও কালক্ষেপণ না করে জাহিরের পিছু নিল, তবে রোমানকে গাড়িতেই রেখে গেল। ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পুলিশ আর তাদের পিছু নিল না।

প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যেই জাহির বরফের ওপর দিয়ে উন্মাদের মতো ছুটছে। পায়ে লং বুট, পরনে সোয়েটার, জ্যাকেট, লং কোট, হাতে গ্লাভস আর গলায় মাফলার থাকা সত্ত্বেও সে নিজের গতি বিন্দুমাত্র কমতে দিল না। একজন স্পোর্টসম্যান হওয়ার সবটুকু সুবিধা সে এখানে কাজে লাগাল। মিকি শত চেষ্টা করেও জাহিরের গতির সাথে পাল্লা দিতে পারল না।

ঝড়ের দাপট আরও বাড়ল। তুষারপাতের ঝাপটায় হঠাতই জাহির কারো সাথে সজোরে ধাক্কা খেল এবং দুজনেই দুই দিকে ছিটকে পড়ল। জাহির দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সামনে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। তার অন্তর যেন কোনো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে; সে নিজের হৃদয়ের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, গুনতে পারছে নিজের প্রতিটি নিঃশ্বাস। ঠিক তখনি উল্টো দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে কেউ বলে উঠল, “সরি... সরি...”

জাহিরের আর কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলো না, খোঁজাখুঁজিরও অবসান হলো সেখানেই। এক তীব্র আবেগ আর স্বস্তিতে তার ঠোঁট জোড়া কেঁপে উঠল। সে ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তুষারের মোটা চাদরে ঢাকা সেই হিমশীতল মাটির ওপর।

সামনে অঝোর তুষারপাতের মাঝে কোনোমতে দৌড়ে যেতে থাকা সেই রমণীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে আর্তনাদ করে ডাকল— "সুহু...!"

“দৌড়াও সুহু, যতটা পারো দৌড়াও। কিন্তু ভুলে যেও না, তোমার গন্তব্য শেষে আমাকেই পাবে। জাহির তোমাকে হাতছাড়া করার জন্য এতদূর আসেনি। আজ তোমার তেজ হার মানবে এই জাহিরের জেদের কাছে।“

______________________________

— "ফিনা!"

ফিনা কেবল গোসল সেরে বেরিয়েছে। কারো ডাক শুনে সে দরজার দিকে তাকাল।

— "হুম, বলো।"

— "নিউজ পেপার দেখেছো?"

— "না।"

— "সুহানা..."

সুহানার নাম শোনা মাত্রই ফিনা সব কাজ ফেলে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে এল। উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "সুহানা এসেছে?"

— "না, তুমি এদিকে এসো।"

স্টাফটি ফিনার হাতে 'Bayerischer Rundfunk' নামক সংবাদপত্রটি দিল। সেখানে চোখ পড়তেই ভেসে উঠল সুহানার একটি ছোট ছবি, যার পাশে বড় করে লেখা ‘১.০’—অর্থাৎ র‍্যাঙ্ক ১।

ফিনা সুহানার ছবির পাশের ছোট লেখাগুলো মন দিয়ে পড়ল:

"বাভারিয়া রাজ্যে আবিটুয়্যর (Abitur) পরীক্ষায় এমজিটি (MGT) স্কুলের ছাত্রী সুহানা ৯০০ পয়েন্টের মধ্যে ৮৮৯ পয়েন্ট পেয়েছে। সে জার্মানির শীর্ষ ১% মেধাবীদের মধ্যে দ্বিতীয় সেরা ছাত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২০২২ সালের শীর্ষ ছাত্র এমডি জাহির উদ্দিনের (৮৯৬ পয়েন্ট) সাথে তার ব্যবধান মাত্র ৭ পয়েন্টের। অভিনন্দন!"

(উল্লেখ্য: জার্মানিতে গ্রেড যত কম, যেমন ১.০, রেজাল্ট তত ভালো ধরা হয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সেখানকার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।)

হঠাৎ ফিনার মনে পড়ল আজকের তারিখ কত। ক্যালেন্ডারে দেখল ২০ মার্চ, ২০২৬। আজই তো রেজাল্ট দেওয়ার কথা! ফিনা দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে সুহানার রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সার্চ করতেই রেজাল্ট বেরিয়ে এল।

Block I (গত ২ বছরের ক্লাস ও টেস্টের রেজাল্ট) ৫৯২ আউট অফ ৬০০

Block II (আবিটুয়্যর ফাইনাল পরীক্ষা) ২৯৭ আউট অফ ৩০০

Gesamtpunktzahl (সর্বমোট পয়েন্ট) ৮৮৯ আউট অফ ৯০০

চোখে আনন্দাশ্রু নিয়েই হেসে উঠল ফিনা। উত্তেজনায় সে নিজের রেজাল্ট চেক করতেই ভুলে গিয়েছিল। স্কুল গ্রুপে অনেক আগেই হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল, যা তার এতক্ষণ নজরে আসেনি। সবাই তাকে ছেঁকে ধরল।

— "ফিনা, তোমার রেজাল্ট চেক করো!"

সবার জোরাজুরিতে ফিনা নিজের রেজাল্ট দেখল— ৬৬৩ স্কোর, অর্থাৎ ২.১ গ্রেড। ফিনা খুশি মনে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, "কংগ্রাচুলেশন গাইস!"

সে পাশ করে গেছে, এতেই সে ভীষণ খুশি। কিন্তু এই খুশির খবরটা কাউকে তো জানাতে হবে! সে দ্রুত সাইডে গিয়ে জাহিরকে ফোন করল, কিন্তু ওপাশ থেকে ফোন বন্ধ শুনে তার হাসিটা মিলিয়ে গেল। নিরুপায় হয়ে সে আফ্রিদিকে কল করল। দুই-তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো।

— "হ্যালো।"

— "আফ্রিদি ভাইয়া?"

— "নো, বস এখন বিজি আছে। আমি তার ম্যানেজার বলছি।"

— "প্লিজ, ফোনটা একটু ভাইয়াকে দিন।"

— "সরি ম্যাডাম, আমি দিতে পারব না।"

আফ্রিদি তখন কারোর সাথে তার প্র্যাকটিস শিডিউল নিয়ে কথা বলছিল। ব্রুসকে ফোনে কথা বলতে দেখে সে জানতে চাইল, "কে?"

ব্রুস কথা বলতে বলতেই উত্তর দিল, "জানি না, এক ম্যাডাম ফোন করেছেন।" আফ্রিদি কী মনে করে ফোনটা চাইল এবং ফিনার নম্বর দেখে দ্রুত কানে দিয়ে বলল, "ফিনা, কী হয়েছে?"

— "ভাইয়া, আপনি কি নিউজ পেপার দেখেছেন?"

— "না তো, কেন?"

— "সুহানা র‍্যাঙ্ক করেছে! ওর ১.০ এসেছে, টোটাল ৮৮৯ পয়েন্ট।"

আফ্রিদি সবটা শুনল ঠিকই, কিন্তু খুব একটা অবাক হলো না। সুহানা মেধাবী ছাত্রী হিসেবে বরাবরই ভালো ছিল, তাই এমন ফলাফল তার কাছে খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হলো না।

— "আপনার ফুফাকে অবশ্যই বলবেন, একদিন তিনি নিজের ভিটে নিয়ে গিয়ে নিজের ঘরেই সুহানাকে প্রশ্ন করেছিলেন— 'তোমার স্ট্যাটাস কী? আমার ছেলের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো যোগ্যতা কি তোমার আছে?' তিনি বলেছিলেন, সুহানা যদি তার নামের পরের অংশটুকু বলতে পারে, তবে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সুহানাকে নিজের ছেলের বউ করে ঘরে তুলবেন। সুহানা সেদিন চুপ ছিল, হয়তো আজকের এই দিনটির জন্যই। ওনাকে বলে দেবেন, ওনার ছেলের সাথে সুহানার ব্যবধান এখন মাত্র ৭ পয়েন্টের।"

কথাগুলো বলেই ফিনা ফোন কেটে দিল। আফ্রিদি স্তব্ধ হয়ে সবটা শুনল। তার ফুফা যে সুহানাকে এমন কথা বলেছিলেন, সেটা তার জানাই ছিল না। আগের খবরটা শুনে অবাক না হলেও, এই বিষয়টি জেনে সে বেশ বিস্মিত হলো। আবার জাহিরের সাথে সুহানার পার্থক্যের কথা ভেবে তার মনে মনে হাসিও পেল। এটাই স্বভাব সিরিয়াস মুমেন্টে হেসে ফেলা।

পুরোনো সব তিক্ততা বাদ দিয়ে আফ্রিদি সুহানার এই সাফল্যকেই বড় করে দেখল। এই খুশির খবরটা সবাইকে জানানো দরকার। সে দ্রুত হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিল এবং ব্রুসকে কড়া নির্দেশ দিয়ে দিল যে— ফিনা, সুহানা ও তুহিনা নামের কেউ কল করলে সে যে কাজেই থাকুক না কেন, তাকে যেন অবশ্যই জানানো হয়।

— “ফুপ্পি...!”

সিঁড়ি বেঁয়ে দ্রুত গতিতে নেমে এল আফ্রিদি। লিভিং এরিয়াতে সবাই তখন একসাথেই ছিল। বিহান আর জাহাঙ্গীর অফিসের কাজে যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। সাবেরা রুহানির চুলে যত্নে হাতে বানানো তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন, আর রুবাইদা ব্যস্ত ছিলেন তুহিনাকে খাইয়ে দিতে। আফ্রিদির ডাক শুনে সবাই সব কাজ ফেলে তার দিকে তাকাল।

— “তোমার ছেলের বউ তো রীতিমতো ধামাকা করে ফেলেছে!”

আফ্রিদির কথা শুনে সাবেরা আর জাহাঙ্গীর একে অপরের দিকে চেয়ে উৎসুক হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সবাই তার দিকে এগিয়ে এল।

— “সুহানাকে কি খুঁজে পেয়েছিস?” সাবেরা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন।

আফ্রিদি মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়ে বলল, “আজকে তো রেজাল্ট ছিল। সুহানা ৯০০-র মধ্যে ৮৮৯ পেয়ে ১.০ গ্রেড পেয়েছে। জার্মানির সেকেন্ড বেস্ট স্টুডেন্ট হিসেবে ও বিবেচিত হয়েছে—ঠিক তোমার ছেলের পরেই ওর অবস্থান এই দেখো।”

কথাটা শোনা মাত্রই সবাই কৌতূহলী হয়ে ফোনের ওপর উঁকি দিল। রুহানি তুহিনাকে ধরে নিয়ে এল দেখার জন্য। আফ্রিদি ফোনের স্ক্রিনে দেখাল যে, স্কুলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সুহানার ছবি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়েছে এবং প্রিন্সিপাল নিজে ভিডিও বার্তায় অভিনন্দন জানিয়েছেন।

জাহাঙ্গীর মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনলেন। সুহানার স্কুলের রিপোর্ট যে তার ছেলের মতোই তুখোড় এবং সে পড়াশোনায় এতটা মেধাবী, সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল। সাবেরা তখন মনে মনে দোয়া পড়ছিলেন যেন মেয়েটা দ্রুত সুস্থভাবে ফিরে আসে।

রুহানি দুষ্টুমি করে বলল, “দাদাভাই, বউমণি যদি কোনোদিন বড়দাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন বড়দা ঠিক কী করে সেটাই দেখার বিষয়!”

আফ্রিদি হেসে রুহানিকে সায় দিয়ে বলল, “এতদিন পর জাহিরকে টক্কর দেওয়ার মতো কেউ অন্তত এল!”

পুরোনো সব দুঃখ ভুলে তুহিনাও হেসে উঠল। বলল, “এবার জাহির বুঝবে কত ধানে কত চাল!”

বিহানও যোগ দিলেন খুশিতে, “সেরা এক ছেলের বউ পেয়েছি আমরা।”

তবে জাহাঙ্গীরের দিকে নজর যেতেই সবার হাসি হঠাতই থেমে গেল। জাহাঙ্গীর অত্যন্ত গম্ভীর মুখে পুরো রেজাল্ট চেক করলেন। অনেকটা ঈর্ষাতুর বাবার মতো মেলালেন ছেলের সাথে তার ঠিক কতটা পার্থক্য। সব শেষে শান্ত গলায় বললেন, “খুব ভালো করেছে সুহানা মা।”

‘ভূতের মুখে রাম নাম’ শুনে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিহান মিটিমিটি হাসলেও কিছু বললেন না। সাবেরা নিজেও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। জাহাঙ্গীর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিজের মান বাঁচাতে দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হবে বলে রুমে গেলেন।

সাবেরা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “জাহিরের খবর কী?”

— “জানি না, একটু আগে কল করেছিলাম কিন্তু ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে।”

ঠিক তখনি আফ্রিদির ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল...

_______________________________

মেনশন এর বিশাল ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিদি। সকালের রোদ তার মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু তার একাগ্র দৃষ্টি নিবদ্ধ আকাশের দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রুসকে সে জিজ্ঞেস করল, “আর কতক্ষণ লাগবে?”

— “এতক্ষণে তো চলে আসার কথা...”

ঠিক তখনি আকাশের বুক চিরে হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা গেল। সেটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে বাড়ির ছাদে নির্দিষ্ট পার্কিং এরিয়ায় ল্যান্ড করতেই আফ্রিদি সেদিকে দৌড়ে গেল।

জাহির হেলিকপ্টার থেকে নেমে এল। তার কোলে কেউ একজন আছে, যাকে সে অত্যন্ত সাবধানে ধরে রেখেছে। আফ্রিদির পা থমকে গেল। সে কিছুটা আন্দাজ করেছিল ঠিকই, তবুও জাহির কাছে আসতেই তার কোলে থাকা মানুষটির মুখ স্পষ্ট হলো— সুহানা!

জাহির আফ্রিদিকে পাশ কাটিয়ে সামনে পা বাড়াল। যেতে যেতে কেবল বলে গেল, “ওর ব্যাগটা নিয়ে আয়।”

আফ্রিদি দ্রুত ব্যাগটা নিয়ে জাহিরের পিছু নিল। লিফটে উঠতেই আফ্রিদি বাটন প্রেস করে দিল এবং সুহানার মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে জাহিরের কোলে লেপ্টে আছে; অনেকটা শুকিয়ে গেছে সে, চোখের নিচে লালচে দাগ স্পষ্ট।

লিফট নির্দিষ্ট ফ্লোরে থামতেই সামনে দেখা মিলল সবার— তুহিনা, রুহানি, ছোটমা, সাবেরা, বিহান, জাহাঙ্গীর এবং সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফিনা। জাহির বেরিয়ে আসতেই জাহাঙ্গীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাবাকে দেখে জাহির সুহানাকে আরও শক্ত করে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে আড়াল করল, যাতে তার মুখ দেখা না যায় যদি আবারো কেড়ে নেয় তার কাছ থেকে। ছেলের এমন আচরণে জাহাঙ্গীর ভীষণ কষ্ট পেলেন এবং নিঃশব্দে রাস্তা ছেড়ে দিলেন। সাবেরার আর এগোনোর সাহস হলো না।

ফিনা কান্নায় ভেঙে পড়ে জাহিরের সামনে ছুটে এল, “ভাইয়া, আমাকে একবার দেখতে দিন না! ও জাগলে তো আর আমাকে দেখতে দেবে না, আমার মুখও দেখতে চাইবে না। প্লিজ, আমাকে একটু দেখতে দিন!”

জাহিরের মনে মায়া হলো। সে সুহানাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। আফ্রিদি পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলে দিল। ফিনা জাহিরের পিছু পিছু ভেতরে এলেও বাকিদের আর সাহস হলো না। মেয়েটির সাথে অতীতে যা করা হয়েছে, তারপর আর তার সামনে যাওয়ার মুখ তাদের নেই।

সুহানাকে বিছানায় শুইয়ে দিতেই ফিনা তার কাছে এল। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ফিনার চোখের পানি টপটপ করে পড়ছে সুহানার ওপর।

— “আমি খুব সরি ইয়ার! আমাকে মাফ করে দে না প্লিজ। আর কোথাও যাস না। তোর মুখটা দেখার জন্য আমার চোখ দুটো ঝাঁঝরা হয়ে গেছে ।”

দুই হাত দিয়ে সুহানার মুখটা ধরে ফিনা অপলক তাকিয়ে রইল— কতদিন পর প্রিয় বন্ধুকে দেখল সে! বেডের সামনে দাঁড়িয়ে জাহির আর আফ্রিদি দৃশ্যটি দেখছে। দরজার সামনে বাকি সবাই ভিড় করে থাকলেও তুহিনা ভেতরে ঢুকল না। মেয়েটির আর কোনো অনিষ্ট করতে চায় না সে।

ফিনা মন ভরে সুহানাকে দেখল। তারপর জাহিরের সামনে এসে সুহানার দিকে ইশারা করে বলল, "ওর পায়ে চাকা লাগানো আছে ভাইয়া। ওকে যতদিন ধরে চিনি, কোনোদিন এক জায়গায় স্থির থাকতে দেখিনি। বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ও ভীষণ চঞ্চল একটা মেয়ে; চোখের পলকে হারিয়ে যায়। ওকে খুব সাবধানে আগলে রাখবেন, নইলে সুযোগ পেলেই আবার চলে যাবে। আমাদের ওপর ওর মায়া বড্ড কম। আরও কয়েকটা কথা বলার ছিল আপনাকে, সেগুলো পরে জানাব। এখন আসি, ওদিকে সব ফেলে এসেছি।"

জাহির আশ্বস্ত করে ফিনার মাথায় হাত রাখল, "আমি আছি তো ফিনা, চিন্তা করো না।"

— "জি।"

আফ্রিদি ব্রুসকে ডেকে ফিনাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করল। জাহির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজা লক করে দিল। সবাই তখনো বাইরেই অপেক্ষা করছিল। জাহির তুহিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোর শরীর ঠিক আছে তো?"

তুহিনা কোনো উত্তর দিল না, শুধু ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। এরপর জাহির তার মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। হাঁটু গেড়ে সাবেরার সামনে বসতেই তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন; জাহিরের চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে।

— "কী হয়েছে জাহির?" সাবেরা ব্যাকুল হয়ে শুধালেন।

জাহির মায়ের কোলে মুখ গুঁজে তাকে জড়িয়ে ধরল। দৃশ্যটি দেখে সাবেরার বুক ফেটে যাচ্ছিল। জাহির ধরা গলায় বলল, "সুহুকে খুঁজে পেয়েছি মা, আমার আর কোনো কষ্ট নেই।"

রুবাইদা এগিয়ে এসে জাহিরের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব নিজের বিবেকের কাছে আরও ছোট হয়ে গেলেন। বাচ্চা মেয়েটাকে তিনি কী সব বলেছিলেন! অথচ তার উচিত ছিল সবার আগে মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো। বিহান পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলেন, "সব দুঃখ-কষ্ট এবার ভুলে যাও। অনেক হয়েছে, বাড়ির সম্পদ শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফিরেছে।"

সাবেরা পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন; জাহির এখন কিছুটা শান্ত। আফ্রিদি তখন তুহিনাকে নিজের রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলল।

— “রুহানি, ওকে নিয়ে যা।”

রুবাইদা জাহিরের মাথাটা টেনে ধরে কৌতূহলী গলায় বললেন, “ব্রেকিং নিউজ শুনেছিস?”

জাহির মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। সে উঠে দাঁড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল; সুহুকে ফিরে পাওয়ার পর এখন তার আর কিছুই ভালো লাগছে না। সুহানা জাগতে এখনো অন্তত আধা ঘণ্টা বাকি আছে।

— “আরে ব্যাটা শোন, তোর বউ যে পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে!”

কথাটা শুনেই জাহির অবাক হয়ে সাবেরাকে ছেড়ে দিল।

— “আজকে কি রেজাল্ট ছিল?”

— “হ্যাঁ রে, পেপারে পর্যন্ত নাম উঠে গেছে, আর তুই কিছুই জানিস না!”

আফ্রিদি ফিনার পাঠানো স্ক্রিনশটগুলো জাহিরকে দেখাল। জাহির মন দিয়ে সবটা দেখল এবং নিজের নম্বরের সাথে সুহানার নম্বরের তুলনা করল। তারপর বুকে হাত দিয়ে বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “অল ইজ ওয়েল, অল ইজ ওয়েল! একটুর জন্য বেঁচে গেছি, নইলে আজ আমার মান-ইজ্জত সব ধুলোয় মিশে যেত।”

জাহিরের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। যেতে যেতে তুহিনা শুনতে পেল সবার হাসাহাসি; আগের সেই প্রাণবন্ত জাহিরকে ফিরে পেয়ে সবাই যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।

সাবেরা রান্নাঘরে চলে গেলেন—ছেলের বউ আজ প্রথম এই বাড়িতে এসেছে, তাই তার জন্য বিশেষ কিছুর আয়োজন করতে হবে। রুবাইদাও কাজের জন্য তৈরি হয়ে নিজের সোয়েটার খুলে রাখলেন। বিহান আর জাহাঙ্গীর ইতিমধ্যে অফিসের কাজে বেরিয়ে গেছেন; এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে তাদের। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেই তারা খুশি।

আফ্রিদি জাহিরকে টেনে জিমের ভেতর নিয়ে এল, সেখানে এখন কেউ নেই।

— “কী হয়েছে?” জাহির প্রশ্ন করল।

— “আগে বোস।”

জাহির বসল এবং ঘড়ি দেখে নিল; সময় যেন কাটতেই চাইছে না।

— “সুহানা কোথায় ছিল?”

— “গ্রিনল্যান্ডে।”

— “কীহ্?” আফ্রিদি চমকে উঠল।

— “হ্যাঁ।”

— “অত দূরে ছিল ও?”

জাহির হেসে নাটক করে বলল, “নাহ্, তোর মামাবাড়ির পাশেই ছিল, ওখান থেকেই তুলে আনলাম!”

— “ফালতু বকবি না শালা!” আফ্রিদি বিরক্ত হলো।

— “তুই যেমন গান্ডুর মতো প্রশ্ন করছিস! দূরত্ব কতটুকু সেটা কি তুই জানিস না?”

— “আমি বলতে চেয়েছি, ও ওখানে গেল কীভাবে?”

— “বাংলাদেশ থেকে দুবাই, তারপর ডেনমার্ক হয়ে গ্রিনল্যান্ডে।”

— “আল্লাহ! সুহানা একা এতদূর চলে গেল? সাবাস ভাই! বিশ্বাস কর, আমি নিজেই হয়তো ঘাবড়ে যেতাম। জীবনে একা অতদূর যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না, আর সুহানা পৌঁছেও গেল!”

জাহির তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “নিজের জীবনে কি কম হেগেছিস তুই?”

আফ্রিদি চোখ সরু করে তাকাল। জাহির তাকে রোস্ট করার একটা সুযোগও হাতছাড়া করে না। তবে অনেকদিন পর প্রিয় বন্ধুকে এমন মেজাজে দেখে আফ্রিদি আর কিছু মনে করল না।

— “ওর কি শরীর খারাপ? ওভাবে ঘুমিয়ে আছে যে?”

জাহির হাত কচলাতে কচলাতে মিনমিন করে বলল, “ঘুমিয়ে নেই, সেন্সলেস হয়ে আছে।”

— “আগে বলিসনি কেন? ডাক্তার ডাকতে হবে তো!”

— “কিছু করতে হবে না, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে।”

— “মানে?”

জাহির বুঝিয়ে বলতে শুরু করল, “পরশুদিন সকালে দুবাই অ্যাম্বাসি থেকে আমার কাছে একটা কল এসেছিল। ওখানে সুহানার পাসপোর্ট নম্বর দেওয়া ছিল। সুহানার হদিস মিলতেই আমার স্পেশাল রেফারেন্সের কারণে তারা আমাকে সব তথ্য দেয়। আমি আগে দুবাই যাই, সেখান থেকে ডেনমার্ক। কিন্তু আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল যে সুহানা এখানে নেই। হয়তো আল্লাহর ইশারা ছিল, আমি পুরো দেশ না খুঁজে আগে ওখানের অ্যাম্বাসিতে ওই পাসপোর্ট নম্বরের বিষয়ে খোঁজ নিলাম। সেখান থেকেই গ্রিনল্যান্ডের হদিস পাই। তারপর গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী 'নুউক'-এ খোঁজ শুরু করি। ডেনমার্কের পর আর ব্যক্তিগত জেট নিয়ে যাইনি, ওখানেই পার্কিংয়ে রেখে গিয়েছিলাম। সেখানে পুলিশ স্টেশনে খোঁজ নিতেই সুহানার সব ডিটেইলস পেয়ে গেলাম। কারণ, সুহানা সেখানে নিজে একটা চিঠি লিখে জমা দিয়েছিল। সেখানে ওর ছয় মাসের ভিসা ছিল—কীভাবে ম্যানেজ করেছে জানি না। ওখানের নিয়ম অনুযায়ী সব টুরিস্টকে পুলিশকে নোটিফাই করতে হয়, সেই সূত্রেই তারা আমাকে সব তথ্য দিয়ে দেয়।”

আফ্রিদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এমনি এমনি সব দিয়ে দিল তোকে?”

— “আমাকে নিয়ে তোর সন্দেহ আছে? এমজে (MJ )-কে সামনাসামনি দেখে এমনিতেই ওরা গলে গিয়েছিল। অন্য জায়গা হলে হয়তো টাকা দিতে হতো, কিন্তু ওখানে কিছুই লাগেনি।”

— “ওরা কি কোনো প্রশ্ন করেনি?”

— “হ্যাঁ, করেছিল তো।”

— “কী?”

— “জিজ্ঞেস করেছিল ও আমার কে হয়।”

— “তারপর?”

জাহির ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল, “আমি বললাম, আমার বউ রাগ করে একা একা হানিমুনে চলে এসেছে!”

— “শালা! জনমের মিথ্যাবাদী তুই!”

আফ্রিদি কৌতূহলী হয়ে আরও কাছে সরে এল, “তারপর? ওকে পেলি কোথায়?”

— “আমি যখন বের হলাম, মিকি আর রোমান আমার সাথেই ছিল। ওরাই সব ব্যবস্থা করেছিল। ওই এলাকায় ঢোকার পরপরই ঝড়ের ঘোষণা দেওয়া হলো এবং সব রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো...”

আর তারপর তো সব জানা আছে।

আফ্রিদি সবটা শুনল ঠিকই, কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই তার মাথায় ঢুকল না। সে প্রশ্ন করল, “ও যে দুবাইতে গেছিল, সেটা তুই জানলি কীভাবে?”

— “বাংলাদেশ থেকেই জেনেছি।”

— “কিন্তু রামীম তো বলেছিল ওখানে কেউ কিছুই বলছে না, উল্টো তাড়িয়ে দিয়েছিল! তাহলে তুই জানলি কী করে?”

জাহির রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “টাকার নম্বর দেখে।”

আফ্রিদির মাথার ওপর দিয়ে গেল সব, সে কিছুই বুঝতে পারল না। জাহির সেটা বুঝতে পেরে নিজেই ব্যাখ্যা করল—

“সুহানা যখন বাংলাদেশে আসে, তখন কারেন্সি কনভার্ট করার সময় ওকে একদম নতুন নোট দেওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি নোটের নম্বর ছিল সিরিয়াল অনুযায়ী সাজানো। সুহু যাওয়ার সময় সব টাকা নিয়ে যায়নি, কিছু টাকা ফেলে গিয়েছিল। আমি ফিনাকে জিজ্ঞেস করে সেই টাকার পরিমাণ জেনে হিসাব করে বের করলাম যে, ওর কাছে থাকা নোটগুলোর নম্বর কত থেকে কতর মধ্যে হতে পারে। সেই নম্বরগুলো নোট করে আমি রামীমকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম এটা জানাতে যে—এগুলো সব জাল নোট। এই তথ্য দিতেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে রামীম সব ডিটেইলস জেনে গেল। আমার শুধু দরকার ছিল ও কোন দেশে গেছে সেই তথ্যটুকু। রামীমের সামনেই যখন অফিসাররা সব কাগজ ওলটপালট করছিল, সে সব শুনে আর দেখে আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল।”

— “পরে যখন ওরা জানল যে ওগুলো আসল নোট, তখন?” আফ্রিদি অবাক হয়ে জানতে চাইল।

— “রামীম স্রেফ বলল—হয়তো আমার কাছে ভুল ইনফরমেশন ছিল, সরি টু ডিস্টার্ব ইউ অফিসার্স।”

আফ্রিদি হাঁ করে জাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবল—এখানেও নিজের গণিত বিশেষজ্ঞ মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়েছে! বসে বসে কত সূক্ষ্ম হিসাব যে কষেছে এই লোক!

হঠাৎ জাহিরের ফোনে অ্যালার্ম বেজে উঠল। সে ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এভাবে হাঁ করে বসে না থেকে নিজের কাজে যা। আমি এখন বউয়ের কাছে যাচ্ছি। এখন আর আমাকে বিরক্ত করিস না, অনেক হিসাব মেলানো বাকি আছে।”

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: {জাহির & সুহানা স্পেশাল ❤️‍🔥🥀}

[বিশেষ দ্রষ্টব্য-"এই গল্পটি মূলত গভীর প্রণয় ও সূক্ষ্ম জীবনবোধের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এখানে যেমন ফুটে উঠেছে হৃদয়ের তীব্র রোমান্টিক অনুভূতি, তেমনি সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে কঠোর সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র। আশা করি, অনুভূতির এই বিচিত্র রঙ আপনাদের স্পর্শ করে যাবে।"]

ঝড়ের মাঝে সেইদিন রাতে সুহানা তালা খুলে নিজের ঘরে ঢুকেছিল। জায়গাটা বেশ ছিমছাম আর ছোট—একটি বেডরুম, একটি রান্নাঘর, চারজন বসার মতো ডাইনিং টেবিল, একটি টিভি আর ছোট্ট একটি ব্যালকনি, যেখানে বড়জোর দুজন মানুষ দাঁড়াতে পারবে। প্রচণ্ড ঝড়ের কারণে এখানকার নিয়ম অনুযায়ী সবাই ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে। একেক জায়গার সংস্কৃতি ও নিয়মনীতি একেক রকম; সবাই পালন করছে দেখে সুহানাকেও তা করতে হয়েছে। সে পোশাক পাল্টে নিল। গ্রিনল্যান্ডের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় সবকিছুই বরফ হয়ে থাকে, তাই খাবার খাওয়ার আগে মাইক্রোওয়েভ করা জরুরি, কিন্তু আজ সেই উপায়ও নেই। সব কিছু ছেড়ে সুহানা ক্লান্ত শরীরে একটি চেয়ার টেনে ব্যালকনির সামনে গিয়ে বসল।

নুউক পৃথিবীর অন্যতম শীতলতম রাজধানী, যেখানে আর্কটিক জলবায়ুর প্রভাব স্পষ্ট। বাইরের তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের অনেক নিচে। চারদিকে শুধু বরফের স্তূপ আর হিমশীতল সমুদ্রের হাতছানি। বিশেষ করে এখন, তুষারঝড়ের সময় উত্তুরে হাওয়া জানলায় আছড়ে পড়ছে, চারপাশটা এক নিস্তব্ধ সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। প্রকৃতির এই রুক্ষতা আর অন্ধকার সুহানার মনের একাকীত্বকে আরও গভীর করে তুলেছে। তুষারঝড় বা ‘পিতারাক’ শুরু হলে এখানকার জনজীবন থমকে যায়, সেই হিমশীতল নিঃসঙ্গতার মাঝে সুহানা বাইরে দৃষ্টি মেলে বসে ছিল। মনের ভেতর এক অজানা অস্বস্তি দানা বাঁধছিল তার।

হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হলো। সুহানা দরজার দিকে তাকাল। বাইরে তখন প্রবল ঝড় বইছে, চারপাশ কুয়াশা আর বৃষ্টিতে সাদা হয়ে যাওয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রথমে সে ভেবেছিল ঝড়ে উড়ে আসা কিছু হয়তো দরজায় আছড়ে পড়েছে। কিন্তু শব্দের পুনরাবৃত্তি ঘটল—একবার, দুইবার, তিনবার। শব্দটা ক্রমে বাড়তে থাকল।

সুহানা নিঃশব্দে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। সে কোনো কথা বলল না বা পরিচয় জানতে চাইল না; কারণ আগন্তুক যদি কোনো পুরুষ হয়, তবে কোনো মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনলে তার উপদ্রব আরও বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া এলাকার কেউ হলে তাকে নাম ধরেই ডাকত। সতর্কতাস্বরূপ সে রান্নাঘর থেকে এক হাতে চপার আর অন্য হাতে একটা মোটা কাঠের চেলা নিয়ে এল।

দরজার লেন্স দিয়ে বাইরে তাকাতেই সে শুধু কালো পোশাক পরিহিত একজনকে দেখতে পেল তাও বুক পর্য্যন্ত স্বাভাবিকের থেকে লম্বা হওয়ায় মুখ দেখা গেলো না। লোকটা সম্পূর্ণ অচেনা। একবার মনে হলো চেনা কেউ, কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলল। সুহানা দরজা খুলল না। কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে গেল। সে আবারও লেন্সে চোখ রাখল, কিন্তু এবার বাইরে কাউকে দেখা গেল না—চারপাশ জনশূন্য। সুহানা সরে এল ঠিকই, কিন্তু মনে মনে সে নিশ্চিত ছিল যে লোকটা এখনও যায়নি।

দরজা থেকে কয়েক হাত দূরে সরে এল সুহানা। এরপর বসার ঘরের ভারী টেবিলটাকে টেনে হিঁচড়ে দরজার সামনে নিয়ে এল—যদি কেউ ধাক্কা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, তবে এটা অন্তত কিছুটা বাধা দেবে। চপারটা সাবধানে কোমরের পেছনে গুঁজে রাখল যাতে প্রয়োজনে দ্রুত বের করা যায়, আর হাতের কাঠের চেলাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। নিঃশব্দে চলাফেরা করার জন্য পায়ের জুতো জোড়া খুলে একপাশে রাখল সে, দরজার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলো নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে ক্ষণেক্ষণে মনোযোগ টিকিয়ে রেখেছে কিন্তু একটা অনুভব করতে চাইছে তার মস্তিষ্ক, জানালার কাঁচ থরথর করে কেঁপে উঠছে ভারি বাতাস এসে ধাক্কা খাচ্ছে সেখানে, সুহানা সাহসী মেয়ে সে ঘাবড়াবা র মানুষ নয় তবুও এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পুরো স্থানে ঝড়ের শাঁ শাঁ শব্দ ছাড়া কিছুই কানে আসছে না তার..

স্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে হঠাৎ মড়মড় শব্দে দরজাটা ভেঙে পড়ল মেঝের ওপর। ঠান্ডা আর ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটায় সুহানার নিশ্বাস আটকে এল। সে হাতের কাঠের চেলাটা মরণপণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরে সামনে তাকাল। ধোঁয়াটে অন্ধকারের বুক চিরে যে অবয়বটা ভেতরে ঢুকে এল, তাকে দেখে সুহানার শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সুহানা। জাহির কোনো কথা না বলে হিংস্র এক লাথিতে সামনের ভারী টেবিলটাকে তুড়ি মেরে সরিয়ে দিল। সুহানা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; তার পলকহীন চোখে তখন শুধু একরাশ বিস্ময় আর অব্যক্ত যন্ত্রণা। জাহির জগতের কোনো নিয়ম বা বাধার তোয়াক্কা করল না। এক ঝটকায় সুহানার ঘাড়ের কাছে মুঠো করে ধরে তাকে নিজের শরীরের কাছে টেনে নিল সে, জাহিরের গরম নিঃশ্বাস পড়ল সুহানার মুখের উপরে।

জাহিরের দুই হাতের বলিষ্ঠ বেষ্টনীতে সুহানার মুখটা তখন বন্দি। প্রবল তৃষ্ণার্তের মতো সে সুহানার ঠোঁটের ওপর ঝুঁকে পড়ল উন্মাদের মতো তাকে গ্রাস করল । সেই স্পর্শে সুহানার সারা শরীর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল, তার নরমকায়া থরথর করে কেঁপে উঠল। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ, ঘৃণা আর চাপা পড়ে থাকা ভালোবাসা যেন এক লহমায় আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। জাহির তার শরীরের পুরো ভার সুহানার ওপর সঁপে দিতে চাইলো তাকে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ফেলতে চাইল নিজের শক্ত শরীর দ্বারা।

বাইরে মিকি আর রোমান দরজার দুই পাশে সরে গেলো। পাহারায় মিকি আর রোমান; দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে তারা বাইরের দিকে নজর রাখছে। কিন্তু ঘরের ভেতর তখন অন্য এক ঝড় বইছে। সুহানার হাত থেকে কাঠের খণ্ডটা কখন যে খসে মেঝেতে পড়ে গেছে, সে টেরও পায়নি।

জাহির তাকে দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরেছে। কয়েক দিনের হাহাকার আর তীব্র দহন শেষে নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে হাতের নাগালে পেয়ে সে তখন হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সুহানা আজ তাকে বাধা দিল না। অন্য দিনের মতো চিৎকার করে বা ছটফট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না সে। কেবল চোখ দুটো বুজে তপ্ত নিশ্বাসের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত সমর্পণে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

জাহিরের তপ্ত নিশ্বাসের ঝাপটা আর বলিষ্ঠ বাহুর বেষ্টনীতে সুহানা যেন এক ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিল। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে তার কোনো হিসেব নেই। জাহির যখন সামান্য দূরত্ব তৈরি করল, তখন সুহানার ফুসফুস অক্সিজেনের জন্য মুখ খুলে হা করে উঠল। জাহির টলমল পায়ে সুহানার পাশে গিয়ে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার এলোমেলো চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে আগের তুলনায় বড় হয়েছে নীচে কালো মাফলার টা গড়াগড়ি খাচ্ছে। জাহির নিজেও জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে

জাহির স্থির দৃষ্টিতে সুহানার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখে তখনো আদিম তৃষ্ণা আর এক পৈশাচিক জয়ের নেশা চকচক করছে। সুহানা একদম নিথর হয়ে সামনে তাকিয়ে রইল; আজ সে আক্ষরিক অর্থেই পরাজিত। জাহিরের এই তীব্র চাউনির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।

কত পরিকল্পনা করে সে পালিয়ে এসেছিল, কত সহস্র মাইল দূরত্ব তৈরি করেছিল তাদের মাঝে। ভেবেছিল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে এলে হয়তো এই বিষাক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু জাহির তো হারের পাত্র নয়। —ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, এই প্রবাদটা জাহিরের মতো মানুষের ক্ষেত্রে কতটা ধ্রুব সত্য এই কয়েকটা দিন সে দিনরাত এই নিয়েই পড়েছিল তবুও বাইরের জগৎ কে বুঝতে দেইনি কিছুই । সুহানা পৃথিবীর বিপরীত মেরুতে আশ্রয় নিয়েও সে রেহাই পায়নি; জাহির তাকে খুঁজে বের করেই ছেড়েছে।

জাহির একটু ঝুঁকে এল সুহানার দিকে। তার তপ্ত নিশ্বাস সুহানার গাল স্পর্শ করছে। অত্যন্ত নিচু স্বরে, অনেকটা হিসহিসের মতো সে বলে উঠল, "ভেবেছিলে আড়ালে হারিয়ে গেলেই আমি তোমাকে খুঁজে পাব না? জাহিরের সাথে পাঙ্গা নিয়েছ সুহু!.... আমাকে হারানো কি এতই সহজ?"

তার প্রতিটি শব্দে যেন বিজয়ের দাম্ভিকতা ঝরে পড়ছিল। সুহানা বুঝল, যে জালে সে আটকা পড়েছে, সেখান থেকে পালানোর সব রাস্তা জাহির অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। জাহিরের এই অমোঘ উপস্থিতির সামনে তার সমস্ত প্রতিরোধ আজ বালির বাঁধের মতো ধসে পড়েছে।

সুহানা কোনো কিছু ভাবার বা বলার সামান্যতম সুযোগও পেল না। মুহূর্তের মধ্যে ঘাড়ে এক তীব্র চাপ অনুভব করল সে, আর তার পরপরই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে চোখ দুটো বুজে এল। জ্ঞান হারিয়ে সে জাহিরের বিপরীত দিকে হেলে পড়তেই জাহির এক হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের বুকের ওপর এনে ফেলল। জাহির কিছুটা বিরক্তই হলো; সব নায়িকাদের মতো কেন এই মেয়ে স্বাভাবিকভাবে তার বুকে ঢলে পড়ল না? এখানেও কি তাকে নিজের জেদ, টেরামী দেখাতে হলো? সুহানার এই স্বভাব জাহিরের সব হক ওলটপালট করে দিচ্ছে। সে এই মেয়েকে নিয়ে সংসার করবে নাকি ‘সংসার’ তাকে করবে—সেটা জাহিরের মাথায় ঢুকছে না।

বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে সে টুপ করে নিচু হয়ে সুহানাকে চালের বস্তার মতো কাঁধে তুলে নিল। এরপর রুমে ঢুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পরীক্ষা করতে লাগল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে পাসপোর্টটা পাওয়া গেল। আর তেমন দামি কিছু সেখানে ছিল না—কয়েকটা সাধারণ জামাকাপড়, একটি হাতঘড়ি আর গুটিকয়েক বই। পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে জাহির ঘর থেকে বেরিয়ে এল এবং রোমানকে নির্দেশ দিল সুহানার সব জিনিসপত্র দ্রুত গাড়িতে তুলে নিতে।

এরপর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। সুহানা যখন একবারের জন্য চোখ মেলে তাকাল, তখন সে সম্ভবত মাঝ-আকাশে কোনো ফ্লাইটের ভেতর ছিল। এরপর আর কিছুই তার মনে নেই। এখন তার মুখটা বিস্বাদ আর তেতো হয়ে আছে—সুহানার দৃঢ় বিশ্বাস, মাঝপথে জাহির নিশ্চিতভাবে তাকে কোনো ওষুধ বা এমন কিছু খাইয়ে দিয়েছিল যার ফলে সে এভাবে অচেতন হয়ে ছিল।

জ্ঞান ফেরার পর উঠে বসতেই সুহানার বুঝতে বাকি রইল না যে এটা কার ঘর। এমন অদ্ভুত রুম কারোর হতে পারে না, জাহির ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সে নিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে ডলতে লাগল, জায়গাটা বেশ ব্যথায় টনটন করছে। এই জাহিরই তাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করল আবার এই বাড়িতেই ফিরিয়ে আনল। কিন্তু এখন সে কী জবাব দেবে? জাহির যদি চলে যাওয়ার কারণ জানতে চায়, তবে সে কী বলবে? পরশুদিন রাতেই হুট করে সে জাহিরকে নিজের সামনে আবিষ্কার করেছিল।

__________________________________

জাহির কোনো শব্দ না করেই লক খুলে রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। ঢুকেই তার প্রথম নজর গেল বাঁদিকের বিছানাটার দিকে—সেটা একদম খালি পড়ে আছে। জাহির কালক্ষেপণ না করে দ্রুত দরজার লক আটকে দিল। এই ঘর থেকে বেরোনোর আর কোনো পথ নেই; কোনো জানালা নেই, নেই কোনো ব্যালকনিও। চারদিকের দেওয়ালগুলো শক্ত কাঁচ দিয়ে ঘেরা, যা ‘পিথাগোরাস’ সিস্টেমে কেবল জাহিরের কণ্ঠস্বর ছাড়া খোলা অসম্ভব। জাহির সতর্ক চোখে পুরো ঘরটা একবার দেখে নিল—ঘরটা একদম ফাঁকা।

“ওহ সুহু! আবারও কোথায় গায়েব হয়ে গেলে?”

জাহির হালকা চালে হেলতে দুলতে সামনের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরও টের পায়নি যে সুহানা দরজার ঠিক পাশেই ঘাপটি মেরে বসে ছিল। জাহির একটু সামনে বাড়তেই সুহানা অতর্কিতে তার হাঁটু বরাবর এক মোক্ষম লাথি বসিয়ে দিল। অপ্রস্তুত জাহির ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। সুহানা তাকে আরও একবার আঘাত করার জন্য পা তুলল ঠিকই, কিন্তু এবার আর সফল হতে পারল না। জাহির বিদ্যুৎগতিতে সুহানার পা ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। মুহূর্তের মধ্যে সুহানা জাহিরের মাথার ওপর দিয়ে ছিটকে সরাসরি তার কোলের ওপর এসে পড়ল।

জাহির দুই হাতে সুহানাকে শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমার সাথেও তোমাকে এখন মারপিট করতে হচ্ছে?”

সুহানা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়; সে কৌশলে নিজেকে জাহিরের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিল। জাহিরও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। এখন সুহানা আর জাহির একে অপরের মুখোমুখি—দুজনেই পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

সুহানা এখন পুরোদস্তুর রণংদেহী মূর্তি! তার চোখে আগুন, আর সেই আগুনের আঁচ জাহির বেশ টের পাচ্ছে। সুহানা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে জাহিরের কলার লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

জাহির খুব আলতো করে একপাশে সরে গিয়ে সুহানার হামলাটা ফসকে দিল। মুখে তার সেই পরিচিত বাঁকা হাসি। সে হাত তুলে ডব্লিউডব্লিউই-র রেফারির মতো ভঙ্গি করে বলল, “ওরে বাবারে! আমার শান্তসৃষ্ট সুহু তো দেখছি আস্ত একটা পকেট ডিনামাইট! তা ম্যাম, অ্যাটাক করার আগে একটু ওয়ার্নিং দেওয়া যায় না?”

সুহানা আরও রেগে গিয়ে এবার একটা ‘রাউন্ড-হাউস কিক’ নেওয়ার চেষ্টা করল। জাহির নিচু হয়ে সেটা এড়িয়ে গেল এবং সুহানার ভারসাম্য সামলাতে তার কোমরে এক হাত দিয়ে আলতো করে ঠেক দিল। সুহানা ছিটকে সরে গিয়ে আবার তেড়ে এল। এবার সে কিল-ঘুসি চালানো শুরু করল জাহিরের বুকে।

জাহির কোনো পাল্টা আঘাত করল না, বরং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সুহানার ছোট ছোট হাতগুলো আটকে দিতে লাগল। যেন কোনো অবাধ্য বাচ্চার সাথে খেলছে। হাসতে হাসতে সে বলল, “আরে আরে! হাত ব্যথা হয়ে যাবে তো আমার ‘উজি’, তোমার এই নরম হাতে আটা মাখা যায়, আমার মতো শক্ত পাথরে মারলে নিজেরই লাগবে। আর শোনো, আমাকে মেরে যদি তোমার হাত ভেঙে যায়, তবে কিন্তু ইনস্যুরেন্স কোম্পানি এক টাকাও দেবে না, কারণ ফাইট তুমিই আগে শুরু করেছ!”

সুহানা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এবার জাহিরকে কামড়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল। জাহির এক হাত সুহানার কপালে ঠেকিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে রাখল। সুহানার হাত-পা বাতাসে দাপাদাপি করছে কিন্তু সে জাহির পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

জাহির হো হো করে হেসে উঠে বলল, “এই যে উজি ম্যাডাম, আপনার হাত কি ছোট হয়ে গেছে নাকি আমি হঠাৎ লম্বা হয়ে গেলাম? আপনি তো দেখি সেই কার্টুনের লিলিপুট মতো হাত-পা ছুড়ছেন! মাফ করো সুহু আমি কিন্তু মাংসাশী প্রাণী নই, তাই কামড়াকামড়িতে আমি নেই।“

সুহানা হাপিয়ে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়াল। বুক ওঠানামা করছে রাগে আর পরিশ্রমে। জাহির তখন আয়নার সামনে গিয়ে নিজের জ্যাকেটটা ঠিক করতে করতে টিপ্পনী কাটল, “কী হলো? আমার ম্যাডাম উজি কি জ্যাম হয়ে গেলেন নাকি? ম্যাগাজিন কি শেষ? যাও, এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার ফায়ার শুরু করো। যাক, আজকের জিমটা ঘরেই হয়ে গেল। থ্যাঙ্ক ইউ সুহু! তবে পরের বার অ্যাটাক করার আগে একটু গ্লুকোজ খেয়ে নিও, তোমার এনার্জি তো দেখি পাঁচ মিনিটেই শেষ!”

সুহানা একটা বালিশ তুলে নিয়ে সজোরে জাহিরের মুখে ছুড়ে মারল। জাহির সেটা লুফে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল, “ওহ! ডিরেক্ট হার্টে হিট করেছ জান। এই নাও, তোমার ভালোবাসা আমি গ্রহণ করলাম!”

জাহির সুহানার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল--“একদম পারফেক্ট নাম দিয়েছি তোমাকে—‘লিটল উজি’। দেখতে ছোটখাটো হলে কী হবে, একবার ট্রিগার টিপলে (রাগলে) থামাথামির নামগন্ধ নেই!”

— "কেন এমন করছেন? নিয়ে এসেছেন কেন আমাকে? আমি তো নিজের ইচ্ছাতেই চলে গিয়েছিলাম, তবে আবার কেন?" সুহানার কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব মিলেমিশে একাকার।

জাহির শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, "আমি যদি তোমাকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করি—তুমি কেন নিজের ইচ্ছায় চলে গিয়েছিলে রাতের আঁধারে লুকিয়ে আমাকে না জানিয়ে?"

— "সেটা আমি আপনাকে বলতে বাধ্য নই!"

— "তবে আমিও তোমাকে উত্তর দিতে বাধ্য নই।"

— "আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই চলে গেছি!" সুহানা জেদ ধরল।

— "আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই তুলে নিয়ে এসেছি।"

— "আমি আবারও চলে যাব।"

— "আমি আবারও তুলে আনব।"

— "আমি আসব না!"

— "তোমাকে আসতেই হবে।"

— "আমি থাকব না আপনার কাছে।"

— "আমি রাখব।"

সুহানা এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল, "আপনি এমন কেন?"

জাহির এক মুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিল, "তুমি এমন, তাই।"

— "কেন করছেন এসব?"

— "তুমি যে কারণে করছ, ঠিক সেই কারণেই।"

— "শুনুন আমার কথা..."

— "তোমার সব কথা শুনতেই তো আমি প্রস্তুত।"

সুহানা একটু থামল, যেন শব্দ খুঁজছে। তারপর ধরা গলায় বলল, "আমি আপনার জন্য সঠিক নই।"

— "সেটা তুমি জানলে কীভাবে?"

— "বোঝার চেষ্টা করুন..."

— "বোঝাও…।"

সুহানা থেমে গেল। সে কোনোকালেই ঠিক ছিল না, অন্তত তার নিজের চোখে। সে বলতে চাইল, "আপনি... আপনি..."

জাহির সুহানাকে হ্যাঁচকা টানে নিজের একদম কাছে নিয়ে এল। সুহানা এখন কী বলবে? সে কি আবার সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটবে যে সে 'অপয়া' কিংবা 'আনলাকি'? এসব তো সে আগেই বলেছে, কিন্তু জাহিরের ওপর তার কোনো প্রভাবই পড়েনি।

জাহির বিদ্রুপের সুরে বলে উঠল, "বলো, বলো যে তুমি আনলাকি আর আমি পারফেকশনিস্ট! তুমি পারফেক্ট নও, আমি হিরে আর তুমি রুপো! আমি খুব বড়লোক আর তুমি মহাগরিব! নাকি এবার নতুন কিছু বলবে—যে তুমি আসলে মেয়েই নও, অন্য কিছু?"

এইসবের মাঝেও জাহিরের বিদ্রুপ শুনে রাগে সুহানা জ্বলে উঠল। সে জাহিরের দিকে তাকাতেই জাহির তাকে হুট করে কোলে তুলে নিয়ে বসল বেডের উপরে সুহানার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখল জাহির। সুহানা আড়ষ্ট হয়ে গেল, প্রাণপণ চেষ্টা করল নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। কিন্তু জাহিরের মতো বিশাল দেহের অধিকারী কাউকে সরানো তার পক্ষে অসম্ভব। শরীরে আর একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই তার, সময় বয়ে চলল কেউ কিছু বলল না জাহির চোখ বন্ধ করে পরে রইলো ওই ভাবেই।

হঠাৎ সুহানা দুহাতে জাহিরকে সরিয়ে দিয়ে বুক ফাটা চিৎকার করে বলে উঠল, "আমাকে যেতে দিন! আমি এখানে থাকতে পারব না। প্লিজ, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে যেতে দিন! আপনাকে আমার ভালো…. নাহ লাগে না ভালো । আপনি যা চাইছেন তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ঘর-সংসার করা আমার দ্বারা হবে না, কখনো না! একই ভুল আমি দ্বিতীয়বার করব না। মম করেছিল, সে তো চলে গেছে। আমি কোনোমতে টিকে আছি, এর চেয়ে বেশি কিছু সম্ভব নয়। এই ভালোবাসা-টালোবাসা সব মিথ্যে, এসব কেবল টিভি সিরিয়াল আর বইতেই মানায়। দয়া করে আমাকে রেহাই দিন, ছেড়ে দিন আমাকে! নিজের মতো কাউকে খুঁজে নিন... আমাকে ডি..."

সুহানার বাক্যটি অসম্পূর্ণই রয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে গেল জাহিরের অভাবনীয় এক আচরণে। সুহানার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। এই দ্বিতীয়বার জাহিরের সামনে সুহানার অশ্রু উন্মোচিত হলো। সুহানা নিজের পায়ে সেই অশ্রুর স্পর্শ অনুভব করল—এক ফোঁটা উষ্ণ জলবিন্দু।

জাহির আকুল কণ্ঠে বলে উঠল, “আমাকে ছেড়ে যেও না তুমি, আমি তোমার পায়ে পড়ছি... রহম করো আমার ওপর।”

কথাটা বলেই সে মাথা তুলে সুহানার মুখের দিকে তাকাল। সুহানাও নতজানু হয়ে নিচে দৃষ্টি দিল। জাহির তখন হাঁটু গেড়ে বসেছে সুহানার পায়ের ওপর ঝুঁকে। সুহানা আড়ষ্ট হয়ে গেল, তার পায়ের আঙুলগুলো মেঝে খামচে ধরল প্রবল অস্বস্তিতে।

জাহির বলতে লাগল, “আমি জাহির। আমার বাইশ বছরের জীবনে কোনোদিন কোনো কিছুতে কারও কাছে হারিনি। পড়াশোনা, খেলাধুলা, মারপিট, তর্ক কি ঝামেলা—কোনো কিছুতেই নয়। আমার গড়া রেকর্ডগুলো আজও অক্ষুণ্ণ আছে, কেউ ভাঙতে পারেনি। আমি সবসময় নিজের ইগোকেই সব থেকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে কোনোদিন মাথা নত করিনি। আমি ভীষণ জেদি আর ইগোইস্টিক একজন মানুষ, যার কাছে নিজের প্রাধান্য সবার ওপরে। কেউ আমার থেকে এগিয়ে যাবে, এটা আমার মন মানতে পারে না। জিততেই হবে আমাকে, নইলে আমার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। না চাইতেও কেবল এই জেদের কারণে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। আমি থামার মতো মানুষ নই, ভীষণ অগোছালো, ঠিক যেন খোলা আকাশে ডানা মেলা এক যাযাবর পাখি।”

একটু থেমে জাহির ধরা গলায় বলল, “সেই জাহির আজ তোমার কাছে নিজের হার স্বীকার করছে। তোমার পা ধরে মিনতি করছি—আমার কাছে থেকে যাও না সুহু! আমাকে তোমার ভালোবাসতে হবে না, আমি কোনোদিন সেই দাবি রাখিনি। ভালোবাসার কথা আমি নিজেও কোনোদিন বলিনি, কারণ আমি জানিই না এটা কী বা কেমন। আমি শুধু চাই তুমি আমার পাশে থাকো সারাজীবন, একদম আমার খুব কাছে। ঘর-সংসারের প্রতি আমার নিজেরও কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ওসব কী হয় বা কেমন হয়, তাও জানি না। এমনকি বিয়ে জিনিসটা কী, তা-ও জানতাম না। শুধু এইটুকু জানতাম যে তোমাকে নিজের করে পেতে হলে বিয়েটা করতে হবে, তাই সুযোগ পেয়ে সেটা করে ফেলেছি। তুমি তো সংসার করতে চাও না, বিয়েও করতে চাও না—কিন্তু এখন তো বিয়েটা হয়েই গেছে। এবার না হয় আমার সাথেই সংসারটা করে নাও, প্লিজ!”

জাহির সুহানার পা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শেষবারের মতো আকুতি জানাল, “আর কোথাও যেও না আমাকে ছেড়ে। এই জীবনে থেকে যাও আমার হয়ে। তুমি চলে গেলে আমি মোটেই ঠিক থাকতে পারব না। তোমাকেই লাগবে আমার, তোমার থেকে ভালো আর কেউ নেই আমার জন্য। আমি তোমার কোনো কাজে কোনোদিন বাধা দেবো না, শুধু প্লিজ—আমার হয়ে থাকো।”

চলবে….

{“এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা এবং কাল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। এছাড়া, অনিচ্ছাকৃত কোনো বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি, আপনারা গল্পের মূল ভাবাবেগটুকুই গ্রহণ করবেন”}

সম্পূর্ণ উপন্যাসের লিংক 🖇️

https://www.facebook.com/share/p/1E8un1tWhL/

পেজ লিংক 🖇️ [Midnight Tales by Joy]

https://www.facebook.com/share/18DrFSvtcF/

আইডি লিংক 🖇️[MD Suhan Joy]

https://www.facebook.com/share/18Arx2QfVM/

.

.

.

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

#উপন্যাস

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন