ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৫৭তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৫৭

[বিশেষ দ্রষ্টব্য-"এই গল্পটি মূলত গভীর প্রণয় ও সূক্ষ্ম জীবনবোধের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এখানে যেমন ফুটে উঠেছে হৃদয়ের তীব্র রোমান্টিক অনুভূতি, তেমনি সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে কঠোর সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র। আশা করি, অনুভূতির এই বিচিত্র রঙ আপনাদের স্পর্শ করে যাবে।"]

জাহাঙ্গির সাহেব সাবেরাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,- "ছেলেরে বোঝাও সাবেরা। মেয়েটা ওর তুলনায় অনেক ছোট। শুধু আবেগে গা ভাসালে চলবে না।"

সাবেবা দ্বিধায় পড়ে উত্তর দিলেন, -"আমি এটা ওকে কীভাবে বলব? মা হয়ে বলব নিজের বউয়ের থেকে দূরে থাকতে?"

জাহাঙ্গির বিরক্তি কন্ঠে বললেন -"তাহলে কি বলতে চাইছ আমি গিয়ে বলব?"

-"সে না হয় আমি আফ্রিদিকে দিয়ে বলালাম, কিন্তু ও কি আদৌ শুনবে?"

জাহাঙ্গির সাহেব কড়া গলায় বললেন,- “শুনবে না মানে? শুনতে হবে।

সাবেরা শুতে শুতে বলে দিলো –“আমি বলার মতো বলে দেব, বাকিটা জানি না”

জাহাঙ্গির সাহেব বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি নিজের ছেলেকে হাড়ে হাড়ে চেনেন, তাই তাকে খুব একটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। মেয়েটাকে নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত; এই সংসারের টানাপোড়েনের মাঝে মেয়েটার পড়াশোনা শেষ হয়েযাবে। মেয়েটার মধ্যে জোস আছে ফিউচার ব্রাইট ওর। আজ কথা বলে তিনি বুঝেছেন সুহানা শুধু পরিশ্রমীই নয়, যথেষ্ট মেধাবীও। তার চিন্তাধারা সাধারণ মেয়েদের মতো নয়; সমাজ, রাজনীতি আর উন্নয়ন নিয়ে তার বেশ ভালো জ্ঞান আছে। যদিও দেখতে নিতান্তই বাচ্চা মনে হয়, কিন্তু জাহাঙ্গির সাহেব সুহানার চোখের দিকে তাকাতে পারেন না। সেই চোখে চোখ রাখলেই পুরনো দিনের কথা আর নিজের অতীতের কর্মগুলো মনে পড়ে যায়। তিনি কোনোদিন ভাবেননি এই অতীত এভাবে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াবে। রাদিফ আর আতিফ কি কিছু জানে? সেই দিনের পর তো আর দেখা হয়নি। একেই বোধহয় বলে ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’—সুহানাকে জীবিত দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তিনি চশমাটা খুলে পাশে রাখলেন এবং শুয়ে পড়লেন। কাল ঈদ, সকালে জলদি উঠতে হবে।

এদিকে তুহিনা জানালার পাশে একা বসে আছে। আফ্রিদি নিচে কিছু কাজ করছে, এখনো আসেনি। সুহানাকে একবারই দেখেছিল সে, তারপর আর দেখা হয়নি। নিচে কথা হলেও সুহানা তার সাথে দেখা করেনি বা খোঁজ নেয়নি। সুহানা তার বোন—সে মানুক আর না মানুক। তুহিনার খুব কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য। মায়ের সেই মিথ্যা সাজানো গল্পের কারণেই কি সুহানা আজ তাকে দেখতেও চাইছে না।

ফিনা অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। রাত অনেক গভীর হয়েছে, কিন্তু তার মাথা ঘোরানো যেন কিছুতেই কমছে না। এমন সময় ডেনিয়েল জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। সামান্য শব্দ হতেই ফিনা মাথা তুলে তাকাল এবং ডেনিয়েলকে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করতেই আবার মাথা ঘুরে উঠল তার। ডেনিয়েল ফিনার দিকে তাকিয়ে দেখল — মেয়েটার চোখ-মুখ বসে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সারা দিন কি কিছু খায়নি মেয়েটা?

ডেনিয়েল নিজের জুতো খুলে বিছানায় বসল। ফিনা নিজের পোশাক খুলতে শুরু করতে গেলে ডেনিয়েল তার হাত ধরে থামিয়ে দিল। ফিনা ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ডেনিয়েল জিজ্ঞেস করল — "শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?"

— "না।"

— "খেয়েছ কিছু?"

— "না।"

— "কেন খাওনি?"

— "ভালো লাগছে না। আপনি কি এখানে থাকবেন?"

ডেনিয়েল পালটা প্রশ্ন করল — "থাকলে কি তোমার খুব সমস্যা হবে?"

ফিনা আর কিছু বলল না, চুপ করে রইল। ডেনিয়েল ফিনার কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বর আছে কি না। জ্বর নেই, তবুও এমন অবস্থা কেন? তখনই তার নজর গেল টেবিলের ওপর রাখা খাবারের প্লেটের দিকে। সে কিছুক্ষণ গভীর চোখে ফিনাকে দেখল — মেয়েটা জেদ ধরে বসে আছে। ডেনিয়েল উঠে দাঁড়িয়ে জানালা এবং দরজা ভালো করে আটকে দিল। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে ফিরে এল।

সে বিছানায় বসে খাবারের প্লেটটা হাতে নিল। ঢাকনা সরাতেই দেখা গেল রোস্টেড মিট, সাথে সালাদ আর হুইট সস। ডেনিয়েল ছুরি দিয়ে মাংসের স্লাইসগুলো কেটে কাঁটাচামচ দিয়ে সসের সাথে ভালো করে মাখিয়ে ফিনার মুখের সামনে ধরল।

— "হা করো।"

ফিনা প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেল, পরক্ষণেই তেজ দেখিয়ে বলল — "আমার সাথে এই নাটক করবেন না।"

— "নাটক করছি না।"

— "করছেন তো! এই যে আলগা পিরিত দেখাচ্ছেন, কেন?"

— "পিরিত দেখাচ্ছি না, তুমি অসুস্থ। বেশি কথা না বলে খেয়ে নাও।"

ফিনা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল — "আপনার যা করার করে দিয়ে বিদায় হন তো এখান থেকে।"

ডেনিয়েল এবার কিছুটা কঠোর স্বরে বলল — "আমি আমার কাজ খুব ভালো করেই জানি। যেটা বলছি সেটা করবে, নাকি আমাকে অন্য পথ বেছে নিতে হবে?"

— "আমি খাব না।"

— "খেয়ে নিলে আমি চলে যাব।"

— "তাহলে এখনই বেরিয়ে যান।"

— "আগে খেয়ে নাও।"

ফিনা নরম হয়ে বলল — "আমি একা একা খেতে পারব।"

— "এতক্ষণ খাওনি যখন, এখন আর নিজে খেতে হবে না।"

ডেনিয়েল অত্যন্ত যত্ন সহকারে ফিনাকে খাইয়ে দিল। ডেনিয়েলের এই কোমল আচরণে ফিনা কিছুটা নরম হলো, কিন্তু তার মনের ভেতর সুহানার কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। ফিনাকে নিশ্চুপ দেখে ডেনিয়েল নরম সুরে জিজ্ঞেস করল — "কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ বেবি?"

ফিনা কোনো উত্তর দিল না। তার মনে পড়ছিল অসুস্থ হলে সুহানা তাকে কত কথা শোনাত, আবার বকাঝকা করে নিজ হাতে খাইয়েও দিত। কত রাত যে সুহানা তার শিয়রে জেগে বসে কাটিয়েছে! এমনকি দুইবার হাসপাতালে থাকার সময়ও সুহানা এক মুহূর্তের জন্য তাকে ছেড়ে নড়েনি। অথচ আজ সেই সুহানা একবারের জন্যও তার খোঁজ নেয়নি। সন্ধ্যায় জাহির এসে সব জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, ফিনাকেও সাথে নিতে চেয়েছিল কিন্তু সে যায়নি। সুহানার চোখের দিকে তাকানোর সাহস এখন আর ফিনার নেই।

ডেনিয়েল ফিনার আরো কাছে সরে এসে তার মুখটা নিজের দিকে ফেরাল — "কী হয়েছে?"

ফিনা নিরুত্তর

— "সুহানার কথা মনে পড়ছে?"

সুহানার নাম শুনতেই ফিনার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। দৃশ্যটি দেখে ডেনিয়েলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে আলতো করে ফিনাকে টেনে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। এবার ফিনা শব্দ করে কেঁদে উঠল — "সুহানা আমার সাথে কথা বলে না, ও আমার মুখ দেখতে চায় না। ও আমাকে ঘৃণা করে। আমার জন্যই ও চলে গিয়েছিল। আমি ওদের মিথ্যে জালে ফেঁসে গিয়েছিলাম... বুঝতে পারিনি যে সব ওদের পরিকল্পনা ছিল।"

— "কোন প্ল্যান?" ডেনিয়েল জানতে চাইল।

ফিনা কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাদের মতো সব সত্য বলে দিল। ডেনিয়েল সবকিছু শুনল এবং বুঝল যে সুহানার পরিস্থিতির কারণেই সে ফিনাকে নিজের হাতের নাগালে পেয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পথটা অসৎ ছিল, সুহানা পাশে থাকলে সে কোনোদিন ফিনাকে পেত না। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ফিনা ডেনিয়েলের বুকেই ঘুমিয়ে পড়ল। ডেনিয়েল খুব সাবধানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চোখের পানি মুছে দিল। সে ফিনার দিকে তাকিয়ে ভাবল — মেয়েটার সাথে সে অনেক অন্যায় করেছে। এখন আর তার ওসব করতে ইচ্ছে করে না; বরং তার মন এখন অন্য কিছু চাইছে। সে কি তবে ফিনার প্রেমে পড়ে গেল?

হতেও পারে। ফিলিংস তো আগে থেকেই ছিল, যা একসময় বোনের জন্য বিসর্জন দিতে হয়েছিল। কিন্তু এবার সে আর সেই একই ভুল করবে না। খুব শীঘ্রই সে নিজের মনের কথা ফিনা এবং নিজের পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

অন্যদিকে, জাহির সুহানার হাতের চড় খেয়ে লাইব্রেরিতেই পড়ে আছে, রুমে যায়নি। কাল ঈদ, সে চায় না মেয়েটা কষ্ট পাক অবশ্য শারীরিক দিক দিয়ে অতটাও নিষ্ঠুর নয় সে। আসলে আবেগের বশবর্তী হয়ে সে এক বড় ভুল করে ফেলেছে—সুহানার কাঁধে কামড়ে দিয়ে রক্ত বের করে ফেলেছে। সুহানা যখন তার চুল টেনে সরিয়ে থাইতে এক লাথি মারল, তখন জাহিরের হুঁশ ফিরল। সুহানা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জামা ঠিক করে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল জাহিরের গালে। চড়টা বেশ জোরেই লেগেছিল, কিন্তু জাহির কিছু বলতে পারেনি। ওইসব মুহূর্তে সে আসলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে পাগল হয়ে যায়। নিজের এই তীব্র অনুভূতি সে তার 'ষোলোআনা'কে কীভাবে বোঝাবে?

সুহানা এখন জাহিরের রুমেই আছে। সে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লেও তার মনে কাজ করছে প্রচণ্ড ভয়। জাহির মানুষটা একাধারে ভালো আবার রহস্যময়। একজন পুরুষের সাথে একই রুমে থাকা সুহানার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। গুগলে সার্চ করে সে জেনেছে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্যের কথা। সুহানা বুঝতে পেরেছে জাহিরকে পুরোপুরি আটকে রাখা সম্ভব নয়, কারণ এতে তার হক নষ্ট হবে। জাহিরও তাকে একই কথা জানিয়েছিল। সুহানা মনে মনে প্রার্থনা করল — "আল্লাহ, ওই লোকের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।"

_________________________________________

ঈদের সকালে সবাই গোসল সেরে তৈরি হয়ে নিয়েছে। সুহানা সকাল সকাল রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে; জাহির রুমে ঢুকে তাকে দেখতে না পেলেও আর ডাকেনি। সুহানা রান্নাঘরের ক্যামেরা হাতে বসে আছে স্ল্যাপের উপরে। রুবাইদা আজ ফিরনি বানাচ্ছেন, সব আয়োজন গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি। ওদিকে সাবেরা বেগমও রান্নার এলাহি কারবার শুরু করেছেন। সুহানা সাহায্য করতে চাইলেও তারা তাকে কোনো কাজ করতে দেননি। রুবাইদা সুহানাকে কাছে ডেকে বললেন — "আমার একটা কাজ করে দিবি মা?"

সুহানা উত্তর দিল — "বলুন আন্টি।"

রুবাইদা হেসে বললেন — "এই ‘বলুন আন্টি’ আবার কী? মা বল, ছোটমা বল। জাহির আমাকে ওটাই বলে।"

সাবেরা বেগম মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটলেন — "তাহলে আমাকে মনে হয় আগের মতোই আন্টি বলবে ও।"

রুবাইদা সায় দিয়ে বললেন — "তাই তো দেখছি...।"

সুহানার বুকের ভেতরটা তখন হাহাকার করে উঠল। 'মা'— এই একটি শব্দ তার জীবনে দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে এক নিষিদ্ধ দীর্ঘশ্বাস হয়ে ছিল। সে জানে না মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ কেমন হয়, জানে না অবাধ্য অভিমানে মায়ের কোলে মাথা রাখা কাকে বলে। সাবেরার চোখের দিকে তাকাতেই তার মনে হলো, এক জনম পার করে সে যেন নিজের হারানো আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

সাবেরা বেগমকে দেখলে তার মনে মায়ের মতো অনুভূতি আসে ঠিকই, কিন্তু মুখ ফুটে মা ডাকতে কেমন যেন জড়তা কাজ করছে। সাবেরা বেগম সুহানার দ্বিধা বুঝতে পেরে চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে কাছে এলেন। আদুরে গলায় বললেন — “মা বলবি না? সমস্যা হলে জোর নেই, কিছু বলতে হবে না।“

সুহানার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা একরাশ কান্না গিলে নিয়ে সে অস্ফুট স্বরে, অনেকটা ভাঙা গলায় উচ্চারণ করল— "মা...!"

সেই ছোট্ট একটি ডাক যেন সারা ঘরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নামিয়ে আনল। সাবেরা বেগম স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন; তার তৃষ্ণা যেন সুহানার ওই একটি শব্দে সিক্ত হয়ে গেল। রুবাইদা বেগম হাতের কাজ থামিয়ে অপলক দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, সুহানা মাথা নিচু করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মেয়েটার সারা শরীর কাঁপছে— যেন সতেরো বছরের জমানো পাহাড়সম একাকীত্ব ওই এক ডাকে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে চাইছে।

রুবাইদা আর স্থির থাকতে পারলেন না। পরম আবেগে সুহানাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিলেন। সুহানার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "পাগলী মেয়ে একটা! নিজেকে এত একা ভাবিস কেন রে? আমরা কি তোর কেউ নই? আজ থেকে আমরা সবাই তোর সব শূন্যতা ভরে দেবে।"

সাবেরা বেগমও সুহানার মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর চোখ ভিজে এলেও মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। ঈদের এই পবিত্র দিনে এক এতিম মেয়ের কণ্ঠে 'মা' ডাক যেন ঘরটাকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দিল। সুহানার মনে হলো, সতেরো বছর পর আজ তার সত্যিকারের ঈদ হয়েছে।

সাবেরা বেগম সুহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ঈদের খুশির দিনে কান্নাকাটি একদম ভালো লাগে না। তিনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন — "কী কাজ বলবে বললে না?"

রুবাইদা বললেন — "রুহানিকে একটু ডেকে নিয়ে আয় না মা।"

সুহানা মাথা নেড়ে বলল — "ওকে।

সুহানা ছোট বাচ্চার মতো তিরিং বিরিং করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। জাহাঙ্গীর সাহেব দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে হাসলেন। আড়ালে থেকে ছোটদের চঞ্চলতা দেখতে তাঁর বেশ ভালো লাগে তার; কিন্তু সে সামনে গেলে সবাই গম্ভীর হয়ে যায়।

রুহানি সেই কখন থেকে রামিমকে কল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রামিম ফোন ধরছে না। রুহানির এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় নক পড়ল। রুহানি ভাবল তার মা এসেছে, তাই চটপট চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল — "আসছি...।"

দরজা খুলে দেখল সুহানা দাঁড়িয়ে আছে। রুহানি অবাক হয়ে বলল — "আরে বউমনি!"

হুট করে বৌমনি শুনে কেমন জানি অদ্ভুত লাগলো সুহানার বৌমনী মানে পরে জানবে

সুহানা চটপট বলল — “ ছোটমা ডাকছে।"

— "ভেতরে আসো না।"

সুহানা উত্তর দিল — "না না, নিচে ছোটমা নতুন রেসিপি ট্রাই করছে, আমি যাই। তুমি দ্রুত রেডি হয়ে এসো।"

রুহানি মাথা নাড়ল — "ওকে।"

সুহানা আবারও পা বাড়ালো তার এখনো গোসল করা হয়নি রাতের পোষাক পাল্টে চলে এসেছিল কালো ট্রাকসুট আর সাদা টিশার্ট পড়েছে সুহানা যেমন আগে পড়ত লাফিয়ে ফলিয়ে চলল সে, সিঁড়ির কাছে যেতেই থেমে গেলো

সুহানা দেখল তুহিনা প্রথম ধাপটিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটি দেখা মাত্রই পুরনো সব স্মৃতি আবারও সুহানার মনের মণিকোঠায় ভিড় করে এল, তার পা জোড়া হঠাৎই থেমে গেল। সে তুহিনাকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল—খয়েরী রঙের একটি চমৎকার লং ফ্রক পরেছে সে, মাথায় সেই একই রঙের ওড়না ঢাকা। তুহিনার গালগুলো আগের চেয়ে কিছুটা ফোলা দেখাচ্ছে, কিন্তু চোখের নিচে কালচে ছোপ স্পষ্ট। মেয়েটা কি ইদানীং একদম ঘুমায় না?

সুহানা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তুহিনা মা হতে চলেছে, অথচ তার নিজের ভেতরে এখনও একরাশ অভিমান জমে আছে। কিন্তু কেন? তুহিনা মাথা নিচু করে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। সুহানা আশেপাশে একবার দেখে নিল আফ্রিদি আছে কি না, কিন্তু কাউকে দেখল না।—মানুষ আজ আছে, কাল নেই। এই দুই দিনের দুনিয়াতে এত মান-অভিমান পুষে রেখে লাভ কী? নিজের ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য তুহিনা না হয় তার সাথে একটু প্রতারণাই করেছে, তাতে আর এমন কী হয়েছে?

সুহানা পা বাড়িয়ে তুহিনার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সিঁড়ির ধাপগুলো বেশ বড় বড়, এই শারীরিক অবস্থায় তুহিনা এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছে তা সুহানা বুঝতে পারল না। সে আলতো করে ডাকল — "দি...।"

ডাকটা শোনা মাত্রই তুহিনা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। সুহানা পরিস্থিতি বুঝে তুহিনার হাত ধরে সাবধানে তাকে উপরে টেনে তুলল।

সুহানা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল — " কী দরকার তোমার?"

তুহিনা ভেজা গলায় উত্তর দিল — "তোকে দরকার।"

সুহানা মৃদু হাসল — "আমাকে দিয়ে কী করবে?"

— "কাজ আছে।"

— "কী কাজ?"

তুহিনা এবার একটা ম্লান হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে বলল — "তোর জিজু ভালো নয়, চেঞ্জ করব।"

সুহানা খিলখিল করে হেসে উঠল, তার গালের টোলখানা স্পষ্ট হয়ে উঠল। তুহিনা আবেগ সামলাতে না পেরে সুহানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সুহানা তাকে পাল্টা জড়িয়ে ধরল না; তার হাত দুটো উঠতে গিয়েও থমকে গেল। পুরনো সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো আবারও তার গলা টিপে ধরছে, মনে করিয়ে দিচ্ছে ফেলে আসা যন্ত্রণার কথা।

তুহিনা কাঁদতে কাঁদতে বলল — "আমায় মাফ করে দে সুহানা। আমি অজান্তে এমনটা করেছি। আমাকে সবটা জানানো হয়নি, আব্বু সব বলেনি, শুধু কিছুটা বলেছিল। ফিনার কোনো দোষ নেই, ওকে কষ্ট দিস না। আমাদের ছেড়ে আর যাস না প্লিজ, আমাদের অন্যায় এর শাস্তি জাহিরকে দিস না ও বেকাসুর। আমরা কেউ ভালো নেই তোকে ছাড়া। এইবার আমাদের মাফ করে দে, আমার অনাগত বাচ্চার কসম!"

বাচ্চার কসম দিতেই সুহানা ধমক দিয়ে উঠল — "এই...!" সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তুহিনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। শান্ত গলায় বলল — "ইটস ওকে, ভুলে যাও সব। আমিও ভুলে গেছি... ওই বেবিটাকে এসবের মধ্যে জড়িয়ে না, নিজের খেয়াল রাখো।"

তুহিনা সরে আসতেই সুহানা নিজের হাত দিয়ে তার চোখ মুছিয়ে দিল এবং তাকে আলতো করে লিফটের দিকে নিয়ে গেল।

জাহির আর আফ্রিদি দরজার আড়াল থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। আসলে তুহিনাকে সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে রাখার পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল জাহিরের। সে-ই তুহিনাকে ওখানে পাঠিয়েছিল যাতে সুহানার সাথে সব মিটে যায়।

আফ্রিদি শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেও জাহির মুখ বেজার করে গজগজ করতে লাগল — "আজ প্রেগন্যান্ট হলে পায়ে পড়তে হতো না। একটু কেঁদে-কেটে নাকের পানি ঝরালেই সব মিটে যেত। ছি! এটা একটা জীবন? ছি!"

আফ্রিদি জাহিরের কথা শুনে ঘাড়ে হাত দিয়ে প্রশ্ন করল — "তুই জানলি কি করে সুহানা এক্ষনি আসবে?”

জাহির ভাব নিয়ে বলল — "ওহে বৎস! আমার অন্তর চক্ষু খুলে গেছে। আমি সব দেখতে পাই।"

আফ্রিদি মুখ বাঁকাল — "আস্ত একটা নাটকবাজ!"

জাহির এবার সিরিয়াস হয়ে বলল — "যাক, একটা ঝামেলা তো মিটল। নেক্সট মিশন ফিনা, পাঠিয়েছিস কাউকে ওকে আনতে?।"

আফ্রিদি মাথা দোলালো, — “ হ্যাঁ ব্রুস কে পাঠিয়েছি…”

“ ওকে…”

আফ্রিদি মনে করিয়ে দিল — "সব তো হলো,নামাজ পড়তে যাবি না?"

“ হ্যাঁ ভুলে গেছিলাম…”

_______________________________

ফিনা আপনমনে বসে শেষ হওয়া জিনিসপত্রের লিস্ট তৈরি করছিল, ঠিক তখনই ব্রুস এসে হাজির হলো। ব্রুসকে দেখেই ফিনা দ্রুত উঠে দাঁড়াল। আশার আলো চিকচিক করে উঠল তার চোখে। সে উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল — " সুহানা পাঠিয়েছে আপনাকে তাই না ?"

ব্রুস মাথা নেড়ে সংক্ষেপে উত্তর দিল — "হ্যাঁ।"

ফিনা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে আবারও নিশ্চিত হতে চাইল — "সত্যিই?"

ব্রুস শান্ত গলায় বলল — "ইয়েস। আপনাকে নিতেই পাঠিয়েছে এখানে।

সুহানা তাকে মনে পড়েছে এই কথা শুনেই ফিনা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত শরীর খারাপ আর ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা বিষণ্ণতায় নুয়ে পড়েছিল, এখন তার চোখেমুখে উপচে পড়া আনন্দ। সে চনমনে গলায় বলল — "আমি জানতাম ও আমাকে ছাড়া ঈদ করতেই পারবে না ইমপসিবল,আমি এখনই আসছি!"

ব্রুস বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। ডেনিয়েল গত রাতে ঠিক কখন বেরিয়ে গেছে, তা ফিনা জানে না। সে দ্রুত রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিল। সাদা আর নীলের মিশেলে একটি সুন্দর ফ্রক পরে সে যখন বাইরে এল, তাকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল।

ফিনা বাইরে আসতেই ব্রুস ভদ্রতার সাথে গাড়ির দরজা খুলে দিল। একরাশ উত্তেজনা আর ভালো লাগা নিয়ে ফিনা গাড়িতে গিয়ে বসল।

গাড়ি যত জাহিরের বাড়ির কাছে পৌঁছাচ্ছিল, ফিনার বুকের ভেতরটা ততই দুরুদুরু করে কাঁপছিল। তার মনে এক অজানা ভয় আর দ্বিধা—সুহানা কি তাকে ক্ষমা করবে? যে সুহানা তার ওপর এতদিন পাহাড়সম অভিমান করে বসে ছিল, আজ হঠাৎ তাকে ডেকে পাঠানোটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। কিন্তু ফিনা জানে না, এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে জাহিরের এক নিপুণ পরিকল্পনা। জাহির চেয়েছে ঈদের এই খুশির দিনে পরিবারের সব ভাঙা মনগুলো যেন আবার জোড়া লেগে যায়।

বাড়িতে পৌঁছে ফিনা দেখল এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বাড়ির পুরুষেরা—জাহির, আফ্রিদি আর জাহাঙ্গীর সাহেব সবাই তখন ঈদের নামাজ পড়তে গেছেন। পুরো বাড়িটা এক পবিত্র নিস্তব্ধতায় ঘেরা, অথচ অন্দরমহলে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুস্বাদু সব খাবারের ম ম ঘ্রাণ। সেখানে তখন ব্যস্ততার শেষ নেই। সুহানা, রুহানি আর তুহিনা—তিন জন মিলে রুবাইদা আর সাবেরা বেগমকে রান্নায় সাহায্য করছে। রুবাইদা বেগম বড় একটা ডেকচিতে ফিরনি নাড়ছেন, আর সাবেরা বেগম ব্যস্ত পোলাও আর কোরমার তদারকিতে সেমাই আগেই কমপ্লিট। সুহানা সুনিপুণ হাতে সালাদ কাটছে, আর রুহানি-তুহিনা মিলে টেবিল সাজানোর কাজগুলো এগিয়ে রাখছে।

রান্নাঘরের সেই হাসাহাসি আর চুড়ির রিনঝিন শব্দের মাঝে ফিনা এসে যখন দরজায় দাঁড়াল, সুহানা আড়চোখে একবার তাকাল। তার চোখে আগের সেই কঠোরতা নেই, বরং এক ম্লান প্রশান্তি। কেউ কিছু না বললেও বাতাসের আবেশে যেন মিশে রইল এক গভীর ক্ষমার ইঙ্গিত। ঈদের এই সকালটা যেন সবার জীবনের সব গ্লানি মুছে দিয়ে এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ফিনা উৎসুক দৃষ্টিতে সুহানার দিকে চেয়ে রইল, কিন্তু সুহানা একবারও তার দিকে ফিরে তাকাল না। ফিনার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল, বুক ঠেলে কান্না এলেও কোনো কথা বেরোল না; শুধু দুচোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফিনাকে এভাবে কাঁদতে দেখে তুহিনা এগিয়ে এল। সাবেরা আর রুবাইদাও হাতের কাজ থামিয়ে সুহানার দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু সুহানা নির্বিকার—সে গভীর মনোযোগে চপার চালিয়ে শসা কাটায় ব্যস্ত।

রুহানি পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিনাকে লিভিং এরিয়ায় নিয়ে এল। তুহিনা পাশে বসেও কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। ফিনা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল— "আমাকে আবারও মিথ্যে বলে এখানে আনা হয়েছে, তাই না? আবারও আমাকে ঠকানো হলো..."

তুহিনা ফিনার মাথায় হাত রেখে অপরাধবোধ নিয়ে বলল— "আমাকে ক্ষমা করে দে ফিনা, প্লিজ।"

ফিনা চট করে চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। ধরা গলায় বলল— "আমি চলে যাচ্ছি। আজকের এই ঈদের আনন্দ আমি নষ্ট করতে চাই না।"

রুহানি তাকে আটকানোর চেষ্টা করে বলল— "শোনো ফিনা, দাঁড়াও। দাদাভাই আর বড়দা ফিরে আসুক, তারপর..."

কিন্তু ফিনা কারও কথা শুনল না। সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে দরজার কাছে চলে গেল। ঠিক তখনই পেছন থেকে সুহানার কণ্ঠস্বর ভেসে এল— "দোষ করে আবার তেজ দেখিয়ে চলে যাচ্ছিস?"

সুহানার কথায় ফিনার পা জোড়া মেঝেতে আটকে গেল। তুহিনা আর রুহানিও অবাক হয়ে সুহানার দিকে তাকাল। বাড়ির কেয়ারটেকাররা উঁকিঝুঁকি মারছে; এই বাড়িতে কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যেই এমন সব নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয়। সাবেরা আর রুবাইদাও চুলা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলেন, তারা মনেপ্রাণে চাইলেন আজ সব মান-অভিমান মিটে যাক।

ফিনা ধীরে ধীরে সুহানার দিকে ফিরল। খুব নিচু স্বরে বলল— "আই এম সরি..."

সুহানার কণ্ঠ এবার বড্ড করুণ শোনাল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— "আই মিস ইউ ইয়ার...!"

সুহানার কথা শুনে ফিনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দৌড়ে সুহানাকে জড়িয়ে ধরতে এল, কিন্তু সুহানা দুষ্টুমি করে ঠিক শেষ মুহূর্তে পাশে সরে গেল। ফিনা তাকে ধরতে না পেরে আবারও কেঁদে ফেলল। এবার সুহানা নিজেই এগিয়ে এসে ফিনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তুহিনা কান্নার মাঝেই হেসে ফেলল। সুহানা তুহিনার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। তুহিনা কাছে আসতেই ফিনা তাকে জায়গা করে দিল। তুহিনা কিছুটা ইতস্তত করে থেমে গেলে সুহানা তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। সুহানা হাসিমুখে বলল— "সব মিটমাট করে নে। আমি সব ভুলে গেছি, তোরাও ভুলে যা।"

সবাই একসাথে হতেই সুহানা আনন্দচিত্রে চিৎকার করে বলে উঠল— "উই আর ব্যাক গাইস! ঈদ মোবারক!"

__________________________________

গোসল সেরে সুহানা যখন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল, ওর অস্বস্তিটা তখন চরমে। তিন-তিনটে মেয়ের সামনে এমন প্রায় উন্মুক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে ওর ভীষণ লজ্জা লাগছিল। ওকে একটা গোলাপি রঙের পেটিকোট আর অফ শোল্ডার ব্লাউজ পরে আসতে বলা হয়েছিল; সেই অনুযায়ী ও পরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু এখানে উপস্থিত বাকি তিনজনের অপলক চাহনি ওকে আরও কুঁকড়ে দিচ্ছিল। সুহানা অবচেতনেই নিজের হাত দিয়ে বুকের দিকটা আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করছিল।

সুহানাকে দেখে তুহিনা মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল, "জাহির শেষ, ফিনা!"

ফিনা সুহানার দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। বিস্ময় নিয়ে বলল —"আমি ওকে আগেও দেখেছি। এবার তোমরা দেখো তবে তোমার সাথে সহমত যে—জাহির ভাইয়া সত্যিই আজ শেষ!"

সুহানার শরীরের জেল্লা দেখে রুহানি অবাক হয়ে কাছে এগিয়ে এল। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল — "বৌমাণি, তুমি কি বিশেষ কিছু খাও? তোমার ত্বক এত চকচকে কেন? পুরো গ্লাসের মতো তেলতেলে মসৃণ! কী মাখো তুমি?"

সুহানা কিছু বলার আগেই ফিনা হেসেই উত্তর দিল — "ও কিছু মাখে না রুহানী আপা, বরং ওসব খায়। সারাক্ষণ কাঁচা সবজি চিবোয়, প্রচুর ফল খায়। আর ওর একটা বোতল আছে, সারাদিন ওতে লেবু দিয়ে ডিটক্স ওয়াটার বানিয়ে খায় আরও কিসব জানি খায় আর ডায়েট চার্ট পাঠিয়ে দেবো”

রুহানি অবাক হয়ে বলল — "তাই নাকি?"

রুহানি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল — “আমি ফর্সা হয়েও তোমার স্কিনের জেল্লা দেখে জেলাস ফিল করছি বৌমনি”

ফিনা হাসল — "আমি নিজেও করছি এত বছর । কিন্তু ওর মতো তো মেইনটেইন করতে পারি না, যা পাই তাই আজেবাজে গিলে ফেলি।"

তুহিনাও এবার এগিয়ে এল। সুহানার ত্বকের ওপর নজর বুলিয়ে সে বলে উঠল — "ত্বক তো দেখলি, এবার ফিগারটা দেখ! ঝাক্কাস একদম।"

সুহানা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করল। কাতর স্বরে বলল — "দি, প্লিজ এমন করো না।"

তুহিনা হেসেই পালটা প্রশ্ন করল — "বল তো শালী, তুই ঠিক কী করিস যে এমন অদ্ভুত সুন্দর থাকিস?"

রুহানি এবার সুহানার দিকে খুব ভালো করে তাকাল। সরু কোমরের সঙ্গে প্রশস্ত হিপসের যে চমৎকার ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে, তা দেখে বোঝা গেলো সুহানা 'আওয়ারগ্লাস' ফিগারের এর অধিকারী। তার শরীরের প্রতিটি কার্ভ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আকর্ষণীয়, যা নিপুণ শারীরিক চর্চা ও সুঠাম গঠনেরই ইঙ্গিত দেয়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত এক লাবণ্যময় রূপ তাকে এক আকর্ষনীয় পুতুল করে তুলেছে।

রুহানি মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল — "নতুন ভাবি….. বড়দা তো জিতে গেছে”

তুহিনার বুকে হাত দিয়ে বলল —"আমি ছেলে হলে তোকেই বিয়ে করতাম। এমন রূপ তুই কীভাবে লুকিয়ে রাখিস?"

সুহানা ভুরু কুচকে উল্টো ঘুরে গেলো— "আমি এই শাড়ি পড়বই না!"

ফিনা দ্রুত বিছানা থেকে নেমে এসে তাকে মানাতে শুরু করল — "না না, আর কিচ্ছু বলব না আমরা। এই যে সরি, একদম সরি!"

তুহিনা প্রেগন্যান্ট হওয়ায় বেশি ঝুঁকতে পারছিল না, তাই ফিনা তাকে ধরে বসিয়ে দিল। তুহিনা নির্দেশ দিতে লাগল, রুহানি তার নির্দেশ অনুযায়ী বক্স থেকে শাড়িটা বের করল।

শাড়িটিতে হালকা গোলাপি থেকে গাঢ় ম্যাজেন্টা রঙের একটি গ্রেডিয়েন্ট এফেক্ট ফুটে উঠেছে। ওপরের দিকটা হালকা হলেও নিচের দিকে রঙটি ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে এসেছে। পুরো শাড়ি আর আঁচল জুড়ে রুপোলি পাথরের ছোট ছোট ফুলের মতো নিখুঁত কাজ। শাড়ির পাড় আর ব্লাউজের গলায় ভারী পাথরের কাজ থাকায় এটি দেখতে ভীষণ গর্জিয়াস লাগছে। এই শাড়িটির সঙ্গে যে আধুনিক অফ-শোল্ডার স্টাইলের ব্লাউজটি রয়েছে, সুহানা সেটিই এখন পরে আছে।

রুহানি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সুহানাকে শাড়িটি পরাতে শুরু করল, আর ফিনা তাকে সব কাজে সাহায্য করতে লাগল। সব শেষে সাবেরা বেগম সুহানার হাতে একজোড়া সোনার বালা এবং গলায় একটি লম্বা সীতাহার পাঠিয়ে ছিলেন সেটা ফিনা পরিয়ে দিল। সুহানা প্রথমে এই ভারী গয়না শাড়ি পরতে রাজি ছিল না, কিন্তু সাবেরা আর রুবাইদা মিলে অনেকটা সময় নিয়ে তার ‘ব্রেইনওয়াশ’ করেছেন। আজকের বিশেষ দিনে বাড়ির বড় বউ হিসেবে তার কী কী করণীয়, সেই সাথে বংশপরম্পরা, আভিজাত্য আর নিয়মের দোহাই দিয়ে অনেক বুঝিয়ে তারা সুহানাকে রাজি করিয়েছেন।

সাজ শেষ হওয়ার পর তারা সুহানার দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইল। সুহানা এমনিতেই খুব একটা সাজগোজ করে না; সাধারণত সে চশমা আর তেলতেলে মুখে খুব সাদামাটা পোশাক পরেই ঘুরে বেড়ায়। আজ প্রথমবার তাকে এই রূপে দেখে সবাই অবাক। তুহিনা আলতো করে সুহানার চোখের চশমাটা খুলে দিয়ে বলল — "রুমের ভেতর তো সব দেখতেই পাচ্ছিস, এখন আর এটা পরে থাকার দরকার নেই।"

সুহানা কিছু বলল না, তবে তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। এত গয়না আর ভারী সাজে নিজেকে কেমন যেন অচেনা লাগছে। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল — "আর কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে?"

তুহিনা হেসে উত্তর দিল — "তোর ঝগড়ুটে জামাই না আসা পর্যন্ত।"

সুহানা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। জাহিরের সামনে এই পোশাকে সে যাবে কী করে? কাঁধের দিকটা যে একেবারেই উন্মুক্ত! এর মধ্যেই তুহিনা চিরুনি নিয়ে এল। সে সুহানার চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে মাঝে সিঁথি কেটে একটা চমৎকার স্টাইল করে দিল।

তুহিনা জিজ্ঞেস করল — "আজ একটু লিপস্টিক পরবি?"

— "না না।"

— "তবে একটু আইলাইনার লাগিয়ে দিই? চোখ দুটো আরেকটু টানা টানা দেখাবে।"

— "না দি, প্লিজ আর কিছু করো না।"

রুহানি এবার আবদারের সুরে বলল — "আজকের দিনের জন্য শুধু এটুকু করো না, নইলে বড়মা কষ্ট পাবেন।"

রুহানির কথায় শেষ পর্যন্ত সুহানা রাজি হলো। তুহিনা খুব যত্ন করে টানা করে আইলাইনার পরিয়ে দিল। সুহানাকে এবার সত্যিই অপূর্ব লাগছে। সব শেষে তুহিনা শাড়ির বড় করে রাখা আঁচলটা সুহানার মাথায় টেনে দিল এবং ফিসফিস করে বলল — "আজ একদম মেরে দিবি ওকে! শালা বড় জ্বালায় আমাদের।"

সুহানা আয়নার দিকে তাকাল না, নড়াচড়াও করল না; একইভাবে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যদি খুলে যায় তখন কি হবে ? বাইরে তখন জাহিরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে কাউকে বকছে মনে হয়। সবাই মিলে দ্রুত সুহানাকে রুমের ভেতর একা রেখে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে পড়ল—জাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। ফিনা পর্দার আড়ালে, রুহানি দোলনার পেছনে আর তুহিনা ছোট একটা আলমারির পাশে গিয়ে লুকাল।

মসজিদে নামাজের সময় হঠাৎ বৃষ্টি নামায় জাহিররা সবাই ভিজে বাড়ি ফিরেছে। আফ্রিদি নিজের রুমে চলে গেল। নামাজের পর পরিচিত লোকজনের ভিড় সামলাতে বডিগার্ডদেরও বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে। জাহির সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে ওপরে উঠে এল। সে নিজের পাঞ্জাবির উপরের দুটো বোতাম খুলে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে রুমের দরজার কাছে পৌঁছাল। দরজা খোলা দেখে ভাবল সুহানা হয়তো ভেতরেই আছে। সে গটগট করে ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর টুপিটা রাখল। তারপর ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই তার নজর আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবীটির দিকে...

চলবে….

{“এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা এবং কাল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। এছাড়া, অনিচ্ছাকৃত কোনো বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি, আপনারা গল্পের মূল ভাবাবেগটুকুই গ্রহণ করবেন”}

সম্পূর্ণ উপন্যাসের লিংক 🖇️

https://www.facebook.com/share/p/1E8un1tWhL/

পেজ লিংক 🖇️ [Midnight Tales by Joy]

https://www.facebook.com/share/18DrFSvtcF/

আইডি লিংক 🖇️[MD Suhan Joy]

https://www.facebook.com/share/18Arx2QfVM/

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

#উপন্যাস

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন