ফন্ট সাইজ:
থিম:
জল ক্যানভাসে প্রজাপতি

৩য় পর্ব

লেখক: এলিজা আক্তার

#জল_ক্যানভাসে_প্রজাপতি |৩|

#লেখনীতে_মুসতারিন_মুসাররাত
-" আমাকে রেখে এভাবে হঠাৎ করে বিয়েটা সেরেই ফেললি, গুনগুন? বিশ্বাস কর, কাল রাতে বিয়ের হুলুস্থুলের মাঝে আমার যে কী পরিমাণ রাগ হয়েছিল তোর উপর। ভেবে দ্যাখ, পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেয়েও সেটা ছেড়ে দিলাম স্রেফ তোর সাথে এক ভার্সিটিতে পড়ব বলে। কত চিল্লাচিল্লি, বাবার পা ধরে কত কান্নাকাটি করে তোর সাথে এক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েই ছাড়লাম। আর সেই তুই কীনা শেষমেশ আমাকে ফেলে রেখেই এই কাণ্ডটা করে ফেললি? ভাবলেই আমার কান্না পায়।"
গুনগুন চাটনির প্যাকেটের কোণাটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে ছিঁড়তে চট করে প্রত্যুত্তর করল,
-" পেয়েছিলি তো দর্শনে চান্স। ফার্স্ট চয়েজ তো ছিলো অন্যটা। দর্শন তোর লাস্ট চয়েজও ছিলো না বলেই তো আমার পিছু নিলি। নইলে কী আর ভর্তি হতিস? শুধু সুযোগ বুঝে আমার ঘাড়ে দোষটা চাপিয়ে দিলি। আমি বুঝি কিছু বুঝি না, হু? ফিডার খাওয়া খুকি পেয়েছিস আমাকে?"
গুনগুন বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে। সন্ধ্যার পরপরই সে অঙ্কনের সাথে নিজেদের ফ্ল্যাটে এসেছে। আর পৌঁছানোর দশ মিনিটের মাথায় হাফসা তার বাবার সাথে হন্তদন্ত হয়ে হাজির। এসেই ঘরজুড়ে একপ্রস্থ অবোধ হট্টগোল, গলা ফাটিয়ে, 'মিস ইয়্যুউ দোস্ত' টাইপের চিৎকার-চেঁচামেচি। অতঃপর জগার্সের পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকা দামের প্রাণ চাটনির প্যাকেট বের করে দিয়ে-- "নে খা, আসার সময় নিচ থেকে এনেছি।" বলেই তার মন খারাপের খবর জানাতে থাকে। 
হাফসা চোখ কপালে তুলে অতি ব্যথিত মুখে বলল,
-" এমন করে বলতে পারলি তুই? বাবাকে রাজি করাতে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল আমার, ভুলে গেছিস সেসব? বিশ্বাস কর একসাথে থাকার জন্যই কিন্তু আমি বাবা- মাম্মার গালি হজম করেও একগুঁয়ে জিদ ধরেছিলাম প্রাইভেটে ভর্তি হওয়ার জন্যে। সেই তুই আমাকে ফেলে রেখে বিয়ে করে নিলি?"
-" তো?"
-" তো মানে?"
-" তো মানে, তোকে ফেলে বিয়ে করব না তো তোকে সাথে নিয়ে বিয়ে করব শুনি? তোকে সাথে নিয়ে একসাথে কবুল বলে সতীন বানাতাম?"
হাফসা নিজের দুইগালে চড় দিয়ে বলে উঠল ঝটিতি,
-" তওবা, তওবা। আসতাগফিরুল্লাহ। কীসব বলছিস? সতীন কেন বানাবি? আমার তো একটাই স্বপ্ন ছিল রে ভাই; দু’জনের একসাথে একই ভেন্যুতে জাঁকজমক করে বিয়ের আয়োজন হবে, একই স্টেজে দু’জোড়া বর-কনে পাশাপাশি বসবে। কাল প্রথমে ভেবেছিলাম কাল শুধু আকদ করে রাখবে। তুই এখানেই থাকবি, পরেপাছে অনুষ্ঠান করে নেবে। ওমা, তাদের দেখলাম আর তর সইল না। বিয়ে হতেই অমনি নিয়ে গেল বউ। আমার সে স্বপ্ন যে ভেঙে খানখান হয়ে গেল।"
গুনগুন চাটনির প্যাকেটটা একদম নিংড়ে চুষে নিয়ে বলল,
-" এই মহতী অভিযোগটা আমাকে না করে তোর প্রিয় ফুপির কাছে কর। সবটাই তার প্ল্যান। আমি ভাই মাত্রই ছিলাম নিরীহ গুটি, তোর ফুপি এক দানেই আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে শ্বশুড় বাড়ি।"
গুনগুন চাটনির খালি প্যাকেটটা মুখের সামনে ধরে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করল, ভেতরে এক ফোঁটা চাটনিও অবশিষ্ট নেই। অতঃপর সে হাত বাড়িয়ে বলল,
-" আরেকটা দে।"
হাফসা মুখখানা ছোট করে নিজের আধখাওয়া চাটনিটা বাড়িয়ে দিল। গুনগুন ভুরু কুঁচকে বলল,
-" কী কৃপণ রে তুই। ফকিন্নির মতো মোটে দুটো কিনেছিলি?"
-" স্যরি রে, যা এরপর যখন কিনব, একবারে পুরো এক কেস কিনে আনব।"
-" তোর সেই এরপর আসতে তো বহুকাল বাকি। আগামী দুই সপ্তাহ আমাকে দেখতেই পাবি না তুই।"
হাফসার মুখটা ছোট হয়ে আসে। ভার্সিটি বন্ধ, ক্লাস নেই আপাতত। তাই তার শাশুড়ি-শ্বশুড় বলেছে অঙ্কনের সাথে সে এই দুই সপ্তাহ থেকো আসুক চট্টগ্রাম। হাফসা মুখভার করে বলল,
-" এসে যখন শুনলাম তুই ভাইয়ার সাথে চট্টগ্রাম যাচ্ছিস, শুনে আরো মন খারাপ হয়েছিল জানিস গুনগুন। তবে.."
গুনগুন ডান ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় বোঝায়,
-" তবে কী?"
হাফসা হঠাৎ কুড়ি থেকে আশি বছরের মতোন বুড়ি মহিলার মতোন বুঝদার হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
-" পুরুষ আর মোবাইল চার্জার- নিজের হাতের মুঠোয় না থাকা পর্যন্ত কোনো ভরসা নেই। কখন কোথায় অন্যের কাজে লেগে যাবে, টেরও পাওয়া যাবে না। তাই বরকে চোখে চোখে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।"
গুনগুন চাটনির স্বাদে জিব চাটতে চাটতে যেন পরম এক শাশ্বত সত্যের সন্ধান পেল। মাথা নেড়ে সহমত পোষণ করে সে। হাফসা আচমকা গুনগুনের হাতটা টেনে ধরে বেশ কৌতুহলী গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
-" আচ্ছা গুনগুন, ভাইয়া বুঝি এই প্ল্যানটা করেছে? তোদের বুঝি হানিমুনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? চট্টগ্রামের নেভাল এরিয়া নাকি বেশ সুন্দর, একদম সমুদ্রের কোলঘেঁষে. ."
গুনগুন ঠোঁট উল্টে আক্ষেপের সুরে বলল,
-" হানিমুন আর ওই রসকষহীন কাঠখোট্টা টোস্ট বিস্কুট? নো ইয়ার।"
হাফসা হতভম্ব হয়ে তাকাল,
-" টোস্ট বিস্কুট মানে? কীসের বিস্কুট?"
-" তোর অতশত বুঝে কাজ নেই। চল তো দেখি, মাম্মা তার অতীব আদরের একমাত্র নেভি জামাইকে কী দিয়ে আপ্যায়ন করছে। জগতে নাকি জামাইদের কদরই আলাদা, দেখে আসি রূপটা।"
_______
সোফায় বসে অঙ্কন। পরনে ডার্ক ব্লু শার্ট অফ-হোয়াইট রঙের ফর্মাল প্যান্টের উপর পরিপাটি করে ইন করা। চওড়া কাঁধ, মেদহীন ঋজু শরীরের ভঙ্গি আর ধারালো মুখচ্ছবিতে অনায়াসেই ফুটে উঠেছে ডিফেন্স জীবনের কঠোর শৃঙ্খলা। 
তার ঠিক বিপরীতে বসে আছেন মৌসুমীর ভাই হারুন সাহেব। তিনি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বেশ উঁচু পদের কর্মকর্তা। চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে তিনি একটানা কথা বলে যাচ্ছেন। ব্যাংকারদের কথাবার্তায় পরিমাপ করা একটা হিসাব থাকে। তবে হারুন সাহেব ভিন্ন। নতুন জামাই পেয়ে হারুন সাহেবের কথার স্রোত থামছে না। শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অচলাবস্থা নিয়ে নিজের ঝানু অভিমত পেশ করে তিনি অঙ্কনের দিকে তাকালেন,
-" বুঝেছ অঙ্কন, আজকালকার যে অস্থির পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশ্যাল ক্যাওস, তাতে প্রপার স্ট্র্যাটেজি ছাড়া পুরো সিস্টেমটাই ধসে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টর বলি কিংবা ন্যাশনাল সিকিউরিটি সবখানেই এখন কোনো প্রসিডিউর কাজ করছে না। এতে করে কিন্তু একটা কান্ট্রির মূল ফাউন্ডেশনটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, তুমি কী বলো?"
হারুন সাহেবের এক প্রকাণ্ড রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের জবাবে অঙ্কন খুব শান্ত ও পরিষ্কার কণ্ঠে বলল,
-" পরিস্থিতির মোড় যেদিকেই ঘুরুক না কেন, স্ট্র্যাটেজিক লেভেলে প্রসিডিউর আর ডিসিপ্লিন যদি ঠিক থাকে, উইথিন নো টাইম যেকোনো ক্রাইসিস ওভারকাম করা সম্ভব। দিনশেষে শৃঙ্খলাই কিন্তু যেকোনো সিস্টেমের মূল শক্তিকেন্দ্র, আংকেল।"
হারুন সাহেব সায় জানিয়ে মাথা নাড়লেন,
-" একদম নিখুঁত বলেছ। শৃঙ্খলাই আসল। তা অঙ্কন, চিটাগাং নেভাল বেসে তো ডিউটি শিডিউল বেশ কঠিন, তাই না? ফ্যামিলিকে টাইম দেওয়াটাও একটা টাফ চ্যালেঞ্জ মনে হয়।"
অঙ্কন স্মিত হেসে উত্তর দিল,
-" ডিউটির প্রেশার তো থাকেই আংকেল। তবে আমার মনেহয় টাইম ম্যানেজমেন্টটা যদি প্রপার হয়, তখন কাজ আর পার্সোনাল লাইফের ব্যালেন্স রাখাটা খুব একটা কঠিন হয় না।"
-" বাঃ! দ্যাটস দা স্পিরিট অব আ ট্রু অফিসার।" হারুন সাহেব প্রফুল্ল মুখে প্রশংসা করলেন।
ড্রয়িংরুমের টি-টেবিলটি জুড়ে সাজানো হরেক পদের আয়োজন। আসার সময় অঙ্কন সাথে করে নিয়ে এসেছে মোড়ানো নামীদামী ব্র্যান্ডের কিছু ইম্পোর্টেড ফ্রুটস আর রাজকীয় কয়েক পদের মিষ্টি। 
মৌসুমী নিজে নাশতা সাজিয়ে দিয়েছেন। সুদৃশ্য চিনমাটির পাত্রে সুবিন্যস্তভাবে রাখা রয়েছে ড্রাই ফ্রুটস, পাতলা কাটা আপেল, আঙুর আর একপাশে ঐতিহ্যবাহী কিছু শুকনো নাশতা। 
রান্নাঘরের তদারকি শেষ করে মৌসুমী এক ফাঁকে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালেন। মুখে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে প্রমিত শান্ত গলায় বললেন,
-" তুমি তো কিছুই মুখে তুলছ না অঙ্কন। খাও, খাওয়ার মাঝেই কথা বলো। ডিনার হতে তো কিছুটা বিলম্ব আছে।"
হারুন সাহেব একটা মিষ্টি মুখে পুরে হেসে উঠলেন,
-" এই দ্যাখো দ্যাখো কান্ড, জামাইকে খাবার দিয়ে আমিই গপাগপ খেয়ে যাচ্ছি। জামাই বাবা, সংকোচ কোরো না। প্লিজ, স্টার্ট।"
অঙ্কন ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত সৌজন্যমূলক মৃদু হাসি ফুটিয়ে পিরিচ থেকে একটা আপেলের টুকরো তুলে নিয়ে অমায়িক কণ্ঠে বলল,
-" না না আংকেল, সংকোচ নয়। আই অ্যাম এঞ্জোয়িং এভরিথিং। আন্টির চয়েস আর এই আর্টফুল প্রেজেন্টেশনের পর না খেয়ে থাকাটাই তো কঠিন।"
মৌসুমী একটু হেসে বললেন,
-" খাবারের কদর করা দেখে খুব ভালো লাগল অঙ্কন। তবে শুধুই ইম্পোর্টেড ফ্রুটস নয়, দেশি মিষ্টিগুলোও চেখে দেখতে পারো। টেস্ট বেশ রিফাইন্ড।"
যদিও অঙ্কন ডায়েট মেইনটেইন করে চলে। তবুও ভদ্রতা দেখিয়ে প্রত্যুত্তরে বলল,
 
-" শিওর, ডেফিনেটলি ট্রাই করব।"
-" আচ্ছা বাবা, তোমার পছন্দ অপছন্দ তো এখনো কিছুই জানি না। ডিনারে আজ. ."
কব্জির সিলভার রঙের ঘড়িটার দিকে দৃষ্টিপাত করে অঙ্কন কথার মাঝেই নম্র স্বরে বলে উঠল,
-" আন্টি, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ট্রাবল ইউরসেলফ। প্লিজ, এত ব্যস্ত হবেন না। আসলে উই হ্যাভ টু লিভ উইথিন অ্যান আওয়ার। বুঝতেই পারছেন কালকে জার্নি আছে। একটা নির্দিষ্ট টাইমিং মেনে আমাদের বেরোতে হবে। সো, প্লিজ।"
-" সেটা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয় অঙ্কন। বিয়ের পর প্রথম এলে, আর ডিনার না করে চলে যাবে- দ্যাটস কোয়াইট অ্যানআনসেপ্টেবল। তাছাড়া তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা বলাও আবশ্যক ছিল।"
শাশুড়ির এভাবে বলায় অগত্যা ডিনার করে যেতে রাজি হয় অঙ্কন। মৌসুমী হঠাৎ বললেন,
-" শোনো বাবা, গুনগুন কিন্তু চপল আর ভীষণ ছেলেমানুষ। উইথ ডিউ রেসপেক্ট টু হার প্রাইভেসি, ওর ইমম্যাচিউর আবদারগুলো তুমি সবসময় প্রশ্রয় দেবে না। আর ওকে কখনো একা ছাড়বে না। জীবনের কঠিন ডিসিপ্লিনগুলো ও এখনো শেখেনি। ও যদি কোনো ভুল করে, হেজিটেট না করে অবশ্যই ওকে শাসন করবে। আই হোপ, ইউ উইল গাইড হার প্রপারলি।”
অঙ্কন মৌসুমীর মুখের অমোঘ কঠোরতা আর মায়ের মমতাটুকু অনুধাবন করল। সে অমায়িক ভঙ্গিতে স্মিত হেসে উত্তর দিল,
-" ডোন্ট ওরি অ্যাট অল। শাসন কিংবা কঠোরতা নয়, আই বিলিভ আ লিটল বিট অব পেশেন্স এন্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং দিয়েই ওকে সামলে নেওয়া সম্ভব। আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট টু টেক কেয়ার অব হার।"
মৌসুমী সন্তুষ্ট হয়ে মৃদু হাসলেন,
-" তোমার এই ম্যাচিউরিটিটুকুই আমার ভরসা বাবা।"
ওদিকে আড়ালে পর্দা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গুনগুন। এদিকেই আসছিলো সে। মায়ের মুখে নিজের নামে এমন অনর্গল অভিযোগ আর শাসন করার ফরমান জারি হতে শুনে সে দাঁত চেপে ফোঁস করে উঠল--- ‘বিদায় করে দিয়েও মাম্মার শান্তি নেই। কাঠখোট্টা টোস্ট বিস্কুটের হাতে নাকি আমায় শাসন করার ট্রেইনিং লাইসেন্স তুলে দেওয়া হচ্ছে। দাঁড়াও, চট্টগ্রাম গিয়ে যদি এই টোস্ট বিস্কুটকে চা-য়ে চুবিয়ে না খেয়েছি, তবে আমার নামও আয়ানাত কবির গুনগুন নয়।’
 _____________
রুপালির কাঁধে রান্নার সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মৌসুমী নিজের ঘরে এসে বসলেন। রডের মতো সোজা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ভেতরটা যে কতখানি ক্ষয় হয়ে গেছে, তা কেবল তিনিই জানেন। মাথা জুড়ে একটা তীব্র, ঝিঁঝিঁ ধরা যন্ত্রণা ক্রমশ বাড়ছে। ড্রয়ার থেকে পেইন কিলারের পাতাটা বের করে একটা বড়ি গিলে ফেললেন। গিলে ফেলার পরও যন্ত্রণার উপশম হলো না একবিন্দুও।
এই মাথাব্যথাটা হুট করে আসা কোনো অতিথি নয়, বেশ কিছুদিন ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে শিকড় গাড়ছে তাঁর মগজে। মৌসুমীর মাঝে মাঝেই মনে হয় ডাক্তারের কাছে গিয়ে গোটা আষ্টেক ল্যাবরেটরি টেস্ট করালেই থোকা থোকা অসুখ ধরা পড়বে। তার চেয়ে এই বেশ ভালো। অসুখটাকে না চিনে, না জেনেই যে কটা দিন নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস ফেলা যায়। প্রেসক্রিপশনের মারপ্যাঁচ আর হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোরে ছোটাছুটি করে আয়ু কমানোর কোনো দরকার নেই। আধুনিক উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়েও আজকাল তাঁর মাথায় এমন প্রাচীন অদ্ভূত ধারণার জন্ম হচ্ছে। আর কেমন যেন একটা কুটিল বিশ্বাস বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে। সত্যি সত্যিই খুব বড় কোনো ব্যাধি তাঁর শরীরে ডালপালা মেলেছে। এই তো কিছুদিন আগে পরপর তিনি তাঁর মৃত মাকে স্বপ্নে দেখছেন। মায়ের পরনে ধবধবে সাদা থান, এসে শিয়রে দাঁড়ান। তারপর খুব ক্লিষ্ট গলায় বলেন,
-" মৌসুমীরে, তুই বড্ড একা রে মা! তুই খুব কষ্টে আছিস। পৃথিবীর আর কেউ না জানলেও তোর মা তো জানে। চলে আয় আমার কাছে।"
আবার সেদিন রাতের শেষ প্রহরে আরেকটা অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠল। স্বপ্ন কি হ্যালুসিনেশন তা আলাদা করার ক্ষমতা মৌসুমীর ছিল না। সেই অতি চেনা মানুষটা, যে বহু বছর আগে ছায়াসঙ্গী হয়ে বিচ্ছেদ এঁকে দিয়েছিল, সে এসে দাঁড়ালো স্বপ্নে। বেশ করুণ ও ভারমুক্ত গলায় বলল,
-" খাঁচার পাখি উড়ে গেলেও তো তার কয়েকটা পালক ফেলে রেখে যায় মৌ! আর তুমি? তুমি তো আমার সমস্ত সম্পদ একাই বুকে চেপে নিয়ে চলে গেলে।"
নেহাৎই অসংলগ্ন স্বপ্ন। মানুষ তো কত হাবিজাবি স্বপ্ন দেখে। কত শত বছর আগে চলে যাওয়া মা-বাবা কিংবা আত্মীয়রা স্বপ্নে এসে এমন কত কথাই না বলে। তবুও মৌসুমীর বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। ভয়টা নিজের জন্য একেবারেই নয়। চিন্তা কেবল ওই যে পুতুলের মতো মেয়েটার জন্য। সেই অজানা ভয়ের তাড়নাতেই তো হুট করেই গুছিয়ে ফেললেন বিয়েটা। 
-" মাম্মা? আর ইউ ওকে?"
গুনগুনের কণ্ঠে একরাশ উদ্বেগ। চোখ দুটো আয়নার মতো স্বচ্ছ, যেখানে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মৌসুমী উঠে বসলেন। মাথার ভেতরের হাতুড়ি পেটার শব্দটা একটু কমেছে যেন। তিনি নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকা দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
-" ইয়াহ্, সোনা। আই অ্যাম টোটালি ওকে।"
গুনগুন পা টিপে টিপে এসে বিছানার কোণটায় বসল। মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। মৌসুমী পরম স্নেহে শুধালেন,
-" মন খারাপ?"
-" উঁহু।"
-" মাম্মার উপর ভীষণ রাগ হয়েছে, তাই না?"
-" নো।" বলেই ফের বলল,
-" প্লীজ মাম্মা এখন আবার জিজ্ঞেস করো না মিথ্যে বলছি কী না।"
মৌসুমীর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম মেপে নেওয়া একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। গুনগুন ঠোঁট উল্টে আবদারের সুরে বলে উঠল,
-" তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি মাম্মা?"
মৌসুমী কোনো কথা না বলে নিজের দুই বাহু প্রসারিত করে দিলেন। গুনগুন অমনি মায়ের উষ্ণ বুকের ভেতর মুখ গুঁজে দিল।
মেয়েটার মন আজ সত্যি ভারাক্রান্ত। কালকে সে এক অচেনা শহরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে। দু-দুটি সপ্তাহ একা একা কীভাবে থাকবে আল্লাহ মালুম। যদিও খুব সহজে গুনগুন সবার সাথে মিশে যায়। তবুও স্বামী নামক ওই গম্ভীর পুরুষটির সামনে এসেই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য দোষটা দেওয়াও যায় না। চব্বিশ ঘণ্টার হিসেব কষলে দুজনে সামনাসামনি হয়েছে মোটে হাতে গোনা কয়েকবার। আর রাতটুকু তো ঘুমেই সাবাড়।
মৌসুমী মেয়ের রেশমি চুলে আঙুল চালিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগলেন। 
-" তোমার জীবনে একটা পরিপূর্ণ, সুন্দর পরিবারের বড্ড অভাব ছিল গুনগুন। মাম্মা সেই অভাবটুকু পূরণ করতেই এত তাড়াহুড়ো করল। যদিও সময়ের পরিমাপে মাত্র একটা দিন কিছুই নয়, আর মাত্র একদিনে মানুষকে চেনা তো দূরের কথা, তার ছায়াকেও পুরোপুরি বোঝা যায় না। মানুষকে চেনা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম কাজ। তবুও আমার ভেতর থেকে একটা জোরালো কণ্ঠ বলছে; তুমি খুব সুন্দর একটা পরিবার পেয়েছ। তোমার জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা ওরা ভুলিয়ে দেবে।"
একটু থামলেন মৌসুমী। দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে ফের বললেন,
-" মনে রাখবে, পরিবারের কারোর সাথে কখনো অহেতুক বেয়াদবি করবে না। তবে ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ আর ‘স্যাক্রিফাইস’ এই দুটো মুখস্থ ভারী শব্দ মাম্মা তোমাকে গিলতে বলবে না। নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেওয়ার নাম সংসার নয়। তাই নিজের ভালো থাকার দায়ভারটা সবার আগে নিজেকেই নিতে হবে।"
কথাগুলো শেষ করে মৌসুমী মাথাটা ঝুঁকিয়ে মেয়ের চুলের ভাঁজে চুমু খেলেন। অতঃপর যোগ করলেন,
-" শোনো গুনগুন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত হলো বিশ্বাস আর ভরসা। বিশ্বাসের সেই খুঁটি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তবে সামান্য আলগা বাতাসেই পুরো ঘর ভেঙে তাসের ঘরের মতো লুটিয়ে পড়ে। তাই অঙ্কনের ওপর সবসময় প্রগাঢ় বিশ্বাস রাখবে। তবে শোনো, অন্ধ ভরসা আবার বোকামি। আর কখনো কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা দ্বিধা মনকে আঁকড়ে ধরলে, তা নিয়ে কোনোদিন কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে যেও না। সরাসরি বরের মুখোমুখি হয়ে কথা বলবে। মনে রাখবে, পৃথিবীর মানুষ সান্ত্বনা দেওয়ার চেয়ে অন্যের দুর্বলতায় সুযোগ খুঁজতে বেশি পছন্দ করে। আশা করি, আমার কথাগুলো মাথায় থাকবে?"
মায়ের গায়ের চিরচেনা সুবাস আর নিবিড় উষ্ণতায় গুনগুনের চোখের পাতা দুটো যেন ভারী হয়ে আসছিল। সে একটা দীর্ঘ হামি তুলে ঢুলুঢুলু চোখে চেয়ে বলল,
-" ওকে মাম্মাম। কিন্তু এবার দয়া করে ওই কলেজের লেকচারার মার্কা ভাবটা ছেড়ে একটু খাঁটি মাম্মা হওয়া যায় না? আমি তো আর কিছুক্ষণ পরেই চলে যাচ্ছি। একটু বেশি বেশি আদর করো তো দেখি।"
মৌসুমী মেয়ের পানে তাকিয়ে মনে মনে হাসলেন। 
__________
-" মা, এত তাড়াহুড়োর কী ছিল বলো তো? মাত্রই তো বিয়েটা হলো। এখনই ভাইয়ের সাথে বাচ্চা মেয়েটাকে না পাঠালেই নয়?"
-" এখানে তাড়াহুড়োর কিছু নেই, অর্পা। বিয়ে হয়েছে, সে তার বরের সাথে থাকবে। আর গুনগুন এতটাও বাচ্চা নয়। হ্যাঁ, মানছি সে অনেক আদরে বড় হয়েছে, সংসারের হিসেব-নিকেশ হয়তো এখনো বোঝে না। তবে সময় সব শিখিয়ে দেয়। মানুষ তো আর এক জায়গায় থমকে থাকে না।"
বলেই চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিলেন অধরা। মায়ের নির্দ্বিধ উত্তর শুনে অর্পা ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
-" আমি সেটা বলছি না, মা। বলছিলাম, ভাই তো ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, মেয়েটা অচেনা এক শহরের বন্ধ ফ্ল্যাটে সারাদিন কীভাবে কাটাবে? বোর লাগবে না ওর?"
-" অঙ্কন সারাক্ষণ ডিউটিতে থাকবে না, যতটুকু সম্ভব সময় দেওয়ার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে। তা ছাড়া সামনেই তো ওর ছয় মাসের মিশন আছে। তার আগেই ওদের নিজেদের ভেতরে একটু সহজ ভাব আসা দরকার। একছাদের নিচে না থাকলে কি আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়?"
-" তবুও মা. ."
অধরা হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে মেয়েকে থামিয়ে দিলেন।
-" এই তবুও-র পেছনে একটা খাঁটি কারণ আছে, অর্পা। তোর কি সেই বিহারী মেয়েটার কথা মনে আছে? যার ছবি দেখিয়ে তোর ভাই একদিন হুট করে জিজ্ঞেস করেছিল 'মেয়েটা কেমন, মা?''
অর্পা একটু থমকে গেল।
-" মানে?"
-" মানে বড় সহজ। আমি তখন এক কথায় বলে দিয়েছিলাম 'বিহারী মেয়েকে এই ঘরের বউ হিসেবে আমি মানব না, তুই বরং অন্য মেয়ে দেখ।' ব্যস, ওখানেই ইতি।"
-" কী আশ্চর্য! ভাই কি তোমায় নিজ মুখে বলেছিল যে সে মেয়েটাকে পছন্দ করে?"
-" তুই বড্ড বোকা, অর্পা। বিয়ের বয়সে পড়া একটা ছেলে যখন গম্ভীর মুখে মাকে কোনো মেয়ের ছবি এনে দেখায়, তখন কি আর ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে দিতে হয় যে পছন্দটা কার? ওটুকু না বুঝলে মা হলাম কী করে?"
-" ধুর মা! তুমি সবসময় বেশি বেশি ভাবো।"
-" তোদের আমি জন্ম দিয়েছি রে। তোরা হাঁ করলেই পেটের খবর বুঝি, বানিয়ে কিছু বলতে হয় না।"
অধরা চায়ের শেষ চুমুকটা শেষ করে সুরটা খানিক নিচু করে ফের বললেন,
-" তোর বাবার এক চেনা মানুষ নাকি কিছুদিন আগেই কথায় কথায় বলেছিল; অঙ্কনকে এক বিহারী মেয়ের সাথে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। নামটা যেন কী বলছিল.. সাবা? ব্যস, সেজন্য তোর বাবা এই বিয়ের কথা বলতেই আমি আর না করিনি।"
অর্পা খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল,
-" আচ্ছা দাঁড়াও, সময় সুযোগ বুঝে ভাইকে সরাসরি জিজ্ঞেস করব।"
-" একদম না। পুরোনো কাশফুলের বনে ফালতু হাওয়া দিয়ে জল ঘোলা করার দরকার নেই। ছেলে বিয়ে করেছে, এখন শান্তিতে সংসার করলেই মঙ্গল। এক একটা বয়সে মানুষের মন এমন একটু-আধটু দোলে। ওসব সাময়িক ছায়া বৈ কিছু নয়। আমার ছেলের ওপর আমার অগাধ ভরসা আছে।"
_________
রাতের মুষলধারার পর আকাশটা সকালে একদম ধুয়ে-মুছে সাফ। বারান্দার টবে জমে থাকা এক ফোঁটা জল মিষ্টি এক চিলতে রোদে হীরের মতো জ্বলজ্বল করছে। ঝিলিমিলি রোদ এসে থমকে গেছে গাছের ভেজা পাতায়। বাতাসটাতেও কেমন যেন হিম হিম স্নিগ্ধ ভাব।
ব্যালকনির রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অঙ্কন। দূর দিগন্তের হালকা নীলচে ধোঁয়ায় চোখ রেখে সে হয়তো নিখিল বিশ্বের কোনো সূক্ষ্ম হিসেব মিলাচ্ছিল। তখনই পায়ের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই চোখ দুটো থমকে গেল।
ঢিলেঢালা হালকা সবুজ টি-শার্ট আর প্লাজোয় মেয়েটাকে যেন কোনো সবুজ পাতার ভেজা কুঁড়ি মনে হচ্ছে। সদ্য ধোয়া মুখে এখনো জলবিন্দুরা আলতো করে জমে আছে। ঠিক যেমনটা রোদের আলোয় টবের পাতায় আটকে ছিল। চুলে আলগা পনিটেল, চোখের দৃষ্টিতে ঘুমভাঙা এক নিটল চঞ্চলতা।
-" আপনার চা।"
হাতে গ্রিন-টির ধোঁয়া ওঠা কাপটা ধরিয়ে দিতেই অঙ্কন ছোট করে বলল,
-" থ্যাংকস।"
-" ওয়েলকাম!"
গুনগুন অমলিন হেসে পাশাপাশি দাঁড়াল। তার নিজের হাতে কফির একটা সুদৃশ্য মগ। মগের উষ্ণতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে তৃপ্তির এক নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-" অর্পা আপু মানুষটা বড্ড ভালো। জানেন? একদম সকাল সকাল খবর নিয়ে আমার প্রাণের কফিটা বানিয়ে পাঠিয়েছে।"
-" আপু আসলেই একটু বেশিই ভালো।"
গুনগুন মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মতো সায় দিল। তারপর মগে আরও একটা ছোট চুমুক দিয়ে হঠাৎ অতি গম্ভীর গলায় বলল,
-" জানেন, আপনাদের বাড়ির দুজন মানুষ কিন্তু আমার অতি অপ্রিয়র তালিকায় উঠে গেছে। খবরদার, এখন আবার প্রশ্ন করবেন না যে তাঁরা কারা।"
অঙ্কন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি চেপে ঘাড় ফেরাল।
-" সেই দুজনের মধ্যে একজন নিশ্চয়ই আমি?"
গুনগুন চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল।
-" বলেই তো নিয়েছিলাম, জিজ্ঞেস করা বারণ।"
-" আমি তো জিজ্ঞেস করিনি, স্রেফ নিজের প্রেডিকশনটা যাচাই করে নিলাম।"
কফির স্বাদে ডুব দিয়ে গুনগুন আবার খানিকটা নীরব হয়ে গেল। কিন্তু সেই নীরবতা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সে মাথা উঁচু করে অঙ্কনের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে শুধাল,
-" আচ্ছা... তুমি কী কিছু ভাবছিলে?"
অঙ্কন সামান্য ভ্রূ জোড়া কুঁচকে তাকাল। গুনগুন চট করে নিজের দু-গালে হাত দিয়ে অপরাধীর মত মুখ করে বলল তড়িঘড়ি,
-" ইশ, স্যরি! পারমিশন ছাড়াই একদম হুট করে 'তুমি' বলে ফেললাম। আসলে 'আপনি-আপনি' শুনলে কেমন যেন পরপর লাগে, ঠিক যেন রাস্তার ওপারের অচেনা কোনো পথিক।"
-" ইটস্ ওকে, নো প্রবলেম। 'তুমি' বলেই ডাকতে পারো। ওপারের পথিক হওয়ার শখ নেই।"
গুনগুনের চোখ দুটো অমনি খুশিতে নেচে উঠল।
-" আসলে কি জানো? দেখছিলাম তুমি ওই দূর আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছ। আমার না যখন মনটা খুব ভারী হয়ে যায়, কিংবা মাথার ভেতর অনেক অনেক না-বলা কথা জট পাকায়, আমি তখন খোলা আকাশের বুকে কথাগুলো সোপর্দ করে দিই। তবে আকাশ তো আর পাল্টা জবাব দেয় না। আমি কিন্তু খুব ভালো একজন শ্রোতা। তোমার মনের মেঘগুলো চাইলে কিন্তু আমার কাছে জমা রাখতে পারো। আমি কিছু মনে করব না।"
অঙ্কন স্মিত হেসে ধীরচক্ষে গুনগুনের মুখপানে তাকাল। মেয়েটির নিষ্পাপ, চঞ্চলা ভাব আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একচিলতে অনাবিল হাসিটুকু যেন এইমাত্র ধুয়ে যাওয়া ভোরের কুয়াশার মতোই বড্ড স্নিগ্ধ। কিছুক্ষণের জন্য অঙ্কনের তীক্ষ্ণ, গম্ভীর দৃষ্টি সেখানে থমকে রইল।
ঠিক তখনই তার নজরে এলো কফির হালকা ফেনা মেখে আছে গুনগুনের বাঁ পাশের গোলাপি ঠোঁটের এক কোণে। 
অঙ্কন নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। সুগঠিত, দীর্ঘ বুড়ো আঙুলটি আলতো করে ছোঁয়াল গুনগুনের অধরের কোণে।
অঙ্কনের উষ্ণ হাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে গুনগুনের পেলব শরীর যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো ছটকা দিয়ে কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে এক অচেনা তালে নাচতে শুরু করল নিমিষেই। সে পলকহীন চোখে স্তব্ধ হয়ে রইল নির্নিমেষ।
অঙ্কন কোনো তাড়াহুড়ো না করে, আলগোছে বুড়ো আঙুল দিয়ে সেই কফির চিহ্নটুকু মুছে দিল। তারপর দৃষ্টিটা না সরিয়ে তরল গলায় বলল,
-" গুনগুন, তুমি শ্রোতা হিসেবে কেমন তা এখনো জানা হয়নি। তবে এই স্বল্প ক'টা ঘণ্টায় এটুকু বুঝে গেছি- মেয়ে হিসেবে কিন্তু বড্ড বেশিই ভালো, মিসেস অঙ্কন।"
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন