#সাইকো_টাইম ( পর্ব-১২)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ
-----------------------
অবয়বটা রুমে প্রবেশ করে দাঁড়ায়। সুফিয়ান কাঁথা মোড় দিয়ে জান্নাতকে সহ ঢেকে নেয়। অবয়বটা হটাৎ বলে উঠলো," সুফিয়ান,আমি রিয়াজ। ভয় পাবার কিছু নেই। আমি সাইকো কে ধরতে চাই। তোর সাহায্য লাগবে আমার"।
সুফিয়ান এমতাবস্থায় কি করবে কিছুই বুঝেনা। রিয়াজও জানেনা সুফিয়ান কেনো কথা বলছেনা। কারণ,অন্ধকারে সুফিয়ান কোন অবস্থানে আছ,তা তো রিয়াজ দেখেনি। কিছুক্ষণ নিরবতা শেষ করে সুফিয়ান রিয়াজকে বলল," তুই ড্রইংরুমে গিয়ে বস,আমি আসতেছি"। রিয়াজ এইবার বুঝে সুফিয়ান এইটা কেনো বলেছে। আর যখনই রিয়াজ ড্রইংরুমে যাবার জন্য এক পা এগিয়ে দেয়,তখনি কারেন্ট চলে আসে।
বুঝতেই পারছেন।
রিয়াজ ড্রইংরুমে এসে বসে। এই মুহুর্তে মায়াকে বড্ড মিস করছে। দুনিয়াতে এখন আছে শুধু তার ভাই,বোন আর মা। স্ত্রী চলে গেছে,নিজের সন্তান হারিয়েছে। রিয়াজের মনের অবস্থা কেমন বুঝতেই পারছেন। এসব ভাবনার মাঝে সুফিয়ান লুঙ্গি পড়ে ড্রইংরুমে আসে। এরপর রিয়াজের সামনের সোফায় বসে জিজ্ঞেস করে," আমি তোর বন্ধু ঠিক আছে। কিন্তু অন্যদিকে আমি আইনের লোক। আমার উচিৎ হবে এই মুহুর্তে তোকে বন্দি করা"। রিয়াজ মাথা নিচু করে রেখেছিলো। এরপর মাথা উঁচু করে সুফিয়ানের উদ্দেশ্যে করে বলে,
- আমি সাইকোকে ধরার একটা প্ল্যান বানিয়েছি।
- আর বানাইস না প্ল্যান। অলরেডি তুই দুনিয়ার কাছে অপরাধী। এইবার হয়তো আমাকেও অপরাধী বানিয়ে ছাড়বি। শুনাইস না তোর প্ল্যান।
- আমি বোরকা পড়ে বের হবো।
- মানে..?
- হ্যাঁ, বোরকা পড়ে রাস্তায় বের হবো রাতে। যাতে সাইকোটা আমাকে ধরে নেয়। আর এতে তোর সাহায্য লাগবে আমার।
- এমন নয়তো? তুই বোরকা পড়ে ইচ্ছাকৃত কিডন্যাপ হবি। পরে আমাকে সাইকো বানিয়ে আমার চাকরিও খাবি,আর ফাঁসিতেও ঝুলাবি ।
-তুই আমার বন্ধুর কাতারেই পড়স না। আমি তোর বন্ধু। আমি বিপদে আছি তুই জানিস। আমাকে সাহায্য করার জায়গায় তুই আমাকেই সন্দেহ করে আছিস?
- আমি পুলিশ। আমার কাজ'ই সন্দেহ করা। আর তুই অলরেডি মাডার কেসের আসামি। তাও ডিপার্টমেন্টের মানুষকে খুন করেছিস। আমি তোর সংঘ দেই কিভাবে বুঝা আমাকে।
- ঠিক আছে। আমি একাই ধরবো সাইকো কে। তোর সাহায্য লাগবেনা আমার।
এ বলেই রিয়াজ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর দরজা দিয়ে বের হতেই যাবে,তখন পিছন থেকে সুফিয়ান বলে," এতক্ষণ আমি তোর বন্ধু হিসেবে কথা বলেছি। এইবার আমি আইনের লোক হিসেবে বলছি। আত্মসমর্পণ কর"। রিয়াজ তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে যায়। পিছনে তাকিয়ে দেখে,সুফিয়ান পিস্তল টার্গেট করে রেখেছে রিয়াজের দিকে। রিয়াজ কিছু বুঝার আগেই,বাহিরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনতে পায়। রিয়াজ বুঝে যায়,সুফিয়ান থানায় কল দিয়ে পুলিশ ফোর্স এনেছে।অর্থাৎ সুফিয়ান রিয়াজকে গ্রেপ্তার করার সব প্ল্যান করে নিয়েছে। রিয়াজ সুফিয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে," আমি আমার সন্তানকে হারিয়ে শক্ত হয়ে গেছি। আমাকে নরম করার শক্তি কারো নেই"। কথাটা বলতে দেরি,রিয়াজ দরজা খুলেই দৌড় দেয়। এদিকে সুফিয়ান টার্গেট মিস করেনি। বের হবার সময় রিয়াজের পিঠে গুলি চালিয়ে দেয়। কিন্তু বুলেট পিঠে নিয়েই রিয়াজ বের হয়ে যায়। সুফিয়ান দৌড়ে বেরিয়ে আসে। দেখে বাড়ির সামনে পুলিশ ফোর্স এসে ভরে গেছে। কিন্তু রিয়াজ নেই। সুফিয়ান বেক্কল হয়ে যায়। মাত্রই তো দরজা খুলে বের হলো। হুট করে গায়েব হয়ে গেছে কোথায়। রিয়াজকে ধরতে না পেরে সুফিয়ানের ব্যার্থতাকে ঘিরে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে।
এদিকে ফাহিম ফ্লোরে বসে কান্না করছে। রিয়াজের বোন আর মা'ও কান্না করে যাচ্ছে। ফাহিম কান্নার স্বরে বলে," আপন না হলেও আমি আমার ভাইকে খুব ভালোবাসি মা। জানিনা ভাইয়া এখন কোথায় কিভাবে পড়ে আছে। ভাইয়ার এই অবস্থাকে আমি মেনে নিতে পারছিনা মা। আমি আমার বোনকে খুন করে ফাঁসিতে ঝুলতে রাজি। আমাকে সাইকো বানিয়ে ভাইয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করতে রাজি। কিন্তু ভাইয়ার কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছেনা মা। ভাবি আর রিমার মৃত্যুর নিউজ ভাইয়া পেয়েছে নিশ্চয়ই। ভাইয়ার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে মা। আমার ভাইয়াকে আমি নির্দোষ প্রমাণ করতে চাই মা। নির্দোষ প্রমাণ করতে চাই"। কথাগুলো শুনে রিয়াজের মা আর বোন ফুফিয়ে কান্না শুরু করে।
ব্রিজের নিচে রিয়াজ সেই ভাঙ্গা কাচের বোতলটা পিঠে ঘষে যাচ্ছে। অর্থাৎ বুলেট বের করার ট্রাই করতেছে। চারদিকে অন্ধকার, তার উপর আন্দাজে পিঠে ঘষায়, ভাঙ্গা কাচ যেনো আরো আঘাত দিচ্ছে রিয়াজকে।রিয়াজ কুকাতে কুকাতে অবশেষে বোতলের মাথা দিয়ে মাংস কেটে বুলেট বের করে। এরপর বোতলটা ফেলে দিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে থাকে।আবার প্রচন্ড ক্ষুদা লেগে যায় রিয়াজের। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে ময়লার ড্রেনে নতুন আবর্জনা ফেলে গেছে। যেহেতু গতকাল রাত থেকে এখানে,তাই নতুন ময়লার স্তুপ চিহ্নিত করে নেয় সে। রিয়াজ বসা থেকে উঠে সেখানে যায়। আর অনেক খুজে কিছু নষ্ট বিরিয়ানির প্যাকেট সংগ্রহ করে। সম্ভবত কোথাও পিকনিক হয়েছিলো।সেই নষ্ট খাবারের প্যাকেট। ক্ষুদার জ্বলায় রিয়াজ কয়েকটি প্যাকেটের বিরিয়ানি একত্রিত করে খেতে শুরু করে।
আর নদীর দূষিত ময়লা পানি তো আছেই। খাওয়া শেষ করে রিয়াজ ক্লান্ত শরীর নিয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে যায়।
এ যেনো ভয়ংকর একটি সময়ের প্রমিষ্ট। কোথাও কেও নেই। জনশূন্য এক দুনিয়ার মতো। যেখানে মানবের অস্তিত্ব থাকা শর্তেও প্রকৃতি মানুষত্বের চিহ্ন সরিয়ে নিচ্ছে। শহরটা একটা ভয়ানক জন্তুর কবলে আটকে আছে। ধমকা বাতাসের তীব্র ঘ্রাণে মিশ্রিত রয়েছে মৃত্যুর সুভাষ।
সূর্যের আলোর প্রভাবে রিয়াজের ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম থেকে উঠে রিয়াজ বসে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, শহরটা জাগ্রত হয়ে গেছে। চারদিকে মানুষের চলাফেরা শুরু। কিন্তু ওদের নজরে পড়া যাবেনা। নয়তো এই সাধারণ মানুষ ধারণ করবে সাইকোর মতো রুপ। নিমিষেই রিয়াজকে জ্যান্ত মেরে দিবে। পিঠের যন্ত্রণায় রিয়াজ নড়তে না পারলেও,কোনোভাবে উঠে দাঁড়ায়। চারদিকে একটু ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে, নদীর কিনারায় একটা পরিবার দাঁড়িয়ে আছে।সম্ভবত নৌকার জন্য। আর নয়তো লঞ্চের জন্য। রিয়াজের মুখে একটা মুচকি হাসি আসে। রিয়াজ ভাঙ্গা কাচের বোতলটা হাতে নেয়। এরপর সেই পরিবারের দিকে ধীরে ধীরে হেটে যায়। দৃশ্য বদলায়।
ব্রেকিং নিউজ- মারিয়া নামের এক তরুনীর কাটা মাথা পাওয়া যায় মিরপুর-১০ এর ওভার ব্রিজে।আর দেহ পাওয়া যায় পূরবীর একটা ময়লার ড্রেনে।
ব্রেকিং নিউজ- সুমাইয়ার কাটা মাথা পাওয়া যায় অমুক জায়গায়।
ব্রেকিং নিউজ- নাদিয়ার মাথা ছাড়া দেহ পাওয়া যায় তমুক স্থানে।
ব্রেকিং নিউজ- মিমের কাটা পা পাওয়া যায় **** স্থানে।
পুরো শহরটা আজ বেশি'ই আতঙ্কিত হয়ে যায়। একসাথে ২৬ টা লাশ উদ্ধার করা হয় আজ। ডিপার্টমেন্টে এই নিয়ে চাপ যাচ্ছে প্রচুর। ধীরে শহরের মানুষ সব ঘরে ঘরে চলে যাচ্ছে। শহরে থাকা দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একসাথে এতো খুন হয়েছে যে,সাইকোকে এইবার সবাই আজরাইলের মতো ভয় পাচ্ছে। শহরটা এইবার ধীরে ধীরে মানব শূন্য হচ্ছে। অনেক মানুষ তো শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছিলো। এর মধ্যে রয়েছে সুফিয়ানের স্ত্রী জান্নাত।
সুফিয়ান নিজেও প্রচুর ভয়ে আছে। তাই বিকেলের ট্রেনে জান্নাতকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সুফিয়ান নিজে জান্নাতকে নিয়ে রেলওয়ে স্টেশনে আসে। এখানেও মানব শূন্য। শুধুমাত্র ১০-১২ জন মানুষ আছে। যেখানে মানুষ থাকার কথা ৭-৮ শত। সুফিয়ান তাড়াহুড়ো করে ট্রেনের টিকিট কেটে জান্নাতকে ট্রেনে তুলে দেয়। এরপর শান্ত গলায় বলে," সাইকোটাকে খুব দ্রুত ধরবো আমি। চিন্তা কইরো না,আমি সাইকোকে ধরেই গ্রামে এসে তোমাকে নিয়ে আসবো। তোমার জন্য এখন শহরে থাকা রিক্স"। কথাগুলো জানালার বাহির থেকে সুফিয়ান বলে। জান্নাতও সুফিয়ানকে সাবধানে থাকার জন্য বুঝায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ১০-১২ জন মানুষ নিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করে। সুফিয়ান এইবার রেগেমেগে নিজের গাড়ির কাছে চলে আসে। ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রচুর চাপ। সুফিয়ান সাইকোকে ধরবেই।
জান্নাত ট্রেনে বসে ফোন টিপছে। গ্রামের বাড়িতে কল দিয়ে বলতে যাবে যে,সে গ্রামে আসছে। কিন্তু ব্যালেন্স চেক করায় জান্নাত দেখে,তার ফোনে ব্যালেন্স নেই। জান্নাত ফোন হাতে নিয়ে দুই সিট সামনে তাকায়। দেখে একটা মানুষের পা দেখা যাচ্ছে। জান্নাত তার ফোন ইউজ করার জন্য যখনি বসা থেকে উঠে,দেখে হেলমেট পরিহিত একটা লোক সেই সিট থেকে দাঁড়ায়। এবং তার হাতে একটা কাঠের বক্স।
ব্রেকিং নিউজ-
চলবে............