ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিকুঞ্জ কাহন

১২তম পর্ব

লেখক: নুজহাত আদিবা

‎#নিকুঞ্জ_কানন

‎#নুজহাত_আদিবা

[‎পর্ব ১২]

‎(কপি ও অন্যত্র ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌)

‎

‎গুনগুন তরীর পিছুই ছাড়ছে না। তরী যখন যেদিকে যাচ্ছে গুনগুন সেদিকেই যাচ্ছে। তরীর আঁচল টেনে গুনগুন বললো,

‎

‎'' বুবু তুমি কী একেবারের জন্য চলে এসেছো? ওই পঁচা লোকটা আর নিয়ে যাবে না তো তোমাকে? লোকটা এত পঁচা কেন বুবু? তাঁর কী বুবু নেই? শুধু আমার বুবুকে নিয়ে টানাটানি করে কেন?"

‎

‎তরী গুনগুনের প্রশ্নের উত্তর দিলো না। আহসান লোকটা আসলেই পঁচা। নাহয় তরীকে ফেলে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারতো?

‎

‎আহসানের বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো। আনুমানিক বারোটার বেশি বাজছে তা নিশ্চিত। জানাযা শেষ হয়েছে এশার পরে। জানাযা দিয়ে লা'শকে অনেক আগেই দাফন করা হতো কিন্তু সৌম্যদের শহরের আত্নীয়দের অপেক্ষায় জানাযা পড়াতে বিঘ্ন ঘটেছে। সৌম্যরা দুইভাই; সৌম্য বড় আর ছোটজনের নাম সৌভিক। সৌম্যের মা দু'বছর আগে ইন্তেকাল করেছে। এতদিন বাবাই ছিল দু'ভাইয়ের বটগাছ। বেঁচে থাকার একমাত্র খুঁটি। বাবার আকষ্মিক মৃত্যুতে দুজনেই দিক বেদিক ভুলে দিশেহারা হয়ে গেছে। দুজনকে সামলাতে দিয়ে তাঁকেসহ অর্ক আর রঙ্গনকে বেগ পেতে হয়ে হয়েছে। তবে, এই দুঃখ কী ঘোচাবার মতো? পিতা ও মাতা সন্তানের জন্য সম্পদ সমতুল্য। সেই বিয়োগ কী মেনে নেওয়ার মতো? আহসান আজ প্রকৃতপক্ষে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সৌম্যের অবস্থা মুখে প্রকাশ করবার মতো নয়। কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে বুঝেই আসেনি।

‎

‎আহসান ক্লান্ত আজ। শারীরিক ও মানসিক উভয় ভাবেই সে বিপর্যয়গ্রস্থ। ঘরে ঢুকতেই তরীকে খুঁজে পেলো না সে। তরীকে তখন কিছু বুঝিয়ে বলার মতো অবস্থায় ছিল না সে। তরীকে সবটা বুঝিয়ে বকা দরকার। সম্পর্কে ভুল বোঝাবোঝি মিসআন্ডারস্যান্ডিং বড্ড খারাপ জিনিস। সম্পর্ককে এক নিমিষেই ধ্বংস করে দেয়। আহসান রুমিকে ডাক দিয়ে তরীর কথা জিজ্ঞেস করতেই রুমি বললো,

‎

‎" ভাইয়া, ভাবী তো বাবার বাড়ি গেছে। ভাবীর আজ মন ভালো নেই। হঠাৎ করে বাবার কথা মনে পরায় খুব করে কেঁদেছে। পরে বাবা গিয়ে ভাবীকে দিয়ে এসেছে। মা বললো ভাবীকে কটাদিন ওখানে থেকে আসতে। মনটা তাহলে হালকা হবে কিছুটা।"

‎

‎আহসান আর কিছু বললো না। রুমি খাবারের প্লেট নিয়ে এসে আহসানের ঘরে দিয়ে চলে গেল। আহসানের মনে বিতৃষ্ণা ভর করেছে। তরী যে বাবার মায়ায় বাড়ি ছেড়েছে তা ভুল। তরী বাড়ি ছেড়েছে তীব্র অভিমানে। তরীর ওপরে প্রথমে বেশ রাগ হলো তাঁর। ফের মনে হলো ❝অভিমান সেখানেই জন্মায় যেখানে ভালোবাসার উপস্থিতি রয়েছে।❞ আহসানের প্রতি তরীর অধিকারবোধ এখন ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। যদি ভালো সে না-ই বাসতো তবে, অন্য মেয়ের কথা শুনে আহসানের প্রতি এতটা অভিমান- অভিযোগ তাঁর থাকতো না। তরীর অভিমান, ক্রোধ প্রমাণ করে দিচ্ছে তাঁর ভালোবাসা, সম্পর্কের প্রতি টানকে। তরী বোকা মেয়ে! মেয়েটার প্রতি যেখানে রাগ হওয়ার কথা। সেখানে তাঁর ক্রতি ভালোবাসা, মায়া উপচে পরছে। আহসান আনমনে বললো,

‎

‎" তরী কী সুধা ছড়ালে গো?"

‎

‎আহসানের ত্বরিত চোখ গেল বিছানার ওপরে রাখা বালিশের কোনে। একটা ভাঁজ করা কাগজের ঝলক দেখা যাচ্ছে। আহসান কাগজটা বালিশের কোন থেকে টেনে তুললো। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,

‎

‎" প্রিয় বাজে লোক আহসান,

‎

‎আপনার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর আমি বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। কিন্তু, বিয়ে হওয়ার পর সবকিছু কেমন যেন পাল্টে গেল। আমার আপনাকে খুব ভালো লাগে।আমি ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে। আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলে কষ্ট হয়। আপনাকে কারো সঙ্গে সহ্য-ই হয় না আমার। চুল ধরে টেনে কুটিকুটি করে দিতে ইচ্ছে হয়। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না সেটা জানি। নাহলে, আমায় ছেড়ে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারতেন? মেয়েটা খুব সুন্দর সেটা জানি। আপনি সুন্দর তাই আপনার সঙ্গে সুন্দরকেই মানায়। আমি চলে যাচ্ছি। আপনি চাইলে ওই মেয়েটাকে নিয়ে সংসার করতে পারেন। কিন্তু, কখনও তাঁকে আমার সামনে নিয়ে আসবেন না। আপনার সঙ্গে কাউকে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। বুকের ভেতর কেমন কেমন যেন হয়। সবকিছুর শেষে বলতে চাই, আপনি একটি নিতান্তই বাজে পঁচা লোক! খুব পঁচা! "

‎

‎আহসান চিঠিটা পড়ে চিঠিতে ছোট্ট করে চুমু খেলো। চিঠিতে তরীর তাঁর প্রতি তীব্র ঘৃনা প্রকাশ পাচ্ছে। সে পাক! তরীর সবকিছু তাঁর। তরীর ঘৃনাগুলোও একান্ত তাঁর। যে স্থান তরী অর্জন করেছে তা আজ অবধি কেউ পারেনি। তাই বা কম কীসে?

‎★

‎মনোয়ারা তরী আর গুনগুনকে একসঙ্গে বসিয়ে ভাত খাইয়ে দিয়েছে রাতে। মনোয়ারা বিছানার অপর প্রান্তে শুয়েছে। গুনগুন আর তরী একসঙ্গে শুয়েছে। গুনগুন মাঝে আর তরী সাইডে। তরীর ঘুম আসছে না। এপাশ ওপাশ ফিরে কয়েক দফা ঘুমানোর চেষ্টা করলো কিন্তু ঘুম এলো না। তরীর ছটফট দেখে মনোয়ারা ঘুম থেকে উঠে বসলেন। শান্ত গলায় বললেন,

‎

‎" কী হয়েছে সত্যি করে বল।"

‎

‎তরী জবাব দিলো না। আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মনোয়ারা উঠে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

‎

‎" কী হয়েছে? আহসান কিছু বলেছে? ঝগড়া হয়েছে তাঁর সঙ্গে? "

‎

‎তরী তখনও কোনো প্রত্যুত্তর করলো না। একেবারে ক্ষীন শব্দে কাঁদতে লাগলো। মনোয়ারা নমনীয় কন্ঠে বললেন,

‎

‎" জীবনে অনেক পরিস্থিতি আসে। স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হওয়াটা অস্বাভাবিক কোনো কিছু না। জীবনে যদি শীত না আসে তবে বসন্তের গুরুত্ব কী করে বুঝবি? সম্পর্কের মাঝে ভুল বোঝাবোঝি, রাগ ও অভিমান আসবেই। অভিমানের তিক্ততা না বুঝলে ভালোবাসার মিষ্টি স্বাদ কী করে পাবি? সবসময় একটা কথা মাথায় রাখবি। দিনের কাজ দিনে করতে হয়। রাতে ঘুমানোর আগে সারাদিনকার সব মনোমালিন্য, ঝগড়ার সমাধান করবি। তাতে চিৎকার, চেঁচামেচি যাইহোক না কেন। অভিমান ঝগড়া করে ঝেড়ে ফেলবি। অভিমান পুষে রাখলে সম্পর্কে ফাটল ধরে। "

‎

‎তরী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। মনোয়ারার ফোনটা দিয়ে আহসানকে কল দিলো। সারাদিনের বিশৃঙ্খলতার মাঝে আহসানের মনে শান্তি নেই। ঘুমের ঔষধ খেয়ে নিদ্রাগ্রস্থ সে। তবুও ঘুমের ঘোরেই ফোনটা তুললো সে। নিদ নিদ কন্ঠে বললো,

‎

‎" হ্যালো কে?"

‎

‎তরী অভিমানের সূরে বললো,

‎

‎" কেউ না আমি আপনার।"

‎

‎আহসানের সম্বিত ফিরতেই সে পিলে চমকে উঠলো। ঘড়িটার দিকে এক পলক তাকালো সে। রাত তিনটা বাজছে! তরী এখন তাঁকে কল দিয়েছে? আহসান কন্ঠে জড়তা জড়িয়ে বললো,

‎

‎" ঘুমোতে যাওনি এখন?"

‎

‎তরী জবাবে বললো,

‎

‎" সবাই আপনার মতো অশান্তি করে পড়ে পড়ে ঘুমায় না।"

‎

‎আহসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

‎

‎" বাড়ি ছেড়ে কে গিয়েছিল চলে? আমি?"

‎

‎তরী প্রতিবাদী স্বরে বললো,

‎

‎" আপনি নিতে এসেছিলেন আমায়?"

‎

‎আহসান গম্ভীর স্বরে বললো,

‎

‎" সৌম্যর বাবা মারা গিয়েছেন। জানাযাসহ সব শেষ করে আসতে আসতে রাত হয়ে গেছে। আমার মানসিক অবস্থা সেরকম নেই তরী। আমি নিতে পারছি না সবটা। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তুমি অভিমান করে চলে যেতে আর আমি বুঝি তোমায় যেতে দিতাম?"

‎

‎তরী সবকিছু শুনে ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে ফেললো। আহসান বিষ্মিত হলো! তরী কাঁদছে? আহসান কিছু বলার আগেই তরী বললো,

‎

‎" আমি এখনই আপনার কাছে আসতে চাই। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। আমি আপনার পাশে একই বালিশে ঘুমোতে চাই। আপনাকে জড়িয়ে ধরে।"

‎

‎এই অনুরোধের সূর কী আহসান ফেরাতে পারে? ঘুমের ঔষধের প্রভাব তখনও কাটেনি। আহসান এলোমেলো পায়ে বাইকের চাবিটা নিয়ে বের হলো। বাইরে ঝিঁঝি পোকার তীব্র আওয়াজ। নিঝুম গভীর রাত; গ্রাম্য এলাকা বিধায় কাকপক্ষীও জেগে নেই। আহসান সবকিছু ফেলে তরীর পানে ছুটলো।

‎

‎ঘুম-টুম সবকিছু ফেলে তরী আবার ব্যাগ গুছালো। আহসান তাঁকে নিতে আসছে। সে এখনই চলে যাবে। মনোয়ারা ঝিমুতে ঝিমুতে মেয়ের কান্ড দেখলো। দু'জনের কথোপকথন তিনি শুনেছেন। ঝামেলা মিটমাট হয়েছে এই শান্তি তাঁর।

‎

‎রাত সাড়ে তিনটার দিকে সত্যি সত্যি আহসান এলো। তরী ব্যাগ নিয়ে ছুটলো আহসানের দিকে। আজ তরীর মোটেও ভূতের ভয় করছে না। আহসানের বাইকের আলোতে তেনারা পালিয়েছেন! মনোয়ারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তরীর চলে যাওয়া দেখলেন। কী ছেলেমানুষ মেয়ে তাঁর!

‎

‎

‎" সত্যি করে বলুন তো মেয়েটা কে ছিল?"

‎

‎আহসান তরীর থুতনিতে হাত রেখে বললো,

‎

‎" জানি না।"

‎

‎তরী ফের প্রশ্ন করলো,

‎

‎" আপনি কী বিয়ে করেছেন তাঁকে? সত্যি করে বলুন।"

‎

‎আহসান বালিশে মাথা রেখে বললো,

‎

‎" একজনের মান অভিমান নিয়েই পারছি না। আবার আরেকজন? কী যে বলো না তরী!"

‎

‎তরী আহসানের বুকে ভর দিয়ে শুধালো,

‎

‎" বলুন না মেয়েটা কে ছিল?"

‎

‎আহসান চোখ বুজে বললো,

‎

‎" আমি জানি না তরী। আমার মনে হচ্ছে রং নাম্বার। অন্যকেউ ভেবে আমায় কল দিয়েছে নিশ্চিত।"

‎

‎তরী আর কিছু বললো না। আহসানের বুকে মাথা রেখে পাঞ্জাবীর বোতাম ঘোরাতে ঘোরাতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলো....

‎★

‎সকালে তরীকে বাড়িতে দেখে এক প্রকার হাসাহাসির রোল পড়ে গেল! শোভা আর মধুবিবি তখন থেকে তরীকে দেখে হাসছেন। লজ্জায় তরী আহসানের ঘরে গিয়ে গা ঢাকা দিলো। আহসান তখন আলমারির খুলে কী যেন খুঁজছে। তরী গিয়ে তাঁকে বললো,

‎

‎" কী খুঁজছেন? আমায় বলুন আমি দিচ্ছি। "

‎

‎আহসান দুষ্ট চাহনি নিক্ষেপ করে বললো,

‎

‎" চাই তো অনেককিছুই।"

‎

‎তরী সেসবের মানে বুঝলো না। আহসানকে সরলমনে প্রশ্ন করলো,

‎

‎" কী চান? কী লাগবে আপনার? আমি খুঁজে দেবো? "

‎

‎আহসান কৌশলে উত্তর দিলো,

‎

‎" না থাক। বাচ্চা মেয়ে তুমি; এত ভার সামলাতে করতে পারবে না।"

‎

‎তরী তেতে উঠে বললো,

‎

‎" কে বলেছে আমি বাচ্চা মেয়ে? আমার অনেক শক্তি আছে। মা রোজ আমায় আর গুনগুনকে এক গ্লাস দুধ আর ডিম সেদ্ধ করে দিতো। আমি দাঁত দিয়ে সুপারি ভাঙ্গতে পারি। আমার অনেক শক্তি! "

‎

‎আহসান তরীর দিকে এগিয়ে এসে বললো,

‎

‎" তোমার অনেক শক্তি?"

‎

‎তরী জবাবে বললো,

‎

‎" হ্যাঁ। আমি অনেক ভার সহ্য করতে পারি। একবার ১০ কেজি চালের বস্তা তুলেছিলাম।"

‎

‎আহসান ঠোঁট টিপে হেসে বললো,

‎

‎" তবে সামলাও!"

‎

‎এটুকু বলেই সে তরীর কোমর চেপে ধরে তরীকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। টুপ করে তরীর ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বের হয়ে গেল। তরী চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে রইলো। এটা কী হলো? বাজে লোকটা চুমু খেলো তাঁকে?

চলবে...

‎

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন