ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিকুঞ্জ কাহন

১৬তম পর্ব

লেখক: নুজহাত আদিবা

‎#নিকুঞ্জ_কানন

‎#নুজহাত_আদিবা

[পর্ব ১৬]

‎(কপি ও অন্যত্র ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌)

" এই বউ তুমি আমার সঙ্গে দুপুরে একটু বাইরে যাবা। খাইয়া দাইয়া মাথায় ঘোমটা দিয়া আমার সঙ্গে যাইয়ো।"

তরী মধুবিবির কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বললো,

" কোথায় যাবো বুবু? উনি বকবেন না তো?"

মধুবিবি উত্তরে বললেন,

" আহসানের সাধ্য আছে আমার মুখের উপরে কিছু বলার? তোমারে নিয়া খাজা বাবার মাজারে যামু। মাজারে তোমার লাইগা মানত করসি। তোমার না পরশু থেইকা পরীক্ষা? "

তরী বিষম খেয়ে বললো,

" মাজার?"

মধুবিবি প্রত্যুত্তরে বললেন,

" তো কী? কয়দিন আগে রুমির পরীক্ষা গেল না? রুমিরেও নিয়া মাজারে গেসিলাম। এই খাজা বাবার মাজার আমাদের অত্র এলাকায় বিখ্যাত। দূর-দূরান্ত থেইকা লোক আইসা মানত করে। মানতে যা চাইবা তাই পাইবা। আমি মানত করসি তুমি ভালো কইরা পাশ দিলে মোমবাতি দিমু। খায়া লইয়া তাড়াতাড়ি লও। দুপুর থাকতে থাকতেই আইসা পরতে হইবো। তোমার শশুর আবার এইসব পছন্দ করে না। তাঁর কাছে কিন্তু বলবা না। শুনলে পরে আমার লগে চিল্লাইবো।"

তরী মাথা দুলিয়ে সায় দিলো। উপরে উপরে হ্যাঁ বললেও তরীর মনে খুব ভয়। মনোয়ারা মাজারে একদমই বিশ্বাস করতেন না। সবসময় বলতেন তরীকে, " যা চাই তা সবসময় সৃষ্টিকর্তার কাছে চাইতে হবে। মৃত মানুষের কোনো শক্তি থাকে না। এসবে বিশ্বাস করাও কুসংস্কারের অংশ।" কিন্তু, এসব এখন বুবুকে বলতে গেলে বিশাল কেলেংকারী কান্ড হবে। এমনিতেও মধু বিবির যা রাগ! এসব শুনলে তরীকে আর আস্ত রাখবেন বলে মনে হয় না।

★

আহসানের ফোনের সিমটা টেলিটকের। দুইমাস আগে একটা চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল সে। প্রাইমারি লেভেলের চাকরি। আজ সেটার রেজাল্ট পাবলিশ হবার কথা। আহসান শান্ত হয়ে রেজাল্ট চেক করতে বসলো। অনেকবার সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে সে। পরীক্ষায় টিকলেও ঘুষ নামক বস্তুটির কাছে শতবার হেরে গেছে। পরীক্ষা তো ভালোই দিয়েছিল সে। কিন্তু, এবারও হয়তো হবে না। ওই এক জায়গাতেই তাঁর পথচলা থেমে যায়।পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষ্ময়কর ব্যাপারখানা এবার ঘটেই গেল আহসানের সঙ্গে! রিটেন এক্সামে সে টিকে গেছে। কী ভয়ংকর ব্যাপার! আহসান খানিকটা সময় কেমন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। কী হলো এটা? মাজদাক সারোয়ার আহসানকে মাল বুঝিয়ে দিতে এলেন। কয়েকবার নাম নেওয়ার পরেও যখন আহসান সাড়া দিলো না। ব্যাপারটা তাঁর কাছে ঠিক সুবিধের লাগলো না। দ্রুত আহসানের পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি। আহসান পিছু ফিরে বাবাকে দেখে বললো,

" আমার রিটেন এক্সামের রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে বাবা। আমি বোধহয় টিকে গিয়েছি। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না!"

মাজদাক সারোয়ার চমকে উঠে বললেন,

" কী? আসলেই?"

আহসান ফোনটা বাবার নিকট তুলে ধরতেই তিনিও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,

" শহরে চলে যাবি বাবা?"

আহসান ফোনটা টেবিলে রেখে বললো,

" না। ঢাকায় গিয়ে যে-ই পরীক্ষাটা দিয়েছিলাম সেটাতে টিকেছিলাম। পরে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম চাকরিতে টিকলেও সেখানে জয়েন করতে ঘুষ লাগবে। আনুমানিক আট লাখের মতো। মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে মনে হলো ঢাকায় আর চেষ্টা করবো না। এখানে একটা পরীক্ষা দিয়ে দেখি। দিলাম প্রাইমারীতে এক্সাম! পরীক্ষা দিয়েই মনে হয়েছিল টিকে যাবো। কিন্তু, কাউকে বলিনি সেভাবে। ভেবেছিলাম রেজাল্টটা পাবলিশ হোক। তারপর যা হবার হবে! আমার খোদার কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।"

মাজদাক সারোয়ার আহসানের কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন। কেমন শুষ্ক কণ্ঠে বললেন,

" আহসান, তুমি আমার ছেলে। সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তুমি জীবনে অনেক বড় মানুষ হও। আমি সবসময় সেই দোয়া করি। আজ শুধু এটুকুই বলবো, জীবনে ভালো মানুষ হও বাবা। টাকার কাছে নিজের মনুষ্যত্ব, মানবতাকে কখনোই বিক্রি করে দিও না৷ মানুষ তখনই সবচেয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে; যখন সে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়।"

মাজদাক সারোয়ার কয়েক মুহূর্ত থেমে ফের বললেন,

" আমি সবসময় চেয়েছিলাম আমার আহসান আমার কাছে থাকুক। বড় বড় শহরের মানুষদের মধ্যখানে সব থাকলেও তাঁদের হৃদয়ে ইট-পাথরের স্তর পড়ে গেছে। সত্তা বিক্রি হয়ে গিয়েছে টাকা, নাম-ধামের কাছে। আমি তো সেই আহসানকে কখনো চাইনি। আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলে খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক। খুব সাধারণ! গ্রামের সহজ-সরল একটা মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকুক। তুমি যদি পড়াশোনা না করে গ্রামের কৃষকও হতে;তবুও আমার কোনো আপত্তি ছিল না।"

আহসান মুখে কিছু বললো না। হুট করে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে। এই পড়ন্ত বিকেলটুকু বাবা ছেলের মধ্যেই তোলা থাকুক। আজ অবধি কম ঝড়-ঝঞ্ঝা তো যায়নি।

আহসান ফোন করে রঙ্গন, অর্ক সবাইকেই ব্যাপারটা জানালো। সৌম্য অফিসে ছিল বিধায় তাঁকে জানাতে বেশ দেরি হলো। সৌম্য বিষয়টা জানতেই আহসানকে বললো,

" অভিনন্দন বন্ধু। তবে, আমারও তোকে কিছু বলার আছে। আমি খুব এক্সাইটেড আবার খুব নার্ভাস। আমি জানি না কীভাবে কী করবো। মাথা পুরো খালি খালি রাখছে!"

আহসান বেশ নড়েচড়ে উঠলো। বিগত দুই মাসে সৌম্য যতটা মিইয়ে গিয়েছিল। আজ তাঁর গলাটা ঠিক ততটাই তরতাজা। কী হলো আজ? সৌম্য নিজেই আবার বলতে শুরু বললো,

" আমার আজকে পুষ্পিতার সঙ্গে কথা হয়েছে। একটা খুব আন-এক্সপেক্টটেড ব্যাপারে কথা হয়েছে। কথার টপিক কে জানিস? দিলশান! আমার দিলশান হায়াত!"

আহসান চমকে উঠে বললো,

" মানে? এতবছর পর দিলশান কোথা থেকে এলো?"

সৌম্য জবাবে বললো,

" সেটাই তো। আমিও তো কখনো ভাবিনি। আজ এতবছর পর দিলশানের কথা তুলতে হবে। আজ কাজের সূত্রে এতবছর পর আমাদের ব্যাচমেট পুষ্পিতার সঙ্গে কথা হলো। পুষ্পিতা আর দিলশান কতটা কাছের বন্ধু সেটা তো আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ইউ নো ওয়াট, দিলশান এখন সিঙ্গেল।"

আহসান ত্বরিত বললো,

" মানে! ওর তো বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।"

সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

" দিলশানের হাসবেন্ড দিলশানকে চিট করেছিল। অন্য নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। মানসিকভাবে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছিল দিলশানকে। এরপরও সবকিছু শেষে দিলশান নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল জা'নোয়ারটার কাছে। নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিল সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু হয়নি সেটা! অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে দিলশানের একটা মিসক্যারেজ হয়। বিষয়টা দিলশানের ফ্যামিলির কানে যাওয়ার পর তাঁরাই আসলে দিলশানকে ওই সম্পর্কটা থেকে সরিয়ে আনে। আহসান, জীবন আমাকে আরেকটা সুযোগ দিচ্ছে। আমি চাই দিলশান আমার জীবনে আসুক। ওর অতীত নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আমি ওর বর্তমান আর ভবিষ্যৎ হতে চাই।আমি এখনও চাই দিলশান আমার হোক।ওর সঙ্গে আমার ছোট্ট একটা সংসার হোক।"

আহসান মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনে বললো,

" ভালো সিদ্ধান্ত। তোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাই বন্ধু। যদি দিলশান রাজি থাকে। তবে, ওর সঙ্গে একটা সুন্দর জীবন শুরু কর। বিষয়টা খুবই সিরিয়াস! তুই দিলশানের পরিবারের সঙ্গে কথা বল। দিলশানকে আগে রাজি কর। কোথাও গিয়ে যদি আমায় প্রয়োজন পড়ে। তবে, সেটা নিয়ে ভাবিস না। আমি আহসান সবসময় তোর পাশে আছি।"

সৌম্য ফোনটা রেখে চুপচাপ বসে রইলো। তাঁর সামনে ভীষণ কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। পছন্দের মানুষকে নিজের করে পাওয়ার পথ।

★

আহসান বাড়ি ফিরতেই তরী তাঁকে একগুচ্ছ প্রশ্নের বান ছুঁড়ে দিলো। টেবিলে বইখাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে আহসানের কাছে দৌড়ে এসে বললো,

"আপনি নাকি চাকরি পেয়েছেন? মা বলছিল রুমিকে আর বুবুকে। আচ্ছা, আপনি কী এখন চলে যাবেন? বড় বড় শহরের মানুষদের মতো স্যুট-বুট পড়বেন?জানেন আপনাকে স্যুট পড়লে সাহেবদের মতো লাগবে। কিন্তু, আপনি কী সত্যি চলে যাবেন? কোথায় যাবেন?"

আহসান খামখেয়ালী হয়ে উত্তর দিলো,

" হুম যাবো তো। শহরে চলে যাবো। তুমি তো আমাকে সহ্যই করতে পারো না। সারাদিন পড়ার জন্য কেমন বকাঝকা করি। ধরে বেঁধে শুধু তোমায় পড়তে বসাই।টিভি দেখতে দেই না। খেয়াল খুশি মতো চলতে দেই না। আমি চলে গেলেই তো ভালো। তুমি সারাদিন টিভি দেখতে পারবে। কেউ আর পড়ার জন্য চাপ দেবে না।"

তরী নিমিষেই মুখটা ভার করে ফেললো। ছটফট করতে করতে আহসানের কাছে ছুটে গিয়ে বললো,

" আমি আপনার সব কথা শুনবো। আপনি যা বলবেন তাই করবো। যেভাবে বলবেন সেভাবেই চলবো। কিন্তু তাও আপনি যাবেন না। আমি সারাদিন পড়বো। একটুও টিভি দেখবো না। আপনি চলে যাবেন না!"

আহসান ভাবুকতার সহিত উত্তর দিলো,

" আচ্ছা, মাথায় রইলো বিষয়টা। পরে ভেবে দেখবো যাবো কী যাবো না। তুমি বললে থেকে যেতে পারি। তুমি না চাইলে কী আর করার! তুমি তো আমাকে পছন্দই করো না। থাক চলে যাবো আমি। কী আর হবে এখানে থেকে? তুমি তো চাও-ই না।"

তরী প্রতিবাদ করে বললো,

" আমি চাই।"

আহসান তরীর সঙ্গে আরো কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো,

" কী চাও?"

তরী অস্ফুটস্বরে বললো,

" আপনাকে চাই। আপনার সঙ্গে থাকতে চাই। আমার ভালো লাগে আপনাকে।"

আহসান না চাইতেও মুখ লুকিয়ে হেসে ফেললো। কী সরল সোজা স্বীকারোক্তি! বলে দেবে কী সত্যিটা? না থাক! সেটা বরং তোলা থাকুক। তরীর নিকট থেকে সরে আসার সময়; তরীর গলায় কী যেন চকচকে বস্তু দেখতে পেল আহসান। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বললো,

" তোমার গলায় ওটা কী তুলতুল?"

তরী গলায় হাত রেখে বললো,

" তাবিজ।"

আহসান ভ্রু কুঁচকে বললো,

" কে দিয়েছে তোমায় এসব? কেন পড়েছো?"

তরী আঁচল ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,

" আজ দুপুরে বুবুর সঙ্গে মাজারে গিয়েছিলাম। আমার পরীক্ষা তাই বুবু মানত করেছে। এই তাবিজ খাজা বাবার তাবিজ। এটা পরীক্ষার দিনগুলোতে পড়ে থাকলে পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হয়। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার তাবিজ এটা।"

আহসান বিরক্ত নিয়ে তাবিজটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কীসব পুরনো দিনের মনোভাব! হয় নাকি কখনো এসব? আহসান তরীকে বললো,

" খোলো ওটা। এসব বিচ্ছিরি জিনিস পড়ে কাজ নেই।কী সব পুরনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন কথাবার্তা। ওসব তাবিজ-কবচের কোনো শক্তি নেই। খুলে ফেলে দাও ওটা।"

তরী মিনমিন করে বললো,

" বুবু যদি বকে? বুবু বলেছে এর ভেতরে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার দোয়া লেখা আছে। এটা যেন গলায় পরীক্ষার সময় পড়ে থাকি।"

আহসান কৌতুহলী হয়ে জবাব দিলো,

" আসলেই? তাহলে এখনই তাবিজটা খুলে দাও তো। দেখি কী এমন দোয়া লিখা আছে। যে দোয়া পড়লে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আপনা-আপনি চলে আসবে।"

তরী সঙ্গে সঙ্গে তাবিজটা খুলে আহসানের হাতে দিলো। আহসান তাবিজটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ভেতরের ছোট্ট কাগজটা বের করলো। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

‎❝পড়িলেই পাশ করিবে।❞

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন