#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-১০♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
----- "টমেটো ভাইয়া....থুক্কু রুশো ভাইয়া...! খুব বেশি লেগেছে কী? আরো দুটো বরফ লাগিয়ে দেবো?"
বিপরীতে চোখ-মুখ উল্টে এক পলক তাকালো রুশো ভাইয়া। মাথাটা ডানে-বামে নাড়িয়ে বোঝালো, "থাক, বরফ লাগাতে লাগাতে নাকটাই ফ্রিজ হয়ে যাবে তাও এ ব্যাথা কমবার নয়!" হতাশ হয়ে সামান্য নড়েচড়ে বসলাম আমি। অগ্নি ভাইয়া মুখ টিপে হেসে চলেছে প্রায় ১০ কি ১৫ মিনিট ধরে। খালামুনির বুদ্ধ চোখদুটো থমকে আছে ছেলের পানে। আম্মুর চোখেমুখে কনফিউজড টাইপ ভাব। হয়তো পূর্বেও রুশো ভাইয়ার এমন রেডনোস টাইপ ফেইসের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেছিলো, এমন সম্ভাব্যতার বেড়াজালেই মস্তিষ্ক কাজ করছে তার। পরিস্থিতি অনেকটাই হাতের নাগালে এসেছে এখন। খালামুনির দৃষ্টি স্থির। নিজের গম্ভীর গলাতেই অবশেষে মুখ খুলে প্রশ্ন করলেন,
----- "এই ফাজিলটা আবার কোন কান্ড বাঁধিয়েছে সাফ সাফ বলে ফেল তো আয়ু।"
বিস্ময়ে বিষম খেয়ে বসলাম আমি। চোখমুখ কুঁচকে আড়চোখে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকালাম। ভাবমূর্তি দেখে যা বুঝলাম তাতে স্পষ্ট, সত্য অস্বীকার করবার আহ্বান জানাচ্ছে ভাইয়া। তাছাড়া কোনো মেয়ের হাতের বাহুবালী টাইপ মুক্কা খেয়ে ছেলের নাকের ভর্তা বানানোর কিচ্ছা কোনো মা'য়েরই শুনবার ইচ্ছে থাকবে না তাও জানা কথা। সব দিক বিবেচনা করে অবশেষে এক কঠিনতম সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম আমি। বিশেষ কোনো শক্তপোক্ত মিথ্যে গড়তে না পাড়ায় মিনমিন করে বললাম,
----- "আব...আসলে হয়েছে কি খালামুনি, রুশো ভাইয়া না ক্যাম্পাসের ভাইয়াগুলোর সাথে হ্যান্ডবল খেলতে নেমেছিলো। আর ঠিকঠাক ক্যাচ করতে না পাড়ায় ভুলভাল জায়গায় বলটা লেগে গিয়েছে আরকি!"
খালামুনি কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। যা দেখেই গলাটা ক্রমশ শুকিয়ে এলো আমার। খালামুনি এবার রুশো ভাইয়ার থুতনিতে হাত রেখে মুখ তুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বিচক্ষণ ভাব নিয়ে বললেন,
----- "তোর ভাইয়ের কবে থেকে শখ জেগেছিল হ্যান্ডবল খেলার বলতে পারিস? নাকি গুরুতর কোনো অপরাধ করে কারো হাতে মার খেয়ে এসেছে বলে লুকোতে চাইছিস আসল ব্যাপারটা?"
মুহুর্তেই চোখেমুখে বিস্ময়ের রেশ ফুটে উঠলো আমার। রুশো ভাইয়া তৎক্ষণাৎ গোলগোল চোখ করে তাকালো। এক হাতে নাক চেপে ধরেই প্রতিবাদী গলায় বলল,
----- "মাম্মি এসব তুমি কি বলছ? আমি কারো হাতে মার....."
এটুকু বলতেই ভাইয়াকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন খালামুনি। আমার দিকে ঘুরে বসে চোখে চোখ রেখে বললেন,
----- "এখনও সময় আছে, সত্যিটা বলে ফেল আয়ু।"
এবার নার্ভাসনেসের শীর্ষে পৌঁছলাম আমি। শুকনো গলাটা যেনো কাঠে পরিণত হলো আমার। আচ্ছা এনিহাও কি খালামুনি রুশো ভাইয়ার নাক ফাটানোর মর্মান্তিক দৃশ্যটি দেখেছেন? নাহ! তা কি করে হয়? ওই সময় খালামুনির তো অন্য রোডে থাকার কথা, তাহলে? কি বলব কি করবো, এসব ভাবতে ভাবতেই নিউরনে শর্টসার্কিট হলো বোধহয়। যার দরুন ফিউজ উড়ে গিয়ে পূর্বের মিথ্যেটাকেই আবারও আওড়ে ফেলার তাগিদে মুখ খুলে বললাম,
----- "সত্যিই বলছি খালামুনি, ভাইয়া খেলতে গিয়েই নাক ফাটিয়ে এসেছে! বাট ট্রাস্ট মি, আমি ভাইয়াকে খুব করে বকে দেবো, এসব রিস্কি, ফাটাফাটি টাইপ খেলায় যেনো আর মনের ভুলেও নিজের নাকটা না ডোবায় বুঝিয়ে দেবো।"
খালামুনির কী হলো ঠিক ঠাওর করে উঠা হলো না। নিরলস ভঙ্গিতেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন তিনি। আমাদের তিন ভাই-বোনকেই উদ্দেশ্য করে বললেন,
------ "যাও সবাই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো৷ বাকি আলোচনা অন্য কখনো।"
তিন জনেই খালামুনির কথামতো মাথা দুলিয়ে সুরসুর করে উপরে এলাম। অগ্নি ভাইয়া বাহিরের দিকটা আবারও এক পলক দেখে নিয়েই দরজা আটকে ঘরে ঢুকলো। বিছানায় বসে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে চটজলদি প্রশ্ন ছুড়লো,
----- "বহুত নখরা হইছে, ব্যাটার নাক ফুটছে কেম্নে সেইটা ভালো মতোই বুঝছি বাট আমার প্রশ্নটা হচ্ছে নাকটা ফাটাইলো কেন মাইয়াটা? আবার কি অঘটন ঘটাইছে ওয়?
রুশো ভাইয়ার মুখে পূর্বের তুলনায় ভয়ানক অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। কাঁদোকাঁদো মুখ করে আমার দিকে চেয়ে রইলো স্রেফ। গলাটা খাঁকারি দিয়ে বেড টেবিলে রাখা পানি ভর্তি গ্লাসটা এক নিমিষে শেষ করলাম আমি। লম্বা একটা দম নিয়ে বলতে শুরু করলাম,
----- "প্রথমত এতে রুশো ভাইয়ার কোনো দোষ ছিলো না এবং দ্বিতীয়ত এতে দ্বিতীয় পক্ষেরও কোনো দায়ভার ছিলো না। উড়ন্ত এক তৃতীয় পক্ষের লাগামহীন কাজ সারবারই ফল ছিলো সব।"
অগ্নি ভাইয়া গভীর মনোযোগী হয়ে আবারও প্রশ্ন ছুড়লো,
----- "মানে কি?"
----- "মানেটা সিম্পল! ভাইয়ার কাউয়া আজো টার্গেট ফিক্সড করে টয়লেট করতে বসেছিলো। বাট ভাইয়া গাড়িতে কাকের ছায়া দেখে লাফ মেরে বসে এন্ড.....নিশানা স্লিপ কেটে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অন্য কোথাও ল্যান্ড করে বসে।"
অগ্নি ভাইয়ার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণতর হয়ে এলো। আমাদের দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
----- "দ্যট মিনস, আমি যা ভাবছি তাই এক্সাক্টলি ঘটেছে?"
রুশো ভাইয়া- আমি, একে-অপরের দিকে এক পলক চেয়ে ঠোঁট উল্টালাম। ভাইয়ার নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই বের করে হঠাৎ থম মেরে রইলো৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলে উঠলো,
----- "কিন্তু....এখানে তো কাউয়ার দোষ, এরে ফুটাইলো কেন ওই মাইয়াটা?"
----- "কারণ, তার কঠিন দাবি রুশো ভাইয়া সেখান থেকে সরে না গেলে কাকটা ভাইয়ার ওপরই পটি ছেড়ে দিতো, আর যেহেতু ভাইয়া লাফ মেরে সরে গিয়েছে দ্যটস হোয়ায় কাকটা উপায় না পেয়ে রাত্রির ওপরই নিজের ইয়াক মার্কা দু নম্বর কাজ সেরে বসেছে।"
প্রতিউত্তরে কিছুক্ষণ অপলক চোখে চেয়ে রইলো অগ্নি ভাইয়া। ব্যাপারখানা বেশ ভালো মতোই বুঝে উঠা হলো আমার। আর এক মুহুর্ত এ ঘরে অবস্থান করা যাবে না। ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটবে আজ! আমায় পালাতে হবে, অন্তত পক্ষে রুশো ভাইয়ার মন রক্ষায় গলা না মিলিয়ে পালাতেই হবে, ভেবে উঠে দাঁড়ালাম আমি। রুশো ভাইয়ার লাল টকটকে নাদুসনুদুস নাকটার দিকে পলক ঝাপটে একবার তাকিয়েই দ্রুত পায়ে ছুট লাগালাম। তবু ঠিক সময়ে বের হওয়া হলো না। দরজার কাছাকাছি পৌঁছতেই অগ্নি ভাইয়ার উচ্চস্বরে দেওয়া অট্টহাসির তীব্র আওয়াজ কানে ভেসে এলো। ব্রেক মারার বদলে ঠোঁটে ঠোঁট চেপেই নিজের ঘরে এসে থামলাম । সাথেসাথেই এতোক্ষণ যাবৎ পেটে চেপে রাখা হাসির ফোয়ারা নিসৃত হলো। হু হা করে হাসতে হাসতেই আবারও চোখের সামনে ভেসে এলো সেই মর্মান্তিক দৃশ্য! তবে এবার ঘটেছে কিছু ভিন্ন রকম ঘটনা। রাত্রি আজ শুধু নাক ফাটানোতেই ক্ষান্ত থাকে নি। নিজের মাথায় লেপ্টে থাকা হোয়াইট হোয়াইট পি পটি রুশো ভাইয়ার পরনের কোট নিয়ে মুছেছে। বেচারা ভাই আমার! নতুন কোটটা আজই পড়েছিলো, আর তা কিনা আজই রাত্রির ইয়াক মার্কা ঘষামাজায় নির্মম ভাবে অত্যাচারিত হলো! নট ফেয়ার!
_____________________________
খিটখিটে মেজাজ নিয়ে ফুটপাতের ওপর দিয়ে গটগট করে হেটে চলছি আমি। বিরক্তিতে জীর্ণশীর্ণ হয়ে আছে পুরো শরীর। ধ্যাত! একটা কাজও ঠিক মতো হয়না আমার দ্বারা। এতোটা অধম কেউ হয়? মা জননী ঠিকই বলেন, একেকটা গরু হয়ে জন্মেছি আমরা। আমিই হয়তো প্রথম যে কিনা নিজেকে নিজেই উড়াধুরা গালিগালাজ করে চলেছি। নিজের গালে নিজেকেই ঠাসঠুস করে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ৷ এতো ইম্পর্ট্যান্ট নোটসটা কিভাবে যে রাত্রির ব্যাগে ফেলে এসেছি তা এখন পর্যন্ত মাথায় খেলছে না আমার! নোটস ছাড়া আজকে স্টাডিস কমপ্লিট করতেও পারবোনা। ওদিকে ভাইয়াদের নিয়ে আবার গোল মিটিং বসিয়েছেন আম্মু-খালামুনি। তাই একাই বের হতে হলো আজ!
রাত্রির মেস খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র ৭ মিনিটের মতো হাটলেই পেয়ে যাবো হয়তো। কিন্তু হাটতেই তো বাঁধছে বিপত্তি। রাস্তায় জমেছে একগাদা পানি। হঠাৎ করেই বাড়ি ফেরার পর বৃষ্টি নেমেছিলো আজ। রোদের পাশাপাশি অদ্ভুত ভাবে হওয়া বর্ষণে শেয়ালের বিয়ে হলো বোধহয়। শেয়াল মামা কি তবে আজ খুব খুশি? হয়তো খুশি আবারও হয়তো বিয়ের সাইড ইফেক্টস নিয়ে ভাবতে গিয়ে বেহুশ প্রায়! কি জানি বাবা, এসব বিয়ে টিয়ে বহুত ক্যাচাল টাইপ রিচুয়ালস! এসবে যতো মাথা ঘামানো যায় ততোই ঘিলু গলে স্যুপে পরিণত হয়। এই উদ্ভট সব ভাবনার বেড়াজালে পিষ্ট হয়েই হেটে চলছিলাম আমি। হঠাৎ কোথায় থেকে এক বাইক এসে পাশ কাটিয়ে গেলো দ্রুত বেগে। মুহুর্তেই রাস্তায় জমাট বাঁধা কাদাপানি এসে ছিটকে পড়লো গায়ে। আমি আচমকা থমকে দাঁড়ালাম। নিজের পরনের সাদা স্কার্টটার দিকে তাকাতেই চোখ চড়কগাছ হলো অগত্যাই! কাদায় লেপ্টে বর্ণ বদলে হয়েছে চকলেট সেইডের! ভিজে বিশ্রীভাবে গায়ে লেগে গিয়েছে স্কার্টটা। বিগড়ে যাওয়া মেজাজে হঠাৎ এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ইন্সিডেন্ট ক্রিয়েট হলে কার কেমন রিয়াকশন হতো জানা নেই তবে এই মুহুর্তে বাইক নিয়ে ধেয়ে চলা মানুষটাকে বিনা তেলে ফ্রাই করে গিলে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। বুকে শতশত ছুড়ির আঘাতে কলিজা বের করে ফেলার তীব্র কামনা জাগছে মনে। কিন্তু শালার কপাল ভালো, মুহুর্তেই কেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো ব্যাটা! সামনে যদি আর কখনো পড়েছে তবে নির্ঘাত ব্যাটারে খুন করে জেলে গিয়ে বিছানা পাতবো আমি।
ছিঃ কি অবস্থা করেছে আমার! এই শরীর নিয়ে আর এক মুহুর্ত দাঁড়ানোও লজ্জাজনক। কিন্তু কি করবো? বাড়ি ফিরে গেলেও যেই দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে, রাত্রির নিকট গেলে বরং তার থেকে একটু কম দূরত্বই অতিক্রম করা হবে। এই চরম কনফিউশানে পড়ে দোমনা ভাব নিয়েই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। হঠাৎ নিকটেই কোনো পরিচিত কন্ঠস্বরের আবির্ভাব ঘটলো। আমি কান খাঁড়া করে এদিক ওদিক তাকালাম। আমার থেকে কম করে হলেও ৭-৮ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেদিনকার আপুটা। হাত নাড়িয়ে আমায় থামতে ইশারা করছে সে। আমি হেসে পলক ঝাপটালাম। কি যেনো নাম ছিলো আপুটার? নিতু নাকি নিতি? উমম....হ্যাঁ মনে পড়েছে, আপুটার নাম তো নিত্য, মানে নিত্য আপু! আমার উনিশ-বিশ ভাবনার মাঝেই পাশ ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করালেন আপু। গেইট খুলে একপ্রকার টেনেই ভেতরে বসিয়ে দিলেন আমায়। আমি ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলাম। আপু দ্রুত বেগে প্রশ্ন ছুড়লেন,
----- "সর্বনাশ করেছে! যাচ্ছিলে কোথায় একা একা?"
থতমত খেয়ে প্রতিত্তোরে বললাম,
----- "আসলে আপু, বান্ধবীর মেসে যাচ্ছিলাম। নোটস রয়ে গেছে ওর কাছেই। আর হুট করে কোথায় থেকে একটা লোক পাশ কাটিয়ে বাইক চালিয়ে গেলো। তারপর তো দেখতেই পারছেন কি অবস্থা!"
আপু কপাল চাপড়ালেন কিছুক্ষণ। স্থির হয়ে বললেন,
----- " কি করবে এখন? এই অবস্থায় বাসায় ফিরে যাওয়াই বেটার হবে তোমার!"
----- "নাহ আপু, একচুয়ালি নোটসটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট! নাহলে কাল প্রাকটিকাল ক্লাসে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আমায়।"
আপু বিচক্ষণ ভঙ্গিতে ভাবলেন কিছু একটা। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে স্টিয়ারিং এ হাত রেখে বললেন,
----- "বেশ, চলো আমাদের বাসায়। চেঞ্জ করে বান্ধবীর কাছে যেয়ো বরং।"
বিস্ময়ে গোলগোল চোখ করে তাকালাম আমি। বাঁধা দেওয়ার তাগিদে ব্যস্ত গলায় বললাম,
----- "এমা, আপু কি করছেন? আমি তো বাসা থেকে ড্রেস নিয়েও আসিনি। আমায় পারলে মেসে ড্রপ করে দিন। আমি ম্যানেজ করে নিবো!"
আপুর ভাবমূর্তির পরিবর্তন হলো না তেমন। গাড়িটাকে আপন বেগে ছুটতে দিয়েই রিল্যাক্স করছেন বোধহয়। আমায় এতো চিন্তিত হতে দেখে অবশেষে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
----- "তোমার ড্রেস আনতে হবে কে বলেছে? আমার ড্রেস আছে তো, সাইজও ফিট হবে আই থিংক। যদিও একটু রোগা তুমি, ব্যাপার না। রিল্যাক্স করো!"
আপুর বিরুদ্ধে আর কোনো কথা বলা হয়ে উঠলো না আমার। অগত্যাই ১০ মিনিটের মতো ছোটখাটো জার্নির পর তাদের বাসাতেই পাড়ি জমাতে হলো আজ। বাড়ির মেইন গেইট দিয়ে বাগানের পাশে গাড়িটাকে পার্ক করলেন আপু। ইশারায় নামতে বললেন আমায়। আপুর কথামতো চটজলদি নেমে পড়লাম আমি। মুহুর্তেই চোখ দুটো বিস্ময় বড়বড় হয়ে এলো আমার। বিশাল দোতলা দালান, পুরোটাই হোয়াট কালারে মোড়ানো। বাগানের পাশে সুইমিংপুল আছে একটা। তাতে স্বচ্ছ পানির বিচরণ। বাগানের এক বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে রংবেরঙে ফুলের মেলা। তাতে ঘুরে বেরোচ্ছে বেশ কিছু প্রজাপতি এবং ফড়িং এর ঝাঁক। আমি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ! চোখ ধাঁধানো কারুকার্যে বানানো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতেই নিত্য আপু নিজের ঘরে নিয়ে এলেন আমায়। কাবার্ড থেকে একটা ফোর-পিস বের করে গায়ে ধরলেন। ভ্রু কুঁচকে, ডান সাইডের ঠোঁটে কামড়ে ধরে বললেন,
----- "উমম...আই থিংক দ্যটস পারফেক্ট ফর ইউ!"
স্মিথ হেসে ভাব জমালাম আমি। আপুর কথামতো চেঞ্জ করতে হলো অবশেষে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই আপু মুখে লম্বা হাসির রেখা টেনে বললেন,
----- "ওয়াও! লুকিং সো মাচ প্রিটি অনন্যা!"
আমি মুচকি হাসলাম। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে বললাম,
----- "আচ্ছা আপু, এতো বড় বাড়িতে কি আপনি একাই থাকেন?"
আমার বোকাবোকা প্রশ্নে হেসে ফেললেন নিত্য আপু। কাদায় লেপ্টানো ড্রেসটাকে ওয়াশিং মেশিনে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন,
----- "উহুম, আমরা চারজন থাকি বাসায়। আমি, বাবা, ভাইয়া আর....জ্যাকি! বাই দ্য ওয়ে তুমি আমায় আপনি আপনি করে সম্মোধন করছ কেনো? ইশশশস! নিজেকে কেমন আন্টি আন্টি ফিল হচ্ছে আমার!"
আপুর কথায় ফিক করে হেসে ফেললাম আমি। মাথা চুলকে বললাম,
----- "আচ্ছা এখন থেকে তুমি করে বলবো। কেমন?"
আপু হাসলো। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
----- "এইরে, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আইসক্রিম বোলটা ফ্রিজে ঢোকাতে হবে। এই অনন্যা, তুমি একটু বসো, নাহলে জ্যাকির সাথে খেলো। আমি এক্ষুনি আসছি!"
একথা বলেই হন্তদন্ত হয়ে ছুট লাগালো নিত্য আপু। আমি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে চেয়ে থেকে আনমনেই বলে উঠলাম, "এই জ্যাকিটা আবার কে?"
পুরো বাড়িটায় চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে ধীর পায়ে হাটছি। দুনিয়ায় সব পেন্টিং, শো-পিস বোধহয় নিজেদের বাড়িতেই স্থাপন করেছে আপুরা। বাপরে! কিন্তু প্রশ্ন জাগছে এই জ্যাকিটাকে নিয়ে। নিত্য আপুর ছোট ভাই হবে সে বোধহয়। নাহলে নাম ধরে ডাকতোনা নিশ্চয়। বর্তমানে এই জ্যাকির উদ্দেশ্যেই ব্যাকুল হয়ে রয়েছে আমার মন। একবার পেলেই কাজ! হাটতে হাটতেই এক পর্যায়ে একটা ঘরের সামনে এসে থামলাম আমি। দরজাটা হাট করে খোলা, তার ওপর বড়বড় অক্ষরে লেখা "Jacky's Dreamworld". চোখ দুটো রসগোল্লা বানিয়ে লেখাটা পড়লাম। বাচ্চাটাকে দেখার আগ্রহ বেড়ে আকাশ ছুঁল এবার। দরজা খোলাই আছে, উঁকি মেরে একবার দেখবো কি? এই ভাবনাতেই দোমনা করতে করতে কিউরিওসিটির বশে অবশেষে ঢু মেরেই বসলাম আমি। এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ চোখে তাকালাম। ধীর পায়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলাম আনমনেই। একপা একপা করে এগোতে এগোতেই হঠাৎ কানে মৃদুস্বরে কোনো আওয়াজ ভেসে এলো। যতোদূর সম্ভব আওয়াজটা খাটের তল থেকেই আসছে। তাই দেরি না করে একরাশ আগ্রহ নিয়েই খাটের নিচে ঝুঁকে তাকালাম আমি। একটি মাঝারি সাইজের বুলডগ খাটের তলায় আরাম করে কিছু একটা খাচ্ছে বোধহয়। যা দেখে মুহুর্তেই কলিজা কানা হয়ে যাবার উপক্রম হয়ে দাঁড়ালো আমার। মুখ ফসকে একটু উচ্চস্বরেই বলে বসলাম,
----- "আ কি, কুত্তা....!"
আমার কথাটা হয়তো বেশ ভালো মতোই শুধল বুলডগটার কানে। নিজের গোলগাল চোখ দুটো তৎক্ষণাৎ আমার ওপর নিক্ষেপ করেই নিজের লাউডস্পিকার মার্কা গর্জন ছেড়ে বসলো সে,
----- "ভাউউউ.....ভাউউউ ভাউউউ.....!"
তার লাগাতার চিৎকারে কেউ হন্তদন্ত হয়ে হয়তো ছুটে এলো ঘরে। তবে সেদিকে বিন্দুমাত্রও হুশ নেই আমার। রুহ কাঁপানি ফিলিংস নিয়ে মিলখা স্টাইলে দৌড় মারবার উদ্দেশ্যে, "আম্মুউউউ গো....কুত্তায়ায়ায়া....." বলে আর্তনাদ করলাম আমি। স্লিপারি ফ্লোরে দৌড়তে গিয়ে বেকায়দায় ধপাস করে স্লিপ কেটে হুমরি খেয়ে পড়লাম কারো ওপর। চোখ সরষে ফুল দেখার দরুন মানুষটার মুখটাও ঠিকঠাক ফ্রেমেবন্দী করা হলো না। তাকে নিয়েই ফ্লোরে বিশ্রীভাবে শব্দ করে পড়তে হলো আমার। ভয়ে কুঁকড়ে উঠে মানুষটার উন্মুক্ত বুকেই পড়ে রইলাম আমি। ততক্ষণে নিত্য আপুও ছুটে এসেছে উপরে। আমাদের এভাবে ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে দেখে কপালে হাত রেখে বিস্মিত কন্ঠে আপু বলল,
----- "হায় আল্লাহ! কিসব দেখছি আমি? ভাইয়া, অনন্যা! তোমরা এভাবে পড়ে গেলে কিভাবে?"
আপুর কন্ঠে হুশ ফিরে এলো আমার। বন্ধ রাখা চোখদুটো চট করে খুলে তাকাতেই আরেক দফা ধাক্কা খেলাম আমি। বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে মানুষটার ভেজা মুখশ্রীর উদ্দেশ্যেই বলে বসলাম,
----- "আপনি!"
#চলবে__________________
( গঠনমূলক মন্তব্য করবেন আশা করি। এভাবে লেখার ইচ্ছেটা মাটিচাপা পড়তে চাইছে।)