ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

২১তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-২১♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

"চলতি সময়, থমকে দাঁড়ায়

জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি হায়,

তোমার ওই হাত ধরতে চাই,

ফাগুন হাওয়ায়!

কি মায়ায়, কোন সে নেশায়?

বারেবারে মন ছুঁতে চায়,

চেনা-মুখ ঘুরপাক খায়

চোখের পাতায়....

আমি বারবার বহুবার বহুবার

তোমাকে চাই,

আমি বারবার হাজারবার

তোমাকে চাই...!"

গিটারের টিউনের ছন্দে সুর মিলিয়ে এটুকু গাইবার মাঝেই দু'হাতে দুটো কফি মগ নিয়ে হাজির হলো রুশো। ব্ল্যাক সেইডের মগটা অগ্নির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

----- "ব্রো, তোমার কফি!"

অগ্নি স্মিত হেসে কফি মগটা হাতে নিলো। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। মেঘেরা চরম পর্যায়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে থেকে থেকেই আলোর প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। ভেজা বাগান, ভেজা মাঠ, ভেজা শহর সব কিছুই কেমন যেনো ঝিমিয়ে আছে আজ। প্রকৃতির এমন ঘুমুঘুমু ভাবভঙ্গিতে হঠাৎ করেই আনচান করতে শুরু করলো অগ্নির মন। কফি মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে লম্বা একটা চুমুক বসালো সে। রুশো চট করে বিছানায় উঠে গুটিসুটি মেরে বসলো ভাইয়ের পাশে। পিংক কালারের কফি মগটা টেবিলে রেখে হাত গুটিয়ে নিলো কিছু সময়ের জন্য। অগ্নি সরু চোখে তাকিয়ে বলল,

----- "ঠান্ডা হয়ে যাবে কফিটা, একেবারে খেয়ে নে।"

রুশো মাথা চুলকতে চুলকতে হাসলো। বলল,

----- "ওটা তো কফি নয় ব্রো।"

----- "তো?"

----- "বাড়তে বাচ্চোকা প্ল্যান, কমপ্ল্যান!"

অগ্নি আকস্মিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো খানিকটা। মুখে ধরে রাখা কফিটা তৎক্ষণাৎ গিলে নিলো বিষম খাবার ভয়ে। পর মুহুর্তে গোলগাল চোখ করে প্রশ্ন ছুড়লো,

----- "হোয়াট দ্য! তুই কফি ছেড়ে কমপ্ল্যান খাওয়া শুরু করলি কবে থেকে?"

রুশো আরো খানিকটা চেপে এলো। ভাইয়ের গায়ে গা ঘেঁষে বসে হাতের একটা আঙুল উঁচু করে বলল,

----- "ফ্রম টুডে ব্রো! একচুয়ালি হয়েছে কি বলো তো! এতোদিন ওয়েট করলাম, এতোসব উদাম মার্কা ঝুলাঝুলি, লাফালাফি করলাম তাও রেজাল্ট বরাবরের মতোই আ বিগেস্ট জিরো।

ইউ নো না তুমি আমার থেকে গুণেগুণে ওয়ান পয়েন্ট টু ইঞ্চ লম্বা? অথচ আমি দেখো সেই ফাইভ ফুট এইট ইঞ্চিতেই আটকে রইলাম। তোমার সমান লম্বা হতে হবে তো নাকি? ওদারওয়াইজ সবাই তো 'পুচকু' বলেই ক্ষেপাতে থাকবে।"

অগ্নি কিছুক্ষণ স্থির চোখে চেয়ে হঠাৎ করেই দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়লো। ঘর কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে এক পর্যায়ে রুশোর কাঁধে হাত রাখল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

------ "এই বয়সে কমপ্ল্যান খেয়ে লম্বা হবি? ওরে ব্যাটা, তুই আমার থেকে গুণেগুণে ১ বছর ১১ মাসের ছোট। বড় ভাই হিসেবে তোর থেকে একটু হলেও লম্বা হওয়াটা আমার মৌলিক অধিকার!"

মুখ ফুলিয়ে দু'হাত ভাঁজ করে বসলো রুশো। তার ভাবখানা এমন যেন কতশত প্রচেষ্টা করে চলেছে সে ভাইয়ের সমান লম্বা হবার জন্য। যে করেই হোক প্রোবাবলি পাঁচ ফুট সাড়ে নয় ইঞ্চি লম্বা তার হওয়া চাই'ই চাই।

------ "দ্যটস নট ফেয়ার ব্রো, আই ওয়াট টু বি মোর টলার লাইক ইউ এন্ড নীবিড় ব্রো! আই থিংক আমার হাইটের জন্যই এটম বোম্ব এতো সাহস পায়। ভাবে আমি তো দুধ পিতা বাচ্চা, যা ইচ্ছা তাই করুক কিছুই বলতে পারবো না হু!"

মগে দ্বিতীয় বারের মতো চুমুক বসানোর মুহুর্তে আচমকাই তালুতে গিয়ে বিঁধল কফি। বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলো অগ্নি। রুশো চমকে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে গ্লাসে পানি ঢালল, এগিয়ে দিতেই এক নিঃশ্বাসে অর্ধেকটা নিঃশেষ করে ফেলল সে। গলায় হাত রেখে আরো দু-তিনবার কেশে নিয়ে বলল,

----- "এই এটম বোম্ব'টা আবার কে, যে তোকে চুচু চুষা বাচ্চা ভাবে?"

ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল রুশো,

----- "কে আবার? ওইযে, ময়দা সুন্দরী! ছুটকির বেস্টু। মেয়ে তো নয় যেনো ধানিলঙ্কা! উফফফ সে কি তেজ! ঝলসে যাওয়ার মতো তেজ!"

অগ্নি ফিক করে হেসে ফেললো তৃতীয়বারের মতো। বাকি কফিটুকু শেষ করবার তাগিদে মগে চুমুক বসিয়ে বলল,

----- "তোকে লাগেই ওরকম! কখনো উড়ন্ত চাড্ডি তো কখনোও চাওমিন গায়ে ফেলে পাউডার বানাস হাড্ডি! মেয়ে কি তোকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে ভাবছস?"

বিনিময়ে কাঁদোকাঁদো মুখ করে তাকালো রুশো। বিশেষ পাত্তা না দিয়ে কমপ্ল্যানে ভর্তি মগটা টেবিল থেকে তুলে রুশোর দিকে এগিয়ে ধরে অগ্নি বলল,

----- "নে শেষ কর! ট্রাই মার, পাইলেও পাইতে পারস অমূল্য রতন।"

আবারও মুখ ফুলিয়ে ঠোঁট উল্টালো রুশো। মগটা ধরে মুখের কাছে এনে স্মেল শুঁকতেই নাক কুঁচকালো সে। অগ্নি আড়চোখে দেখলো রুশোর মুখভঙ্গি। বালিশে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসতে বসতে বলল,

------ "একটা কথা কি জানিস, আমাদের সিকুয়েন্সটা

কিছুটা স্মৃতিসৌধের এক পিঠের মতো। স্মৃতিসৌধ যেমন নিচু থেকে উঁচু আকারে সজ্জিত, ঠিক তেমনই ছোট থেকে ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করাটা আমাদেরও কাম্য। সো, বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে আমি টলেস্ট হবো, দেন তুই হবি টলার, বাকি থাকলো অনু। ও নিঃসন্দেহে টল! এখন তুই আমায় দেখে আফসোস না করে, প্রাউড ফিল কর অনুর থেকে লম্বা হওয়ার। বুঝলি?"

রুশো কয়েক সেকেন্ড অগ্নির বলা পুরো বাক্যটা নিয়ে নাড়াচাড়া করলো। ভাবলো "আসলেই তো! এমনটা তো আগে ভেবে দেখিনি!"

------ "ইয়াপ ব্রো, ইউ আর রাইট! তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছ? আমাদের ব্রাদার-সিস্টার সিকুয়েন্স অনুযায়ী ছুটকি সবচেয়ে খাটো হলেও, বাকি মেয়েদের সাথে তুলনা করলে ওকেই পদবি দেওয়া হয় খাম্বা!"

একথা বলেই হেসে কুটিকুটি হতে লাগলো রুশো। তাল মিলিয়ে হাসলো অগ্নিও। ফাঁকাফাঁকা বাড়িটার দিকে এক নজর বুলিয়ে বলল,

------ "অনুকে আরেকবার ফোনে ট্রাই কর তো রুশো, কল ঢুকে কিনা দেখ! যে নেটওয়ার্ক বনে! উফফফ! কাল দুপুর থেকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছেনা ওদের কাউকেই!"

রুশো চটজলদি ড্রয়ার থেকে ফোনটা বের করলো। অবাক কন্ঠে বলল,

----- "হোয়াট আর ইউ সেয়িং ব্রো? কাল থেকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না! আমি তো আবার তোমার পানিশমেন্টের চক্করে ফোনটাও জমা দিয়ে বাসায় গিয়েছিলাম। তাই আর কল করার চান্সও পাইনি। ভেবেছিলাম তুমি কথা বলেছ ছুটকির সাথে।"

অগ্নি মাথাটা ডানে-বামে নাড়াল। সেই সময়ই রুশো ফোনে ট্রাই করলো বোনকে। একবার, দুবার, তিনবার! প্রতিবারই বিরক্তিকর মেয়েলী কন্ঠে সেই একই বাক্য উচ্চারিত হলো ওপর পাশ থেকে, "দ্য নাম্বার ইউ ডায়ালড, ইজ কারেন্টলি আনরিচেবল!" রুশো হতাশ ভঙ্গিমায় কান থেকে ফোন নামিয়ে রাখলো। ছোট্ট করে বলল,

----- "সুইচট অফ, এগেইন!"

অগ্নি কফি মগের ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল,

----- "আচ্ছা বাদ দে, নেটওয়ার্ক নেই অথবা চার্জ শেষ হয়ে গেছে হয়তো। তুই টিভিটা অন কর, অনেকদিন থেকে নিউজ দেখিনা। দেশটার যে কি হাল, খবরই নেওয়া হয়নি বহুদিন।"

রুশো মাথা নুইয়ে রিমোর্ট চেপে এক নিঃশ্বাসে কমপ্ল্যানের মগটা খালি করাবার উদ্দেশ্যে উঠেপড়ে লাগলো। মূলত নিউজ আর্টিকেল বিষয়গুলোতে বরাবরই ইন্টারেস্ট কম তার। যেদিনই টিভি অন করে কার্টুন দেখতে বসে ঠিক সেই সময়ই দেশের কোথাও ঘটে যাওয়া এক বিশ্রী ঘটনার হেডলাইন চোখে পড়ে তার। এতো আইন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দূর্নীতি পিছু ছাড়ে না দেশের, ব্যাপারটায় চরম ক্ষিপ্ত হয়ে যায় রুশো। তবে অগ্নি বেশ আগ্রহী চোখে ভ্রু কুঁচকালো। টিভির বড় পর্দায় ভেসে উঠা নিউজ রিডার্সের গলায় তাজা খবর শুনতে খাঁড়া করলো কান।

"রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে আয়োজিত সুন্দরবনে ট্যুর যাত্রায় নিখোঁজ দেশের অন্যতম মধ্যমনি "সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়"। জানা যায়, "আয়ানা জাহান অনন্যা" নামক দলছুটা একজন স্টুডেন্টকে খুঁজতে একাই বেরিয়ে পড়েন তিনি। অতঃপর বনের গহীনে হারিয়ে যান দুজনই। এ বিষয়ে ট্যুর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ কমিশনারেরা দলবেঁধে খোঁজ চালাচ্ছেন। তবে আশংকা করা যাচ্ছে, বনে নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নগণ্য।"

নিউজের এটুকু কান অবধি পৌঁছতেই হাত থেকে কফি মগটা উল্টে পায়ে পড়লো অগ্নির। গরম-গরম কফির উত্তাপে ঝলসে গেলো পা। অথচ অগ্নি নির্বিকার, অনুভূতি শুণ্য হয়ে পড়েছে যেনো। রুশোর এতোক্ষণে হুশ হলো, অবিশ্বাস্য ভঙ্গিমায় আরেকবার নিউজটা কানে তুললো সে। মুহুর্তেই মাথাটা চক্কর মেরে উঠলো তার। রুশো স্থির দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। অগ্নি এখনও নির্বিকার, পায়ের ওপর কফি ঢেলে পড়ায় লালচে বর্ণ ধারণ করেছে তার ফর্সা পা।

----- "ব্রো, ইট ওয়াজ আ প্রাঙ্ক রাইট? আমি সবসময় তোমাদের সাথে প্রাঙ্ক করি তাই তুমি এসব ফেইক ফুটেজ বানিয়ে নিউজের মতো ইউটিউবে আপলোড করেছ তাইনা?"

রুশোর ধরা গলায় ছুঁড়ে মারা প্রশ্নে বিন্দুমাত্রও নড়চড় হলো না অগ্নির। শুধু ঠোঁট দুটো আলাদা করে মৃদুস্বরে বলল,

----- "ওটা পিসি নয় রুশো, টিভিতে ফেইক কিছু দেখানোর মতো ক্ষমতা আমার নেই।"

নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ঘরটায় অনেকটা বজ্রপাতের ন্যায়ই ঠেকলো খবরটা।

------ "নো নো, আই কান্ট বিলিভ দিস! এসব ফেইক নিউজ, ব্রো এই মহিলার চাকরি খেয়ে ফেলবো আমি, আই সোয়্যার!"

এমন আরো কিছু বাক্য আওড়াতে আওড়াতেই দু'হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো রুশো। চোখের কিনারায় বারবার করে ভেসে উঠতে লাগলো ফুটফুটে বোনটার হাস্যজ্বল মুখ। অগ্নি রোবটের মতো উঠে এসে হাতে কেঁচি নিলো। টিভির সাথে লাগানো তার'টার মাঝ বরাবর কেটে দিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে পুরল। আলনায় ছড়িয়ে রাখা শার্টটা গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল,

----- "টেনশন করিস না রুশো, ওসব গুঁজব! নীবিড়-অনন্যা, দুজনই ঠিক আছে। ফ্লাইট মিস হওয়ার আগে পৌঁছাতে হবে এয়ারপোর্ট, চল!"

রুশো নাক ফুলিয়ে চোখ তুলে তাকালো৷ ফর্সা নাকটা লালবর্ণ ধারণ করেছে তার। চোখে নোনাজলেরা বাসা বেঁধেছে একে-একে। ভাইয়ের দেওয়া আশ্বাসে সামান্য হলেও শান্ত হলো সে। দু'হাতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,

------ "শার্টটা উল্টো করে পড়েছ ব্রো, ঠিক করে নাও।"

_________________________________________

ভোরের সূর্য পূর্ব আকাশের চূড়ায় উঠতে শুরু করেছে। ঘড়িতে ঘন্টার কাটা ৮-৯ এর মাঝামাঝি অবস্থানে বিচরণ করছে বর্তমান। সূয্যিমামার উজ্জ্বল বর্ণে আলোকিত হয়ে রয়েছে বন। হরিন, বানর নিজেদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়েই দৌড় ঝাঁপ করছে এদিক থেকে ওদিক। নানান প্রজাতির পাখি উড়াউড়ি করছে মস্ত আকাশটায়। কাল রাতের ভয়াবহ মুহুর্তটা যেনো কোনো কালেই ঘটেনি এমন ধারা ভাবমূর্তি ধারণ করেই ব্যস্ত সকল পশুপাখি।

নীবিড়ের পা দুটো ঝিম ধরে গেছে। একইভাবে টানা এতোগুলো ঘন্টা বসে থাকার দরুন পা ঝিনঝিন করছে তার। তবু নড়বার বিন্দুমাত্র জোঁ নেই। মেয়েটা এমনভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে তাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে তাতে না ঘুমোবার সুযোগ পেয়েছে আর না পাচ্ছে একটু ক্যাপাসিটি নড়েচড়ে বসবার। নীবিড় ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে অনন্যার ঘুমন্ত মুখখানার দিকে তাকালো। বুকে মাথা রেখে কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা! ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে শান্ত করবার আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার মুহুর্তে নীবিড় আবিষ্কার করেছিলো, গভীর ঘুমে নিপাতিত হয়ে পড়ছে অনন্যা। চোখ খুলে আবারও বিপত্তি সৃষ্টি করতে পারে আশংকা করেই ডাকবার রিস্ক নেয়নি সে। হিংস্র বাঘমামার ডিনার সেড়ে স্থান ত্যাগ করার পরপরই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে নীবিড়। তবু সন্দেহ থেকেই যায়, বনে তো শুধু একটা-দুটো বাঘ নেই। গগণা মতে কম হলেও ১০০ ঊর্ধ্বে বাঘের বিচরণ থাকার কথা সুন্দরবনে। সেই হিসেবে ঘুমিয়ে পড়া হারাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল নীবিড়ের। প্রথমত ঘুমোলে ব্যালেন্স হারিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, দ্বিতীয়ত নিচে পড়ে যাওয়ার দরুন হাত-পা ভেঙে সোজা রেডিমেড ডিনারে পরিণত হবার নিশ্চয়তা। এতো দুশ্চিন্তা, রিস্ক নিয়ে ঘুমোনোটা নীবিড়ের পক্ষে সম্ভব ছিলো না কোনো কালেই। যার দরুন সারারাত অনন্যাকে নিজের বুকে শুইয়ে রেখেই নির্ঘুম প্রহর গুণে যায় সে।

নীবিড় এবার আরেকটু ঝুঁকে তাকালো। চোখের দৃষ্টি গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে চলল তার। ইশশস কি নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটার মুখ! ঘুমে কাঁত হয়ে নিচের ঠোঁটটা ফুলে উঠেছে কিছুটা। এলোমেলো চুলগুলো কপাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার। গালের এক পাশে চাপ পড়ায় মারাত্মক কিউট লাগছে মেয়েটাকে। নীবিড় এক-হাতে অনন্যার কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এদিক-ওদিক চেয়ে পা টান করার চেষ্টা চালালো। কেমন যেনো অবশ ভাব ধারণ করেছে পা দুটো। অনেক তো হলো এবার বরং অনন্যাকে জাগানো যাক, ফিরতে হবে তো নাকি!

নীবিড় যথারীতি মনস্থির করে সামান্য ঝাঁকাল অনন্যাকে। তবে লাভ বিশেষ হলো না। উপায় না পেয়ে কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হাঁক ছাড়লো সে,

------ "অনন্যা! হেই, আয়ানা? উঠো....সকাল হয়ে গেছে। ফিরতে হবে আমাদের!"

সাদা পোষাক পরিহিত তালগাছের সমান ভূতটার পেছনে লাগামহীন দৌড়ে চলেছি আমি। একবার হাতের নাগালে পাই শুধু তারপর দেখাব থাপ্পড় কতো প্রকার এবং কি কি! ব্যাটায় আমাকে ভয় দেখাতে এসেছে, শালার এক একটা হাড্ডি পাউডার বানাবো আমি। সেই পাউডারগুলো ঢালবো রাত্রির মেকআপ বক্সে। রাত্রি সেই পাউডার মুখে মাখবে, ভূত বাবাজি রাত্রির মতো পেত্নীর গাছে চড়ে ভয়ে হিশু করে দিবে, হু!

এসব উদ্ভট টাইপ চিন্তা-ভাবনার মাঝে কানে পৌঁছাতে লাগলো এক ভিন্ন গলার আওয়াজ৷ মানুষটা ক্রমাগত আমার নাম আওড়ে চলেছেন। ব্যাস, ধীরে ধীরে চারিপাশ ঘোলাটে হয়ে আসতে লাগলো৷ ভূটটা হাতের নাগালের বাহির থেকে ইনফিনিটি দূরত্ব অতিক্রম করে হারিয়ে গেলো মুহুর্তেই।

আমায় কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে চোখ পিটপিট করতে দেখে আশাভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন নীবিড় ভাইয়া।

------ "হাইলা! ব্যাপারটা কি হলো? ব্যাটা কই পালালো এটুকু সময়ের মধ্যেই?"

সবেমাত্র ঘুম ভেঙে উঠা মানুষের মুখে এমন ধারা কথাবার্তা শুনায় চোখ ফুটবল বানিয়ে তাকালেন নীবিড় ভাইয়া। অবাক কন্ঠে বললেন,

------ "কে পালাচ্ছে? কার কথা বলছ তুমি?"

নীবিড় ভাইয়ার প্রশ্নে ভ্রম কাটলো আমার। চারিদিকে নজর ঘুরিয়ে থতমত খেয়ে চুপ করে রইলাম আমি।

তারমানে এতোক্ষণ মরার মতো ঘুমোচ্ছিলাম? আর ওই ভূতটা! জাস্ট একটা স্বপ্ন ছিলো?

যাহ শালা! সারারাত ঘুমিয়ে কাটালাম কিভাবে? আর এতো তাড়াতাড়ি সকাল হলোই বা কিভাবে? ওমাগো, ফিলিং ঠু মাচ মাথা ঘুরিং ঘুরিং!

নীবিড় ভাইয়া খানিকটা আন্দাজ করেই কপাল কুঁচকালেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

------ "স্বপ্ন দেখছিলে?"

চুপসে যাওয়া মুখ নিয়েই মাথা ঝাঁকালাম আমি।

----- "তো কি দেখছিলে?"

----- "আমি ভূতের পেছনে লুঙ্গি খুলে, হাতে জুতো নিয়ে দৌড়চ্ছি!"

মুহুর্তেই বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন নীবিড় ভাইয়া। নিজের লাগামহীন কথাবার্তায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম আমি নিজেও। ইশশ! আমি এতো বোকা কেনো? এতো উদ্ভট একটা স্বপ্নের কথা কাউকে বলা যায় নাকি? তাও আবার এই মানবরূপী যমবাবাজীর সামনে! হাও স্টুপিড ইজ দ্যট!

বড়সড় কোনো ধমক খাওয়ার আশংকা করে আগেভাগেই চোখমুখ কুঁচকে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলাম আমি। এক, দুই, তিন.....এভাবে পাঁচ সেকেন্ডের মতো নীরবতা অতঃপর এক ঝংকার তোলা হাসি। আচমকাই চমকে উঠলাম আমি সেই হাসির তাড়নায়। নীবিড় ভাইয়া হাসছেন। মন খুলে হাসছেন। হাসতে হাসতে চোখদুটো বুজে ফেলেছেন উনি। একদম শেইপ মতো ঝকঝকে দাঁতগুলো সূর্যের আলোয় চকচক করছে মানুষটার। আমি সেই হাস্যজ্বল সুদর্শনের হাসিতে মত্ত হলাম। মুগ্ধতা ভরা চোখে চেয়ে রইলাম পলকহীন। ঠোঁট দুটো পরস্পর হতে আলাদা হয়ে আনমনেই উচ্চারণ করে বসলো,

------ "মা-শা-আল্লাহ!"

#চলবে___________________

(পার্ট আরো বড় হতো, মাঝপথে লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন