ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

২৩তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-২৩♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

স্তব্ধ পরিবেশের মাঝে অচেতন আমি। চারিদিকে নিকষকালো অন্ধকার। দূর কোনো এক জগৎ থেকে মৃদুস্বরে আওয়াজ ভেসে আসছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। উফফফফ, কি ভীষণ যন্ত্রণা! কোনো এক অজানা থেকে ক্ষীণ আলো উঁকিঝুঁকি মারতে চাইছে। চাইছে অন্ধকারের কালো চাদর ছিন্ন করে নিজের প্রতিফলন ঘটাতে।

চোখমুখে কোনো তরল পর্দাথের পতনে কপাল কিঞ্চিৎ ভাঁজ উঠে উঠলো আমার। চারিদিক থেকে ঘন কালো রঙটা মিইয়ে আসতে শুরু করলো। পিটপিট করে পলক ঝাপটে তাকাতে চেষ্টা চালালাম আমি। পাশাপাশি ঝিমি ধরা মাথার বাম পাশটায় চিনচিন করে উঠলো। পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাতে পুরো এক মিনিটের মতো সময় নিলো।

এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ! পুরো পাঁচ পাঁচটা জীবন্ত সাপ ফণা তুলে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে আমার পানে! মুহুর্তেই চোখ ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো আমার।

----- "আয়ায়ায়ায়ায়া......!"

করে এক তীব্র চিৎকার ছেড়ে হাতের ওপর ভর রেখেই কিছুটা দূর ছিঁটকে সড়ে এলাম আমি। আশ্চর্য! সাপগুলো এগোচ্ছে, ঠিক আমায় টার্গেট বানিয়েই এগোচ্ছে তারা! কাঁদায় লেপ্টানো জামা-কাপড় নিয়েই উঠে দাঁড়াবার প্রচেষ্টা চালালাম আমি৷ তবে বিশেষ লাভ করে উঠতে পারলাম না। শক্তি শুণ্য শরীরটা বেইমানি করলো ফের। হাটু ভেঙে পিচ্ছিল রাস্তাটায় আবারও পড়ে গেলাম আমি। সাপগুলো এগোতে এগোতে এতোটাই কাছে চলে এসেছে যাতে মৃত্যু নিশ্চিত বলার প্রশ্ন রাখে না। আমি দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেললাম। ক্রন্দন মিশ্রিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বললাম,

------ "আল্লাহর দোয়াই লাগে, তোরা আমায় মারিস না! প্লিজ! আমার এখনোও বিয়ে হয়নি, আন্ডা-বাচ্চা হয়নি, তাদের বিয়েও হয়নি, নাতি-নাতনী হয়নি! জীবনে এতো এতো অপূর্ণতা নিয়ে মরতে চাই না আমি, প্লিজ মারিস না আমারে।"

অদ্ভুত! সাপগুলো এগোলো না আর। থমকে দাঁড়িয়ে নিজেদের মাঝেই চাপা গলায় কিছু একটা নিয়ে গভীর আলাপে মগ্ন হলো। আমি চমকে উঠলাম আচমকাই! সাপেরা কেমন মানুষের মতো কথা বলছে! একটা মেয়েলি গলার স্বর, আর বাকিগুলো পুরুষালী! ওহ নো! আমি তো এই কন্ঠগুলো চিনি। তবে কি সাপেরা মানুষের কন্ঠ চুরি করে কথা বলার ক্ষমতাও রাখে?

যা শালা! এরা আবার হিন্দি সিরিয়ালের মতো ইচ্ছাধারী নাগ-নাগিন নয় তো? কিন্তু, আমার জানা মতে ইচ্ছাধারী নাগ-নাগিনেরা অন্যের রূপ ধারণ করতে পারে। অথচ এরা? রূপ না বদলে সাপের আকারে থেকেই কথা বলছে, তাও আবার আমার পরিচিত মানুষগুলোর কন্ঠস্বর চুরি করে! হে মাবুদ, রক্ষা করো!

আল্লাহর নিকট আশ্রয় চেয়ে বিড়বিড় করতে করতেই হাত দুটো সরিয়ে নিলাম মুখ থেকে। বন্ধ চোখ দুটো দোয়া-দরুদ আওড়াতে আওড়াতে মেলে তাকালাম এবং প্রায় সাথেসাথেই ছাড়লাম আরেক তীব্র তীক্ষ্ণতা বিশিষ্ট চিৎকার ছাড়লাম,

------ "আম্মুউউউউউ.......!"

সাপগুলো জিহ্ব খাঁড়া করে নিজেদের হিংস্র, বিষাক্ত চাহনি নিক্ষেপ করলো আমার ওপর। এদিকে আমি প্রায় হার্ট অ্যাটাক করতে বসেছি! এসব কি দেখছি আমি? অর্ধেক সাপ, অর্ধেক মানুষ! কিন্তু...ওরা যদি সত্যিই ইচ্ছাধারী নাগ-নাগিন হয়ে থাকে তবে মাথাটা কেন সাপের রেখে বডি মানব রূপে চেঞ্জ করেছে? আমি তো একবার সিরিয়ালে দেখেছিলাম, নাগ-নাগিনেরা সাপ রূপ বদলে এক সম্পূর্ণ মানব রূপ নিতে পারে অন্যথায় অর্ধেক রূপ প্রদান করে অঙ্গ-প্রতঙ্গদের। এবং তাদের এমন ফিফটি ফিফটি রূপ ধারণের মাঝে মডেলটা হয় ভিন্ন। মাথা হতে কোমড় পর্যন্ত যেমন মানব রূপী তেমনই কোমড় থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত লেজবিশিষ্ট হয়! যার দরুন বাস্তবে এমন উদ্ভট ভিন্নতা মোটেই সহ্য করে উঠতে পারছিনা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে, তার ওপর শক্তিহীনতা! হে আল্লাহ, এ কোথায় এনে ফেললে আমায়?

________________________________________

------ "ভাইয়া এসব কি হচ্ছে? অনন্যা আমাদের সাপ ভেবে ভয় পাচ্ছে কেন?"

নীবিড়ের ভাবুক ভঙ্গি। বেশ গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছে সে। প্রফেসরেরা তাড়া মারছেন, দ্রুত ফিরতে হবে শিপে। প্রেস-মিডিয়া এতোক্ষণে পুরো দেশে নিউজটা ভাইরাল করে ফেলেছে। ফ্যামিলি মেম্বাররাও নিশ্চয়ই এই খবর পেয়ে দুশ্চিন্তায় কাবু হয়ে পড়েছে।

----- "নীবিড়, ফেরার পথে কি সাপ নিয়ে কোনো ক্রাইসিসে পড়েছিলে। তবে কি সেই জন্যেই সেন্সলেস হয়ে গেছে মেয়েটা?"

প্রফেসর সালামের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে মাথা ঝাঁকায় নীবিড়। একহাতে কপালে স্লাইড করতে করতে বলে,

----- "ইয়াহ! ইউ আর রাইট স্যার! আই থিংক ওর মাথার ঠিক নেই। শিপে কোনোরকমে নিয়ে গিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখতে হবে!"

একথা বলে নীবিড় একধাপ আগায়। অনন্যা একইভাবে ভয়ে ভুলভাল বকবক করে চলেছে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে উঠতে চাইছে, ফের শরীরের কাছে পরাজিত হয়ে মাটিতেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। নীবিড় ইশারায় বাকিদের সামনে থেকে সরে যেতে বলল। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে আড়ালে চলে গেলো নিজেও। নিঃশব্দে, খুবই সাবধানে পা ফেলে অনন্যার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো৷ চোখ বুজে এক নাগাড়ে চাপা আর্তনাদ করতে থাকা মেয়েটার মুখ থেকে কিছু বাক্য কানে এলো,

------ "হে বিষধর অর্ধ মানবী নাগ-নাগিন, বিশ্বাস করুন আমি নাগমণির ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না। শুরু থেকে শেষ কিচ্ছুটি না। আমায় ছেড়ে দিন, আমি এক অবলা আন্ডাবাচ্চা, আমার কোনো দোষ নেই গো!"

এসব উদ্ভট অর্থহীন কথাবার্তা শুনে বারকয়েক কপাল চাপড়ালো নীবিড়। মনে মনে জোরসে ধমকে দিয়ে নিলো সাথে। পরিস্থিতি স্বাভাবিকতায় ফেরাতে পকেট থেকে রুমাল বের করে ঝটপট অনন্যার চোখ ঢেকে ফেললো। লাফিয়ে উঠার পূর্বেই কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,

----- "অনন্যা, ডোন্ট বি প্যানিক! আমি নীবিড়। শান্ত হও!"

কানের কাছে নীবিড় ভাইয়ার গলা পাওয়া মাত্রই শান্ত হয়ে যাই আমি। চোখে হঠাৎ করেই রুমাল বেঁধে ধরা মানুষটি তবে নীবিড় ভাইয়া। একথা বুঝে আসতেই ভয়টা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে উদ্যত হয়, তবু কোথাও না কোথাও থেকেই যায়। সাপগুলো কি চলে গেলো তবে? সাড়াশব্দ পাচ্ছিনা যে! আর নীবিড় ভাইয়াই বা চোখ কেনো বাঁধলেন আমার? কোথায় ছিলেন উনি এতোক্ষণ?

------ "লিসেন, এখানে কোনো সাপ-টাপ নেই, আমি ওদের তাড়িয়ে দিয়েছি। ইউ আর টোটালি সেইফ নাও, বাট তোমার চোখ বাঁধছি অন্য কারণে....."

------ "কেন কারণে?"

------ "শাট আপ! পুরো কথা শেষ করার আগেই কথা বলো কেনো তুমি? চুপ! একদম চুপ! আর একটা সাউন্ডও যেনো মুখ থেকে না বের হয়। তোমার মনে যতো কোয়েশ্চন আছে সব শিপে ফিরে গিয়ে করবে। নাও বি কোয়াইট!"

একথা বলেই একপ্রকার ঝড়ের গতিতে আমায় নিজের কোলে উঠিয়ে নিলেন নীবিড় ভাইয়া। এমন আকস্মিক ঘটনায় হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। একে চোখের ওপর রুমাল বেঁধে রাখায় চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তারওপর এভাবে কোলে উঠিয়ে নেওয়া! ভাবখানা এমন হয়ে দাঁড়ালো, যেনো মস্তিষ্কের কোনো এক কোণায় কুটকুট করে কামড় বসাচ্ছে কোনো কীট! বুকের ভেতর ক্রমাগত ড্রাম বাজছে। কি তীব্র শব্দ তার! শ্বাস-প্রশ্বাস উত্তপ্ত অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছে। ঘনঘন নিসৃত হয়ে জানান দিচ্ছে অজানার। কি অদ্ভুত অনুভূতি! দহন সৃষ্টি করছে ভেতরটায়। মানুষটার উষ্ণ বুকে কি আশ্চর্যরকম প্রশান্তি! শিরা-উপশিরায় বিদ্যুৎ এর ন্যায় স্রোত বইছে, থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে মন! উনার বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে ধেয়ে চলার যাত্রাটা বড্ড ভিন্নরকম ঠেকছে। কেমন যেনো টক-ঝাল-মিষ্টি টাইপ ভাব! মাঝেমাঝে ভয় লাগছে, নাগ-নাগিনগুলো লেজ গুটিয়ে পালালো কিভাবে? উনিই বা কোথায় ছিলেন এতোক্ষণ! আর....তখনকার ওই সাপটা! ও মাই গড! এই হাতেই তো সাপটার মাথা চেপে ধরে রেখেছিলেন নীবিড় ভাই!

_______________________________________

আধঘন্টা মতো যাত্রা, অনন্যাকে কোলে নিয়ে হেঁটেই সমাপ্তি ঘটালো নীবিড়। বাকিরা আগে আগে হাঁটছিলো, নিঃশব্দে, নিস্তব্ধতা বজায় রেখে। শিপে ফিরে সর্বপ্রথম মুখ দর্শন হলো জারার। অফিসারেরা নীবিড়-অনন্যাকে খুঁজে পেয়ে টেক্সট করে পাঠিয়েছিল অন্য প্রফেসরদের। সেই শুনেই বোধহয় আগ বাড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো মেয়েটা। নীবিড় ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো। আরো কয়েকধাপ এগিয়ে যাওয়ার মুহুর্তে হঠাৎ করেই চিৎকার ছেড়ে বসলো জারা,

------ "হোয়াট দ্য হেল! নীবিড়, তুমি ওই বিচটাকে কোলে উঠিয়েছো কেন? হেই ইউ, কোন সাহসে ওর কোলে উঠেছ তুমি? লজ্জা করে না? নামো বলছি!"

নীবিড় চোখ গরম করে তাকালো জারার পানে। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের গায়ে হাত উঠাতে ইচ্ছে হচ্ছে তার! কিন্তু সেই শিক্ষাটা কখনোই বাবা-মা'র থেকে পায়নি সে। অন্তত জারার ক্ষেত্রে তো নয়ই! নীবিড় নিজেকে যথাসাধ্য স্বাভাবিক রাখতে চেয়েও ধমকে উঠলো,

------ "কেমন মেন্টালিটি নিয়ে থাকো তুমি জারা? দেখতে পারছ না মেয়েটা সিক? আমরা যে সশরীরে ফিরেছি তার জন্য এটলিস্ট আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করো, আদারওয়াইজ গেট লস্ট!"

জারার হঠাৎ করেই নিজের গালে কষিয়ে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করলো! ধ্যাত! কেনো যে নিজের রাগটাকে কন্ট্রোলে রাখতে পারে না? এই অনন্যা মেয়েটাকে যে বিন্দুমাত্রও সহ্য করতে পারেনা সে। এককথায় সুবিধেরই ঠেকে না। কেমন যেনো একটা সন্দেহ সন্দেহ গন্ধ পায় জারা। কোনো খারাপ কিছু ঘটার তীব্র সন্দেহ!

নীবিড় জারাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অনন্যাকে কেবিনের বিছানায় শুইয়ে দিলো। কি হলো হঠাৎ করে মেয়েটার? আবারও সেন্সলেস হলো না তো? নীবিড়ের ডাকে প্রফেসরেরা চটজলদি ডক্টরকে নিয়ে এলেন। নাহ সেন্সলেস হয়নি, বেকায়দায় ঘুমিয়ে পড়েছে সে। নীবিড় নিশ্চিন্তে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ থেকে সাবধানে রুমালটা খুলে পাশে রাখলো। অনন্যার ঘুমন্ত ফোলাফোলা চোখদুটো নজরে পড়তেই ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো তার। ভাজ্ঞিস অসম্ভবটাকে সম্ভব করে ঘুমিয়ে পড়লো মেয়েটা! ইঞ্জেকশন দেওয়াটা সুবিধেরই হলো তবে! কয়েকঘন্টা টানা ঘুমের প্রয়োজন আছে ভীষণ। শরীরটা বড্ড দূর্বল তার!

_________________________________________

কানে হেডফোন গুঁজে বেশ আয়েশ করে শুয়ে ছিলো নিত্য। খোলা জানালার পর্দা উড়িয়ে মৃদুমন্দ বাতাস প্রবেশ করছিলো ঘরে। খোলা চুলগুলো থেকে থেকেই কপালে এসে পড়ছিলো। দুষ্টুমিষ্টি খেলায় মত্ত হয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে চলছিলো আনমনেই।

এমন শীতলতায় ঘেরা মুহুর্তে হঠাৎ করেই এক তীব্র শব্দে ফোনটা বেজে উঠলো তার। নিত্য একপ্রকার লাফিয়ে উঠেই কলটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে কম্পিত গলায় সাদনান সাহেব বলে উঠলেন,

----- "নিত্য মা রে, নীবিড়....তোর...ভাই.....!"

নিত্যর বুকটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠলো। কি হলো হঠাৎ! বাবার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেনো? কি হয়েছে তার ভাইয়ের? নিত্য তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "বাবা, কি হয়েছে ভাইয়ার? তোমার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেনো?"

------ "তুই নিউজ চ্যানেল এখনও দেখিস নি নিত্য? নী...নীবিড় কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না রে মা! গহীন বনে হারিয়ে গেছে ও!"

একথা বলেই ওপাশ থেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সাদনান সাহেব। নিত্যর হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে গিয়েও সামলে নিলো। সম্পূর্ণ বিশ্বাসের গলায় বলল,

------ "বাবা, ইউ মাস্ট বি জোকিং রাইট?"

------ "কি বলছিস তুই নিত্য? নিজের ছেলের এমন একটা খবর নিয়ে কোনো বাবা মিথ্যে বলতে পারে?"

------ "ওহ কাম অন বাবা, তুমি তো জানোই ভাইয়ার যখন তখন যেখানে সেখানে হারিয়ে যাবার রোগ আছে। যেকোনো জায়গাতে গেলেই স্পেস নিতে হঠাৎ হঠাৎ দলছুটা হয়ে পড়ে সে। আর এই প্রেস-মিডিয়া তিল কে তাল বানাতে বরাবরই ওস্তাদ! ওদের এসব ভুলভাল নিউজ কেনো যেনো মাথায় নাও তুমি? উফফফফ!"

------ "নিত্য, বি সিরিয়াস! নীবিড় আজ নয়, কাল দুপুর থেকে নিখোঁজ। খবরের হেড লাইনে বেরিয়েছে "আয়ানা জাহান অনন্যা" নামের একটা মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে সে'ও হারিয়ে গেছে বনে। এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ওদের।"

নিত্যর ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো মুহুর্তেই। ভাবনাটাকে নিজের মাথায় পুরতে ধরেছিলো মাত্র। ঠিক সেই মুহুর্তেই ফোনটা টুং করে শব্দ বেজে উঠলো তার। নিত্য ফোনটাকে কান থেকে নামিয়ে ধরলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এবং প্রায় সাথেসাথেই একগাল হেসে বাবার উদ্দেশ্যে বলল,

------ "আমার ভাই যে সুপারম্যান একথা কি তোমায় আলাদা করে লিখে দিতে হবে বাবা? প্রেসার না বাড়িয়ে নিশ্চিত থাকো তো, একদম ঠিক আছে ওরা! হান্ড্রেড অন হান্ড্রেড!"

_________________________________________

শিপের রেলিং চেপে ধরে হাওয়ায় গা ভাসাচ্ছে নীবিড়। ভাজ্ঞিস নেটওয়ার্ক স্বল্পতা বেশি হলেও কাজে দিয়েছে! বাসায় নিশ্চয় তুলকালাম কান্ড ঘটতে ধরেছিলো। মেসেজটা সময় মতো না পৌঁছালে বড্ড ঝামেলা পোহাতে হতো তাকে। নীবিড় চোখ দুটো বুজে লম্বা করে শ্বাস টানলো। গোখরা সাপটাকে চেপে ধরা দেখেই ফিট লেগেছিলো মেয়েটা, যদি কামড়ে দিতো তখন তো খুঁজেই পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়তো তাকে। এতো উইক কেনো যে মেয়েটা! একে তো মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জানের ওপর খেলে সাপটাকে মারল তারওপর সেন্সলেস তাকেই কোলে উঠিয়ে এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালো। এতোকিছুর পর তাকেই শেষ পর্যন্ত অর্ধ মানবদেহী নাগ বানিয়ে ফেললো সে! হাও রুড! নীবিড় চাইলো কড়া গলায় কয়েকটা ধমক মেরে নিজের মনকে শান্ত করতে। কিন্তু অদ্ভুত! রাগ লাগছে না কেনো তার! জোরালো কোনো শব্দও মাথায় আসছে না! নীবিড় রাগ হবার চেষ্টা চালালো, খানিকবাদে নিজের বোকার মতো কাজকর্মে নিজেই হেসে ফেললো।

নীবিড়ের আনমনেই ভাবা ভাবনাগুলোর মাঝে হঠাৎ করেই দুলে উঠলো শিপ। রাত্রি পাশ দিয়েই যাচ্ছিলো। সেও চমকে উঠলো নীবিড়ের সাথে। সামনে থেকে আওয়াজ এলো। কোনো একটা ট্রলার এসে বাড়ি খেয়েছে শিপে! নীবিড় হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো, কোনো দূর্ঘটনা ঘটেনি তো?

তবে বেশিদূর এগোতে হলো না তাকে। তার পূর্বেই দুটো সুপরিচিত মুখ দৃশ্যমান হলো চোখের কিনারায়। অগ্নি-রুশো টলমলে পা ফেলেই ট্রলার থেকে শিপে উঠলো। দৌড়ে কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো নীবিড়ের। রাত্রি যেনো সেখানটাতেই স্তব্ধ বনে গেলো। কি হচ্ছে এসব? অগ্নি-রুশো এখানে এইসময় কিভাবে এলো?

অগ্নি ব্যস্ত গলায় কিছু একটা বলতে ধরেছিলো তার পূর্বেই বিদ্যুৎ গতিতে বলে বসলো নীবিড়,

------ "তোর বোন একদম ঠিক আছে, ঘুমোচ্ছে। তোরা জিরিয়ে নে, এখন কোনো কথা নয় প্লিজ!"

রুশোর রক্তলাল ফোলা নাক-মুখ, ছলছলে চোখদুটো হঠাৎ করেই চিকচিক করে উঠলো। খুশিতে একপ্রকার লাফিয়ে উঠে নীবিড়কে হাগ করে বসলো সে,

----- "নীবিড় ব্রো, ইউ আর রিয়েলি আ সুপারম্যান! জানো কতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি? দেখো, আজ এটম বোম্বের মুক্কা না খেয়েই নাকটাকে কেমন টমেটো বানিয়ে ফেলেছি!"

রুশোর হাত দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া লাল নাকটা বেশ মজার বস্তু বলে ঠেকল নীবিড়ের কাছে। নাকটা আচমকাই টেনে দিয়ে হেসে ফেললো সে। রুশো ফের প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "ছুটকি কোথায় ব্রো?"

নীবিড় পাশ ফিরে তাকিয়ে রাত্রির উদ্দেশ্যে বলল,

----- "ওদের কেবিনটা দেখিয়ে দাও তো রাত্রি!"

রাত্রি ভ্যাবাচ্যাকা খেতে খেতেই "জ্বি ভাইয়া!" বলে মাথা নাড়াল। রুশো প্রায় লাফাতে লাফাতেই রাত্রির দেখানো পথ ধরে ছুট লাগালো।

অগ্নি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। নীবিড়ের কপালে ভাঁজ পড়ার মুহুর্তেই শক্ত করে জরিয়ে ধরলো তাকে। ঘনঘন শ্বাস টানতে টানতে বলল,

------ "তোকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিব জানা নেই রে! সারাজীবন ধন্যবাদ দিয়েও পোষানো যাবে না এ ঋণ!"

নীবিড় আস্তে করে গাট্টা মেরে দিলো অগ্নির মাথায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

------ "ওয়েট, হোয়াট? কিসের ঋণ আর কিসের থ্যাংক্স বে? এক্কেবার ফাটায় ছাড়ে দিবো শালা! আমি জাস্ট নিজের ডিউটি পালন করেছি বুঝছোস? নাথিং মোর ওকে?"

অগ্নি হেসে ফেললো। নীবিড়ের পলক ঝাপটানিতে আশ্বস্ত হয়ে ধাপ ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলো বোনটাকে দেখবার উদ্দেশ্যে। চার-পাঁচবার ধাপ ফেলার মাথায় আচমকাই থমকে দাঁড়ালো সে। টার্ন মেরে এক ছুটে এসে আবারও ঝাপটে ধরলো নীবিড়কে। নীবিড় অনেকটাই চমকে গেলো এবার। ভরাট গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "ব্যাপার-স্যাপার কি বলতো? আজকে ওসব আউল-ফাউল হাগ ডে ফাগ ডে নাকি? এতো ঝাপটায় ধরতাছোস কেন?"

অগ্নি ঠোঁট চেপে ধরে কান্না আটকালো। ধরা গলায় বলল,

------ "একসাথে দু'দুটো কলিজার টুকরা কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গেছিলো জানিস? কি ভয়াবহ বিষণ্নতা! নিজেকে সেইভ করার জন্যও বালতি-বালতি ধনিয়াপাতা!"

#চলবে______________

(মাথা ব্যাথা, সময় স্বল্পতা এই দুটো বিষয় আঁকড়ে ধরে লিখেছি বিধায় পঁচা হওয়াটা স্বাভাবিক। এন্ড অলসো সরি ফর বিং লেইট!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন