ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

২৬তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-২৬♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

জীবনে এই প্রথম, এমন বিশ্রী এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে আমার। চারিদিকে অহরহ মানুষের ছড়াছড়ি। মিডিয়ার লোকেদের হাতে হাতে মাইক্রোফোন। ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে কানদুটো থেকে ধোঁয়া বের হবার উপক্রম। সেলিব্রিটিদের বুঝি এই লাইটস, ক্যামেরা এসবের মাঝেই বন্দী থেকে চলাফেরা করতে হয়? ক্লান্ত শরীর নিয়ে স্বস্তিতে শ্বাস ফেলার সুযোগটুকুও মিলে না তাদের? এটা একটা জীবন নাকি ফেম যুক্ত কারাগার মাত্র!

আজ সন্ধ্যের প্রায় কাছাকাছি সময়ে আড্ডা-হাসি-তামাশা করবার পর আমরা পৌঁছাই জেলখানা ঘাট। জরিনা খালা চরম ক্ষেপা ক্ষেপেছিল রুশো ভাইয়ার বলা "লেগপিস' শব্দের অর্থ বুঝতে পেরে, তবু ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলেনি। আমাদের চাপা হাসির ফোয়ারা এড়িয়ে দিব্যি হাসিহাসি মুখ করে থেকেছে। জেলখানা ঘাটে পৌঁছে শিপ থেকে নামবার পূর্বমুহূর্তে নীবিড় ভাইয়া আগেভাগেই বলে রেখেছিলেন তিনি পেছনে থাকবেন। বাকিরা ঠিকমতো ঘাট ছেড়ে উঠার পরই দেখা দেবেন। কিন্তু ভাবনার চেয়ে বড্ড বেশিই বাড় বেড়েছে মিডিয়া। প্রোফেসারদের প্রথমেই ঘিরে ধরেছে তারা। নীবিড় ভাইয়া বিরক্ত হয়ে সামনে এগিয়েছেন। শতশত প্রশ্নের ছড়াছড়িতে বাকিদের স্ট্রেসে ফেলতে না চেয়ে নিজেই আগ বাড়িয়ে তাদের সকল প্রশ্নের জবাবে মুখরিত করছেন ঠোঁট।

----- "স্যার, শুনলাম আপনি নাকি বনে হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিভাবে ফিরে এলেন এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে?"

------ "স্যার, আপনি তো একটা মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, তবে সেই মেয়েটা কোথায়?"

----- "আপনারা কি সেদিন দুপুর থেকে রাত অবধি একসাথেই ছিলেন? এমন একটা বনে রাত কাটালেন কিভাবে আপনারা? বন্য প্রাণীদের কবলে পড়েন নি?"

নীবিড় ভাইয়া বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রেখেই সবগুলো প্রশ্নের জবাব দিতে চাইছিলেন কিন্তু মাঝখান থেকে বিরক্তিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আমার। অগ্নি-রুশো ভাইয়া উল্টো দিকে ফিরে মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। না পারছে ছুটে বেরিয়ে যেতে আর না পারছে পরিস্থিতির সামাল দিয়ে আমায় ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। হাতে সময় নগন্য। নীবিড় ভাইয়া যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আমায় ক্যামেরার সামনে না আনার। তবু এই ছোট চুল বিশিষ্ট ভদ্র মহিলা ঠিক মুখের সামনে এসে মাইক্রোফোন ধরে ফেললো আমার। ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "আপনিই তো অনন্যা। এতো কড়া সিকিউরিটি থাকা সত্ত্বেও বনে হারিয়ে গেলেন কীভাবে? 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়'ই বা আপনাকে খুঁজতে একাই বেরিয়ে পড়েন কেনো? এবং আপনাকে খুঁজে পেলেনই বা কীভাবে? সিনিয়র জুনিয়রের বাহিরেও কি ভিন্ন কোনো সম্পর্ক আছে আপনাদের মাঝে?"

ব্যাস হয়ে গেলো! সহ্যের সীমা অতিক্রম করে প্রশ্নটা মস্তিষ্কের নিউরনে পৌঁছে বেশ জোরেশোরেই আঘাত করে বসলো। চুপ থাকার সময়সীমা যে অতিদ্রুত ফুরিয়ে এলো। এবার কি হবে বাচ্চু?

নীবিড় ভাইয়া চমকালেন খানিকটা! ফাঁক পেয়ে দ্রুত এগিয়ে এলেন আমার পানে। তৎক্ষণাৎ উঁচু গলায় বললেন,

----- "আপনাদের কাছে রিকুয়েষ্ট, আমরা সবে ক্লান্ত হয়ে ফিরছি একটা জায়গা থেকে। বাকিদের প্লিজ স্পেস দিন। আমি তো সব কনফিউশান ক্লিয়ার করবার জন্য আছিই। ওদের যেতে দিন। ইটস টু লেইট নাও!"

------ "আরে আরে যেতে দেবে কেন? নীবিড় ভাই, আপনি আমায় বলতে দিন তো। ওদেরও তো জানা দরকার কিভাবে আমি-আপনি হারিয়ে গিয়ে বাঘের পিঠে চড়ে পুরো বন ঘুরে বেড়িয়েছি!"

নীবিড় ভাইয়া গোলগাল চোখ করে তাকালেন। বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আমি লাগামহীন শব্দে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেই চললাম,

------ "আপনারা সবাই ক্যামেরা আমার দিকে ঘুরান। এই যে আমি হলাম, "আয়ানা জাহান অনন্যা" ভীষণ সাহসী একটা মেয়ে বুঝলেন? কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমার জুতোটা একটু বেশিই উড়নচণ্ডী হবার ভান ধরেছিল। সেই জুতোকে পিটিয়ে সোজা করতে যেই ঝুঁকে বসলাম। ওমনি বাকিরা হাওয়া! কি ভয়ানক ব্যাপার স্যাপার ভাবতে পারছেন?"

ভদ্রমহিলা বেকুব সেজে কপাল কুঁচকালো। উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

----- "ম্যাম একটু ক্লিয়ার করে বলুন প্লিজ, 'উড়নচণ্ডী জুতো', তাকে আবার পেটাতে ঝুঁকেছিলেন! এসবের কোনো মানেই তো বুঝতে পারছিনা আমরা।"

নীবিড় ভাইয়া আগ বাড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন আমার। প্রসঙ্গ বদলাতে চটজলদি বলে উঠলেন,

----- "আব...আপনারা ওর কথায় কিছু সিরিয়াসলি নেবেন না। শি ইজ হাস্ট কিডিং! প্লিজ লেট আস গো! এই নিয়ে প্রয়োজনে আমি নিজেই আপনাদের সাথে মিটিং ফিক্সড করবো।"

নীবিড় ভাইয়াকে পাশ কাটিয়ে আবারও সামনে এলাম আমি। তিন তিনটে মাইক্রোফোন একাই দখল করে বললাম,

------ "আপনারা উনার সাথে আলাদা করে কথা বলতেই পারেন। মাগার, আগে আমার কথা শুনুন। জানেন, সুন্দরবনে আমরা বাঘের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে কী হিংস্র তার চাহনি। উফফফ! ভয়ে লোম দাঁড়িয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো আমাদের!"

------ "হোয়াট? আপনারা বাঘের সম্মুখীন হয়েছিলেন?"

------ "আরে তা নাহলে বলছি কী? একদম দেশি, মোটাতাজা খাসা টসটসে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সামনে পড়েছিলাম আমরা। কিন্তু বাঘমামা আমাদের একটা চুল পর্যন্ত বাঁকা করতে পারেন নি! কেনো জানেন?"

------ "কেনো?"

------ "কেনো আবার? এইযে আপনাদের ওয়েলনোউন সুপারস্টার ওরফে সাদা বিলাইয়ের জন্য। বিড়ালকে বাঘের মাসি বলা হয় একথা তো নিশ্চয় শুনেছেন। কিন্তু নীবিড় ভাইয়া তো মেইল ভার্সন! দ্যটস হোয়ায় নীবিড় ভাইয়া হলেন বাঘের মেসো! এখন আপনারাই বলুন, বাঘমামার একটা প্রেস্টিজ আছে না? নিজের মেসোর ওপর কি আক্রমণ করতে পারে সে?"

একথা শুনার পর সকলের চোখ মুখের রঙ ভয়ার্ত, সাথে কনফিউজিং টাইপ দেখালো। বেকুব সেজে মুখটা গোলগাপ্পা সাইজ বানিয়ে ফেললো তারা। এদিকে নীবিড় ভাইয়ার মাথায় যে রক্ত চড়ে গেছে তাও বেশ বুঝা গেলো৷ যার দরুন দাঁতে দাঁত চেপে চাপা আওয়াজে বললেন,

------ "হোয়াট দ্য হেল আর ইউ স্পিকিং? জাস্ট শাট আপ স্টুপিড!"

আড়চোখে একপলক নীবিড় ভাইয়ার রক্তলাল চোখমুখের দিকে তাকালাম আমি এবং প্রায় সাথেসাথেই দৃষ্টি সরিয়ে বললাম,

------ "আচ্ছা ওসব আপনারা বুঝবেন না। সো বাদ দিন! এবার আপনাদের সুন্দরবনের সবথেকে ইন্টারেস্টিং নিউজ টা দেওয়া যাক। আপনারা কি জানেন? সুন্দরবনে শুধু বাঘ, বানর, হরিণ, সাপ এসবই নেই, রয়েছে আরো ভয়ংকর প্রাণীদের বসবাস!"

মাইক্রোফোন হাতে ঝাঁকড়া চুল বিশিষ্ট ছেলেটা উচ্ছ্বাসিত চিত্তে গোলগাল চোখ করে তাকালো। "দারুণ কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে" টাইপ ভাব ধরে প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "কী বলছেন! বাঘের থেকেও ভয়ানক প্রাণী! ম্যাম, আমাদের একটু ক্লিয়ার করে বলুন, কি দেখেছেন আপনারা?"

------ "অবশ্যই, বলার জন্যই তো এসেছি। আপনারা 'কালারস' চ্যানেলে যে 'নাগিন' সিরিয়ালটা হয় ওটায় দেখেন নি, কেমন অর্ধেক মানুষ ফের অর্ধেক সাপের লেজ টাইপ ফিগার নিয়ে থাকে নাগ-নাগিনগুলো?"

একে-অপরের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো সাংবাদিকেরা। আমি আবারও লম্বা করা দাঁত কেলিয়ে দিয়ে বললাম,

------ "ওমন রসগোল্লার মতো তাকাবেন না, আগে পুরোটা শুনুন! তো ওদের ফিগারটা ঠিক ওরকম অর্ধ মানব-সাপ টাইপ হলেও ওরা ভিন্ন রকম ছিলো। কোমড় থেকে উপর অবধি ছিলো সাপের অর্ধাংশ এবং কোমড় থেকে পা পর্যন্ত ছিলো মানবাংশা!"

সাংবাদিকদের চোখ এক পর্যায়ে বড় হতে হতে কোটর থেকে বেরিয়ে হাতে চলে আসার উপক্রম দাঁড়ালো। আমি বেশ রসিকতা করেই স্পষ্ট সত্যর ন্যায় বলে চললাম,

------ "মজার ব্যাপার কি জানেন, এই অর্ধমানব নাগ-নাগিনদের আবার সিরিয়ালের নাগ-নাগিদের থেকেও মারাত্মক সব পাওয়ার আছে। ওরা শুধু রূপ বদলানোতেই ক্ষান্ত থাকে না। বরং রূপের সাথেসাথে আমার পরিচিত মানুষগুলোর কন্ঠস্বরও কপি করে লম্বা জিহ্ব নাড়িয়ে কথা বলার ক্ষমতা রাখে। জাস্ট ইমাজিন কী ভয়ানক প্রাণী!"

নিত্য পায়ের ওপর পা তুলে একের পর এক পপকর্ন মুখ পুরছিলো। বেশ উৎসাহ নিয়েই টিভিতে লাইভ নিউজ দেখছিলো সে। তাতে নিজের সুপার স্টার ভাই এবং কমেডি কুইন অনন্যাকে একসাথে দেখে হঠাৎ করেই চমকে উঠেছিলো। আনমনেই পপকর্নগুলো চিবাতে চিবাতে অনন্যার উদ্ভট সব কথাবার্তা শুনছিলো। বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো ফাউল ডেসক্রিপশন থেকে শুরু করে নাগ-নাগিন পর্যন্ত ঠিক ছিলো কিন্তু এসব কি শুনছে ও! রূপ বদলানো অতঃপর কন্ঠস্বর কপি করা! ও মাই গড, কি সাংঘাতিক! নিত্য টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিলো। ঢকঢক করে পুরোটা পানি সাবাড় করবার জন্য মুখে তুলে ধরলেও লক্ষ্যে পৌঁছতে বিপত্তি বাঁধালো। ভাই পরিস্থিতির সামাল দিতে গিয়ে অনন্যার মুখ চেপে ধরেছে, তাও আবার প্রেস-মিডিয়ার সামনে। এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা নিজ চোখে দেখবার সৌভাগ্য অর্জন করার ঝাটকায় গ্লাসে থাকা পানি গলায় ঢালার বদলে নিজের গায়েই ঢেলে ফেললো নিত্য!

------ "আপনারা ওর এসব মনগড়া কথায় কান দেবেন না প্লিজ, শি ইজ মেন্টালি আনওয়েল! হোপ ইউ গাইস রিয়ালাইজ! এক্সকিউজ মি!"

একথা বলেই একপ্রকার টানতে টানতে অনন্যাকে নিয়ে ভীড় ঠেলে বেরিয়ে গেলো নীবিড়। পেছন পেছন ছুটতে দেখা গেলো বেশ কিছু স্টুডেন্টদেরও। মিডিয়ার লোকেরা হতাশ ভঙ্গিতে শ্বাস ফেললো। অতঃপর জারাকে দেখতে পেয়ে চটজলদি ঘিরে ফেলে ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "জারা ম্যাম, আপনি! আপনিও কি তবে ট্যুর এটেন্ড করেছিলেন? "সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ে"র নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে কিছু বলুন প্লিজ!"

জারা থমকালো কিছু মুহুর্তের জন্য। ছোট্ট করে বলল,

----- "এই সিচুয়েশনে কিছু এক্সপ্লেইন করার মতো মুড কারোরই নেই। উই আর গেটিং লেইট! প্লিজ এক্সকিউজ আস!"

একথা বলেই গটগট করে এগিয়ে চলল জারা৷ মিডিয়ার লোকেদের মাঝে চাপা গুঞ্জন চললো। একজন ক্যামেরার সামনে এসে সিরিয়াস মুড নিয়ে হড়হড় করে বলা শুরু করলো,

------ "আপনারা দেখলেন 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়' নিজের ভার্সিটির একজন মেয়েকে প্রেস-মিডিয়ার পরোয়া না করে মুখ চেপে ধরে জোরজবরদস্তি করে নিয়ে গেলেন এবং তার সাথে নিজের বাগদত্তা জারা'ও ছিলেন। তথাকথিত 'আয়ানা জাহান অনন্যা' 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ে'র কোনো রিলেটিভস নন। একজন সাধারণ স্টুডেন্টের জন্য 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ে'র এতোটা ভাবনা সত্যিই রহস্যজনক। এখনও বনে হারিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কিছু খোলাসা করে বলেননি কেউই। আমরা আগামীতে এই নিয়ে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ পর্বে নামবো।"

নিত্য আনমনেই রিমোটের লাল সুইচ চেপে টিভি বন্ধ করলো। তার ভ্রম কাটলো দরজায় কড়া নাড়ানোর তীব্র শব্দে। সেদিক পানে মনোযোগ রেখেই উঠে দাঁড়ালো সে। দরজা খুলতেই সাদনান সাহেবের অস্থিরতা মাখা ক্লান্ত মুখটা নজরে পড়লো প্রথম। হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের ঘরে ঢুকে কপাল চেপে ধরলেন তিনি। চিন্তিত গলায় বললেন,

----- "নিত্য তুই নিউজ দেখেছিস? কিসব হচ্ছে আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না!"

নিত্য বেশ রিল্যাক্সিং মুডে বাবার দু কাঁধে হাত রেখে বিছানায় বসালো। গুটিসুটি মেরে নিজেও পাশে বসে বলল,

----- "এতো কিছু মাথায় ঢোকাবার কোনো প্রয়োজন নেই বাবা। যা হচ্ছে হতে দাও! ভবিষ্যতে দারুণ কিছু ঘটতে চলেছে বুঝলে? তুমি শুধু হাত গুটিয়ে দেখে যাও!"

_______________________________________

ট্রেন নিজের আপন গতিতে ছুটছে গন্তব্যে। প্রকৃতির হিমেল হাওয়ায় বুক ভাসাচ্ছি আমি। কপাল জুড়ে বিচরণ করা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পুরো মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে থেকে থেকেই। সারি সারি গাছগাছালিগুলো শা শা করে ছুটে চলছে পেছন দিকে। তাদের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছি আমি। ভাবনার মূল প্রসঙ্গটা নিজের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে গাঁথতে না পারলেও উদ্ভট সব ভাবনা এসে হানা দিচ্ছে আমাতে। মাঝেমাঝে ইচ্ছে হচ্ছে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ মেরে প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াতে আবার পরক্ষণেই ডানার অভাবে নির্ঘাত মৃত্যুর কথা স্মরণ করে ফোলাতে হচ্ছে মুখ।

রাত্রি টেনশনে থরথর করে কাঁপছে। ফেসবুক ঘেটে আজকের লাইভটা দেখার পর থেকেই মাথায় হাত পড়েছে তার। রাত্রির ভয়ানক আক্ষেপ, তাকে ক্যামেরায় দেখা যায়নি তাই! অপরদিকে আমার ভাইয়েরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে নিজেরদের দেখা ক্যামেরার বিস্তারে না দিতে পারায়।

------ "রুশো তুই ঠিকঠাক দেখেছিস তো? আমাদের লাইভে দেখা যায়নি তো?"

------ "ওহ হো ব্রো! এতো প্যারা খাচ্ছ কেন? আমি পুরো সোশ্যাল মিডিয়া ঘেটে দেখেছি। কোথাও আমাদের দেখা যায়নি, সো জাস্ট চিল বেইবি!"

মুহুর্তেই অগ্নি ভাইয়া কপট রাগ দেখিয়ে ধাম করে চাটি বসিয়ে দিলো রুশো ভাইয়ার মাথায়। ভ্রু কুঁচকে বলল,

------ "ওই ব্যাটা, আমি তোর কোন বউয়ের সৎবেইবি লাগি?"

রুশো ভাইয়া দাঁত দিয়ে জিহ্ব কেটে বসলো৷ এক হাতে মাথা চুলকতে চুলকতে বলল,

------ "উপপস সরি! স্লিপ কেটে গেছে ব্রো!"

ভাইদের গুঁতোগুঁতির সময়সীমা ইনফিনিটি পর্যন্ত! ননস্টপ দুষ্টুমি মত্ত থাকবে তারা এ জানা কথা। কখন আবার সিট বদলাবার জন্য ঘুষাঘুষি শুরু হয়ে যায় বলা মুশকিল। নীবিড় ভাইয়া পাশে এই দুটো বিচ্ছু নিয়ে চুপচাপ চোখ দুটো বুজে রয়েছেন৷ গায়ে ঘেমে যাওয়ার দরুন লেপ্টে আছে পার্পেল কালারের শার্ট। সিল্কি চুলগুলো কপাল জুড়ে বিরাজ করছে উনার। তাদের কিছু কিছু বড্ড বেশিই বাড় বাড়ছে। বাতাসের ধাক্কায় খেলে বেড়াচ্ছে নির্দ্বিধায়। বাম ভ্রুর পাশে চমৎকার সেই তিলটার থেকে থেকেই দেখা মিলছে। অমাবস্যার চাঁদের মতো হুটহাট মিলিয়ে যাচ্ছে সে চুলেদের চাদরে। আবার কখনো নিজের ভয়ানক সুন্দর রূপ দেখিয়ে চলছে দুষ্টুমিতে মত্ত হয়ে। এবং প্রতিবারের মতো এবারেও সেই বিশ্রী ভুলটা হয়ে যাচ্ছে আমার। সম্ভবত মানুষটা চোখদুটো বুজে থাকলে কোনো অটোমেটিক সেনসর কাজ করে আমাতে। যতোই চাই চোখদুটোকে কন্ট্রোলে রাখতে ততই আরো বেশি করে অবাধ্য হয়ে পড়ে তারা। শত বাঁধা অতিক্রম করে ঠিক নির্লজ্জের মতো থমকে যায় উনাতে। বর্তমানে চোখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতেই প্রকৃতিতে ডুব দিয়েছি আমি। আশ্চর্য! মস্ত বড় আকাশটাতেও নীবিড় ভাইয়ার গম্ভীর মুখখানা ভাসছে! এই মানুষটার ভ্রম কাটাতে এবার কোন দিকে তাকাবো আমি?

ঘন্টা খানেক পূর্বে জেলখানা ঘাটে অবস্থানরত মিডিয়ার লোকেদের ভীড় থেকে আমায় একপ্রকার টেনেহিঁচড়েই বের করে আনেন নীবিড় ভাইয়া। চটজলদি মাস্ক এবং ক্যাপ পড়ে নিয়ে নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল করে নেন। ঠিক পরপরই মারাত্মক একখানা ধমক মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য এবার আমায় ছেড়ে সাদা বিলাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে দিয়েছিলো। ভাইয়েরা দ্রুত দৌড়ে এসে পৌঁছেছিলো নিকটে। যার দরুন মুখে তালা লাগাতে বলা ছাড়া বেশিকিছু বলবার সুযোগটুকু মেলেনি উনার। অগ্নি ভাইয়া বকাঝকা করেছিল কিছু। তাতে অবশ্য রুশো ভাইয়া বাম হাত ঢুকিয়ে ফেলেছিল নির্দ্বিধায়। বাকি ছিলো রাত্রি এবং আমাদের সনামধন্য জরিনা খালা। এবার এক ভয়ানক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিলো খালাম্মার সাথে। শুধুমাত্র মুখ বাঁকানো পাশাপাশি ফোঁসফোঁস করাতেই ক্ষান্ত ছিলেন তিনি। ভেবেছিলাম জোরালো কোনো কথা নিশ্চয় শুনাবে কিন্তু আমায় সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিয়ে স্রেফ রাগান্বিত রিয়াকশন দিয়েই চুপ করে গিয়েছিলেন। আমি প্রায় বড়সড় একখানা ভ্যাবাচাকা খেয়ে থম মেরে গিয়েছিলাম। তবু শান্তি লাগছিলো ভীষণ! যাক, এসব উগান্ডা মার্কা পাবলিকের নিউজ বানানোর উত্তেজনায় গরম গরম ঘি তো ঢালা হলো। শান্তি শান্তি, বহুত শান্তি!

রাত প্রায় ৯ টার কাছাকাছি। কুষ্টিয়া এবং পাবনা জেলার মাঝামাঝি অবস্থান। খানিকবাদেই হার্ডিঞ্জব্রিজ পাবার কথা। কেবিনের পুরোটা জুড়েই অবস্থান করছি আমি, রাত্রি, অগ্নি ভাইয়া, রুশো ভাইয়া, নীবিড় ভাইয়া এবং জারা। ভাইয়েরা মুখোমুখি সিটে পাশাপাশি বসে ঘুমে টুপছে। অগ্নি ভাইয়া নিজের পুরোনো নোবিতা স্টাইলে গভীর ঘুমে আচ্ছাদিত হয়েছে আজ। রাত্রি-জারা কারোরই মুখ নিসৃত কোনো শব্দ কানে আসছে না। ঘুমিয়ে পড়লো নাকি দুজনেই? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চট করে হেলা মাত্রই দুজনের ঘুমন্ত মুখশ্রী ফুটে উঠলো চোখের রেটিনায়। শরীরটা আজ সকলেরই ক্লান্ত ছিলো ভীষণ! চলতি ট্রেনে ঘুম পাওয়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক ছিলো। তাছাড়া একদিক দিয়ে আমার উপকারই হলো বরং। আজ জানালা দিয়ে নয় সোজাসুজি দরজায় দাঁড়িয়ে ব্রীজ দেখব আমি। দেখব পদ্মার ওপর দিয়ে অতিক্রম করা বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম রেলসেতুর রাতের আঁধারে নিস্তব্ধ রূপ।

ভাবনা মতোই কেবিন ছেড়ে চুপিচুপি পা ফেলে বেরিয়ে এলাম আমি। দুটো বগি জুড়ে সব স্টুডেন্টস এবং প্রফেসরদের আনাগোনা। প্রায় সকলেই ঘুমে কাতর হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ মোবাইলে নিজেদের প্রগাঢ় দৃষ্টি নিবন্ধন করে নির্ঘুম রয়েছে। আবার কেউ কেউ খানাপিনায় কাটাচ্ছে প্রহর। ব্যস্ততম সেই বগির দরজায় পৌঁছে লম্বা করে শ্বাস টানলাম আমি। ভেতরের যতো গুমোট বাঁধা জ্বালাতন ছিলো তা নিঃশ্বাস আকারে বিলিয়ে দিলাম প্রকৃতিতে! গা হীম করা হিমেল হাওয়ায় বুক জুড়ে বয়ে চললো শীতলতা। সামান্য ঝুঁকে আবিষ্কার করা হলো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সন্নিকটে ভীষণ। খুশিতে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। পদ্মার পানিগুলো চাঁদের ম্লান আলোয় চিকচিক করছে। তার স্নিগ্ধতায় সাঁতার না জানা আমিটার'ও ইচ্ছে হচ্ছে ডুব দিতে। ইচ্ছে হচ্ছে ব্রীজ থেকে এক লাফ মেরে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

আমি যখন প্রকৃতির মুগ্ধতায় বিমোহিত ঠিক এমন সময়ই হাতে সজোরে টান পড়লো আমার। এমন আকস্মিক ঘটনায় চমকে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিলাম মুহুর্তেই। তবে মানুষটা আমায় পড়তে দিলেন না, নিজের উষ্ণ বুকের সাথে চেপে ধরলেন তৎক্ষণাৎ। হৃদস্পন্দন ঘোড়ার বেগে ছুটতে লাগলো আমার। মানুষটার মুখ না দেখলেও চিনতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। এই উষ্ণ বুক, তার ডিবডিবে আওয়াজ আমার চেনা। শরীরে মাখানো পারফিউমটাও বড্ড চেনা।

নীবিড় ভাইয়া আমায় খানিকটা ভেতরে এনে সোজা করে দাঁড় করালেন। দু'বাহু চেপে ধরে ঝাঁঝালো গলায় বললেন,

------ "এই মেয়ে! পাগল হয়ে গেছো তুমি? দরজার কাছে কি করতে এসেছ হ্যাঁ? এক্ষুনি তো পড়ে যাচ্ছিলে। এমন রিস্কি জায়গায় চলতি ট্রেন থেকে পড়লে ঠিক কি হবে ধারণা আছে তোমার?"

নীবিড় ভাইয়ার ঠোঁট ক্রমাগত নড়ে চলছে। নিশ্চয়ই ধমকের সুরে কিছু বলছেন আমায়। কিন্তু কথাগুলো ঠিক বোধগম্য হচ্ছেনা আমার। উনার স্নিগ্ধ মুখখানাতেই সব মনোযোগ ঢেলে পড়েছে হঠাৎ। অদ্ভুত সব অনুভূতিতে মনটা পুড়ছে। কেনো অসময়ে মানুষটা এতোটা কাছে আসেন আমার?

আমায় এভাবে চুপচাপ নিজের পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকাতে দেখে বিষয়টা মোটেও পছন্দ হলো না নীবিড় ভাইয়ার। ভ্রু যুগল ক্রমশই আরো খানিকটা কুঁচকে এলো উনার। আমার দু'বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরলেন উনি। তীব্র চিৎকার করে কিছু একটা বলতে মুখ খুলেছিলেন সবে, তার পূর্বেই নিজের ডান হাতের আঙুল দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলাম মানুষটার। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে অস্ফুটস্বরে বললাম,

------ "কর্কশ স্বভাবের হলেই কী হবে? আপনি মানুষটা কিন্তু ভারী চমৎকার!"

#চলবে___________________

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, প্রয়োজনে শেয়ার করুন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন