ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ২)

৪১তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)

#পর্ব-৪১♥

#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥

মেডিক্যাল কলেজ পেড়িয়ে কিছুদূর হেঁটে এগোলেই পড়ে মোড়। তার ডান সড়ক ধরে ৫ মিনিটের মতো যেতে হলো কাঙ্ক্ষিত পার্কের উদ্দেশ্যে। চারিদিকে ঝলমলে অজস্র আলো। অবাক করা বিষয় আজ পার্কটা রাতের অন্ধকারে মোড়ানোর বদলে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে বহুগুণ। গোল টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গোলাপের পাপড়ি। ঠান্ডা মৌসুমের গা হীম করা বাতাসে শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে। সাথে ভয়ানক এক আতংকে কেঁপে উঠছে নিত্যর বুক।

সেই দেড় বছর যাবৎ যাকে চোখে না দেখে শুধু গানের মাধ্যমে চিনেই এতোটা পাগলপ্রায় হয়েছিল আজ সেই মানুষটা নিজে থেকেই দেখা করতে আসছে নিত্যর সাথে। এই সংবাদ পাবার পর নিত্যর ঠিক কেমন রিয়াকশন হওয়ার কথা ছিলো? নিশ্চয় আনন্দে বুকটা ভরে উঠার কথা ছিলো, এক্সাইটমেন্টের বশে কান্না করে দেওয়ার মতোও অবস্থা হওয়ার কথা ছিলো। অথচ অদ্ভুত! নিত্যর মনে আজ আনন্দের ছিঁটেফোঁটাও নেই। আছে শুধু একরাশ ভয় এবং সংশয়!

নিত্য কাঁপাকাঁপা হাতটা টেবিলে ছড়িয়ে থাকা ফুলের পাপড়িগুলোর ওপর রাখল। তাদের কোমলতায় মনে এক রেশমি অনুভূতি জাগ্রত হলো তার। কল্পনায় ভেসে উঠলো সেই চিরচেনা মুখ। অগ্নির ঠোঁটে লেগে থাকা এক চিলতে হাসি। সামনের দাঁতগুলো মুক্তোর মতো ঝকমক করছে তার। গালের সাথে লেপ্টে থাকা খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো অমায়িক এক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। আর চোখদুটোর কথা নাই বা বললাম। নিত্য সেই চোখদুটোর দিকে ভুলেও তাকাতে চায় না। তবু অবাধ্য মন বারবার একই ভুল করিয়ে বসায়। অগ্নির চোখে চোখ পড়লে নিত্য পলক ঝাপটাতে ভুলে যায়। একটা ছেলের দিকে নির্লজ্জের মতো ওমন হা করে কোনো মেয়ে চেয়ে থাকুক এমনটা কি মানা যায়? একদম নয়!

নিত্য জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। এইযে এতো এতো আয়োজন, ফুলে-মোমবাতির আলোয় সাজানো প্রান্তর তাতো আর মনের মানুষটা করেনি! যেই মানুষটাকে না দেখে নিজের অনুপ্রেরণা ভেবেছিলো, যেই মানুষটাকে না দেখেই তার গানের প্রেমে পড়েছিল আজ সেই মানুষটাই করেছে এতোসব আয়োজন। নিত্যর বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্য যে অনিবার্য। AJ তাকে প্রপোজ করেছে, আজ সামনাসামনি নিজের মনের কথা বলতেই ডেকেছে নিত্যকে। সেদিন নিত্য যখন একরাশ ভয় নিয়ে ফোনের লাইন কেটে এসএমএস-এ জানালো তার ভাববার জন্য সময় প্রয়োজন তখন AJ'ই হেসে ব্যাপারটা সহজ করতে চেয়েছিল। বলেছিল,

"তোমার সময় নেওয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই নেবে। গভীরভাবে ভাববে। আমি তোমায় দু'দিন সময় দিচ্ছি, এরপর আমি যেদিন রাজশাহী পৌঁছব সেদিন কিন্তু তোমার সামনে গিয়ে সেই একই প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়াব। এখন যেমন প্রশ্নটা ঝুলিয়ে করে রেখে দিলে তখন কিন্তু তা পারবেনা। জবাব দিতে হবে তোমায়, আমি নেগেটিভ অথবা পজিটিভ উভয় উত্তরের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত রাখবো নিত্য। অপেক্ষায় রইলাম। আমি জানি তুমি আমায় ফেরাবেনা, তবু তোমার মুখ থেকে স্পষ্ট উত্তরটা জানতে চাই। ভালো থেকো, নিজের যত্ন নিও। আমি আসবো। খুব শীঘ্রই আসবো!"

নিত্য আজ পাথরের কাজ বিশিষ্ট কালো রঙের শাড়ি পড়েছে। কানে বড়বড় একজোড়া প্লাটিনামের ঝুমকো, হাতভর্তি চুরি, সাথে হাল্কা একটু সাজ। চোখের কাজল আর ঠোঁটের লাল লিপস্টিক'টুকুই যেনো সৌন্দর্যটা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে তার। AJ বলেছিলো তার পছন্দের রঙ লাল, সেই হিসেবে নিত্য যেনো লাল রঙা কোনো পোশাকে নিজেকে মুড়িয়ে আনে এমনটাই প্রত্যাশা করেছিল। তখন ছোট্ট করে "হু" বললেও নিত্য কিন্তু তেমনটা করেনি। বরং অগ্নির সবথেকে পছন্দের কালো রঙটাকেই বেছে নিয়েছে। গায়ে জড়িয়ে রেখে অনুভব করেছে। আজ যে কঠিন জবাব দিতে হবে তার। AJ এর মতো একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মানুষকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এতোদিন যাবৎ তার বান্ধবীর মাধ্যমে চলা কনভার্সেশনের সত্যটাও খোলাসা করে বলতে হবে। নিত্য জানে না এসব শুনে অপরপক্ষ ঠিক কেমন রিয়াকশন দেবে, সে কি নিত্যকে খুব খারাপ মেয়ে ভাববে? ভাবতেই পারে, নিত্য তো প্রশংসা করার মতো ভালো কোনো কাজ করেনি। সে নিজের এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর দ্বারা AJ'র সাথে কথা বলিয়ে নিয়েছে। একজন ফ্যান হিসেবে, AJ এর রেসপন্স পাওয়ায় তার যেহেতু কথা বলাটা কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে সেই হিসেবে নিজেলে সচল রাখতে চেয়েছিলো নিত্য। পাছে অগ্নির প্রতি এমন আকস্মিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ায় AJ'র সাথে কনভার্সেশন চালানোটা বড্ড বিদঘুটে ঠেকছিল। কিন্তু সে তো জানত না তার মাথামোটা বান্ধবী এতোটা বাড়িয়ে বলবে সবকিছু, পাগলপ্রায় হয়ে প্রতিটি কথার জবাব দিবে! ভাজ্ঞিস সেদিন মেসেঞ্জারে কলটা সে নিজেই রিসিভ করেছিল, নয়তো নির্ঘাত মেয়েটা প্রপোজালটাও এক্সেপ্ট করে ফেলত! নিত্য মনে মনে রূপাকে একগাদা বকা দিতে দিতে চেয়ার টেনে বসলো। ভারী হয়ে আসা বুকটা ভীষণ পোড়াচ্ছে তাকে। নিত্যর ভাবনার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আগামী ভবিষ্যতে অগ্নির পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া বার্তা। AJ'কে রিজেক্ট করার পর শুধু এজেরই নয়, অগ্নির রিয়াকশন কেমন হবে এই ভেবেও কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেনা সে। আচ্ছা অগ্নি কি বুঝবেনা নিত্যকে? অগ্নির চোখে নিজের জন্য যেই মায়াটা সে দেখেছিল তা কি ভুল ছিলো? ভাবতে পারে না নিত্য! ঝিমঝিম করা মাথাটা টেবিলের ঠেস দিয়ে বসে রয় স্রেফ।

____________________________________________

পারফরম্যান্স শেষে স্টেজের সেই ঝলমলে আলোগুলো যখন নিভে গিয়ে অন্ধকার নেমে এলো ঠিক তক্ষুনি শরীরটা যেনো আছড়ে পড়তে চাইলো আমার। নীবিড় ভাইয়া তৎক্ষণাৎ আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে আটকে নিলেন। অডিয়েন্সের হৈচৈ থেকে চিৎকার চেঁচামেচি, হাজারো ক্যামেরার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও ঝট করেই কোলে তুলে নিলেন আমায়। ঘাম শুধু কপাল থেকেই বইছে এমনটা নয়, পুরো শরীর জুড়ে বিচরণ করেছে তারা। শ্বাস নিতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে, ঘনঘন উঠানামা করা বুকটা জ্বালাপোড়ার মতো ব্যাথা তীব্র ব্যাথার সৃষ্টি করছে আমার।

নীবিড় ভাইয়া আমায় দু'হাতে নিজের বুকে আগলে ধরে সকলকে পাশ কাটিয়ে নেমে যেতে ধরলেন। তবে মাঝপথেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো স্টুডেন্টরা। আমাদের ঘিরে ধরে মুহুর্তেই পথ আটকে দিলো তারা। নীবিড় ভাইয়া রক্তবর্ণ চোখে তাকালেন। কঠিন গলায় বললেন,

------ "মেয়েটা অসুস্থ, এই মুহুর্তে কোনোরকম গ্যাদারিং পছন্দ করবো না আমি। গট ইট? নাও প্লিজ এক্সকিউজ আস!"

সকলেই একপ্রকার চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে সাইডে সরে দাঁড়ালো। মেয়েদের গোপনে চলা ফিসফাস লানে এসেছিল যদিও তবে সেসবে বরাবরের মতো আজো পাত্তা দিলেন না নীবিড় ভাই। এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে বড়বড় ধাপ ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলেন। আমার চোখ তখনও আধখোলা। শরীরের সবটুকু এনার্জি হারিয়ে ফেলেছি বোধহয়। যার দরুন সবকিছু উপলব্ধি করতে পারলেও উনার কোল থেকে নেমে হেঁটে যেতে পারছিনা। নীবিড় ভাইয়ার কোলেই সমস্ত ভার ছেড়ে লেপ্টে রয়েছি।

নীবিড় ভাই দ্রুত পা চালিয়ে আমায় ডক্টরের চেম্বারে এনে থামলেন। সিটের এক কোণায় নিকিতা-আপু এবং রাত্রি বসা ছিলো। আমাদের দেখতেই চট করে উঠে দাঁড়ালো রাত্রি। নিকিতা আপু চেষ্টা চালিয়ে উঠতে নিতেই নীবিড় ভাই চোখের ইশারায় উঠতে মানা করলেন। বসে থেকেই চিন্তিত গলায় নিকিতা আপু প্রশ্ন ছুড়লো,

------ "নীবিড় ভাই, অনন্যার কি হয়েছে? এমন অচেতন দেখাচ্ছে কেনো ওকে?"

নিকিতা আপুর প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই রাত্রি কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠলো,

------ "হায় আল্লাহ! অনুর কি হয়েছে? এই অনু, এভাবে নীবিড় ভাইয়ার কোলে চুপ করে শুয়ে আছিস কেনো? কথা বল!"

নীবিড় ভাই জবাব না দিয়ে আমায় বেডে শুইয়ে দিলেন। ব্যস্ত গলায় বললেন,

------ "এখন এতোকিছু বলার সময় নেই। তোমরা প্লিজ নয়েজ ক্রিয়েট করো না। আর চেম্বার ফাঁকা কেনো? ডক্টর ইকবাল কোথায়?"

------ "ড. আংকেল তো আপুকে ড্রেসিং করিয়ে দিয়ে একটু পাশের ভবনে গেছেন!"

------ "ড্যাম ইট! রাত্রি, ফ্যানের সুইচ দাও হারি আপ!"

------ "জি..জ্বি ভাইয়া!"

একথা বলেই চট করে মাথার ওপরে থাকা ফ্যানটা অন করলো রাত্রি। মুহুর্তেই গণনাযোগ্য পাখাগুলো গণনার অস্তিত্ব হারালো। শা শা শব্দে ঘুর্নায়মান অবস্থায় তীব্র হাওয়ার মেলা বসালো। আমি শক্তিহীন শরীরটাকে বেডের ওপর ছেড়েই চোখদুটো বুজে রইলাম। জোরে জোরে শ্বাস টেনে অক্সিজেনের অভাবটা মেটাবার চেষ্টা চালাতে থাকলাম। নীবিড় ভাই পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে পাশে রাখা বোলটায় পানি ঢেলে নিলেন। তাতে রুমালটা ভিজিয়ে রাত্রির উদ্দেশ্যে বললেন,

------ "রাত্রি ওর ওপরের জ্যাকেটটা খুলো।"

রাত্রি প্রথম প্রথম ইতস্তত বোধ করলো বোধহয়। খানিকটা চাপা স্বরেই জিজ্ঞেস করলো,

------ "আব...কেনো ভাইয়া?"

------ "আহ! তোমাকে যা করতে বলেছি করো। এতো কোয়েশ্চেনের তো কোনো কারণ দেখছিনা।"

নীবিড় ভাইয়ার কথাটায় স্পষ্ট বিরক্তি সাথে রাগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলো। আমি কানে সবটা শুনতে পেলেও বড়বড় চোখ করে মানুষটার রাগান্বিত মুখটা দেখবার সৌভাগ্য করে উঠতে পারলাম না। এ যেনো আমার শত জনমের ব্যার্থতা! আজ নীবিড় ভাইয়ার রাগের উপস্থিতি সবসময়েই মতো হলেও ক্ষেত্রটা যে ভিন্ন! এরকম দৃশ্য কি চোখে না দেখে থাকা যায়?

রাত্রি যখন দ্বিধান্বিত হয়ে আমার জ্যাকেটটা খুলে পাশে রাখল তখন নীবিড় ভাই এসে পাশে বসলেন আমার। চোখদুটো এই শুকনো মুখটাতেই স্থীর রেখে ভেজা রুমাল দিয়ে কপাল থেকে শুরু করে গলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মুছে দিতে লাগলেন। একই কার্যক্রম চলমান রাখার মাঝে রাত্রির উদ্দেশ্যে বললেন,

------ "রাত্রি, ড্রয়ারটা খুলো। ওখানে স্যালাইনের বেশকিছু প্যাকেট আছে। একটা স্যালাইন পানিতে গুলিয়ে আনো। ওর শরীর প্রচন্ড ঘেমে গেছে। স্যালাইনটা লবণ-পানির চাহিদা মেটাবে!"

------ "জ্বি, এক্ষুনি আনছি ভাইয়া!"

তারপর রাত্রি গেলো স্যালাইন গুলিয়ে আনতে। আমার শরীরটা আগের থেকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। আমি অনুভব করতে পারছি! হয়তো চেষ্টা করলে উঠে বসতেও পারবো। কিন্তু শক্তি প্রয়োগ করে উঠে বসতে ইচ্ছে করছেনা একদম। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ঝাপসা চোখদুটো এবার খোলা দরকার। আমি লম্বা দম নিতে নিতেই চোখ মেলে তাকালাম। নীবিড় ভাইয়া ভেজা রুমালটা আবারও পানিতে ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন। পানি ঝরিয়ে আবারও ঘাড়টা মুছতে হাত এগোতেই আমায় দূর্বল চোখে তাকিয়ে থাকতে আবিষ্কার করলেন। উনার উদ্বিগ্ন চোখদুটো হঠাৎ করেই চিকচিক করে উঠলো, খানিকটা ঝুঁকে এসে উতলা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

------ "এখন কেমন ফিল করছ অনন্যা? আগের থেকে বেটার লাগছে?"

আমি পলক ঝাপটে হ্যাঁ সূচক বার্তা পাঠালাম। যা ভারী বুকটা অনেকখানি হাল্কা করতে বোধহয় সক্ষম হলো উনার। নীবিড় ভাই স্মিথ হেসে আমার মাথাটা নিজের কোলের ওপর এনে রাখলেন। ভেজা রুমালটা দিয়ে উত্তাপ ছড়ানো ঘাড়টা মুছে দিয়ে অবশেষে ক্ষান্ত হলেন। তার কয়েক সেকেন্ডে বাদে একটি স্যালাইন ভর্তি স্বচ্ছ কাচের গ্লাস হাতে নিয়ে এলো রাত্রি। নীবিড় ভাইয়ার হাতে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

------ "ভাইয়া এইযে স্যালাইন!"

নীবিড় ভাইয়া পলক ঝাপটে বললেন,

------- "গ্লাসটা টেবিলে রেখে বসো। চিন্তা করো না। অনন্যা ঠিক আছে!"

রাত্রির অন্ধকার মুখে হঠাৎ করেই প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। আমার পানে উজ্জ্বল চোখে তাকাতেই ঠোঁটের বামকোণটা কিঞ্চিৎ প্রসারিত করে হাসলাম আমি। নীবিড় ভাই আমায় দু'হাতে ধরে সাবধানে বেডে হেলান দিয়ে বসালেন। ততক্ষণে হাটু চেপে ধরে বেডের পাশে এসে বসেছে নিকিতা আপুও। নীবিড় ভাই ডান হাতে স্যালাইনের গ্লাসটা আমার মুখের কাছে এনে ধরলেন এবং বা হাত দিয়ে পেছন থেকে মাথাটা আলতো করে ধরে রাখলেন। আমি ছোট্ট ছোট্ট চুমুক বসিয়ে একটু একটু করে স্যালাইনগুলো পেটে চালান করবার লক্ষ্যে লেগে পড়লাম। সুস্থ থাকাকালীন ১ মিনিটেই শেষ করে ফেলা গ্লাসটা প্রায় ১২ মিনিট ধরে শেষ করে ক্ষান্ত হলাম। নীবিড় ভাইয়ের কপালের ভাঁজটা এখন পর্যন্ত সহজ হয়নি, এই ভাঁজ প্রায় সবসময়ই উনার কপালে দেখা গেলেও ভাঁজখানা অর্থটা আজ ভিন্ন। তাতে জুড়ে আছে শতশত দুশ্চিন্তার ছড়াছড়ি, প্রিয়জন হারাবার তীব্র ভয়।

আমার কাছে এতোক্ষণ যাবৎ যা যা হচ্ছিল তার সবটাই স্বপ্ন বলে ঠেকছিল। নীবিড় ভাইয়ার সাথে একই স্টেজে পারফর্ম করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সবটাই স্রেফ বানোয়াট কল্পকাহিনী বলেই ঠেকছিল। কিন্তু দিনশেষে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যিটা যে খুবই অনড়! এই মানুষটা নির্ঘাত একপ্রকার বহুরূপী! মনে প্রশ্ন জাগায় বারংবার! অস্থির মনটা শুধু একটি প্রশ্নই করে বসে "এই কঠিন মানুষটাও বুঝি আমার প্রতি এতোটা কেয়ারিং হতে পারেন? শুধু কি বেস্টফ্রেন্ডের বোন বলেই এতোকিছু নাকি অন্যকিছু? যদি অন্যকিছুই হবে তবে সেটা কী? আদৌ জানতে পারবো তো কখনো?"

_________________________________________

নিত্যর টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে এই জট থেকে উদ্ধারের পথ খুঁজবার মুহুর্তে পেছন থেকে কারো পদধ্বনির আওয়াজ কানে ভেসে এলো। নিত্য কেঁপে উঠে সটান হয়ে বসলো। বোঝার চেষ্টা চালালো তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটিই এসেছে কিনা।

অগ্নি দুষ্টু হেসে কন্ঠটা ভিন্ন রকম করার চেষ্টা করে শব্দ করলো, "এহেম এহেম...!"

নিত্য বুঝল এই সেই মানুষটি যার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে হচ্ছিলো তাকে। নিত্য সচেতন ভঙ্গিমায় উঠে দাঁড়াল। কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে মানুষটাকে পরখ করে দেখবার মতো সাহস জোগাতে পারলো না। উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেই বলে উঠলো,

------ "ওখানেই দাঁড়ান! একদম এগোবেন না!"

অগ্নির ঠোঁটের বাম কোণটা প্রসারিত হলো আরো কিছু। সে তার পূর্বে জায়গাতেই অটল থেকে পকেটে দু'হাত গুঁজে দাঁড়ালো। নিত্য চোখদুটো বুজে লম্বা একটা শ্বাস টানল। জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো সত্যের মুখোমুখি হবার জন্য। অতঃপর হাতের মুঠো শক্ত করে বলতে শুরু করলো,

------ "আপনাকে আজ নতুন করে একই প্রশ্নটা করতে হবেনা এজে। আমি নিজেই আজ উত্তরটা জানাতে এসেছি আপনাকে। আপনি দয়া করে আমায় ভুল বুঝবেন না। আমি জানি আমি যা যা বলবো তা শোনার পর আপনি আমায় অনেক খারাপ ভাববেন। রেগে যাবেন, অকথ্য ভাষায় গালিও দিতে পারেন। তবু আপনাকে সত্যগুলো জানানো দরকার। আপনি ধৈর্য্য নিয়ে আমার কথাগুলো শুনবেন প্লিজ।

আমি আসলে আপনাকে ভাষায় বলে প্রকাশ করতে পারবো না আমি আপনার ঠিক কতোবড় ভক্ত। আপনার গান, আপনার কন্ঠ আপনার পার্সোনালিটি সবকিছুতেই মুগ্ধ আমি। কিন্তু একটা কথা কি জানেন, ভালো কিন্তু আমার শাহরুখ খানকেও লাগে কিন্তু তাই বলে তাকে নিজের হাজবেন্ড ভেবে তো ভালোবাসবো না আমি তাইনা? আপনিও ঠিক সেরকমই একজন মানুষ। আপনার আমার মাঝে একজন সিঙ্গার এবং ফ্যান বহির্ভূত কোনো সম্পর্ক নেই। আর রইলো আপনার সাথে অনেক ক্লোজভাবে কথা বলা, নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করা। আসলে সত্যটা কি জানেন? সেসব কিছুই মিথ্যে ছিলো! এইযে এতোগুলা দিন আপনার সাথে আমার যোগাযোগ অথচ সত্যিটা হলো আপনার সাথে আমি হাতে গোণা দু-একবার বাদে কথাই বলিনি। আমার আইডি থেকে আমারই এক বান্ধবীর দ্বারা কথা বলিয়ে নিয়েছি। সেও আমার মতোই আপনার অনেক বড় ভক্ত। হয়তো সেই জায়গা থেকেই অনেকটা ক্লোজভাবে আপনার সাথে কথা বলে ফেলেছে! আর আমার হয়ে কিন্তু ওই'ই আপনাকে আমার ছবিগুলো পাঠিয়েছে। আপনি হয়তো খেয়াল করলে দেখবেন আমার আইডিটি নতুন খোলা, ফেইক একটা একাউন্ট। সেই আইডির পাসওয়ার্ড আমার কাছেও যেমন ছিলো তেমন ছিলো ওর কাছেও। আপনি হয়তো আমায় ছবি দেখে পছন্দ করেছেন কিংবা কথাবার্তা বলে পছন্দ করেছেন। আমি এক্সাক্টলি জানি না, ইনফ্যাক্ট আমি জানতেও চাইনা। আমি শুধুমাত্র আপনার আর আমার মাঝে একটা সচল যোগাযোগ রাখার জন্যই ওকে দিয়ে কনভার্সেশনটা কন্টিনিউ করতে বলেছিলাম। এখন হয়তো প্রশ্ন করবেন আমি নিজেও তো আপনার সাথে এজ আ ফ্যান কথা বলতে পারতাম কিন্তু আমি তা করলাম না কেনো। তবে উত্তরটা আমার কাছে আছে আর আমি মনে করি আপনাকেও সবটা খুলে বলা দরকার।

না, আমি বলছিনা আমি আপনাকে অপছন্দ করি। আপনি আগেও আমার কাছে যেমন একজন গ্রেট সিঙ্গার এবং অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিলেন আজও ঠিক তাই আছেন। আমি আপনাকে এজ আ হিউম্যান বিং ভালোবাসি তবে আপনি আমার থেকে যেই ভালোবাসাটা এক্সপেক্ট করছেন সেই ভালোবাসাটা আমি অন্য কাউকে দিয়ে ফেলেছি এজে। আমি জানি না কিভাবে কিন্তু এটাই সত্যি, আমি আপনার কাজিন অগ্নিকে ভালোবেসে ফেলেছি। হ্যাঁ এটাও ঠিক, এই কথাটা এখনও মুখ ফুটে বলা হয়ে উঠেনি। জানিনা কখনও সাহস করে বলতে পারব কিনা! তবু উনার জায়গাটা শুধু উনারই। অন্য কেউ সেই জায়গাটা নিতে পারবেনা। কখনও না!

নিত্য একনাগাড়ে এতোগুলা কথা বলে অবশেষে দম নিলো। বুকে চেপে রাখা পাহাড় সমান কঠিন কথাগুলো আওড়ে ফেলার প্রায় সাথেসাথেই চোখ থেকে দুফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো তার। পেছনে থাকা অগ্নি বহুকাঙ্ক্ষিত প্রেমিকার মুখ থেকে তার মনের কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো স্রেফ। প্রচন্ড খুশিতে মানুষ নাকি আত্মহারা হয়ে পড়ে, পুরো বাড়িঘর দাপিয়ে বেড়ায়, চিৎকার করে সবাইকে তার খুশির খবরটা জানাতে চায় কিন্তু অগ্নির বর্তমান অনুভূতিটা ভিন্ন। এই অনুভূতি মুখ ফুটে প্রকাশ করবার মতো নয়, আর না সম্ভব কাউকে বলে বোঝানো। অগ্নি স্রেফ অপলক চেয়ে রইলো তার প্রেয়সীর পানে। মনে মনে আওড়ে চলল,

"নাহ, আমি ভুল ছিলাম না। আমি ঠিক ছিলাম, আমার ধারণা আমার ভাবনা সব ঠিক ছিলো। আমার নিত্য ওরকম মেয়ে নয়, ও আমায় ভালোবাসে নিজের সবটা দিয়েই ভালোবাসে। আমি ভুল কাউকে ভালোবাসিনি, ভালোবাসাময় একটি সঠিক মেয়েকেই ভালোবেসেছি!"

অগ্নি বুকভরা স্বস্তি নিয়ে শ্বাস ছাড়লো। ঝুঁকে একপলক নিজের দিকে তাকালো। সে নিজেও ব্ল্যাক শার্ট, ব্ল্যাক ব্লেজার পরিধান করেছে আজ। নিত্যও যে তার পছন্দের রঙটাতেই নিজেকে মোড়াবে তা ধারণা করেনি পূর্বে। যার দরুন একের পর এক চমকগুলো ম্যাজিকের মতো লাগছে তার।

নিত্য অপেক্ষা করছিলো এজের পক্ষ থেকে পাওয়া কোনো উত্তরের। তবে বিপরীতে কোনো জবাব কিংবা ফিরে যাওয়া পদধ্বনি শুনতে না পেয়ে কপাল কুঁচকালো। মুখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞেস করলো,

------ "আপনি কিছু বললেন না যে? আপনি কি ফিরে যাচ্ছেন? এজ!"

অগ্নি প্রশান্তির হাসি হেসে দু'ধাপ পেছালো। এবার আর কন্ঠে বিকৃতি না এনে নিজের স্বাভাবিক গলাতেই বলল,

------ "আমি চলে গেলে আপনি খুশি হবেন তো মিস নিত্য?"

নিত্য চমকে উঠলো সঙ্গেসঙ্গে! এ কার গলা শুনলো সে? অগ্নি! কিন্তু অগ্নি এখানে কিভাবে এলো? নিত্য তৎক্ষণাৎ উল্টোদিকে ফিরল চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে।

অগ্নি সাথে করে আনা নিজের গিটারটা হাতে নিলো। গিটারের টুনটান শব্দে গলা মিলিয়ে মনোমুগ্ধকর গলায় গাইতে শুরু করলো,

------ "আমি ভাবতে পারিনি,

তুমি বুকের ভেতর ফাটছো

আমার শরীর জুড়ে

তোমার প্রেমের বীজ!

আমক থামতে পারিনি,

তোমার গালে নরম দুঃখ

আমায় দুহাত দিয়ে

মুছতে দিও প্লিজ.....!"

#চলবে___________

[ সবার অনুভূতি জানতে চাই!😇]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন