#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৪৬♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। গায়ে সামান্য এক ঢিলাঢালা টি-শার্ট জড়িয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে অগ্নি। আকাশের তারা গুনছে নতুবা সেই তারাদের মাঝেই কারো মুখশ্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অগ্নি অপলক চেয়েই আছে, দীর্ঘ সময় বাদে দু-একবার পলক ফেলছে তো আবারও ডুব দিচ্ছে নিজ ভাবনাতে।
রুশো ছাদে এলো সাথে করে ভাইয়ের হুডি নিয়ে। অগ্নিকে এভাবে আনমনেই তারা গুণতে দেখে খানিকটা অবাক হলো। ভাইয়ের যে প্রেম নামক নাছোড়বান্দা এক রোগ হয়েছে তা জানলেও তার প্রভাব সম্পর্কে ততটা বিজ্ঞ ছিলো না রুশো। প্রেম যে প্রেমিকের মনে অজানা সব ভাবনার পাশাপাশি গায়ের চামড়াও গন্ডারের মতো করে দিতে পারে তা আজ প্রথম দেখছে সে। রুশো তীক্ষ্ণ চোখে ভাইয়ের শরীর পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলো। না আছে কাঁপুনি আর না আছে শীতে কাতর হবার ভাব। গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে আছে যদিও তবু তাতে হেলদোল নেই অগ্নির। রুশো ঠোঁট উল্টে ফিসফিস করে বলল,
------- "ইয়ে ক্যায়সা লাউ হ্যা রে বাবা! যো ইনসানকে চামড়ে কো গান্ডার কি চামড়ে সে বাদাল দেতা হ্যায়?"
রুশো চোখমুখ কুঁচকে কথাটা বলে ফের হাঁটা ধরলো। ভাইয়ের পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি অগ্নির দৃষ্টির বরাবর নিক্ষেপ করলো। মৃদুস্বরে বলল,
------- "আকাশ ভরা তারা....!"
------- "ধলা ইন্দুরের গোয়া মারা সারা।"
দৃষ্টি স্থির রেখেই অস্ফুটস্বরে রুশোর বলা কথাটার সুর ধরলো অগ্নি। রুশো হতবাক হয়ে কপাল চাপড়াল। হতাশ হয়ে হুডিটা অগ্নির কাঁধে রেখে বলল,
------- "মাথাটা যে গেছে তা তো ভালোই বুঝেছিলাম কিন্তু তাই বলে চামড়াও যে গন্ডারের মতো হয়ে যাবে তা তো বুঝিনি!"
অগ্নি অলস ভঙ্গিমায় হুডিটা গায়ে জড়াল। রুশোর থুতনিতে পরপর দু'বার হাল্কাভাবে টাপ করে বলল,
------- "চামড়া গন্ডারের হয়নি রে পাগলা, ব্যাস আলসেমির ঠ্যালায় হুডিটা পড়া হয়নি!"
------- "কোনদিন যে পটি করতে করতে টলয়েটেই ফ্রিজ হয়ে যাবা সেই চিন্তাই করছি!"
ভাবুক ভঙ্গিমায় কথাটা বলল রুশো এবং প্রায় সাথেসাথেই অগ্নির বরফের মতো ঠান্ডা, শক্ত হাতের কিল খেলো। অগ্নি বিরক্ত গলায় বলল,
------- "ধুরো ব্যাডা! খালি নোংরা নোংরা কথাবার্তা, যা ভাগ এখান থেকে।"
রুশো গেলো না। বরং ভাইয়ের আরো কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করলো,
------- "আচ্ছা ব্রো, তুমি তো কলিজা কাটা ডাক্তাররে নিজের কলিজাটা দিয়েই দিলা। তা এই অদৃশ্য কলিজা দেওয়া-নেওয়ার অনুভূতিটা কেমন একটু বলবে?"
অগ্নি দু'চোখ বুজে ডান হাতটা বুকের বাম পাশে রাখল। লম্বা একটা দম টেনে বলতে লাগলো,
------- "প্রেমের অনুভূতি তুই এখনই বুঝবি না রে পাগলা। এই অনুভূতি অন্যরকম, এই অনুভূতিতে পিষ্ট মানুষগুলো অনেকটা হাওয়ায় ভেসে বেরায়৷ এই যেমন আমাকে ধর, আজকাল এই দুনিয়া থেকে যে কোন দুনিয়ার ভাবনার চলে যাই তার কোনো হুশই থাকে না। প্রমাণ লাগবে? তাহলে ওইযে ওই আকাশের ওদিকটায় দেখ। একদম নিত্যর মুখের গড়নের মতোই তারাগুলো সেজেছে।"
অগ্নির দেখিয়ে দেওয়া স্থান বরাবর তাকিয়েও ফলাফল শূণ্য পেলো রুশো। আরেকটু উঁচু হয়ে হবু ভাবীর চেহারাখানা খুঁজতে খুঁজতেই প্রশ্ন ছুড়লো,
------- "কোথায় ব্রো? আমি তো দেখতে পারছিনা।"
অগ্নি হাসলো। নরম গলায় বলল,
------- "পারার কথাও না। আমি যেহেতু নিত্যকে ভালোবাসি সেহেতু সব জায়গাতেই ওকে খুঁজে চলি। জানি না কেনো, না চাইলেও ওর মুখটাই বারবার ভেসে উঠে সামনে।"
রুশো ফুস করে শ্বাস ফেললো। বিপরীতে বলল না আর কিছু। ভাইকে নিজের হালে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁট বাঁকাল। দু-এক মিনিট পর রুশোর ফোন প্রকাণ্ড শব্দে বেজে উঠলো। এখানকারই এক ফ্রেন্ড কল করছে। রুশো কল রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশ থেকে উচ্ছ্বাসিত গলায় ভেসে এলো,
------- "দোস্ত, হোয়াটস আপ?"
------- "আরে রাখ তোর আপ সাপ! এতো রাতে কল দিছস ক্যা?"
------- "সরি রে। আসলে দিনে কল করতে চাইছিলাম বাট সময় পাইনি। গার্লফ্রেন্ডরে নিয়ে একটু প্যারা খাইতে হচ্ছে রে, বুঝিসই তো?"
রুশো একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
------- "তুই আর তোর গার্লফ্রেন্ড! হালায় লাইফে করলি কি? শুধু খাওয়া-দাওয়া আর গার্লফ্রেন্ডের পেছনে ঘুরে বেরানো। হুরু ব্যাটা! এটা একটা লাইফ?"
------- "আরে চেতস ক্যা? শান্ত হ, আমারে পরে বকিস। আগে তোর ভাইয়ের খবর বল।"
------- "ভাইয়ের খবর মানে?"
------- "ওমা, এমন ভাবটা নিতাছস যেনো কিছু জানোস না? তোর ওই অগ্নি ভাই যে সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের পেছন দিয়ে টেম্পু চালাচ্ছে তা কয়দিন লুকায় রাখবি?"
রুশো যেনো সাত আসমান থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। চরম আশ্চর্য নিয়ে বলল,
------- "নীবিড় ব্রোর পেছন দিয়ে টেম্পু চালাচ্ছে মানে? ওই কি বলস এগুলা?"
------- "তা নয়তো কী? আজকেই দেখলাম সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের বোনের সাথে তোর ভাই পার্কে। ভাইরে ভাই কী সিন! আমি যদিও নোটিস করছিলাম কিন্তু ওদের প্রাইভেট টাইমে বেগড়া দিতে চাইনি।"
রুশো দ্বিতীয় বারের মতো অবাক হলো। তাও পূর্বের তুলনায় শতগুণ তীব্রভাবে।
------- "জনি, তুই কী ঠিক দেখছস? আর সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের বোনটা আসলে কে?"
------- "আচ্ছা আচ্ছা এইবার বুঝলাম। তুই বোধহয় সানজানারে চিনস না। সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের বোন সানজানা। পুরো নাম মেইবি সানজানা সাবরিন নিত্য!"
রুশোর হাত থেকে আচমকাই ফোনটা পড়ে যেতে ধরলো। কোনো রকমে ফোনটা পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলো সে। ফোনের লাইন কেটে ধপ করে দোলনায় বসে পড়লো। নাহ, জনি যা বলছে তা সত্যি নয়। ও মিথ্যা বলছে! রুশো অবিশ্বাস করতে চাইলেও বিবেক প্রশ্ন করলো,
------- "কিন্তু মিথ্যে বলে জনির কী লাভ? সে কেনো অগ্নিকে নিয়ে মিথ্যে বলবে?"
রুশোর দ্বিধায় নিপাতিত হয়ে ইউটিউবে ঢুকলো। সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের বায়োগ্রাফি সম্পর্কে ছাড়া ভিডিওগুলো ঘেঁটে দেখতে লাগলো। তাতে নীবিড়ের লাইফ স্টাইল সম্পর্কে সত্যের পাশাপাশি হাবিজাবি সব তথ্য দেখে মেজাজটা চটে গেলেও তার বোনকে আবিষ্কার করার জন্য একের পর এক ভিডিও দেখতেই থাকল। তিনটে ভিডিওর পর চতুর্থ ভিডিওতে রুশোর দৃষ্টি স্থির হলো। ক্যাপশনে লেখা "নিজের বোনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করার যা বললেন সাদমান...." রুশো বেছে বেছে সেই ভিডিওটাই ঘেঁটে দেখতে শুরু করলো। ভিডিওটা দু'বছর পূর্বের, সম্ভবত কোনো চ্যানেলে ইন্টারভিউ নিয়ে ডাকা হয়েছিল নীবিড়কে। সেখানে তাকে হোস্ট জিজ্ঞেস করে,
------- "মিস্টার সাদমান, আপনারা তো দুই ভাই বোন। সানজানা কি বড় নাকি আপনি বড়? আর তিনি বর্তমানে কী করছেন?"
নীবিড় খানিকটা দ্বিধাভরা গলাতেই জবাব দেয়,
------- "বোন ছোট, মেডিক্যালে স্টাডি করছে।"
------- "বেশ, কিন্তু আমার প্রশ্ন, আপনার বোনকে কখনও আপনার কনসার্টে কিংবা আপনার সাথে রাস্তাঘাটেও বিশেষ দেখা যায় না। এর কারণ কী?"
------- "একচুয়ালি, বোনের এসব প্রেস-মিডিয়ার পছন্দ নয়। আমার নেইম-ফেইম এসবের ভিত্তিতে ওকে কেউ জাজ করুক এমনটা চায় না ও। শি ওয়ান্টস টু লিড আ সিম্পল লাইফ। দ্যটস হোয়াই আমার সাথে খুব কমই বাহিরে বের হয় ও।"
এরপর হোস্ট স্ক্রিনে একটা ছবি ফুটিয়ে তোলেন। ছবিটা বেশ পুরোনো, নীবিড় তখন এতোটা সাফল্য অর্জন করেনি। কোনো এক শপিং মলের পাশে দাঁড়িয়ে এবং তার পাশে দাঁড়ানো একটি ফুটফুটে মেয়ে। ছবিটা পুরোনো হলেও নিত্যকে চিনতে রুশোর দু'সেকেন্ড সময়ও লাগলো না। হোস্ট সেই ছবিটা নীবিড়কে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
------- "ছবিটা একজন রিপোর্টার এক বছর আগে মলের বাইরের ভীড় দেখানোর জন্য তুলেছিলো। তবে তার ব্যাকগ্রাউন্ডে যে আপনি থাকবেন তা খেয়াল করেনি। আচ্ছা আপনার সাথে যেই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে তিনিই কি আপনার বোন?"
নীবিড় কয়েক সেকেন্ড গম্ভীর চোখে চেয়ে থাকে ছবিটার দিকে। তারপর হেসে বলে,
------- "হ্যাঁ! ওটাই আমার বোন।"
রুশোর হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো এবার। ঠান্ডায় নয়, আতংকে! একপা একপা করে অগ্নির পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়াল সে। মৃদু গলায় ডাকল,
------- "ব্রো!"
অগ্নি পলক ফেলে তাকাল। কপালে ভাঁজ প্রকট করে জিজ্ঞেস করলো,
------- "কিরে ভেতরে যাস নাই এখনও?"
রুশো ভাবলেশহীন জবাব দিলো,
------- "ব্রো, নীবিড় ব্রোর বোনের এই ছবিটা দেখো তো চিনতে পারো কি-না?"
অগ্নি ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বিরক্ত গলায় বলল,
------- "ধুরো, ওর বোনরে দেখে কি করমু? পারলে ওরে দেখা।"
রুশো উত্তর না দিয়ে ফোনটা অগ্নির হাতে ধরিয়ে দিলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো,
------- "যা করবে ভেবে চিন্তে করো ব্রো। আমি আসছি!"
________________________________________
রাত পেরুতে পেরুতে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে অথচ চোখে ঘুম নেই নিত্যর। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছে সে। এই নিয়ে কম করে হলেও দুইশত বার অগ্নির নম্বরে ডায়াল করেছে এবং প্রতিবারই গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া একই লাইন শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলেছে। "দ্য নাম্বার ইউ ডায়ালড ইজ বিজি নাও। প্লিজ ট্রাই আফটার সাম টাইম...!" নিত্য ভেবে পায় না অগ্নির এমন বেখেয়ালিপনার কারণ। মেডিক্যালের হোমওয়ার্কগুলো সারতে সারতে ১ টা বেজে গিয়েছিল নিত্যর। অগ্নি বেশ হেসেই বলেছিলো "টেক ইউর টাইম নিত্য। আমি আছি, পড়া শেষ হলে ছোট্ট করে একটা টেক্সট দিও!"
নিত্য পড়া শেষে অগ্নির কথামতো টেক্সট দিয়েছিল। প্রতিউত্তরে কোনো বার্তা না আসায় ভেবেছিল অগ্নি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তবু একবার কল করে বাজিয়ে দেখে সে। একবার, দু'বার তারপর যতবারই কল করে ততবারই ব্যস্ত দেখায় নম্বর। কারো সাথে কথা বললে টানা ৫ ঘন্টা নিশ্চয় ব্যস্ত দেখানোর কথা নয়। তবে কি অগ্নি কোনোভাবে নিত্যর নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে উঠিয়েছে? কিন্তু কেনো? অগ্নি এমনটা কেনো করতে যাবে? তবে কি ভুল করে হাতের টাচ লেগে নম্বর ব্লক হয়ে গেছে? হুম! তাই হবে হয়তো। নয়তো নিত্যর নম্বর অগ্নি ব্লক করতো না কোনো কালেই। নিত্য মনে মনে স্থির করলো, আজ গোটা রাজশাহী শহর তন্নতন্ন করে খুঁজতে হলেও অগ্নির বাড়িতে পৌঁছবে সে। স্টুডিওতে কর্মরত কারো না কারো কাছে ওর ঠিকানা নিশ্চয় থাকবে। সেখান থেকেই ম্যানেজ করে একদম বাসায় চলে যাবে। তারপর অগ্নিকে এমনভাবে চমকে দেবে যেনো পরবর্তীতে ফোনের ভুলভাল অপশনে টাচ না লেগে যায়।
_______________________________________
সকাল সকাল চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দরজা খুলতেই বড়সড় এক ধাক্কা খেলাম আমি। তবে ধাক্কাটা মোটেই দুঃখে-বেদনায় ভরা নয়। চরম উত্তেজনাময় এক ধাক্কা। ওপর পাশে থাকা ব্যক্তিটিও অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো আমার পানে। আনমনেই বলে উঠলো,
------- "অনন্যা!"
নিত্য আপুর মতো আমিও অবাক কন্ঠে বলে উঠলাম,
------- "নিত্য আপু তুমি!"
নিত্য আপু হাতের ছোট্ট কাগজটায় থাকা ঠিকানায় আরেকবার চোখ বুলালো। সঠিক ঠিকানাতেই পদার্পণ করেছে বুঝে ফের একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলল,
------- "এটা তোমাদের বাড়ি?"
আমি নিত্য আপুকে টেনে বাসায় ঢোকালাম। সোফায় বসাবার উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে যেতে বললাম,
------- "হয়েছে হয়েছে আর নাটক করতে হবেনা। আজ সকাল সকাল আমায় চমকে দিতেই ঠিকানা খুঁজে এসেছ তাইনা? এই এতোদিন বাদে আমার কথা মনে পড়ল?"
নিত্য আপুর বিস্ময় কাটেনি এখনোও। সোফায় বসে কোনোরকমে বলল,
------- "অনন্যা, কিছু মনে করো না। আমি আসলে অন্য একজনের সাথে দেখা করতে এসেছি। কিন্তু জানতাম না তোমরা একই ফ্ল্যাটে থাকো। উপরতলা কি ভাড়া দেওয়া আছে?"
------- "অ্যাঁ! ভাড়া দেওয়া হতে যাবে কেনো? এটা আমাদেরই তো বাসা। তুমি কার খোঁজে এসেছ আপু?"
------- "আব....অগ্নি! আই মিন মিস্টার আয়ান জুবায়ের অগ্নি। স্টুডিওর লোকেরা তো আমায় এই ঠিকানাই দিয়ে পাঠালেন।"
আমি কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অতঃপর গালে হাত রেখে গভীর ভাবনার ভান করে বললাম,
------- "তাহলে তুমি আমার কাছে আসো নি, এসেছ আমার ভাইয়ার কাছে?"
নিত্য আপু ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। অস্ফুটস্বরে বলল,
------ "তোমার ভাই! তারমানে তুমি অগ্নির বোন?"
------ "তা নয়তো কী? তুমি বসো। আমি সবাইকে ডেকে দিচ্ছি। তোমাদের পরিচয় কিভাবে হলো সে খবর নাহয় পরেই এসে জানলাম!"
নিত্য আপুকে বিপরীতে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হাঁক ছেড়ে বসলাম আমি,
------- "আম্মু, আব্বু, রুশো ভাইয়া, ভাইয়ুউউউ....! কোথায় তোমরা? এসে দেখো কে এসেছে!"
আমার ডাকে সর্বপ্রথম সাড়া দিলেন মা জননী। বাবা এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি বিধায় নিশ্চুপই রইলেন। আম্মুর আগমনে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো নিত্য আপু। নরম গলায় সালাম দিলো,
------- "আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
আম্মু সালামের জবাব দিলেন। নিত্য আপুর আগাগোড়া পরখ করে নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন,
------- "ওয়ালাইকুম আসসালাম! কিন্তু মা তোমায় তো চিনলাম না!"
নিত্য আপুকে কষ্ট করে আর নিজের পরিচয়খানা দিতে হলো না। হাত উঠিয়ে আমিই বলে উঠলাম,
------- "আম্মু, ও নিত্য আপু। তোমার অতি প্রিয় বাবুই'য়ের বোন!"
নিত্য আপুর কপালে ভাঁজ। বিস্ময় দমিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হওয়ায় জিজ্ঞেস করল,
------- "অনন্যা, আম সরি। বাট আমি আসলে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা। এই বাবুই কে?"
------- "কে আবার? তোমার একমাত্র গুণধর ভাই!"
নিত্য আপুর বিস্ময় যেনো এবার আকাশ ছুঁলো। আম্মুর পরপর রুশো ভাইয়া নেমে এসেই নিত্য আপুকে দেখে বলে উঠলো,
------- "ও মাই গড! ভাবী, তুমি?"
নিত্য আপু রুশো ভাইয়ার ডাকে চমকাল। বোকাবোকা মুখ করে বলল,
------- "রুশো ভাই, তুমিও এখানে!"
------- "আমিও তো সেটাই ভাবছি ভাবী, তুমি এখানে?"
রুশো ভাইয়ার 'ভাবী' ডাকটা প্রত্যেকের মনেই সন্দেহের সৃষ্টি করলো। আমার কিউরিওসিটি বরাবরই সবার ঊর্ধ্বে হওয়ার জিজ্ঞেস করলাম,
------- "রুশো ভাইয়া, তুমিও কি নিত্য আপুকে আগে থেকে চেনো? আর ভাবী বলে সম্মোধন করছ কেনো?"
রুশো ভাইয়া দাঁত দিয়ে জিহ্ব কেটে বসলো তৎক্ষণাৎ। হেসে বলল,
------- "আজকাল ভাবীর বয়সী কোনো মেয়েকে দেখলেই কেনো যেনো ভাবী শব্দটা স্লিপ কেটে বের হয়ে যায়। হেহে সরি!"
রুশোর ভাইয়ার দেওয়া উত্তর তেমন একটা পছন্দ হলো না আমার। বিপরীতে আবারও প্রশ্ন ছুড়তে নিলাম, "কিন্তু...." তবে মা জননী বাঁধ সাজলেন। আমায় থামিয়ে দিয়ে এগিয়ে এলেন। নিত্য আপুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
------- "মা-শা-আল্লাহ! ভীষণ মিষ্টি মেয়ে তো তুমি! আমার বাবুইয়ের যে এতো সুন্দর একটা বোন আছে আগে জানতাম না।"
নিত্য আপু মিষ্টি করে হাসলো। মা জননী এবার আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
------- "এই তোরা কী শুরু করেছিস বলতো। মেয়েটা আমাদের বাসায় এসেছে কোথায় আপ্যায়ন করবি তা না নিজেদের মাঝে কথা কাটাকাটি করছিস? চুপ করে থাক। আর মা নিত্য, তুমি বসো। আমি তোমার জন্য আজকে স্পেশাল ব্রেকফাস্ট বানাবো। নিশ্চয় এতো সকালে কিছু খেয়ে আসোনি!"
নিত্য আপু সম্মতিসূচক হাল্কা মাথা নাড়াল। নিচু গলায় বলল,
------- "জ্বি আন্টি, আসলে ভাইয়াকে না বলেই ক্লাসের বাহানায় বেরিয়ে গেছি।"
------- "এসেছ বেশ করেছ। নীবিড় তো তোমায় নিয়েই আসেনা। না জানি তুমি নিজে থেকে না এলে আদৌ নিয়ে আসত কি-না।"
নিত্য আপু আবারও একগাল হেসে সম্মান জানাল। মা কিচেনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রায় সাথেসাথেই রুশো ভাইয়াকে চেপে ধরলাম আমি। অনেকটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
------- "ব্যাপার কী রুশো ভাইয়া? বাই এনি চান্স নিত্য আপুই সেই মেয়ে নয়তো যার কথা বলতে গিয়ে অগ্নি ভাইয়ার ধোলাই খেতে প্রতিবার?"
রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টে মাথা ঝাঁকাল। মিনমিন করে বলল,
------- "কিন্তু অনেক বড় একটা প্রবলেম হয়ে গেছে রে ছুটকি, ভাবী নিজের পরিচয় এতদিন গোপন করে রেখেছিল। আর কাল রাতেই আমি-ব্রো ভাবীর এই পরিচয় সম্পর্কে জেনেছি! আর......!"
------ "আর কী?"
ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি।
------- "এরপর ব্রো কি করেছে আমি জানিনা। তবে যা বুঝেছি তাতে এটা শিওর, ভাবী ব্রোর বেস্টফ্রেন্ডের বোন হওয়ার কারণে তাদের রিলেশনশিপের মাঝে ছোটখাটো একটা ঝড় আসবেই।"
আমি নিত্য আপুর চুপসে যাওয়া মুখ আর রুশো ভাইয়ের আতংকে ভরা চোখ দুটোই পরখ করে নিলাম। আগামী ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করতেই শুকনো ঢোক গিললাম। মাথায় হাত রেখে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলাম,
------- "সর্বনাশ!"
#চলবে_________________
[ আগামী পর্বে অদ্ভুত কিছুর সূচনা ঘটবে। আজ নীবিড়কে মিস করার জন্য কেউ বকা দিবেন না প্লিজ। ওই মানুষ একদম ভালো না। সবখানেই প্রচুর ঝামেলা করে!🥴 ]