#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৪৯♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
চারিদিকে এক নির্ঘুম অস্বস্তির অস্তিত্ব। চেঞ্জিং রুমে পুতুল সেজে দাঁড়িয়ে আছি আমি। জান আছে, শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে শুধু যেটা নেই তা হলো শরীরের নড়চড়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, চোখে ঝাপসা দেখছি। আমায় চেঞ্জ করিয়ে দেওয়ার জন্য দু'জন ফিমেল এসিস্ট্যান্ট এসেছে। এখন পর্যন্ত কম চেষ্টা চালায় নি যদিও তবু সামান্য শাড়িটা গায়ে জড়াতেই নাজেহাল অবস্থা তাদের। কাজটা তাদের পক্ষে অসম্ভব নয়, কিন্তু তাদের একমাত্র স্যারের হবু স্ত্রীকে তো আর যাই হোক হাত-পা চেপে ধরে শাড়ি পড়িয়ে দেওয়া যায় না। সম্মানের এক উঁচু জায়গায় বসিয়ে বর্তমানে কাকুতি-মিনতি'তেই আটকে রয়েছে তারা।
শাড়ি পড়ানো নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন আবারও দরজায় টোকা পড়লো। ওপাশ থেকে শোনা গেলো রাহিত ভাইয়ের ব্যস্ত কণ্ঠস্বর,
------- "এইযে আপনাদের হলো? নিচে ভাই ওয়েট করছে। তাড়াতাড়ি ভাবীকে রেডি করিয়ে নিয়ে আসুন।"
রাহিত ভাইয়ের বিপরীতে লম্বা করে মেয়েটার হতাশ গলা উত্তর দিলো,
------- "মিস্টার রাহিত, আমরা এখন পর্যন্ত অনেকবার চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনোভাবেই ম্যামকে রেডি করাতে তো দূরে থাক শাড়িটাই পড়াতে পারিনি।"
------- "হোয়াট? এখনও শাড়িও পড়াতে পারেন নি? ভাইয়ের কানে কথাটা গেলে ঠিক কি হবে ভাবতে পারছেন?"
আমার দিকে আহত দু'জোড়া চোখ আবদ্ধ হলো। তাতে বিশেষ কোনো ভাবমূর্তির পরিবর্তন হলো না আমার। আমি নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে বোঝালাম, "শাড়ি তো দূরে থাক, এই বিয়েই আমি করছিনা!" আমায় কয়েক সেকেন্ডে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে জবাব দিল দুজন মিলেই,
------- "মিস্টার রাহিত, আমারা সব রকমের চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো লাভ হয়নি। সেরকম জোরজবরদস্তি করার সাহস আমাদের নেই তবু কথায় কাজে না দেওয়ায় অবশেষে স্থির করেছিলাম একজন ধরে অপরজন শাড়ি পড়িয়ে দেবো। কিন্তু ম্যামের গায়ে হাত দিতে যাওয়া মাত্রই দু-তিনটে ফ্লাওয়ার বাজ ভেঙেছেন। আপনি স্যারকে বলুন, উনি যা ভালো বুঝবেন তাই করুক। আমরা আর পারছিনা!"
ওপাশ থেকে রাহিত ভাই ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যার শব্দ কানে না পৌঁছালেও উপলব্ধি করা গেলো স্পষ্ট। রাহিত ভাই খানিক ভেবে নিয়ে জবাব দিলো,
------- "বেশ, আমি ভাইকে বলছি। এখন যা করার ভাই'ই করবে।"
তারপর রাহিত ভাইয়ের পদধ্বনি ক্রমশই বিলীন হতে চললো। আমি ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে মেয়ে দুটোর উদ্দেশ্যে বললাম,
------- "আমার জন্য আপনাদের চাকরী চলে গেলে দুঃখিত। জানেন তো চাকরী আর বিয়ের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য?"
একে-অপরের দিকে শুকনো মুখ করে তাকালো তারা। তারপর আমার পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিঞ্চিৎ মাথা নাড়াল। ইচ্ছাকৃত নয়, নীবিড় ভাইয়ের নির্দেশে জোর করেই যে তারা আমায় সাজাতে এসেছে তা স্পষ্ট ফুটে উঠলো তাদের ভাবমূর্তিতে। আমি চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে দু-চোখ বুজে নিলাম। সামনে রাখা ডায়মন্ডের অর্নামেন্টস, পার্পেল এবং সিলভার সেইডের সংমিশ্রণে তৈরি শাড়িটা চোখে বড্ড জ্বালার সৃষ্টি করছে। আচ্ছা নীবিড় ভাই এখন কি করবেন, নিশ্চয় রেগেমেগে বোম্ব হয়ে মেয়েদুটো চাকরী খেয়ে নেবেন। তারপর বাকি রাগটুকু আমার ওপর ফেলে আঘাত করেও বসতে পারেন। আমার কাজ হবে উনার রাগের পরিমাণটা আরো কিছু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরো কিছু ভাঙচুর করা নয়তো উনার সাথে দুর্ব্যবহার করা। আর যাই হোক এমন অবাধ্য, ট্যারা স্বভাবের মেয়েকে নিশ্চয় বিয়ে করতে চাইবেন না উনি।
আমি ঘরটার আনাচে-কানাচে চোখ বুলালাম। রাজশাহীতেই উনার আরো একটা ফ্ল্যাট আছে তা জানা ছিলো না। এই ফ্ল্যাটটায় কেউ থাকে না। গেস্টদের জন্যই স্পেশালি বানানো হয়েছে শুনলাম। আমার ভাবনার মাঝেই দরজায় খট করে আওয়াজ হলো। মেয়েদুটোর আত্মা বোধহয় তৃতীয় বারের মতো কেঁপে উঠলো। গুটিগুটি পায়ে দরজা খুলে দিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো। বাইরে থেকে হয়তো তাদের ইশারায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলল কেউ। যার দরুন বিনাবাক্যে তৎক্ষণাৎ ঘর ছেড়ে বের হলো তারা। আমি এসব কিছু দেখেও না দেখার ভান ধরে রইলাম। অনেকটা অচেতন, নির্বোধ রোবটের মতো। নীবিড় ভাই ভেতরে এসে দরজা লাগালেন। নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ঘরটায় উনার পদধ্বনিই শোনা গেলো স্রেফ। আমি উল্টোদিকে মুখ করে বসে, তখনও উনার দিকে তাকাইনি। নীবিড় ভাই হঠাৎ কোনো নোটিশ ছাড়াই আমায় চেয়ার থেকে উঠিয়ে বিছানার কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন। হুটহাট এমন টানা-হেঁচড়া টাইপ ঘটনাগুলোয় বরাবরই হতবাক হতে বাধ্য হই আমি। এবারও ব্যাতিক্রম হলো না। আমি চমকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে উনার হাত খামচে ধরে ছিলাম। যথাযথ স্থানে ভর ছেড়ে চোখ তুলে তাকালাম। নীবিড় ভাইয়ার মুখ মাত্রাতিরিক্ত স্বাভাবিক। তাতে না আছে কোনো রাগ না আছে কোনো ক্ষোভ আর না আছে কোনো উৎফুল্লতা। আমার শাড়িটার সাথে ম্যাচিং করে হয়তো গোল্ডেন কালারের পাঞ্জাবি এবং তার ওপর পার্পেল কালারের জহরকোট জড়িয়েছেন। পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। যার দরুন উনার ফর্সা লোমশ হাতদুটো দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে স্পষ্ট রূপেই। এতোদিন যাবৎ খেয়াল করিনি, উনার লোমগুলো ঠিক কালচে নয় অনেকটা ডিপ ব্রাউন রঙের। লোমগুলোও যেনো কত যত্ন নিয়ে বানানো। আমি এবার চোখ তুলে তাকালাম উনার মুখের দিকে। ঘন সিল্কি চুলগুলো সেট করে রেখেছেন তবু কিছু অবাধ্যরা কপাল জুড়ে বিচরণ করছে। উনার গালের হাল্কা চাপদাড়ি বরাবরই চমৎকার এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। ডার্ক রেড ঠোঁটদুটো দেখে মনে হয় হাল্কা করে লিপস্টিক দিয়েছেন তবে বাস্তবে তা যত্ন এবং নেশাদ্রব্যের থেকে একশ হাত দূরে থাকারই ফল। আমার নজর ঘুরেফিরে এবার গিয়ে পড়ল উনার বাম ভ্রুর পাশে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা বাদামী তিলটার ওপর। আমি একই ভুল এবার আর করলাম না। ওই তিলটায় জানিনা কি আছে একবারের বেশি দুবার তাকালে নজর সরানো যায় না। এমন সুদর্শন এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য খ্যাত ব্যক্তির চরিত্রও যে নোংরা হতে পারে তা আদৌ উনাকে উপর থেকে পরখ করে বোঝা সম্ভব নয়!
নীবিড় ভাই আমার অবাক চোখে চেয়ে হয়তো কোনো অর্থ খুঁজছিলেন। আমায় চোখ নামিয়ে নিতে দেখে ঠোঁটের বাম কোণটা প্রসারিত করলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন,
------- "কি হলো নজর সরিয়ে নিলে কেনো? দেখা শেষ?"
আমার লজ্জায় মাথা কেটে যাওয়া অবস্থা। ছিঃ আমি কি তবে নির্লজ্জের মতো এতোক্ষণ উনার দিকে চেয়ে ছিলাম? ইশশ! এখন আমায় কি ভাবছেন কে জানে। যেখানে রাগ দেখিয়ে বিয়ে ভাঙার কথা সেখানে এমন ড্যাবড্যাব করে উনাকে দেখার অপরাধে নিজের চোখদুটোই ফুটো করে দেবার ইচ্ছে জন্মাল আমার। নীবিড় ভাই মৃদুশব্দে হাসলেন। আচমকাই আমার কোমড় এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন,
------- "আমি যদি ভুল না হই, তবে তুমি নির্ঘাত আমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছ। সে তুমি স্বীকার করো বা নাই করো!"
আমি ছিটকে দু'হাত সরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললাম,
------- "আপনি ভুল ভাবছেন। আমি মোটেও আপনার মতো এমন বজ্জাৎ মানুষের প্রেমে পড়ার মেয়ে নই। আর আপনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। আমার একটাই কথা, আমি এ বিয়ে করবো না। না মানে না!"
------- "ওহ রিয়েলি? যা ইচ্ছা তাই করবো? বেশ!"
অনেকটা পৈশাচিক কণ্ঠে কথাটা বলেই আমার গায়ে জড়ানো জ্যাকেট'টায় হাত রাখলেন উনি। আমি তৎক্ষণাৎ দু'চোখ বড়বড় করে জ্যাকেট খামচে ধরলাম। কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম,
------- "এ..এই আপনি কি করছেন? আমার জ্যাকেটে হাত দিচ্ছেন কেনো?"
------- "কেনো? তুমিই তো বললে, যা ইচ্ছা তাই করতে। আমি তো তোমার কথামতোই করছি। যা ইচ্ছা তাই!"
------- "যা ইচ্ছা তাই মানে কী? আপনি আমার জামা-কাপড় নিয়ে পড়ছেন কেনো? আরো তো অনেক কিছুই করার আছে। প্রয়োজনে আমার মারুন, হাত-পা ভেঙে দিন।"
নীবিড় ভাই হঠাৎ করেই শব্দ করে হাসতে লাগলেন। রুমময় প্রতিধ্বনির ন্যায় বাজতে লাগলো উনার হাসির ঝংকার। উনার ভাবমূর্তি এমন, যেনো পৃথিবীর এক চমকপ্রদ এক কৌতুক শোনানো হয়েছে উনাকে।
------- "কী হলো, আপনি এভাবে রাক্ষসের মতো হাসছেন কেনো?"
নীবিড় ভাই হাসি থামালেন। হাসির চোটে অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছেন মনে হলো। কোমড়ে এক হাত রেখে ভর ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
------- "লাইক সিরিয়াসলি অনন্যা! তুমি এতোটা স্টুপিড? তুমি জানো না, সাদমান শাহরিয়ার নীবিড় কোনো মেয়ের গায়ে হাত তোলে না? সেখানে তুমি তো আমার বউ হতে চলেছ, বউয়ের গায়ে কি কোনো সুপুরুষ হাত তোলে? হাহ! আমি যা করবো তা একেবারেই উইনিক। আজ পর্যন্ত কোনো মানুষই হয়তো তার হবু বউকে নিজ হাতে বিয়ের শাড়ি পড়িয়ে দেয় নি। আর আমি সেই রেকর্ডটাই ভেঙে দেবো।"
আমি ভয়ে কুঁকড়ে লাফ মেরে বিছানায় উঠে পড়লাম। এই মানুষের হাব-ভাব মোটেও সুবিধার ঠেকছে না আমার। উনি যা বলেন তা যে হাড়েহাড়ে করে দেখান তা এতদিনে বেশ বুঝেছি আমি। তাই অবিশ্বাস করে রিস্ক নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসেনা। নীবিড় ভাইয়া আমায় এভাবে লাফিয়ে বিছানায় উঠতে দেখে ফিক করে হাসলেন। গলার স্বরে অন্যরকম এক ভাব নিয়ে এসে বললেন,
------- "এতো ভয়! হাহ! এতো ভয় নিয়ে বিয়ে করাতে দ্বিমত পোষণ করছ কিভাবে? উমম....আমার তো মনে হচ্ছে তোমার এই বিয়েতে মত আছে ঠিকই কিন্তু অবাধ্য হতে চাইছ যাতে আমি নিজ হাতে তোমায় শাড়ি পড়িয়ে দেই, রাইট?"
------- "ছিঃ! এ...একদম না। আপনি এক ধাপও এগোবেন না বলে দিচ্ছি।"
------- "ঠিক আছে, তবে যাদের পাঠিয়েছিলাম তাদের হাতেই রেডি হয়ে নাও। নাহলে কি হবে তাতো বুঝতেই পারছ!"
বুঝলাম রাজি না হয়ে উপায় নেই। আমার হাত-পা শিকল দিয়ে বাঁধা না থেকেও আমি অসহায়। আর যাই হোক, অন্তত এই মানুষের সামনে সম্মান নিয়ে টানাটানি করানো যাবে না। যার ফলশ্রুতিতে জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মৃদুস্বরে জবাব দিলাম,
------- "আচ্ছা আচ্ছা, আমি আর অবাধ্য হবো না, পাঠান ওদের।"
নীবিড় ভাইয়া ঠোঁটে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি ফোটালেন। স্বস্তিভরা গলায় বললেন,
------- "দ্যটস লাইক আ গুড গার্ল!"
________________________________________
এক এক করে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামছি আমি। ব্যাপারটা হাস্যকর! যেখানে এক দৌড়ে দোতলা থেকে বাগানে নেমে আসি সেখানে আমায় এই ড্রয়িংরুমে আনতেই কতশত ব্যবস্থা। শাড়ি সামলানো আমার কর্ম নয়, এতো এতো গহনায় নিজেকে মোড়ানো অবস্থায় ঠিকভাবে নামতে পারবো কি-না এই নিয়েই জুড়েছিল সন্দেহ। আমি বলিনি আমার কারো সাহায্য লাগবে, কিন্তু ওইযে উপরমহলের অর্ডার! নীবিড় ভাইয়ার নির্দেশ মতো চারজন ফিমেল এসিস্ট্যান্ট আমায় ধরে ধরে নামাছে ফলস্বরূপ। নিজেকে নিজের কাছে এক অনুভূতিশূণ্য রোবট বলে মনে হচ্ছে আমার। যেনো এই ছেড়ে দিলে দুম করে পড়ে গিয়ে ধুম করে কোমড় ভেঙে ফেলবো। আর তারপর আমায় দু'ভাগ করে তারতুর জুড়ে দেওয়ার জন্য রোবোটিকস এর ওপর পড়াশুনা করে সাইনটিস্ট হয়ে যাবেন নীবিড় ভাইয়া।
আমায় ছোট্ট ছোট্ট ধাপ ফেলে ফ্লোরে নামাবার পর যে যার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ালো। নীবিড় ভাই কাজী সাহেবের পাশে বসা ছিলেন। আমায় নামতে দেখে আসন ছেড়ে উঠে এগিয়ে এলেন। আমার ডান হাতটা আলতো করে ধরে হাল্কাগলায় বললেন,
------ "এসো!"
আমি চোখের ইশারায় হাজারো অনিচ্ছা প্রকাশ করলাম কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র নড়চড় হলো না উনার সিদ্ধান্তের। নির্দয় মানুষটা টেনে নিয়ে গিয়ে আমায় নিজের পাশে বসালেন। তারপর কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,
------- "তো কাজী সাহেব, শুরু করুন। ছেলে-মেয়ে উভয়ই প্রস্তুত!"
কাজী সাহেব আমার শুকনো মুখের দিকে পলক ফেলে তাকালেন। খানিকক্ষণ তব্দা খেয়ে বসে থেকে মাথা ঝাঁকালেন। আর পাঁচটা মানুষের মতো হয়তো উনার মাথাতেও এমন হুড়োহুড়ি টাইপ বিয়ের ব্যাপারটা খেলছে না। সমাধান খুঁজছে অথচ সমীকরণটাই অজানা। কাজী সাহেব অনর্গল দোয়া আওড়াতে লাগলেন। নীবিড় ভাইয়া এখনও আমার ডান হাত চেপে ধরে বসে আছেন। আমি এদিক-ওদিক আড়চোখে তাকাতে লাগলাম। খুঁজে চললাম পালানোর কোনো পথ। কিন্তু ভাগ্য এবারও আমায় থাপ্পড় মেরে বলে উঠলো "তুই যা চাইবি তার ঠিক উল্টোটাই হবে হতচ্ছাড়ি, আশা ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাক। এটাই তোর জন্য মঙ্গল!" আমার হঠাৎ করেই মনে হলো কপাল নামক অঙ্গটা খুবই অপ্রয়োজনীয়। আমার তাকে যখন সবথেকে বেশি দরকার ঠিক তখনই প্রতারণার পরিচয় দিয়ে সঙ্গে থেকেছে সে। কপালে হাজারো ঘষামাজা চালিয়েও কোনো লাভ হয় নি। জানিনা ভবিষ্যতে আমার জন্য ঠিক কি অপেক্ষা করছে, কিন্তু কপাল তো আমারই, সে যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে যাওয়াই যে আমার বাধ্যতামূলক কর্ম! আমি আহত, ক্ষত-বিক্ষত মন নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সেই উত্তপ্ত শ্বাসের সাথেসাথে ভারী হয়ে এলো চারিপাশ। আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝে আমার কানে পৌঁছল না কাজী সাহেবের ডাক। তিনি আবারও ডাকলেন তবে আমার টনক নড়ল নীবিড় ভাইয়ার হাতের ছোঁয়ায়।
------- "কি হলো চুপ করে আছ কেনো? কবুল বলো!"
"কবুল" শব্দটা কানে পৌঁছতেই চোখদুটো ভিজে আসতে চাইল আমার। আমার এতোদিনের স্বপ্ন, সবকিছুই ফিকে হয়ে আসতে চলল। লোকে বলে বিয়ের পর নাকি পৃথিবী বদলে যায়। আমারও কি তবে তাই হতে চলেছে। আমি কি তবে এখন থেকে আমার পরিবারের পর হয়ে যাবো? এই মানুষটার অধীনেই বাকি জীবনটা কাটাতে হবে? আর আমার প্যাশন, আমার ফটোগ্রাফির স্বপ্ন! তার কী হবে? এই মানুষটা আদৌ আমার ইচ্ছের মর্যাদা দেবেন নাকি এখনকার মতোই জোরজবরদস্তির ওপর রাখবেন আমায়?
------- "অনন্যা, আম টকিং টু ইউ। কোন ভাবনায় হারিয়ে গেছ?"
আমি চমকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকালাম। জলে জমা ঝাপসা চোখদুটোয় নীবিড় ভাইয়ার অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব ফুটে উঠলো। উনি আমায় ডাকছেন, 'কবুল' বলতে বলছেন। কিন্তু আমি তো চাইনা, আমি চাইনা কবুল বলতে, চাইনা এই কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটাতে। এখনও হাতে সময় আছে 'না' করার। আমি চট করেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনো এক দিশা বরাবর দৌড়তে যাব তার আগেই হাতে টান পড়লো। নীবিড় ভাই আমায় গর্জে ওঠা ইশারায় হুমকি দিলেন। ব্যস্ত গলায় কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,
------- "কাজী সাহেব আপনি দু'মিনিট বসুন, আমরা এক্ষুনি আসছি। ওর একটু ওয়াশরুমে যাওয়া প্রয়োজন।"
একথা বলেই আমায় টেনে ড্রয়িং রুম থেকে কর্ণারের কোনো এক রুমে এনে থামলেন। দরজা লাগিয়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে আক্রমণ চালালেন। আমায় দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে উত্তপ্ত শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললেন,
------- "সমস্যা কী তোমার? কবুল বলতে এতো কাহিনী করছ কেনো? বোবা হয়ে গেছ নাকি?"
আমি দম আটকে কোনোরকমে উত্তর দিলাম,
------- "না...না...আমি এ বিয়ে করবো না। আপনি আমায় খাঁচায় বন্দী করে হুকুম চালাবেন। আমি এমন জীবন চাইনা। ছেড়ে দিন আমায়!"
নীবিড় ভাইয়া আমায় ছাড়লেন না। দু'হাতে শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের আয়ত্তে নিয়ে এলেন। উনাকে আমার ঠোঁটের কাছাকাছি ঠোঁট নিয়ে আসতে দেখেই ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গেলো আমার। সাথে বেড়ে গেলো শরীরের কাঁপুনি। নীবিড় ভাই বাঁকা হাসলেন। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন,
------- "তুমি কি চাইছ বিয়ের আগেই বাসর সেড়ে নিতে?"
আমি যতদ্রুত সম্ভব মাথাটা ডানে-বামে নাড়াতে নাড়াতে বলে চললাম,
------- "না..না...না!"
নীবিড় ভাইয়া আরো কিছু এগোলেন। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে অস্ফুটস্বরে বললেন,
------- "নীবিড়ের পক্ষে কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। এখন তোমার যদি বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে এতই কষ্ট হয় তবে আমার কিন্তু বাসরটা সেড়ে নিয়ে বিন্দুমাত্র কষ্টও হবে না। তুমি কি তা চাও?"
------- "নাহ, প্লিজ এমন করবেন না। আমি আপনাকে বিয়ে করবো চলুন। কয়বার বিয়ে করতে হবে? একবার, দুবার, তিনবার আপনি আমায় যতোবার বলবেন ততবারই বিয়ে করবো। প্রমিজ!"
নীবিড় ভাইয়া নিঃশব্দে হাসলেন। তা উনার হাসির সাথে ফেলা শ্বাসের স্পর্শে না দেখেও বুঝলাম আমি। নীবিড় ভাই আমায় ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আমি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই সিল্কি চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিলেন।
আবারও পুনরায় বিয়ের কার্যক্রম শুরু করা হলো। নীবিড় ভাইয়াকে কবুল বলতে বলার বিপরীতে বেশ দায়সারাভাবেই তিনবার কবুল বলে ফেললেন উনি। আমি তখনও দ্বিধাদ্বন্দে পিষ্ট। 'কবুল' শব্দটা পেটে আসছে অথচ মুখে আসতে চাইছেনা। আমায় চুপ থাকতে দেখে নীবিড় ভাইয়া খানিকটা চেপে এলেন আমার পানে। ধীর কণ্ঠে বললেন,
------- "তুমি আমায় যতটা খারাপ ভাবছ, আমি ঠিক ততটা খারাপ নই অনন্যা!"
আমি বিস্ময়মাখা চোখ নিয়ে তাকালাম। উনার গভীর অর্থপূর্ণ চোখদুটোর মাঝে দৃষ্টি মিশিয়েই আনমনে বললাম,
------- "আলহামদুলিল্লাহ আমি কবুল করছি।"
পরপর তিনবার কবুল বলার পর বিয়ের কার্যাদি সম্পন্ন হলো। রাহিত ভাই সহ ড্রয়িংরুমে উপস্থিত বাকি স্টাফরা "আলহামদুলিল্লাহ" বলে প্রকার লাফিয়েই উল্লাস পালন করলো। শুধু খুশি হতে পারলাম না আমি। উনার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই দু ফোঁটা নোনাজল টপটপ করে পড়লো চোখ বেয়ে। আমি চমকালাম! জল গড়ানোর জন্য নয়, চমকালাম জলেদের শেষ গন্তব্য আবিষ্কার করে। নীবিড় ভাইয়ার প্রসস্থ হাতে আমার নোনাজলের দুফোঁটা গিয়ে জমাট বেঁধেছে। ব্যাপারটা অতিদ্রুত হওয়ায় চমকানোর তীব্রতা বেশ চড়াই ছিলো। আমি অবাক চোখে নীবিড় ভাইয়ার পানে তাকালাম, উনি গম্ভীর গলায় বললেন,
------- "আসার সময় বলেছিলাম তোমার জন্য পুরোপুরি ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। যার শুরু হয়তো চোখের জল ফেলে তবে শেষ এক চিলতে হাসি দিয়েই।"
কথাটার অর্থ আমার ছোট্ট মস্তিষ্কে খেললো না। বাক্যটা নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করার মুহুর্তেই হুড়োহুড়িয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো কয়েক জোড়া পা। আমি-নীবিড় ভাই দু'জনেই চমকে সেদিক পানে তাকালাম। চিরচেনা মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ছুট লাগালাম আমি। সোজা গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম ভাইয়েদের। এবার আর নীবিড় ভাইয়া বাঁধা দিলেন না। ঠোঁটে চমৎকার এক হাসি ফুটিয়ে তুলে এগিয়ে এলেন উনিও।
রুশো ভাইয়া-অগ্নি ভাইয়া আমায় শক্ত করে চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অগ্নি ভাইয়া আহত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
------- "বিয়ে কি হয়ে গেছে?"
আমি ছলছল চোখে চেয়ে মাথা নোয়ালাম। অদ্ভুত! অগ্নি ভাই বিয়ের জন্য নয়, হতাশ হলো বিয়ের ভোজন করতে না পারায়।
------- "আবে দুলাবাবু, আমি তোর বিয়েতে কবজি ডুবায় খামু বলে বলে এতোদিন পেটে কূয়ার সমান জায়গা বাঁচায় রাখছিলাম। আর তুই কি করলি? এম্নে চিপায় চাপায় বিয়া কইরা নিলি? ব্যাটা ধোকাবাজ! সীমারও একটা বাটপারি আছে!"
নীবিড় ভাই হাসলেন। অগ্নি ভাইয়ার পিঠে কিল বসিয়ে দিয়ে বললেন,
------- "তোর বউ যেনো জামাইয়ের ভূরি নিয়ে আজীবন আক্ষেপ না করে তার সলিউশন দিয়ে দিলাম। তোর তো আমায় ধন্যবাদ জানান উচিত, শালাবাবু!"
আমার হৃদপিন্ড দ্বিতীয় বারের মতো খন্ড-বিখন্ড পরিণত হলো। এসব কি বলছে ভাইয়া? নীবিড় ভাইয়ার সাথে কি অগ্নি ভাইয়াও পাগল হয়ে গেছে? আমি এবার করুন চোখে তাকালাম রুশো ভাইয়ার পানে। রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টে আমার দুঃখে খানিকটা দুঃখী দুঃখী অনুভূতি আনার চেষ্টা চালালো। আমার আগা-গোড়া পর্যবেক্ষণ করে বলল,
------- "ছুটকি, তোকে তো পুরাই প্রিন্সেস লাগছে রে! ইশশ! আমি ভাবতেই পারছিনা, তোর জন্য...শুধুমাত্র তোর জন্য আমি আমার আইডল 'সাদমান শাহরিয়ার নীবিড়ের" দু নম্বর শালা হতে পেরেছি। থ্যাংকিউ সো মাচ ছুটকি! তোর জন্য আমি কিটক্যাটের বাড়ি বানিয়ে দেবো দেখিস।"
এই নিয়ে তৃতীয় বারের মতো মন ভাঙলো আমার। রুশো ভাইয়াও একই গোয়ালের মাথামোটা বাছুরের ন্যায় আচরণ করবে এমনটা স্বপ্নেও ভাবিনি আমি! এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? আর নিত্য আপু? নিত্য আপুও তো মুখে হাসি লাগিয়েই রেখেছে। আমি কাঁদোকাঁদো মুখ করে পেছনে তাকালাম এবার। ধীর পায়ে এগিয়ে আসা আম্মু-আব্বুকে দেখেই বুকটা আরো খানিকটা ভারী হয়ে এলো। মেয়েকে বুকে আগলে তারাও অনুভূতির বিনিময় চালালেন। মা জননী আমার কপালে হাত রেখে বললেন,
------- "সুখী হ মা। অনেক বড় হ!"
------- "নীবিড়ের মতো সুপাত্র দুটো হয়না রে অনু। দেখিস ও তোকে অনেক ভালো রাখবে।"
আম্মু-আব্বুর চোখেমুখে এমন আকস্মিক মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সুপ্ত কোনো ব্যাথার প্রকাশ ঘটছে। তবে নিয়তিকে মেনে নেওয়াই কাম্য ভাবছে তারা। আমি নিরুপায়, অসহায় শুধু একেকজনের চালচলন দেখছি। আম্মু-আব্বু নীবিড় ভাইয়াকে কড়া করে দুটো কথা শোনানো তো দূরে থাক যখন বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করলো তখন নিজেকেই নিজের পরিবারের কাছে আগাছা বলে বোধ হতে লাগলো। যেনো আমার কোনো মূল্য নেই, আমার কোনো ভূমিকা নেই। আমার মতামতের আদৌ কোনো গুরুত্ব নেই। আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জমা নোনাজলগুলো মুছলাম। অভিমানে পরিপূর্ণ মনটা বলে উঠলো, "তোর এখানে থাকা সাজে না।" মনের সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত পা চালালাম আমি। এক ছুটে ড্রয়িং রুম থেকে দোতলার ঘরটায় উঠেই প্রকাণ্ড শব্দে দরজা লাগিয়ে দিলাম। একা থাকা প্রয়োজন বর্তমানে। ওরা কেউ আমায় বুঝবেনা, আমার নিজেকে নিজেরই সামলাতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না।
______________________________________
অনন্যাকে এভাবে ছুটে ঘরে যেতে দেখে সব জোড়া চোখেই বেদনার ছায়া দেখা গেলো। তবে আগ বাড়িয়ে আটকালো না কেউই। নীবিড় নিত্যকে ইশারায় বলল 'ঘরে যেতে' তবে নিত্য যেতে চাইল না। আকুতিভরা চোখে চেয়ে বোঝাল 'ভাইয়া, থাকি না একটু। আমি এখন যথেষ্ট এডাল্ট।' নীবিড় আর কথা বাড়ালো না। বোনেরও হয়তো এই কঠিন সময়ে উপস্থিত থাকা দরকার। বাস্তবতা বোঝা দরকার। নীবিড় নিত্যকে সকলের সাথে সোফায় বসতে বলে নিজেও বসলো। রুশো কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে প্রশ্ন ছুড়লো প্রথম,
------- "ব্রো, তোমার কি মনে হয় যা হচ্ছে সব ঠিক হচ্ছে? ছুটকির ওপর কোনো নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট পড়বে না তো?"
রুশোর কথার রেশ ধরে মিস্টার আহমেদও বললেন,
------- "নীবিড় বাবা, আমরা যথাসম্ভব স্বাভাবিক আচরণ করছি কিন্তু চিন্তা তো একটা থেকেই যায়। মেয়ে আমার ছোট, সবে কলেজের গন্ডি পেড়িয়ে ভার্সিটির মুখ দেখল। আর এখনই এসব!"
------- "সেটাই মূল সমস্যা বাপী। ও বয়সে ছোট, বাচ্চা একটা মেয়ে। ও হতে পারে ১৮+ কিন্তু, বয়সের তুলনায় ওর মানসিক বয়সের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। এই মানসিকতায় এতো চাপ ওর পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। আজ যদি ওকে নিয়ে মিডিয়ায় নোংরা নোংরা লাইনগুলো প্রচার হতো তবে ও পুরোপুরি ভেঙে পড়তো। আমি যতটা আশংকা করছি হয়তো তার থেকেও বাজে পর্যায়ে পৌঁছত। আর ওকে নিয়ে দেহব্যবসার মতো জঘন্য কোনো প্রসঙ্গ উঠুক তা না আমি চাই আর তোমরা। এই হঠাৎ বিয়েটা হয়তো প্রথম প্রথম ওর ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করবে বাট বিলিভ মি সেই প্রেশার বিয়েটা না হলে যে প্রভাব ফেলত তার ১০ ভাগের এক ভাগও নয়।"
বিনিময়ে কেউ কোনো উত্তর দিলোনা। আজকের ব্রেকিং নিউজ থেকে এতটুকু পরিষ্কার নীবিড় স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় না দিলে বিশ্রী এক খবরে মুখরিত হতো সোশ্যাল মিডিয়া। শুধু সোশ্যাল মিডিয়াই নয়, লোকমুখে বাজে উক্তির পরিস্ফুটন ঘটত। আর যাই হো, নিজের মেয়ের গেয়ে কলঙ্কের দাগ লাগুক, তা কোনো বাবা-মা'ই মেনে নিতে পারে না। মিস্টার এবং মিসেস আহমেদও তার ব্যতিক্রম নয়।
নীবিড়ের বিপরীতে সবাই যখন চুপ তখন আবারও রুশো প্রশ্ন করে বসলো,
------- "কিন্তু ব্রো, তুমি তো সত্যিটাও বুঝিয়ে বলতে পারতে!"
নীবিড় তাচ্ছিল্যের হাসিতে ঠোঁট রাঙাল। রুশোর কাঁধে হাত রেখে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল
------- "জানো তো রুশো, দুনিয়াটা না এতোটা সহজ নয়। সকলের দৃষ্টিতে হয়তো আমি যেই পজিশনে আছি তাতে রয়েছে শুধু বিলাসিতা আর সুখ। অথচ বাস্তবটা পুরোপুরি উল্টো। একজন পাবলিক ফিগার হওয়া চারটে খানি কথা নয়। অগ্নিকেই জিজ্ঞেস করে দেখো না, ও কেনো নিজের পরিচয় গোপন রেখে গান গায়!"
রুশো একবার তার ভাইয়ের চুপসে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। অগ্নির পলক ঝাপটানিতে বুঝল আসলেই পাবলিক ফিগার হওয়া অতিমাত্রায় সুখের কোনো বিষয় নয়।
------- "একজন পাবলিক ফিগারের ভালো-খারাপ উভয় মন্তব্য হজম করারই ক্ষমতা থাকতে হয়। আমি এইযে ৬ টা বছর এই পেশায় জড়িত আছি, প্রথম প্রথম কিন্তু খুব উৎসাহ পেয়েছি এমনটা নয়। এককালে আমার হেটার্সের সংখ্যা গণনা করলে নির্ঘাত মাথায় প্যাঁচ লেগে যাবে তোমার। আমার এসব ভালোমন্দ শোনার অভ্যেস আছে। আমি আদৌ মিথ্যে কোনো অপবাদে গা ভাসাই না। কিন্তু অনন্যা? ও অনেক নরম মনের মানুষ। যে মেয়ে সামান্য একটা আঘাতপ্রাপ্ত পাখি দেখে কেঁদে ফেলে সে কী এসব হেইটরেড, এসব অপবাদ নিতে পারবে? নেভার!
মিডিয়া চোখে বা কানে যা শোনে তাই বিশ্বাস করে, তারা চোখে যা দেখবে তাই খবরের কাগজে নিজেদের মতো করে ছাপিয়ে দেবে। ঘেটে দেখতে যাবেও না আসল ঘটনা কী। আর আজ যেই ঘটনাটা ঘটেছে তা কিন্তু ষড়যন্ত্র করে ঘটানো হয়েছে। আমার সেন্স ছিলো না, জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আর অনন্যাকে একই রুমে আবিষ্কার করি আমি। তারপর কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই মিডিয়ার আগমন। তুমি কি ভেবেছ আমি যদি তখন বলতাম 'আমি এসবের কিছু জানি না' তবে ওরা তা মেনে নিতো? উহুম! কক্ষনও না! হ্যাঁ এটা ঠিক, আমি হয়তো আসল কালপ্রিটকে ধরে কয়েকদিনের মাঝে মিডিয়াকে দেখিয়ে দিয়ে পারতাম, কিন্তু ততোদিন ঠিক কতো রকমের অপবাদ যে অনন্যাকে দেওয়া হতো তার কোনো হিসেব রাখা সম্ভব নয়।"
নীবিড়ের যুক্তিসঙ্গত কথাগুলোর বিপরীতে আর প্রশ্ন ওঠার মতো পরিস্থিতি রইলো না। মিস্টার এবং মিসেস আহমেদ দীর্ঘশ্বাসের পাশাপাশি স্বস্তিভরা শ্বাস ফেললেন। নীবিড় ভীষণ বিচক্ষণ একজন ছেলে। তার সুক্ষ্ম, ঠান্ডা মস্তিষ্কের জন্য বরাবরই মানুষজন প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমন একজন ছেলের ঘরে নিজের মেয়েকে বউ করে পাঠানো আদৌ কোনো দুঃখের সংবাদ হতে পারেনা। এতো চাওয়ার থেকেও বড় পাওয়ার সমান। সবার গভীর ভাবনার মাঝেই আবারও কথা বলে উঠলো নীবিড়,
------- "বাপী-মামনি, তোমরা আমায় ভুল বুঝ না। আমি আমার নেইম-ফেইম এসবের কাছে তোমাদের মেয়েকে বিক্রি করতে বলিনি। মানুষ বিক্রি হওয়ার মতো কোনো পণ্য নয়। আমিও আর পাঁচটা মানুষের মতো সাধারণ একজন মানুষ। তোমাদের আমি সেই প্রথমদিন থেকেই বলে আসছি, 'ক্যারিয়ার দেখে নয় ব্যক্তিত্ব দেখে জাজ করো আমায়' আর আমার বিশ্বাস তোমরা আমার ক্যারিয়ারের আগে আমার ব্যক্তিত্ব দেখেই এই বিয়েতে মত দিয়েছ।"
অনামিকা এবং মিস্টার আহমেদ দুজনের চোখের পলক ঝাপটে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন। তারপর অনামিকা নীবিড়ের মাথায় মমতায় আপ্লুত হয়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। জলেসিক্ত চোখদুটোয় নীবিড়ের স্নিগ্ধ মুখখানার প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে বললেন,
------- "হ্যাঁ রে বাবুই। তোর মতো ছেলে হয়না! তোকে জামাই হিসেবে পাওয়া যে আমাদের পরম ভাগ্য!"
নীবিড় হাসলো। তার গভীর চোখদুটোও যেনো কথা বলে উঠলো, 'তোমাদের মতো বাবা-মা পাওয়াও আমার পরম ভাগ্য মামনি.' অগ্নি এতোক্ষণ চুপ ছিলো, সবার মত বিশ্লেষণের পর নীবিড়ের পাশে গা ঘেঁষে বসল। সন্দেহী গলায় কানেকানে বলল,
------- "সবই ঠিক আছে। কিন্তু ভালোবাসা? তুই আয়ুকে ভালোবেসে বেঁধে রাখতে পারবি তো নীবিড়?"
নীবিড় কোনো বনিতা না করে সোজাসাপটা জবাব দিলো,
------- "আমি তোর মতো এতোটা উদার নই রে। আমি আমার ভালোবাসার জিনিসগুলোর প্রতি স্বার্থপর। ভীষণ স্বার্থপর!"
#চলবে_____________
[ কিছু বলতাম না।]