#প্রেম_আমার♥(সিজন-টু)
#পর্ব-৫৩♥
#আয়ানা_জাহান_নুসরাত♥
বিয়ে, স্বামী, সংসার এই বিষয়গুলো আমার ডিকশনারীতে ছিলোনা কোনোকালেই। আমি বরাবরই ছন্নছাড়া স্বভাবের একজন মানুষ। আর পাঁচটা বিচক্ষণ মানুষের মতো ভেবেচিন্তে ধাপ ফেলা আমার কর্ম নয়। আমি এতোটাই অলস যে আমার গভীর ভাবে চিন্তা করার জন্য যেটুকু ব্রেইনে চাপ ফেলতে হয় সেটুকু চাপও ফেলতেও মুখ বাঁকাই। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ধেয়ে চলি। আগামীতে কি হবে তা না ভেবে বর্তমান নিয়েই যতটা সম্ভব মেতে থাকি৷
একটা সময় ছিলো যখন লোকে "এইম ইন লাইফ" বলতে শুধু ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়াই বোঝাত। আমিও ছিলাম হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেরানো মফিজ। পৃথিবীতে এই দুটো পেশাই স্রেফ রয়েছে ভেবে প্রথম প্রথম ডাক্তার হতে চাইতাম। তারপর বয়স বেড়ে যখন ৭ এর ঘরে পৌঁছল তখন বুঝলাম হুটহাট পড়ে গিয়ে নিজের রক্ত দেখলেই বেহুশ হতে ধরা আমি আর যাই হোক ডাক্তার হতে পারবো না। সেই থেকেই ডিসিশন চেঞ্জ করে ভেবে নেই ইঞ্জিনিয়ার হবো। এর পর থেকে যখনই কোনো মুরব্বি আমায় জিজ্ঞেস করতো, "আয়ানা বুড়িটা কী হতে চায়?" তক্ষুনি বুক ফুলিয়ে বলতাম আমি "ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়।"
অথচ সেই আমিই ইঞ্জিনিয়ার হতে যা যা করার প্রয়োজন তার বিন্দুমাত্রও করিনি। হাস্যকর বিষয়, এখন ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে পরীক্ষা না দিয়ে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ছি। অদ্ভুত হলেও আমার "এইম ইন লাইফ" কখনই ফিক্সড ছিলো না। বাবার ফোন কিনে দেবার পর থেকেই টুকটাক ছবি তোলার শখ ছিলো। গ্যালারি ঘেটে ফেখলে এমন বহু মাস্টারপিস দেখা যাবে। আমি যখন অনুভব করলাম ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এসব হতে পারব না। তখনি ফটোগ্রাফির প্রতিই ঝোঁকটা বেড়ে যায় আমার। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত একই ভাবনাতেই আটকে রয়েছি আমি। লক্ষ্যে পৌঁছতে পরিশ্রম করিনা যদিও তবু এই আমার বর্তমান এইম ইন লাইফ।
আমার এই দায়সারা জীবনটা হঠাৎ করেই পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ইদানীং একটু বেশিই। আজকাল আমায় ভেবে ভেবে ধাপ ফেলতে হচ্ছে। ভাবাভাবি সংক্রান্ত বিষয়গুলো মগজে ঢোকাতে হচ্ছে। এই পরিবর্তন এমনি এমনি হয়নি অবশ্য। হয়েছে সাদমান শাহরিয়ার নীবিড় নামক এই মানুষটার জন্য, যাকে আমি প্রথম দেখায় একটা বড়সড় সাদা বিলাই ছাড়া কিছুই ভাবিনি। দিনটি ছিলো আমার জীবনের প্রথন ফ্লাইটের দিন। সেই দিন থেকেই আজ পর্যন্ত এই মানুষটার আগমনে আমার জীবনের অধ্যায়গুলোয় ভিন্নতা এসেছে। ইমোশনলেস মানুষের যেই তকমাটা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছি সেই তকমাটাও দিন দিন উবে যাচ্ছে। এখন আমি সব সময়ের মতো ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে রাখি না। বিশেষ কোনো হাসার প্রসঙ্গ উঠলে তবেই হাসি। কান্না নামক শব্দটা আমার জীবনের পাতায় খুব কম এলেও আজকাল কান্নাগুলো সাক্ষাৎ করতে চায়। এই যেমন অতিরিক্ত খুশি বা অবাক হলে চোখের কোণে পানি জমে, কিংবা অতিরিক্ত রেগে গেলে। কষ্টের জন্য খুব কমই কেঁদেছি আমি। এতোদিনে এটুকু বুঝতে পারছি, এই মানুষটার আগমনেই ইমোশন'গুলো বদলেছে আমার।
এইযে আজ নাকি আমাদের বাসর রাত। ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা বিছানায় স্বামী-স্ত্রী একসাথে ঘুমোবে এমনটাই হবার কথা। কিন্তু আমি তা চাইনা, আবার নীবিড় ভাইয়া আমার রেখে সোফায় গিয়ে ঘুমোবে এমনটাও হতে দেওয়া যায়না। আমি উনাকে বলেছিলাম, বাসায় তো এতোগুলা ঘর তবে আমি অন্য কোনো ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু নীবিড় ভাই রাজি হন নি, বলেছেন উনার বাবা যদি এমনটা দেখতে পায় তবে কষ্ট পাবেন। উনার বাবারও নাকি আমার মায়ের মতো হাই প্রেশার। সামান্য জিনিসগুলো নিয়ে ব্যাপক চিন্তা করে শরীরের বারোটা বাজাতে ওস্তাদ। যেহেতু আমার মা'কে দেখে দেখেই বড় হয়েছি সেহেতু শ্বশুর মশাইকে একই বিপাকে ফেলতে আমি পারবো না। এখন আমার ভাবনা-চিন্তাগুলো মাথায় পোকার মতো কুটকুট করে কামড়াচ্ছে। ভাবতে চাইছিনা তবু ভাবতে হচ্ছে। নীবিড় ভাইয়া ঘরের এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছেন। আর আমি বলদের মতো মেঝের দিকে তাকিয়ে। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়? ঘুমে চোখের চৌদ্দ অবস্থা। আমি অবশেষে ঘুমে টুপতে টুপতে বলে উঠলাম,
------- "শুনুন!"
নীবিড় ভাইয়া হাঁটা থামালেন। ডান সাইডের ভ্রু উঁচু করে আমার পানে তাকিয়ে বললেন,
------- "কী?"
------- "আপনি বরং খাটে ঘুমোন, আমি ওই সোফাটায় ঘুমিয়ে পড়ব। অনেক ঘুম পেয়েছে, শুয়ে পড়ুন তো। "
নীবিড় ভাইয়ার কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠলো। ধমকের সুরেই বলে উঠলেন উনি,
------- "ইম্পসিবল! আমি থাকতে তোমাকে সোফায় কষ্ট করে শুতে হবে না। আর তোমাকে খাটে শুতে বলেছি না আমি? এখনও বসে আছো কেনো? শুয়ে পড়!"
আমি ঘোলাটে চোখে তাকালাম। মিনমিন করে বললাম,
------- "কিন্তু আপনি কোথায় ঘুমোবেন?"
নীবিড় ভাইয়ার সেই একই উত্তর,
------- "আমি যেখানেই হোক ঘুমিয়ে পড়ব। তোমার এতো চিন্তা করতে হবে না।"
বুঝলাম আমার কথা শুনবেন না উনি। তবু লাটসাহেবের মেয়ের মতো পুরো বিছানা দখল করে তো ঘুমোনো যায় না। হাজার হোক উনি একজন নাম করা স্টার। উনার মতো একজন সেলিব্রিটি কি-না এতো ঘর এতো নরম বিছানা থাকতে সোফায় ঘুমোবেন? তা কি হতে দেওয়া যায়? উহুম কক্ষনও না। আমি ঠোঁট কামড়ে ধরে মনস্থির করলাম। খাটটা সাইজের দিক থেকে বেশ বড়। দৈর্ঘ্য বরাবর নিশ্চিন্তে তিনজনের জায়গা হয়ে যাবে। তবে মাঝে একটা কোলবালিশ রেখেও তো ঘুমোনো যায়! আমি বিষয়টা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করলাম। এই ফুলে ফুলারন্য বিছানায় পাশাপাশি ঘুমোতে চরম লেভের অস্বস্তি হলেও তা ব্যতীত কোনো উপায় পেলাম না। আমি হতাশ গলায় জবাব দিলাম,
------- "এইযে শুনুন, আমি খাটের এই কর্ণারে শুয়ে পড়ছি। আপনি ওপাশে শুয়ে পড়ুন।"
নীবিড় ভাইয়ার হঠাৎ করেই চক্ষু চড়কগাছ হলো। কথাটা হয়তো ভুল শুনেছেন এমনটা ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন উনি,
------- "ওয়েট ওয়েট, কি বললে তুমি? আবার রিপিট করো তো।"
------- "বলছি যে, আপনি আমি এক বিছানাতেই কিন্তু শুতে পারি। মাঝে জায়গা গ্যাপ রাখলেই হয়ে যাবে। আসুন, শুয়ে পড়ুন।"
আমি কথাটা বলা শেষ করেছি বোধহয় দু সেকেন্ডও হয়নি ততক্ষণে এক লাফে বিছানায় এসে শুয়ে পড়া সারা নীবিড ভাইয়ার। আমি চমকে উঠে বিদ্যুৎ গতিতে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটায় মনোযোগ দিলাম। নীবিড় ভাইয়া বিছানায় শুয়ে আয়েশ করে আমার পানে তাকালেন। শীতল গলায় বললেন,
------- "এই ছোট্ট একটা কথাটা এতক্ষণ বাদে কেনো বললে বউ? ধুর! শুধু শুধু পরিশ্রম করালে! এসো এসো, শুয়ে পড়। জলদি...!"
আমি শুকনো ঢোক গিলে বিছানার ওপাশে গিয়ে বসলাম। ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
------- "আপনি এতোটা এক্সাইটেড কেনো হচ্ছেন নীবিড় ভাইয়া, আপনার কোনো বদমতলব নেই তো?"
নীবিড় ভাইয়া একহাতে ভর রেখে কাঁত ঘুরে শুলেন। ঠোঁটে চমৎকার এক হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
------- "তুমি যেটাকে বদমতলব বলছ সেটা কিন্তু অন্য মেয়েদের কাছে অতি কামনার বিষয়বস্তু!"
আমার হঠাৎ করেই কি যেনো হলো বুঝলাম না। তবে মেজাজটা অসম্ভব রকম চটে গেলো। অনেকটা ঝাঁজ মেশানো গলাতেই বলে বসলাম,
------- "এই আপনি কি বললেন? অন্য মেয়েদের কামনা মানে কী হ্যাঁ? আপনি আমায় বিয়ে করে অন্য মেয়েদের নিয়ে ভাবছেন?"
বিনিময়ে ঠোঁটের বাম কোণ প্রসারিত করলেন নীবিড় ভাইয়া। ভ্রু বাঁকা করে দুষ্টুমি মাখা গলায় বললন,
------- "এখন বউ যদি কাছে ঘেঁষতে না দেয়, আদর করতে না দেয় তবে আমার কী দোষ?"
আমি তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চোখ নামালাম। শরীরের লোমগুলো আজকাল ঠান্ডায় নয় এই লোকের অস্বস্তিকর কথা গুলোয় দাঁড়িয়ে যায়। ইশশস, এতোটা নির্লজ্জ কবে হলেন উনি? নীবিড় ভাইয়া আমায় লজ্জায় মাথা নোয়াতে দেখে মৃদু হাসলেন। উল্টোদিকে ফিরে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
------- "ডোন্ট ওয়ারি অনন্যা, আমি তোমার কাছে স্বামীর অধিকার নিয়ে ততদিন আসবো না যতদিন না তুমি নিজে থেকে আমায় ডাকছ। এন্ড আই চ্যালেঞ্জ ইউ, একটা সময় তুমিই আমার কাছে আসবে, কষ্ট করে তোমায় আর ডাকতে হবে না আমার।"
আমি আড়চোখে একপলক তাকালাম। নীবিড় ভাইয়া উল্টোদিকে ফিরে রয়েছেন। মাঝখানে আরেকজন মানুষের থাকার মতো জায়গা হয়ে যাবে সহজেই। আমি ভয়ে ভয়ে বিছানায় গা ছেড়ে আরেকটু গুছিয়ে নিলাম গায়ের পোশাক। জিজ্ঞেস করলাম,
------- "আর যদি তা না-হয় তবে?"
নীবিড় ভাইয়া চট করেই আমার পানে ফিরে তাকালেন। কোনো বনিতা না করেই বলে দিলেন,
------- "আনড্রেস মি দেন।"
বিনিময়ে বিস্ফোরিত চোখে তাকাতেই নিজের বাম চোখটা টিপে দিলেন উনি। তারপর উল্টোদিকে ফিরে টেবিল ল্যাম্পটা বন্ধ করে দিলেন এবং সাথেসাথেই পুরো ঘর অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গেলো। আমার বিধ্বস্ত মন আনমনেই বলে উঠলো,
------- "ইশশ মানুষটা ভীষণ অসভ্য!"
______________________________________
এসএন ম্যানশনের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখেই গাড়ি থামানো হলো। সোডিয়াম বাল্বের পাশাপাশি গেইটের সাথে লাগানো বাল্বের আলোয় গাড়িটা বেশ সহজেই দৃশ্যমান হবে বিধায় এগোনোটা রিস্কি হয়ে যেত খুব। অগ্নি ফুস করে শ্বাস ফেললো। নিত্যর আশাভরা মুখটার দিকে না তাকিয়েই বলল,
------- "সাবধানে যেও!"
নিত্য ঠোঁট উল্টে একবার ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। রাত প্রায় ১ টার কাছাকাছি। বিছানায় কোল বালিশকে ঢেকেঢুকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে সে। এখন সেই কোলবালিশের কাছেই ফেরার সময়। নিত্য পলক ফেলে অগ্নির পানে তাকালো। নিত্যর মনে হলো অগ্নি ভীষণ কেয়ারলেস হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। চুলগুলো আগের তুলনায় বেশ বড় হয়ে গেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো নিত্যর কাছে অগ্নিকে এই চুলে আরো বেশিই মারাত্মক লাগছে। যেনো এই বড় চুলের জন্য অগ্নির সৌন্দর্যটা আরো শতাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্য মায়াভরা চোখে চেয়ে অগ্নির উদ্দেশ্যে বলল,
------- "আপনিও সাবধানে ড্রাইভ করে বাসায় ফিরবেন কিন্তু!"
অগ্নি পলক ঝাপটে মাথা নোয়াল। নিত্য ঠোঁট কামড়ে ধরে সিট বেল্ট খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল,
------- "আর যা যা বলেছি মনে আছে তো?"
অগ্নি বুকে চাপা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে জবাব দিলো,
------- "হু, মনে আছে।"
------- "গ্রেট! দ্যটস লাইক আ গুড বয়! আসছি তবে। নিজের খেয়াল রাখবেন। আর একটা কথা...!"
অগ্নি উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল নিত্যর পানে এবং প্রায় সাথেসাথেই অগ্নির গালে আলতো করে চুমু খেয়ে ছিটকে সরে এলো নিত্য। অগ্নি স্তব্ধ হয়ে এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকাল। ততক্ষণে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে নিত্য। বাহির থেকেই হাত নাড়িয়ে বলল সে,
------- "আর কথাটা হচ্ছে, আপনাকে বড় চুলে মারাত্মক হট লাগে এজে সাহেব। খেয়াল রাখবেন, অন্য রমণীরা যেনো নজর না দেয়।"
কথাটা বলেই দুষ্টু হেসে হাঁটা ধরল নিত্য। অগ্নি বোবা হয়ে এক দৃষ্টিতে তার যাওয়ার পানেই চেয়ে রইলো স্রেফ। ততক্ষণ পলক ফেললো না যতক্ষণ পর্যন্ত নিত্য দৃষ্টি সীমার বাহিরে না চলে যায়। নিত্য যখন গেইট ম্যানদের ভুলিয়ে ভালিয়ে ভেতরে ঢুকতে নিলো তার কয়েক সেকেন্ড পূর্বে ঘাড় ঘুরিয়ে অগ্নির নির্নিমেষ চোখে চেয়ে থাকা ঘোলাটে মুখটার পানে তাকাল। দূর থেকেই মিষ্টি হেসে ডান চোখটা টিপে দিলো সে। অগ্নি বুঝলও না কখন তার ঠোঁটে প্রশান্তিতে মাখা হাসি ফুটে উঠলো। পলক ফেলে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো সে। আজকের দিনের আগ পর্যন্ত সে নিজেকে বহু কষ্টে হলেও ধরে রেখেছিল কিন্তু আজ নিত্য যেই পাগলামিটা করলো তা পাগল হতে বাধ্য করেছে তাকেও। অগ্নির পক্ষে আর সম্ভব নয় এই মায়া কাটিয়ে বের হওয়া। সে নিত্যকে নিজের করে নেবে, সে যে করেই হোক। মেয়েটাকে যে কথা দিয়েছে অগ্নি! এই ভালোবাসা থেকে কি দূরে থাকা যায়?
অগ্নি নিজ মনে হাসলো। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যেই রওনা হতেই মনে হলো বুকটা আজ ভীষণ হাল্কা লাগছে তার। এতদিন যাবৎ কোনো এক অদৃশ্য পাথর হয়তো সেই বুকে চেপে রাখা ছিলো। যা তাকে ক্ষণে ক্ষণে পোড়াত, নিঃশব্দে কাঁদাত, তিল তিল করে মারত। তবে সে পাথরের ক্ষমতা ভালোবাসার সামনে টিকতে পারেনি। নিত্যর জেদ, নিত্যর উষ্ণ ভালোবাসা সব কিছুকে হার মানিয়েছে আজ।
_______________________________________
নীবিড়ের ঘুম বরাবরই ভীষণ পাতলা। আশেপাশে কোনো কানে লাগার মতো ক্ষীণ আওয়াজ হলেই ঘুম ভেঙে যায় তার। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। টানা দেড় ঘন্টা ঘুমোবার পর নীবিড় আবিষ্কার করল অনন্যার ঘুমোনোর ধরণ একেবারেই ভালো নয়। শীতের জন্য এমন করছে কি-না জানা নেই। তবু এটুকু স্পষ্ট অনন্যার হাত-পা ছোটাছুটির অভ্যেস আছে বেশ। এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো নীবিড়ের পায়ের ওপরে পা তুলে দিয়েছে। নীবিড় তার পা সরিয়ে যতই কর্ণারের দিকে চেপে আসছে ততই নিজ অবস্থান থেকে নীবিড়ের পানে চেপে আসছে সে'ও। আর হাত দিয়ে কম করে হলেও দু'বার বুকে ঘুষি মেরেছে। নীবিড়ের ভাবনা, স্বপ্নে নির্ঘাত কোনো ভূতের লুঙ্গি নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে মেয়েটা। আবার থেকে থেকেই বিড়বিড় করে কিসব যেনো বলছেও। নীবিড় কিউরিওসিটির বশে অনন্যার মুখের কাছে কান নিয়ে গেলো। ক্ষীণ আওয়াজে শুনতে পেলো,
-------- "শিক্কুরুন....শিক্কুরুন, সুরেগি!"
নীবিড়ের ভ্রু যুগল আপনা-আপনিই কুঁচকে এলো। সর্বনাশ! এ তো ঘুমের ঘোরে কোরিয়ানে গালিগালাজ করছে। নীবিড় কপাল চেপে ধরলো হতাশায়। সরে এসে কোনোরকমে শুতে নিতেই নিজের জায়গা থেকে গড়িয়ে নীবিড় বুকে এসে থামলো অনন্যা। নীবিড় কয়েক মুহুর্তের জন্য শ্বাস আটকে ধরে রইলো। বোঝার চেষ্টা চালালো এসব আসলে কি হচ্ছে তার সাথে। অনন্যা যে ভীষণ বাজেভাবেই স্বপ্নে কাউকে উদাম কেলানি দিচ্ছে তা তো স্পষ্ট। কিন্তু একে এখন সামলাবে কিভাবে সে? নীবিড় কি তবে অনন্যাকে ডেকে ঘুম ভাঙাবে? উহুম, তা হয়তো ঠিক হবে না। দেখা যাবে লজ্জায় সারারাত না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিবো মেয়েটা। নীবিড় আর কোনো উপায় না দেখে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে শুয়েই রইলো। দেখতে লাগলো অনন্যা ঠিক কি কি করে। অনন্যা বোধহয় এবার শীতে কাবু হয়েই কুঁকড়ে নীবিড়কে কোলবালিশের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। নীবিড় খুব বেশি চমকালো না এবার বরং ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললো। ব্ল্যাংকেটটা টেনে ভালোমতো অনন্যা ঢেকে দিলো। ঘুমন্ত মুখটা দেখার লোভ সামলাতে না পেরে হাত বাড়িয়ে ডিম লাইটা জ্বালাল। মৃদু আলোয় অনন্যার মুখটা দৃশ্যমান হলো অনেকটাই। ইশশশ কি নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছ সে। নীবিড়ের ইচ্ছা হলো ঠোঁটটায় আলতো করে চুমু খাওয়ার। কিন্তু তা সে করবে না। ভালোবেসে প্রথম চুমুটা অনন্যার থেকেই আদায় করে নেবে সে। নীবিড অনন্যার কোমল ঠোঁটটায় আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল। তাতে স্লাইড করতে করতে মনে হলো মেয়েটা অতিমাত্রায় কিউট। ওকে আর পাঁচটা মেয়ের মাঝে রাখা হলে লোকে সুন্দরী হিসেবে না হলেও কিউটনেসের জন্য চট করেই আলাদা করতে পারবে।
নীবিড় ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো। অনন্যাকে নিজের প্রশস্ত শরীর বিলিয়ে দিয়ে চোখদুটো বুজে নিলো। অনন্যা যখন নীবিড়ের বুকে মুখ গুঁজে দিলো তখন নীবিড়ের মনে হলো এই পৃথিবীতে তার মতো সুখী মানুষ আর দুটো নেই। নীবিড় দুচোখ বুজে রেখে আনমনেই বলে উঠলো,
------- "থ্যাংকিউ জারা, থ্যাংকিউ সো মাচ!"
______________________________________
পুবাকাশে দিনের আলো ফুটেছে সবে৷ কুয়াশায় ঢাকা চাদরটা কাটতে শুরু করেছে। শিশির ভেজা ঘাসগুলো মুক্তার ন্যায় চমকাতে শুরু করেছে। সেই সাথে জানালা ভেদ করে চোখে এসে পড়েছে স্নিগ্ধ আলো। রাত্রি চোখ ঘষতে ঘষতে উঠে বসলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে যখন আবিষ্কার করল ৬ টা পাড় করে প্রায় ৭ টার ঘরে ঘন্টার কাঁটা, ঠিক তক্ষুনি লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলো। ফ্রেশ হয়ে কোনোরকমে ঝটপট তৈরি হয়ে নিলো। বেচারির ফোনে বিন্দুমাত্র ব্যালেন্স ছিলো না। কাল বিকাল থেকে টিভির মিডিয়ার এক একটা নিউজ তার কাছে এক একটা যোগজীকরণের অংক বলে মনে হয়েছে। হাজার চেষ্টা চালিয়েও উত্তর মেলাতে পারেনি। একমাত্র সচক্ষে সবটা দেখে অনন্যার সাথে আলোচনার আগ পর্যন্ত কিচ্ছু বুঝে উঠা সম্ভব নয়।
রাত্রি বাড়ি থেকে বের হলো যত দ্রুত সম্ভব। বের হওয়ার আগে মোটা সুয়েটারটা গায়ে জড়িয়ে নিলো। বলা তো যায় না, অতিমাত্রায় উত্তেজনার ফলস্বরূপ মাঝ রাস্তাতেই আইসক্রিম হয়ে বসে থাকতে হয় কি-না।
রাত্রি স্টলের পাশ থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় আচমকাই তার মুখ চেপে ধরলো কেউ। চেঁচানোর সুযোগ পেলো না সে। তার পূর্বেই চিপা গলিটায় টেনে নিয়ে গেলো সেই হাতের মালিক। রাত্রি বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। আগুন্তকঃ তার মুখ ছেড়ে দিতেই বিস্ময়ে বলে উঠলো,
------- "আপনি!"
------- "এই এই চেঁচিয়ো না। আস্তে কথা বলো। ওরা শুনে ফেলবে!"
রাত্রি অবাক হলো। রুশোর সন্ধানী চোখে এদিক-ওদিক তাকানোর ভাবভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
------- "দেখে ফেলবে মানে? কে দেখে ফেলবে? কাদের কথা বলছেন?"
রুশো মুখে কিছু বলল না। হাতের ইশারায় গলির ওপারের গোডাউনটা দেখিয়ে দিলো সে।
#চলবে_____________
[ এতো লিখেও কেনো যে টানতে পারছিনা, বুঝছিনা!]