#অতৃপ্ত_চাহনা
#তুরঙ্গনা
পর্ব—|০২|
"হায় আল্লাহ!এসব কি হচ্ছে?"
তৃতীকা যেখানে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে তীব্র প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে,সেথায় তার সম্মূখে বসে থাকা আধীর রায়ান চৌধুরী এখনো তার দিকে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ফলাফলস্বরূপ তার চোখমুখ আতংকে শুকিয়ে আসছে নিমিষেই।
এভাবেই প্রায় বেশ খানিকটা সময় কেটে যাবার পর, আচমকা কারো কন্ঠে তৃতীকা মুখ তুলে তাকায়। আর তৎক্ষনাৎ দেখতে পায় এ.আর. তার নিরেট কন্ঠস্বরে বলছে,
"ইউ মে লিভ নাউ।"
এই বলতেই এ.আর. তার চোখ নামিয়ে নেয়। এবং তৃতীকার ফাইটা তার দিকে ঢেলে দেয়। এদিকে তৃতীকার হুঁশ এখনো ফেরেনি। বুঝতেও যেন পারল না কি হতে কি হলো? আর সত্যিই কি এতো তাড়াতাড়ি ইন্টারভিউ শেষ?
সে কিছুটা তব্দা খেয়ে সামনের তিনজের দিকে ইতস্তত নজরে তাকিয়ে দেখে। তার বিষয়টা যেন এ.আর. এর পাশে বসে থাকা বয়স্ক ব্যক্তিটা বুঝতে পারে। অন্যদের চেয়ে তৃতীকা বেশ ছোট এবং তার মায়াবী চেহেরা ও ইতস্ততবোধে যেন সে নিজেই তার মায়ায় পড়ে গিয়েছে।
তিনি তৃতীকার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ নমনীয় স্বরে বলে,
"মা! তুমি এখন যেতে পারো। তোমার ইন্টারভিউ শেষ।"
লোকটির অভিব্যক্তিতে তৃতীকার কপালে কিঞ্চিৎ ভাজ পড়ে। সে কয়েকবার চোখের পাপড়ি ঝাপটে নিজেকে আশ্বস্ত করে। এবং আর একটুও সময় নষ্ট না করে,নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে। তবে যাবার মূহুর্তে না চাইতেও একবার, পেছন ফিরে আঁড়চোখে এ.আর. ওরফে আধীর রায়ানকে দেখে নেয়।
________
চারপাশটা তীব্র বৃষ্টিতে আচ্ছন্ন। অত্যধিক বৃষ্টিতে এই মস্ত বড় শহরের রাস্তাঘাটে জরাজীর্ণ এক অবস্থা। চারপাশে কাঁদা,পানি জমা হয়ে ড্রেনে সাথে মিশে—গা গুলিয়ে যাওয়ার মতো আবহ তৈরি করেছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতেও চারপাশের ভীড়ে একটুও মানুষের উৎপাতের কমতি নেই। যে যার মতো নিজ নিজ কাজে ছুটছে।
বিকেলের সূচনালগ্নে এমন বৃষ্টি তৃতীকার কাছে বেশ বিরক্তিকর লাগল। শহরে এসেছে অল্প কয়েকমাস হলো। এসেই যেন এই নিত্যদিনের বিরক্তিকর পরিবেশে সে হাঁপ ছেড়ে দিয়েছে। অসহ্য লাগে তার এই শহর। অথচ কিছুই করতে পারবে না বিধায়,সে এই বিষয়ে ভীষণ অসহায়।
সকালের ইন্টারভিউ-এ কি হলো, সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। অবশ্য এখন আর সে এসব নিয়ে ভাবছেও না। ও চাকরি হওয়ার কোনো আশা নেই, এবং সে কোনো আশাও রাখছে না। দিনের পর দিন সাধারণ টিউশনি খুঁজে চলছে, অথচ তাই মিলছে না—সেথাও ওতো বড় অফিসে তার জব পাওয়া যেন অকল্পনীয় ব্যাপার।
তবে আজ ছিমরান নামক নতুন এক ব্যক্তির সাথে পরিচিত হয়ে সে নিত্যন্তই খুশি। অফিস থেকে বের হয়ে দুজনে প্রায় অনেকক্ষণ রিকশায় চড়ে গল্প আলাপ করেছে।শেষবেলায় দুজন দুজনের কন্টাক্ট নাম্বার নিতেই—তাদের গল্পের সমাপ্তি ঘটে। না জানি আবার কবে তাদের দেখা হবে।
-
শহরের সবজি বাজারটার দিকটায় আজ তৃতীকা এসেছে। হাতে একটা বড়সড় কালো আকৃতির ছাতা। যা দেখতে অনেকটা আদিম কালের কাঠ ও মোটা কাপড়ের তৈরি। এই আধুনিক যুগে, এমন শহর এলাকায় এমন ছাতার দেখা পাওয়া যেন দুষ্কর। তার মাঝে তৃতীকার মতো বয়সের এক মেয়ের হাতে...এ যেন নিত্যন্তই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।
তৃতীকার কাছে স্বাভাবিক হলেও,বাকিদের কাছে আশ্চর্যজনকই বটে। ফলাফলস্বরূপ, চারপাশের সকল লোকজন তাকেই ঘুরে ঘুরে দেখছে। একদিকে কাঁদা-পানি ময় রাস্তা,মাথার উপর তুমুল বৃষ্টি ঝরছে,সেই সাথে আবার সকলের অদ্ভুত চাহনি। সবমিলিয়ে তৃতীকা নিমিষেই বারংবার অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে।
তৃতীকা যথাসম্ভব নিজেকে এক প্রকার গুটিয়ে নিয়ে, নিজের গন্তব্যের দিকে এগোয়। সে ধীরে ধীরে বাজারের মধ্যখানে অগ্রসর হয়।
হালকা কিছু বাজার করে নিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে খাবার প্রায় নেই বললেই চলে। আবার হাতেও তেমন টাকা পয়সা নেই। গ্রাম থেকে আসার সময় তার কাকীমা তাকে যে কয়েকটা টাকা দিয়েছে,তার সবটাই প্রায় এখন শেষের দিকে। ভার্সিটির ফী, বাসা ভাড়া,সারা মাসের খাবার—সব মিলিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই।
তৃতীকা এসব ভাবতে ভাবতেই আলতোভাবে মলিন হাসে। অতঃপর এগিয়ে যায় সামনের একটি ছোট্ট কাঁচাবাজারের দোকানে। শুরুতেই তার নজরে পড়ে—একটি ছোট আকারের লাউ। সে কোনো কিছু না ভেবে বয়স্ক দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলে,
"মামা! এই লাউয়ের দাম কত?"
---"মামা, লাউয়ের দাম তো একশ বিশ ট্যাকা।"
দোকানদারের এহেন কথা শুনে তৃতীকা যেন আকাশ থেকে পড়ে। এক লাউয়ের দাম একশ বিশ? এই দামে তো তার এক সপ্তাহের খাওয়া-দাওয়ার খরচ খুব ভালো মতোই মিটে যাবে।
এছাড়া গ্রামে লাউয়ের দামটা খুব সামান্য। অবশ্য তাদের নিজেরই লাউ সহ বিভিন্ন শাক-সবজির বাগান ছিল। যার ফলে, শহরের জীবন যাত্রার সম্পর্কে তার ধারণা তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই কম।
তৃতীকাকে এভাবে থম মে'রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, দোকানদার মুখ তুলে তাকিয়ে খানিকটা বিরক্তির স্বরে বলে,
"কি মামা! নিবেন নাকি? নিলে তাড়াতাড়ি নেন। নয়তো এই বৃষ্টির দিনে দোহানের সামনে এম্নে খাঁড়াইয়া থাইকেন না।"
লোকটির বিরক্তিবোধ তৃতীকার কাছে স্পষ্ট। সে বিষয়টায় বেশি মাথা না ঘামিয়ে কিঞ্চিৎ মুচকি হেসে বলে,
"না মামা, লাউ থাক। আপনি বরং আমাকে হাফ কেজি আলু, বিশ টাকার মরিচ,বিশ টাকার পেঁয়াজ আর দুই মুঠা কলমি শাক দেন। আর কিছু লাগবে না।"
তৃতীকার কথায় লোকটি কিছুটা কপাল কুঁচকেই তার দিকে তাকায়৷ পরক্ষণেই আবার চোখ নামিয়ে তার কথা মতো জিনিস গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে, কিছুটা বিরক্তির স্বরে আওড়ায়,
"কি সব ফকিন্নি আসে। আজ-কাল আবার বিশ ট্যাকারও নাকি পেঁয়াজ দিওন লাগে।"
লোকটির ব্যবহার নিত্যন্তই রুক্ষ। তা আর বলতে বাকি নেই। তবে তার শেষ কথাটা, বিড়বিড় করে আওড়ালেও—তৃতীকা ঠিকই শুনতে পায়। কিন্তু সে কোনো ঝামেলা করতে চায় না বিধায়, চুপচাপ জিনিসগুলো নিয়ে চলে যেতে চাইছে। তবে ততক্ষণে তার নজরে পড়ে, দোকানদারের পাশে বসে থাকা এক ছোট্ট বাচ্চার দিকে। তিন-চার বছর বয়সের হবে আরকি।
লোকটির এমন রুক্ষ ব্যবহারের পরও, তার কাছ থেকে জিনিসগুলো নেওয়ার সময়, তৃতীকা তাকে জিজ্ঞেস করে,
"মামা! এটা কে?"
তৃতীকার কথামতো লোকটি পাশে ফিরে ছোট বাচ্চাটিকে একপলক দেখে নেয়। পরক্ষণেই আবার তৃতীকার দিকে ফিরে বলে,
"আমার নাতী ।"
---"ওহ আচ্ছা।"
তৃতীকা শুধু এইটুকুই বলে,জিনিসগুলোর সঠিক দাম দোকানদারকে দিয়ে দেয়। এবং জিনিসগুলো নিয়ে সে পা বাড়ায় সামনের দিকে। তবে যাবার পূর্বে আরো একটা কাজ করে বসে। তার ব্যাগে দুটো চকলেট ছিল। যাওয়ার সময় ছিমরান দিয়েছিল। সে কয়েকটা খেয়েছে আর বাকি কয়েকটা ব্যাগেই রয়ে গিয়েছে।
তৃতীকা মনে করে সে দুটো চকলেট যাওয়ার পথে সেই ছোট্ট বাচ্চাটিকে দিয়ে যায়।বাচ্চাটি চকলেট দেখার সাথে সাথে খুশিতে হেসে ওঠে। ততক্ষণে আবার দোকানদার বিষয়টা দেখেই, তৃতীকার দিকে তাকাতেই, সে বিস্তৃত মুচকি হেসে বলে,
"আপনার নাতীটা বেশ সুন্দর, মাশাল্লাহ।"
এই বলে সে চলে যেতে নিতেই, লোকটি ইতস্ততস্বরে কিছু বলতে চায়,
"কিন্তু..."
---"মামা, আমি হয়তো গরীব কিন্তু ফকিন্নি না।"
লোকটির কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই, বিস্তৃত হাসি মুখে তৃতীকা এইটুকু বলেই সামনে ফিরে এগোতে থাকে। এবং একবারের জন্যও আর পেছনে ফিরে তাকায় না। তবে যাওয়ার পথে বাজারের ব্যাগটায় নজর পড়তেই চাপা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মনে মনে বিড়বিড়য়ে আওড়ায়,
"এই আলু খেয়েই তবে এই সপ্তাহ চলতে হবে। হাহ্, কি আর করার।"
তৃতীকা পুনোরায় ভারী শ্বাস ফেলে মুচকি হাসে। প্রায় এই কয়েকটা জিনিসেই তার একশ টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে। অথচ এইটুকু বাজারে তাকে পুরো এক সপ্তাহ চলতে হবে। এছাড়া অবশ্য কোনে উপায়ও নেই। জীবন বাঁচাতে এইটুকুই যথেষ্ট।
________
শহর অঞ্চল হতে প্রায় অনেকটা দূরে,একটা ভাঙাচোরা দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশ গাছগাছালি দিয়ে পরিপূর্ণ। ইট - সিমেন্টেট গাঁথুনি ধসে পড়ার দায়। এমনই এক জরাজীর্ণ বাড়িতে ঠাঁই হয়েছে তৃতীকার৷
শহরের বেশিরভাগ বাসাগুলোরই ভাড়াটা অনেক বেশি। যা তৃতীকার সামর্থ্যের বাহিরে। তবে সেসবের তুলনায় এই বাড়িটার ভাড়া বেশ কম। এর মানে এই নয় যে পুরো বাড়িতে তৃতীকা একাই ভাড়া নিয়ে থাকে। শুধু মাত্র দোতলার একটি ছোট্ট ঘরটিই সে নিজের থাকার জন্য নিতে পেরেছে। যেখানে একটা ছোট্ট বাথরুম, ঘরের সাথে লাগানো রান্নাঘর আর শোয়ার জন্য একটা ভাঙাচোরা লোহার বিছানা ব্যতীত কিছুই নেই।
লোহার বিছানাটা এই আধভাঙা ঘরেই পরিত্যক্ত অবস্থাতেই পেয়েছিল সে। যার উপরেই শক্ত কার্টুন পেপার এবং তার উপর মোটামুটি ভালো মানের এক চাদর,বালিশ পেতেই সে তা ঘুমানোর উপযোগী করেছে। নয়তো তাকে হয়তো শীত,বর্ষা,গ্রীষ্ম—সর্বকালেই মেঝেতে শুয়েই কাটিয়ে দিতে হতো।
এই বাড়িতে আরো বেশ কয়েকজন মানুষ থাকে। তবে কেউই তেমন কারো সাথে কথা বলে না। তৃতীকাও আগ বাড়িয়ে কারো সাথে তেমন কথা বলতে যায় না কিংবা তার সময়-সুযোগও হয়না। এছাড়া নিচ তলা জুড়ে বসবাস করা বাড়িওয়ালার এক বখাটে ছেলেও রয়েছে। যত বারই তৃতীকা তার সামনাসামনি হয়েছে, ততইবারে তাকে তার বেশ বির'ক্তিকর লেগেছে। বিশেষ করে তার অঙ্গভঙ্গি, চাহনি—সবই কুরু'চিপূর্ণ।
সবমিলিয়ে তৃতীকার মাথায় এখন এটাও ঘুরছে যে, কিভাবে এই বাড়ি থেকে দ্রুত অন্য কোথাও যাওয়া যায়। অবশ্য থাকা নিয়ে এতো কষ্ট করতে হতো না যদি শুরুতেই সে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে একটা সিট পেয়ে যেত। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তার কপালে সিট জোটেনি। আর কষ্ট করে হলেও তাকে এইখানেই এমন জরাজীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর এক পরিবেশে থাকতে হচ্ছে।
--
একে একে তৃতীকা অনেক কিছুই ভাবতে বসেছিল। কিভাবে কি করলে জীবনে একটু সচ্ছলতা আসবে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন কোনো উপায় তার মিলছে না। বারংবার সে এই ভাবনায় হতাশ হচ্ছে।
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। একহাতে চুলোয় ভাত বসিয়ে, আলু সিদ্ধ দিয়েছে।রাতে তার এটাই খাবার৷ আর অবশিষ্ট ভাতে পানি দিয়ে—সকাল হলেই পেঁয়াজ-মরিচ ডলে পান্তা খেয়েই ভার্সিটি যেতে হবে।
আবার এই শহরে এমন জায়গায়— কারেন্টের সাথে সাথে গ্যাসের লাইনেও কত-শত সমস্যা করে। অর্ধেক খাবার রান্নার মূহুর্তে যদি গ্যাস ফুরিয়ে যায়,তাহলেই কান্ড! আজ রাতে হয়তো সেসব আধঁসিদ্ধ খাবার খেতে হবে নয়তো না খেয়েই থাকতে হবে।
তৃতীকা এতো সবকিছু ভাবতে ভাবতে বিরক্ত। সবশেষে উপায় না পেয়ে সে তার বাটন ফোনটা বের করে। ফোনে বিশ টাকার মতো রিচার্জ করেছিল—বাড়িতে কথা বলার জন্য।
বাড়িতে কথা বলার মতো এখন শুধু একজনই রয়েছে,তা হলো তার বড় কাকীমা। এবং তার এই বড় কাকীমা ব্যতীত তার বাড়ির কেউই জানেনা সে এখন কোথায়।
-
তৃতীকার ঢাকায় এসে এভাবে একা একা থাকার পেছনে এক বিশেষ ঘটনা রয়েছে। খুব অল্প বয়স হতেই তার চাচা-চাচীরা তার বিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যেন সে বাড়িতে থাকলে তাদের অন্নধ্বংস হয়৷ আর এই ভাবনাতেই তাকে সেই ক্লাস এইট থেকে বিয়ে দেওয়ার নানান চেষ্টা চালিয়েছে তারা।
তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা ব্যর্থ হয়েছে—তৃতীকার বড় চাচী ও ছোট চাচার জন্য। তাদের দুজনের জোরেই মূলত তৃতীকা শেষমেশ এইচএসসিটা দিতে পেরেছে আর এতে সর্বচ্চ সহায়তা করেছে তার এই ছোট কাকা ও বড় কাকীমা।
কিন্তু সে এইচএসসি দিতে দিতেই যেন খেলাটা খানিক পাল্টে যায়। তৃতীকার চাচা-চাচীদের পাশাপাশি অনেক বড়-ছোট ভাইবোনও রয়েছে। তার মাঝে এই ছোট চাচার বড় ছেলে তুহিন—খুব সম্ভবত তার চেয়ে বছর কয়েকের বড় এবং খানিকটা গ্রামের বখাটে ছেলের মতো তার চালচলন।
আর এই ছেলেই পছন্দ করে বসে তৃতীকাকে। এরপর শুরু হয় তার তৃতীকাকে বিয়ে করার আবদার। অতঃপর ছেলের আবদারে বাবা তথা তৃতীকার ছোট চাচাও চায় তৃতীকার সাথে তুহিনের বিয়ে হোক। কিন্তু তৃতীকা তো বিয়ে করতে রাজি নয়।সে চায় পড়াশোনা করতে। আর তার এই বিয়েতে রাজি না হওয়ার কারণেই, সবসময় তাকে পড়াশোনায় সহয়তা করা তার সেই ছোট চাচাই তার পড়াশোনা বন্ধ করতে উঠে পড়ে লাগে।
আর এটাও ঠিক এমন মূহুর্তে যখন তৃতীকার কেবলমাত্র এইচএসসি শুরু হয়েছে। পরীক্ষা মাঝে বাড়িতে নানান অশান্তির কারণে সে এক প্রকাশ মানসিকভাবে বি'ধ্বস্ত হয়ে যেতে শুরু করে। তবে সেসময় তার পাশে থাকে তার বড় কাকীমা। নিজের মেয়ের মতোই সবাইকে অনুরোধ করে, এইচএসসি অব্দি বিয়ে নিয়ে বাড়িতে কোনো ঝামেলা না করতে। পরীক্ষা মিটে যাক তারপর বাকি সব।
অতঃপর পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই আবারও একই কাহিনি শুরু হয়। আর সেসময় এডমিশনের পড়ার নাম করে, তার বড় কাকীমা তৃতীকাকে নিজের ভাইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এবং সেখান থেকে মোটামুটি ভালো একটা প্রস্তুতির পর তার দেশের সনামধন্য এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স হয়ে যায়।
কিন্তু সমস্যা এখানেই থেমে থাকে না। তৃতীকা তার বড় কাকীমার ভাইয়ের বাড়িতে থাকতে থাকতেই, তার কাকীমার ভাইয়ের ছেলে তাকে পছন্দ করে ফেলে। যার খবর টের পাওয়া মাত্রই তৃতীকার কাকিমা আবার তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে।
এখন তৃতীকাকে নিয়ে তার বড় কাকীমার এতো বেশি উদ্বেগেরও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যা তৃতীকা এখনও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি। আর সেই উদ্দেশ্য হলো, তৃতীকার বড় কাকিমা চায় তার নিজের ছেলেকে তার সাথে বিয়ে দিয়ে, তৃতীকাকে ঘরের বউ করে তুলতে। আর এই কারণেই সে শুরু থেকেই নানান কৌশলে তৃতীকাকে পড়াশোনার বাহানায় বিয়ে থেকে বাঁচিয়েছে। কেননা সে চাইছে, তৃতীকাও পড়াশোনা চালিয়ে যাক আর সাথে তার একমাত্র ছেলেটাও আরেকটু যোগ্যতা অর্জন করুক।
তবে সবশেষে তার এই ভালোমানুষি উদ্দেশ্যের পেছনেও,বাকিদের মতো এক স্বার্থপরের ন্যায় চিন্তাভাবনা রয়েছে। আর তা হলো তৃতীকার ভাগে থাকা তার বাবা-মায়ের সম্পত্তি। তৃতীকাদের বংশ যে উচ্চবংশ ছিল তার আর বিশেষ করে উল্লেখ করার কিছু নেই। যথারীতি তৃতীকার বাবারও পৈতৃক ও নিজস্ব—বেশ খানিকটা সম্পত্তি ছিল। যার সবটাই এখন তৃতীকার নামে।
তবে তৃতীকার বাকি চাচা-ফুপুদের পৈতৃক সম্পত্তি ছিল গ্রাম ও নদী অঞ্চলের দিকে। যার অর্ধেক শেষ হয়েছে মহামারীতে আর বাকি অর্ধেক শেষ হয়েছে নদী ভাঙ্গনে। আর এখন যা রয়েছে তা খুবই সামান্য। যার ফলে সকলের নজর এখন ভাগ্যক্রমে অধিক সম্পত্তি পেয়ে যাওয়া তৃতীকার দিকে। অথচ সেই তৃতীকা, এসবের কিছুই না জানায়,তার আজ এই পরিণতি।
-গল্পের সকল পর্ব সবার আগে পেতে লেখিকা 'তুরঙ্গনা' এর আসল পেইজে নজর রাখুন।
তৃতীকা বেশি দেরি না করে, তার কাকীমার নাম্বারে কল দেয়। এই শহরে তাকে চুপ করে পাঠিয়ে দেওয়ার সময়, কাকীমা তার হাতে কয়েক হাজার টাকা দিয়েছিল। যা দিয়েই সে এখন অব্দি খরচ করে চলছে। কিন্তু সে টাকাও তো এখন শেষের পথে। এরপর সে কি করবে? ভার্সিটির বই কেনার জন্য, গত দুমাসের বাসা ভাড়া দেওয়া হয়নি। এতেও বাড়ি ওয়ালাও বেশ অসন্তুষ্টত। না জানি কখন, চর'ম ক্ষি'প্ত হয়ে বলে—বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। তখন সে কি করবে? রাস্তায় গিয়ে থাকবে?
না! এতো টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে তার কাকীমাও ফোন তুলছে না। আবার তুললে সে তাকে বলবেই বা কি? এতো তাড়াতাড়ি টাকা শেষ, তাই তার টাকা চাই?
একে একে কতবার কল করলো, অথচ কেউ ফোন তুলছে না। আবার এতোবার ফোন করাটাও তার ঠিক মনে হচ্ছে না। এমনও তো হতে পারে, তিনি কোনো কাজে ব্যস্ত। আর এতবার কোনো ফোন নাম্বার হতে কল করায় যদি বাড়ির কেউ তা দেখে কোনো সন্দেহ করে,তাহলে তখন কি হবে?
না, থাক! যথেষ্ট ফোন দিয়েছে। বাকিটা তার কাকিমা যখন দেখবে তখন সে নিজেই ফোন করবে। এই ভাবনায় সে ভারী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ফোনটা রেখে দেয়। ওদিকে ভাতও প্রায় হয়ে এসেছে। তৃতীকা দ্রুত ভাতের পাতিলটা চুলো হতে নামাবে—এমন পর্যায়ে আচমকা তার ফোনটা বেজে ওঠে।
বড় কাকীমা ফোন করেছে, এই ভাবনায় তৃতীকা একপ্রকার ভাতের পাতিলটা চুলোর পাশে রেখেই ফোনের কাছে ছুটে আসে। তড়িঘড়ি করে হাসিমুখে ফোনটা হাতে নিতেই যেন কপালে সুক্ষ্ম চিন্তার ভাজ পড়ে। তার কাকীমা নয়, বরং ভিন্ন কোনো নাম্বার হতে ফোন এসেছে।
এখানে আসার পর তার কাকীমা ব্যতীত আর কেউ তাকে ফোন করেনি। কারণ তার ফোন নাম্বার তেমন কারো কাছেই নেই। তবে এটা কোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছে?
এমন সময় হঠাৎ তার ছিমরানের কথা মনে পড়ল। আর ফোনের অপরপাশের ব্যক্তিকে ছিমরান ভেবেই সে কিছুটা খুশি মনে ও কিছুটা দ্বিধা নিয়েই কলটা রিসিভ করে। তবে ফোনটা কানের কাছে ধরতেই তার কপাল কুঁচকে যায়। একইসাথে সে কিছুটা বিস্মিতও হয়। যেন এমন কিছু হবার কথা ছিল না। এটা তার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
প্রায় মিনিট খানেক কথা বলার পর, তৃতীকা ফোনটা রেখে দিয়ে চিন্তিত অভিব্যক্তিতে ঘরের জানালার দিকে এগিয়ে যায়। মরিচাধরা জানালার ফাঁক গলিয়ে সাই সাই শীতল বাতাস এসে তার মুখের আঁচড়ে পড়ছে। সাদা রাঙের ও খানিকটা ছিঁড়া পুরোনো কাপড় দিয়ে বানানো, জানালার পর্দাটা উড়ছে নিস্পৃহে।
এমন আবহে তৃতীকা খানিকটা চিন্তার সহিতে বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগল,
"আমার সাথে কি সত্যিই এসব কাকতালীয় ভাবেই ঘটে যাচ্ছে? নাকি এর পেছনেও খোদাতায়ালা কোনো বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে?"
এই বলেই সে ভারী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। যে অসমাপ্ত ইন্টারভিউ এর কথা সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল, সেই ইন্টারভিউ তথা ARC কোম্পানি থেকেই ফোন এসেছে। আগামীকাল তাকে আবারও অফিসে ডাকা হয়েছে। ফোনে শুধু এইটুকুই বলা হলেও, তৃতীকা কোনো না কোনোভাবেই নিজের অজান্তেই বারংবার চিন্তিত হচ্ছে। সে যা ইন্টারভিউ দিয়েছে তাতে তার ওতো বড় অফিসে নূন্যতম স্তরের জব পাওয়াও, দুঃস্বপ্নের মতো।
অথচ এখন কিনা তাকে সেখানেই যাওয়ার জন্য ডাকছে। আদতে আগামীতে তার ভাগ্যে রয়েছেটা কি? খুব ভালো কিছু, নাকি জীবন সংশয়মূলক? এতো কিছু তৃতীকা জানে না। আর সে আপাতত এসব নিয়ে ভাবছেও না। শুধু সবশেষে তার চাওয়া একটাই,"আগামীতে যাই হোক না কেনো, তা যেন ভালো হয়। নয়তো এতো দ্বিধাদ্বন্দের জীবনে তার বাঁচা সম্ভব নয়।"
চলবে_______