#অতৃপ্ত_চাহনা
#তুরঙ্গনা
পর্ব—||১১||
তৃতীকা স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় বসে রয়েছে। অন্যদিকে আধীরের মাঝে বিশেষ কোনে হেলদোলই নেই। তৃতীকার পায়ে জুতোজোড়া বেশ মানিয়েছে বিধায়—সে যেন অনেক বেশিই খুশি। যার স্পষ্টতা তার চোখে-মুখে অনিমিষেই ফুটে ওঠেছে।
আধীর উঠে এসে, পুনরায় নিজের জায়গায় বসল। এদিকে তৃতীকা এখনো স্তব্ধ হয়ে, মাথা নুইয়ে নিজের পা-জোড়া দেখে চলেছে। মাথাতেই যেন ঢুকছে না এটা কি হলো এই মূহুর্তে? আধীর তার পরিচিত কেউ নয়। একইসাথে না কোনো বিশেষ ব্যক্তি। নামকরা একজন কোম্পানির বস হয়ে, কিভাবে সে অফিসের সামান্য এক এমপ্লয়িকে,এভাবে লোকসমাগমের মাঝে হাঁটু গেঁড়ে বসে জুতো পড়িয়ে দেয়? কিভাবে? এটাও কি আদোও স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণযোগ্য?
তৃতীকা আলগোছে মাথা তুলে একবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নেয়। না! কেউই তাদের দেখেনি। যে অল্প কয়েকজন রয়েছে,তারা সকলেই নিজেদের মাঝেই ব্যস্ত। তবে এই মূহুর্তে ঘটে যাওয়া বিষয়টি যেন, তৃতীকা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। সে আধীরের দিকে একপলক তাকিয়ে দেখে,সে একদন নির্বিকারে বসে খাবার খাচ্ছে। অথচ বিষয়টা তো এতোটাও স্বাভাবিক নয়, যতটা আধীর স্বাভাবিক রয়েছে।
______
রাতের নির্জনতা ভেদ করে গাড়ি সাঁ সাঁ করে এগিয়ে যাচ্ছে। আধীর নিজের মতো ড্রাইভ করছে। আর পাশে চুপচাপ তৃতীকা বসে রয়েছে। তৃতীকার অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। নিজের মনের মাঝে চলা হিসেব যেন কোনো মতেই মিলছে না। তৃতীকা সর্বদা এটাই ভাবছে—সে ভুল পথে এগোচ্ছে। সে কারো জীবন ধ্বং'সের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। যার প্রতিকার এই মূহুর্তে না করলে, পরবর্তীতে অনেক বেশিই দেরি হয়ে যাবে।
আধীর বাহিরে খেয়ে অভস্ত্য। সে চৌধুরী ম্যানশনে খুব কমই যায়। এমনিতে সে আলাদা করে নিজের ফ্ল্যাটেই থাকে বিধায়,বেশিরভাগ সময় নিজ ইচ্ছেতেই বাহিরের খাবার খেয়েই দিন পার করে। যদিও এটা তার কাছে খানিকটা বিরক্তিকর, কিন্তু নিজে রান্না করার মতো লোক সে নয়। ওসবে তার বিন্দুমাত্র ধৈর্য নেই। একইসাথে রান্নার জন্য কোনো লোক এসে তার বাড়িতে ঘুরঘুর করবে,এটাও তার পছন্দ নয়। মূলত এ কারণেই, সব থাকার পরও সে একজন সাদামাটা সিঙ্গেল মানুষের মতোই জীবনযাপন করে।
আর আজ তৃতীকার জন্য অনেকগুলো খাবার অর্ডার দিলেও,তৃতীকা খুব সীমিতই খেয়েছে। যে কারণে সে-ও খানিকটা বেশ পেট ভরে খেয়ে, বাকিটা পার্সেল করে তৃতীকার জন্য নিয়ে এসেছে৷
কিন্তু তৃতীকার এমন নিস্তব্ধতা, তার বেশ অদ্ভুত লাগছে। মনে মনে ভাবতে শুরু করেছে,তখন ওভাবে জুতো পড়িয়ে দেওয়াটা আদৌও ঠিক হলো কিনা! নাহ,বিষয়টা হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। তৃতীকা তার পূর্বপরিচিত হলেও,তৃতীকা তো আর জানে না আধীর কে! সেক্ষেত্রে অচেনা ব্যক্তির কাছ থেকে....আচ্ছা সে কি এজন্য তৃতীকার কাছে মাফ চাইবে নাকি...কিসের মাফ চাইবে।মাফ চাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
আধীর ড্রাইভ করতে করতে নিজের কথারই বেড়াজালে পেঁচিয়ে গেল। এটা কেমন দ্বিধাদ্বন্দে পড়ল। তারমতো মানুষ এইটুকু বিষয়ে কারো কাছে কখনোই মাফ চাইবে না। কিন্তু তৃতীকা যদি সে ঘটনার বশেই, ভিন্নকিছু ভেবে বসে?
আধীর এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের প্রতি বিরক্ত হলো। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে তৃতীকার উদ্দেশ্যে বলল,
"মিস তৃতীকা! আর ইউ ওকে?"
আধীরের সামান্য কথায়, তৃতীকা অকস্মাৎ চমকে উঠল। সে নিজের বেখেয়ালি ভাবনায় মগ্ন ছিল বিধায়, এই দশা। কিন্তু তার চমাকানোয় আধীরের কপাল আরো বেশ খানিকটা কুঁচকে যায়। সে আবারও তৃতীকার উদ্দেশ্য বলে,
"আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত?"
আধীরের কথায় তৃতীকা আলতোভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে,
"না, আমি ঠিক আছি স্যার।"
তৃতীকার ইতস্তত অভিব্যক্তিতে আধীরও আর কথা বাড়ায়। তৃতীকা নিজ ইচ্ছেতেই বাড়ি যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অসুস্থ বিধায়,আধীর নিজেই জোর করে তার বাড়ির ঠিকানায় নিয়ে যাচ্ছে।
এভাবে আরো কিছুটা দূর যাওয়ার পরই,আধীরের কিছু একটা মনে পড়তেই সে তৃতীকার উদ্দেশ্যে বলল,
"মিস তৃতীকা!"
তৃতীকার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। অদ্ভুত এক ক্লান্তি এখনও তার সর্বস্বজুড়ে। এই ভাবনাতেই সে আনমনেই জবাব দেয়,
"জ্বী!"
---"তৃতীকা,আপনার বাবা-মা কোথায়?"
---"নেই।"
---"ওহ,তার মানে আপনি এই শহরে একাই..."
---"আমি শুধু এই শহরে একা নই, আমি পৃথিবীর সর্বস্তরে সর্বদাই একা।"
তৃতীকার আনমনে বলা এহেন কথায়, আধীর মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকায়। খানিকটা সন্দিহান স্বরে কিছু বলে ওঠার পূর্বেই, তৃতীকা আবারও বলে,
"আমার বাবা-মা আর এই পৃথিবীতে নেই। তাই নিজেকে পুরোপুরি নিঃস্ব বললেও ভুল হবে না।"
তৃতীকা এইটুকু বলে থামতে না থামতেই,আচমকা আধীরের গাড়ি থেমে যায়। হঠাৎ থমকে যাওয়ায়,ঝাঁকুনিতে তৃতীকার সম্মুখে হেলে পড়লেও নিজেকে সামলে নেয়। একইসাথে নিজের আনমনে অভিব্যক্তি হতেও বেরিয়ে আসে।
এদিকে আধীর হঠাৎ এমন কাজ করায়, নিজেও কিছুটা ইতস্তত হয়। তার কাছে তৃতীকার বলা কথাটা বেশ বিস্ময়কর লেগেছে। যেন সে এমন কিছু কখনোই আশা করেনি।
---"আ...আ'ম সরি...!"
আধীর এইটুকু বলেই, পুনরায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের গাড়ি স্টার্ট করে। অন্যদিকে তৃতীকাও আর কিছু না বলে নিজেকে সামলায়। তবে আধীরের মন-মস্তিষ্ক এখনোও নিশপিশ করছে, তৃতীকাকে একটি বিশেষ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে। ফলাফলস্বরূপ সে নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে, তৃতীকার উদ্দেশ্যে বলল,
"মিস তৃতীকা! আমার আপনাকে একটা বিষয়ে..."
আধীরের কথা শেষ না হওয়ার পূর্বেই, আচমকা তৃতীকা বলে ওঠে,
"স্যার, এটাই আমার বাড়ির রাস্তা। ঐ যে ওখানেই নামিয়ে দিলে ভালো হয়।"
তৃতীকার কথা শুনে, আধীরের ধ্যান তৃতীকার ইশারামতো রাস্তার দিকে চলে যায়। একদম ঘন কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা। চারপাশের আবহও বেশ অদ্ভুত। জায়গাটা শহর হতে বেশ দূরেই বলা চলে। রাতের বেলায় রাস্তার ধারে যা কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট দাঁড়িয়ে—সেগুলোও আবার বেশিরভাগই নষ্ট। আধীর ভারী শ্বাস ফেলে তৃতীকার কথা মতো, তাকে তার বাড়ির সামনে এসেই গাড়ি থামায়।
তৃতীকাও আর দেরি না করে গাড়ি হতে নেমে পড়ে। এতোক্ষণ বসে থেকে,এখন হঠাৎ উঠে দাঁড়াতেই তার হাত-পা, মস্তিষ্ক—ঝিমঝিম করে উঠল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটার চেষ্টা করল।
এদিকে আধীরও গাড়ি হতে নেমে পড়ে। তবে তৃতীকা বেখালিতে পরে যেতে নিতেই—আধীর তৎক্ষনাৎ তার হাতটা পাশ হতে শক্ত করে ধরে বলল,
"তৃতী! সাবধানে চলুন।"
আচমকা আবারও এমন ঘটনায় তৃতীকা পুনরায় স্তব্ধ।সে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়াতেই,আধীর তার হাত ছেড়ে দেয়।একইসাথে তৃতীকাও তার উদ্দেশ্যে কিছুটা জোরপূর্বক মুচকি হেসেই আওড়ায়,
"ধন্যবাদ স্যার,আমি আসছি।"
অন্য সময় হলে হয়তো, তৃতীকা তাকে তার বাসার ভেতরে আসতে বলতো। কিন্তু আজকের ঘটনার পর সে মোটেও এমন কিছু চায় না। অন্তত আধীর এমন কেউ নয় যে,তাকে তার একা বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানানো যাবে।
তবে আধীরের কিছু একটা মনে পড়তেই,সে ব্যাকসিট থেকে কয়েকটা ব্যাগ এনে তৃতীকার হাতে ধরিয়ে দেওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
"তৃতীকা,এগুলো নিয়ে যান।"
তৃতীকা যেতেই নিয়েছিল।আচমকা আধীরের কথায় পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। আধীরের হাতে অনেকগুলো ফলমূল আর খাবারের ব্যাগ। তার আর বুঝতে বাকি রইল না, মাঝ রাস্তায় আধীর কেনো ফলমূলের দোকানে গিয়েছিল। সে ভেবেছিলো তার পরিবারের জন্যই হয়তো—কিন্তু এখন তো দেখছে পুরো ভিন্ন ঘটনা।
তৃতীকা খানিকটা দ্বিধার স্বরেই বলে,
"স্যার কিছু মনে করবেন না।কিন্তু আমি এসব...আ...আমার এসবের প্রয়োজন নেই। আমি এসব খাওয়া পছন্দ করি না।"
তৃতীকার কথায় আধীর যেন খানিকটা অবাকই হয়।একইসাথে তার কন্ঠে ফুটে ওঠে কর্তৃত্বপরায়ণতা।
---"আপনার পছন্দ, অপছন্দে কিছু যায় আসে না। নিতে বলেছি নিন! সাথে এও স্পষ্ট করে বলছি—আজ বাদে কাল যেন আবার আপনাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে না দেখি।"
আধীরের কথায় তৃতীকা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এমনিতেই শরীর ভালো না।তার মাঝে এ লোকের এমন কথাবার্তায় সে প্রতিনিয়ত আশ্চর্য হচ্ছে। তৃতীকা কিছু বলার পূর্বেই আধীর একপ্রকার জোর খাটিয়েই,তৃতীকার হাতে ব্যাগগুলো ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"নিজের যত্ন নেবেন,শুভ রাত্রি।"
এই বলেই সে গম্ভীর্যের সহিত তার গাড়িতে গিয়ে বসল। অতঃপর ডানে-বামে কোনোকিছুরই তোয়াক্কা না করে গাড়িটি নিয়ে সোজা তার গন্তব্যে রওনা হলো। আর এদিকে হতবিহ্বল হয়ে তৃতীকা—আধীরের গাড়িটাকে পেছন হতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল।
__________
বেশ অনেকটা রাত হয়েছে। তৃতীকার চোখে আজ কয়েকদিনের ন্যায় কোনো ঘুম নেই। শরীর ভর্তি ক্লান্তি। অথচ সে নির্ঘুম অস্থিত্বের ন্যায় রাত কাটাতে মগ্ন।
তৃতীকার বসা কিংবা শোয়ার জায়গাই হলো তার আধভাঙা বিছানা। বরাবরের মতো সেখানে বসে, দু'হাটুর মাঝে মুখ গুঁজে সে কিছু একটা গভীর মনে ভেবে চলেছে। রাত হলেই যেন তার মন-মস্তিষ্কে রাজ্যের চিন্তা নেমে আসে।
তৃতীকার সামনে আধীরের দেওয়া সেই খাবারের ব্যাগগুলো। সে ওসব খুলেও দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। অন্যদিকে কালো রঙের জুতো জোড়াও তার ছোট্ট ট্রাঙ্কের উপর নতুন কাপড় দিয়ে মোড়ানো। যেন সেটা এখন সাজিয়ে রাখার ন্যায়ই কোনো বস্তু।
এদিকে তার আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভার্সিটির সিনিয়রদের বই-খাতা। মনের তীব্র অশান্তি নিয়েও,বেশ খানিকটা লিখেছে সে।কিন্তু এরচেয়ে বেশি লেখার মনমানসিকতা তার নেই। অসহ্য লাগছে তার এসব করতে। যদিও কালই শেষ দিন—ভার্সিটিতে সিনিয়রদের দেওয়া সময় অনুযায়ী। কিন্তু তৃতীকা আপাতত সেসবের কোনো তোয়াক্কা করছে না। সে তো ব্যস্ত তার হিসেব মেলাতে। এরইমাঝে তৃতীকা তার মন-মস্তিষ্কে চলা নানান মিশ্র অনূভুতি নিয়েই,বিড়বিড়িয়ে বলতে লাগল,
"না! প্রয়োজনে এই চাকরি আমি কালই ছেড়ে দেব।কিন্তু আমি কখনোই চাই না, আমার জন্য কারো জীবনে অশান্তি হোক। মিস্টার আধীর রায়ান আমার বিশেষ কেউ নয় যে, সে আমাকে ওভাবে অন্তত সবার মাঝে জুতো পড়িয়ে দেবে। এই অধিকার তার নেই। কোনোভাবেই আমি এমন একটা বিষয়কে নরমালইজ করতে পারি না।
এছাড়া...উনাকে আমি শুধুমাত্র একজন অফিসের বস হিসেবেই গণ্য করেছি। যেখানে তার নিজের স্ত্রী-সন্তান রয়েছে—সেখানে তিনি আমার সাথে কিভাবে এই ধরনের আচরণ করে? ছিহ্,আমি কি তার মেয়ের বয়সী যে তিনি আমার সাথে...আর এমনিতেও, কে-ই বা তার মেয়ের বয়সী কারো সাথে এরূপ আচরণ করবে?
আমি যা আন্দাজ করছি,তাই যদি সত্যি হয়—তবে করবে না আমি এই চাকরি। প্রয়োজনে না খেয়ে মরব, তবুও না! আর যাই হোক, ঈয়াশ-ঈশানীর মতো মানুষদুটোর জীবন আমি জেনে-বুঝে নষ্ট করতে পারি না। বেঁচে থাকলে,আগামীকালই আমি অফিসে গিয়ে নিজের রিজাইন লেটার দিয়ে আসব।এটাই আমার লাস্ট ডিসিশন।"
চলবে______