#বসন্তের_দিনগুলো
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান (সিনু)
#পর্বঃ৩
বসারঘরে বর্তমানে পিনপতন নিরবতা ছেয়ে আছে ৷ মেহমেত থতমত মুখে মাথা নিচু করে বসে আছে ৷ সাজিদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য কিছু বলতে যাবে তখনই নিয়ামত আলম মুচকি হেসে বলতে লাগলেন,,,
সহজ ছিল না এই রমনীকে নিজের প্রেমে ফেলা ৷
সাজিদ কিছুটা স্বস্থি পেল ৷ মেহমেতের লটকানো মুখটা মুহূর্তেই জ্বলমলিয়ে উঠল, ও আগ্রহ ভরে নিয়ামত আলমের পানে চেয়ে থাকল ৷ বাকিরাও উনার দিকে কৌতূহল বশত তাকাল ৷ নিয়ামত আলম পুনরায় বলতে শুরু করলেন,,,
সেই কলেজ লাইফ থেকে আমি ওকে পছন্দ করতাম কিন্তু সাহসের অভাবে কিছু বলতে পারতাম না ৷তবুও একদিন বুকে সাহস জুগিয়ে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম ৷ গিয়ে যা দেখলাম তাতে প্রপোজ করার শখ একদম মরে গেল ৷
রাইমা আর মেহমেত একযোগে বলে উঠল, কি দেখেছিলেন?
একসাথে বলে ওঠায় দুজনেই একে অপরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল ৷ তারপর পুনরায় নিয়ামত আলমের দিকে তাকাল উত্তরের আশায় ৷ নিয়ামত আলম সামান্য হেসে বললেন,,,
একটা ছেলে ওকে প্রপোজ করায় ও ছেলেটাকে ঠাটিয়ে একটা চ'ড় মে'রেছে ৷ এতো জোরে মে'রেছিল যে ছেলেটা দু দিন কানে শোনেনি ৷ এটা দেখার পর কোনো ছেলেই আগানোর সাহস করবে না, আমিও করিনি ৷ নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মন তো বে'হায়া , ও নিজের মর্জি মত চলে তাই লুকিয়ে লুকিয়ে ওর প্রতি নজর রাখা অব্যাহত রাখলাম ৷ এভাবেই কলেজ লাইফ শেষ হলো, ভার্সিটিতে ওঠার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম ৷ ভয় হচ্ছিল আর হয়তো প্রিয়তমার দেখা পাব না কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমি যে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম প্রিয়তমাও একই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল ৷ একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে ও নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলতে এসেছিল ৷ সেদিন যে আমি কি পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম তা বলে বোঝাতে পারব না ৷
সবাই বেশ আগ্রহী হয়ে নিয়ামত আলমের দিকে তাকিয়ে উনার প্রেম কাহিনী শুনছে ৷ সিনু হঠাৎ সামনে তাকাতেই সাজিদের সাথে ওর চোখাচোখি হয়ে গেল, সাজিদও ভুলবশত ওর দিকে তাকিয়ে ছিল ৷ আচমকা এমন হওয়ায় দুজনেই বেশ বিব্রতিতে পড়ে গেল ৷ নিজের বিব্রতি ভাব কাটিয়ে সিনু সাজিদকে মুখ ভেংচি কাটল, সাজিদ ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ নিয়ামত আলমের কথায় ও ওর থেকে চোখ সরিয়ে উনার দিকে তাকাল ৷
কয়েকদিন এভাবে কথা বলার পর আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল ৷ এতে আমার সাহস কিছুটা বাড়ল ৷ আরো কিছুদিন অপেক্ষা করার পর আমি ওকে প্রপোজ করে ফেললাম ৷
সিনুরা একযোগে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,,তারপর?
প্রপোজ করার পর ও বেশ কয়েক মিনিট আমার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ছিল ৷ তা দেখে আমি প্রচন্ড ঘা'বড়ে গিয়েছিলাম ৷ মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যেন আমাকে থাপ্পড় না মে'রে দেয় ৷ কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলেছিল এক শর্তে আমি তোমার প্রপোজাল একসেপ্ট করব ৷
সাজিদ তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করল,,কি শর্ত?
মেহমেত ওর দিকে হতভম্ভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলল,, অ্যাহ এই প্রেম-বিদ্বেষী গোমড়ামুখো ছেলেরও প্রেমের কাহিনী শোনার এতো আগ্রহ!
সাজিদ মেহমেতের হতভম্ভ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কিছুটা ল'জ্জা পেল ৷ তারপর মুখটা গম্ভীর করে চোখ রাঙিয়ে ওর দিকে তাকাতেই মেহমেত চট জলদি ওর থেকে চোখ সরিয়ে নিল ৷ নিয়ামত আলম হাসিহাসি মুখে বলতে লাগলেন,,,
আমাকে বিশ রকমের ফুল দিয়ে বুকেট বানিয়ে আনতে বলেছিল ৷ শর্ত ছিল প্রতিটা ফুল যেন আমি নিজে গাছে চড়ে ছিঁড়ে আনি আর নিজ হাতে সেটার বুকেট বানাই ৷ আমিও শর্তমত কাজে লেগে পড়লাম ৷ বিশ রকমের ফুল তো মুখের কথা না! এক সপ্তাহের মতো লেগেছিল সব ফুল কালেক্ট করতে ৷ তারপর সুন্দর করে বুকেট বানিয়ে ওকে দিয়েছিলাম ৷ ও বুকেট টা নিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল ৷ বিভিন্ন গাছে উঠে ফুল ছেঁড়ার কারনে আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাঁটা ফুটে ক্ষ'ত-বিক্ষ'ত অবস্থা হয়ে গিয়েছিল ৷ ও নিজের ব্যাগ থেকে মলম বের করে পরম যত্নে আমার ক্ষতে লাগিয়ে দিয়েছিল ৷ তারপর মিষ্টি করে হেসে বলেছিল আমার প্রস্তাবে সে রাজি ৷ তারপর চলল আমাদের প্রণয় ৷ ভার্সিটি শেষে একটা চাকরি জোগাড় করে আমি ওকে নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী করে নিজের ঘরে তুলেছিলাম ৷
সবাই মুগ্ধ হয়ে এখনও উনার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ তানিয়ার চোখ হঠাৎ মেহমেতের উপর পড়তেই ও ভ্রু কুঁচকে বলল,,,
মানুষ এতোটা বি'শ্রিভাবে কিভাবে হাসতে পারে?
মেহমেতের কানে কথাটা যেতেই ও গম্ভীর মুখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, আমাকে বললেন?
তানিয়া ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,, না ডংকার ওরফে বে'য়াদপ পুরুষকে বলেছি ৷
মেহমেত তেতে উঠে বলল,, Whatever মুখ সামলে কথা বলুন শা'কচু'ন্নি ওরফে বে'য়াদপী মহিলা!
তানিয়া ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে ধরতেই সিনু ওকে চুপ করতে বলল ৷ তানিয়া তাতে চুপ হয়ে গেল ৷ রাইশা তানিয়ার কানে মুখ এনে বলল,,,
এই ছেলেটাই তাহলে সেই ডংকার?
তানিয়া কিছু বলার আগেই রাইমা ফিসফিস করে বলল,,, তানি তোর আসল নাম ওই ছেলে কিভাবে জানল?
তানিয়া কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল ৷তখনই জোসনা সুলতানা বসারঘরে আসায় তানিয়া নিজের রা'গ সামলে নিয়ে ভদ্র ভাবে বসে থাকল ৷ উনি এসে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,
বাচ্চারা তোমাদের জন্য রান্না করেছি ৷ ও আমাকে আগেই বলেছিল তোমরা আজ আসবে ৷
সবাই মুচকি হেসে সম্মতি জানিয়ে উনার পিছু পিছু ডায়নিং টেবিলে চলে গেল ৷ জোসনা সুলতানা সকলকে খাবার পরিবেশন করার জন্য উদ্যত হতেই সিনু উঠে বলল,,,
আন্টি আপনি বসুন , আমি সবাইকে পরিবেশন করে দিচ্ছি ৷
জোসনা সুলতানা অনেক বাধা দিলেও সিনু উনাকে জোর করে বসিয়ে দিল ৷ অন্যদিকে সাজিদ নিয়ামত আলমকে পানি আনার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে গিয়েছে ৷ সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে বসারঘরে বসে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করতে লাগল ৷ সিনুরা জোসনা সুলতানার সাথে আর সাজিদ,মেহমেত নিয়ামত আলমের সাথে হেসে হেসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেছে ৷
কথা বলার ফাঁকে সাজিদ নিয়ামত আলমকে জিজ্ঞেস করল,,, আঙ্কেল এমন কোনো ইচ্ছা কি আপনার অপূর্ণ থেকে গেছে যেটা করতে গিয়েও আপনি করতে পারেননি?
নিয়ামত আলম ওর দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,, ছিল এমন একটা ইচ্ছা তবে সেটা পূরণ হওয়া এখন আর সম্ভব না ৷
মেহমেত উনার কাধে হাত রেখে বলল,,, Whatever একবার বলেই দেখুন না আঙ্কেল ৷ আমি ম্যাজিকের মতো সেটা পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ৷ এমন কোনো কাজ নেই যেটা আমি করতে পারি না ৷
সাজিদ মুখটা ওর কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,,, ঢপ কম করে মার ৷ যে সামান্য একটা লুঙ্গি পড়লে সেটা সামলাতে পারে না, রাতে লুঙ্গি পড়ে ঘুমালে সকালে চিরুনি তল্লাশি করেও সেই লুঙ্গি আর খুঁজে বের করতে পারে না সে নাকি দুনিয়ায় এমন কোনো কাজ নেই যেটা করতে পারে না! ছ্যাহ পৃথিবীর সেরা ঢপারুও মনে হয় তোর এই কথাটা শুনলে নিজের সেরার আসন নিয়ে শ'ঙ্কায় থাকত!
মেহমেত অ'পমানে থতমত খেয়ে গেল ৷ নিয়ামত আলম সামান্য হেসে বললেন,,,
অনেক ইচ্ছা ছিল বাইক চালিয়ে পুরো শহরটা ঘুরব কিন্তু পড়াশোনার চাপে আর প্রিয়তমার প্রেমে বিভোর হওয়ায় বাইক চালানোর সময় ই করতে উঠতে পারিনি ৷ পরে ভাবলাম ছেলের থেকে শিখব কিন্তু ছেলে পড়াশোনা কমপ্লিট করে সেই যে বিদেশে পাড়ি দিল আর দেশে ফিরল না ৷ ওখানেই সেটেল হয়ে গেছে ৷ বাদ দাও সেসব কথা, এখন এই বয়সে বাইক চালানো অসম্ভব ব্যাপার বটে ৷
সাজিদ আর মেহমেত একে অপরের দিকে চোখমুখ উজ্জ্বল করে তাকাল ৷ আরো কিছুক্ষণ উনাদের সাথে সময় কাটানোর পর ওরা উনাদের থেকে বিদায় নিল ৷হাসিমুখে উনাদের থেকে বিদায় নিলেও গেইট পেরোনোর পরই ওদের হাসিহাসি মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল ৷ দু পক্ষের মধ্যে চোখ রেষারেষি চলল কয়েক মুহূর্ত তারপর ওরা নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
পরেরদিন সকাল সকাল ওরা চারজন নিয়ামত আলমের বাড়িতে আসল ৷ ওদের চোখ চকচক করছে কারন আজ ওরা সাজিদ আর মেহমেতের আগে আসতে পেরেছে ৷ কলিংবেল বাজালে জোসনা সুলতানা এসে হাসিমুখে ওদের ভিতরে প্রবেশ করাল ৷ বসারঘর থেকে নিয়ামত আলমের হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে ৷ রাইশা কৌতূহল বশত উনাকে জিজ্ঞেস করল,,,
বাসায় আত্মীয় এসেছে নাকি আন্টি?
জোসনা সুলতানা মলিন কন্ঠে বললেন,,, আমাদের দেখতে আসার মতো কোনো আত্মীয় নেই মামুনি রা ৷ নিয়ামত আর আমার বাবা-মা তো অনেক আগেই মারা গেছে ৷ উনারা মারা যাওয়ার পর বাকিরাও আস্তে আস্তে আমাদের সাথে যোগাযোগ কমাতে শুরু করেছিল ৷ আর এখন ন্যূনতম যোগাযোগ টুকুও করে না ৷
উনার কথা শুনে ওদের অনেক খারাপ লাগল ৷ রাইমা বলল,,,
আপনাদের সন্তান রা কোথায়?
জোসনা সুলতানা হতাশার শ্বাস ফেলে বললেন,, আমাদের একটাই ছেলে ৷ কত স্বপ্ন নিয়ে ওকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠালাম ৷ কিন্তু ছেলে যে আমাদের ভুলে যাবে এটা কি জানতাম?
তানিয়া অবাক হয়ে বলল,, ভুলে গিয়েছে মানে?
ওখানে এক বিদেশী মেয়ের প্রেমে পড়ে আমাদের না জানিয়েই বিয়ে করে নিয়েছিল ৷ বিয়ে করার কয়েক মাস পর আমাদের ফোনে জানিয়েছে সে কথা ৷ প্রথমে অভিমান করলেও পরে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়েছিলাম এই বলে যে 'একটাই ছেলে , ভালোবাসেই তো বিয়ে করেছে' ৷ কিছুদিন সবকিছু ভালোই চলছিল তার পরে নিজের বিদেশী শ্বশুড়-শ্বাশুড়িকে পেয়ে আমাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করল ৷ একদিন তো বলেই দিয়েছিল আমাদের মতো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কে নিজের মা-বাবা বলে পরিচয় দিতে নাকি ওর লজ্জা করে তাই যেন আমরা আর ওকে ফোন না দেই ৷ দরকার পড়লে ও আমাদের ফোন দিবে কিন্তু সেই দরকার টা বিগত পাঁচ বছরে পড়েনি তাই ফোনও দেয়নি ৷ নিয়ামত তো রেগে গিয়ে ওর সমস্ত ছবি, জিনিসপত্র পু'ড়িয়ে দিয়েছে ৷ এই দুনিয়ায় আমাদের কোনো আত্মীয় কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী নেই ৷ ওর জন্য আমি আর আমার জন্য ও আছে ৷ অবশ্য এটা আমাদের প্রাপ্য ছিল ৷ আল্লাহর সাথে নাফরমানি করে আমরা অবাধে হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম ৷ তার শাস্তি সরুপ আল্লাহ আমাদের সন্তানের অবজ্ঞা ফিরিয়ে দিয়েছেন ৷ বুঝিয়ে দিয়েছেন আল্লাহর সাথে নাফরমানি করে কেউ পার পাবে না ৷
বলে উনি নিঃশব্দ কাঁদতে লাগলেন ৷ উনার কথা শুনে ওদের চারজনের চোখ ছলছল করে উঠল ৷ সিনু নিজের কান্না আটকে উনার চোখের পানি সন্তর্পণে মুছে দিয়ে বলল,,,
হয়েছে অনেক শাস্তি পেয়েছেন ৷ আল্লাহ এখন আপনাদের সুখ দিতে চান ৷ যায় হোক কে বলেছে আপনাদের কেউ নেই? আমরা আছি না আন্টি?
ওরা তিনজনও এগিয়ে এসে বলল,,,হ্যাঁ আন্টি ওই কু'লাঙ্গার, সাদা বা'ন্দরের কথা ভুলে যান ৷ আজ থেকে আপনি চার কন্যা সন্তানের জননী হলেন ৷ এই মুহূর্ত থেকে আমরা আপনাদের মেয়ে হয়ে গেলাম ৷
জোসনা সুলতানা ওদের জরিয়ে ধরে হেসে ফেললেন ৷ সিনু মাথা উঠিয়ে বলল,,,
ওহ হ্যাঁ সম্পত্তির ভাগ না দিলেও চলবে ৷ শুধু আপনাদের আদরটুকুই যথেষ্ট আমাদের জন্য ৷
সবাই ওর কথায় হেসে উঠল ৷ তারপর বসারঘরের উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷ ওখানে যেতেই ওদের চারজনের ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ সাজিদ আর মেহমেত নিয়ামত আলমের সাথে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে ৷ সিনু বিরবির করে বলল,,,
মাঝরাতেই চলে এসেছিল নাকি ছা'গল দুটো!
সাজিদ আর মেহমেতও ওদের দেখে কপাল কুঁচকে ফেলল ৷ জোসনা সুলতানা ওদের সবাইকে লনের দিকে যেতে বললে ওরা সবাই উনাকে অনুসরণ করতে শুরু করল ৷ বাকিরা এগিয়ে গেলেও সিনু আর সাজিদ ওদের থেকে খানিকটা পিছনে ছিল ৷ সামনে একটা কলার ছাল পড়ে ছিল ৷ সিনু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ওখানে পা দিতেই মৃদু চিৎকার করে পড়ে যেতে ধরল ৷ সাজিদ চট জলদি গিয়ে ওর একটা হাত ধরে ওকে পড়া থেকে বাঁচিয়ে নিল ৷
সিনু চোখ খিচে মুখ কুঁচকে আছে ৷ এখনও পড়ে যায়নি টের পেয়ে ও আস্তে আস্তে চোখ খুলে ফেলল ৷ চোখ খুলে সামনে সাজিদ কে দেখতেই ও কয়েক সেকেন্ড সাজিদের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ সাজিদও হতভম্ভ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ৷ হুশ ফিরতেই সিনু বাজখাই গলায় বলল,,,
আপনার সাহস কি করে হলো আমাকে টাচ করার?
সাজিদও ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো ৷ গম্ভীর মুখে ওর দিকে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,,
ওকে ছেড়ে দিচ্ছি ৷
ও ছেড়ে যেতেই সিনু ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল ৷ চাপা আ'র্তনাদ করে বলল,,,
এভাবে কেউ ফেলে দেয় স্টুপিড!
সাজিদ হাই তুলে বলল,, আপনি ই তো ছেড়ে দিতে বললেন ৷
সিনু রা'গত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে কোমড় ধরে ধরে উঠে পড়ল ৷ তারপর আফসোস করে বলতে লাগল,,,
কোমড়টা মনে হয় ভেঙেই গেল! আমার এখনও বিয়ে হয়নি!
সাজিদ ব্যঙ্গ করে বলল,,, হবেও না বিয়ে ৷ এমন ঝ'গড়ুটে মেয়েকে বিয়ে করে কোন ছেলে নিজের জীবন ধ্বং'স করতে চাবে?
সিনু কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,, আর আপনাকেও কেউ বিয়ে করবে না ৷ এমন খা'টাশ ছেলে কে বিয়ে করে নিজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করতে কোন মেয়ে ই বা চাবে?
সাজিদ শিস বাজিয়ে যেতে যেতে বলল,, সে না হয় পরে দেখা যাবে ৷
সিনু ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,, এর বদলা তো আমি নিয়েই ছাড়ব মিস্টার প্রতিদ্বন্দ্বী ওরফে শত্রু সাহেব!
সিনু কোমড় ধরে ধরে লনের দিকে চলে গেল ৷ ওর মনটা প্রচন্ড বিষিয়ে উঠেছে ৷ ও বিরবির করে বলতে লাগল,,,,
ছি! আমাকে একজন পরপুরুষ স্পর্শ করল! আমার স্বামীর তো হক নষ্ট হয়ে গেল ৷ আল্লাহ মাফ করো আমাকে ৷
লনে যেতেই ও মুগ্ধ হয়ে গেল,মনের সব তিক্ততা আর কোমড়ের ব্যাথা ভুলে গেল ৷ গাছ-গাছালি আর বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছ দিয়ে ভরপুর একটা লন ৷ এসব দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিয়ামত আলম আর জোসনা সুলতানা ভীষণ প্রকৃতি প্রেমী মানুষ ৷
সিনু ওদের দিকে এগিয়ে যেতেই ওরা তিনজন একযোগে বলে উঠল,,, কোথায় ছিলি সিনুর বাচ্চা!
সিনু কিছু বলার আগেই জোসনা সুলতানা ওকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,
সিনু মা রান্নাঘর থেকে নুডুলসের প্লেটগুলো নিয়ে আসো তো ৷
সিনু তৎক্ষণাৎ কিচেনে চলে গেল ৷ সবার জন্য আলাদা আলাদা প্লেটে উনি নুডুলস সাজিয়ে রেখেছেন ৷ সেটা দেখেই সিনুর মাথায় একটা আইডিয়া এসে গেল ৷ ও একটা প্লেট হাতে তুলে বলল,,,
সিনুর সাথে পাঙ্গা নেওয়ার মজা আজ বুঝবেন মিস্টার প্রতিদ্বন্দ্বী ওরফে শত্রু সাহেব!
সিনু গিয়ে সকলকে তাদের নুডুলসের প্লেটগুলো দিয়ে দিল ৷ তারপর নিজেও বসে খেতে লাগল ৷ খাওয়ার পাশাপাশি ও আড়চোখে সাজিদের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ এক চামচ নুডুলস মুখে দিতেই সাজিদের মুখমন্ডল পরিবর্তন হয়ে গেল এবং ও কাশতে শুরু করল ৷ জোসনা সুলতানা ব্যস্ত হয়ে ওর দিকে পানি বাড়িয়ে দিলেন ৷ সাজিদ ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিল ৷ সিনু মিথ্যা মিথ্যা চিন্তার স্বরে বলল,,,
রান্না ভালো হয়নি? আন্টি কত ভালোবেসে বানিয়েছেন!
সাজিদের আর বুঝতে বাকি নেই কাজটি কার ৷ সিনু ওর প্লেটে অনেকগুলো লঙ্কার গুড়া মিশিয়ে দিয়েছে ৷ জোসনা সুলতানা চিন্তিত স্বরে বললেন,,,
নুডুলস পছন্দ হয়নি তোমার? অন্যকিছু বানিয়ে এনে দিব?
সাজিদ উনাকে কষ্ট দিতে চায় না তাই বলল,,, না আন্টি অনেক ভালো হয়েছে ৷ আসলে হঠাৎ চোখে মুখে উঠে গিয়েছিল তো তাই ৷
সিনু বাকা হেসে বলল,,, তাহলে খেতে শুরু করুন , বসে আছেন কেন?
সাজিদ ক্ষুব্ধ চাহনিতে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে খেতে শুরু করল ৷ ওর চোখমুখ ঝালে ক্রমশ রক্তিম হয়ে উঠছে তবুও ও পানি খাচ্ছে না ৷ ছোট থেকে ও ঝাল সহ্য করে পারে না ৷ সিনু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ সাজিদ খাওয়া শেষ করে অস্বাভাবিক কন্ঠে দুর্বল ভাবে বলল,,,
ওয়াশরুমটা কোথায়?
নিয়ামত আলম বলতেই ও লম্বা লম্বা পা ফেলে সেদিকে চলে গেল ৷ জোসনা সুলতানা আর নিয়ামত আলম চিন্তিত হয়ে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ মেহমেত উনাদের অভয় দিয়ে বলল,,,
Whatever আপনারা টেনশন করবেন না আমি দেখে আসছি ৷
সাজিদ ওয়াশরুমে ঢুকে চিৎকার করতে লাগল ৷ ব্যস্ত ভাবে চোখে মুখে পানি ছিটাতে শুরু করল ৷ এমন দৃশ্য দেখে মেহমেত হতভম্ভ হয়ে বলল,,,
কি হয়েছে ভাই?
সাজিদ পাগলের মতো বলতে লাগল,, ঝাল ঝাল ঝাল! ঝালে আমি ম'রে যাচ্ছি!
বলে ও আবারও পানি খেতে লাগল ৷ মেহমেত ওর পিঠে হাত রেখে বলল,,,
Whatever মিষ্টি কিছু খা তাহলে কমে যাবে ৷
সাজিদ ক্ষীণ স্বরে বলল,, এনে দে ৷
মেহমেত কিছু একটা চিন্তা করে বলল,, আমার ঠোঁটে চুমু খা ৷ Whatever আমার ঠেঁটের চেয়ে মিষ্টি কিছু এই দুনিয়ায় আর নেই ৷
চলবে,,,,,,