#রাগে_অনুরাগে_তুমি
#কলমে_ইসরাত_জাহান_এশা
সুচনা পর্ব 🌷
..
বিকাল টা ছিল অদ্ভুত নীরব। দূরে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আছে কাঁচের জানালায়। ড্রইংরুমের সোফায় বসে ফাইল দেখছিলেন তূর্য চৌধুরি— T.C ফ্যাশন ডিজাইনার, নিজের দুনিয়ায় ব্যস্ত একজন মানুষ। কিন্তু কাজের ভিড়ে যে শূন্যতা, সেটা কেউ দেখে না। কিছুক্ষন পর ছোট ছোট পায়ের শব্দ। চার বছরের নাহিয়ান চৌধুরি দৌড়ে এসে বাবার হাঁটুতে হাত রাখলো। বড় বড় চোখ তুলে বললো—
—“বাবা…”
তূর্য তাকালেন, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
—“কি হয়েছে, বাবা?”
নাহিয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে বললো—
—“বাবা, তুমি আমার জন্য মা আনবে?”
তূর্যের হাত থেমে গেল।
—“মা?”
—“হুম। আমাকে মা আদদ করবে। খইয়ে দিবে… ঘুম পাড়িয়ে দিবে … আমাল মাথায় হাত বুলাইয়া দিবে ”
শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অভিমানটা স্পষ্ট। তূর্যের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো।
ছেলেটা আবার বললো—
—“সবার মা আছে। আমার নাই কেন?”
তূর্য নাহিয়ানকে কোলে তুলে নিলেন। বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
—“বাবা তোমাকে কে বলেছে আমি তোমার জন্য মা আনবো? ”
নাহিয়ান ছোট্ট হাতে বাবার গাল ছুঁয়ে দাড়ি টানতে টানতে বললো—
—" দাদু ভাই বলেছে তুমি আমার জন্য মা আনবে। "”
তূর্য চোখ বন্ধ করে ফোস করে শ্বাস ছাড়লো।
নাহিয়ান আবার ফিসফিস করে বললো—
—“তুমি মা আনবা, বাবা? আমাল একদম ভালো মা চাই…”
_" বাবা শোনো আমি একটা কথা বলি?। "
_"জ্বী বাবা বলো "
_" তুমি যে মা আনতে বলছো। তুমি জানো এখন যদি আমি তোমার জন্য মা নিয়ে আসি। তাহলে তোমার সব চকলেট খেয়ে ফেলবে। তখন তোমার ভালো লাগবে বলো তো বাবা। "
নাহিয়ান কিছু বলতে যাবে তখনি পিছন থেকে আমেনা চৌধুরী এসে বললেন,
_"ছেলে আজে বাজে কথা মাথায় না ঢুকিয়ে একটা বিয়ে করো একা হয়ে ছেলেকে সামলাতে পারবে না । তোমার কথা নাই ভাবো। কিন্তু আমার নাতির কথা তোমাকে ভাবতে হবে তূর্য। "
আমেনা চৌধুরীর কণ্ঠে ছিল কঠোরতা, কিন্তু ভেতরে ছিল ভয়— একা ছেলের একা জীবন আর নাতির শূন্য শৈশবের ভয়।তূর্য ধীরে ধীরে নাহিয়ানকে কোলে নিয়েই সোফা থেকে উঠলেন। চোখ তুলে তাকালেন মায়ের দিকে।
—“মা, বিয়েটা কি এত সহজ?”
আমেনা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“সহজ না। কিন্তু প্রয়োজন। তোমার ছেলে চার বছরে মা চায়। এটা খেলনা না যে কাল কিনে এনে দিলে হবে।”
নাহিয়ান দু’জনের কথোপকথন বুঝতে না পেরে বাবার গলায় মুখ লুকিয়ে বললো—
—“বাবা, তুমি চকলেট নিয়া আসবা … আমি মাকে দিবো।”
তূর্যের বুক কেঁপে উঠলো। তিনি মৃদু স্বরে বললেন—
—“মা আনলে যদি সে তোমাকে বকা দেয়?”
—“আমি দুষ্টুমি করবো না।”
—“যদি তোমার খেলনা কেড়ে নেয়?”
—“আমি শেয়ার করবো।”
—“যদি সে তোমাকে আমার থেকে দূরে রাখে?”
নাহিয়ান এবার মুখ তুলে দৃঢ় গলায় বললো—
—“আমি তোমাকে ছাইড়া কথাও যামু না। মা আমার সাথে থাকবো, তুমি আমার সাথে থাকবা। আমরা তিনজন থাকবো।”
শিশুসুলভ সরলতায় যেন উত্তর পেয়ে গেল পুরো পৃথিবী। আমেনা চৌধুরী এবার নরম স্বরে বললেন—
—“তূর্য, তোমার অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখলে ভবিষ্যৎ দাঁড়াবে কোথায়?”
তূর্যের চোখে ক্ষণিকের জন্য এক ছায়া নেমে এলো।
একটা নাম, একটা মুখ, একটা ভাঙা সম্পর্ক— যা আজও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
—“আমি দ্বিতীয়বার ভুল করতে চাই না, মা।”
—“সব মানুষ এক হয় না।আমি তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখেছি মেয়েটা ভিষণ মিষ্টি। তুমি চাইলে আমি মেয়ের পরিবারের সাথে কথা বলবো। ”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো। তূর্য ধীরে ধীরে নাহিয়ানকে নামিয়ে দিলেন।
—“বাবা , দাদুর কাছে যাও।”
নাহিয়ান চলে যেতেই তূর্য গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
—“মা, যদি বিয়ে করি… তবে আমার শর্ত থাকবে।”
আমেনা চৌধুরীর চোখে এক ঝলক আশার আলো।
—“কি শর্ত?”
—“সে প্রথমে আমার ছেলের মা হবে। তারপর আমার স্ত্রী।”
—“আর?”
—“সে যেন জানে— আমি ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবো না। দায়িত্ব দিতে পারবো।”
আমেনা চুপ করে গেলেন। তূর্য কথা টি বলে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। আমেনা বেগম একটু স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো । যাক নাতির উছিলায় ছেলেকে তো বিয়ে করাতে পারবে। এবার পরের টা পরে ভাবা যাবে।
......
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজতেই নীরা শেখ দ্রুত খাতা জমা দিলো। চারপাশে মেয়েরা কেউ হাসছে, কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে— কিন্তু নীরার চোখে সেই অবকাশ নেই। সে দ্রুত ওড়নাটা ঠিক করে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এল। রোদের তাপে রাস্তা ঝাঁঝালো হয়ে আছে। তার গন্তব্য— ছোট ভাইয়ের স্কুল। দ্রুত পা চালিয়ে স্কুল গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ আটকে গেল। গেটের এক পাশে ছোট্ট একটা ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে নিলয়— তার ( সৎ ভাই।) কাঁধে ব্যাগ, কপালে ঘাম, চোখে অপেক্ষার ছাপ। নীরা কে দেখতেই নিলয় দৌড়ে এলো—
—“বুবু! তুমি এসেছো!”
বলেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
—“আমি তোমার জন্য সেই কখন থেকে দাঁড়িয়েছিলাম।”
নীরার ক্লান্ত মুখে মায়াভরা হাসি ফুটলো। সে আলতো করে নিলয়ের চুলগুলো ঠিক করে দিল।
—“আপুর তো পরীক্ষা ছিলো, ভাইয়া। তাই একটু দেরি হয়েছে। রাগ করেছো?”
নিলয় মাথা নাড়িয়ে বললো—
—“না। আমি জানতাম তুমি আসবা।”
এই একটা বাক্যেই নীরার বুক ভরে উঠলো। এই বাড়িতে যদি কেউ তাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসে— তবে সে নিলয়।
—“চলো, বাসায় যাই।”
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা রিকশা ডাকলো নীরা।রিকশায় বসতেই নিলয় গা ঘেঁষে বসলো। ছোট্ট হাত দিয়ে নীরার আঙুল আঁকড়ে ধরলো।
—“বুবু, তুমি পরীক্ষায় ভালো লিখছো?”
নীরা মৃদু হাসলো।
—“আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই হয়েছে।”
—“তুমি বড় হয়ে কি হবা?”
নীরা কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো। তার স্বপ্ন ছিল— বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, নিজের একটা পরিচয় গড়বে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন কি তার জন্য?
—“দেখি আল্লাহ কী রাখছেন।”
নিলয় হঠাৎ বললো—
—“মা বলতেছিল তোমারে নাকি বিয়া দিবে।”
নীরার আঙুল থমকে গেল। মুখের হাসিটা মলিন হয়ে এলো।
—“এইসব কথা কে বলছে তোমারে?”
—“মা ফোনে কারো সাথে বলতেছিল।”
রিকশার চাকা ঘুরছে…রাস্তার শব্দ বাড়ছে… নীরার মাথার ভেতর কেমন ঝাঁকুনি লাগছে।
...
রিকশা থেকে নেমে নীরা দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে শিমলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“এই সময় আসে মেয়েমানুষ? পরীক্ষা ছিল নাকি পিকনিক?”
নীরা মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলো।
—“স্কুল থেকে নিলয়কে আনতে গেছিলাম।”
—“তা আনতে গিয়া সূর্য ডুবায়া আনতে হইছে?”
নীরা চুপ।
সব কথা তার কানে ঢুকে, কিন্তু মুখে আসে না।
—“শুনে রাখ , কাল লোক আসবে। ভালো করে সাজগোজ করে বসবি। কোনো বাড়াবাড়ি করলে ভালো হবে না।”
নীরার বুক ধক করে উঠলো। কিন্তু সে শুধু বললো—
—“জ্বী।”
নিজের ছোট্ট ঘরে গিয়ে ওড়না খুলে মুখে পানি দিলো। আয়নায় নিজের শ্যামলা মুখটা দেখে এক মুহূর্ত থমকে রইলো।
“আমার জীবনটা কি সত্যিই এত সহজে কারো হাতে তুলে দেওয়া যাবে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। চুলায় হাঁড়ি চাপাতেই ছোট ছোট পায়ের শব্দ—
মুন্নি দৌড়ে এসে নীরার পা জড়িয়ে ধরলো।
—“আপুইই… আমাকে নুদুলস বানাইয়া দিবা। আমার পেটে হাতি ডাকছে। ইয়া বড় হাতি!”
নীরা হেসে ফেললো। মুন্নির গোল গাল দুটো টেনে বললো—
—“আচ্ছা বুড়ি, দিচ্ছি বানাইয়া।”
মুন্নি দুই হাত তুলে নাচতে নাচতে বললো—
—“ইয়া বড় হাতি! ইয়া বড় হাতি!”
তার হাসির শব্দে রান্নাঘরের ভারী বাতাসটা হালকা হয়ে গেল। নীরা নুডুলস বানাতে বানাতে ভাবছিল—
এই দুইটা বাচ্চাই তার জীবনের একমাত্র স্বস্তি।
কিছুক্ষণ পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আতিক শেখ ভেতরে ঢুকলেন।
—“নিলয়! মুন্নি!”
দুই ভাইবোন দৌড়ে গেলো। আতিক শেখ মুন্নিকে কোলে তুলে নিলেন, নিলয়ের হাতে একটা খাবারের প্যাকেট দিলেন।
—“নাও, তোমাদের জন্য এনেছি।”
নীরার দিকে একবারও তাকালেন না। এতে অবশ্য নীরার কোনো আক্ষেপ নেই। বহু বছর ধরে সে এই অভ্যাস করে ফেলেছে। সে শুধু হাঁড়িতে নেড়ে দিয়ে একটা দীর্ঘতম শ্বাস ফেললো। তার নিজের জন্য কখনো কেউ কিছু আনেনি , না আদর, না ভালোবাসা
কিন্তু সে অভিযোগ করতে শেখেনি।
....
তূর্য বাসা থেকে বের হয়ে সোজা অফিসে চলে এসেছে।
T.C ফ্যাশন হাউসের কাঁচের দরজা ঠেলে নিজের বরাদ্দকৃত রুমে ঢুকে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।
টাই আলগা করে চোখ বন্ধ করলো।
মায়ের কথা… নাহিয়ানের কথা…
“মা আনবা, বাবা?”
হঠাৎ দরজায় নক।
—“কাম ইন।”
ভেতরে ঢুকলো আকাশ— তূর্যের ক্লোজ ফ্রেন্ড, আর কোম্পানির পার্টনার।
—“কি রে, মুখটা এমন কেন? কেউ কি ডিজাইন চুরি করে নিলো?”
তূর্য হালকা হেসে বললো—
—“ডিজাইন না… জীবনটাই যেনো কপি-পেস্ট হয়ে গেছে।”
আকাশ চেয়ার টেনে বসল।
—“আন্টি আবার বিয়ের কথা বলেছে?”
তূর্য চোখ খুলে তাকালো।
—“নাহিয়ান আজ নিজে এসে বললো— মা চাই।”
আকাশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“হুম… বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি শূন্যতা বুঝে ফেলে।”
তূর্য ধীরে বললো—
—“আমি আবার সেই ঝুঁকি নিতে পারবো তো?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো—
—“সবাই এক রকম হয় না, তূর্য। হয়তো এবার তোমার জন্য ঠিক মানুষটাই আসবে।”
তূর্য জানালার বাইরে তাকালো। দূরে শহরের ব্যস্ততা।
চলবে… 🌷