#রাগে_অনুরাগে_তুমি || পর্ব ৮ || (শেষ অংশ)
#কলমে_ইসরাত_জাহান_এশা
নাহিয়ানের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর তূর্য নিচে নেমে এলো। ডান হাতে নাহিয়ানের ছোট্ট হাত ধরা, আর বাম হাতে নিজের লাগেজ। বসার ঘরে ঢুকতেই আমেনা চৌধুরীর চোখে লাগেজটা পড়লো। তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“তূর্য, লাগেজ নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
তূর্য ধীর ভঙ্গিতে সোফায় বসতে বসতে বললো—
“চট্টগ্রাম যাচ্ছি।”
আমেনা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—
“হঠাৎ চট্টগ্রাম কেন?”
তূর্য নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো—
“বিজনেসের জন্য যাচ্ছি। আর কিছু দরকার আছে… যেটা ব্যক্তিগত।”
আমেনা চৌধুরী একটু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন—
“নীরা জানে?”
তূর্য নির্বিকারভাবে বললো—
“জানানোর প্রয়োজন মনে করি নি।”
কথাটা শুনে আমেনা চৌধুরীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“তূর্য, তুমি কি এখনো নীরাকে মেনে নাওনি?”
তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর নিচু স্বরে বললো—
“সময় লাগবে।”
আমেনা চৌধুরী এবার স্পষ্ট করে বললেন—
“সময় লাগবে মানে ? নাকি তুমি এখনো কনিকাকে নিয়েই ভাবছো?”
কথাটা যেন তূর্যের কানে বিষের মতো লাগলো।
তার কপালের রগ ফুলে উঠলো। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
“এখানে কনিকার কথা উঠছে কেন?”
আমেনা চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন—
“স্বাভাবিক ভাবেই উঠবে। তুমি নীরাকে এখনো মেনে নাওনি। তাই সবার মনেই একই প্রশ্ন আসবে। আর চট্রগ্রামে কী শুধু কাজের জন্য যাচ্ছো। নাকী অন্য কিছু কোনটা? "
ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো লিপি আর নীরা। নীরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘোমটা টানা। চোখ দুটো শান্ত— কিন্তু ভেতরে কত কথা জমে আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। তূর্য দাঁড়িয়ে পড়লো। রাগ দমিয়ে বললো—
“বাইরের মানুষ এসে আমাকে দু’মুঠো ভাত দিয়ে যাবে না। আমি কারও কথা কানে দেই না। আর অন্য কোন কারণে চট্টগ্রাম যাবো আমি? ”
আমেনা চৌধুরী এবারও থামলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন—
“তুমি যদি নীরাকে না মেনে নাও, তাহলে স্পষ্ট করে বলে দাও। আমি ডিভোর্স করিয়ে আমার ভাইয়ের ছেলে তুহিনের সাথে নীরার বিয়ে দিয়ে দেবো। ওর জন্য এমনিতেই মেয়ে দেখা হচ্ছে। আর নাহিয়ান দাদুভাইও— দুদিনের মোহ কেটে যাবে।”
এই কথাটা শুনে তূর্য যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো। রাগে পিছন ফিরে বললো—
“কেন? পৃথিবীতে কি আর কোনো নারী নেই— যে আমার ভাগ্যে এসেছে তাকে আবার অন্য জায়গায় জুটাতে হবে তোমার ?”
তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
" সমস্যা কী তোমার তুর্য? "
“ সমস্যা হলো— এখন ওর নামটা আমার নামের সাথে জড়িয়ে গেছে। আর আমি যা নিজের বলে মেনে নিই, সেটা ছাড়ি না।”
তার গলায় তীব্রতা স্পষ্ট। এই বলে তূর্য গটগট করে দরজার দিকে হাঁটা দিলো। দরজার কাছে এসে তার সাথে নীরার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। নীরা একবার তার দিকে তাকালো। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। আর হালকা গলায় গেয়ে উঠলো—
🎼
যে জন প্রেমে ভাব জানে না
তার সাথে নাই লেনা দেনা
খাটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা
সেতো সোনা চিনে না। 🎼
গানটা শুনে তূর্যের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
রাগে গজগজ করতে করতে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর লিপি হঠাৎ হেসে উঠলো। হেসে হেসে কুটি কুটি হয়ে বললো—
“ভাবি, তুমি তো একেবারে আগুনে ঘি ঢেলে দিলে!”
নীরা ঠোঁট টিপে মুচকি হাসলো। কিন্তু তার চোখের গভীরে তখনো অদ্ভুত এক ঝিলিক— রাগ, অভিমান আর অজানা এক অনুভূতির। বাইরে তখন সন্ধ্যার বাতাস ধীরে ধীরে বাগানের ফুলগুলোকে দুলিয়ে দিচ্ছে। আর চৌধুরী বাড়ির ভেতরে— রাগ আর অনুরাগের গল্পটা যেন ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠছে।
★
তূর্য চলে যাওয়ার পরও বসার ঘরে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইলো। নীরা ধীরে ধীরে ভেতরে এসে দাঁড়াতেই আমেনা চৌধুরী তার দিকে তাকালেন। চোখে সেই চেনা স্নেহের ছায়া। নরম গলায় বললেন—
“নীরা মা, আজকে তোমার মামা শ্বশুর আর মামি শাশুড়ি আসবে তোমার সাথে দেখা করতে। সুন্দর করে একটা শাড়ি পরে রেডি হয়ে নিও, কেমন?”
কথাটা শুনে নীরা একটু কাচুমাচু হয়ে গেল।
লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বললো—
“মা… শাড়ি পড়তে হবে?”
আমেনা চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন—
“হুম মা, শাড়ি পড়তে হবে। তুমি তো এখনো নতুন বউ।”
নীরা এবার আরও লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বললো—
“মা… আমি তো শাড়ি পড়তে জানি না। আগে কখনো শাড়ি পড়া হয়নি আমার। শুধু বিয়ের দিন শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছিলো।”
কথাটা শুনে আমেনা চৌধুরীর চোখে মমতা ভরে উঠলো। তিনি এগিয়ে এসে নীরার গালে আলতো করে হাত রাখলেন।
“আমায় মা ডেকেছো না? তাহলে আমি কি তোমার মা না?”
নীরা একটু অবাক হয়ে তাকালো। আমেনা চৌধুরী স্নেহভরা গলায় বললেন—
“আমি নিজেই তোমাকে শাড়ি পড়িয়ে দেবো। সন্ধ্যায় তারা আসবে। তুমি মাগরিবের নামাজ পড়ে আমার রুমে এসো। তোমাকে পুতুলের মতো সাজিয়ে দেবো।”
কথাটা শুনে নীরার মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠলো— যেন ছোট্ট কোনো বাচ্চা নতুন খেলনা পেয়েছে। সে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললো—
“ঠিক আছে মা।”
এই সব কথার কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারলো না নাহিয়ান। তবে সে শুধু এটুকু বুঝেছে— তার মাকে পুতুলের মতো বলা হয়েছে। সাথে সাথেই খুশি হয়ে বলে উঠলো—
“দাদু ভাই, আমার মা তো পুতুলের মতোই! কত্ত সুন্দর আমার মা!”
লিপি হেসে ফেললো। সে নাহিয়ানকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে গালে একটা চুমু দিয়ে বললো—
“হুম পাগলা, তোর মা অনেক সুন্দর।”
নাহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে ফেললো।
“তুমি আমায় পাগল বললে কেনো ফুপিমণি?”
লিপি হেসে বললো—
“তুইও পাগল, তোর বাপও পাগল। তোদের দুই পাগলের আস্তানায় গিয়ে আমার এই মিষ্টি ভাবিটা জড়িয়ে গেছে।”
কথাটা শুনে নাহিয়ান কোল থেকে নেমে দৌড়ে নীরার কাছে গেল। নীরার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো—
“আম্মু… আমি পাগল?”
নীরা তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে ছেলের কপাল আর গালে চুমু দিলো। মমতা ভরা গলায় বললো—
“না বাবা, তুমি ভালো। তুমি পাগল হতেই পারো না।”
তারপর চোখ টিপে বললো—
“শুধু তোমার বাপ পাগল।”
লিপি হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলো। নীরা আবার বললো—
“ওই পাগলের ঘর থেকেই তো এমন একটা কিউটের ডিব্বা হয়েছে।”
মায়ের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে নাহিয়ান একেবারে বেহায় খুশি ।
.....
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো। আকাশের গাঢ় নীল রঙের বুক জুড়ে একে একে তারা জ্বলতে শুরু করেছে। চারপাশে মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে উঠলো। চৌধুরী বাড়ির বাগানে তখন হালকা বাতাস বইছে। চন্দ্রমল্লিকা আর রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। নীরা নামাজ শেষ করে ধীরে ধীরে আমেনা চৌধুরীর রুমের দিকে এগিয়ে গেল।রুমে ঢুকতেই আমেনা চৌধুরী আলমারি খুলে একটা মিষ্টি রঙের শাড়ি বের করলেন। শাড়িটার উপর ছোট ছোট সাদা ফুলের কাজ করা। তিনি মুচকি হেসে বললেন—
“এইটা পড়বে আজ।”
নীরা একটু লজ্জা পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমেনা চৌধুরী খুব যত্ন করে নীরাকে শাড়ি পড়াতে লাগলেন। এক এক করে কুচি গুঁজে দিলেন। আঁচলটা সুন্দর করে কাঁধে সাজিয়ে দিলেন। তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দিলেন। চুলগুলো আলতো করে আঁচড়ে একটা সুন্দর খোঁপা করে দিলেন। খোঁপার পাশে ছোট্ট একটা জুঁই ফুল গুঁজে দিলেন।
কপালে ছোট্ট লাল টিপ। হালকা কাজল টেনে দিলেন চোখে। সবশেষে আয়নার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“দেখো তো, আমার পুতুলটা সাজানো কেমন হয়েছে।”
নীরা আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল। সে যেন সত্যিই একটা পুতুলের মতো লাগছে।
....
এর কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির সামনে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। গেট খুলে দারোয়ান অতিথিদের ভেতরে নিয়ে এলো। মামা শ্বশুর মিলন আর মামি শাশুড়ি সুমি মামাতো দেওর তুহিন বসার ঘরে এসে বসলেন। আমেনা চৌধুরী হাসিমুখে তাদের আপ্যায়ন করতে লাগলেন। সুমি বেগম বললেন
" আপা নতুন বউকে দেখি একটু। আসতে বলো "
তুহিন ও সায় দিয়ে বললো
" হুম ফুপি দেখি আমিও একটু। আমার বুড়ো ভাইয়ের কপালে কেমন বউ জুটলো। "
কিছুক্ষণ পর লাজুক পায়ে নীরা বসার ঘরে এলো।
মাথায় ঘোমটা টানা। শাড়ির আঁচলটা বুকের কাছে আলতো করে ধরা। মামি শাশুড়ি নীরাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মুচকি হেসে বললেন—
“মাশাল্লাহ… মেয়েটা তো একেবারে পুতুল।”
নীরা লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে ফেললো।
তুহিন হাত তালি দিয়ে বললো,
" আমি এদিকে মেয়ে পাই না। আর আমার ভাই পুরো ছক্কা মেরে দিলো বাহ বাহ "
নীরা পা দিয়ে নক খুটছে। নাহিয়ান তুহিনের সামনে দাঁড়িয়ে বললো
" চাচু আমার আম্মু অনেক সুন্দর । তুমি নজর দিয়ো না।"
তুহিন আর চোখে চেয়ে বললো
" আব্বে হালা আগে সুন্দর করে চাচ্চু বল। কী চাচু চাচু শুরু করেছিস। আর আমি কখন তোর আম্মুর দিকে নজর দিলাম? "
" আমি তোমায় চাচু বলবো। "
তুহিন আর কিছু বলতে যাবে তখন বাইরে থেকে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল। চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা থামলো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো তূর্য। তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়লো বসার ঘরের দিকে। তুহিন বসে আছে আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে … মিষ্টি কালারের শাড়ি পরে, মাথায় ঘোমটা টেনে, লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে নীরা। তূর্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। মনে মনে শুধু একটা কথাই ভেসে উঠলো—
“মাশাল্লাহ …!”
আমেনা চৌধুরী এগিয়ে এসে বললো
" কী হলো তূর্য তুমি চলে যে? কিছু ঘন্টা আগেই না বেরোলে। তুমি না ৪ দিন পর আসো। "
তূর্য মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো
"ইচ্ছা হয়েছে তাই ফিরে এসেছি। "
এই বলে উপরে চলে যায় । তুহিন নীরার উদ্দেশ্য বললো
" ভাবি শুনলাম আপনি নাকি অনেক সুন্দর করে চা বানাতে পারেন। আমাকে এক কাপ বানিয়ে দেন তো। "
তুহিনের বলা কথাটি তূর্যর কানে যেতেই নিচে এসে নীরার হাত ধরে বললো
"উপরে চলো? "
কথাটি বলে এক প্রকার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নিচ থেকে তুহিন বললো
" আরে ভাইয়া একটু চা-ই তো খেতে চাইলাম। আর বউকে নিয়ে যাচ্ছো। "
তূর্য যেতে যেতে বললো
" যার চা খেতে ইচ্ছে হয়েছে সে যেনো নিজে বানিয়ে খায়। "
এই বলে নীরাকে নিয়ে উপরের ঘরে চলে গেলো
তুহিন মুখ বেকিয়ে বললো
" আমি মনে হয় তার বউকে খেয়ে ফেলতাম। "
লিপি হেসে বললো,
" ভাইয়া তুমি বুঝবে না। ভাইয়া কীসের জন্য রমন করেছে বুঝছো। আর আমি তোমায় চা বানিয়ে দিচ্ছি। "
★
তূর্য দ্রুত পায়ে নীরাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে এলো।
ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।
নীরা অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তূর্য কিছু না বলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো। নীরা দুই হাত বগলের নিচে গুঁজে বিরক্ত মুখে বললো—
“আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেনো?”
তূর্য আয়নার দিকেই তাকিয়ে থেকে নির্লিপ্ত গলায় বললো—
“ইচ্ছে হয়েছে।”
নীরা ভ্রু কুঁচকে বললো—
“আমি এখানে থাকবো না। আমি নিচে যাচ্ছি।”
তূর্য এবার আয়নার সামনে থেকেই ঠান্ডা গলায় বললো—
“এক পা-ও বাইরে দিবে না।”
নীরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো—
“দিলে কী করবেন?”
তূর্য ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকালো। চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা।
“পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো।”
নীরা সাথে সাথে উত্তর দিলো—
“আমার পা কী আপনার বাবার সম্পত্তি, যে ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবেন?”
তূর্যের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
“আমার বাবার না হোক… আমার সম্পত্তি তো।”
নীরা চোখ বড় বড় করে বললো—
“বললেই হলো?”
তারপর ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললো—
“আমি নিচে যাচ্ছি। আমার হবু জামাই দেখা করতে এসেছে। আমি দেখা করবো।”
কথাটা শেষ করেই দরজার দিকে পা বাড়ালো।
কিন্তু সেই কথাটা তূর্যের কানে যেন তীরের মতো বিঁধলো। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে গেল।
এক লাফে এগিয়ে এসে নীরার বাম হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে নিলো। নীরা হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে তূর্যের বুকের সাথে ধাক্কা খেল। তূর্য এক হাতে তার কবজি ধরে রেখেছে, আরেক হাত দেয়ালে রেখে তাকে আটকে দিল। নীরার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল।
দুজনের মুখের দূরত্ব খুব বেশি হলে এক হাত।
তূর্যের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে। নিচু গলায় বললো—
“কী বললে তুমি?”
নীরা একটু ভয় পেলেও মুখে সেটা প্রকাশ করলো না।
ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো—
“যা শুনেছেন তাই বলেছি।”
তূর্যের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
“হবু জামাই?”
নীরা এবার দুষ্টু ভঙ্গিতে বললো—
“হুম… তুহিন সাহেব।”
তূর্যের মুঠো আরও শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বললো—
“তোমার সাহস তো কম না।”
নীরা চোখ তুলে সরাসরি তার দিকে তাকালো।
“সাহস না থাকলে আপনার মতো নিরামিষ মানুষের সাথে কি থাকতাম ? আর আপনি একটা বুড়ো বেটা মানুষ। ”
তূর্য কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব ধীরে বললো—
“আমি নিরামিষ? আর আমি বুড়ো ”
নীরা মুচকি হেসে বললো—
“হুম। একদম নিরামিষ। আর বুড়ো। আমার এখনো ১৫/২০ টা বাচ্চার মা হওয়া বাকি। ”
তূর্য ব্রু কুচকে বললো
"কয়টা বাচ্চা "
নীরা হালকা লজ্জা পেয়ে বললো
" ১৫/২০ টা। বেশি হয়ে গেলো বুঝি? আচ্ছা থাক মাত্র ১৫ টা বাচ্চার মা হওয়া বাকি । মাত্র ১ টা বাচ্চা হলো। আরো ১৪ টা বাচ্চা লাগবে। "
তূর্যর কাশি উঠে গেলো। নীরার কথা শুনে। বলে কী এই মেয়ে। তূর্য নিজেকে শান্ত রেখে বললো
" তুমি কী নেশা করেছো? মাথা ঠিক আছে তোমার। "
" অবশ্যই আমার মাথা ঠিক আছে। থাক আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার সাথে এক বুড়ো বেডির বিয়ে দিয়ে দিবো নি। আমি এক জুয়ান বেডার লগে বিয়ে করব ১৪ টা বাচ্চার মা হয়ে যাবো। এখন সরুন তো দেখি। আমি এখনো কুমারী মেয়ে যেকেও দেখলে আমার নামে কলঙ্ক লেগে যাবে। "
তূর্য হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো। কী বলবে বুঝ উঠতে পারলো না। শুধু বললো
" দেখুন মি....."
" Sorry, I don't want to see you. Get out of my way. "
তূর্যর রাগ আকাশ ছোয়া হলো। তূর্য একদম নীরার কাছে এসে দাঁড়াল। তূর্যর গায়ে থেকে আসা ঘ্রান নীরার নাসারন্ধ্র দিয়ে যাচ্ছে। কেমন জানি অসস্থি লাগছে নীরার। তূর্য গলা নামিয়ে একদম নীরার মুখোমুখি হয়ে বললো,
" এই সুন্দর মুখ খানা যদি অসুন্দর বানাতে না চাও তাহলে এই মুখ দিয়ে অন্য পুরুষের নাম মুখে নিয়ো না। "
নীরা তৎক্ষনাত বললো
" নিলে কী করবেন? "
" কথা বলার ও শক্তি রাখবো না। "
এই বলে ঘার আর গলার মাঝ বরাবর ছোট রকটা কামড় দিয়ে সরে দাঁড়ালো। নীরা পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো । তূর্য সেদিকে তাকিয়ে বাকা হাসলো। নিজের ঘর্মাক্ত শার্ট খুলে নীরার মুখের উপর ফিক্কা দিয়ে বললো
" যাও শার্ট টা ধুয়ে শুকাতে দাও। "
নীরা বাস্তবে ফিরে নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো
" নিজের শার্ট নিজে ধুয়ে নিন। অসভ্য পুরুষ মানুষ "
এই বলে ধিরিম করে দরজা আটকিয়ে চলে গেলো। তূর্য সেদিকে তাকিয়ে হাসলো।
চলমান......