#রাগে_অনুরাগে_তুমি || ১৪||
#কলমে_ইসরাত_জাহান_এশা
নীরা স্তব্ধ হয়ে রইলো তূর্যের কথা শুনে।
এতদিন যে শক্তপোক্ত মানুষের কথা শুনে এসেছে—
এতদিন যে মানুষটাকে পাথরের মতো কঠিন মনে হতো,
আজ তার কণ্ঠে স্পষ্ট ভাঙনের শব্দ শুনতে পেল নীরা।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেমন ভারী হয়ে উঠলো।
তূর্যের মাথাটা এখনো তার পেটের সাথে ঠেকানো—
যেন একটা ক্লান্ত মানুষ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
নীরা ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে তূর্যের চুলে হাত বুলিয়ে দিলো।
কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না সে।
★
আকাশের রঙটা আজ অদ্ভুত। এই একটু আগেও তপ্ত রোদে চারপাশ ঝলসে যাচ্ছিল—
আর এখন হঠাৎ করেই সবকিছু মেঘে ঢেকে গেছে।
কালো-ধূসর মেঘগুলো ধীরে ধীরে পুরো আকাশটা গ্রাস করে নিচ্ছে। দূরে কোথাও মৃদু গর্জন শোনা গেল।
হালকা বাতাস বইতে শুরু করলো—
সেই বাতাসে গরমের তাপটা কেমন যেন কমে এলো।
অফিসের কাঁচের দেয়ালে হঠাৎ টুপটাপ শব্দ পড়তে লাগলো। প্রথমে দু-এক ফোঁটা… তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি।
মেঘের গর্জনের সাথে সাথে আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে—
অসংখ্য বৃষ্টির ফোঁটা একসাথে ঝরে পড়ছে শহরের উপর। কাঁচের দেয়াল বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে—
বাইরের সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
রাস্তার মানুষগুলো ছুটছে আশ্রয়ের খোঁজে,
গাড়িগুলোর হেডলাইট জ্বলে উঠছে অন্ধকারে।
পুরো শহরটা যেন এক মুহূর্তে অন্য রূপে বদলে গেল।
কেবিনের ভেতরে দাঁড়িয়ে নীরা সেই বৃষ্টি দেখছে—
আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ভেতরের ঝড়টার সাথে যেন মিল খুঁজে পাচ্ছে।
বাইরে ঝরছে বৃষ্টি… আর ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে।
★
তূর্য ধীরে ধীরে নীরার পেট থেকে মাথাটা তুলে নিলো।
তার চোখ দুটো লাল—অস্পষ্ট, ভেজা ভেজা।
মুখে সেই আগের শক্ত ভাবটা থাকলেও ভেতরের ভাঙনটা স্পষ্ট। নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিজের দুই হাতের তালুতে তূর্যের মুখটা আলতো করে তুলে ধরলো।
তূর্য অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো—
চোখে মিশে আছে বিস্ময় আর অদ্ভুত এক শান্তি।
নীরা কোনো কথা বললো না।
শুধু একটু ঝুঁকে এসে খুব নরমভাবে তূর্যের কপালে নিজের থেকে একটা চুমু এঁকে দিলো।
সেই স্পর্শে যেন মুহূর্তের জন্য সব ঝড় থেমে গেল। সেই স্পর্শে যেন মুহূর্তের জন্য সব ঝড় থেমে গেল।
তূর্য স্থির হয়ে রইলো।
তার চোখের পাতা ধীরে ধীরে নেমে এলো—
যেন এই শান্তিটুকু সে হারাতে চায় না।
নীরার আঙুলগুলো এখনো তার গালের পাশে থেমে আছে।
দুজনের মাঝখানে নীরবতা—কিন্তু সেই নীরবতাই যেন হাজারটা কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দিচ্ছে।
নীরা তূর্যের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
" জানেন আমার প্রিয় জিনিসগুলো খুব কম কেও নেই প্রিয় জিনিসের খাতায়। যদি কেও সেই প্রিয় জিনিসের খাতায় একবার আমি লিখে ফেলি তাহলে সেটা মুছার ক্ষমতা কারোর নেই। আপনি আমায় স্ত্রী হিসেবে মানেন নি কিন্তু আমি তো আপনাকে স্বামি হিসেবে মেনে নিয়েছি তিন কবুলের পরেই। আমি আপনায় প্রতিটা মোনাজাতে চেয়েছি যেনো আপনি আমার হয়ে যান। আপনি আমায় ভালোবাসুন। শুধু রক্তে মাংসের তৈরী নীরাকে না। তার ছায়াকেও আপনি ভালোবাসুন আমি এটাই চাইতাম। আমার প্রাপ্তির খাতা বরাবরই শুন্য নাহিয়ানের বাবা। আমার প্রাপ্তির খাতায় কী শুধু আপনি হতে পারেন না। আমি আপনায় ছেরে কোথায় যাবো। লাল শাড়ি পরে আপনার সাথে এসেছি । এই দেহে যতদিন প্রান থাকবে আজরাইল আমার দেহ থেকে রুহু যতদিন না কবজ করছে ঠিক ততদিন আমি আপনার থাকবো। আমার যে আপনার সাথে অনেক বছর কাটানো বাকি। আপনার ভালোবাসা পাওয়া বাকি। আপনার সাথে একটা সংসার করা বাকি। বাবা মায়ের ভালোবাসা তো পাই নি, স্বামির ভালোবাসাটা কী আমার পাওনা না বলুন? "
নীরার কথা গুলো তূর্য মন দিয়ে শুনলো। বাহিরে বর্জপাত হচ্ছে আকাশ আজ বাধ ভেঙেছে। তূর্য নীরার দুই হাত তার শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু দিলো। হাত দুটি কপালের সাথে ঠেকিয়ে বললো
" বাসবো খুব ভালোবাসবো। হৃদয়ের রাণি করে রাখবো। শুধু আমায় আগলিয়ে রেখো। আমায় ঠকিয়ে না। "
নীরার চোখের পানি ঠোঁটে হাসি টেনে মাথা নেরে সম্মতি জানালো । বাহিরে মুশলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে আকাশ যে আজ ভিষণ খুশি। তূর্যের কেবিনে আজ দুটি মানব মানবির মনের কথা আদান প্রদান করছে প্রকৃতির নিয়ম যে বরই অদ্ভুত। যে কয়দিন আগে তার বিবাহিত স্ত্রীকে কে মানতে নারাজ ছিলো। আজ সেই তার কাছে স্ত্রীর অধিকার চাইছে।
★
★
বৃষ্টি থেমেছে বিকেলের শেষ দিকে।
আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে—
ধূসর মেঘগুলো সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছে নরম সোনালি আলোকে। সূর্য ডুবতে বসেছে— তার আলো ভেজা আকাশে লালচে-কমলা রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে। কাঁচের দেয়ালে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এখনো ঝুলে আছে— সূর্যের আলো পড়তেই সেগুলো ছোট ছোট হীরের মতো ঝলমল করছে। মাটির গন্ধটা এখন আরও গভীর—
ভেজা মাটির সেই মিষ্টি গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে আকাশের রঙ প্রতিফলিত হচ্ছে—
কোথাও হালকা নীল, কোথাও কমলা আভা। মানুষগুলো আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে— গাড়ির শব্দ, মানুষের কোলাহল—সবকিছু আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে। প্রকৃতি যেন একটু আগে কেঁদে নিয়ে এখন শান্ত হয়ে গেছে। আর সেই শান্ত আকাশের নিচে— দুটো মনও আজ নতুন করে একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।
চলবে..........!