#রাগে_অনুরাগে_তুমি [ ২৭ ]… ( প্রথম অংশ)
#ইসরাত_জাহান_এশা
জাফলং — সিলেটের এক অপূর্ব সৌন্দর্যের নাম, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ছবি এঁকেছে জাফলং মানেই সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ নদী আর পাথরের মেলা। দূরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো নীলচে আবরণে দাঁড়িয়ে থাকে, আর নিচে বয়ে যায় পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল। নদীর বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য সাদা-কালো পাথর—যা এই জায়গাটাকে অন্যরকম করে তোলে। সকালে যখন সূর্যের আলো পাহাড় ছুঁয়ে ধীরে ধীরে নদীর জলে পড়ে, তখন পুরো পরিবেশটা হয়ে ওঠে শান্ত আর মোহময়। আর বিকেলের দিকে হালকা বাতাস, নদীর শব্দ আর পাখির ডাক—সব মিলিয়ে একদম গ্রামের মতো নিরিবিলি অনুভূতি দেয়। জাফলংয়ের আরেকটা বিশেষ আকর্ষণ হলো এর চা বাগান। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি সবুজ চা গাছ যেন কার্পেটের মতো বিছিয়ে আছে। সেখানে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়, যা গ্রামীণ জীবনের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এখানকার মানুষজন সহজ-সরল। কেউ পাথর সংগ্রহ করে, কেউ কৃষিকাজ করে—সব মিলিয়ে জীবনটা খুবই স্বাভাবিক আর প্রকৃতিনির্ভর।
★
গাড়ির ভিতর সবাই ঘুমে কাহিল। নীরা জানালায় মাথা দিয়ে রেখেছে। তূর্য তা দেখে নীরার মাথা নিজের কাধে নিলো। নীরাও গুটিশুটি মেরে চেপে গেলো তূর্যের সাথে। তারা বর্তমানে গোয়াইঘাটে আছে যেতে আরো ঘন্টাখানিক। রাস্তায় মাগরিবের আজান দিয়ে দিসে। পিছন থেকে মুন্নি উঠে কান্না ভেজা স্বরে তার আপুই এর উদ্দেশ্যে বললো
" আপুই কই তুমি "
নীরার তন্দ্রা তখনি ছুটে যায়। ধড়ফড়িয়ে উঠে। পিছনে তাকিয়ে দেখে মুন্নি কাদছে । নীরা জিজ্ঞেস করে
" বুড়ি এই তো আপুই। কী হইসে পাখি। "
মুন্নি ছোট ছোট হাত ধারা চোখ মুছে বললো
" খিদা নাগছে আপুই। কাবো আমি "
নীরা হাসে। তূর্য গাড়ি স্লো করে নিলে মুন্নিকে নিয়ে সামনে বসলো নীরা। ড্যাশবোর্ড থেকে পাউরুটি দিলো। সেটাই টুকুটুকুর করে খেতে লাগলো। কিছুক্ষন পর নাহিয়ান চিল্লিয়ে উঠে আম্মু বলে। গাড়ির ভিতর সবাই লাফ দিয়ে উঠলো। লিপি তো চিল্লিয়ে বলেই ফেললো,
" চোর চোর এই ভাইয়া চোর এসেছে সব নিয়ে গেলো।"
মুন্নি হেসে কুটি কুটি। আমেনা চৌধুরী হাই তুলে লিপির পিঠে এক থাপ্পড় দিয়ে বললো
" বেয়াদব চুপ কর। চোর আসবে কোথা থেকে। আমরা গাড়িতে আছি। নাহিয়ান চিল্লিয়েছে। "
লিপি এবার বেকুপ বনে গেলো। নাহিয়ান আবার চিল্লিয়ে বলে
" আম্মু আমার হিসি পেয়েছে। "
মুন্নি এবার জোড়ে জোড়ে হেসে দেয়। নাহিয়ান খেক করে উঠে বলে
" এই মুন্নি চুন্নি চুপ করো। "
মুন্নি মুখ চেপে হাসছে। তূর্য গাড়ি সাইডে রেখে নাহিয়ানকে নামালো। সাথে লিপি নীরা, মুন্নিও নামলো। নীরা চারপাশ দেখতে লাগলো। তূর্য মুন্নির উদ্দেশ্যে বললো
" মুন্নি তুমিও হিসি দিবে। "
মুন্নি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মাথা উপরনিচ করলো। তূর্য বললো,
" আসো আমার সাথে। "
মুন্নি যায় না। নীরা ব্যাপার বুঝতে পেরে নীরাই নিয়ে গেলো। পাশে কোনো বসত বাড়ি দেখতে না পেয়ে মাঠেই নিয়ে গেলো নীরা পিছনে তূর্য।
কিছুক্ষন পর মুন্নি মিটিমিটি হাসলে নাহিয়ান বললো,
" এই হাসছো কেনো "
" আমি তুমাল ইয়ে দেকেচি। "
" কি কি দেখেছো প্রিন্সেস "
" বুলবো না। আমি আপুইকে বলবো "
" তোমাকে চকলেট দিবো আমি। বলো কী দেখেছো "
" আগে তকলেট দাও "
" এখন নেই তো "
মুন্নি দৌড়ে নীরার কোমড় জড়িয়ে বলে,
" " আপুই তানো, তুমাল এই পতা তেলে না দালিয়ে দালিয়ে হিসু দিসে। আমি দেকেচি লজ্জা লজ্জা। "
নাহিয়ান চিল্লিয়ে বলে উঠে,
" আম্মু তোমার বোন ভালো না। আমার সব শেষ। বাবা এই মুখ আমি কীভাবে দেখাবো। "
এই বলে কাদতে থাকে। লিপি হেসে ফেলে। তূর্য ও মুখ টিপে হাসে। যা নাহিয়ান কে আরো রাগিয়ে দেয়। বাবাকে সে ইচ্ছা মতো মারতে থাকে আর বলে তোমার শালি পচা ভালো না। নীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে মুন্নিকে তূর্যর কোলে দিয়ে নাহিয়ানের উদ্দেশ্যে বলে
" মানিক সোনা আম্মুর কাছে আসো। "
নাহিয়ান নাক টেনে তার আম্মুর কোলে উঠে। মায়ের গলায় মুখ লুকায়। মুন্নি আবার হেসে দেয়। নীরা চোখ রাঙিয়ে বলে
" বুড়ি মামাকে সরি বলো "
মুন্নি নীরার দিকে তাকিয়ে বলে,
" আপুই আমাল মামা কে "
" এই যে আমার ছেলে নাহিয়ান সেই তোমার মামা "
" আমাল মামা "
" হ্যা তোমার মামা "
" আমি এই পতা তেলেকে মামা দাকবো "
" হ্যা ধানি লঙ্কা মামা ডাকবে। "
" তুনাবাই আমি ওলে বাইয়া দাকমু না? "
" না শালিকা ভাইয়া না মামা হবে "
" মামা..." কিছুক্ষন নাম টা নিজেই আওরায়। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলে,
" আচ্ছা আমি মামা দাকমু "
তাহলে ডাকো তো বুড়ি,।
" দাকলে আল কানবে না তু। "
" না ধানি লঙ্কা কানবে না "
" আমাল মামা কান্দে না তবাই পুচা বলবে। মুন্নি আল তুমায় পতা তেলে বুলবে না তলি... "
লাস্টের কথা আদুরি গলায় কানে ধরে বলে। নাহিয়ানের ও কান্না থেমে যায়। হাসে মিষ্টি করে।
......
গাড়ি আবার চলতে থাকে তাদের মেইন গন্তব্যে নাহিয়ান আর মুন্নি দুইজনেই এখন কার্টুন দেখতে ব্যাস্ত। লিপি গাড়িতে উঠে আবার ঘুমে কাত। নীরা গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে পরিবেশ দেখতে ব্যাস্ত। তূর্য নীরার পা জোড়া নিজের পায়ের উরুর উপর রাখে। পায়ের পাতা আলতো করে টিপতে থাকে। নীরা প্রথমে হকচকিয়ে উঠে। পা সরাতে চাইলে তূর্য চোখ গরম করে তাকালে আর সরায় না। নীরা এবার আমতা আমতা করে বলে,
" মিস্টার হাসবেন্ড "
" বলুন রাণি সাহেবা "
" আমায় এখানে নিয়ে আসবেন সকালে। অনেক সুন্দর এখানে। সিলেটের জাফলং টা পুরো ঘুড়িয়ে দেখাবেন আমায়। "
তূর্য তাকায় তার বউয়ের দিকে কতো আদুরি ভাবে বললো। তূর্য নীরার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে কপালে চুমু দিয়ে বললো
" সব ঘুড়িয়ে দেখাবো আয়ার নুড়ি ফুলকে। "
নীরা অনেক খুশি হয়। অতি খুশিতে তূর্যের গালে টপাটপ দুটো চুমু দেয়। চুমু দিয়ে আবার বাহিরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তূর্য আর লজ্জা দিতে চাইলো না। রাতেই নাহয় উসুল করবে।
★
গাড়ি এসে থামলো চৌধুরী বাড়িতে। গাড়ির হর্ন পেয়ে সবাই বাহিরে ছুটে আসে। বাচ্চারা হৈ-হুললোড় শুরু করে দেয়। লিপি আগে আগে নেমে দৌড়ে যায়। নাহিয়ান আর মুন্নি গাড়ি থেকে নেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে যেনো তাদের মতো শান্ত বাচ্চা আর কেও নেই। নীরাও খানিকটা শান্ত হয়ে যায়। কিছুটা ভয় লেগে যায় । তূর্য বুঝতে পেরে পিঠে হাত রেখে অভয় জানায়। " আমি আছি ভয় পেয়ো না "
নীরা তূর্যের হাত ধরে শক্ত করে। আমেনা মুন্নি আর নাহিয়ানের হাত ধরে ভিতরে যায়। তূর্য নীরাকে নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ায় । তূর্যের মেজো চাচি ( জমিলা) নীরার দিকে তাকিয়ে তুর্যের উদ্দেশ্যে বলে
" এই তাহলে তোমার নতুন বউ তূর্য "
তূর্য নীরাকে নিজের সাথে জড়িয়ে বলে,
" হ্যা আমার বউ "
" নাহিয়ান মেনেছে তার সৎ মা... "
মাঝ পথে তূর্য জমেলাকে থামিয়ে দিয়ে বললো
" চাচি যেটা বলতে চাচ্ছেন আর যেনো সেটা না শুনি। নীরা আমার অর্ধাঙ্গিনী । আমার ছেলের আম্মু। আমার জীবন সঙ্গী । তাকে নিয়ে একটা কূউক্তি আমি তূর্য শুনবো না। "
পরিবেশ গুমোট হয়ে যায় তূর্যের কথায়। একদম শান্তু নিরিবিলি। পিছন থেকে তূর্যের মেজো কাকা ওয়ালিদ চৌধুরী গম্ভীর কন্ঠে বললো
" কী হচ্ছে টা কী বাহিরে? জমিলা ওদের ভিতরে নিয়ে আসো। ওরা অনেক ক্লান্ত। জার্নি করে এসেছে। "
ওয়ালিদের কথা শুনে আর কেও কিছু বলে না । জমিলা নীরা আর তূর্যকে ভিতরে নিয়ে আসে। নীরা তূর্যের হাত শক্ত করে ধরে রাখে। তূর্যও ছাড়ে না তার বউয়ের হাত।
চলবে.....